আবার পড়ি : প্রবন্ধ―হাসনাত আবদুল হাই : বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশী : হাসনাত আবদুল হাই

বাংলা

বাংলাদেশই পৃথিবীতে একমাত্র দেশ যার প্রতিষ্ঠার পেছনে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা কার্যকর ছিল। যে জাতিসত্তা ভাষাকে কেন্দ্র করে পরিচিত এবং সুসংগঠিত হয়েছে তারই অধিকার প্রতিষ্ঠার এবং সংরক্ষণের জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। বাংলাদেশ এই অর্থে ভাষাভিত্তিক একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ এবং বাংলা এই দেশের রাষ্ট্রভাষা। রাষ্ট্রভাষার মূল অর্থই হলো রাষ্ট্রীয় কাজে এর স্বীকৃতি এবং ব্যবহার। এরপরই ভাষার যে ভূমিকা তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, সামাজিকতায়, শিল্প-সাহিত্যের সৃষ্টিতে এবং শিক্ষায়-গবেষণায়। রাষ্ট্রভাষা হলেও বাংলা যে এই সব ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যবহৃত হতে হবে এমন বিধান নেই, বাধ্যবাধকতাও নেই। তবে রাষ্ট্রভাষার অনুষঙ্গ হিসেবে এই সব ক্ষেত্রেও বাংলা ব্যবহৃত হবে, এটাই প্রত্যাশিত। ভাষা ব্যবহারের এই সব ক্ষেত্রের মধ্যে শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ; কেননা শিক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে উঠে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পালাবদলের ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলা ভাষার মাধ্যমে সকল পর্যায়ের শিক্ষা-দীক্ষা পরিচালিত হলে একদিকে যেমন ভাষা-জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে অন্য দিকে মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রাপ্তির ফলে শিক্ষার্থীরা স্বচ্ছন্দবোধ করবে। এতে করে উচ্চশিক্ষিতের হার বৃদ্ধিরও সম্ভাবনা থাকবে। এমন প্রত্যাশা নিয়েই কোনো আইন প্রবর্তিত না হলেও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা অনিবার্যভাবে গৃহীত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত সকল বিতর্কের অতীত এবং এ নিয়ে দীর্ঘ কোনো আলোচনারও প্রয়োজন পড়েনি। এমনটি যে হয়েছে, হবার কথা, এ ছিল স্বতঃসিদ্ধ। বাংলা ভাষার এই মর্যাদা ও ভূমিকা অবশ্য বাংলাদেশের আদিবাসীদের ব্যবহৃত ভাষাকে অস্বীকার করে না। কিন্তু সেই সব ভাষা সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় এবং রাষ্ট্রকার্যে ব্যবহৃত হবার অবকাশ নেই।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার দীর্ঘ আটাশ বছর পর একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশের প্রাক্কালে শিক্ষায় বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে দুটি সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার মধ্যে প্রথমটি অত্যন্ত গুরুতর এবং এর প্রভাব হয়েছে সুদূর প্রসারী। বাংলা ভাষায় বিভিন্ন বিষয় শিক্ষাদানের জন্য, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে, প্রথমেই প্রয়োজন বাংলায় সেই সব বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক রচনা। বাস্তব অবস্থা এখন এই যে, সুদীর্ঘকালে উচ্চতর শিক্ষার পর্যায়ে এমন কোনো বিষয় (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ছাড়া) নেই যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক বাংলায় অনূদিত কিংবা মৌলিকভাবে রচিত হয়েছে। এই দায়িত্ব বাংলা একাডেমির ছিল; যে কারণেই হোক তারা এখন পর্যন্ত তা পালন করতে পারেনি। এই দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের কোনো সময়সীমা বা লক্ষ্যমাত্রা নির্দিষ্ট করা আছে কিনা জনসাধারণের জানা নেই। ফল হয়েছে এই যে, উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি বই ব্যবহার করেই অধ্যাপকবৃন্দ ক্লাসে লেকচার দিচ্ছেন এবং অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী অধ্যাপকদের অথবা ইংরেজিতে অভিজ্ঞ ব্যক্তির অনুগ্রহে তৈরি নোট লিখে জোড়াতালি দিয়ে পরীক্ষা পাসের চেষ্টা করছে। সংখ্যায় নগণ্য ইংরেজি জানা ছাত্র-ছাত্রীদের অবশ্য এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। এইভাবে নোট মুখস্থ করে পরীক্ষা পাস হয়তো হচ্ছে কিন্তু সত্যিকারের জ্ঞানার্জন হচ্ছে, এ কথা প্রায় ক্ষেত্রেই বলা যাবে না। মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা সম্ভব না, এমন বক্তব্য এখানে রাখা হচ্ছে না। জাপানে, থাইল্যান্ডে, চীনদেশে, ইয়োরোপের প্রায় সব দেশেই মাতৃভাষা সকল পর্যায়ের শিক্ষার মাধ্যম এবং সেখানকার শিক্ষার্থীরা বিশে^র অন্যান্য উন্নত দেশের সমমানের জ্ঞানার্জন করে নিজেদের শিক্ষিত করে তুলেছে এবং তুলছে। কিন্তু সেই সব দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে নিজেদের ভাষায় শিক্ষার সকল পর্যায়ের জন্য পাঠ্যপুস্তক অথবা মৌলিক বই-পত্র পাওয়া যায় না। এমনকি বিদেশের গবেষণামূলক প্রবন্ধও প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সে সব দেশে নিজ ভাষায় অনূদিত হয়ে যায়। এই ধরনের মজুদ (ংঃড়পশ) জ্ঞানভাণ্ডার এবং প্রবহমান (ভষড়)ি জ্ঞানসৃত বাংলাদেশে নেই বললে চলে এবং তা নিশ্চিত করার তেমন আন্তরিক প্রচেষ্টা বা উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না। বাংলা একাডেমির ভূমিকা কেবল একুশের উদ্যাপন আর বইমেলার অনুষ্ঠান অথবা বিক্ষিপ্তভাবে অপরিকল্পিত উপায়ে কিছু বিষয়ের ওপর বাংলা বই মুদ্রণে সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল না। উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষার ব্যবহার অর্থবহ এবং কার্যকর করার দায়িত্বও এই প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তিয়েছে। তারা কবে কোন সময়সীমার ভেতর সেই দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করতে পারবেন সে সম্বন্ধে ঘোষণা করা হলে উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ ও সংশয়ের অবসান হবে।

বর্তমান বিশে^ নতুন আবিষ্কার, অনুশীলন ও গবেষণার ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে। এই সব সংযোজন পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত না হলে উচ্চশিক্ষায় তো বটেই নিম্নতর পর্যায়েও জ্ঞান প্রদান নিম্ন পর্যায়ের অথবা মাঝারি মানের হয়ে যেতে বাধ্য। বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষিতদের অনেকেই আজ এই সীমাবদ্ধতার শিকার। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে যার জন্য কিছু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী নিজ উদ্যোগে, শ্রমে এবং অধ্যবসায়ে ভাষাজনিত এই প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বিশ^মানের অধিকারী হতে পারছে। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের বৃহৎ অংশই ইংরেজি ভাষা জ্ঞানের অভাবে এই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত। এই সমস্যা সমাধানের এখন একটাই পথ : যে পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে ন্যূনতম সংখ্যায় বই-পুস্তক বাংলায় লেখা না হচ্ছে (এবং এটা হওয়া মধ্য-মেয়াদি ব্যাপার) ততদিন উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে কলেজ থেকে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার। বর্তমানে কলেজে এখন সব বিষয়ই বাংলায় পড়ানো হচ্ছে এবং বিশ^বিদ্যালয়ে অনেক বিষয়েই ক্লাসের লেকচার দেওয়া হচ্ছে বাংলাতেই, যদিও সে সব বিষয়ে কলেজ পর্যায়ে ছাড়া বাংলা বই নেই। এই অবস্থায় যে সব ছাত্র-ছাত্রী ইংরেজি মাধ্যমে স্কুলের পরীক্ষা পাস করে আসছে অথবা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইংরেজি ভাষা ভালোভাবে রপ্ত করেছে তারাই ইংরেজিতে লেখা পাঠ্যপুস্তক পড়ে পরীক্ষায় বাংলায় অথবা ইংরেজিতে ভালো উত্তর দেবার সুযোগ গ্রহণ করছে। এই সমাধান যে সন্তোষজনক না এবং এর মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। কোনো বৈষম্যের প্রশ্রয় না দিয়ে ইংরেজি ভাষা জ্ঞানের জন্য সকলকে সমান সুযোগ দেওয়া সমীচীন। এই সমান সুযোগ দেবার উদ্দেশ্যে কলেজ থেকেই (যেসব বিষয়ে বাংলা পাঠ্যপুস্তক নেই সে বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য) ক্লাসে ইংরেজি ভাষাকে উচ্চতর শিক্ষার মাধ্যম করে ইংরেজি পাঠ্যপুস্তক পড়ার সমান সুযোগ প্রদান করা হলে সকলেই ইংরেজি বই পড়ে (যে সব বিষয়ে বাংলা পাঠ্যপুস্তক নেই) পরীক্ষা দিতে পারবে। ভাষায় ব্যুৎপত্তির কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে উৎকর্ষের বৈষম্য দূরীকরণের এটাই স্বল্প অথবা মধ্য-মেয়াদি উপায়।

প্রশ্ন হলো, উচ্চতর পর্যায়ে অর্থাৎ কলেজ থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার জন্য হঠাৎ করে ইংরেজির ব্যবহার করলেই কি তা সব ছাত্র-ছাত্রীর জন্য সমান সুযোগ এনে দেবে ? না, দেবে না। এখন মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে ইংরেজি শিক্ষার মান এমনই যে অধীত এই বিদ্যা নিয়ে কলেজে এসে এবং বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ইংরেজিতে লেকচার শুনে তার অর্থ বোঝা এবং নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষমতা অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীদেরই আয়ত্তে থাকবে না। এখানে ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ছাত্র-ছাত্রীরা অন্যদের অতিক্রম করে যাবে। সুতরাং মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে ইংরেজি ভাষা শিক্ষাকে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যাতে করে ছাত্র-ছাত্রীরা মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ভালোভাবে রপ্ত করতে পারে। ইয়োরোপের অনেক দেশেই এখন স্কুলে ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। আমরাও পঞ্চাশ কি ষাটের দশকে মফস্সলে বাংলা মিডিয়াম স্কুলে যে ইংরেজি শিক্ষা লাভ করেছি সেই শিক্ষা পরবর্তী কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি মিডিয়ামে শিক্ষালাভের জন্য যথেষ্ট ছিল। অনেক বছরের অবহেলার ফলে স্কুলে ইংরেজি শিক্ষার যে অধঃপতন ঘটেছে তার নিরসনে যথেষ্ট সংখ্যক ইংরেজি ভাষার শিক্ষককে বিশেষ অনুশীলন দিয়ে, বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য প্রেরণ করে এবং ইংরেজি শিক্ষার জন্য বিশেষ বৃত্তি দিয়ে উৎসাহ দিতে হবে। স্কুল ও কলেজের ইংরেজি শিক্ষকদের জন্য ইংরেজি ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউট (প্রতি প্রশাসনিক বিভাগে একটি) প্রতিষ্ঠা করে এই প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

উচ্চশিক্ষায় যথাযথভাবে শিক্ষিত হবার উদ্দেশ্য ছাড়াও ইংরেজি ভাষাকে গুরুত্ব দেয়ার আরও একটি কারণ রয়েছে। বর্তমানে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা প্রদানকারী স্কুলের পাশাপাশি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল রয়েছে এবং এদের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। উচ্চবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরাও এই সব স্কুলে ভর্তি হবার জন্য ব্যাকুল। যারা সফল হচ্ছে তাদের সঙ্গে বাংলা মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রথম থেকেই ভাষাকে কেন্দ্র করে একটা পার্থক্য গড়ে উঠছে। ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র-ছাত্রীরা ভালো ইংরেজি লিখছে, শুদ্ধভাবে কথা বলছে, অবলীলায় ইংরেজি বই পড়ছে। এরা স্কুলের পড়া শেষ করে স্যাট, টোফেল দিয়ে অথবা ‘এ’ লেভেল ‘ও’ লেভেলে প্রাপ্ত গ্রেডের কল্যাণে বিদেশের কলেজে বা বিশ^বিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যাচ্ছে। যারা দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য থেকে যাচ্ছে তারা বিশ^বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় (যেমন আইবিএ-তে বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে) স্বচ্ছন্দে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকে, মাল্টিন্যাশনালে এবং প্রায় সব আকর্ষণীয় চাকরিতে এরাই সফল হচ্ছে। এইভাবে শিক্ষার ভিত্তিতে সমাজে দুটি শ্রেণির সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। এটা বাঞ্ছনীয় হতে পারে না। এর জন্য ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো বন্ধ বা তাদের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ইংরেজি শিক্ষার মানের উন্নতি, ঠিক আগে যেমন ছিল। এর জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে সে সম্বন্ধে ওপরে কয়েকটা প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অন্যান্য সমাধানের কথাও ভাবা যেতে পারে। আমাদের লক্ষ্য অবশ্যই থাকবে একদিন উচ্চশিক্ষার সকল বিষয় বাংলায় পড়ানো। তার জন্য যে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও আয়োজন তা আপতকালীন পদক্ষেপের পাশাপাশিই চলতে হবে।

চার দশকেরও বেশি সময়কালব্যাপী বাংলা রাষ্ট্রভাষার (পাকিস্তান আমলে অন্যতম এবং এখন একমাত্র) মর্যাদায় আসীন। এই সুদীর্ঘ সময়ের ভেতরও আমরা যে বাংলাকে উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত এবং সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে পারিনি এটা আমাদের বড় ব্যর্থতা তো বটেই, লজ্জারও বিষয়।

বাঙালি

বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচিতি ‘বাঙালি‘ হবে, এই বিধান রাখা হয়েছিল। ১৯৭৬ সালে সামরিক শাসনের সময়ে এই বিধান পরিবর্তন করে সংশোধনীর মাধ্যমে ‘বাঙালি’র স্থলে ‘বাংলাদেশী’ সন্নিবেশিত হয়। কোন কারণে বা বিবেচনায় এই সংশোধনী আনা হয় সে স¤পর্কে কোনো বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা এবং অনুমানই করা চলে। ‘নাগরিকের’ আভিধানিক অর্থ, যে বা যারা একটি রাষ্ট্রে জন্মসূত্রে বসবাস করে এবং নাগরিকত্বের সুযোগ-সুবিধা এবং অধিকার প্রাপ্ত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জন্মসূত্রেই নাগরিকত্বের প্রাপ্তি ঘটে ; স্বল্প এবং বিশেষ ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব প্রদানও করা হয়। ইংরেজিতে ‘নাগরিকের’ সমার্থক শব্দ পরঃরুবহ। এই আভিধানিক অর্থ অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক ‘বাঙালি’, একথা বলা হলে অর্থগত এবং সংজ্ঞাগত কিছু বিভ্রান্তির অবকাশ থাকে। ‘বাঙালি’ একটি নৃ-তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়, সেই অর্থে বাঙালি একটি জাতিগত গোষ্ঠী। এই নৃ-তাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক জাতিসত্তার উপকরণসমূহের মধ্যে রয়েছে দৈহিক গঠন, আকার-প্রকার, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, ব্যবহৃত ভাষা এবং সেক্যুলার আচার-অনুষ্ঠান। সেক্যুলার এই জন্য যে উপরোক্ত উপকরণে নিষিক্ত একটি জাতির সদস্যরা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হতে পারে। অবশ্য ধর্মের কারণে খাদ্যাভাসে, বেশভূষায় এবং সংস্কৃতির কোনো কোনো অভিব্যক্তিতে ভিন্নতার সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় কারণে সৃষ্ট এই ভিন্নতা জাতিসত্তার যে বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রধান, সে সব গৌণ করতে পারে না। এখানে যেভাবে নৃ-তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত জাতির সংজ্ঞা দেওয়া হলো, একটি দেশ এমন একটি জাতি নিয়েই গঠিত হতে পারে। এমন একটি জাতির নর-নারী সেই রাষ্ট্রের নাগরিক, একথা বলা হলে ভুল হবে না। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একটি রাষ্ট্রে জাতীয়তার ভিত্তিতে একাধিক নৃ-তাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জাতি বসবাস করতে পারে। যেমন, বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ইত্যাদি নৃ-তাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক জাতি বা উপ-জাতীয়দের বাস রয়েছে। এদের সবাইকে ‘বাঙালি’ বলা হলে হয়ত তারা নিজ নিজ অঞ্চলে কিছু আইনগত সুযোগ বা অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে। যেমন, জমির মালিকানা। সুতরাং বাংলাদেশের সকল নাগরিক বাঙালি নয়, ‘বাংলাদেশি’, এর পেছনের যুক্তি শক্ত।

বেশ কিছু দলিল-পত্র এবং দেশি-বিদেশি সংস্থার অনুসৃত ফর্মে ‘নাগরিকের’ স্থলে ‘জাতীয়তা’ কথাটি লেখা থাকার ফলে দুটি শব্দের যথাযথ ব্যবহারে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। যেমন, দেশের বা বিদেশের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কার্ডে যাত্রীদের লেখার জন্য কেবল ‘জাতীয়তা’ কথাটিই লেখা থাকে। এটি সঠিক নয়। তারা যা জানতে চাইছেন বা যা তাদের জানা উচিত সে বিষয়টি হল সংশ্লিষ্ট যাত্রী কোন দেশের ‘নাগরিক’; কোন নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ, সেই তথ্যটি নয়। এই দুটি শব্দের অশুদ্ধ ব্যবহার বন্ধ করা প্রয়োজন। কোনো কোনো দেশের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আবার ‘বর্ণ’ সম্বন্ধেও জানতে চায়, যা তাদের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে না। ‘নাগরিকত্বই’ একটি মানুষের আইনগত পরিচয় এবং সে কোন দেশের নাগরিক, সরকারিভাবে এটি জানতে চাওয়াই সঙ্গত এবং আইনানুগ। জাতীয়তা মানুষের নৃ-তাত্ত্বিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়, যার ভূমিকা প্রধানত থাকে সংশ্লিষ্ট নৃ-গোষ্ঠীর সমাজ জীবনে এবং অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর সঙ্গে বিভিন্ন স¤পর্ক স্থাপনে। বিদেশি কর্তৃপক্ষ এবং প্রয়োজন ছাড়া দেশীয় কর্তৃপক্ষেরও এ সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ অপ্রাসঙ্গিক।

একইভাবে সংজ্ঞার এবং প্রচলনের দিক দিয়ে একটি জাতিসত্তাই জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক ভিত্তি, সেটি নাগরিকত্বের পরিচয় নয়। ‘বাংলাদেশি’ যদি নাগরিকত্বের পরিচয় হয় তাহলে তাকে ‘জাতীয়তাবাদের’ ভিত্তি বলা হলে বিভ্রান্তির অবকাশ থাকে। ‘নাগরিকত্ব’ একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে বসবাস করবার আইনগত অধিকার। অপর দিকে ‘জাতীয়তাবাদ’ মূলত তার মৌলিক এবং সঙ্কীর্ণ অর্থে একটি নৃ-তাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর পরিচয়, যেই পরিচয়ে সেই নৃ-গোষ্ঠীর নর-নারী কোনো একটি রাষ্ট্রে বা একাধিক রাষ্ট্রে বাস করতে পারে (যেমন, স্পেনে বাস্ক অথবা ইরাক এবং তুরস্কে কুর্দ নৃ-গোষ্ঠীর নর-নারী) এবং সেই বাস করার ভিত্তিতে তারা সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকত্বের অধিকার প্রাপ্ত হয়। নাগরিকত্ব ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ। জাতিসত্তা একই সঙ্গে ভূগোলে সীমাবদ্ধ এবং ভৌগোলিক সীমার ঊর্ধ্বে। এইভাবে একটি রাষ্ট্রে একাধিক জাতিসত্তার সহাবস্থান হতে পারে এবং তাদের ভাগ্য, জীবনযাপন ইত্যাদি সেই রাষ্ট্রের নাগরিকত্বের একই সুতোয় বাঁধা থাকে। নিজেদের মধ্যে কিছু বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বে¡ও (যেমন ধর্ম) একাধিক জাতিসত্তা একটি ভৌগোলিক সীমারেখার ভেতর একই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পরিচিত হয়ে বসবাস করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রই বহুজাতিক, যেমন আমেরিকা। সেই দেশে সকল অধিবাসীই আমেরিকার নাগরিক কিন্তু জাতিসত্তার বা বর্ণের ভিত্তিতে কোনো গোষ্ঠী নিজেকে বলে আফ্রো-আমেরিকান, হিস্পানো-আমেরিকান এবং কিছুদিন পর সেখানকার বাঙালিরাও হয়ত নিজেদের বলবে বেঙ্গলি-আমেরিকান। জাতিসত্তার এই বিভিন্ন পরিচয়ে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কোনো হানি হয় না। জাতিগত গোষ্ঠীগুলো যে পর্যন্ত নিদারুণভাবে নিপীড়িত, শোষিত অথবা বঞ্চিত না হয়, সে পর্যন্ত তারা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে ইতস্তত করে না, বরং বৃহৎ একটি ভূখণ্ডের অধিবাসী হিসেবে নাগরিকের পরিচয়ে গর্ব অনুভব করে। এই গর্ব এবং সন্তুষ্টি সংখ্যালঘু একটি নৃ-তাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী অনুভব করবে কিনা তার অনেকটাই নির্ভর করবে সংখ্যাগরিষ্ঠের মনোভাব এবং ব্যবহারের ওপর। এই মনোভাব এবং ব্যবহার সততা, ন্যায়নীতি, আন্তরিকতা এবং সৌহার্দের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলে অভ্যন্তরীণভাবে সৃষ্ট অসন্তোষ অথবা বাইরে থেকে চাপানো ভেদ-বুদ্ধি জাতি-গোষ্ঠীর সম্পর্কে চিড় ধরাতে পারে না। একটি ভৌগোলিক সীমানায় গঠিত রাষ্ট্রের ভেতর একাধিক জাতিসত্তার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দৃষ্টান্তই বর্তমান বিশে^ বেশি। একাধিক জাতিসত্তার ভেতর বিদ্যমান জাগ্রত ঐক্যবোধের ভিত্তিতে অথবা একটি প্রধান জাতিসত্তার উদ্যোগেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে জাতিগত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীতে কেবল ধর্মের ভিত্তিতে একাধিক জাতিসত্তা নিয়ে গঠিত রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত ইসরায়েল এবং পাকিস্তান। এদের একটি টিকে আছে, অন্যটি আদিরূপে টেকেনি। জাতিগত রাষ্ট্র যেভাবেই গঠিত হোক, তার অন্তর্গত জাতিসত্তাসমূহের ঐক্যবোধ একটি প্রবল সংযোগকারী শক্তি এবং পারস্পরিক স¤পর্কের বন্ধন। এই ঐক্যবোধ তিরোহিত হবার কারণেই পাকিস্তান ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে অখণ্ড থাকেনি; দুভাগ হয়ে একটি বাংলাদেশ হয়েছে। জাতিগত রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে জাতীয়তাবাদকে চিরায়ত মনে করার উপায় নেই, ইতিহাসের এই শিক্ষা।

জাতীয়তাবাদ

জাতীয়তাবাদ মূলত নৃ-তাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর জাতিসত্তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। এর অস্তিত্ব জাতিসত্তার ভেতরই অন্তর্নিহিত হয়ে সুপ্ত থাকে; স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সদা জাগ্রত নয়। এই শ্রেণির জাতীয়তাবাদের অনুভূতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশেষ বিশেষ দাবি, (যেমন, শিক্ষায় বা চাকরিতে সমান সুযোগ) প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়। কোনো নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতি তার প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে, নানা অধিকার থেকে তার সদস্যরা বঞ্চিত হচ্ছে, তারা শোষণের শিকার হচ্ছেএর কোনোটি বা সব বোধ থেকে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আন্দোলন শুরু হতে পারে। এই সব অসন্তুষ্টি দূর করা হলে এবং স্থিতাবস্থায় উন্নতি ঘটলে এই প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া স্তিমিত হয়ে আসে এবং এক সময় শান্তির প্রত্যাবর্তন হয়। অপর দিকে প্রতিকারহীন পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ চরমে উঠে সংগ্রামের রূপ নেয়। প্রতিবাদ ও সংগ্রামের প্রকারভেদে স্থিতাবস্থার যে পরিবর্তন আসে রাজনৈতিকভাবে তার সম্ভাবনা স্বায়ত্তশাসন থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা পর্যন্ত বিস্তৃত। অপর দিকে অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে নৃ-তাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত কোনো জাতির প্রতি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শিক্ষায়, চাকরিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে সমান অধিকার আদায় অথবা কোটা পদ্ধতির প্রচলন করতে পারে। আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতিবাদী আন্দোলন তাদের জন্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে সমান অধিকার আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা স্থিতাবস্থায় এই উন্নতিতেই সন্তুষ্ট হয়েছে, স্বায়ত্তশাসন বা রাজনৈতিক স্বাধীনতা চায়নি।

আগেই বলা হয়েছে যে সব রাষ্ট্র একাধিক নৃ-তাত্ত্বিক- সাংস্কৃতিক জাতীয়তা বিশিষ্ট গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত সেখানে সকল জাতির (বৃহৎ, ক্ষুদ্র, মাঝারি) সমন্বয়েই গড়ে ওঠে ‘রাজনৈতিক জাতি’। এই পরিচয় তখন রাষ্ট্রের সমার্থক হয়ে যায়, কেননা সার্বভৌম রাষ্ট্র ছাড়া রাজনৈতিক জাতি রূপ পরিগ্রহ করতে পারে না। এই অর্থেই জাতিগত রাষ্ট্রের উদ্ভব। আমরা এই মানদণ্ডেই বলি বাংলাদেশিরা একটি জাতি, যেমন জাতি আমেরিকান, ফরাসি অথবা ইটালিয়ানরা। জাতিগত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত জাতি-গোষ্ঠীগুলোর ঐক্যবোধের ভিত্তিতে যে আদর্শবাদ গড়ে ওঠে তাকে বলা যায় জাতীয়তাবাদের দ্বিতীয় সংজ্ঞা এবং ভিত্তি। এই জাতীয়তাবাদ একইসঙ্গে জাতিগত রাষ্ট্র গঠনের কারণ বা অনুরূপ রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী ফলাফল হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাতিগত রাষ্ট্র গঠনের পর জাতীয়তাবাদ সোচ্চার থাকে না এবং তার ব্যবহারের প্রয়োজনও অনুভূত হয় না। এইভাবে জাতি, জাতিসত্তা আর তাদের সদস্যদের দ্বারা অনুভূত জাতীয়তাবাদের ভেতরে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রেখা টেনে দেওয়া সম্ভব। স্পষ্টীকরণের জন্য আবারও বলতে হয় যে, রাষ্ট্রের অধিবাসী সকল নৃ-তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত হয় রাজনৈতিক জাতি যখন তারা একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়। তার আগেই নৃ-তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক ভিত্তিতে চিহ্নিত জাতিগত গোষ্ঠীর অন্তর্নিহিত সত্তার আত্মরক্ষামূলক বা স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি অথবা অভীপ্সা থেকে জাগ্রত হয় জাতীয়তাবাদ। আবার সকল জাতিসত্তার সম্মিলিত দাবিও জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে হয় বা হতে পারে এবং জাতিগত রাষ্ট্র গঠনের পরও তার অস্তিত্ব থাকতে পারে, যদি তেমন প্রয়োজন থাকে। বিভিন্ন প্রেক্ষিত এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্যের ভিন্নতা থাকার জন্য জাতীয়তাবাদের বিষয়টি কিছুটা জটিল যে কারণে এ সম্বন্ধে আরো কিছু বক্তব্য রাখা যেতে পারে।

বৈরী পরিবেশ অথবা বিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে জাগরূক হলে জাতীয়তাবাদ কেবল প্রতিবাদী নয়, সংহারীও হতে পারে। বৃহতের সঙ্গে ঐক্যবোধের স্থলে অনৈক্যের দিকে যাত্রা এর গন্তব্য হয়ে যেতে পারে। আবার কোনো জাতিসত্তার জাতীয়তাবাদ কেবল অশান্ত, অস্থির এবং অস্বাভাবিক কালের প্রতিবাদী এবং সংগ্রামী আহ্বানের অতিরিক্ত কিছু নাও হতে পারে। জাতীয়তাবাদকে তাই কোনো নৃ-তাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সকল সময়ের, বিশেষ করে স্বাভাবিক, শান্ত ও স্থির সময়ের জীবন দর্শন হিসেবে দেখা হয় না। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতিগত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও যেসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ‘জাতি’র ভেতর উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখা দিতে পারে তার লক্ষ্য বাইরের বৈরী শক্তির মোকাবেলা অথবা তার বিরুদ্ধে আগ্রাসন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রাক্কালে জার্মানি, ইতালি এবং জাপানে এই ধরনের ‘জাতীয়তাবাদের’ আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। ঐতিহাসিকভাবেই রাজনৈতিক ‘জাতির’ উগ্র ‘জাতীয়তাবাদে’ ক্ষতিকর দিকটি উদ্ঘাটিত হয়ে গিয়েছে। অপর দিকে গোষ্ঠীভিত্তিক জাতিসত্তার জাতীয়তাবাদ যতক্ষণ ন্যায়-বিচার, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা বা অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য ব্যবহৃত হয় তখন এর নৈতিক ক্ষমতা এবং সৃজনীশক্তি শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। আবার বহু-জাতিক কোনো রাষ্ট্রে সম্মিলিত জাতিকে একতাবদ্ধ করে জাতীয় উন্নয়ন অথবা বাইরের কোনো সত্তার সঙ্গে তার পার্থক্য চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যেও কখনও কখনও জাতীয়তাবাদের চেতনা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এইভাবে প্রেক্ষিত এবং উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ হতে পারে। এই সব প্রেক্ষিত এবং উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সচেতন হয়ে যৌক্তিক প্রয়োজন বোধেই জাতীয়তাবাদ বিষয়টির ব্যবহার এবং প্রয়োগ বাঞ্ছনীয়। যেমন, একটি জাতিগত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অনৈক্য যদি প্রবল হয়ে ওঠে তাহলে সেখানে বৃহত্তর জাতীয়তাবাদ একটি আদর্শ হিসেবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এর অনুষঙ্গ হয়ে অবশ্যই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমতা আনার প্রয়োজন হবে। এই ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ কেবল আদর্শিক ভাবনা হলে যথেষ্ট হবে না, দৈনন্দিন জীবনে এর কার্যকর দিকটি হবে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আলোচনার সার-সংক্ষেপ করে বলতে গেলে ‘নাগরিক’ হিসেবে আমরা বাংলাদেশি, ‘জাতীয়তার’ পরিচয়ে আমরা কেউ বাঙালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো আর ‘জাতি’ হিসেবে আমরা বাংলাদেশি। এখানে ‘বাংলাদেশি’ দুবার এসে গিয়েছে। এটা অনিবার্য। কেননা যারা রাষ্ট্রের নাগরিক তাদের সবাইকে নিয়েই রাজনৈতিক জাতি গঠিত হয়ে থাকে। রাষ্ট্রের পরিচয়েই রাজনৈতিক জাতির পরিচয়। কোনো প্রেক্ষিতে ‘জাতি’ কথাটির ব্যবহার তা ¯পষ্ট হলে বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। একই শব্দ পূর্বাপরের উল্লেখে তার যথার্থতা পায়। লেখার বা আলোচনার সময় এ বিষয়ে সচেতন হলে সমস্যা দেখা দেয় না। আর যেহেতু রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘জাতি’ এবং ‘নাগরিক’ বিষয় দুটি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত, তাই একই শব্দের ব্যবহারে যৌক্তিকতা রয়েছে। জাতীয়তাবাদের বিষয়ে ধরে নেওয়া যায় যে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের (এবং অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর) জাতীয়তাবাদের সফল ব্যবহারের পর পরবর্তী সময়ে এবং বর্তমানে জাতীয়তার ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভেতর যে সৌহার্দ ও সমঝোতা বিদ্যমান তার ফলে তাদের কারও পক্ষ থেকে বিশেষ করে জাতীসত্তাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ অনুভবের অবকাশ নেই। তাহলে অবশিষ্ট থাকে রাজনৈতিক জাতির মতাদর্শ হিসেবে জাতিয়তাবাদ। রাজনৈতিক জাতি হিসেবে বাংলাদেশীদের যদি বাইরের কোনো শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মোকাবেলার প্রয়োজন দেখা না দেয় অথবা নিজেদের পক্ষ থেকে আগ্রাসনের অভিপ্রায় না থাকে তাহলে কেবল জাতি-নির্মাণের জন্যই এই জাতীয়তাবাদের যৌক্তিকতা থাকতে পারে। কিন্তু দেশের ভেতর বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য অক্ষুণ্ন রেখে অথবা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস না করে কেবল জাতীয়তাবাদের আদর্শের ভিত্তিতে জাতি গঠন কার্যকর হবে এমনটি আশা করা যায় না। তখন জাতীয়তাবাদের নেতিবাচক (আমরা অন্যের চেয়ে ভিন্ন!) ভূমিকাই প্রাধান্য পেয়ে যেতে পারে। জাতীয়তাবাদের একাধিক অর্থ এবং বহুমুখী ব্যবহারের সম্ভাবনার জন্যই এর গ্রহণ এবং প্রয়োগে সতর্কতা প্রয়োজন।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares