আবার পড়ি : প্রবন্ধ―হাসনাত আবদুল হাই : সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা : হাসনাত আবদুল হাই

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেটি ঐতিহাসিক বক্তৃতা বলা হলে যথেষ্ট হবে না। সেই বক্তৃতা ছিল পৃথিবীতে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক বক্তৃতা। ভাষার শক্তিতে, আবেগের স্ফুরণে এবং বক্তব্যের ক্ষুরধারে ৭ মার্চের বক্তৃতা ছিল অসাধারণ এবং অদ্বিতীয়। পৃথিবীর আর কোনো দেশে কোনো রাজনীতিবিদ বা গণনায়ক কখনও এমন বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে, তেজোদ্দীপ্ত ভাষায় এবং সময়োপযোগী করে বক্তৃতা দিয়েছেনতার উদাহরণ নেই। বঙ্গবন্ধু ভালো বক্তা ছিলেন এবং সব সময়ই বক্তৃতা দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। কিন্তু ৭ মার্চের বক্তৃতা শুধু তাঁর নিজের অতীত সব বক্তৃতা নয়, আরও অনেক বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তি ও নেতার বক্তৃতাকে অতিক্রম করে গেছে। তুলনায় কাছে আসতে পারে এমন কোনো বক্তৃতার কথাও মনে করা যায় না, এতই বিস্ময়করভাবে শক্তিশালী ছিল সেই বক্তৃতা। তাঁর সামনে উপস্থিত ছিল আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার লাখো জনতা। বক্তৃতা শুনে কেবল তারাই অনুপ্রাণিত, উদ্দীপ্ত এবং সঙ্কল্পবদ্ধ হয়নি; যারা রেডিওতে শুনেছে অযুত, কোটি সেই সব শ্রোতাও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতো একইভাবে আবেগে, উচ্ছ্বাসে, ক্রোধে এবং অকুতোভয়ে উদ্বেলিত হয়েছে। বক্তৃতার প্রতিটি কথা স্পর্শ করেছে হৃদয়ের তন্ত্রী এবং একই সঙ্গে মনন ও প্রজ্ঞার যৌক্তিক মানদণ্ড। সেই বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার সংগ্রামের কথা বলতে হয়েছে, আবার একই সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে জনগণের দাবি ও অধিকার মেনে নেওয়ার জন্য শাসকদের শেষ সুযোগ দিয়ে আহ্বান করা হয়েছে। বিপরীত দুই শক্তি ও চিন্তাধারার মধ্যে ভারসাম্য আনার জন্য এমন মোক্ষম বক্তব্য উপস্থাপন এক অভাবনীয় কৃতিত্ব। দ্ব্যর্থবোধক মনে হলেও ৭ মার্চের বক্তৃতায় সুযোগ সন্ধান ও চতুরতার ভূমিকা ছিল না, বক্তৃতাটি ছিল সময়ের দাবি ও প্রয়োজন মনে রেখে এমন এক ঘোষণা ও অঙ্গীকারযেখানে সমসাময়িক বাস্তবতা প্রাধান্য পেয়েছে। সেই বক্তৃতায় প্রতিফলিত হয়েছে কোটি কোটি বাঙালির প্রাণের কথা, তাদের ক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং সংগ্রামী সত্তার বজ্রকণ্ঠ। জনগণের নেতা হয়ে বঙ্গবন্ধু রক্তপিপাসু হন্তারক প্রতিপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছেন, এ দেশের মানুষকে চোখ রাঙিয়ে, বেয়নেট-বুলেট দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না, ন্যায্য অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা যাবে না। যদি স্বায়ত্তশাসনের দাবি মেনে না নেওয়া হয় এবং বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দেশ শাসনের সুযোগ দেওয়া না হয় তাহলে স্বাধীনতাযুদ্ধ হবে অনিবার্য, এ ঘোষণাও প্রচ্ছন্ন রয়েছে তার বক্তব্যে। জনগণকে এই স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছেন তিনি ¯পষ্ট ভাষায়। তিনি তাদের ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে বলেছেন, যার যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।

৭ মার্চের বক্তৃতার অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে রাষ্ট্রশক্তির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে যদি জনগণের অধিকার মেনে না নেওয়া হয় তার প্রতিক্রিয়া কী হবে তার উল্লেখ করে। যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ন্যায্য পাওনা দেওয়া না হয়, তাদের রাষ্ট্রের পরিচালনার ভার থেকে বঞ্চিত করা হয় তা হলে স্বাধীনতা সংগ্রামের সম্ভাবনা ও প্রয়োজনের উল্লেখ করা হয়েছে। আবার একই সঙ্গে রয়েছে পাকিস্তান-রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরই বাঙালিদের অধিকার রক্ষার জন্য শাসকদের শেষ সুযোগ দেওয়ার ইঙ্গিত।

১ মার্চ গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে সামরিক সরকার পূর্ব পাকিস্তকানের বাঙালিদের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র করেছিল। তাকে সহায়তা করেছিল জুলফিকার আলী ভুট্টো। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশ শাসনে যতটা না উৎসুক ও উদগ্রীব ছিল তার চেয়েও বেশি আগ্রহী ও সঙ্কল্পবদ্ধ ছিল স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি উঠেছে এবং ক্রমেই সেই দাবি গণআন্দোলনের রূপ নিয়েছে; যার অন্তিমে ছয় দফার ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ নর-নারী নির্বাচিত করেছে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে। যখন দেখা গেল পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক আমলা এবং শিল্পপতিদের চক্র বাঙালিদের ক্ষমতায় আসতে দিতে চায় না তখন ¯পষ্ট হয়ে গেল তারা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দিতেও সম্মত নয়। ১ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করে সামরিক সরকার তাদের এই ষড়যন্ত্র প্রকাশ্যে নিয়ে এলো। ক্ষোভে প্রতিবাদে এবং ঘৃণায় ফেটে পড়ল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি। কেন্দ্রের শাসন উপেক্ষা করে তারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করে প্রদেশের দৈনন্দিন সরকারি কাজকর্ম সম্পাদনে সহযোগিতা করল। প্রতিদিন রাস্তায় রাস্তায় লাখ লাখ মানুষের মিছিল বের হলো, প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হলো এবং অধিকার আদায়ের জন্য দৃঢ়সঙ্কল্প ব্যক্ত হলো। সামরিক সরকার বেগতিক দেখে দর-কষাকষির জন্য বৈঠকের ব্যবস্থা করল; কিন্তু একই সঙ্গে কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমনের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্লেন বোঝাই করে সৈন্য এবং অস্ত্র-শস্ত্রও আনতে থাকল। এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেল যে, তারা মুখোমুখি সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ছাত্রনেতারা সময়ক্ষেপণ না করে বঙ্গবন্ধু ও অন্য নেতাদের ওপর স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য চাপ দিল। তারা পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে তার স্থানে উড়িয়ে দিল বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত সবুজ পতাকা।

৭ মার্চের বক্তৃতার আগে বঙ্গবন্ধু দুটি বিপরীত স্রোতের মাঝখানে দেখতে পেলেন নিজেকে। একদিকে ছাত্র-জনতার দাবিএখনই স্বাধীনতা ঘোষণা করা হোক, অন্যদিকে চতুর সামরিক শাসক ও তাদের দোসরদের পক্ষ থেকে সমঝোতায় আসার জন্য বৈঠকের আহ্বান। এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু যে উভয় সঙ্কটে পড়লেন তার তুলনা নেই কোনো রাজনৈতিক নেতার অভিজ্ঞতায় এবং জীবনে। এমন কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়নি আর কোনো জননেতাকে, কোনো দেশে, কোনো সময়ে। বঙ্গবন্ধুর ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনে ৭ মার্চ ছিল সবচেয়ে কঠিন এক পরীক্ষার মুহূর্ত। বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ ছয় দফার ভিত্তিতে নির্বাচন করেছে এবং নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করেছে। টালবাহানা করার পর যখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দলবল নিয়ে ঢাকায় এসে ছয় দফা নিয়ে আলোচনা করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে তখন সেই উদ্যোগকে সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাখ্যান করা যায় না। আবার যে উত্তাল জনসমুদ্র প্রতিদিন রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং সংগ্রামী স্লোগান দিচ্ছে তাদের আশ^াস দেওয়া না হলে তা যে হবে বিশ^াসঘাতকতা, সে কথাও তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন। ছাত্রদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের পর জনতার পক্ষ থেকে স্বাধীনতার জন্য ঘোষণার দাবি প্রায় দুর্বার হয়ে উঠল। ৭ মার্চের বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুকে এই দুই বিপরীত স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এমন বক্তব্য রাখতে হবে, যা তাকে জনতার দাবি রক্ষার প্রতিই অধিক দায়িত্বশীল এবং আন্তরিক বলে প্রমাণিত করবে। এমন কঠিন বক্তৃতা বঙ্গবন্ধুকে আগে কখনও দিতে হয়নি, পৃথিবীর কোনো নেতার সামনেও এমন পরীক্ষা এসে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়নি। বক্তৃতায় কী বলবেন, কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবেন, আবার একই সঙ্গে শত্রু শিবিরে ভীতির সঞ্চার করে দেবেন, এসব নিয়ে ভাবনা-চিন্তার সময় পাননি বঙ্গবন্ধু। তাকে খুব স্বল্প সময়ে ভেবে নিতে হয়েছে, ঠিক করতে হয়েছে তার বক্তব্য। আর এটা তাকে করতে হয়েছে প্রচণ্ড চাপের মুখে। কারও সঙ্গে বুদ্ধি-পরামর্শের সুযোগ পাননি তিনি, কোনো ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের কথা মনেও আসেনি তার; কেননা ইতিহাসে এমন ঘটনা, সঙ্কট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হননি কোনো নেতা। বেশ বোঝা যায় বঙ্গবন্ধুকে একাই ভাবতে হয়েছে কী বলবেন জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে। কোন কথা শুনলে তারা উদ্দীপ্ত হবে, তাদের সংগ্রামী চেতনা জাগ্রত থাকবে। যাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন সমঝোতার শেষ সুযোগ দেওয়ার জন্য তাদেরই বা কীভাবে বোঝানো যাবে যে, দাবি মেনে না নিলে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রাম অনিবার্য। চূড়ান্ত ভাষায় স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিলে সমঝোতার শেষ সুযোগ দেওয়া যাবে না সামরিক শাসকদের, আবার স্বাধীনতার উল্লেখ করা না হলে সংগ্রামী চেতনায় অকুতোভয় জনতা সন্তুষ্ট হবে না। এই উভয় সঙ্কটে থেকে মনে মনে তৈরি করে নিয়েছেন ৭ মার্চের বক্তৃতা বঙ্গবন্ধু, এ কথা বেশ বোঝা যায়। এ ছিল এমন এক বক্তৃতা, যা শুনে শ্রোতার ধমনিতে রক্ত প্রবাহ প্রবাহিত হয়েছে বন্যার প্রবল স্রোতের মতো, তাদের হৃৎপিণ্ডের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়েছে মাঠে-ঘাটে-প্রান্তরে। ৭ মার্চের বক্তৃতায় স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না কিন্তু স্বাধীনতার সংগ্রামের ঘোষণা ছিল। ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’এ কথায় কোনো অস্পষ্টতা ছিল না। ৭ মার্চ পর্যন্ত সংগ্রাম চলছে এবং চলবে, যতদিন না বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, একথা বঙ্গবন্ধু জানতেন। শাসকদের সঙ্গে স্বায়ত্তশাসন নিয়ে যে আলোচনা সেটিও এই সংগ্রামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, পূর্বাপর বক্তৃতাটি শোনা হলে। আলোচনা ব্যর্থ হলে যে সশস্ত সংগ্রাম শুরু হবে তারও ইঙ্গিত এবং নির্দেশনা রয়েছে ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো’এই ঘোষণায়।

দুই বিপরীত স্রোতের মধ্যে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু কি আপসের চেষ্টা করেছিলেন ? ৭ মার্চের বক্তৃতা কি ছিল দ্ব্যর্থবোধক ? প্রতিটি লাইন পড়া হলে চলমান ঘটনা স্মরণ করলে এই ধারণা অমূলক মনে হবে। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের জন্য স্বায়ত্তশাসন লাভের দাবি নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন এবং সেই স্বায়ত্তশাসন আদায় করার উদ্দেশ্যে আলোচনায় শেষবারের মতো বসতে রাজি হয়েছিলেন। আলোচনায় ছয় দফার কোনো অংশ নিয়েই তিনি এবং তার সহকর্মীরা ছাড় দেননি, সুতরাং স্বায়ত্তশাসন, যা ছিল স্বাধীনতারই নামান্তর বা ভূমিকা, সেক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কোনো দ্ব্যর্থবোধক অবস্থান গ্রহণ করেননি। যদি এই স্বায়ত্তশাসনের অধিকার অস্বীকৃত থাকে এবং সামরিক শাসক শ্রেণি সংখ্যাগরিষ্ঠের দাবি উপেক্ষা করে তাহলে সশস্ত্র সংগ্রামই হবে একমাত্র উপায়এই ঘোষণাও ছিল ৭ মার্চের বক্তৃতায় অবিচ্ছেদ্য অংশ। খুব প্রচ্ছন্ন ছিল না স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি। শুধু সময় নিয়ে মতপার্থক্য ছিল। এক অংশ চেয়েছে ৭ মার্চেই স্বাধীনতার ঘোষণা এবং যুদ্ধ শুরুর নির্দেশ। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং যুদ্ধ শুরুর জন্য বাঙালিদের প্রস্তুত হতেও বলেছেন। কিন্তু আলোচনায় শাসক শ্রেণিকে বাঙালিদের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য শেষ সুযোগও দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু বিপ্লবী নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাকে জনগণের প্রতি তার প্রতিশ্রুতির কথা যেমন মনে রাখতে হয়েছে, দাবি আদায়ের পর্যায়ক্রমিক ধাপের প্রসঙ্গেও সচেতন থাকতে হয়েছে। এখানে আপসের প্রশ্ন ছিল না, ছিল ধৈর্য প্রদর্শন ও যুক্তির সহায়তায় দাবি আদায়ের কৌশল। এই কৌশল যখন সফল হয়নি তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য জনগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আরও আগে, ৭ মার্চের বক্তৃতায়। কেউ বলতে পারবে না যে, তিনি স্বাধীনতার যুদ্ধের জন্য জনগণকে প্রস্তুত হতে বলেননি। তবে তাঁর হয়তো একটা ক্ষীণ আশা ছিল যে রক্তপাত ছাড়াই বিনাযুদ্ধে স্বাধীনতা (স্বায়ত্তশাসন) অর্জিত হবে। তিনি রক্তপাত চাননি, হত্যাকাণ্ডে তিনি শোকাভিভূত হয়েছেন আর তাই সামরিক শাসকদের তর্জনি তুলে বলেছেন―‘আর যদি একটা গুলি চলে…।

খুব সংক্ষিপ্ত ছিল ৭ মার্চের বক্তৃতা কিন্তু বক্তব্যের গভীরতায়, গুরুত্বে এবং ব্যাপকতায় এর সমতুল্য দ্বিতীয় বক্তৃতা খুঁজে পাওয়া যাবে না। আব্রাহাম লিঙ্কন গেটিসবার্গ বক্তৃতা দিয়েছেন মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে গণতন্ত্রের আদর্শের প্রতি তার বিশ^াস এবং ধারণা উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে। বেশ ভেবেচিন্তে অনেক সময় নিয়ে লেখা সেই বক্তৃতা। উইনস্টন চার্চিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ‘নেভার সো ফিউ’ শীর্ষক যে বক্তৃতায় ব্যাটল অব ব্রিটেনে নিহত বৈমানিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান, সেটিও সুলিখিত এবং বেশ ভাবনা-চিন্তা করে লেখা। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে যে বক্তৃতা দেন সেটি প্রায় তাৎক্ষণিক জনসভায় দাঁড়িয়েই অথবা তার ঠিক আগে তাকে ঠিক করতে হয়েছে কী বলবেন। তার সময় ছিল না ভাবনা-চিন্তার, তদুপরি ছিল অসম্ভব চাপ। এ সত্ত্বেও যে বক্তৃতাটি তিনি রেসকোর্সের জনসমুদ্রের সামনে দিয়েছিলেন সেটি অবিস্মরণীয়। পৃথিবীতে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবে এর মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে চিরকাল।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares