আবার পড়ি : প্রবন্ধ―হাসনাত আবদুল হাই : আমাদের সংস্কৃতি : হাসনাত আবদুল হাই

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সংস্কৃতি কেবল চারুকলা, সাহিত্য বা নৃত্য-গীতে সীমাবদ্ধ নয়। তার রয়েছে বৃহৎ এক পরিমণ্ডল এবং পরিচিতি যার সঙ্গে একটি নৃগোষ্ঠী বা জাতিগত সমষ্টির জীবনযাপনের সব অনুপুংখ বৈশিষ্ট্যই সংশ্লিষ্ট। এই বিশদ অর্থে সংগতি সামগ্রিকভাবে জীবনযাপনের প্রকরণ ও উপকরণের সমার্থক। কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্র থেকে শুরু করে নর-নারীর পরিধেয় বস্ত্রও সংস্কৃতির ধারক বলে স্বীকৃতি পায়। প্রচলিত অর্থে অবশ্য সাহিত্য-শিল্প এবং বিভিন্ন পারফর্মিং আর্টই সংস্কৃতির পরিচয় বহন করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, যার কোনোটার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক রয়েছে।

যেভাবেই সংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন, তার অভিব্যক্তিতে একটি দেশের ভূগোল, জলবায়ু, তার অতীত ইতিহাস, সে দেশের অধিবাসীদের মুখের ভাষা, ধর্ম বিশ্বাস, লোক-কথা ও লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান এবং সৌন্দর্যবোধ ভূমিকা পালন করে। এদের বলা যায় সংস্কৃতির অভ্যন্তুরীণ এবং মৌলিক পরিচিতির উপাদান। যেহেতু কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠীই স¤পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল না এবং নেই সেই কারণে তাদের ওপর অন্য দেশের বা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন ও সংস্কৃতির প্রভাবও পড়েছে। গ্রহণ-বর্জনের প্রক্রিয়ায় বহিরাগত সেসব প্রভাবের আত্তীকরণ ঘটেছে এবং ঘটছে। এসব প্রভাবকে বলা যায় সংস্কৃতির অর্জিত উপাদান। যে সংস্কৃতি সচল এবং সমসাময়িক হতে পেরেছে, কেবল অতীতকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেনি, তার প্রভাব হয়েছে সুদূরপ্রসারী। একইভাবে যে সংস্কৃতি নতুন এবং জনপ্রিয় প্রযুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তার প্রভাবও অতিক্রম করেছে দেশ-কালের সীমানা।

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে অভ্যন্তরীণ এবং মৌলিক উপাদানের ভূমিকা বেশ প্রবল। ভাষা এবং সমৃদ্ধ লোকজ ঐতিহ্য এই সংস্কৃতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এ দেশে জীবনযাপনের পদ্ধতির পরিবর্তন হয়েছে ধীরগতিতে, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ক্ষেত্রে যারা গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে স¤পৃক্ত। নাগরিক নর-নারীর জীবনে বাইরের সংস্কৃতির প্রভাব পড়লেও তারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির দিকে পিঠ ফিরে দাঁড়ায়নি, অন্তত সবাই নয়। এই ভূখণ্ডে যখন পাঠান-মোগল-তুর্কিদের শাসন ছিল এবং তারও পর ইংরেজদের, সেই সময়ে বাংলাভাষা ও সাহিত্যচর্চা অব্যাহত থেকেছে এবং লোকসংস্কৃতি জনপ্রিয়তা হারায়নি। নাগরিক উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বিদেশি ভাষা শিখেছে এবং বিদেশি সংস্কৃতির বিভিন্ন উপকরণ ও প্রকরণ ব্যবহার করে জীবনযাপনে উচ্ছ্বসিত হয়েছে। কিন্তু তাদের কাছেও লোকসংস্কৃতি এবং লোকজ ঐতিহ্য উপেক্ষণীয় মনে হয়নি। সেই তখন থেকে লোকজ এবং আধুনিক ঘরানার সমন্বয়ে যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে তা এখনও অব্যাহত।

যেহেতু প্রাক্তন পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমানের বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলা এবং পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও তাই, সেই জন্য এক সময় প্রশ্ন উঠেছিল দুই অঞ্চলের সংস্কৃতি এক এবং অভিন্ন কি না। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক দেখা দিয়েছে এবং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপও ঘটেছে। জোর করে ভাষাকে পৃথক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং রবীন্দ্রনাথকে উপেক্ষা করার নির্দেশ এসেছে। কিন্তু এই সচেতন হস্তক্ষেপ ও প্রচেষ্টা সফল হয়নি। এর কারণ ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হয় না। সংস্কৃতির কোনো রাজনীতি নেই। যদিও রাজনীতির সংস্কৃতি থাকতে পারে। সংস্কৃতির মূল বৈশিষ্ট্যই হলো তার স্বতঃস্ফূর্ততা এবং পপুলিজম। মানুষ যা নিজের পছন্দ মতো গ্রহণ করবে না তা ওপর থেকে চাপিয়ে দিলেও টেকে না। একমাত্র সাংস্কৃতিকভাবেই মানুষ তার স্বাধীনতা প্রকাশ এবং উপভোগ করে। একজন বন্দি দাস উদয়াস্ত পরিশ্রম করে প্রভুর নির্দেশে এবং নিপীড়নে কিন্তু দিনান্তে সে যখন বিনোদনের জন্য গান গায়, সেই গান একান্তভাবেই তার নিজস্ব। সংস্কৃতিতে প্রভুত্বের জোর খাটে না।

এক সময়ে মনে হয়েছিল, সংস্কৃতির যে আধুনিক রূপ এবং যার অধিষ্ঠান শহরে তার কাছে বোধহয় লোকজ এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি পরাজয় স্বীকার করে ধীরে ধীরে লুপ্ত হবে। গ্রামের মানুষ গাছের ডাব দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন না করে কোকাকোলা ব্যবহার করছে, পালা-পার্বণ উঠে যাচ্ছে এবং পিঠা তৈরির রেওয়াজ ভুলে যাচ্ছে গ্রামের মেয়েরা, আলতা আর কাজল ছেড়ে গ্রামের মেয়েরা যখন লিপস্টিক আর পাউডার বাবহার শুরু করল এবং তাঁতের শাড়ি ছেড়ে ক্যারিলিন জাতীয় সিনথেটিক শাড়ি হলো তাদের আবরণ, বাঁশের বাঁশির জায়গায় টু-ইন-ওয়ান এসে জয় করে ফেলল গ্রামের মানুষের মন। তখন মনে হয়েছে যে লোকজ সংস্কৃতির দিন বোধহয় নিঃশেষিত। গ্রামে যখন এই অবস্থা, শহরে আধুনিকতার জোয়ারে প্রায় ভেসে গেল নতুন প্রজন্ম। পিঠা কী জিনিস তা অজানা থাকল তাদের কাছে। ভাটিয়ালি, জারি-সারি গান মনে হল বিরক্তিকর এবং সেকেলে। মাটির পুতুল কিংবা বাঁশ-বেতের কারুশিল্প দিয়ে ঘর সাজানোর পরিবর্তে মহার্ঘ ক্রিস্টলের নানা প্রোডাক্টে ভরে উঠল টেবিল আর শো-কেস। আর এসব বেশিরভাগই ঘটল স্বাধীনতা লাভের পর পর যখন বাংলা ভাষা আর বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা-বক্তৃতা করে বেড়ালেন পণ্ডিত ব্যক্তিরা। খুব সুপরিকল্পিত বা সচেতনভাবে যে সংস্কৃতিতে এই পরিবর্তনের সূচনা হলো তা নয়। বাংলাদেশ পাকিস্তান আমলে একটি প্রদেশ থাকায় বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ ক্ষীণ এবং পরোক্ষে থাকার কারণেই স্বাধীনতা-উত্তর পর্বে এখানে বাইরের পৃথিবীর উপস্থিতি হঠাৎ করে এবং বিশালভাবে অনুভূত হল। সংস্কৃতির পালাবদলে সবাই যে আত্ম-সন্তুষ্ট বা নির্বিকার ছিল তা নয়। অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সমালোচনা হতে সময় নেয়নি। নিজস্ব সংস্কৃতির লালনে যেসব সংস্থা পাকিস্তান আমলে অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কর্মসূচি অক্ষুণ্ন রেখেছে তাদের তৎপরতা অব্যাহত থাকল। তবু একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীনতার বৈশিষ্ট্য নিয়ে যে সংস্কৃতি গড়ে উঠবে বা ওঠা উচিত সে সম্পর্কে যেন কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থেকেই গেল। এককালে মঞ্চনাটক আর রবীন্দ্র-নজরুল সংগীত চর্চার মাধ্যমেই স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সংস্কৃতি কিছুটা গতিশীল হতে পারল। বাংলাদেশের সংস্কৃতির যে মূল বৈশিষ্ট্য, তার লোকজ ঐতিহ্য, তাকে সংস্কৃতির চালিকাশক্তি করে স্বকীয়তা অর্জনের উদ্যোগ যেন সীমিতই থেকে গেল। বাংলা একাডেমি ভাষা ও সাহিত্যের জন্য তার ভূমিকা আগের মতোই পালন করতে থাকল। এক সময়ে নজরুল একাডেমি হলো কিন্তু সেই সঙ্গে রবীন্দ্র একাডেমি যে হল না অথবা দুটির সমন্বয়ে একটি একাডেমি যে প্রতিষ্ঠিত করতে উৎসাহ দেখা গেল না, তার পেছনে রাজনীতির সংকীর্ণ মনস্কতার পরিচয় পাওয়া গেল। সবচেয়ে হতাশাব্যঞ্জক হলো, লোকসংস্কৃতির জন্য ফোক একাডেমি বা মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো উদ্যোগের অভাব।

ধীরে হলেও বাংলাদেশের আবহমানকালের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য জাতীয় জীবনে তার স্থান করে নিয়েছে। এই সংস্কৃতির কোনো কোনো সৃষ্টি আন্তুর্জাতিকভাবেও খ্যাতি অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রামের মেয়েদের তৈরি কাঁথা এবং গ্রামীণ কারুশিল্পীর তৈরি নানা কারুপণ্য। শহরের উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের ঘরেও এসব ব্যবহার করে শোভাবর্ধনের অভ্যাস এখন বেশ বিস্তৃত। বাউল গানের জনপ্রিয়তা বেড়েছে এবং বাউল উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে অনুকূল পরিবেশের সৃষ্টি না করে কিছুটা প্রতিকূলও হয়েছে। লালনের আখড়ায় লালন উৎসবে প্রাধান্য পাচ্ছে ভিআইপিদের সংবর্ধনা। তার শিষ্যদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে এবং এর ফলে উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং আবেগ-উচ্ছ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টিতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে। সরকারি পর্যায়ে প্রতিবছর রবীন্দ্র-নজরুল বার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে প্রটোকলের বেড়াজালে এবং আনুষ্ঠানিকতার জন্য সেখানেও সাধারণের অংশগ্রহণ বেশ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সংস্কৃতি যে মানুষের প্রাণের তাগিদের ও বিশ্বাসের বিষয় এবং সেখানে সরকারি নির্দেশনা সহায়ক ভূমিকা পালনের পরিবর্তে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারে সেই উপলব্ধি আমাদের এখনও হয়নি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সরকারি সাহায্য সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এই সাহায্য পরোক্ষে হলেই তা বেশি কার্যকর হয়। সরকার নিজে থেকে অনুষ্ঠানের আয়োজন না করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করলেই এটি নিশ্চিত করা যায়।

মঞ্চনাটক এখন কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। যে প্রজন্ম এর সূচনা করেছিল সত্তরের দশকের শুরুতে, তারা আজ বিভিন্ন পেশায় ব্যস্ত। টেলিফিল্ম তাদের এবং নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রী ও পরিচালকদের টেনে নিয়েছে। বাণিজ্যিক কারণে খুব অল্পসংখ্যক টেলিফিল্ম বা নাটকের গুণগত উৎকর্ষ উল্লেখ করার মতো। আর্টের সঙ্গে পুঁজির মেলবন্ধন ইতিবাচক হয়নি। সত্যি যে এক্সপেরিমেন্টাল মঞ্চের উদ্বোধন করা হয়েছে তার ফলে হয়তো মঞ্চনাট্যের চর্চায় নতুনভাবে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দেবে। কিন্তু মঞ্চনাটকের পুনরুত্থান হলেই হবে না, যেসব নাটক মঞ্চায়িত হবে এবং যেভাবে তাদের উপস্থাপনা হবে তার ওপর নির্ভর করবে নাটকে বাংলাদেশের সংস্কৃতির স্বকীয়তা স্থান পাবে কি না। সিনেমার মতো নাটকও একটি আন্তর্জাতিক শিল্প মাধ্যম, কিন্তু সিনেমার তুলনায় নাটকেই স্পষ্টভাবে একটি দেশের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য এবং সাংস্কৃতিক উপাদানকে বিশেষভাবে প্রতিফলন করা যায়। আমাদের নাট্যচর্চায় মুষ্টিমেয় কিছু নাট্যকার (যেমন-সেলিম আল দীন, মামুনুর রশীদ) ছাড়া সচেতনভাবে এই ঐতিহ্যিক প্রশ্ন নিয়ে তেমন উল্লেখযোগ্যভাবে কাউকে কাজ করতে দেখা যায়নি। সাহিত্যে কবিতা এবং উপন্যাসে ‘বাংলাদেশি’ চরিত্র এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট হয়নি। একমাত্র বাংলা ভাষা ব্যবহার ছাড়া সাহিত্যকর্মের বিষয় বা আঙ্গিকে নিজস্বতা প্রকাশের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য নয়। সচেতনতার ক্ষেত্রে বা ম্যাজিক রিয়েলিজম জাতীয় বিদেশি প্রভাবে সাহিত্যচর্চা করেই আমাদের লেখকরা তৃপ্ত। শওকত আলীর প্রাকৃতজন কিংবা সেলিনা হোসেনের মিথ নিয়ে উপন্যাস লেখা ব্যতিক্রমই থেকে গিয়েছে, অথচ এমন সৃষ্টিই আমাদের সাহিত্যকে বিশিষ্টতা দিতে পারে। চিত্রকলার ক্ষেত্রে মুর্তজা বশীর রঙের ব্যবহারে বাংলাদেশের ঐতিহ্য অনুসরণ এবং শাকুরের লোকগাথা অবলম্বনে আঁকা ছবি পটুয়া কামরুলের সৃষ্ট ক্ষীণ লোকজ ধারাকে বাঁচিয়ে রাখলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ শিল্পী এই ধারা নিয়ে আগ্রহী নয়। বাংলাদেশের সংস্কৃতি বর্তমানে দুটি সমস্যায় মুখোমুখি, যার মধ্যে পারস্পরিক স¤পর্ক রয়েছে। একটিতে রয়েছে গ্রামীণ বা লোকজ সংস্কৃতির চর্চা বনাম নাগরিক সংস্কৃতির প্রাধান্য। দ্বিতীয়টি সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশি সংস্কৃতির পক্ষে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতিসহ অন্যান্য বহিরাগত সাংস্কৃতিক প্রভাবের মোকাবেলা। আগেই বলা হয়েছে যে, দেরিতে হলেও নাগরিক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের কাছে গ্রামীণ সংস্কৃতির কদর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা কাঁথা কিনে ঘর সাজাচ্ছে। নববর্ষে মাটির পুতুল কিনছে এবং পিঠা খাচ্ছে। কেবল নববর্ষে নয়, অন্য সময়েও পিঠা খাওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছে এবং সুপার মার্কেটে প্যাকেটে তৈরি পিঠা বিক্রি হচ্ছে। ভাপা পিঠা কেবল রাস্তার পাশে বসে রিকশাঅলা বা হকাররা খাচ্ছে না, মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের সন্তানাদির বিয়ের মজলিসেও পরিবেশিত হচ্ছে। এসব যে ক্ষণিকের খেয়ালখুশি নয়, এমন মনে করলে ভুল হবে না। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক যে, নতুন প্রজন্মও গ্রামীণ জীবনের এবং লোকজ ঐতিহ্যের এই অনুসরণ অনুমোদন করেছে এবং তাদের কাছে এই অভ্যাস জনপ্রিয় হয়েছে।

সংগীতে নতুন প্রজন্ম ব্যান্ডের ব্যবহার করছে এবং অনেক ব্যান্ডদল এখন সক্রিয়। তাদের ওপর পশ্চিমের পপ বা রক সংগীতের প্রভাব ¯পষ্ট। কিন্তু তারা যন্ত্র সংগীতে পশ্চিমের অনুসরণ করলেও লিরিকে গ্রহণ করেছে বাংলা গান এবং অনেক ক্ষেত্রেই লোকসংগীতের লিরিক। এই ‘ফিউশন’ মিউজিক বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে নিজস্বতার সঙ্গে মিলন ঘটেছে বাইরের প্রভাবের। আধুনিক বা পাশ্চাত্যের মোকাবেলার এটি একটি সফল উদাহরণ। এভাবেই বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে একই সঙ্গে হতে হবে দেশজ এবং আন্তর্জাতিক। এর পাশাপাশি কেবল যা লোকজ বলে পরিচিত তার চর্চাও থাকতে হবে কেননা, সেটাই মৌলিক এবং সেখানেই আমাদের সংস্কৃতির উৎস।

বাইরের সংস্কৃতি বিশেষ করে আমেরিকা ও ইয়োরোপের সংস্কৃতি সবসময়ই আমাদের জীবন এবং সংস্কৃতিতে প্রভাব রেখেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশাল ভূমিকা এবং সাংস্কৃতিক পণ্যের আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও বাণিজ্যিকীকরণ এই প্রভাবের পেছনে কাজ করেছে। কোকাকোলা, লেভাইস জিন্স এবং ম্যাকডোনাল্ড থেকে ব্রিটনি ¯িপয়ার্স, ম্যাডোনার গান বা ব্র্যাড পিটারের চলচ্চিত্র, সবই এমনভাবে বাণিজ্যিক পণ্যের আকারে পরিবেশিত হয় যে এদের আকর্ষণ অনিবার্য। এদের সঙ্গে বলিউডের চলচ্চিত্রশিল্প এবং অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রভাবও এসে যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া কেবল টেলিভিশনের কল্যাণে সেক্স অ্যান্ড দি সিটি থেকে শুরু করে জিটিভির কাসুটির মতো সিরিয়ালও এখন বাংলাদেশের টিভি দর্শকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এসবকে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনই বলা হোক অথবা অপসংস্কৃতি, তাদের উপস্থিতি প্রতিহত করার উপায় নেই। কেবল সুস্থ এবং সুন্দর, রুচি এবং মার্জিত অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমেই দর্শক-শ্রোতাকে নিরস্ত করা যেতে পারে এই অপসংস্কৃতি দেখার নেশা থেকে। এই ভূমিকা ও দায়িত্ব আমদের নিজস্ব সংস্কৃতির, যেখানে মৌলিক প্রকাশের পাশাপাশি থাকবে ‘ফিউশন’ জাতীয় সৃষ্টির দেওয়া-নেওয়ার সেতুবন্ধ। সাম্প্রতিককালের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে বিবর্তন চোখে পড়ে তার ভিত্তিতে আশা করা যায় যে, কাক্সিক্ষতভাবেই আমাদের সংস্কৃতি শক্তি সঞ্চয় করে নিতে সক্ষম হবে। সব কিছুই ত্রুটিমুক্ত বা সন্তোষজনক নয়। কিন্তু মূলধারাটি সঠিক পথেই এগুচ্ছে বলে মনে হয়। সবচেয়ে আশার কারণ, সংস্কৃতির চর্চায় স্বকীয়তা অর্জনের আকাক্সক্ষা ও সংকল্পে প্রবীণ ও নবীনদের মধ্যে মত-পার্থক্য নেই। সংস্কৃতির মৌলিক সূত্র এবং সাধারণ বৈশিষ্ট্যের বিষয়ে প্রবীণ এবং নতুন প্রজন্ম একই বিশ্বাসে বিশ্বাসী এবং অভিন্ন মূল্যবোধের অধিকারী। এই ঐক্য অর্জিত হয়েছে সরকারি ভূমিকা ছাড়াই অথবা তার সংকীর্ণ ভূমিকা সত্ত্বেও। এ কারণেই যত সীমিতভাবেই হোক আমাদের সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা যে সচল ও অব্যাহত থাকবে, সেই আশা করা যায়।

অর্থনীতির রূপরেখায় দেশে দেশে একদিন ভিন্নতা হয়ত থাকবে না। রাজনীতিও হবে পৃথিবীব্যাপী একই প্রকৃতির। বিদেশি প্রভাব আত্তীকরণ করে কোনো দেশ যদি স্বকীয়তা রক্ষা করতে পারে তাহলে তার সঙ্গে অন্য দেশের কিছুটা হলেও পার্থক্য থাকবে। বিশ্বায়নের যুগে এই পার্থক্যের প্রয়োজন আছে। কেবল রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক পরিচয়ে মানুষ স¤পূর্ণ নয়। সব ঐক্য ও অভিন্নতা সত্ত্বেও তার আত্মার এবং বুদ্ধির সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজন নিজস্ব একটা পরিচয়। একমাত্র সংস্কৃতিই পারে সেই পরিচয় দিতে। বাংলাদেশ এই পরিচয় সংরক্ষণ এবং পরিবর্ধনের  পথে যে ধীরে হলেও নিশ্চিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সেজন্য আমরা গর্ব অনুভব করতে পারি।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares