আবার পড়ি : প্রবন্ধ―হাসনাত আবদুল হাই : পথের পাঁচালীর নান্দনিকতা : হাসনাত আবদুল হাই

পথের পাঁচালী বিভূতিভূষণের সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস এবং এখন পর্যন্ত এই বইটির জন্যই তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত। সত্যজিৎ রায়ের প্রথম চলচ্চিত্র-প্রয়াস বিভূতিভূষণের এই প্রথম উপন্যাসটি ভিত্তি করেই। প্রথম উপন্যাস লিখে বিভূতিভূষণ যেমন প্রশংসা ও খ্যাতিলাভ করেছিলেন, পরবর্তী একই স্বীকৃতি এবং সুনাম অর্জন করেছিলেন সত্যজিৎ তার প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য। তফাৎ ছিল এই যে, প্রথমজনের খ্যাতি সীমাবদ্ধ ছিল দেশে, দ্বিতীয়জনের সুকৃতির প্রান্ত ছুঁয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। একই সাহিত্যকর্মকে কেন্দ্র করে দুইজনের এই অর্জন কাকতালীয় ছিল না। পথের পাঁচালী উপন্যাস, উপন্যাসের বিষয়বস্তু এবং ন্যারেটিভই নির্ধারিত করে দিয়েছিল দুই ভিন্ন অঙ্গনে ও মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের সম্ভাবনা। কিন্তু দুটির সৃষ্টির ক্ষেত্রে পার্থক্যও ছিল, কেননা গল্প-উপন্যাস এবং চলচ্চিত্র একই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যস¤পন্ন নয়। কোনো গল্প বা উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপ দেওয়ার পর এই তুলনামূলক বিচার তাই অনিবার্যভাবেই এসে যায়।

দুই.

চলচ্চিত্রকে বলা হয়েছে বহুমাত্রিক এবং পূর্ণাঙ্গ শিল্প যেখানে সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চিত্রকলা, ফটোগ্রাফি এবং প্রযুক্তির যৌথ ব্যবহারে স¤পূর্ণ হয় সৃষ্টি। উপন্যাসের সৃষ্টিকর্ম বিষয় সম্বন্ধে লেখকের ন্যারেটিভেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য সিদ্ধিতে কোনো উপায় উপকরণের সাহায্য নেওয়া হয়, সেই প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ। গল্পে-উপন্যাসে লেখকের যে স্বাধীনতা আছে চলচ্চিত্রে তা সাধারণত থাকে না, অন্তত থাকার কথা না। যেমন, লেখক তার চরিত্রের মনোভাব প্রকাশের জন্য সংলাপের দ্বারস্থ হন এবং প্রায় ক্ষেত্রেই চরিত্রের অন্তর্গত চিন্তা-ভাবনাকেও নিজের অনুভবের ভিত্তিতে বর্ণনা করেন। এইভাবে কোনো চরিত্রের মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া লেখকের কল্পনার ভিত্তিতে পরোক্ষে উপস্থাপিত হয়। অনেকের কাছে চলচ্চিত্রে সংলাপই চরিত্রকে উপলব্ধির প্রধান উপায়। সেই সঙ্গে থাকে তার কর্মকাণ্ডের বর্ণনা, যা সংলাপের সম্পূরক বা পরিপূরক হয়। কোনো কোনো পরিচালক বা চিত্রনাট্যকার চরিত্রের মনোজগতের চিন্তা-ভাবনাকেও জনান্তিকে মনোলোগে বর্ণনা করে থাকেন, অথবা চরিত্রের মানসিক অবস্থা এবং ঘটনার তাৎপর্য বোঝানোর জন্য সংগীতের প্রয়োগ করা হয়। অধুনা প্রযুক্তির ব্যবহারেও চরিত্রের অন্তর্জগতের অনেক অব্যক্ত চিন্তা-ভাবনা মূর্ত হয়ে ওঠার সুযোগ হয়েছে। চলচ্চিত্র ক্রমেই বহুমাত্রিক মাধ্যমে পরিণত হওয়ার ফলে আদিতে ন্যারেটিভের ব্যবহারে যে সীমাবদ্ধতা ছিল তার থেকে উত্তরণ ঘটেছে। একে অগ্রগতি বলা যায় যদি অন্যান্য ন্যারেটিভ-কৌশল চলচ্চিত্রের মূল এবং প্রকৃত ভাষা সম্বন্ধে দ্বিধাদ্বন্দ্বের দোলাচল বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি না করে।

চলচ্চিত্রের মৌলিক ভাষা বা ন্যারেটিভ-কৌশল কী, সেই প্রশ্নের উত্তর তার আদিপর্বেই পাওয়া গিয়েছে। ‘সিনেমাটোগ্রাফি’ এবং বাংলায় অনূদিত ‘চলচ্চিত্র’ কথা দুটিই এই নবতম ভিন্নরূপের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও অনন্যতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে নির্ভুলভাবে। চলচ্চিত্র মানেই এমন ছবি যা স্থির নয় এবং যে ছবি পরস্পর সংলগ্নতায় সৃষ্ট করে চরিত্রের রূপ। চরিত্র ও ঘটনার সমাহারে এইভাবে সৃষ্টি হয় কাহিনি। চলমান ছবি এক একটি দৃশ্যের অবতারণা করে বলেই দৃশ্যমান ছবি বা ভিজ্যুয়াল ইমেজই চলচ্চিত্রের মূল এবং প্রকৃত ভাষা। সংগীত, সংলাপ ইত্যাদি এই ভাষার অনুষঙ্গ, যার জন্য বৈচিত্র্য আসে কিন্তু যা চলচ্চিত্রের মূল ভাষার অর্থাৎ চিত্রকল্পের অন্তর্গত নয়। নির্বাক যুগের চলচ্চিত্র কেবল ভিজ্যুয়াল ইমেজ অর্থাৎ চিত্রকল্প দিয়েই কাহিনি বর্ণনা করেছে। এখন অবশ্য সেই শুদ্ধতম ভাষার একচ্ছত্র আধিপত্য আশা করা যায় না কেননা, তাহলে চলচ্চিত্রের অগ্রগতিকেই অস্বীকার করা হবে। কিন্তু কোনো চলচ্চিত্র ধ্রুপদী অভিধায় আখ্যায়িত হতে হলে সেখানে চলচ্চিত্রের মূল ও প্রকৃত ভাষা অর্থাৎ ভিজ্যুয়াল ইমেজের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্ব পাবে এবং তাকে বিবেচনায় নিতে হবে। এই বিচারে সত্যজিতের পথের পাঁচালী নিঃসন্দেহে সফল সৃষ্টি। এই চলচ্চিত্রে কাহিনির বাস্তবতা, সকল চরিত্রের জীবনের টানাপোড়েন এবং মর্ম¯পর্শী পরিণতি, এইসব সামাজিক-মানবিক মাত্রাকে অতিক্রম করে প্রায় মুখ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে এর অন্তর্গত ভিজ্যুয়াল ইমেজের উপস্থিতি। বলা যায়, ভিজ্যুয়াল ইমেজের গুণেই পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভ এত স্বতঃস্ফূর্ত, বিচিত্র এবং প্রাণবন্ত হতে পেরেছে।

তিন.

শান্তিনিকেতনে আড়াই বছরের ছাত্রজীবন শেষে কলকাতায় ফিরে সত্যজিৎ জড়িত হন ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে। তার কিছু আগে তিনি পথের পাঁচালীর সংক্ষেপিত এক সংস্করণের জন্য কিছু ছবি এঁকেছিলেন। তখনই তাঁর মনে হয়েছিল যে, বইটির মধ্যে চলচ্চিত্রের অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। বইটি নিয়ে কীভাবে কখন কার সাহায্যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন, এই ভাবনা যখন তাঁকে পেয়ে বসেছে সেই সময় দুটি ঘটনা ঘটে যার ফলে তাঁর মনস্থির করতে বেগ পেতে হয় না। প্রথম ঘটনাটি ছিল ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা জাঁ রেনোয়াঁর কলকাতায় এসে তার দি রিভার সিনেমার জন্য লোকেশন খুঁজে বেড়ানো। ‘মিয়ে আঁ সি’ বা ফ্রেমের ভেতর ছবির দৃশ্য বাছাই করার সময় সত্যজিৎ তাকে সঙ্গ দেন এবং তিনি তখন দেখতে পান জাঁ রেনোয়াঁ তাঁর বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিলিয়ে কীভাবে ভিজ্যুয়াল ইমেজ নির্বাচন করেছেন। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে প্রবাসে গিয়ে ডি সিকার বাইসাইকেল থিভস ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। এরপরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে দেশে ফিরেই তিনি ডি সিকার মতো অল্প সময়ে অপেশাদার শিল্পীদের নিয়ে, মুক্ত-প্রাকৃতিক পরিবেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। রোমের উপকণ্ঠ যেমন পটভূমি ছিল ডি সিকার ছবিতে, বিভূতিভূষণের নিশ্চিন্তপুরকেও তিনি একইভাবে আনতে চাইলেন তার প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রয়াসের লোকেশন হিসেবে। তখনই তিনি উপলব্ধি করলেন যে, পথের পাঁচালীর শিকড় প্রোথিত রয়েছে বাংলার মাটির গভীরে। উপন্যাসে যে জীবনের বর্ণনা আছে সেখানকার গতি এবং ছন্দ একান্ত তার নিজস্ব। সেই গতি ও ছন্দ মেনে ছবিকেও চলতে হবে, এই উপলব্ধি তাঁর হয়েছিল। এই ক্ষেত্রে বিভূতিভূষণ হয়েছিলেন খুবই সহায়ক। সত্যজিতের ভাষায় : ‘তিনি এমন একজন লেখক যাঁর গল্পগুলো চলচ্চিত্রসুলভ বর্ণনা ও ডিটেইলের রত্ন-ভাণ্ডার।’ বিভূতিভূষণের প্রতি এই ঋণ সত্ত্বেও তিনি দৃশ্যচিত্রের নির্বাচন ও ব্যবহারে নিজস্বতা ও নতুনত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রের যে শুদ্ধতম ভাষা, ভিজ্যুয়াল ইমেজ, তার সংযোগে ন্যারেটিভ তৈরির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

চার.

প্রথমেই ধরা যাক দরিদ্র পরিবারের ক্ষুধার চরিত্র বর্ণনায় ইমেজের ব্যবহার। উপন্যাসে হরিহরের বসতবাটির বর্ণনা দিয়ে শুরু হলেও সত্যজিৎ চলচ্চিত্রে প্রথমেই এনেছেন দুর্গার ফল চুরি করে খাওয়া ও ঠাকুরমাকে খাওয়ানোর দৃশ্য। দুর্গা পিসিমার আশ্রয় স্থানে পেয়ারা রেখে জানিয়ে দিল যে এটি চুরি করে আনা। তারপর ঠাকুরমার কক্ষে বসে তার খাওয়া দেখে তন্ময় হয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে ক্ষুধার ছবি এমন প্রকটভাবে মূর্ত হয়েছে যা কথায় প্রকাশ করা সম্ভব হতো না। বিভূতিভূষণ অবশ্য কথায় এই দৃশ্যটি বর্ণনা করেছেন এবং পিসিমার খাওয়ার শেষে ‘ওমা, তোর জন্য দুটো রেখে দিলাম না ? ওই দ্যাখো’, এই কথাও বলিয়েছেন। এই সংলাপ চলচ্চিত্রেও এসেছে, কিন্তু ভিজ্যুয়াল ইমেজের মোক্ষম কার্যকারিতা সংলাপকে প্রায় অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে।

হরিহর যে হতদরিদ্র একথা কারও মুখ দিয়ে বর্ণনা করতে হয় না। পলেস্তরাহীন পুরনো ইটের ভাঙা দেয়াল, শ্যাওলা ঢাকা উঠোন, ভাঙা জিরজিরে ঘরের দরজা আর সামান্য তৈজসপত্র দিয়েই সত্যজিৎ নিদারুণ দারিদ্র্যের ছবিটি তুলে ধরেছেন।

দরিদ্র হলেও হরিহর দম্পতির শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এবং আস্থা প্রবল। অপুর পাঠশালায় যাওয়ার দিন তাকে দুধ খাওয়ানো, দুর্গার চুল আঁচড়ে দেওয়া এবং তারপর তাকে নিয়ে গ্রামের পথে যাত্রা, সবই ঘটেছে প্রায় সংলাপ ছাড়া। মিষ্টির ভাঁড় নিয়ে গ্রামের পথ দিয়ে যেতে যেতে ময়রা হাঁক দিচ্ছে আর তাই শুনে পয়সা না থাকার ফলে দুর্গা আর অপু পুকুর পাড় দিয়ে তাদের কুকুর সঙ্গে নিয়ে ময়রার পেছনে পেছনে যাচ্ছে, এই দৃশ্যটিও সত্যজিৎ দেখিয়েছেন পুকুরের পানিতে টলমলে শরীরগুলো উল্টো করে দেখিয়ে। এমন দৃশ্য আধুনিক বেশ কিছু বিদেশি ছবিতেও দেখা যায়, কিন্তু সত্যজিৎই মনে হয় প্রথম যিনি এর ব্যবহার করেছিলেন। তিনি শুধু নতুনত্বের জন্য এইভাবে দৃশ্যটা কল্পনা করেননি, এর ভেতর দিয়ে একটি পরাবাস্তব পরিস্থিতি যেখানে ময়রার ভাঁড়ে মিষ্টি আছে তার পেছনে পেছনে যেতে থাকা মিষ্টি খেতে আগ্রহী দুটি ছেলেমেয়ে হাঁটছে, কিন্তু মিষ্টি তাদের হাতের নাগালের বাইরে, এই কথা বলা হয়ে গিয়েছে। উপন্যাসের বর্ণনায় অসম্ভবের এই ব্যঞ্জনা নেই।

হরিহর শহরে যাওয়ার পর মাসের পর মাস কোনো খবর নেই। তারপর স্ত্রী সর্বজয়া একদিন চিঠি পান এবং সেই চিঠিতে থাকে সংসারের জন্য কিছু সুসংবাদ। সর্বজয়ার মনের আনন্দ-উচ্ছ্বাসকে ফুটিয়ে তুলতে কোনো শারীরিক অভিব্যক্তির সাহায্য নেননি সত্যজিৎ, এমনকি সামান্য হাসির উদ্ভাসও না। তার পরিবর্তে এনেছেন তুমুল বৃষ্টির সিম্ফনি যার অভিঘাতে সমস্ত গ্রামই জেগে উঠেছে আনন্দে-উচ্ছ্বাসে। এর প্রাণবন্ত প্রকাশ ঘটেছে পুকুরের উপরিতলে যেখানে ফড়িং উড়ছে নানা ভঙ্গিতে; গুল্মলতার ওপর, যার আকৃতি এক একটি সূক্ষ্ম ভাস্কর্যকর্ম বলে মনে হয়। উল্লসিত প্রাণের আবেগের আরও প্রকাশ ঘটেছে পানির ওপর পোকার প্রায় নৃত্যের অঙ্গ-ভঙ্গির ভেতর। এই দৃশ্যচিত্রে একই সঙ্গে ব্যালে নৃত্য ও সিম্ফনির সমাবেশ ঘটেছে। এখানে সত্যজিৎ একজন কবির ভূমিকা নিয়েছেন। কোনো কোনো সমালোচক সত্যজিৎকে এই বলে সমালোচনা করেছেন যে, তিনি বিভূতিভূষণের উপন্যাসের কাব্যময়তা থেকে সরে এসে দুঃখ-দারিদ্র্যকেই বড়ো করে দেখিয়েছেন। বৃষ্টি বর্ষণ এবং তারপর প্রসন্ন প্রকৃতির আনন্দময় যে রূপ প্রায় লিরিকাল ভিজ্যুয়াল ইমেজে তিনি তুলে ধরেছেন তার জন্য এই সমালোচনা ভিত্তিহীনই বলতে হয়।

ইন্দিরা ঠাকুরুণকে সর্বজয়া শেষবারের মতো যখন বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলে তখন উপন্যাস অনুযায়ী, ‘জলমগ্ন ব্যক্তি যেমন ডুবিয়া যাইবার সময় যা সামনে পায় তাই আঁকড়াইয়া ধরিতে চায়, বুড়ি সেই রূপ মুঠা আঁকড়াইবার আশ্রয় খুঁজিতে লক্ষ্যহীনভাবে এদিক-ওদিক চাহিল’, এই মন্তব্য করা হয়েছে। চলচ্চিত্রে যে ভিজ্যুয়াল ইমেজ ব্যবহার করে ইন্দিরা ঠাকুরুণের বিদায় দৃশ্য দেখানো হয়েছে সেখানে তার আত্মসম্মানবোধ এবং কর্তব্যপরায়ণতা প্রাধান্য পেয়েছে। আশ্রয় খুঁজবার জন্য খড়কুটো ধরার প্রচেষ্টা না করে (উপন্যাসের বর্ণনা) বুড়ি খেতে খেতে আঙিনার এক কোণে গাছের ওপর হাতের বাটির শেষ বিন্দু পানি ঢেলে দিয়েছে। তার মৃত্যুদৃশ্যও উপন্যাসে খুবই সাদামাটাভাবে এসেছে কিন্তু চলচ্চিত্রে যেভাবে দেখানো হয়েছে সেখানে প্রথমে বয়োজ্যেষ্ঠরা নয়, প্রথমে দুর্গা আর অপুর মর্মান্তিক অভিজ্ঞতাই প্রাধান্য পেয়েছে। সেই তাদের প্রথম মৃত্যু দেখা এবং তাও এক প্রিয়জনের। ভাই-বোনের চোখে-মুখে যে অবিশ্বাস, ভয় এবং শোক যুগপৎ দেখা দিয়েছে তার মধ্যে নিষ্পাপ এবং নির্দোষ মনের কথাই প্রথমে মনে আসে, যেখানে মৃত্যুর অভিজ্ঞতা বয়োজ্যেষ্ঠ এবং অভিজ্ঞদের তুলনায় ভিন্ন। মৃত্যুদৃশ্যের এই পরিকল্পনার মাধ্যমে সত্যজিৎ তার প্রধান চরিত্র অপুর মানসিকভাবে বেড়ে ওঠার প্রতি বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন, যা বিভূতিভূষণের বর্ণনায় পাওয়া যায় না। ‘ইন্দিরা ঠাকরুণের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিন্তপুর গ্রামে সেকালের অবসান হইয়া গেল,’ উপন্যাসে ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ এইভাবে শেষ হওয়ার মধ্যে কিশোর চরিত্র দুইটির প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয়নি।

দুর্গার মৃত্যু দৃশ্যটি সত্যজিৎ এমনভাবে দেখিয়েছেন যার সঙ্গে উপন্যাসে বর্ণনার কোনো মিলই নেই। উপন্যাসে রাতে ঝড়ের বর্ণনা আছে, সেই ঝড়ে ভাঙা ঘরে ছেলে-মেয়ে নিয়ে জেগে থাকা সর্বজয়ার দুশ্চিন্তার উল্লেখ আছে, কিন্তু দুর্গা যে মৃত্যুর কাছাকাছি কিংবা মারাত্মক অসুখে ভুগছে, এমন ইঙ্গিতই নেই। তার অসুখের কথা বলা হয়েছে ঝড়ের পর এবং তার মৃত্যু ঘটেছে আরও পরে। ঝড়ের রাতের একদিন একরাত পার হয়ে গেলে চারধারে যখন ঝলমলে শরতের রৌদ্র, সেই সময় অপুদের বাড়ির দিক থেকে যেন একটা কান্নার রোল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানাল নীলমণি মুখুয্যের স্ত্রী। ‘তখন ব্যাপার কী দেখিতে সকলে ছুটিয়া গেলেন। সর্বজয়া মেয়ের মুখের ওপর ঝুঁকিয়া পড়িয়া বলিতেছে, ও দুগগা চা দিকি, ওমা ভালো করে চা দিকি ও দুগগা।’ বলাবাহুল্য, চলচ্চিত্রে দুর্গার মৃত্যুর দৃশ্য এরকম নয়। তা আরো করুণ এবং মর্মস্পর্শী। ঝড়ো হাওয়া যখন ভেজানো দরজায় বারবার পরম আক্রোশ ধাক্কা দিচ্ছে এবং প্রদীপের আলো কাঁপতে কাঁপতে নিভে যাওয়ার উপক্রম, সেই দৃশ্য-চিত্রেই মৃত্যুর আভাস ¯পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুর্গার মৃত্যু জানানোর জন্য সত্যজিৎকে বর্ণনার আধিক্যে যেতে হয়নি। এমনকি প্রদীপের শিখাটিকে নাটকীয়ভাবে নিভিয়ে দিতেও হয়নি তাকে। তিনি যে তার ছবিতে এ ধরনের ‘ক্লিশে’ বা গতানুগতিক দৃশ্যচিত্র অপছন্দ করতেন তার নিজের ভাষাতেই তা ¯পষ্ট : ‘ঈশ্বরই জানেন কত ছবিতে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে মৃত্যুর ব্যঞ্জনা রচনা করা হয়েছে। কিন্তু সত্যিকারের চিত্রভাষা যেমন টাটকা তেমনি তীব্র ¯পষ্ট।’ সত্যজিৎ ভিজ্যুয়াল ইমেজে অর্থাৎ চলচ্চিত্রের ভাষায় ক্লিশের ব্যবহার অপছন্দ করেছেন প্রথম থেকেই।

দুর্গার মৃত্যুর পর অপু শুধু একাকী হয়ে যায় না, তাকে সংসারের ছোটোখাটো দায়িত্বও নিতে হয়। একটি দৃশ্যে নির্বাক ভঙ্গিতে তার এই হঠাৎ বেড়ে ওঠার ইঙ্গিত দিয়েছেন সত্যজিৎ। গায়ের চাদর জড়িয়ে দোকানে যাওয়ার পথে হঠাৎ আকাশে তাকিয়ে ঘরে ফিরে এসে ছাতা হাতে নিয়ে বের হয় সে। এই দৃশ্যে অপুকে হঠাৎ অনেক অভিজ্ঞ আর বিজ্ঞ দেখায় এবং সেই সঙ্গে তাকে বিষণ্নও মনে হয়। কোনো সংলাপ বা আবহ সংগীত ছাড়াই এই দৃশ্যটি বাঙ্ময় হয়ে ওঠে।

শেষ পর্যন্ত দারিদ্র্যের কাছে পরাজয় স্বীকার করে ভিটেমাটি ছেড়ে বের হতে হয় হরিহরকে সপরিবারে। ভিটে ছাড়ার পরপরই সেখানে প্রবেশ করে দীর্ঘ এক সাপ যা পরিত্যক্ত ভিটেবাড়ির অনুষঙ্গ হিসেবে দেখে গ্রামের মানুষ। গ্রামীণ জীবনের এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে নিজেই যুক্ত করেছেন দৃশ্যটি সত্যজিৎ, উপন্যাসের সাহায্য ছাড়াই।

উপন্যাসে হরিহর-পরিবারের গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার দীর্ঘ বর্ণনা আছে। এই বর্ণনার এক জায়গায় আছে : ‘গ্রামের শেষ বাড়ি হইতেছে আতুরী বুড়ির সেই দোচালা ঘরখানা, যতক্ষণ দেখা গেল অপু হাঁ করিয়া চাহিয়া রহিল। তাহার পরই একটা বড়ো খেজুর বাগানের পাশ দিয়া গাড়ি গিয়া একেবারে আছাড় খাইয়া বাঁধা রাস্তার ওপর উঠিল। গ্রাম শেষ হইবার সঙ্গে সঙ্গে সর্বজয়ার মনে হইল যা কিছু দারিদ্র্য, যা কিছু হীনতা, যা কিছু অপমান, সব রহিল পেছনে পড়িয়া। এখন সামনে শুধু নতুন সংসার, নতুন জীবনযাত্রা, নতুন সচ্ছলতা।’ এরপর শেষ দৃশ্যের পুরো বর্ণনা আছে। সেখানে ঠ্যাঙ্গারে বটগাছ থেকে শুরু করে দরগাতলা, মেলামঞ্চ, পলাশ গাছ, এই সব গ্রামের নাম উল্লেখ করে স্ত্রী-পুত্রকে যাত্রাপথের পরিচয় দেয় হরিহর। চলচ্চিত্রে এসব কিছুই নেই। শেষ দৃশ্যে কেবলই দেখা যায় হরিহর, সর্বজয়া আর অপু সজল দৃষ্টিতে ব্যথাতুর মুখে ফেলে আসা গ্রামের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে আছে। তাদের কারও মুখে কথা নেই। তাদের জীবনের ট্র্যাজেডি এই দৃশ্যচিত্রের চেয়ে আর অন্য কিছু এমন মোক্ষমভাবে এবং মর্মস্পর্শী হয়ে প্রকাশ করতে পারত কিনা সন্দেহ।

আরও দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখানো যায় সত্যজিতের পথের পাঁচালী বিভূতিভূষণের উপন্যাসকে অতিক্রম করে গিয়েছে অনেক স্থানে। এটা ঘটেছে ভিজ্যুয়াল ইমেজের দক্ষ এবং সুমিত ব্যবহারে। সত্যজিৎ চলচ্চিত্রের ভাষা বুঝে ছিলেন প্রথম জীবনেই। পথের পাঁচালী তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares