আবার পড়ি : প্রবন্ধ―হাসনাত আবদুল হাই : নভেরা : যেভাবে লেখা হল : হাসনাত আবদুল হাই

ঘর ভরতি মানুষ, তুমুল আড্ডা চলছে; শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক অথবা নিছক শিল্প-সাহিত্য রসিক যাদের নিয়ে আমার সেই সময়ের, সত্তর-আশির দশকের সামাজিক জীবন, সমস্ত ঘরে সিগারেটের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরে উঠছে, উত্তেজিত স্বর একসঙ্গে মিলে কোলাহলে পরিণত হচ্ছে আর সেই সময় কানের কাছে মুখ এনে আমিনুল ইসলাম বললেন, নভেরাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লেখেন না ক্যান ? প্রথমটায় পরিষ্কার শুনতে পাইনি, যখন দ্বিতীয়বার বলার পর শোনা গেল, বেশ সময় লাগল বুঝে উঠতে। নভেরা ? নভেরা ? ধূসর অতীত থেকে, বিস্মৃতির পর্দা সরিয়ে নামটি রক্ত-মাংসের একটা আকার নিল, যদিও তা খুব স্পষ্ট হলো না সেই স্মৃতিচারণের প্রবল আর কৌতূহলী প্রচেষ্টায়। ফর্সা, সুন্দর একটা মুখ। বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ আর পিঠময় ছড়িয়ে দেওয়া কালো চুলের বন্যার ভেতর ‘নভেরা’ নামটি ধীরে সুস্থে তার আসন করে নিল। শুধু তার অনিন্দ্যসুন্দর চেহারা নয়, অবিস্মরণীয় ছিল মুক্ত আচরণ আর স্বচ্ছন্দ অবাধ বিচরণ। রুচিহীন স্থূল কিংবা অশোভন কিছু নয়, কিন্তু সেই মুক্ত আচার-আচরণেই চেনা গিয়েছিল একটি স্বাধীনসত্তা যা একজন মেয়ের পক্ষে সেই সময় অভাবনীয় ছিল। তখন নারীদের অধিকার নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়নি, নারীবাদী চিন্তা-চেতনার ঢেউ এসে লাগেনি রক্ষণশীল সমাজের অচলায়তনে। সেই সময়, উনিশশ’ পঞ্চাশের দশকে, ‘নভেরা’ নামের মেয়েটি ছিল এমন এক ব্যতিক্রম যে সে নিজেই ছিল একটি আন্দোলন, মেয়েদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা আর জীবনযাপনের এক দৃপ্ত ঘোষণা, নীরব বিপ্লবের ইশতেহার। ‘নভেরা’র নাম ষাটের দশকের পর আর শোনা যায়নি। তখন তিনি প্রবাসে; জনশ্রুতি প্যারিসেই তার মৃত্যু হয়েছে। তাঁকে নিয়ে দেশের কারও কৌতূহল ছিল না, আমারও না। নতুন প্রজন্মের কেউ তাকে চিনত না, তার নামও শোনেনি। পঞ্চাশের দশকের শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার শেষ পর্বে আমি তার চেয়ে বয়সে ছোটো ছিলাম, তাই জানাশোনার ভিত্তিতে পরিচয় হয়নি। কিন্তু নামটি জানা ছিল, আমিনুল উপচে পড়া আড্ডায় স্মরণ করিয়ে দিতেই অতীতে তাকে দেখার সামান্য স্মৃতি ছেঁড়া-খোঁড়া হয়ে ফিরে এল আবার। আমি বললাম, ‘নভেরাকে নিয়ে লেখার মতো তেমন কিছুই জানি না, তার ওপর লেখা রিভিউ বা অন্য কিছু চোখে পড়েনি। কীভাবে লেখা যাবে ? না, হবে না।’

আমিনুল বললেন, ‘যারা তাকে জানত তাদের সঙ্গে কথা বলুন। তাদের ইন্টারভিউ নিন। এইভাবেই তার জীবন সম্বন্ধে বেশ তথ্য পেয়ে যাবেন। বাকিটা কল্পনা করে নেবেন। এক্সট্রাপোলেশন।’ আমি বললাম, ‘অনেকটা ‘সিটিজেন কেইন’ সিনেমার মতো ? ইন্টারভিউয়ের পিঠে ইন্টারভিউ জুড়ে মোজাইকের মতো ছবি তৈরি। মন্দ না। ‘সুলতান’ যেভাবে লিখেছি সম্পূর্ণ সে রকম হবে না, একটা ভিন্ন মাত্রা থাকবে। উপন্যাস নিয়ে এই নিরীক্ষা আমার পছন্দের। বেশ, চেষ্টা করে দেখি। আপনাকে দিয়েই শুরু করি। যদি দেখি জীবনী-উপন্যাস লেখার মতো কিছু পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে আর অগ্রসর হব না।’ আমিনুল সিগারেটের ধুঁয়ো উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘তাই হোক। তাহলে আমার কথা বলি। এরপর আমিনুল নভেরা সম্বন্ধে যা বললেন, সেই সব ছিল এমনই চমকপ্রদ আর আকর্ষণীয় যে, তখনই উপলব্ধি হলো সুলতানের মতো নভেরাও উপন্যাসেরই উপজীব্য। দি স্টাফ দ্যাট ফিকশনস আর মেড অফ।

আমিনুল তখন ১৯৫৬ সালে ফ্লোরেন্সে। বেল্লা দি আর্টিতে পড়ছেন। একদিন হঠাৎ শিল্পী হামিদুর রহমান তার গার্লফ্রেন্ড নভেরাকে নিয়ে এসে হাজির। তাঁরা কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে এসেছেন। তাঁর সঙ্গেই থাকতে চান। আমিনুল হোস্টেলে এক কামরায় থাকেন। সেখানে তাদের থাকার প্রশ্ন ওঠে না। কেয়ারটেকারকে বলার পর একটা ঘর পাওয়া গেল, মানে একটা বেডরুম। কিন্তু তারা তিনজন। দুই বন্ধু যখন পর¯পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছেন সেই সময় নভেরা বললেন, ‘এটা কোনো সমস্যাই না। বিছানায় আমি মাঝখানে থাকব, তোমরা দুই বন্ধু আমার দুপাশে।’ তিনজন, এক বিছানায় ? এ যেন অবিশ্বাস্য, দারুণ নাটকীয় আর রোমাঞ্চকর। আমিনুল হেসে বললেন, হ্যাঁ। থাকলাম। ঘরের ভেতর একটা পর্দা টানিয়ে দিলাম যার ওপাশে গিয়ে নভেরা কাপড় বদলাত আর কপট রাগের সঙ্গে বলত, এইই, কেউ দেখবে না কিন্তু।’ শুনে আমি বললাম, হ্যাঁ লেখা যাবে। নভেরাকে নিয়ে উপন্যাস হবে। এমন চরিত্র নিয়ে উপন্যাস না লিখলে খুবই অস্বাভাবিক হবে। মনে হচ্ছে তার বিষয়ে লিখতে গিয়ে খুব একটা কল্পনার প্রয়োজন হবে না। এখন বলুন নভেরাকে জানতেন, তাদের মধ্যে কে কোথায় আছেন। তাদের সঙ্গে দেখা করতে হবে। ইন্টারভিউ নিতে হবে, ঠিক সিটিজেন কেইনের সাংবাদিকের মতো। নভেরা উপন্যাস লেখা এইভাবে শুরু।

ভাষাসৈনিক মাহবুবুল আলম চৌধুরী চট্টগ্রামের মানুষ, সম্প্রতি ঢাকায় বসবাস। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তাঁকে ফোন করে নভেরাকে চিনতেন কি না প্রশ্ন করতেই বললেন, ‘চিনতাম মানে, খুব ভালো করে। তাকে আমাদের সংস্কৃতি সংসদের সদস্য করেছিলাম। সে আমাদের অনুষ্ঠানে নেচেছিল। তার সম্পর্কে অনেক কথা জানা আছে আমার। বলুন কী জানতে চান।’ টেলিফোনেই দুঘণ্টার ওপর আলাপ হলো মাহবুব ভাইয়ের সঙ্গে। তরুণী নভেরা আর তার পরিবার সম্পর্কে অনেক কিছু জানা গেল। বোঝা গেল নভেরা তার অপরূপ সৌন্দর্য, খামখেয়ালিপূর্ণ ব্যবহার আর শিল্পের প্রতি আগ্রহের জন্য চট্টগ্রামে অনেকেরই মধ্যমণি হয়েছিলেন পঞ্চাশের দশকের শুরুতেই। অনেকের মতো মাহবুব ভাইও যেতেন তাদের আশকারদিঘির ‘গডস গিফট’ বাড়িতে। নভেরা সবার সঙ্গে খোলামেলা মিশেছেন কিন্তু কাউকে খুব বেশি প্রশ্রয় দেননি। এতে করে তাঁর প্রতি অনুরক্তদের আকর্ষণ বেড়েই গিয়েছে। তিনি হয়ে গিয়েছেন চল্লিশের দশকের হলিউডে ‘ফিল্ম নোয়া’ শ্রেণির সিনেমার প্রায় রহস্যময়ী কুহকিনী নারী। প্রদীপের মতো তিনি নিজের কাছে টেনে নিয়েছেন অনেককে অনিবার্যভাবে। তাই বলে কেউ ইমমোরাল মনে করেনি তাকে। স্বাধীনচেতা হয়ে মুক্ত আচরণের ভেতরও একটা সীমারেখা বেঁধে দিতেন তিনি, যার জন্য তাঁর চরিত্র নিয়ে কেউ কটাক্ষ করেনি।

মাহবুব ভাই জানালেন যুদ্ধবিরোধী কর্মসূচিতে স্বাক্ষর নেবার জন্য কুমিল্লায় গিয়েছিলেন। নভেরাকে দেখলেন এক পুরুষের সাইকেলের পেছনে আরোহিণী হয়ে বসে রাস্তা দিয়ে চলে যেতে। রাস্তার আশপাশে লোকজন হাঁ করে সেই দৃশ্যই দেখছে। পুরুষটি একজন সরকারি কর্মকর্তা, পরে তাঁর সঙ্গে নভেরার বিয়ে হয়। সেই বিয়ে টেকেনি। তারপর তিনি বিয়ে করেন ‘পিআইএ’র নৃত্য পরিচালক দেবুকে। সেটাও ভেঙে যায়। এরপর নভেরা আর বিয়ে করেননি। এসবই পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা।

মাহবুব ভাইয়ের সঙ্গে আলাপের পর নভেরার প্রথম স্বামীর সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা নিয়ে যোগাযোগ করলাম। যার মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলো তিনি পরে জানালেন যে ভদ্রলোক নভেরা সম্বন্ধে কোনো আলাপ করতে চান না। এটা হতেই পারে। ব্যক্তিগত ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকা অস্বাভাবিক কিছু না। এরপর আমি নভেরার জীবনের বর্ষপঞ্জি তৈরি করে বিভিন্ন পর্বে তিনি কোথায় ছিলেন এবং সেই সময় যাদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন তাদের মধ্যে ঢাকায় অথবা চট্টগ্রামে কে কোথায় আছেন তার একটা ছক তৈরি করলাম। সেই সঙ্গে তাঁর ভাস্কর্য কাজের বিবর্তনেরও একটা খসড়া ইতিহাস লিখে নিলাম। এটা তৈরি করতে গিয়েই জানতে পারলাম নভেরা বুদ্ধমূর্তি দেখার জন্য ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে গিয়েছিলেন এবং সেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কমরুদ্দিন আহমদের অতিথি ছিলেন। তারপর জনাব আহমদের আত্মজীবনী পড়ে দেখলাম সেখানে তার সম্পর্কে চার পৃষ্ঠা লেখা আছে। ভূমিকা দিয়ে সেই চার পৃষ্ঠাই উদ্ধৃত করে একটা অধ্যায় লিখে ফেললাম। মাহবুব ভাইয়ের সঙ্গে আলাপের ধারাবাহিকতায় এই অধ্যায় এসেছে বলে খাপছাড়া হয়নি। তাছাড়া এই ছোটো অধ্যায়ে নভেরার জীবনের দুটি দিকের ওপর আলোকপাত করা সম্ভব হয়েছে। এক, ভাস্কর্য সম্বন্ধে জানার জন্য তার অদম্য আগ্রহ এবং সরেজমিন গিয়ে দেখার কৌতূহল। দুই, তাঁর ছবিতে প্রায় মজ্জাগত প্রবৃত্তি হিসেবে এক্সট্রা সেনসরি পারসেপসন। তাঁকে যে রহস্যময়ী মনে হতো, তার পেছনে এই ‘সাইকিক’ ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া কিছুটা ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয়। এক অর্থে তিনি সাধারণ চরিত্রের মানুষ ছিলেন না। তাঁর অন্তরে বেশ দ্বন্দ্ব ছিল এবং সেই সঙ্গে ছিল এক ধরনের নিঃসঙ্গতাবোধ। রেঙ্গুন প্রবাসের আখ্যানে তার চরিত্রের এবং মানসিকতার এই দিক ফুটে উঠেছে বলে কমরুদ্দিন আহমেদের বই থেকে উদ্ধৃতি প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। উদ্ধৃতিটি চট্টগ্রাম থেকে ফোটোকপি করে পাঠিয়েছিলেন কমরুদ্দিন আহমেদের ভাগ্নে আমিনুজ্জামান ভূঁইয়া, যার ডাক নাম সেন্টু, আমাদের সতীর্থ।

ইন্টারভিউয়ের জন্য যাদের নাম সংগ্রহ করা হলো তাদের মধ্যে ছিলেন খান আতাউর রহমান, শামসুর রাহমান এবং সৈয়দ জাহাঙ্গীর। এরা নভেরাকে জানতেন বিভিন্ন সময়ে, দেশে বিদেশে। খান আতাউর রহমানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় লন্ডনে; ঢাকাতে ফিরে আসার পরও মাঝে মাঝে দেখা হয়েছে। শামসুর রাহমান পুরনো ঢাকার আশেক লেনে থাকতে দেখেছেন নভেরাকে হামিদুর রহমানের ভাগ্নের দোতলায়। সৈয়দ জাহাঙ্গীর দেখেছেন তাঁকে ঢাকায় এবং পরে লাহোরে। এদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক না করে একদিন ‘অরুণিমায়’ আমার সরকারি ফ্ল্যাটে এক দুপুরে আমন্ত্রণ জানালাম সবাইকে। শিল্পী-সাহিত্যিকদের সেই সময় অর্থাৎ আশির দশকে, আমার বাসায় প্রায়ই আড্ডা এবং খাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছি। সেই দুপুরে আমন্ত্রিতদের আলোচনা ছিল খুবই স্বতঃস্ফূর্ত আর প্রাণবন্ত। কথার পিঠে কথা উঠে আসছে। একজন শেষ না করতেই আর একজন সম্পূরক হিসেবে যোগ দিচ্ছেন তাঁর মন্তব্য অথবা অভিজ্ঞতার কথা। এই আলোচনার ভেতর বিভিন্ন ব্যক্তির দৃষ্টিতে ও অভিজ্ঞতায় নভেরার ব্যক্তিত্ব ও জীবনযাপনের একটা চিত্র পাওয়া গেল। কোনো সংযোজন, বিয়োজন না করেই আমন্ত্রিতদের সংলাপ লিখে রেখে পরে উপন্যাসে উদ্ধৃত করেছি। এই আলাপ আলোচনা নিয়েই একটি অধ্যায় হয়েছে এবং পূর্বাপর বেশ একটা সম্পর্ক রক্ষা করা গিয়েছে। পরে মনে হয়েছে আলোচনাকারীদের উদ্ধৃত বছরগুলো বোধ হয় সঠিক ছিল না, দু-এক বছর এদিক ওদিক হতে পারে। যাই হোক, এটা যখন জীবনী-উপন্যাস, সেই ক্ষেত্রে বছরের হিসেব সঠিক হওয়ার তুলনায় তাদের দেওয়া তথ্য সঠিক হওয়াটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যেমন নভেরার লন্ডনে গিয়ে শিল্পাচার্যের সঙ্গে দেখা হওয়া এবং তার কাছে ড্রয়িং শেখা অথবা ক্যাম্বারওয়েল আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়া, সেইসব তথ্য। খান আতার কথাতেই জানা গেল নভেরা লন্ডনে গিয়ে অস্তিত্ববাদী দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন এবং সিমন বুভুয়াঁর বই সেকেন্ড সেক্স পড়ে সে সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। আমিনুল ইসলামের মত অনুযায়ী বই পড়ার প্রতি তার এই আগ্রহ হামিদুর রহমানের প্রভাবে হয়েছিল। যাই হোক, লন্ডনে গিয়ে নভেরার কৌতূহল যে বহুমুখী হয়েছিল, এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই কারণে বইতে স্থান পেয়েছে।

লন্ডনে হামিদুর রহমানের সঙ্গে নভেরার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৫১ সাল থেকে শুরু করে প্রায় সতেরো বছর মেয়াদি ছিল এই সম্পর্ক। হামিদুর রহমান বেঁচে নেই, তাই তাঁদের স¤পর্ক নিয়ে জানার জন্য তাঁর ভাই সাঈদ আহমদের বাসায় যাই। তিনি বাসায় বেশ রসিয়ে ঢাকাইয়া ভাষায় লন্ডনে নভেরার দেখা হওয়া এবং হামিদ-নভেরা সম্পর্কে বর্ণনা দেন। তাঁর সংলাপ হুবহু তুলে দিয়েছি তথ্যের প্রতি আন্তরিক হওয়ার জন্য এবং বেশ আকর্ষণীয় হবে, সেই কারণে। ‘সি ডিড নট নো হু সি ওয়াজ,’ সাইদ আহমেদের এই উক্তি আমার কাছে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। নভেরা সম্বন্ধে যতটুকু তাঁর জানা তার ভিত্তিতেই মনে হয়েছে জটিল মানসিকতার মানুষ ছিলেন তিনি। বলতে গেলে বিদীর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

নভেরা লন্ডন ও প্যারিসে আসা-যাওয়া করে, ১৯৫১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ছিলেন। এই সময় তিনি পড়াশোনা করেছেন। মিউজিয়মে গিয়ে মনোযোগ দিয়ে ছবি দেখেছেন, নিজের স্টুডিওতে কাজ করেছেন, অন্য বইপত্র পড়েছেন আর অসংখ্য বন্ধুদের সঙ্গে মিশেছেন। তাঁর প্রায় সব বন্ধুই পুরুষ। চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকায় যেমন, প্রবাস জীবনেও তাই। অনেকেই তাকে একান্তে চেয়েছে কিন্তু সেই সৌভাগ্য হয়েছে মাত্র কয়েকজনেরই। তাঁর চরিত্রের এই দিকটি বেশ উল্লেখযোগ্য এবং উপন্যাসে প্রত্যক্ষে এবং পরোক্ষে এর ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। তাঁর ভেতর এক ধরনের বোহেমিয়ান জীবন-দর্শন কাজ করেছে। কিন্তু তার মধ্যে শৃঙ্খলা ছিল, নিয়ম-পদ্ধতি ছিল, যার জন্য তিনি উদভ্রান্ত হলেও দিকভ্রষ্ট হয়ে যাননি। নিজের শিল্পীসত্তাকে স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে উত্তরোত্তর ঋদ্ধ করেছেন। যদিও সর্বাংশে তুলনীয় নন, তবু বলা যায় তিনি ছিলেন আমাদের ‘ইসডোরা ডানকান’, অন্তত জীবনযাপনে।

লন্ডন ও প্যারিসে নভেরা যে পাঁচ বছর ছিলেন সেই সময়ের কাহিনি লিখতে গেলে অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে সেই সমস্যার সমাধানে আমাকে একটা কৌশল অবলম্বন করতে হল যা হয়তো বাস্তবে সঠিক ছিল না। আমি কল্পনা করলাম যে, নভেরা ডায়েরি লিখতেন এবং ডায়েরিতে নিয়মিতভাবে না হলেও তার প্রধান অভিজ্ঞতাগুলো লিপিবদ্ধ করেন। ডায়েরিতে কী লিখতে পারেন এটা কল্পনা করার জন্য যাঁরা তাকে দেখেছেন এবং যাদের ইন্টারভিউ নিয়েছি যেমন, খান আতাউর রহমান, সাঈদ আহমেদ, তাঁদের দেয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করেছি। কোথাও কোথাও কল্পনাও করেছি। যেমন, হামিদুর রহমান তাকে হার্বার্ট রিডের ‘স্কাল্পচার অ্যান্ড ড্রয়িং’ বই থেকে পড়ে শুনিয়েছেন, এই অংশ বেশ প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। একজন ভাস্করকে তার বিষয় সম্বন্ধে কেউ পড়ে শোনাতেই পারে। একইভাবে কল্পনা করেছি বিখ্যাত ভাস্কর জ্যাকব এপস্টাইন ক্লাসে তাঁকে ভাস্কর্যের নান্দনিকতা নিয়ে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিচ্ছেন, এর জনা এপস্টাইনের লেখা বই পড়তে হয়েছে আমাকে। কেননা তাঁর মুখ দিয়ে বানানো কথা বলানো যায় না। এই পর্বে তার ডায়েরিতে লেখা বিষয়ের মধো কল্পনা করেছি নভেরা লন্ডনে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চেয়েছেন। এর মাধ্যমে বংলাভাষা এবং বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তান) প্রতি তাঁর আকর্ষণের ও ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। দেশে তো বটেই, বিদেশেও নভেরা বাঙালির মতো সাজ্জ-সজ্জাই পছন্দ করতেন, পড়তেন রুদ্রাক্ষের মালা। কখনও সন্ন্যাসিনীর মতো চুল বাঁধতেন ঝুটির মতো উঁচু করে, কপালে দিতেন ফোঁটা আর তিলক। দেশজ সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল তীব্র। লন্ডন পর্বে যে এই ক্ষেত্রে বিচ্যুতি ঘটেনি তার উল্লেখ করা হয়েছে প্রাসঙ্গিক কারণেই।

মুর্তজা বশীর নভেরাকে প্রথম দেখেন ফ্লোরেন্সে, যখন নভেরা আর হামিদুর রহমান আমিনুলের অতিথি হিসেবে বেড়াতে এসেছেন। তারপর দেখেছেন ১৯৬১ সালে লাহোরে এবং সর্বশেষ ১৯৭২ সালে প্যারিসে। নভেরা তাকে চমৎকৃত করতে পারেনি। বশীরের কাছে তাঁকে মনে হয়েছে একটা সুন্দর মৃতদেহ, প্রাণহীন। তবে বশীরও অন্যদের মতো মনে করেছেন যে নভেরা একটা রহস্য।

ফ্লোরেন্সে নভেরা আর হামিদুর আমিনুলের অতিথি হয়ে কয়েক মাস ছিলেন যার উল্লেখে এই লেখার শুরু। এই পর্ব বেশ তথ্যবহুল আর চমকপ্রদ। তিন বন্ধুর এক সঙ্গে বসবাস এরিক মরিয়া রেমার্কের ‘থ্রি কমরেডস’ এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যদিও তেমন বিয়োগান্তক নয়। এই পর্বের কাহিনি লিখতে গিয়ে আমিনুল ইসলামের সঙ্গে আমাকে বেশ কয়েকবার বসতে হয়েছে, পড়তে হয়েছে রেনেসাঁর ইতিহাস এবং দেখতে হয়েছে ফ্লোরেন্সের ম্যাপ। ম্যাপ দেখে রাস্তা, পিয়াজ্জা, প্যালোজ্জো, ‘পন্টে ভেচ্চিও’ নামের বিখ্যাত ব্রিজের বর্ণনা দিয়েছি। এটা করতে হয়েছে অথেনটিসিটির জন্য। রেনেসাঁ কালের শিল্পী, বিশেষ করে ভাস্করদের কথাও আলোচনায় এসেছে এখানে, ছবির তুলনায় বেশি করেই কেননা, নভেরা ভাস্কর বলে ভাস্কর্যের প্রতিই তাঁর আগ্রহ বেশি হওয়া স্বাভাবিক। এই পর্বে হামিদুর রহমানের সঙ্গে মাইকেল এঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ ভাস্কর্য কর্ম নিয়ে নভেরার মধ্যে আলোচনা কল্পনাপ্রসূত হলেও তার পেছনে একই কারণ ছিল। একইভাবে কল্পনা করেছি যে, নভেরাকে লাইভস অব দ্য পেইন্টারস থেকে মাইকেল এঞ্জেলোর সমকামিতা সম্বন্ধে পড়ে শুনিয়েছে দুই বন্ধুর মধ্যে একজন। তখন নভেরা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দিয়ে সেই স¤পর্ক বোঝাতে চেয়েছেন এবং দুই বন্ধুর সঙ্গে তর্ক করেছেন এই বলে যে, মাইকেল এঞ্জেলো হয়ত ঐসব পুরুষের চরিত্র মাধুর্যে মুগ্ধ হয়েছেন, তাঁদের স¤পর্ক ছিল দেহাতীত, আধ্যাত্মিক ধরনের কিছু। কাল্পনিক হলেও তাঁর জীবনযাপনের সঙ্গে মনে হয়েছে এটা সঙ্গতিপূর্ণ।

লন্ডন থেকে ঢাকায় ফেরার পর নভেরা পুরনো ঢাকায় হামিদুর রহমানের পারিবারিক বাড়ির দোতলায় থাকতেন। ঠিক লিভিং টুগেদার নয়, কিন্তু অনেকটা তারই মতো। সেই সময়ের প্রেক্ষিতে এটা বেশ দৃষ্টিকটু এবং আপত্তিজনক মনে করার মতো। কিন্তু পুরনো ঢাকার একটি রক্ষণশীল পরিবারে থেকেও এ নিয়ে যে কোনো কথা ওঠেনি এ বিষয়টির ওপর আলোকপাত করা প্রয়োজন বোধ করেছি। সেই সময় ১৯৫০-৬০ এর দশকগুলো রক্ষণশীলতার কাছে আবদ্ধ ছিল, মেয়েদের আচার-আচরণ, চলাফেরার ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু অন্ধ গোঁড়ামি ছিল না, এটা মনে করিয়ে দিতে চেয়েছি। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত হামিদুর রহমান আর নভেরা শহিদ মিনারের নকশা তৈরি ও নির্মাণ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। আমিনুল এবং অন্যদের কাছ থেকে এ বিষয়ে যে তথ্য পেয়েছি তার ভিত্তিতে আমার মনে হয়েছে শহিদ মিনারের স্থাপত্য নকশা তৈরিতে সীমিতভাবে হলেও নভেরার অংশগ্রহণ ছিল। এই নকশা হামিদুর রহমানের একক প্রয়াসের ফল নয়। এই বিশ্বাসের পেছনে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, তারা দুজন তখন খুব অন্তরঙ্গ জীবনযাপন করেছেন, প্রতিদিন একসঙ্গে শহিদ মিনারের প্রাঙ্গণে গিয়ে কাজ করেছেন। দ্বিতীয়ত, শহিদ মিনারের যে ভাস্কর্যের নকশা, সেখানে ভাস্কর হিসেবে নভেরার কিছু অবদান থাকা স্বাভাবিকই হবে। কিন্তু কেউ কেউ, যেমন সাঈদ আহমেদ মনে করেন শহিদ মিনারের নকশা হামিদুর রহমান একাই করেছেন। আমি আমার অনুমান ত্যাগ করিনি। সাঈদ আহমেদের বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তার লেখা পরিশিষ্ট হিসেবে ছাপিয়েছি।

নভেরার পারিবারিক জীবন সম্বন্ধে অনেক তথ্য দিয়েছেন নভেরার ভাইয়ের স্ত্রী লুতফুন। তাঁর মতে, নভেরার বোনরা তাঁর প্রতিভার জন্য ঈর্ষান্বিত ছিলেন। লুতফুনের এই কথা এবং অন্যান্য মন্তব্য হুবহু তুলে দিয়েছি বইতে। বই ছাপা হওয়ার অনেক বছর পর আমার অফিসে এক ভদ্রলোক হঠাৎ ঢুকে পরিচয় দিয়ে জানালেন যে, তিনি নভেরার বড়ো বোন কুমুম হকের স্বামী। চেয়ারে বসে তিনি বেশ রুষ্ট হয়ে বললেন যে উপন্যাসে তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা সর্বৈব মিথ্যা। আমি তাকে সবিনয়ে জানালাম যে, ঐ অংশ লুতফুন যা বলেছেন তার আক্ষরিক প্রতিবেদন, আমার নিজের কোনো মন্তব্য নেই। এরপর জানালাম যে, তাঁর স্ত্রীর আপত্তি লিখিতভাবে পাঠালে তা বইতে ছাপা হবে। পরে কুমুম হকের চিঠি পাই এবং সেটিও বইতে পরিশিষ্ট হিসেবে ছাপা হয়েছে যেন তার বক্তব্যও পাঠকেরা জানতে পারে। এই চিঠির ভিত্তিতে উপন্যাসে পরিবর্তন আনতে গেলে লুতফুনের দেয়া তথ্য সব বাদ দিতে হয়, যা আমার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি, কেননা বইটা ইন্টারভিউয়ের ওপরই ভিত্তি করে লেখা।

লাহোরে নভেরা আর এস এম আলী এক সঙ্গে ছিলেন কিছুদিন। তাদের সঙ্গে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সখ্য ছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে কল্পনার সাহায্যেই বর্ণনা করি যে লাহোরে এক সকালে তাদের তিনজনের এক সঙ্গে দেখা হয়েছে। এই কল্পনার ভিত্তিও নভেরার আগের জীবনের ওপর নির্ভর করেই তৈরি। এখানে তথ্যভিত্তিক বর্ণনার পরই কল্পনাপ্রসূত বর্ণনা এসেছে। সেখানে পরম্পরা আর সামঞ্জস্যময়তার প্রতি দৃষ্টি রাখা হয়েছে যেন দুটি অংশ খাপছাড়া মনে না হয়।

আমিনুলের কাছ থেকেই জানতে পারি যে লাহোর থেকে নভেরা বোম্বাই চলে যান এবং বৈজয়ন্তীমালার কাছে নাচের প্রশিক্ষণ নেন। তার নাচের সখ ছিল আগে থেকেই। লাহোরে যেহেতু ভাস্কর্যের জন্য তেমন কাজের সুযোগ পাননি তাই তার বোম্বাই গিয়ে নাচ শেখার ইচ্ছা হয়েছিল, এমন মনে করা যায়। এটা তাঁর জীবনীর অংশ হিসেবে বেশ প্রাসঙ্গিক এবং আকর্ষণীয় মনে হয়েছে তাই একটা অধ্যায় লিখেছি এর ওপর। এই অধ্যায়ের জন্য আমাকে ভরত নাট্যম ও কথাকলি নৃত্য স¤পর্কে বইপত্র পড়ে নাচের কারিগরি আর নান্দনিক দিক সম্বন্ধে জানতে হয়েছে। হস্তলক্ষণ দীপিকা বইটি পড়ে অঙ্গ ও উপাঙ্গের ব্যবহার জেনে নাচের বর্ণনা করেছি। মুদ্রা প্রয়োগ করে নর্তকী কীভাবে নাচের পূর্ণাঙ্গ ভাষা তৈরি করে, তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বিশদভাবে।

হামিদুর রহমানের সঙ্গে ১৯৫৯-এর দিকে সম্বন্ধ ছিন্ন হওয়ার পর সাংবাদিক এস এম আলীর সঙ্গে নভেরার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এবং ক্রমেই তা গাঢ় হয়। আমি যখন উপন্যাসটি লিখতে শুরু করতে যাচ্ছি এস এম আলী তখন দি ডেইলি স্টার পত্রিকার স¤পাদক। একদিন ফোন করে তাঁর সঙ্গে দেখা এবং তাঁর কাছ থেকে নভেরা সম্বন্ধে জানার ইচ্ছা ব্যক্ত করি। তিনি বললেন, বিষয়টা তাঁর জন্য বেশ বেদনাদায়ক। তবে তিনি সময় দেবেন। মাত্র একবার তাঁর সঙ্গে বসার সুযোগ হয়েছিল। এরপরই তাঁর মৃত্যু হয়। এভাবে হঠাৎ চলে না গেলে তাঁর কাছ থেকে নভেরা সম্বন্ধে এমন কিছু জানা যেত যা অন্যেরা হয়ত জানেন না। তিনি নভেরার খুব নিকট বন্ধু ছিলেন এবং সুহৃদও বটে।

মুতর্জা বশীর বলেছিলেন, তাঁর সংগ্রহে লাহোরে এক প্রদর্শনীর ব্রোসিউর আছে যেখানে নভেরার প্রদর্শিত ভাস্কর্যের ওপর মন্তব্য রয়েছে। এই ব্রোসিউরটিই একমাত্র ছাপানো ডকুমেন্ট যেখানে নভেরার কাজের মূল্যায়ন করা হয়েছে। এটি পড়ার জন্য আমি চট্টগ্রাম যাই এবং বশীর তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখা ব্রোসিউরটি অবলীলায় বার করে এনে দেন। বশীরই বাংলাদেশের একমাত্র শিল্পী যার ডকুমেন্টেশন নিখুঁত এবং বিশদ। তিনি প্রয়োজনীয় বইপত্র, সংবাদপত্রের কাটিং, সব সংগ্রহ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বার করে দিতে পারেন। এই ব্রোসিউর পড়ে নভেরার ভাস্কর্য সম্বন্ধে আর্ট ক্রিটিকদের মতামত জানার সুযোগ হয়। আমার যে ধারণা, তাতে নভেরাকে মনে হয়েছে পাশ্চাত্য আর দেশজ ঐতিহ্যের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দোদুল্যমান। তিনি হেনরি মুরের আদলে মাঝখানে ফুটো রেখে বড়ো বড়ো ভাস্কর্য তৈরি করেছেন। কেবল ভল্যুমের দিকে সে সব শীর্ণাকায় এবং কম স্পেস নিয়েছে, কিন্তু প্রবণতা হেনরি মুরের স্টাইলের দিকেই। পরবর্তী পাবলিক লাইব্রেরির ম্যুরাল তৈরির সময় তিনি দেশজ পুতুলের আদল ব্যবহার করেছেন। এভাবে তিনি নিজস্ব একটা স্টাইলের সন্ধানে ছিলেন, তা বোঝা যায়। হয়ত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার সুযোগ পেলে একদিন নিজস্ব শৈলী পেয়েও যেতেন। কিন্তু সেই সময় ভাস্করদের চাহিদা প্রায় ছিলই না, তাই নভেরার প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারেনি। তবু তাঁর যে কটি কাজ এখনও অক্ষত তার ভিত্তিতেই তাঁকে কেবল বাংলাদেশের প্রথম নয়, একজন গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর বলে স্বীকার না করে উপায় নেই।

উপন্যাসটি কীভাবে শেষ করব এই কথা যখন ভাবছি সেই সময় আকস্মিকভাবে দেখা হয়ে গেল নভেরার নিকট আত্মীয় রাশেদ নিজামের সঙ্গে। তিনি ১৯৮৭ সালে লন্ডন থেকে ব্যাংকের কাজে প্যারিসে যান। বহু খোঁজাখুঁজির পর তিনি জানতে পারেন যে, নভেরা স্ট্রাসবুর্গ এলাকায় কাফে ব্লাকে প্রায়ই গিয়ে বসে থাকেন। রাশেদ এক বিকেলে সেখানে গিয়ে দেখেন যে, কেউ নেই। কিন্তু তিনি তবু অপেক্ষা করেন। বেশ কয়েক কাপ কফি খাওয়ার পর এক মহিলা প্রবেশ করেন। তার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠেন রাশেদ। জবুথবু এক প্রৌঢ়া, দেহে পুরনো জরাজীর্ণ এক পোশাক। চুলে আর চেহারায় নিদারুণ মালিন্য। অত বড়ো পরিবর্তনের মধ্যেও চিনতে পারলেন রাশেদ যে মহিলাটি নভেরাই, তার কাজিন। মুখের আদল আর চোখ দেখে শনাক্ত করা সম্ভব হল তার পক্ষে। একবার উঠে দাঁড়িয়ে তার কাছে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে রাশেদ বসে পড়লেন। ‘না, থাক। আই ওয়ান্টেড হার টু ফেড অ্যাওয়ে উইথ ডিগনিটি। সি ওয়াজ এ প্রাউড উওম্যান।’ বলে রাশেদ ঘরের এক কোণে সযত্বে রাখা নভেরার তৈরি কাঠের একটি মূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর আপন মনে বললেন, ‘সি ওয়াজ লার্জার দ্যান লাইফ।’ আমি শিহরিত হলাম তাঁর কথা শুনে। নভেরা উপন্যাস এইভাবেই শেষ হয়েছে। এর চেয়ে আর কোনো ভালো সমাপ্তি কল্পনা করা যায় না।

এর কিছুদিন পরই রাশেদ মারা যান। যেন আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার এবং নভেরাকে তাঁর শেষ দেখার অভিজ্ঞতা জানাবার জন্যই তিনি বেঁচেছিলেন।

সুলতান উপন্যাস লিখি প্রথম ও তৃতীয় পুরুষে, ইন্টারভিউ-এর ভিত্তিতে। কিন্তু তখন সুলতান জীবিত বলে তার মুখেও আত্মজীবনীর মতো বর্ণনা এসেছে। নভেরা লেখায় নতুনত্ব ছিল এবং প্রতিটি অধ্যায়ে ভিন্ন বর্ণনার আঙ্গিক ব্যবহার করেছি। কোনোটি চিত্রনাট্যের মতো, কোনোটি নাটকের মতো সংলাপ নির্ভর আবার কোনোটি ডায়েরির পাতা থেকে উদ্ধৃত। নিরীক্ষার জন্য এই আঙ্গিক ব্যবহার করা হলেও এর সঙ্গে নভেরার জীবনের মিল ছিল বলে আমার মনে হয়েছে।

বইটি লেখার সময় সবাই বলেছিল নভেরার মৃত্যু হয়েছে। আমি তাই বিশ্বাস করেছি। কিন্তু বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর গুজবের মতো শুনতে পেলাম তিনি বেঁচে আছেন। প্যারিসেই থাকেন। পঙ্গু হয়ে গিয়েছেন, দুর্ঘটনায় অথবা অসুখে। কারও সঙ্গে দেখা করেন না। বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। আমিনুল বলেছিলেন তাঁর ভেতর একটা অভিমান ছিল দেশের প্রতি। সেই অভিমানের জন্যই এই বিচ্ছিন্নতাবাদী হয়ে থাকা এবং সবাইকে এড়িয়ে যাওয়া।

১৯৯৮ সালে প্যারিসে গিয়ে বহু কষ্টে তার ঠিকানা খুঁজে এক ফরাসি গাড়ির চালকের সাহায্যে সেখানে উপস্থিত হই। সেটি একটি খ্রিস্টধর্ম সংক্রান্ত বই-পত্রের দোকান। পাশেই রাশিয়ান অর্থডক্স এক গির্জা দাঁড়িয়ে। বেশ নির্জন পরিবেশ। দোকানের প্রবেশদ্বারে একটি লোক বেশ ক্রুদ্ধ এবং বেপরোয়া ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে, যেন আমাদেরই অপেক্ষায়। নাম বলতেই বিরক্ত চোখে তাকিয়ে সে বেশ জোরে প্রায় চিৎকার করার মতো ফরাসিতে কী যেন বলল কিছুক্ষণ। গাড়ির ফরাসি চালক আমাকে দেখিয়ে লোকটিকে কী যেন বলল। তাতে তার রাগ যেন আরো বেড়ে গেল। চালক আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ভেতরে যেতে দেবে না। দেখা হবে না।

আমি বললাম, কেন ?

চালক বলল, ‘তুমি নাকি তার স্ত্রীকে নিয়ে বানিয়ে বানিয়ে এক উপন্যাস লিখেছ। তাতে তার স্ত্রী খুবই অসন্তুষ্ট। তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায় না।’

তখন আমি বললাম, ওকে বলো আমি কিছুটা বানিয়েছি, কিন্তু বেশিরভাগই তাকে যারা চিনত তাদের দেয়া তথ্য বাবহার করে লেখা। তাছাড়া তাকে ছোটো কিংবা অপমান করার উদ্দেশ্য মোটেও ছিল না আমার। এক ধরনের মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধা থেকেই বইটা লেখা। ঐ বইয়ের জন্য ভুলে যাওয়া নাম ‘নভেরা’ এখন বাংলাদেশে অনেকের কাছে পরিচিত হয়েছে। তিনি বেঁচে আছেন একথা জানা থাকলে হয়তো তার কাছে এসে নিজে তাঁর কথাও শুনতাম। ক্রসচেক করতাম অন্যের দেয়া তথ্য।

চালক আমার কথা তর্জমা করে শোনাবার পর লোকটি মুখ ভেংচে কিছু বলল। চালক আমার দিকে তাকিয়ে বলল, লোকটি বদমেজাজি। ধর্মের বই বিক্রি করছে কীভাবে ? তারপর ভেতরের দিকে তাকিয়ে বলল, এটা একটা দোকান। পাবলিক প্লেস। প্রবেশে বাধা দেয়ার জন্য পুলিশের কাছে অভিযোগ করব নাকি ?

আমি চালককে বললাম, থাক। দরকার নেই। চলো যাই।

ফিরে আসবার সময় মনে হল যেন দোকানের ভেতর প্রায় ন্যুব্জ দেহে, সাদা-কালো চুল মাথায় কেউ বসে আছে। নভেরা ? হতেও পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares