আবার পড়ি : ভ্রমণ―হাসনাত আবদুল হাই : ম্যানহাটান ও দশ ডলার : হাসনাত আবদুল হাই

মধ্যরাতে আইডল ওয়াইল্ড। আকাশপথে নিউইয়র্ক প্রবেশের দ্বার। ওপর থেকে মনে হলো যেন নিওনের অরণ্য। লাল-নীল, হলুদ-সবুজ আর সাদা আলোয় চারদিক উজ্জ্বল। একটু পরপর অতিকায় সামুদ্রিক পাখির মতো জেটগুলো উড়ে যাচ্ছে, নামছে। তাদের লাল-সবুজ আলোয় আকাশ যেন জ্যাকসন পোলকের বিমূর্ত ছবির ক্যানভাস।

গ্যাংওয়ে থেকে নামতেই ঠান্ডা কনকনে হওয়া হাড় কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। ট্রপিক্যাল সুটটাকে মনে হলো বড় বিপন্ন। অথচ পরশুদিনই এটা গায়ে দিয়ে ঢাকার পথে হাঁটার সময় স্বেদ-সিক্ত হতে হয়েছে। প্যান অ্যামের গোলাকার টার্মিনাল বাঁয়ে রেখে ইন্টারন্যাশনাল এরাইভাল টার্মিনালে এসে উষ্ণ সম্বর্ধনা পেলাম। ভিতরটা সেন্ট্রালি হিটেড। হেলথ ডিপার্টমেন্টের কর্মচারীটি এক্সরে থেকে যাবতীয় মেডিকেল সার্টিফিকেট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। তারপর আমার বর্তমান সুস্থতায় নিঃসন্দেহ হয়ে হলুদ একটি কার্ড দিল। তাতে যা লেখা তার সারমর্ম এই : হয়তো তুমি এমন রোগের জীবাণু বহন করছ, যার ফলাফল আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সাত দিনের মধ্যে যদি নিম্নবর্ণিত কোনো সংক্রামক রোগ দ্বারা আক্রান্ত হও তাহলে অবিলম্বে নিকটস্থ ডাক্তারের শরণাপন্ন হবে। এরপর কয়েকটি সংক্রামক অসুখের নাম। অন্য পৃষ্ঠায় ডাক্তারকে নির্দেশ : ‘অবিলম্বে রোগীর নাম-ঠিকানা হেলথ ডিপার্টমেন্টে পাঠিয়ে দাও।’ এই হলুদ কার্ড উপহার পাওয়ার পর থেকে মনে মনে রোগগুলোর লক্ষণ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়লাম।

এরপর কৃষি বিভাগের কর্মচারী। আমি কি কোনো গাছের চারা এনেছি ? ফুল ? ফল ? অথবা বীজ ? বললাম, না। তারপর যোগ করলাম, যদি আনতাম তাহলে কী করতে হতো ? কৃষি বিভাগ নির্বিকার মুখে বলল, তাহলে ওগুলো রেখে দিতাম। ল্যাবে পরীক্ষার পর যদি কীট বা জীবাণুমুক্ত প্রমাণ হতো, তাহলে ফেরত দেওয়া হতো। মনে মনে বললাম, শুচিবাইতে তোমরা দেখছি হিন্দু বিধবাদেরও ছাড়িয়ে যাও।

আমার সুটকেসটা অসহায়ের মতো কনভেয়ার বেল্টে চেপে কাস্টমস অফিসারের সামনে উপস্থিত হলো। সে খুলে এটা-ওটা দেখল, তারপর মুখস্থের মতো বলে গেল, তুমি কি আফিম, গাঁজা বা অন্য কোনো মাদক দ্রব্য এনেছ ?

ইচ্ছে হলো অ্যাসপ্রিনের প্যাকেটটা হাতে দিয়ে বলি, ওপরে অ্যাসপ্রিন লেখা আছে, ভিতরে গাঁজা-ফাজা থাকলেও থাকতে পারে। খুলে দেখো। কিন্তু, রাগ করে লাভ নেই। লোকটি তার বিচক্ষণ সরকারের আইন পালন করছে মাত্র। কিছু পর কাস্টমসের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে প্যাসেঞ্জার লবিতে এসে স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলি। আধুনিক আসবাবে সুন্দর করে সাজানো, একপাশে এয়ারলাইন্সের কাউন্টারগুলো। সামনে যাত্রীদের বসবার আসন, উঁচু স্ট্যান্ডে অ্যাশট্রে, যেন দাঁড়িয়ে থেকেই ছাই ফেলা যায়। লবির দেয়ালে ছবি, অসংখ্য আলোর শেড। ওপরে একটা মোবিল স্কাল্পচার। আলেকজান্ডার ক্যান্ডারের ট্রেডমার্ক, দেখেই বোঝা যায়। লাউডস্পিকারে হঠাৎ ঘোষণা শুনে চমকে উঠি। ‘পাকিস্তান থেকে আগত যাত্রী মি. হুইকে এস এস এসের কাউন্টারে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। তার একটা জরুরি চিঠি আছে।’ মি. হুই! ইয়াংকিরা একে অন্যকে ‘গাই’ বলে শুনেছি। তাই বলে হাইকে হুই! এ দেশে যতদিন আছি টাইম ম্যাগাজিনের মতো নামের শেষে বন্ধনী দিয়ে উচ্চারণটাও লিখে দিতে হবে দেখছি।

কাউন্টারে যেতেই সোনালি চুলের মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলল,

 : মে আই হেল্প ইউ ?

 : চিঠিটা।

 : কোন চিঠি ?

 : এই যে ঘোষণা করলে।

 : ও তুমিই মি : হুই। আমাকে আবিষ্কার করতে পেরে মেয়েটি খুশি হয়ে ওঠে।

 : না, মি. হাই।

 : দুঃখিত, খুব দুঃখিত। তোমাদের নামগুলো আমরা এখনও উচ্চারণ করতে পারলাম না। কী লজ্জার ব্যাপার!

মেয়েটির আন্তরিকতায় আমার রাগ নিমেষেই পানি হয়ে যায়।

মেসেজ স্লিপ খুলে দেখি ইভলিন শেয়ারের চিঠি। লিখেছে, ‘শরীর অসুস্থ থাকায় এয়ারপোর্টে যেতে পারলাম না। ফোন করো পৌঁছেই। নম্বর ‘কলম্বাস ৫-৬০৮০’। নম্বর দেখে আমি প্রায় ভিরমি খাই। শুধু কলম্বাস গোল বাঁধায় না। পাঁচ এবং ছয়ের মাঝখানে ড্যাশটাও বিভ্রান্তিকর। কাউন্টারের মেয়েটিকে বলতে সে ব্যাখ্যা করে বলে, কলম্বাস এর শুধু ‘সিও’ আর তারপর সমস্ত নম্বরটা ডায়াল করো। তার কথামত কলম্বাসের শিরñেদ করে নম্বরটা ডায়াল করি। ইভলিন শেয়ার ও প্রান্ত থেকে বলল, ওয়েলকাম টু আমেরিকা। মার্টিনিক হোটেলে তোমার ঘর ঠিক করা আছে। ঠিকানা ব্রডওয়ে ও ৩২নং স্ট্রিট। সকালে উঠে ফোন করো। তারপর বিশদ আলাপ করা যাবে। আমি ইতস্তত করে বলি, সকালে তো বিশদ আলাপ হবে, কিন্তু এখন এখান থেকে শহরে যাই কী করে তার হদিস বাতলে দাও। শুনে ইভলিন শেয়ার বলল, এই দেখ, তুমি যে নতুন এসেছ এদেশে তা ভুলেই গেছি। বুড়ো হতে চললে দেখি মনে কিছু থাকে না। শোনো, তুমি আছ কুইনসে। এয়ারপোর্টের বাস ধরে চলে আসো ম্যানহাটান। ইস্ট সাইড এয়ার টার্মিনাল বললেই হবে। বাস ভাড়া লাগবে দেড় ডলার। তারপর ইয়েলো ক্যাব নিয়ে হোটেল মার্টিনিক। এক ডলার। ইয়েলো ক্যাবটা কী জিনিস ? আমি প্রায় বোকার মতো প্রশ্ন করি। ইভলিন শেয়ার হেসে বলে, ট্যাক্সি কোম্পানির নাম। সবকিছু গোলমেলে লাগছে তাই না ? ঠিক হয়ে যাবে কদিনেই।

আমার কাছে এমেরিকান এক্সপ্রেসের দশ ডলার ট্রাভেলার্স চেক। সেটাকে নগদ ডলারে পরিণত করা দরকার। কাউন্টারে বলতেই সোনালি চুল সেই মেয়েটি বলল, সামনেই ফার্স্ট ন্যাশনাল সিটি ব্যাংক। সারা রাত খোলা। তারপর হঠাৎ সহানুভূতির সুরে বলে, অসুবিধেয় পড়েছ বুঝি ? কেউ নিতে আসেনি ? মাথা নেড়ে উত্তর দিই। কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এসে মেয়েটি হাত বাড়িয়ে বলল, আমি ন্যান্সি, এ দেশে আমাকে তোমার প্রথম বন্ধু হবার সুযোগ দাও। চলো তোমার চেক ক্যাশ করে আনি। শুনে আমি কৃতার্থ হয়ে যাই।

দরজার বাইরে রাস্তা। বাসে যাত্রী উঠছে; লাগেজ নিয়ে পোর্টারদের ব্যস্ততা। রাস্তার এপাশে অনেকগুলো কালো খুঁটির ওপর যেন কাঁচের একটি মস্ত বাক্স দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে উজ্জ্বল আলো। ওপরে চারদিক ঘিরে লেখা ফার্স্ট ন্যাশনাল সিটি ব্যাংক। ব্যাংকে যাবার পথে ডান দিকে মস্ত বড় একটা ফোয়ারার দিকে হাত দেখিয়ে ন্যান্সি বলল, লিবার্টি ফাউন্টেন। জাহাজযাত্রীদের জন্য যেমন স্ট্যাচু অব লিবার্টি, প্লেন যাত্রীদের জন্য এই ফোয়ারা।

ব্যাংকের কাউন্টারে মেয়েরা কাজ করছে। এখন যে মধ্যরাত তা বোঝারই উপায় নেই। টেবিলে তাজা ফুল, দেয়ালে অয়েল পেইন্টিং। সুদৃশ্য আসবাব। সুন্দর করে রাখা ক্যাবিনেট। ব্যাংক না হয়ে আর্ট গ্যালারি বললেও বিশ^াস করতাম। কাছে যেতেই কাউন্টারের মেয়েটি হেসে বলল : ‘মে আই হেল্প ইউ ?’ উত্তরে আমি চেকটা বাড়িয়ে দিই। সেটা হাতে নিয়ে মেয়েটি ডলারের অঙ্ক দেখে নিয়ে বলে, ‘ব্যস্ আর নেই ?’ আমি বলি, ‘আপাতত এই।’ তারপর মনে মনে বলি, এই দশ ডলার পেতেই মেলা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে, তুমি তার কী বুঝবে ? কিছু পর ডলারের নোটগুলো হাতে দিয়ে মেয়েটি বলল, কদিন থাকবে নিউইয়র্ক ? দশ ডলারে যতদিন থাকা যায়, আমি বলি। মেয়েটি হেসে বলল, ‘ইউ আর এমবিশাস।’ ব্যাংক থেকে বেরিয়ে এসে ন্যান্সিকে অশেষ ধন্যবাদ দিয়ে বাসে উঠি। ভিতরে যাবার উপক্রম করতেই ড্রাইভার ডাক দিল। কী ব্যাপার ? ফেয়ার প্লিজ। ভাড়া দাও। তার ডান দিকে একটা যন্ত্র। যন্ত্রে পয়সা নিয়ে ফেলছে ড্রাইভার। টিকিট বেরিয়ে আসছে। কন্ডাক্টর বলতে কোনো প্রাণী নেই সমস্ত বাসে। আরও একটা ধাক্কা খাই।

ইউনিয়ন টার্মিনালে এসে ইয়েলো ক্যাব ধরি। শুধু নামে নয় রঙেও হলুদ। সমস্ত পথ ড্রাইভার তার ইন্টারকমে কথা বলে চলল অদৃশ্য কোনো ‘জো’ নামক ব্যক্তির সঙ্গে। মিটার উঠল এক ডলার বিশ সেন্ট। শুধু মিটারের পয়সা দিতেই ড্রাইভারের চোখেমুখে বিরক্তি দেখতে পাই। মনে পড়ল টেন পারসেন্ট টিপস্ দেওয়া রেওয়াজ এখানে। দশ সেন্ট দিয়ে বলি, কফি খেয়ো। ইউ, বেট, বলে ক্যাবি হেসে চলে গেল। ইউ, বেট, কথাটার অর্থ কী ভাবতে ভাবতে আমি হোটেল মার্টিনিকে ঢুকি।

সকালে ব্রেকফাস্টের জন্য হোটেলের কফিশপে যাই। উঁচু টুলের ওপর কয়েকজন বসে খাচ্ছে, কফিতে চুমুক দিচ্ছে। কাচের দেয়াল দিয়ে দেখা যাচ্ছে ফুটপাথে লোকের চলাচল, রাস্তায় ট্রাফিক। হালকা রোদের টুকরো স্কাইস্ক্র্যাপার ডিঙিয়ে এখানে-ওখানে পড়েছে। মেনু হাতে নিয়ে দেখি সব বিজাতীয় নাম। ঝামেলায় না গিয়ে ডিম, রুটি, কফির অর্ডার দিই। কিন্তু এখানেও ঝামেলা। ডিমের অর্ডার দিতেই নিগ্রো ওয়েটার বলে, ‘হাউ ডু ইউ লাইক ইট ? সানি সাইড আপ, স্ক্র্যাম্বলড অর বয়েলড ?’ শুনে আমার প্রায় আক্কেলগুড়ুম। ঢোক গিলে বলি যেটা প্রথমে মনে আসে সেটাই, বয়েলড। একটু পর সেদ্ধ দুটো ডিম যখন সামনে এনে দেয় তখন আমার বিতৃষ্ণার শেষ নেই। কেবল বিপদ থেকে উদ্ধার পেতেই সুপরিচিত ‘বয়েলড’ কথাটা মুখে এসেছে। এখন সেটা মুখে দিতে গিয়ে পরম অনীহা। সব মিলিয়ে নব্বই সেন্ট, টিপস যোগ করে এক ডলার। তারপর লবিতে এসে দুটো পিকচার পোস্টকার্ড কিনি। টিকিটসহ পিকচার পোস্টকার্ড কিনতে লাগে পঁয়ত্রিশ সেন্ট। আমার হাতে থাকল পাঁচ ডলার পঁচাত্তর সেন্ট। সমস্ত দুপুর আর বিকেলের পাথেয়।

ইভলিন শেয়ারকে ফোন করতেই সে তার অফিসে যেতে বলল। সেখানেই সব কথা হবে। অফিসের ঠিকানা সাতশো চল্লিশ ফিফথ এভেন্যু। ঠিকানা দিয়ে বলল, ‘হেঁটেই চলে এসো, এই তো কয়েক ব্লক।’ ব্লকটি কী জিনিস জিজ্ঞেস না করে শুধু বলি, ‘প্রথম দিনেই হেঁটে নিউইয়র্কে ঠিকানা বের করতে পারলে নিউ গিনির এক্সপেডিশনে যোগ দিতাম এতদিনে।’ শুনে সে হেসে বলল, ‘নিউইয়র্কের ঠিকানা বার করা খুব সোজা। সব কিছু এত বিজ্ঞানসম্মত যে ভুল করতেই পারো না। তোমাকে ঠিকানা বার করার একটা সহজ ফর্মুলা শিখিয়ে দিচ্ছি। প্রথমে ঠিকানার শেষ সংখ্যাটা বাদ দেবে। তারপর দুই দিয়ে ভাগ। এর ফলের সঙ্গে যোগ দাও সতেরো। সতেরো হলো ফিফথ এভেন্যুর সাঙ্কেতিক নম্বর। প্রত্যেক এভেন্যুরই একটা সাঙ্কেতিক নম্বর আছে। ওগুলো পরে দেব। এখন এই ফর্মুলার হিসেবে আমার অফিসের ঠিকানা হবে ফিফথ এভেন্যু ও ৫৪নং স্ট্রিটে। কেমন, সোজা না ?’ আমি হ্যাঁ, না গোছের একটা উত্তর দিই। তারপর পথে বেরিয়ে সামনে যে ইয়েলো ক্যাব পাই তাতেই উঠে বসি। মাথায় থাক সহজ ফর্মুলা। ইয়েলো ক্যাব পাঁচ মিনিটেই গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কৃষ্ণাঙ্গ ড্রাইভার আমাকে অবাক হয়ে দেখে।

কলিং বেলের পাশে ইভলিন শেয়ারের নাম দেখে, বেলটা টিপি। দরজা খোলার পরিবর্তে সেই কলিং বেলের পাশের ছিদ্র দিয়ে কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, কে ওখানে ? শুনে বেশ একটু ঘাবড়ে যাই। এমন পরিস্থিতির কথা কেউ বলেনি আগে। এই কণ্ঠস্বর কি আমার উদ্দেশে এবং যদি আমার উদ্দেশে হয় তাহলে আমার কী করা উচিত ? এইসব ভাবনার মধ্যেই দ্বিতীয়বার কণ্ঠস্বর বলে ওঠে, ‘এটা কি মি. হাই ? আমি ইভলিন শেয়ার বলছি।’ এতক্ষণে আশ^স্ত হই। ইভলিন শেয়ার লিফট দিয়ে দশতলায় উঠে যেতে বলে। সেখানে তার অফিস। লিফট সেলফ অপারেটেড, আমাকে নিজেই চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শুনে ভীষণ ঘাবড়ে যাই। এ পর্যন্ত সাইকেল ছাড়া জীবনে অন্য কিছু চালাইনি। একটা দুর্ঘটনার জন্য প্রস্তুত হয়ে লিফটের দিকে অগ্রসর হই। দুর্বৃত্তের মতো দেয়ালের এককোণে প্রায় অন্ধকারে গা ঢেকে ছিল লিফটখানা। লিফট তো নয় যেন পুরনো সার্কাসের খাঁচা। লোহার শিকের দরজা, কাঠের মেঝে, মরচে পড়া লোহার রড। সুইচগুলোর নম্বর পড়া যায় কি, যায় না। দরজা বন্ধ করে দশ নম্বরের সুইচটা টেপা বিধেয় মনে করি। কিন্তু লিফট কথা কয় না। আবার টিপি, তবুও না। এমনি কয়েকবারের পর বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে আসবার উপক্রম করতেই কনুইতে একটা সুইচ ভীষণ জোরে লাগে। আর তখনি প্রচণ্ড শব্দ করে লিফট আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বগামী হয়। বাইরে বেরিয়ে দেখি সেটি আটতলা। দুতলা হেঁটেই পার হই, আবার খাঁচায় বন্দি হতে সাহস হয় না।

ইভলিন শেয়ারের বয়স চল্লিশোর্ধে। সাদাপাকা চুল কদম ছাঁটে কাটা। যে অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে গেল সেটা তার অফিস এবং বাসস্থান, দুইই। অফিসঘরের দেয়ালে দেশ-বিদেশের প্রিমিটিভ আর্টের নমুনা। রেড ইন্ডিয়ানদের টোটেমপোল, ইনকাদের সূর্য দেবের মাথা, আফ্রিকার মুখোশ, নিউগিনির আদিবাসীদের অলঙ্কার। আমাকে তাকাতে দেখে বলল, ‘ওই আমার একমাত্র সখ। প্রতি বছর বাইরে যাই। কিছু না কিছু নিয়ে আসি।’ তারপর কিউরিওগুলোর কাছে গিয়ে সে ব্যাখ্যা শুরু করে কোনটা কী। শুনতে শুনতে আমার মুখে হাই ওঠে, অনভ্যাসে মুখ চাপা দেওয়া হয় না। এরপর ইভলিন শেয়ার ডেস্ক থেকে আমার টিকিট বার করে দিয়ে বলে, ‘তোমার অনওয়ার্ড জার্নির সূচি আছে সঙ্গে। দেখে নাও। অবশ্য ট্রাভেল এজেন্ট হিসেবে তোমাদের টিকিট দেওয়াই আমার কর্তব্য। তোমার হোটেল ঠিক করা, এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা, এসব আমার কর্তব্যের বাইরে। কিন্তু তুমি স্পেশাল কেস। তাই কর্তব্যের বাইরে হলেও করতে হয়েছে।’ এরপর শুরু হয় তার ট্রাভেল এজেন্ট হিসেবে কর্তব্যের বর্ণনা। একটু পরপরই যোগ করে, ‘ভেবো না তোমার বেলায় এটুকু করেই ক্ষান্ত হব। তুমি স্পেশাল কেস।’ ট্রাভেল এজেন্টের কর্তব্যের তালিকা শেষ হলে শুরু হলো তার আত্ম-জীবনী। আত্ম-জীবনী ব্যাখ্যানের মাঝেই কয়েকবার জানাল এসব ব্যক্তিগত কাহিনি সবাইকে বলে না সে, কিন্তু আমি স্পেশাল কেস্ তাই। একবার ভাবলাম বলি, দোহাই তোমার, আমাকে এই প্রিভিলেজ দিয়ো না। সাধারণ কেস হিসেবে নিয়ে বিদায় করো। কিন্তু অভদ্রতা হবে বলে কিছুই বলি না। অনেক পর প্রায় ক্লান্ত হয়ে ইভলিন শেয়ার থামল। তারপর কী মনে করে বলল, ‘বিকেল পাঁচটায় তোমার প্লেন, বেশ কয়েক ঘণ্টা হাতে আছে এখন। ম্যানহাটানের কিছু কিছু দেখে নাও। পরের বার যখন আসবে তখন ভালো করে দেখো সব কিছু।’ বলে একটা হলুদ কাগজে কয়েকটা রাস্তা আর দর্শনীয় স্থানের নাম লিখে দিল। আমি ধন্যবাদ দিয়ে উঠে দাঁড়াতে সে বলল, ‘তোমার কাছে খাওয়া আর অন্যান্য খরচের টাকা আছে তো ? না থাকলে ধার নিতে পার আমার কাছ থেকে। সবাইকে অবশ্য ধার দিই না, কিন্তু তুমি স্পেশাল কেস্।’ আমি একটু ভেবে দেখি দুপুরের খাওয়া আর বিকেলে এয়ারপোর্টে যাবার খরচ ছাড়া আমার আর কোনো খরচ নেই। সঙ্গে এখন আছে পাঁচ ডলার বিশ সেন্ট। হয়ে যাবে। তাকে বলি, থাক, যা আছে চলে যাবে আমার। ধন্যবাদ। তারপর যোগ করি, ‘এমনিতেই তো আমাকে প্রচুর স্পেশাল স্ট্যাটাস দিয়েছ। সেটা আর নাই বাড়ালে।’

হলুদ কাগজের ম্যাপ হাতে নিয়ে ম্যানহাটানের সঙ্গে পদব্রজে পরিচয়ের পালা শুরু হয় আমার, ফিফথ এভেন্যু ধরে সেন্ট্রাল পার্ক। সেখানে ইতস্তত ঘুরি কিছুক্ষণ। ডাক পন্ডে ছেলেমেয়েদের নৌকো ভাসানো দেখি বসে বসে। তারপর ফিফথ এভেন্যু ধরে দক্ষিণে অগ্রসর হই। রকফেলার সেন্টারের চত্বরে লোকের ভিড় আর দেশ-বিদেশের পতাকা দেখে বুঝি সেখানে পৌঁছে গেছি। চত্বর পেরিয়ে আইস স্কেটিংয়ের রিংয়ে স্কেটিং দেখি কিছুক্ষণ। ওপাশে প্রমিথিয়ুসের মূর্তি। এ পাশে অ্যাটলাস তার কাঁধে পৃথিবী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বেচারাদের কেউ দেখছে না। ফিফথ্ এভেন্যুর আরও দক্ষিণে পাবলিক লাইব্রেরি। সিঁড়ির ওপর পশুরাজ দাঁড়িয়ে। ছোটো ছেলেমেয়েরা পশুরাজের গায়ে হাত দিয়ে ছবি তুলছে। ফিফথ এভেন্যুর আরও দক্ষিণে ৩৪নং স্ট্রিটের সংযোগ যেখানে, সেখানে মস্ত উঁচু যে দালান ওপরে উঠে গেছে, ইভলিন শেয়ারের ম্যাপ যদি নির্ভুল হয় তাহলে সেটিই এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং। সমস্তটা দেখতে গিয়ে ঘাড় প্রায় মচকে যায় আর কি। ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে হোটেলে ফেরা। লাঞ্চে এক ডলার চলে যায়। আমার হাতে থাকে চার ডলার বিশ সেন্ট। বাসে লাগবে দেড় ডলার। ট্যাক্সিতে বড়ো জোর আরও দেড় ডলার। যথেষ্ট আছে এখনও।

সাড়ে চারটায় হোটেল ছাড়ি। রাস্তায় বেরিয়ে দেখি গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে চারগুণ। হঠাৎ মনে পড়ল অফিস ছুটির সময় এখন, রাশ আওয়ার। শোনা ছিল, দেখলাম এবার। গাড়ির বা¤পারের সঙ্গে বা¤পার লাগানো, চলছে শম্বুক গতিতে। সামনে পেছনে, ডানে বাঁয়ে, গাড়ি আর গাড়ি। সেই ভিড়ে ইয়েলো ক্যাবে উঠে দেখি ট্যাক্সি দশ মিনিটে পাঁচ গজ এগুচ্ছে। একটু পরপর আসছে রাস্তাগুলো। ট্রাফিক লাইটের রক্তচক্ষু জ্বলে উঠছে। ওদিকে মিটার বেড়ে চলেছে। ব্রডওয়ে আর ৩৭নং স্ট্রিটে এসে যখন মিটার উঠল দেড় ডলার তখন আমি বেশ ঘাবড়ে যাই। আমাকে যেতে হবে ৪২নং স্ট্রিটে ওয়েস্ট সাইড এয়ার টার্মিনালে। অর্থাৎ পথ এখনও অর্ধেক বাকি। অথচ এর মধ্যেই দেড় ডলার উঠেছে মিটারে। এই গতিতে চললে গন্তব্যে পেঁৗঁছুতে তিন ডলার লাগবে শুধু ট্যাক্সিতেই, বাসের দেড় ডলার ছাড়াও। অথচ আমার কাছে আছে চার ডলার বিশ সেন্ট। একটা ভয়ংকর পরিস্থিতির কথা ভেবে ঘেমে উঠি। একবার ভাবি ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলি, তাড়াতাড়ি যাও তো বাপু। কিন্তু তার কোনো গাফিলতি নেই। সামনের গাড়ির ব্যূহ ভেদ করে গতি বাড়াতে পারছে না সে। আর ট্রাফিক লাইট একটু পরপরই সেই শম্বুক গতিকেও দিচ্ছে স্তব্ধ করে।

আমি প্রায় রুদ্ধশ্বাসে মিটার আর রাস্তার নম্বর দেখতে থাকি। ৩৯নং স্ট্রিটে মিটার এক ডলার নব্বই সেন্ট। ৪০নং স্ট্রিটে মিটার দু ডলার দশ সেন্ট। ৪১নং স্ট্রিটে মিটারে ওঠে দুডলার চল্লিশ সেন্ট। ৪২নং স্ট্রিট; আমাকে প্রায় বিস্ময়ে স্তব্ধ করে দিয়ে ট্যাক্সি এসে থামে একটা চত্বরে। ড্রাইভার নেমে বলে, এসে গেছ গন্তব্যে। মিটারে তাকিয়ে দেখি, দুডলার ষাট সেন্ট।

ট্যাক্সি বিদায় করার পরও পকেটে থাকে বাসভাড়া দেড় ডলার আর উদ্বৃত্ত দশ সেন্ট। উৎফুল্ল চিত্তে পকেটে হাত দিয়ে আমি ডলারের উপস্থিতি অনুভব করি।

‘তুমি আছ, তুমি আছ এ বিস্ময় সওয়া যায় নাকো।’

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares