ধারাবাহিক জীবনকথা : যে জীবন আমার ছিল : ইমদাদুল হক মিলন

তৃতীয় পর্ব

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় প্রসঙ্গে সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা মনে পড়ল। কলকাতার কয়েকজন দুর্ধর্ষ লেখক আমাদের প্রজšে§র যারা লেখালেখি শুরু করেছিল তাদের প্রায় দিশেহারা করে তুলেছিল। যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, রতন ভট্টাচার্য নামের একজন গল্প লেখক, সুধাংশু ঘোষ, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, দিব্যেন্দু পালিত বা প্রফুল্ল রায়। সমরেশ মজুমদার তখনও আমাদের সেভাবে আকৃষ্ট করেননি, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ও না। দু-চারটা গল্প দেশ পত্রিকায় তাঁদেরও প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু আমরা তেমন মনোযোগী হইনি। তবে এই সব লেখকের অগ্রজ সমরেশ বসু, বিমল কর আর রমাপদ চৌধুরীও আমাদের বেশ নাড়া দিচ্ছিলেন। কবিতায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শক্তি, সুনীল, শঙ্খ ঘোষ, বিনয় মজুমদার, তারাপদ রায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, দেবারতি মিত্র, কবিতা সিংহ, সাধনা মুখোপাধ্যায় আমার প্রজšে§র কবিদের আকৃষ্ট করছিলেন। এদিকে বাংলাদেশের শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, রফিক আজাদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, নির্মলেন্দু গুণ আর আবুল হাসান কবিতায় মাতাচ্ছিলেন বাংলাদেশ। শওকত আলী, রশীদ করীম, হাসান আজিজুল হক, মাহমুদুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, রাহাত খান ও আরও কেউ কেউ আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছিলেন। আমার সৌভাগ্য, তারপর ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের এই সব লেখক-কবির প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। অকুণ্ঠ স্নেহ-ভালোবাসা তাঁদের কাছ থেকে আমি পেয়েছি।

শৈশব-কৈশোর প্রসঙ্গ থেকে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা মনে এলো। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হলো তিরাশি বা চুরাশি সালে। শ্যামলদা ঢাকায় এলেন। ঢাকায় তাঁর প্রধান বন্ধু বেলাল চৌধুরী। বেলাল ভাই বহু বছর কলকাতায় কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন। ভারতীয় হাইকমিশন তখন ধানমণ্ডিতে। সেখান থেকে একটি মাসিক পত্রিকা বেরয়। নাম ভারত বিচিত্রা। বেলাল ভাই সেই পত্রিকার সম্পাদক। কলকাতায় বহু বছর কাটাবার ফলে তাঁর সমসাময়িক অগ্রজ-অনুজ প্রায় সব কবি-লেখকই বেলাল ভাইয়ের ঘনিষ্ঠজন। দেশ পত্রিকায় সাহিত্যের কলাম লিখতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘সনাতন পাঠক’ ছদ্মনামে। সেই কলামের একটিতে বেলাল চৌধুরী প্রসঙ্গে লিখতে লিখতে শেষ লাইনটা লিখলেন চিঠিপত্রের শেষ লাইনের মতো। ‘বেলাল, ঢাকায় তুমি কেমন আছ ?’

শ্যামলদা ঢাকায় এসে বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে থাকেন। আমি তখন চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আঠারো ঘণ্টাই কাটাই রফিক আজাদের সঙ্গে। শ্যামলদার সঙ্গে রফিক আজাদেরও ঘনিষ্ঠতা হলো। রফিক ভাই তখন থাকেন মোহাম্মদপুরের একটা একতলা ফ্ল্যাটে। দুপুরবেলা তাঁর বাড়িতে শ্যামলদাকে খাওয়াবেন। সঙ্গে আমিও আছি। রফিক আজাদের প্রথম স্ত্রী বকুল ভাবি ভালো আয়োজন করেছেন। মাছ মাংস ভাজি ভর্তা মিলিয়ে বিস্তর খাবার। শ্যামলদা খেতে ভালোবাসেন এ কথা জেনেছিলাম কবিতা সিংহের লেখা পড়ে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কৃত্তিবাস পত্রিকায় সমসাময়িককালের লেখক বন্ধুদের নিয়ে কবিতা সিংহ একটি ধারাবাহিক লিখেছিলেন। ‘আমার পুরুষ বন্ধুরা’। সেই লেখায় বন্ধুদের নিয়ে শ্যামলদার বাড়িতে খাওয়ার একটা বর্ণনা ছিল। বেশ রসালো ভঙ্গিতে লেখা। আমি নিয়মিত সেই লেখাটা পড়তাম। রফিক আজাদের বাড়িতে শ্যামলদার সঙ্গে খেতে বসে কবিতা সিংহের সেই লেখার কথা মনে পড়েছিল।

এখানে কবিতা সিংহ সম্পর্কে একটু বলি। কবিতা, গল্প, ব্যক্তিগত রচনা সবই তিনি লিখতেন। অত্যন্ত আকর্ষণীয় মহিলা। লেখায় দৃঢ় ও সাহসী। তাঁর একটি উপন্যাসের নাম চারজন রাগী যুবতী। সত্তরের দশকের শুরুর দিককারকালে ও-রকম উপন্যাস লিখতে সাহস লাগে। কৃত্তিবাসের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ’৬৫ সালে বাংলা সাহিত্যে একটি আণবিক বোমা ফাটিয়েছিলেন সমরেশ বসু। সেই বোমাটির নাম বিবর। দেশ পুজো সংখ্যায় প্রকাশের পর ‘সাহিত্য রসাতলে গেল’ রব উঠল চারদিকে। অশ্লীলতার দায়ে বাজেয়াপ্ত  হলো বই। মামলা হলো। সমরেশ বসুর পক্ষে দাঁড়ালেন বুদ্ধদেব বসু। আকাশবাণীতে এক অনুষ্ঠানে কবিতা সিংহ বিবর উপন্যাসের আলোচনা করতে গিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করলেন। আকাশবাণী সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান। যে উপন্যাস নিয়ে অশ্লীলতার কারণে মামলা চলছে, সেই উপন্যাসের এত প্রশংসা সরকারি মাধ্যমে, এটা ঊর্ধ্বতনেরা ভালো চোখে দেখলেন না। ইন্দিরা গান্ধী তখন তথ্যমন্ত্রী। কবিতা সিংহকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হলে ইন্দিরা গান্ধীর লিখিত অনুমতি লাগবে। ওভাবে ফাইল তৈরি করে তাঁর কাছে পাঠানো হলো। একদিকে বিবর নিয়ে মামলা চলছে, অন্যদিকে আনন্দবাজারের প্রকাশন সংস্থা আনন্দ পাবলিশার্স থেকে রাতারাতি একটির পর একটি মুদ্রণ হচ্ছে। এ অবস্থায় বই বাজেয়াপ্ত হলো। সমরেশ বসুকে গিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো। সাক্ষী হিসেবে দাঁড়ালেন বুদ্ধদেব বসু। তিনি পরিষ্কার বললেন, ‘বিবর অশ্লীল নয়’।

ওদিকে কবিতা সিংহের চাকরি যায় যায়। ফাইল ইন্দিরা গান্ধীর হাতে। তিনি নেহরুকন্যা। ফাইলে সই করার আগে বিবর উপন্যাস সম্পর্কে জানতে চাইলেন। ইংরেজি অনুবাদ করে তাঁকে দেওয়া হলো। পড়ে তিনি বললেন, ‘আমি তো এই বইতে কোনো অশ্লীলতা খুঁজে পেলাম না।’ এই বইয়ের প্রশংসা করবার কারণে কেন একজনের চাকরি যাবে ? কবিতা সিংহের চাকরি রক্ষা করলেন ইন্দিরা গান্ধী।

তো সেই দুপুরে রফিক আজাদের বাড়িতে খেতে বসে শ্যামলদা একটু বেশিই খেলেন। এমনিতেই তিনি ভোজনরসিক, মোটাসোটা শরীরে ভালোই একখানা ভুঁড়ি আছে। গোলগাল ফর্সা সুন্দর মুখটা নরম নিরীহ এবং মায়াবী ধরনের। কিন্তু তাঁর রসবোধ এবং রাগ-ক্রোধের তুলনা নেই। আনন্দবাজার পত্রিকার মফস্সল পাতার প্রধান ছিলেন। সেই পত্রিকার ঊর্ধ্বতনকর্তাদের একজন সন্তোষকুমার ঘোষ। সন্তোষকুমার ঘোষ নিজেও খুব বড় লেখক। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস কিনু গোয়ালার গলি। স্বয়ং নায়ক, জল দাও সুধার শহর। শেষ জীবনে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলেন শেষ নমস্কার : শ্রীচরণেষু মাকে। এই উপন্যাসের জন্য একাডেমি পুরস্কার পেলেন।

সত্তরের দশকের শুরুতে কয়েকজন লেখকের নির্বাচিত গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। সেই লেখকরা তখন বাংলা ছোটগল্পের পুরোনো ভিত ভেঙে নতুন আঙ্গিক এবং গল্প বলার রীতি তৈরি করছিলেন। নির্বাচিত গল্প প্রকাশিত হলো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ও মতি নন্দির। আরও তিনজনের বেরুবার কথা। বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। এই বইগুলোর গল্পের নির্বাচক হচ্ছেন সন্তোষকুমার ঘোষ। প্রথম চারটা বই বেরুল। পরের তিনটা আর বেরোয়নি। বইগুলোর ভারি সুন্দর ভূমিকা লিখেছিলেন সন্তোষকুমার ঘোষ। তাঁর গদ্য সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মিশ্রণে তৈরি। আনন্দবাজার পত্রিকার ভাষারীতিটাই তিনি বদলে দিয়েছিলেন। অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত সমরেশ বসুর বিবর উপন্যাস সম্পর্কে সন্তোষকুমার ঘোষ বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ দশটি উপন্যাসের নাম বলতে বলা হয় তাহলে দশ নম্বর নামটি আমি বলব সমরেশ বসুর বিবর।’

এই সন্তোষকুমার ঘোষের সঙ্গে খুবই অশোভন আচরণ করলেন শ্যামলদা। শোনা যায়, সন্তোষকুমার ঘোষকে চড় মেরে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার চাকরি ছেড়েছিলেন। চলে গিয়েছিলেন যুগান্তর গ্রুপের সাপ্তাহিক পত্রিকা অমৃতর প্রধান হয়ে। সেখানে গিয়ে ঘটাতে লাগলেন তাঁর রাগ-ক্রোধের বিস্ফোরণ। দেশ পত্রিকায় সুনীলদা কলাম লেখেন ‘সনাতন পাঠক’ নামে। অমৃতে শ্যামলদা শুরু করলেন ‘বৈকুণ্ঠ পাঠক’ নামে। সে কী কলাম! বাপরে বাপ! যেন শ্যামলদার হাতে কলম না, ঝকঝকে একখান ব্লেড। চিরে-ফেঁড়ে-ছিলে লবণ ছিটাতে লাগলেন তাঁর সমসাময়িক লেখকদের লেখায়। সুনীলদার নায়িকাদের সম্পর্কে লিখলেন, ‘আচ্ছা সুনীল, তোমার গল্প উপন্যাসের নায়িকারা এত ফুটফুটে সুন্দরী হয় কেন ? তারা কেউ কালো হয় না কেন ? ভাবছি তোমার দোয়াত থেকে কিছুটা কালি নিয়ে আসবো।’ এই রকম আরকি! শীর্ষেন্দুর চরিত্রদের নিয়ে লিখলেন, ‘আপনি কী এই চরিত্রগুলোকে হাত দিয়ে ছুঁতে পারেন ?’

সুনীলের সঙ্গে শ্যামলদার গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক। তুই তোকারি সম্পর্ক। শীর্ষেন্দুর সঙ্গে অতটা বোধ হয় না। সুনীলদার মুখে অনেকবার শুনেছি, তিনি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা পছন্দ করেন।

রফিক আজাদের বাড়িতে সেই দুপুরবেলা মেঝেতে বসে খাওয়া হয়েছিল। প্রচুর খাওয়ার ফলে শ্যামলদা তাঁর ভারি পেট নিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘মিলন, আমাকে টেনে তোল।’ আমি আক্ষরিক অর্থেই তাঁকে টেনে তুললাম। সেদিন আমার মনে পড়েছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আর তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি ঘটনা। কোনো এক সাহিত্য সম্মেলন থেকে ট্রেনে করে ফিরছেন বাংলা সাহিত্যের এই দুই মহান ঔপন্যাসিক। বিভূতিভূষণ ছিলেন অতিমাত্রায় ভোজনরসিক। টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার ছিল। তারাশঙ্কর সামান্য খেয়ে ওঠে গেলেন। বিভূতিভূষণ খেয়েই যাচ্ছেন। টিফিন ক্যারিয়ার ফাঁকা। বিভূতিভূষণের তখন এমন অবস্থা, বোধ হয় গলা পর্যন্ত ভরে গেছে। উঠে হাত ধোয়ার ক্ষমতাও নেই। তারাশঙ্করের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘হাতটা একটু ধুয়ে দে না ভাই।’

রফিক আজাদের ফ্ল্যাটে শ্যামলদার অবস্থা সেদিন বিভূতিভূষণের মতো। লেখায়ও তিনি তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুসারী। তারাশঙ্কর বিভূতি মানিক। দেশ পত্রিকায় শ্যামলদা ধারাবাহিকভাবে লিখছিলেন তাঁর অসামান্য উপন্যাস কুবেরের বিষয় আশায়। ভাষার অভূতপূর্ব ব্যবহার, তির্যক বর্ণনা, চরিত্র চিত্রণ গতানুগতিকতার বাইরে, রসবোধ আর বাংলা বাক্যের ভিতরে অবলীলাক্রমে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার, কোথাও কোথাও সাধুভাষায় কয়েকটি লাইন, সব মিলিয়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এক অন্য জাতের লেখক। আমি তাঁর লেখায় এতটাই মগ্ন হলাম, যেখানে তাঁর যে লেখা পাই, যে বই পাই পাগলের মতো পড়তে থাকি। নির্বাচিত গল্পের প্রথম গল্প ছিল ‘পরী’। কী অদ্ভুত ধরনের গল্প! খুঁজে পেতে আনি তাঁর প্রথম দিককার ছোট ছোট উপন্যাসগুলো। মনে পড়ছে পরস্ত্রী নামে একটি উপন্যাসের কথা। আর দেশ পত্রিকার একটার পর একটা বিস্ময়-জাগানিয়া গল্প। ‘লক্ষ্মণ মিস্ত্রির জীবন ও সময়’, ‘চন্দনেশ্বরের মাচানতলায়’, ‘কর্কটকান্তি’, ‘গতজšে§র রাস্তা’Ñএ রকম কত গল্প। আর উপন্যাস লিখলেন স্বর্গের আগের স্টেশন, দুই পর্বের হাওয়া গাড়ি, ঈশ্বরীতলার রূপোকথা। দুই পর্বের বিশাল ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখলেন শাহজাদা দারাশুকো। এই উপন্যাসের জন্য একাডেমি পুরস্কার পেলেন। আনন্দলোক পুজো সংখ্যায় খুবই হালকা চালে লিখলেন স্বর্গে তিন পাপী। আনন্দমেলায় লিখেছিলেন ছোটদের উপন্যাস ক্লাস সেভেনের মিস্টার ব্ল্যাক। আত্মজীবনী লিখতে শুরু করেছিলেন এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি। লেখা শেষ করে যেতে পারেননি। যতটা লিখেছিলেন ততটাই প্রথমে ঢাকার একটি দৈনিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল, পরে বাংলাদেশ থেকেই বইটি বেরয়। সেই শেষ না হওয়া আত্মজীবনী পড়েই শ্যামলভক্ত পাঠকরা মুগ্ধ। বেলাল চৌধুরী ভারি সুন্দর একটি ভূমিকা লিখেছিলেন এই  বইয়ের।

ঢাকায় বোধ হয় শ্যামলদা তারপর আর আসেননি। ’৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতায় গেছি একবার। সমরেশ মজুমদার ততদিনে আমার খুবই প্রিয়বন্ধু। চিত্তরঞ্জন এভিনিউতে সমরেশদার বন্ধুর থ্রি স্টার টাইপের একটা হোটেল আছে। একবার কলকাতায় গিয়ে টলিক্লাবে উঠেছি। সেই ক্লাবে আমার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে সমরেশদা মহাবিরক্ত। এইসব সাহেবদের জায়গায় উঠেছ কেন ? চল আমার সঙ্গে।

আমি ব্যাগ সুটকেস নিয়ে সমরেশদার গাড়িতে চড়লাম। তিনি আমাকে নিয়ে এলেন বন্ধুর হোটেলে। তারপর থেকে কলকাতায় গেলেই আমি সেই হোটেলটায় উঠি। সেবারও উঠেছি।

তবে টলিক্লাব সম্পর্কে আরেকটু কথা বলা দরকার। ওই সাহেবি ক্লাব সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমার সঙ্গে সেবার কলকাতায় গিয়েছিল গৌতম নামে শিল্প-সংস্কৃতিপ্রেমী এক যুবক। টলিক্লাব সে ঠিক করেছিল। ’৯৭ সালে গৌতমের সঙ্গে আমি ইউরোপে বেড়াতে গিয়েছিলাম। গৌতমের সঙ্গে তার স্ত্রী ছিল। আর আমি একা। প্রথমে লন্ডনে গিয়ে গৌতমের বন্ধু সেলিমের বাড়িতে উঠলাম। নিউবুরি পার্ক এলাকায় সেলিমের বাড়ি। সে ব্যবসা করত। মধ্য লন্ডনে তার একটা দোকান ছিল। লন্ডন থেকে আমরা গিয়েছিলাম সুইজারল্যান্ডের জুরিখে। তারপর আবার লন্ডন। লন্ডন থেকে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি। একটা পর্যায়ে ইতালি আর জার্মানিতে গৌতম গেল না। ঢাকায় কাজ ছিল বলে ফিরে এল। আমি একা একা ঘুরে বেড়ালাম। ’৭৯ সাল থেকে ’৮১ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে ছিলাম। সিনডেলফিনগেন নামের যে ছোট্ট শহরে ছিলাম, যে বাড়িটায় ছিলাম সেই শহরটায় দ্বিতীয়বারের মতো গেলাম, ঘুরে এলাম। বাড়ির সামনে একটা পার্ক এবং পাখিদের চিড়িয়াখানা। এই চিড়িয়াখানার কথা ছোটদের উপযোগী করে লিখেছিলাম। ‘কাননে কুসুমকলি’ নামের সেই লেখা ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল কিশোর বাংলা পত্রিকায়। আর জার্মানির জীবন নিয়ে লিখেছিলাম পরাধীনতা, পরবাস আর একটি প্রেমের উপন্যাস লিলিয়ান উপাখ্যান। কবি সাজ্জাদ শরিফ আর ইউসুফ হাসান এই দুই যুবক শৈলী নামে চমৎকার এক সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেছিল। ‘সুদূরতমা’ নামে লিলিয়ানকে নিয়ে এই পত্রিকায় কয়েকটি পর্ব আমি লিখলাম। পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর লেখাও বন্ধ হয়ে গেল। তবে তখন আমার লেখার বেশ একটা ডিমান্ড তৈরি হয়েছে পাঠক মহলে। সুদূরতমা নামে ক্রাউন সাইজের এক বই বেরিয়ে গেল। সেই বই আরও খানিকটা বাড়িয়ে বই হলো। নামটা বদলে দিলাম। এবার বইয়ের নাম সেই বিদেশিনী। ১২-১৩টা এডিশন হল। তারপর লিখলাম এই উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব। দ্বিতীয় পর্বের নাম ‘প্রিয় লিলিয়ান’। তৃতীয় পর্ব লিখলাম প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায়। সেই বিদেশী মেয়ে নামে। প্রথমা প্রকাশন থেকে বইও বেরুল। পরে ছোট ছোট পর্ব তিনটি একত্রে করে বেরুল লিলিয়ান উপাখ্যান। কী যেন কী কারণে এই উপন্যাসটির প্রতি আমার বিশেষ একটু মায়া আছে। লিলিয়ান যেন আমার মানসকন্যা।

দ্বিতীয়বার জার্মানিতে গিয়ে উঠেছিলাম ফ্রাংকফুর্টে। বাবুল ও হামিদুল নামে জার্মানপ্রবাসী দুই যুবক খুবই সাহিত্যপ্রেমি। ফ্রাংকফুর্ট থেকে হাইডেলবার্গ শহরটি কাছেই। হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটিতে পড়ান বাংলা ভাষার বিখ্যাত কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। তাঁর স্ত্রী জার্মান। সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য জার্মান ভাষার মহাকবি গ্যেটের নামে প্রবর্তিত ‘গ্যেটে সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছেন অলোকদা। বাবুল ও হামিদুলকে তিনি খুবই ভালোবাসেন। শুনে দিশেহারা হলাম। আমি অলোকদার কবিতার ভক্ত। তাঁর ছৌ কাবুকির মুখোশ কবিতার বইটি পড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এত কাছে হাইডেলবার্গ, এত কাছে অলোকদা, তাঁর সঙ্গে দেখা হবে না!

এক বিকেলে বাবুল আর হামিদুল আমাকে অলোকদার কাছে নিয়ে গেল।

ছোট্ট সুন্দর একতলা একটা বাড়িতে থাকেন অলোকদা। হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটির শহর। ছাত্র, শিক্ষক এবং ইউনিভার্সিটির অন্যান্য কর্মচারীর শহর। স্নিগ্ধ সুন্দর। আর হাইডেলবার্গ হচ্ছে ছাপা-মেশিনের জন্য বিখ্যাত। হাইডেলবার্গের অফসেট মেশিন খুবই সফেসটিকেটেড। প্রেস লাইনের লোকজন সবাই হাইডেলবার্গের নাম জানে।

অলোকদার বাড়ির সামনে একটুখানি সবুজ লন আর কিছু গাছপালা। ছোটখাটো বনেদি চেহারার মানুষ কিন্তু ভিতরে বারুদ ভরা। মায়াময় মুখখানি হাসিমাখা। চোখের তারায় মেধার ঝিলিক। ঠিক তার মতোই স্নিগ্ধ মায়াবী মানুষ ট্রুডবার্টা হেসলিঙ্গার। অলোকদার জীবনসঙ্গিনী। একটু মোটা ধাঁচের শরীর। ধীর পায়ে হেঁটে এলেন। সুন্দর বাংলা বলেন। অলোকদা পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর মিষ্টি করে হেসে ভিতরে চলে গেলেন। খানিকপর ট্রেতে করে চা আর নিজ হাতে তৈরি গরম গরম শিঙাড়া আর সমুচা নিয়ে এলেন। একেবারেই যেন বাঙালি কবির বাঙালি বউটি। সেই মুহূর্তে আমার মনে পড়েছিল অলোকদা তাঁর ছৌ কাবুকির মুখোশ কবিতার বইটি ট্রুডবার্টাকে উৎসর্গ করেছিলেন। চা-শিঙাড়া খেতে খেতে বিকেল কাটছিল। আমি হাতে করে নিয়ে গেছি আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত নূরজাহান প্রথম পর্ব। বই হাতে নিয়ে অলোকদা বললেন, ‘আমি এখন যা বলব শুনে তুমি চমকে উঠবে, মিলন। আমি কিছুদিন আগে কলকাতায় গিয়েছিলাম। নূরজাহান নিয়ে এসেছি। পড়েও ফেলেছি। দাঁড়াও প্রমাণ দিচ্ছি।’ ট্রুডবার্টাকে জার্মান ভাষায় কী কী বললেন। তিনি উঠে ভিতরের ঘরে চলে গেলেন। খানিকপর নূরজাহান বইটা হাতে নিয়ে ফিরে এলেন। এত বড় বিস্ময় অলোকদার হাইডেলবার্গের বাড়িতে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল, কল্পনাও করিনি! অলোকদা আমাকে তাঁর কবিতার বই উপহার দিলেন। বইটির নাম একেকটি উপভাষায় বৃষ্টি পড়ে। সেই মুহূর্তে আমার মনে পড়েছিল অলোকদার ‘যুক্তি’ কবিতার কয়েকটি লাইন।

স্টেশন-মাস্টার, আপনি দয়া করে এই

লোকটিকে ছেড়ে দিন, বুড়ো লোকটার

ত্রিসংসারে কেউ নেই।

এই কবিতা ছিল অলোকদার ধুনুরী দিয়েছে টংকার কাব্যগ্রন্থে। সেই অবিস্মরণীয় বিকেল এই জীবনে ভোলা যাবে না। বাংলা ভাষার এত বড় এক কবির সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা কাটানো! কত কথা হয়েছিল বাংলা সাহিত্য নিয়ে সেই বিকেলে! ও রকম সময় বোধ হয় মানুষের জীবনে একবারের বেশি আসে না। তারপর আর কোনো দিন দেখা হয়নি অলোকদার সঙ্গে। টেলিফোনে কথা হতো।

সেবার টলিক্লাবে দুদিন দুজন মানুষ আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। একজন সন্তোষকুমার ঘোষের মেয়ে কাকলী চক্রবর্তী। কাকলীদি আবার নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর পুত্রবধূ। দৈনিক বর্তমান পত্রিকায় কাজ করেন। এত স্নিগ্ধ সুন্দর একজন মানুষ! খুবই বন্ধুত্ব হলো আমার সঙ্গে। বর্তমান পুজো সংখ্যায় আমার লেখা ছাপতেন নিয়মিত। বর্তমান পত্রিকায় সন্তোষ ঘোষদের পরবর্তী প্রজšে§র অনেকেই যুক্ত হয়েছিলেন। যেমনÑগৌরকিশোর ঘোষের মেয়ে শাহনা নাগচৌধুরী, বিমল করের মেয়ে অনুভা কর, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে অপূর্ব চট্টোপ্যাধায়। ওদের বাবা কাকারা সব আনন্দবাজার গোষ্ঠীতে কাজ করতেন। আর ওরা এসে যুক্ত হল নতুন দৈনিক বর্তমান পত্রিকা। বর্তমান পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত সাংবাদিক বরণ সেনগুপ্তও এক সময় আনন্দবাজার-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমান করেন।

বর্তমান গ্রুপের সঙ্গে আমার সম্পর্ক করে দিয়েছিলেন সমরেশ মজুমদার। প্রথমবার ঢাকায় এসেই ফিরে গিয়ে তিনি সাপ্তাহিক বর্তমান পত্রিকায় আমাকে এবং হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে লিখলেন। সাপ্তাহিক বর্তমান থেকে লেখা চাওয়া হলো আমার কাছে। ‘মানুষের আড়ালে মানুষ’ নামে গল্প পাঠালাম। সেই গল্প পড়ে বিমল করের মেয়ে অনুভা আমাকে চিঠি লিখল। অনুভার ডাকনাম ‘পুচুন’। গভীর বন্ধুত্ব হল পুচুনের সঙ্গে। নিয়মিত চিঠি লেখালেখি হতো। প্রায়ই আমার গল্প ছাপা হতে লাগল সাপ্তাহিক বর্তমান পত্রিকায়। পুজোসংখ্যা বর্তমানে লিখলাম ‘মেয়েটির কোনো অপরাধ ছিল না’ গল্পটি।

এক বৃষ্টির দিনে টলিক্লাবে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলো অনুভা। দুপুর হয়ে গেছে। তাকে নিয়ে খেতে গেছি ক্লাবের ক্যান্টিনে। কাচের জানালার ধারে বসে টলিক্লাবের বিশাল গলফ মাঠ আর সবুজ গাছপালার ওপর অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরা দেখছি। টুকটাক গল্প করছি। রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার এসে বলল, স্যার, এখানে চটি পরে আসা যায় না। ব্যাপারটা আমি বুঝতেই পারলাম না। অনুভা মিটিমিটি হাসছে। রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার আবার বলল, স্যার, আপনার পায়ে ঘরে পরার চটি। এখানে চটি পরে ঢোকা যায় না। জুতো পরে আসতে হবে। তখন খেয়াল হলো রুমে যে স্যান্ডেল পরা ছিলাম ওটা পরেই অনুভার সঙ্গে চলে এসেছি। বৃষ্টির মধ্যে দৌড়ে গেলাম রুমে। জুতো পরে এলাম। ভারি লজ্জা লাগছিল। অনুভা শুধু বলল, এ রকম সাহেবদের জায়গায় আপনি উঠেছেন কেন ?

আহা, সেই মনোরম দুপুর বেলাটি আর কখনও ফিরে আসবে না জীবনে। সেই বৃষ্টি ঝরা দুপুর বেলাটি এই জীবনের এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকল। আমার বন্ধু অনুভা কর অল্প বয়সে চলে গেল। ক্যান্সার কেড়ে নিল তাকে।

সেবার অনুভাদের পুরো টিম খুব বড় একটা হোটেলে আমার সম্মানে লাঞ্চের আয়োজন করেছিল। কাকলীদি, শাহানাদি, অপূর্ব চট্টোপাধ্যায় আর অনুভা তো ছিলই। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে আমার একটু সমস্যা আছে। অনেকের সঙ্গে খেতে বসলে সংকোচ হয়। ঠিকঠাকমতো খেতে পারি না। ব্যাপারটা অনুভা খেয়াল করল। নিজের প্লেট নিয়ে আমার পাশে এসে বসল। আমার প্লেটে খাবার তুলে দিতে লাগল। এটা খাও, ওটা খাও। আমাকে একটা বই উপহার দিয়েছিল অনুভা আর সাপ্তাহিক বর্র্তমান পত্রিকার কর্মী পার্থ ঘোষ। পার্থর হাতের লেখা খুব সুন্দর। ‘আগাথা কৃষ্টির আত্মজীবনী’লাল কালিতে অনুভা আর পার্থ লিখেছিল ‘মিলন, তোমার কলকাতা বিজয়ে অভিনন্দন।’

সমরেশদার বন্ধুর হোটেলে এসে ওঠার পর প্রতিটি সন্ধ্যা হৈ-হুল্লোড় আর আড্ডায় কাটতে লাগল। সমরেশদা আসছেন রোজই। এক সন্ধ্যায় বাদলদা এলেন। বাদল বসু। আনন্দ পালিশার্সের কর্ণধার। আরেক সন্ধ্যায় বাংলা সাহিত্যের কয়েক মহীরুহ আমার রুমে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদারতাঁদের সঙ্গে আছেন আমার আরেকজন প্রিয় লেখক শেখর বসু আর বাদলদা। পানাহার আর আড্ডা। শ্যামলদা একসময় বেহেড মাতাল হয়ে গেলেন। আমার রুমে একবার গ্লাসের দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন। রাত দেড়টার দিকে ধরাধরি করে তাঁকে নিচে নেওয়া হলো। ট্যাক্সিতে তুলে দেওয়া হলো। রাতটা শ্যামলদার চিন্তায় আমার ঘুম হলো না। পরদিন সকালে সাড়ে ৯টা-১০টার দিকে শ্যামলদার ফোন। মিলন, আমি শ্যামলদা। তুমি বোধ হয় আমাকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করেছ। দুশ্চিন্তা কোরো না, আমি এ রকমই। স্ত্রী ভেবে বড়মেয়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। তাকে জড়িয়ে ধরতে গেছি, মেয়ে বলে, বাবা আমি তো! তুমি মার কাছে যাও। হা হা…। আজ সকালবেলা তোমার বৌদি বেদম বকাঝকা করেছে। ওই বড়মেয়েই আমাকে উদ্ধার করল। ওর মাকে বলল, বাবাকে বকছ কেন? বাবা খুব ভালো ছেলে। হা হা…!

দেশ পত্রিকা একবার সুনীল-প্রজšে§র লেখকদের নিজের সম্পর্কে লেখার আমন্ত্রণ জানাল। নিজের লেখা নিয়ে, নিজের জীবন এবং চিন্তার জগৎ নিয়ে সুনীল শীর্ষেন্দু শ্যামল মতি নন্দিরা লিখলেন। ভারি সুন্দর একটি সংখ্যা। আমরা খুবই আগ্রহ নিয়ে লেখাগুলো পড়লাম। ওইসব লেখকের জীবনদর্শন আর লেখক হয়ে ওঠার গল্প খুবই আকৃষ্ট করল আমাদের। শ্যামলদা যে লেখাটি লিখলেন সেই লেখা পরবর্তী সময়ে ভূমিকা হিসেবে ছাপা হল তাঁর ঈশ্বরীতলার রূপোকথা উপন্যাসে। ঈশ্বরীতলার রূপোকথাকে আমার মনে হয় শ্যামলদার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। পড়ার পর বহুদিন পর্যন্ত এই উপন্যাসে আমি আচ্ছন্ন হয়ে থেকেছি। ভূমিকা হিসেবে দেশ পত্রিকার সেই লেখাটিতেই পকেটে শৈশব-কৈশোর থাকার কথাটা ছিল। সেই লাইনটা এখনও আমার মনজুড়ে। নিজের লেখক জীবনের দিকে তাকালে, পিছনে ফেলে আসা জীবনের, শৈশব-কৈশোরের কত কত ছোট ঘটনার কথা যে মনে আসে! চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে ওঠে নিবিড় এক গ্রাম। যে গ্রাম শরীরের চামড়ার মতো লেপটে আছে জীবনে। সেই গ্রামের নাম মেদেনী মণ্ডল। যে গ্রাম ঘুরেফিরে আসে আমার লেখায়। আমার কাছে গ্রাম বলতেই যেন মেদেনী মণ্ডল।

খানবাড়ি থেকে বেরিয়ে দক্ষিণে চলে গেছে সড়ক। কিছুদূর এগোলে পুবদিক থেকে সরু আরেক হালট এসে মিশেছে। চলে গেছে গোরস্তানের দিকে, বিলের বাড়ির দিকে। বর্ষাকালে তখন কী যে বৃষ্টি হত! দিনরাত শুধু বৃষ্টি, শুধু বৃষ্টি। টিনের চালায় ঝমঝম শব্দ। আমি আর দাদা হয়তো আছি বুজির কাছে। বৃষ্টিতে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে আছে সকালবেলাটি। রোদ ওঠেই না। ও রকম সকালে দুআনা পয়সা দিয়েছেন বুজি। যাও মিয়া ভাই, ভেসাইল থেইকা সাচরা মাছ লইয়া আসো।

বাগানে কোষানাও বান্ধা। আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি। আট বছর বয়স। দাদা পড়ে ক্লাস ফাইভে। সে কোষানাওয়ের বাঁধ খুলল। ও রকম ঝুমবৃষ্টি ছাতায় মানে না। ছাতা একটা আমাদের আছে, তাও ছেঁড়া। হাফপ্যান্ট পরা খালি গা দুই ভাইয়ের। দাদা বৈঠা ‘চাব’ দিয়ে কোষানাও বেয়ে যায়। বৃষ্টিভেজা দুটি বালক যাচ্ছে দুআনার সাচরা মাছ কিনতে। বড়জন পাছার চারোটে বসে নৌকা বায়। ছোটজন ডুলা আঁকড়ে জবুথবু হয়ে বসে আছে নৌকার চটির পাটাতনে। মেঘ ডাকে না। খাড়া ঝিলিকও (বিদ্যুচ্চমক) নেই। আকাশে নৌকার মতো ভাসে মেঘ। খানবাড়ি থেকে বেরোনো সড়কের যেখানটায় পুবদিক থেকে এসে হালট মিলেছে, গোরস্তান আর বিলের বাড়ির দিকে যাওয়ার মুখে ভেসাল পেতে বসে আছে আধবুড়ো নন্দ জেলে। আমাদের কোষানাও তার নাওয়ের কাছে যেতেই বৃষ্টিভেজা মানুষটি চোখ তুলে তাকাল। মাছরাঙার ভঙ্গিতে বসেছিল ভেসালের পায়ের কাছে। সরু ভাঙাচোরা নৌকার ডরাভর্তি মাছ খলবল খলবল করছে। আরেকটু বেলা হলেই মাছ নিয়ে নন্দ যাবে মাওয়ার বাজারে। নন্দর নৌকার ছই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে নরম হয়ে, পচে প্রায় খুলে পড়েছে। গত সন্ধ্যা থেকে আজ সকাল পর্যন্ত মাছ ধরেই যাচ্ছে নন্দ। সীতারামপুরের দিকে বাড়ি তার। কোন বাড়ি, জানি না।

দাদা বলল, দুই আনার মাছ দেন।

নন্দ জেলে কথা বলে না। পায়ের চাপ দিয়ে ভেসাল তোলে। তোলার আগেই পানির তলা থেকে ভেসালে আটকা পড়া মাছের ছটফটানি টের পাওয়া যায়। নন্দ গম্ভীর গলায় বলল, ‘এই খেওয়ে (ক্ষেপ) যত মাছ ওডে বেবাক তগো দিয়া দিমু দুই আনায়।’

সত্যি সত্যি তাই করল সে। গুড়াগাড়ি মাছকে আমরা বলি সাচরা মাছ। সেই সাচরা মাছই বেশ ভালো পরিমাণ উঠল এক খেওয়ে। ছোট ছোট টাটকিনি ফেউস্যামাছ ঘাওরা মাছের বাচ্চা, পুঁটি টেংরা বাইল্যা টাকি দুচারটা কৈ শিং শিলং মাছের বাচ্চা, বাতাসি মাছ পাবদা, এই রকম এক খেওয়ের মাছে ঢুলা প্রায় ভরে গেল। দুআনা পয়সা কোঁচড়ে রাখতে রাখতে নন্দ বলল, তগো ভাগ্যি ভালো রে। দুই আনায় মাছ পাইলি চাইর আনার।

বিলের দিকটা তখন বৃষ্টিতে ঘন কুয়াশার মতো আচ্ছন্ন। জলে ভাসা ধানক্ষেত বর্ষার পানিতে বুক ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গোরস্তানের বাঁশঝাড়টা আবছা দেখা যায়, কলাগাছ আর অন্য ঝোপঝাড়গুলো দেখা যায় না। বিলের বাড়ির শিমুলগাছটা একটুখানি দেখা যায়। গোরস্তান থেকে একদেড় কানি পশ্চিমেই সেই বাড়ি। আমার অনেক লেখায় এসেছে বিলের বাড়ির কথা। শিমুলগাছটির কথা। এই বিলের দৃশ্যপট মাথায় রেখে ধানপাট চাষি বেলদারদের নিয়ে লিখেছিলাম ভূমিপুত্র। জোতদার-ব্যাপারিরা ছিল বাস্তব আর কল্পনার মিশেল দেওয়া চরিত্র।

সেই ছেলেবেলায় বড়শিতে একবার এমন একটা শিংমাছ ধরলাম, মাছটার পেটের নিচ থেকে লেজ পর্যন্ত জায়গাটা নেই। অর্থাৎ আধখানা মাছ। কিন্তু জীবন্ত। বড়শির ‘আধার’ খেয়ে ধরা পড়েছে। বড়শিটা আমি ফেলেছিলাম নানা আর টগর মামার কবরের পশ্চিম দিককার ঝোপঝাড়ের ফাঁকে। বর্ষার পানি তখন নামতে শুরু করেছে। ও রকম আধখানা শিংমাছ দেখে আমি তো অবাকই, বুজি আর পুনুআম্মাও অবাক। বুজি বলল, এই মাছ খাওয়া যাবে না। এই মাছের শরীর ভরা বিষ। সাপে ছোবল দিয়ে অর্ধেকটা খেয়ে ফেলেছে। বিষভর্তি শরীর নিয়েও বেঁচে আছে শিংমাছটা। শিংমাছের নিজের কাঁটায়ও বিষ আছে। কাঁটা দিলে বিষকাঁটালি দিয়ে সেই বিষ নামাতে হয়। শিংমাছের কাঁটা দেওয়াকে আমরা বলি ‘কাতা দেওয়া’। শিংমাছে কাতা দিছে।

এই বিষয়টুকু মাথায় ছিল। বিজ্ঞানসম্মত কোনো ব্যাখ্যা বিষয়টার নেই। বিষাক্ত সাপ সাধারণত ডাঙায় থাকে। পানিতে থাকা ধোড়াসাপ (ঢোঁড়াসাপ) বা মাইট্টাসাপ (মেটে সাপ) মাছ শিকার করে। ও রকম কোনো সাপেই শিংটাকে নিশ্চয়ই থাবা দিয়েছিল। বুজির বলা কথাটা গ্রামে প্রচলিত ছিল। এক ধরনের কুসংস্কার। সাপের বিষ নিয়ে বেঁচে আছে বিকলাঙ্গ শিংমাছ। ওই শিংয়ে ‘কাতা’ দিলে নিশ্চিত মরণ। ভূমিপুত্র উপন্যাসের বাদলা চরিত্রটি এ রকম ঘটনার শিকার হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুই হয়ে ওঠে তার নিয়তি।

পুবদেশ থেকে, অর্থাৎ বিক্রমপুরের পুবদিক থেকে এই বিলে মাছ ধরতে এসেছিল একজন। বাদলা আর তার মামা কাদের যেভাবে ‘দাঐন’ বাইতো, ওই লোকটাও সেরকম দাঐন বাইতো। ও রকম শিংয়ের কাতায় ধীরে ধীরে যাচ্ছে মৃত্যুর জগতে। গল্প লিখেছিলাম ‘অপরূপ বিলঝিল’। বর্ষায় ডোবা এই বিলের দৃশ্য সারাজীবন ধরে আমার চোখে লেগে আছে।

গোরস্তানের পুবদিকে একটা জংলা পুকুর। এখানটায় জমি ছিল। মাটি কেটে ভিটি (ভিত) বেঁধে গোরস্তান তৈরি করা হয়েছিল। মাটি কাটা জায়গা হয়ে গেছে পুকুর। গোরস্তানের পুবদিককার ভাঙন থেকে টোসখোলা ছিটকি কাশ এইসব ঝোপঝাড় এসে পুকুরের ওদিকটা একেবারেই জংলা করে ফেলেছে। পুকুরের পানি দেখাই যায় না। বড় বড় ঠাসবুনোট কচুরি। কিছু জলজ ঘাসও আছে। একটা ঘাসের নাম ‘দল’। গরুরা খুবই স্বাদ করে খায়। এই পুকুরটায় সহজে কেউ মাছ ধরতে নামত না। শোনা যায়, পুকুরে অনেক রকমের মাছ আছে। সবই বিলের মাছ। কৈ শিং শোল গজার বাইং (বাইন) বোয়াল চিতল রুই কাতলাও আছে। একবার শীতকালে গ্রামের যুবক পোলাপান ঝাঁকিজাল আর পলো নিয়ে গেল সেই পুকুরে। কচুরি সাফ করে মাছ ধরবে। সকালবেলা শুরু  হলো সাফ করার কাজ। দুপুরের মুখে মুখে শুরু হলো মাছ ধরা। ভালোই মাছ ধরা পড়ল। অনেকে জাল পলো ছাড়াই হাতিয়ে হাতিয়ে মাছ ধরছে। হাজামবাড়ির রব হাফিজুদ্দি ধরছে। আমাদের বাড়ির জাহাঙ্গির আলমগির ধরছে, মিন্টু ধরছে। আমার বড়ভাইও ছিল তাদের দলে। আমি পাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাছ ধরা দেখছি। কে যেন বলল, মিলু, তুইও নাম।

নামলাম। অন্ধের মতো হাতাচ্ছি মাছ ধরার জন্য। একসময় কী একটা লাগল হাতে। মাছ ভেবে দুহাতে আঁকড়ে ধরে তুলেছি। কিন্তু জিনিসটার নড়াচড়া নেই। মাছ হলে তো ধরা পড়ার পর ছটফট করবে! ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করবে। তাহলে কী ধরেছি আমি! তুলে দেখি বিঘত পরিমাণ মোটা একটা হাড়। বোকার মতো ওটা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। হাজামবাড়ির মজিদ দেখে বলল, হায় হায়, এইডা তর হাতে কিরে মিলু ? এটা তো মরা মাইনষের হাড্ডি।

আমি ছটফট করে পাড়ে লাফিয়ে উঠলাম। কোথায় ছুড়ে ফেললাম সেই হাড় কে জানে। খুব ভয় পেলাম। জ্বর আসার মতো অবস্থা। খাইগোবাড়ির (খানবাড়ি) মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে পানিপড়া এনে খাওয়ানো হলো আমাকে। গোরস্তানের পুকুর থেকে বড় বড় কয়েকটা কৈ ধরেছিল দাদা। বুক পেট গাঢ় হলুদ রঙের বিশাল কৈ। সেই মাছ আমাকে খেতেই দেওয়া হলো না।

জীবনে যতবার ওই গোরস্তানের দিকে তাকিয়েছি ততবারই এই ঘটনা মনে পড়েছে। এখনও মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়।

আমাদের গ্রাম এলাকায় তখন প্রচুর শিয়াল ছিল। সন্ধ্যা হলেই গোরস্তানের দিক থেকে, বিলের বাড়ির দিক থেকে, ঠাকুরবাড়ির দিক থেকে, পুবদিকে কামারবাড়ির দিক থেকে হক্কাহুয়া রবে মুখর হতো দেশগ্রাম। গিরস্ত বাড়ির হাঁসমুরগি দিনের বেলায়ও ধরে নিয়ে যেত শিয়ালে। এক জ্যোৎস্না রাতে পেশাব করতে উঠেছি। কেবিনের দক্ষিণ দিককার জানালা খুলে শিকের ফাঁক দিয়ে কাজ সারতে গিয়ে দেখি বাগানের মাঝখানকার উঠানের মতো সাদা জায়গাটায় পাঁচসাতটা শিয়াল হুটোপুটি করছে। কুকুরের দল একসঙ্গে হয়ে যেমন করে কখনও কখনও একদম সেরকম। শিয়ালেরা খেলাধুলা করছে। আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি যে এগুলো শিয়াল। রাতেরবেলা আমার ও রকম কাজ সারার সময় হলে বুজিকে ডাকতাম। বুজিও সেই রাতে উঠে বসেছেন। কাজ সেরে আমি শুতে গেলে জানালা বন্ধ করবেন। তাঁকে বললাম, ও বুঝি, বাগানে এত কুত্তা আইল কইথিকা ? বুজি এক পলক দেখে বললেন, ওইডি কুত্তা না মিয়াভাই, শিয়াল।

সেই রাতের আগে এত শিয়াল একসঙ্গে কোনোদিন দেখিনি। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একটা-দুটো কুকুর থাকে। আমাদের বাড়িতেও হামেদ মামাদের দুটো কুকুর ছিল। বেশ মোটাতাজা তেল চকচকে। শিয়াল-কুকুরে চিরকালের শত্রুতা। শিয়াল দেখলেই তেড়ে যায় কুকুর। কুকুরের ভয়ে গিরস্ত বাড়িতে হানা দিতে পারে না শিয়াল। আজ রাতে দেখি আমাদের বাগানে পাঁচ-সাতটা একসঙ্গে খেলা করছে। বাড়ির কুকুর দুটো কোথায় ? বুজি বললেন, এত শিয়াল দেইখা কুত্তা দুইটা ডরাইছে। ডরে রাও শব্দ করে না। খেউক্কায় (ঘেউ দেওয়া) না।

লেখালেখির শুরুর দিকে খুবই কাঁচাহাতে একটা শিশু-কিশোরদের উপন্যাস লিখেছিলাম। গণকণ্ঠ নামে একটা পত্রিকা ছিল। বলধা গার্ডেনের ওদিককার একটা বিল্ডিংয়ে ছিল অফিস। কবি আল মাহমুদ সম্ভবত সেই পত্রিকার সম্পাদক তখন। ছোটদের পাতা দেখতেন আমার চেয়ে বছর দু-তিনেকের বড় আবু করীম। বোধহয় সে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কবিতা লেখে আর পার্টটাইম কাজ করে গণকণ্ঠ-এ। আমার উপন্যাসের নাম মুনমুনের দিনরাত্রি। আবু করীমের সঙ্গে পরিচয় নেই। তবু তাকে গিয়ে দিয়ে এলাম। লেখাটি ধারাবাহিকভাবে ছাপা হলো। পরে আবু করীমের সঙ্গে আমার বেশ বন্ধুত্ব হয়। কিন্তু নিজের লেখা ওই উপন্যাস আমার আর ভালো লাগছিল না। পরে অনেক কাটাকুটি, নাম বদলে বই হয়ে বেরোয়। বইয়ের নাম এক যে ছিল টুনি। সেই উপন্যাসে জ্যোৎস্নারাতে বাড়ির বাগানে পাঁচসাতটা শিয়ালের ঘটনাটা লিখেছিলাম।

এলাকার শিয়ালগুলো বোধহয় তখন খুব খাবারের কষ্টে ভুগত। গ্রামের গরু-ছাগল মারা গেলে সেগুলো বিলের দিকে নিয়ে ফেলা হতো। শকুন-শিয়ালে খাবার একটা সুযোগ পেত। মানুষজন মারা গেলে রাতের অন্ধকারে কবর খুঁড়ে শিয়ালের দল অনেক সময় সেই লাশ তুলে খেত। কবরস্থান থেকে টেনে নামিয়ে বিলের দিকে নিয়ে আসত। বিলের বাড়ির পুকুরে হাতিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে যে হাড়টা আমি পেয়েছিলাম, ওটা নিশ্চয় শিয়ালেরা কবর থেকে যে লাশ তুলে খেয়েছিল সেরকম কোনো লাশের হাড়। বর্ষার মুখে মুখে বৃষ্টি আর পদ্মা থেকে খাল উপচে মাঠঘাট ভেসে যাওয়ার সময়, পানির চাপে পুকুরে গিয়ে পড়েছিল। বোধ হয় এ রকম মানুষের হাড় আর খুলি অনেকই ছিল পুকুরটায়, যে কারণে ওই পুকুরে সহজে মাছ ধরা হতো না।

বিলের বাড়িটা একসময় বসতবাড়ি ছিল। ছাড়াবাড়ি হয়ে যাওয়ার পর ঝোপজঙ্গলে ভরে গিয়েছিল। বিলে যাদের জমি ছিল, জমির মালিক ও কৃষকরা ধানপাট চাষ তো করতই, একটা সময়ে এই বিলে বাঙ্গি-তরমুজের চাষও  তো। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে বিলে বড় বড় তরমুজ ফলে থাকত। বাঙ্গি থাকত। তখন বিলের কোনো কোনো জমিতে বাইল্লা (বেলে) মাটি ছিল। ও রকম মাটিতে বাঙ্গি-তরমুজের ফলন ভালো হয়। একদিকে ধানপাট তিলকাউন বড় হচ্ছে, অন্যদিকে বাঙ্গি তরমুজ। আমার মায়ের এক ফুফাতো বোনের ছেলে দুলাল। দুলাল আর আমি একবার দুপুরের দিকে বিলে তরমুজ চুরি করতে গিয়েছিলাম। পাটক্ষেতের ভিতর দিয়ে চুপি চুপি গিয়ে তরমুজ ক্ষেতে নেমেছি। দুলাল তরমুজে টোকা দিয়ে দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল কোনটা পাকা কোনটা পাকা না। আমি তো অত কিছু বুঝি না! দুলালের সঙ্গে আছি আর কি! মাঝারি সাইজের পাকা একটা তরমুজ আবিষ্কার করল দুলাল। আবিষ্কারের ফলে এতই মুগ্ধ সে, কোনো দিকে আর তাকিয়ে দেখছে না। তরমুজ ছিঁড়ে বুকের কাছে মাত্র ধরেছে, কয়েক কানি দূর থেকে কাঁচি (কাস্তে) হাতে খালি গায়ের লম্বা চওড়া একজন মানুষ পাটক্ষেত থেকে হৈহৈ করে বেরিয়ে এলো। তরমুজ ক্ষেতটা তার। বোধ হয় কান্দিপাড়ার লোক। পাটক্ষেতের আড়ালে বসে তরমুজ ক্ষেত পাহারা দিচ্ছিল। সে বেরিয়ে আসতেই আমি ভয়ে দৌড় দিলাম। দুলাল এক মুহূর্ত কী ভাবল, লোকটার দিকে তাকাল কিন্তু তরমুজ ছাড়ল না। বুকের কাছে দুহাতে তরমুজ ধরা। বোধহয় জীবনের শ্রেষ্ঠ দৌড়টা সে দিল। লোকটা আমাদের ধরতে পারল না। ছেউল্লার বাড়ির পশ্চিম পাশ লাগোয়া একটা পাটক্ষেতে আমরা ‘পলাইয়া’ (পালিয়ে) রইলাম। সেই লোক এদিক-ওদিক আমাদের খুঁজল। না পেয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে ফিরে গেল। আমরা দুজন ছেউল্লার বাড়ির আমগাছতলায় বসে সেই তরমুজ ভেঙে ভেঙে খেলাম। দুলালের গায়ে বেশ শক্তি। আমগাছের গোড়ার সঙ্গে আছাড় দিয়ে তরমুজটা ভেঙেছিল। ভিতরটা লাল টকটকে, কী যে মিষ্টি আর রসালো তরমুজ!

বিলেরবাড়ির পটভূমিতে ছোটদের উপন্যাস লিখেছিলাম চিতা রহস্য। ১৯৭৭ সালের কথা। লেখালেখির জগতে আমার কিছুটা পরিচিতি হয়েছে। তরুণ লেখক হিসেবে নামটা সবাই জানে। উš§াদের মতো দুহাতে লিখি। ভালোমন্দ বিচার না করে সব পত্রিকাতেই লেখা দিই। কিছু অগ্রজ বা সমসাময়িক লেখক গালাগাল করেন। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। ওসব গায়ে না মেখে নিজের মতো লিখে চলেছি। আমার দুইবন্ধু কিশোর বাংলা পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িত। আবদুর রহমান ও সাইফুল আলম। পত্রিকার সম্পাদক রফিকুল হক দাদুভাই। ‘চাঁদের হাট’ নামের সংগঠন করে দাদুভাই আমাদের সবাইকে একত্র করেছিলেন। ‘চাঁদের হাট’ ছিল পূর্বদেশ পত্রিকার ছোটদের পাতা। সেই পাতা ঘিরেই গড়ে উঠেছিল সংগঠন। পূর্বদেশ বন্ধ হওয়ার পর সেই ভবন থেকেই বেরুল কিশোর বাংলা। শুধু কিশোরদের জন্য পূর্ণাঙ্গ একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। দাদুভাইয়ের সহকারী হিসেবে যুক্ত হলো রহমান আর লিটন। লিটনের পুরো নাম সাইফুল আলম। পরবর্তী সময়ে যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক। আবদুর রহমান অসামান্য ছড়া লিখত। হাতের লেখা মুক্তোর মতো। আমার অতিপ্রিয় বন্ধু। ’৭৭ সালের একদিন, মধুমিতা হলে কী একটা ইংরেজি সিনেমা দেখতে গেছি। ম্যাটিনি শো দেখে বেরিয়েছি। দেখি ইভনিং শো দেখার জন্য রহমান আর লিটন দাঁড়িয়ে আছে। রহমান বলল, আমরা কিশোর বাংলার ঈদ সংখ্যা বের করব। তোকে উপন্যাস লিখতে হবে। ১৫ দিন সময়।

বিরাট উৎসাহ নিয়ে পরদিনই লিখতে বসে গেলাম। তখন খবরের কাগজে কয়েক দিন ধরে একটা বেশ লোমহর্ষক ঘটনার কথা লেখা হচ্ছিল। বাংলাদেশের কোনো এক গ্রাম অঞ্চলে কী একটা প্রাণী বেরিয়েছে। ছাগল ধরে খায়। গিরস্তের হাঁস মুরগি কবুতর খায়। দু-তিনটি শিশুকে আক্রমণ করেছে। কিন্তু প্রাণীটি যে কী কেউ বলতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত জানা গেল ওটা আসলে চিতা বিড়াল। চিতাবাঘের মতো দাগ আছে শরীরে। এই নিয়ে উপন্যাস লিখলাম চিতা রহস্য। পটভূমি মেদেনী মণ্ডল গ্রাম। আমার নানাবাড়ি আর ওই বিলেরবাড়ি। উপন্যাসের নায়ক আমার ছোটভাই খোকন। তার সহকারী বারেক আর জিমি নামের একটা কুকুর। খোকনের সঙ্গে আছে আমাদের খালাতো ভাই ডালু। শেষ পর্যন্ত এই প্রাণীটির রহস্য তারা আবিষ্কার করে। বিলেরবাড়িতে খোকনদের তৈরি ফাঁদে আটকা পড়ে মারা যায় চিতা বিড়ালটি। জমজমাট রহস্যমাখা উপন্যাস। কিশোর বাংলায় প্রকাশের পর শিশু-কিশোর পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করল। চারদিক থেকে ভালো রকম প্রশংসা পেলাম। কিশোর বাংলার ঈদ সংখ্যাটিও ব্যাপক প্রশংসিত। আমার সঙ্গে উপন্যাস লিখেছিলেন অগ্রজ শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম।

চিতা বিড়াল থেকে মনে পড়ল আমার বিড়ালটির কথা। ভারি আদুরে ধরনের তুলতুলে সাদা বিড়াল। ধীর পায়ে হেঁটে এদিক-ওদিক যেত। কোনো জ্বালাতনই করত না। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যেত বাগানের দিকে। কাজ সেরে সামনের দুই থাবা দিয়ে ধুলোমাটি টেনে ঢেকে দিত। খেতে বসলে আমার পাশে এসে বসত। মাছের কাঁটাকুটা খেতে দিতাম। মাখা ভাতও দিতাম। টেংরা মাছটা আমি খেতে পারতাম না। আমার পাতে বুজি সেই মাছ দিলে একটা-দুটো মাছ আমি বিড়ালটাকে দিতাম। কুটকুট করে খেত। আমরা ঘুমাতাম কেবিনে। কারে ওঠার সিঁড়িটার কাছে টিমটিম করে সারারাত জ্বলত হারিকেন। সিঁড়ির ছায়া পড়েছে কেবিনের একটা অংশে। গরমকালে বিড়ালটা গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকত সেখানটায়। কত রাতে ঘুম ভেঙে আমি তাকে দেখেছি। কোনো কোনো রাতে কেবিনে ঢুকে আমরা হয়তো দরজায় খিল লাগিয়ে দিয়েছি। বিড়াল রয়ে গেছে বাইরে। কেবিনের সিঁড়িতে উঠে দরজার কাছে বসে সে মিউ মিউ করত। অর্থাৎ দরজা খোল, আমি বাইরে রয়ে গেছি। বুজি জানেন বিড়ালের জন্য আমার খুব মায়া। তিনি দরজা খুলে দিতেন অথবা পারুকে বলতেন দরজা খুলতে। পারু বিরক্ত হয়ে দরজা খুলত। তার বোধ হয় সূক্ষ্ম একটা রাগ ছিল বিড়ালটার ওপর। কী কারণে কে জানে! ভোররাতের দিকে বিড়ালটা আমার বুকের কাছে এসে শুয়ে থাকত। শীতকালে ঢুকে যেত লেপের তলায়। বেশ একটা ওম তার শরীরে। কখনও কখনও আমার একটা হাত গিয়ে পড়ত তার ওপর। সে একটুও বিরক্ত হত না। মৃদু ঘ্যার ঘ্যার একটা শব্দ হত তার শ্বাস-প্রশ্বাসের। নাকি নাক ডাকত বিড়ালটা!

আমার এই আদুরে বিড়ালটাকে হত্যা করল পারু। তার আগে প্রায়ই বিড়াল নিয়ে সে বুজির কাছে অভিযোগ করত। বিড়াল এই খেয়ে ফেলেছে, ওই খেয়ে ফেলেছে। আমার সামনে বলত না। বলত আড়ালে। শেষ পর্যন্ত বুজির সঙ্গে পারু বোধ হয় একটা মতলব এঁটেছিল। বিড়ালটাকে দূর কোনো গ্রামে ফেলে দিয়ে আসবে। হাজামবাড়ির মজিদ যাচ্ছিল মাওয়ার বাজারে। আমি গেছি স্কুলে। ছালার বস্তায় বিড়ালটা ভরা হলো। মজিদ খুবই আমুদে ধরনের লোক। বিড়াল ভরা ছালা চাদরের মতো কাঁধে ফেলে গান গাইতে গাইতে হাঁটা দিল। মাওয়ার বাজারের দিকে বিড়ালটাকে সে ছালা থেকে বের করে ছেড়ে দিয়ে এলো। স্কুল থেকে ফিরে আমি আর বিড়াল খুঁজে পাই না। বুজিকে জিজ্ঞেস করি, পারুকে জিজ্ঞেস করি। কেউ কিছুই বলে না। ব্যাপারটা বুঝতেই পারি না। কোথায় চলে গেল বিড়াল ? মন খারাপ করে এদিক-ওদিক বিড়াল খুঁজি। পুরানবাড়ির মাঠে সেদিন আর গেলামই না। শেষ বিকেলে দেখি আমিনুল মামাদের বাড়ির নামার দিক থেকে মিউ মিউ করতে করতে আসছে বিড়াল। আমি আর খুশিতে বাঁচি না। পারুর দেখি মুখ কালো। বুজির মুখে মিটিমিটি হাসি। সন্ধ্যাবেলা বিড়াল কোলে নিয়ে বসে আছি। তখন ঘটনাটা বললেন বুজি। ‘এই বিলাইটার তোমার লেইগা খুব মায়া মিয়াভাই। মজিদ বহুত দূরে নিয়া ফালাই দিয়া আইছিল। ওইখান থিকা ফিরত আইছে। এই বিলাই তোমারে ছাইড়া যাইব না।’

মাওয়া তখন মেদেনী মণ্ডল থেকে দেড়দুই মাইল দূরে। পদ্মার ভাঙনে সেই মাওয়া বিলীন হয়ে গেছে। এখন দূরত্ব খুবই কম। ওই অতটা দূর থেকে ফিরত এসেছিল আমার বিড়াল। সেই বিড়ালটা পারু হত্যা করল।

সন্ধ্যাবেলায় সেদিন চাঁদ উঠেছে আকাশে। বুজি আমার জন্য দুধ জ্বাল দিয়ে রেখেছেন রান্নাঘরে। বেশ পুরো হালকা হলুদ রঙের সর পড়েছে দুধে। এই সর খেতে আমি খুব পছন্দ করি। রাতে দুধভাত খেতে পছন্দ করি। হঠাৎ পারু এসে বুজিকে বলল, দুধ খেতে গিয়ে কড়াই উল্টিয়ে ফেলেছে বিড়ালে। দুধ যতটা না খেয়েছে তার চেয়ে ফেলে দিয়েছে বেশি। শুনে বিড়ালটাকে না, বুজি বকাঝকা শুরু করলেন পারুকে। কারণ সন্ধ্যার আগে আগেই পারু সব সময় দুধের কড়াই বড়ঘরে নিয়ে আসে। সেদিন আনেনি। কিশোরী মেয়ে। হয়তো বাড়ির ভানুখালার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল বা এদিক-ওদিক কোথাও ঘুরতে গিয়েছিল। বুজির বকা খেয়ে ভিতরে ভিতরে খুব রাগল। বিড়ালটাকে খুঁজতে লাগল। দুধ খানিকটা খেয়েছিল বিড়াল। পেট বোধ হয় ভালো রকমই ভরেছিল তার। সন্ধ্যা হয়ে আসছে দেখে বড়ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল। থাবা দিয়ে সেই বিড়াল ধরল পারু। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া বাগানে নিয়ে শরীরের সর্বশক্তি একত্র করে দিল এক আছাড়।

বিড়াল খুব শক্ত ধরনের প্রাণী। সহজে কাবু হয় না, মরে না। আশ্চর্য ব্যাপার, এই বিড়ালটা সঙ্গে সঙ্গে মরে গেল। আছাড়ের ফলে পেট থেকে অনেকখানি দুধ বেরিয়ে গেছে। মুখ থেকে রক্ত বেরিয়েছে কিছুটা। দুধ রক্তে মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে বাগানের মাটিতে। আছাড়ের সময় ম্যাও করে বড় রকমের একটা আর্তনাদ করেছিল। সেই শব্দে আমি আর বুজি ছুটে গেছি বাগানে। গিয়ে দেখি বিড়াল কাত হয়ে পড়ে আছে। পারু তার সামনে বসে ভয়ার্ত মুখে বিড়ালের মাথায় হাত  বুলাচ্ছে। বিড়াল যে মরে গেছে সে বুঝতে পারেনি। বাগানে পড়ে থাকা বিড়াল দাঁড় করাবার চেষ্টা করছিল। মরা বিড়াল দাঁড়ায় কেমন করে! দৃশ্যটা দেখেই বুজি বুঝে গেলেন তার মিলুর আদরের বিড়াল শেষ হয়ে গেছে। পারুকে তিনি ‘পারি’ বলে ডাকতেন। দিশাহারা গলায় একবার শুধু বললেন, ‘হায় হায় পারি, করছস কী ? বিলাইডাতো মইরা গেছে।’

শোনার সঙ্গে সঙ্গে মৃত বিড়াল বুকে জড়িয়ে আমি কাঁদতে লাগলাম। বুজি বেদম বকাঝকা শুরু করলেন পারুকে। বাড়ির লোকজনও অনেকে বাগানে চলে এসেছে। প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে পারুকে বকাঝকা করছে। পারু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। বিড়াল মেরে ফেলেছে সেই দুঃখে সে কাঁদছে না, সে কাঁদছে বকা খেয়ে।

তখন শোনা গেল আরেক কথা। বুজিই বললেন। বিড়াল মেরে ফেললে সেই বিড়ালের সঙ্গে সোয়াসের লবণ দিয়ে দূরের ঝোপজঙ্গলে ফেলে আসতে হয়। রাত হয়ে গেছে। এখন সোয়াসের লবণ কোথায় পাওয়া যাবে ? কে যেন বলল, লবণ অল্প একটু হলেও হয়। এক-দুমুঠ লবণ বিড়ালের গায়ে মাখিয়ে দূরে নিয়ে ফেলে দিয়ে আসলেই হবে। বড়ঘর থেকে লবণ রাখার চিনামাটির পাত্রটা নিয়ে আসা হলো। দুমুঠ লবণ নিয়ে বিড়ালের ওপর ছড়িয়ে দিলেন বুজি। ছানাদা সেন্টুদা গেলেন বিড়াল ফেলতে। কান্নায় ভেসে যাওয়া চোখে আমি দেখছি আমার অনেক দিনের সঙ্গী বিড়ালটির লেজ ধরে দোলাতে দোলাতে ফকফকে জ্যোৎস্না ভেঙে ছানাদা সেন্টুদা মিয়াবাড়ির ওপর দিয়ে গুহের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। গুহদের ছাড়াবাড়ি ভর্তি গভীর জঙ্গল। সেই জঙ্গলবাড়ির কোথায় যে ফেলে দিয়ে এল আমার প্রিয় বিড়ালটি! বাগানে পড়ে রইল তার পেট থেকে বেরোনো দুধের রেখা, মুখ থেকে বেরোনো রক্ত। তার সঙ্গে মিশে আছে কিছু বড় বড় রোয়ার লবণ।

এই বিড়ালের শোক কাটাতে বহুদিন সময় লেগেছে আমার। ফাল্গুন-চৈত্র মাসের কোনো কোনো শেষ বিকেলে বাগানে পায়চারি করতে করতে হঠাৎই আমি যেন বিড়ালটির মিউ ডাক শুনতে পেতাম। হঠাৎই মনে হত দূর মাওয়ার ওইদিকে ফেলে দিয়ে আসা হয়েছে আমার বিড়াল। এই বুঝি সে ফিরে এলো!

নূরজাহান উপন্যাসে এই বিড়ালটির বর্ণনা আছে। ওই যে হারিকেনের নিবু নিবু আলোয় শুয়ে থাকা বিড়ালটি! দেলোয়ারদের ঘরের কেবিনে শুয়ে থাকে সেই বিড়াল! আর আছে কেমন আছ সবুজ পাতা উপন্যাসে। আমার আত্মজৈবনিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব। ছেলেবেলার জীবন নিয়ে লেখা।

আমি একটু বড় হয়ে ওঠার পর পারুরা গ্রাম ছেড়ে গেল। পারুর বাবা তার পরিবার নিয়ে রংপুর না দিনাজপুর কোথায় যেন চলে গেল। অন্যের বাড়ির আশ্রিত মানুষ। এক আশ্রয় ছেড়ে বহুদূরের কোনো আশ্রয়ে চলে গেল। এই জীবনে পারুর সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। তবে সেই বালক বয়সেই আমার বিড়াল মেরে ফেলার ফলে পারুর হাতের কোনো খাবার আমি খেতাম না। বুজি আমার রেকাবি আর কাচের গ্লাস আলাদা করে দিয়েছিলেন। ওই রেকাবিতে শুধু আমিই ভাত খাব। ওই গ্লাসে শুধু আমিই পানি খাব। পারু ওই রেকাবি গ্লাস ধরলে নতুন করে ধুয়ে আমি ভাত পানি খেতাম। তীব্র এক ঘণা জšে§ গিয়েছিল পারুর ওপর।

ছেউল্লার বাড়িটা আসলে কার বাড়ি আমি তা জানতামই না। ‘ছেউল্লা’ কার নাম জানতাম না। বাড়িটা ছিল ছাড়াবাড়ি। পুরানবাড়ির মাঠের উত্তর পাশে। বাড়ি ভর্তি আমগাছ। মাঝখানটা ফাঁকা। আমরা সেই ফাঁকা জায়গায় গুলি খেলতাম। পুবপাশে একটা পুকুর। পশ্চিমপাশে বাড়ির গা ঘেঁষে খানবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসা হালট। তারপর বিল। পুব পাশের পুকুরটা ছিল বাইল্লা মাটির পুকুর। পানির তলায় কাদা ছিল না। আমরা ওই পুকুরে গোসল করে খুব মজা পেতাম। বালি মাটির পুকুরের পানি স্বচ্ছ হয়। দল বেঁধে ঝাপাঝাপি করলেও সহজে ঘোলা হতো না।

এই বাড়িতে একবার এক পাগলিনী এসে উপস্থিত হলো। কোত্থেকে এলো কে জানে! এক সকালে গ্রামের লোকজন তাকে আবিষ্কার করল। একটু মোটা ধাঁচের শরীর। যুবতি বয়স। পাগলীর গায়ে সুতোটি পর্যন্ত নেই। খরালিকাল। অনেকের সঙ্গে পুরান বাড়ির মাঠে গিয়ে পাগলিনীকে আমিও এক পলক দেখে এলাম। নগ্ন নারী মূর্তিটি দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির মাঝখানে। দুতিন দিন বোধ হয় ওই ছাড়াবাড়িতে সে ছিল। তারপর যেমন করে এসেছিল তেমন করেই উধাও হয়ে গেল। তবে তারপর কয়েক দিন গ্রামের যুবকদের মধ্যে ওই পাগলিনীকে নিয়ে এক ধরনের রসালো কথাবার্তা আর হাসাহাসি হতো। সেসবের মর্ম আমি বুঝিনি।

শিয়ালের মতো অনেক বাঘডাশাও ছিল গ্রামে। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ দিকটায়, পায়খানা ঘরের পুব পাশে কিছু ঝোপজঙ্গল আর একটা বউন্নাগাছ। এসবের দক্ষিণে ভাঙনের দিক ভরা কাশ টোসখোলা আর ছিটকির ঝোপ নিবিড় হয়ে আছে। তারপর মিয়াবাড়ির ঝোপজঙ্গল, গাছপালা। কতগুলো ঝাপড়ানো হিজলগাছ আছে ওখানটায়। বর্ষাকালে কানিবক এসে বাসা বাঁধে, বাচ্চা ফোটায়। আমার ধারণা ছিল, কানিবকের বাসা আর ছানাদের কথা মিয়াবাড়ির কেউ জানে না। কোষানাও নিয়ে এক নির্জন দুপুরে গিয়েছি কানিবকের ছানা ধরে আনতে। আমার সঙ্গে হাজামবাড়ির রব। ছানাদের পাহারা দিচ্ছিল দুটি কানিবক। আমাদের দেখেই ডানা ঝাপটিয়ে এমন ডাকাডাকি শুরু করল, মিয়াবাড়ির লোকজন টের পেয়ে গেল। তারাও কানিবকের ছানাদের লোভে আছে। উড়তে শেখার আগে ধরে নিয়ে জবাই করে খাবে। একদিকে কানিবকদের চিৎকার, অন্যদিকে মিয়াবাড়ির লোকজনের। আমি আর রব ভয়ে পালিয়ে এলাম।

নূরজাহান উপন্যাসে এই বাড়ির কথা বিস্তারিত আছে। ছনুবুড়ি আসলে এই বাড়ির মানুষ। উপন্যাসে তাকে অন্য বাড়ির মানুষ হিসেবে দেখিয়েছি। তবে তার মাইট্টা তেল খেয়ে মারা যাওয়ার ঘটনাটা সত্য। এই বাড়ির কর্ত্রী মোমের মা-ও বাস্তব চরিত্র। তার পঙ্গু বড়বোন দোতলা ঘরের পালঙ্কে শুয়ে থাকত। এটাও বাস্তব। শুধু তার দেখাশোনা করত যেই মেয়েটি, চরের মানুষটির সঙ্গে যার গভীর প্রেম হয়েছিল, ওসব কল্পনা। বাড়ির জামরুলগাছ, আমগাছগুলো, বাঁশঝাড় আর চালতাগাছটা সত্য। পুবপাশের ছাড়াবাড়িটা, যেখানে বছরের প্রথম খেজুরগাছ ঝুড়তে এসেছিল দবির গাছি, সেই বাড়িটা সত্য। আমগাছে ভর্তি ছিল ছাড়াবাড়িটা। একটা গাবগাছ ছিল। গাবগুলো পেকে হলুদ হয়ে থাকত। মোমের মা জাঁদরেল মহিলা। তাঁর দাপটে ওই বাড়ির দিকে কেউ পা বাড়াতে পারত না। গাছের সব আম পাকলে তাঁর বাড়ির চউরা কাজের লোকটিকে দিয়ে, হাজামবাড়ির লোকজন নিয়ে একদিনে সবগাছের আম পাড়িয়ে ফেলতেন। সে এক উৎসবের মতো ব্যাপার। আমরা বিভিন্ন বাড়ির ছোট পোলাপান দল বেঁধে সেই আম পাড়া দেখতে যেতাম। তিনি ছিলেন খুবই কৃপণ মানুষ। একটা আমও কাউকে দিতেন না। তিনি যতটা জাঁদরেল, তাঁর স্বামী আদিলউদ্দিন মিয়া বা আদিলউদ্দিন চৌধুরী ততটাই শান্ত নিরীহ ধরনের মানুষ। বাড়িতে দোনলা বন্দুক ছিল। আমিনুল মামাদের বাড়ির পুব দিককার নামায়, নাড়ার পালার সামনে একবার চৈত্রমাসের তীব্র গরমে বিশাল একটা খৈয়া জাতসাপ বেরল। গরমের হাত থেকে বাঁচতে হাত সাতেক লম্বা আর কাছির মতো মোটা সাপটা নাড়ার পালার ছায়ায় শরীর মেলে পড়ে রইল। সাপ দেখে আমিনুল মামাদের বাড়ির মানুষ, হাজামবাড়ির মানুষ সবাই অস্থির। আদিলউদ্দিন মিয়া সেই প্রথম দোনলা বন্দুক বের করলেন। নিপুণ হাতে গুলি করে সাপ মারলেন।

আদিলউদ্দিন মিয়ার বাড়িকে আমরা মিয়াবাড়ি বলতাম ঠিকই, আসলে তাঁরা চৌধুরী। বনেদি মানুষ। আব্বার সঙ্গে এই ভদ্রলোকের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। জিন্দাবাহার উপন্যাসে তাঁর কথা লিখেছি।

আদিলউদ্দিন মিয়ার ছেলে ইউনুস চৌধুরী। চিটাগাংয়ে তাঁর ব্যবসা। ঢাকার ইস্কাটনে বাড়ি। তাঁর ডাকনাম তারা মিয়া। মা-খালাদের মুখে আমরা খুব তারা মিয়ার কথা শুনতাম। তিনি অনেক টাকার মালিক। এই সব শুনতাম। তারা মিয়া বা ইউনুস চৌধুরীর ছেলে আজাদ বীর মুক্তিযোদ্ধা। এই গেরিলা যোদ্ধাকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। রমনা থানায় তাঁকে রাখা হয়েছিল। তাঁর মা একদিন ছেলের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন থানায়। ছেলে বলেছিল, মা, আমি তিন দিন ধরে ভাত খাই না। কাল তুমি আমার জন্য একটু ভাত নিয়ে এসো। পরদিন ভাত নিয়ে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ছেলেকে আর পাননি মা। পাননি তো পানই নি। আজাদ আর ফিরে আসেননি। থানা হাজতের মেঝেতে শুয়ে থাকতেন আজাদ। সেই ঘটনার পর মা বেঁচেছিলেন ১৪ বছর। তিনি কখনও আর ভাত খাননি। কখনও আর বিছানায় শোননি। মেঝেতে শুয়ে থাকতেন। এই মাকে নিয়ে আর আজাদকে নিয়ে মা নামে উপন্যাস লিখেছেন কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। উপন্যাসটি ব্যাপক জনপ্রিয়, ব্যাপক সাড়া জাগানো। বেশ কয়েকটি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাদের খালাতো ভাই জায়েদ, চঞ্চল। ওরা সমেদ খাঁ নানার নাতি। টুকুমামার ছেলে। চঞ্চলের সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়েছিল। ওরা ছিল ঢাকায়। মা মারা যাওয়ার পর গ্রামে চলে আসে। দুই ভাই কাজীরপাগলা স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। জায়েদদা পড়তেন আমার বড়ভাইয়ের সঙ্গে। চঞ্চল পড়ত আমার সঙ্গে। আনিসুল হকের মা উপন্যাসে ওদের কথাও আছে। ইউনুস চৌধুরী দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন বলে আজাদকে নিয়ে অভিমান করে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন তাঁর মা। ইস্কাটন থেকে চলে এসেছিলেন পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জে। ফরাশগঞ্জের বাড়িতেই থাকতেন।

মানুষের জীবনের বাঁকে বাঁকে কত ছোটবড় ঘটনা, কত দুঃখবেদনা, কত সুখের স্মৃতি, কত অভিমান আর বুকচাপা কষ্ট। কত কথা লেখা হয়, কত কথা লেখাই হয় না, বলাই হয় না। আমৃত্যু বহন করে চলে মানুষ। এই চলার নাম জীবন। মানুষের আসলে তিনটি জীবন। জনসম্মুখে প্রকাশ্য জীবন, পারিবারিক জীবন আর গোপন জীবন। গোপন জীবনে লুকিয়ে থাকে প্রকাশ্য জীবনের চেয়ে শত গুণ বেশি কিছু। মানুষটি নিজে ছাড়া কেউ তা জানে না। সেই জীবনের হদিস পায় না অন্য কেউ। এই তিন জীবনের পথে মানুষ হাঁটে। সঙ্গে হাঁটে তার ফেলে আসা দিনরাত্রি। কত বর্ষা বসন্ত, কত নিঝুম বৃষ্টির রাত, কত রৌদ্র ঝলমল দিন! শীতের কুয়াশা জড়ানো সকালবেলাটি, নির্জন দুপুরের উদাসীনতা। বিকেলবেলায় কমলা রঙের রোদ ছড়িয়ে মাঠের ওপারে অস্ত যায় সূর্য। গভীর গভীরতর অন্ধকার রাতে আকাশে জেগে থাকে কোটি নক্ষত্র। চাঁদের আলো শিউলি ফুলের মতো ফুটে থাকে ভুবনময়। হাওয়া বয় প্রেমিকার স্পর্শের মতো। এই মনোরম প্রকৃতিই নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে।

[চলবে]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares