ধারাবাহিক উপন্যাস : ফসলের ডাক : মঈন শেখ

দ্বিতীয় পর্ব

[মঈন শেখ। জন্ম ২২ নভেম্বর ১৯৭৯, রাজশাহির তানোর উপজেলার পাড়িশো গ্রামে। পেশা শিক্ষকতা। গল্প ছাড়াও লিখেছেন উপন্যাস, প্রবন্ধ, কিশোর সাহিত্য, কবিতা ও গান। সম্পাদনা করেছেন কয়েকটি ছোট কাগজ। তিনি বাংলাদেশ বেতারের একজন তালিকাভুক্ত গীতিকার।

মঈন শেখের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘কুসুমকথা’ ছাপা হয় ভারতের দেশ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় ২০১৯ সনে (১৪২৬ ব.)। এর পরপর তাঁর নাম অনেকটা আলোচিত হতে থাকে সাহিত্যিক মহলের বিভিন্ন আড্ডায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অল্প সময়ের মধ্যে দেশ-এর ওই শারদীয় সংখ্যা ফুরিয়ে যায় বাংলাদেশের পত্রিকার বিঅিভন্ন স্টল থেকে। সেই বছরই কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলা উপলক্ষ্যে কুসুমকথা বই আকারে প্রকাশ করে আনন্দ পাবলিশার্স। এই উপন্যাসের জন্য রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা-উর্দু লিটারারি ফোরামের সাহিত্য পুরস্কার-২০২০’ প্রদান করা হয় মঈন শেখকে। তারই ধারাবাহিকতায় ‘ফসলের ডাক’ মঈন শেখের দ্বিতীয় উপন্যাস। কুসুমকথা আপাদমস্তক নিটল প্রেমের উপন্যাস। ‘ফসলের ডাক’ও তাই। তবে এই প্রেম সম্পূর্ণ আলাদা প্রেম। এ প্রেম ধানের প্রেম, ফসলের প্রেম। ফসল ফলানোর কষ্ট এবং আনন্দ যাদের বুঝবার কথা তারা বুঝতে না পারলেও ফসল কিন্তু তা ঠিকই বুঝতে পারে। কৃষকের দির্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার হওয়া এবং তা ক্রমে ক্রমে পুঞ্জিভুত হওয়া ও তার বিস্ফোরণই হল এই উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য।]

॥ তিন ॥

দুপুরে খেতে বসে মিনহাজকে মা বলল―ক্যানরে বাপ, তুমার বাপ যে তালকানা হয়্যা বিছনের বিয়াতাত৭ পড়ে মরোজে, তুমি একটু হিল্লে হলেও তো পার ? মিনহাজ কোনো উত্তর দিতে পারেনি। মাথা গুঁজে খেয়েছে মাত্র। খাবার শেষ করে বিছানাতে একটা গড়ানি দিল। দুপুরের ভাতঘুম তার প্রতিদিনের অভ্যেস। তবে আজকে ঘুম এলো না। দুপুরে খেতে বসে মায়ের বলা কথাগুলোও তার সঙ্গে বিছানাতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। মাঝে মাঝে ঝিঙ্গেশাইল ধানের শুঙ্গ হয়ে ফুটছে সমস্ত শরীরে। ধড়ফড়িয়ে উঠল মিনহাজ। কিছুক্ষণ বসে থাকলেও বাপের মুখটা সামনে থেকে গেল না। দেয়ালে ঝুলন্ত ঘড়ির পাশ থেকে টিকটিকিটা লেজ উঁচিয়ে ভেংচি কাটল। স্বভাবের শব্দ তুলে কী যেন বলতে চাইল মিনহাজকে। টিকটিকি ঘড়ির পিছনে লুকাতেই মিনহাজ উঠে দাঁড়াল। গেঞ্জিটা শরীরে চাপিয়ে সোজা বিয়াতার দিকে যেতে লাগল।

বাড়ির দরজা পেরিয়ে, খৈলান পেরিয়ে আমগাছের ছায়াতে দাঁড়াল মিনহাজ। এটুকু আসতেই যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। অথচ কয়েক ধাপের রাস্তা। একটা আগুনে ঝাঁঝ ছুটে আসছে উত্তরের ফাঁকা মাঠ থেকে। ধিকিধিকি কী যেন জ্বলছে প্রতিটি আলের গা ঘেঁষে। এ কোনো আগুনে পুড়ছে আষাঢ়ের আকাশ, মাঠ, বাতাস। মিনহাজের শরীরটা কাঁটা দিয়ে উঠল হঠাৎ। দমকা বাতাস ধাক্কা দিল বোধহয়। প্রতিটি লোম দাঁড়িয়ে গেল তরতর করে। উনুনে থাকা খোলা থেকে সদ্য তোলা কোনো রুটির বাতাস বেরিয়ে তাকে ধাক্কা দিল যেন। দৌড়ে বাড়িতে ঢোকা ছাড়া কিছু ভাবতে পারল না। কিন্তু বাড়ির দিকে মুখ ঘোরাতে গিয়ে থমকে গেল। খানিক দূরে কে যেন জ্বলছে। খরানির ধিকিধিকি জ্বলনের সঙ্গে আলের ওপর সেও যেন লাফায়। ছোটবেলায় মুণ্ডলের আমবাগানে দেখা পুতুলনাচের কথা মনে পড়ল। তবে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে, এটা ছায়াবাজি, খরানিবাজি নাকি আগুনেবাজি। লোকটি আলের ওপর কোদাল কুপিয়ে মরে, আবার পায়ের গোড়ালি দিয়ে সেই আলেই লাথি মারছে সমস্ত শরীরের ভারে। মিনহাজের মনে হলো, লোকটি কুচিকুচি করে খরানিকে কাটছে আবার পায়ের গোড়ালি দিয়ে তাকেই শাসিয়ে মারছে। মনে হচ্ছে সে প্রেতপুরীর বাসিন্দা। একচিলতে শরীরে এ কেমন যুদ্ধ। এবার ঠিক চিনে ফেলল মিনহাজ। এ যোদ্ধা তার বাপ। ঘেন্না হলো নিজের ওপর। নিজেকে কেঁচো, জোঁক, আরশোলা যা কিছু অমেরুদণ্ডী, সব ভাবল। আর ভাবতে ভাবতেই এগিয়ে গেল বাপের দিকে; বিছনের বিয়াতার দিকে।

কিরে বাপ, তুমি ভুঁয়ে ক্যান ? খুব রোদরে বাপ, তাড়াতাড়ি বাড়িত যাও, অসুখ করবে। খুব বিস্ময় আর রাগ মিশিয়ে টানপেড়ে কথাগুলো বলল সুরমান।

কেন তোমার অসুখ করবে না। এত রোদে আসবার কী দরকার ছিল ? রোদ পড়লে এলে চলতো না ? রাগ মিনহাজও দেখাল।

না রে বাপ, ধান বিকালের মধ্যেই ফেলতে হবে। না হলে ধান ভাপিয়ে সিদ্ধ হোবে, ট্যাঁক৮ এমনিতেই বড় হয়ে গেজে। পরে আর  জট ছাড়ানো যাবে না।

আল কাটছো কেন ?

আর বুলিস না রে বাপ। শালার এন্দুর আইলডা ঝাঁজরা কর‌্যা দিজে। গোঙ্গাল৯ করে করেছে কি, দ্যাগ না ? সকালেই পানি সেচনু, এগন দ্যাগ অদ্ধেকই নাই। আবার পানি সেচতে হোবে। ইঁদুরের বিরুদ্ধে একটা জোরালো অভিযোগ পেশ করল যেন।

ক্যান পানি সেঁচতে হবে কেন, সকালেই তো সব পানি আল কেটে বের করতে হবে।

সুরমান ছেলের কথাতে মুচকি হাসল। এ তুমি বুঝব্যা না। থকথকে কাদাতে ধান বুনলে ট্যাঁকগুলো কাদার মইদ্দে চাপা পড়বে যে। তাছাড়া এই গরমে সিদ্ধ হয়্যা যাবে ধানের ভিতরডা। মিনহাজের মুখের দিকে একবার তাকালো সুরমান। ও মুখে বড় মায়া। যা এখন ঘাম হয়ে ঝরঝরিয়ে পড়ছে। সুরমানের মুখেও ঘাম; সঙ্গে কাদা। বাপ আবার হাসল। শব্দহীন হাসি হলেও তা যেন সমস্ত শরীরে, সমস্ত মাঠে বিছিয়ে গেল। এই হাসির বিছানো রং না মিলাতেই বলল―বাজান চামড়া তোমার পুড়ে গেল যে; তুমি যাও। বাপ, কবিতা আর ধান ফলানো এক কাম নয়। আবারও হাসল সুরমান। তবে নিজেকে ফিরিয়ে নিল কাজের দিকে। অন্য সময় হলে রেগে যেত মিনহাজ। এখন রাগল না। এই খরদাহে কাজের মাঝেও বাপের মনে কত রস! এ রস শুকাবার নয়, ফুরাবার নয়; ঘাপটি মেরে থাকবার নয়। যা ঠাট্টা করবার যা মসকরা করবার, তা করবেই। তা তুমি চুল্লির মধ্যিখানি বসিয়ে দাও না কেন। ইচ্ছা হলেই বান ডাকে।

বাজান এ্যকনা সরে দাঁড়াও, কাদা ছিটায়ে পড়বে। সুরমানের মুখে কাতরতার ছাপ প্রকাশ পেল।

এবার রেগে গেল মিনহাজ। ইচ্ছা হলো দড়াম করে কাদাতে শুয়ে যেতে। ইচ্ছা হলো বলতে, বাবা আমি কাদা মাখতে পারি। বলতে ইচ্ছা করল, বাবা আমি তোমারই সন্তান; আমি খাঁটি কৃষকের সন্তান। আমার ঘামে, চোখের পানিতে লবণ থাকে। হাঁপিয়ে উঠলে তোমার বুকের মতো আমার বুকটাও ওঠা-নামা করে।

হঠাৎ কতগুলো শব্দ মিনহাজের কানে গেল। শব্দটা বাপের মুখ থেকেই বের হচ্ছে। অমন শব্দ মুখ থেকে বের হওয়া সম্ভব বলেই মিনহাজ মনে করল শব্দটা তার বাপের মুখ থেকে বের হচ্ছে। তাছাড়া অন্য যে কোনো বেবুঝ প্রাণী কোনো তরজমা ছাড়াই ধরে নেবে, শব্দগুলো বের হচ্ছে সুরমানের সমস্ত শরীর থেকে। পায়ের গোড়ালি দিয়ে শরীরের শক্তিভর লাথি মারছে আলের ধার ঘেঁষে। কোদাল দিয়ে আল কুপিয়ে এতক্ষণ যতটা আলগা করেছিল, ঠিক ততটাই আটিল করবার চেষ্টা। প্রতিটি লাথির সঙ্গে সঙ্গে ঐ শব্দটি একবার করে বের হচ্ছে ফঁস ফঁস করে। এ কোন ধরনের আল-শাসন ? বাপের দিকে এক ধেয়ানে তাকিয়ে থাকল মিনহাজ। যেন এক অচেনা মানুষ। ভিনগ্রহ থেকে এসে এখানে আল-শাসন করছে। আলকে বড় দুর্বল আর অসহায় মনে হলো এই লাথির কাছে। এ লাথিতে রাগ, ক্ষোভ নাকি অসহায়ত্ব ঝরে, বুঝা মুশকিল। হয়তো পৃথিবীর সমস্ত বিশ্লেষকই হার মানবেন এটা বুঝতে, এ ফোঁপানী গোখরো নাকি জলঢোঁড়ার। কাঁধের রগগুলো টনটন করে ফুলে উঠেছে। ঘাম আর নতুন করে ঝরে পড়বার দরকার নেই, সমস্ত শরীর সাঁতার কাটছে শরীরের ঘামে। শরীরের রং এখন যতটা পাকা ততটাই তামাটে। বিঘত শিং মাছের শরীর। অথচ দাদি প্রায়ই গল্প করত, ছেলে তার রাজপুত্তর ছিল। দুধে আলতায় মিশানো রং। এখনও নাকি ছায়াতে দুদিন ঢুকে থাকলে আগের রং ফিরে পাবে। সেই চিরচেনা বাপ মিনহাজের কাছে আজ আস্তে আস্তে অচেনা মনে হয়। এখনও লাফায় সুরমান। অথচ মিনহাজের কাছে মনে হলো, আল আর বাপ দুজন দুজনাকে বিকর্ষণ করছে। দুজনেই উত্তর মেরু। হঠাৎ মিনহাজের কাছে মনে হলো, এ মাঠ কবেকার ভুষণ্ডির মাঠ। একটু দূরে তাকিয়ে ঝাপসা হলেও দেখতে পেল, ছোট বড় আলের গা ঘেঁষে হাজারো প্রেত, প্রেতনী ধিকিধিকি জ্বলছে আর লাফাচ্ছে।  শুধু সামনেরটাই যা একটু বড় আর স্পষ্ট।

একটা গর্তের মুখ তখনও বোধহয় আলগা হয়ে ছিল। আর সেদিক দিয়ে ইঁদুরটা লাফ দিল। মরণ-নাটকের শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্যের লাফ বোধহয় সর্ব বৃহৎ হয়। ইঁদুর; অথচ বিড়ালের মতো লাফ দিয়ে পড়ল মিনহাজের লুঙ্গির মধ্যিখানে। সেখানে ধাক্কা খেয়ে পাশের ঢোলকলমির ঝোপে ঘাপটি মারল। মিনহাজ অপ্রস্তুত হয়ে লাফ দিয়ে একধাপ পিছাল। লুঙ্গির গোছা ধরে ঝাড়তে লাগল আলতো করে। সুরমানও ছুটে এলো ছেলের কাছে। অপরাধ স্বীকারের রেখা মুখে এঁকে বলল―বুললাম না বাপ, এ্যকনা দূরেত যাও। দেগলে তো, লুঙ্গিডা কাদাতে কী হলো ? সুরমান ছেলের লুঙ্গিটা ছোঁবার জন্যে এগিয়ে গেল। লুঙ্গির কাদা সরাবার দায় একমাত্র তার। কিন্তু লুঙ্গিতে হাত দেবার আগেই খেঁকিয়ে উঠল মিনহাজ―কী করছো তুমি ? সরে যাও তো! মিনহাজ আরও একধাপ সরে গেল পিছনে। চরম রাগ হলো বাপের ওপর। যার সমস্ত গায়ে কাদা অথচ ছেলের কিঞ্চিৎ কাদা লাগাতে কত দুঃখ।

বাপ, রাগ দেগাও ক্যান ? হামি কি জানতাম এন্দুরডা এভাবে ঘাপটি মাইরা আজে। ঐ জন্যই তো শালা এন্দুর, এন্দুরের বাচ্চা এন্দুর। ইঁদুরের গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে লুঙ্গির নেংটিটা আরও একবার মজবুত করবার চেষ্টা করল।

তুমি থামবে এবার। একটা কাজ কর আব্বা, ইঁদুরগুলোকে ধরে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে এসো, আমার মতো করে। তাহলে যদি একটু বুদ্ধিসুদ্ধি হয়। ধমকের শুরুর রেশ যতটা ছিল, পরের কথাগুলো বোধহয় তাকে একটু হালকা করবার জন্যেই। এটা ঠিক, কথাতে ঠাট্টা থাকলেও রাগের কমতি ছিল না। বাপ সেটা বুঝতেও পারল। তবে কষ্ট পেল, ইঁদুর আর তার ছেলেকে গুলিয়ে ফেলবার জন্যে। লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে মিনহাজকে একটা গাছ দেখিয়ে বলল―বাপ তুমি ছায়াতে গিয়া বস, না হয় বাড়িত যাও; হামি আইলডা ঠিক কইরা আসি।

ঠিক তখনই আর একটা কাণ্ড ঘটল। আকাশ থেকে পড়ল সুরমান। হারিয়ে ফেলল তার ছেলেকে। এ কোন মিনহাজ, বাপের সামনে দাঁড়িয়ে বাপকে শাসায়, আদেশ দেয়। কিন্তু এর জবাবে কোনো কথা তার ঝোলা হাতড়িয়ে পেল না। ছেলে শাসিয়ে, চোখ রাঙিয়ে যা বলল তাই-ই করতে বাধ্য হলো যেন, শান্ত বাবা হয়ে। তাদের আজ এই মুহূর্তে যেন অবস্থার বিনিময় হলো। ছেলে কোদালের বাঁট কেড়ে নিয়ে তাকে শাসিয়ে বলল―খবরদার আব্বা, তুমি কোদাল ছুঁবে না। ঠিক হয়ে ঐ গাছটার ছায়াতে গিয়ে বস। আমি আলটা ঠিক করে আসছি। বাপ ছেলের আগুনে মুখের দিকে তাকিয়ে অকস্মাৎ ভয় পেয়ে গেল। সুড়সুড় করে ছেলের দেখানো গাছটার ছায়াতে ঠিক চলে গেল। তবে বসল না, দাঁড়িয়ে থাকল। আর অবিশ্বাস্য এক ঘটনা অপলক দেখতে লাগল। মিনহাজ ঠিকঠিক লুঙ্গি গুছিয়ে নেংটি ঠুকল। নেংটি অনেকটা বেসামাল। তবুও সেভাবেই নেমে পড়ল তৈরি হওয়া জমিতে। কোদাল দিয়ে মাটি তুলে আল বাঁধতে লাগল। মাঝে মাঝে কোদাল রেখে হাত লাগায়। হাত দিয়ে মাটির উঁচুনিচু সমান করে আলের সৌন্দর্য বাড়ায়। বাপের বিশ্বাস হয় না, যে ছেলে কোনোদিন জমির আল বেড়িয়ে দ্যাখেনি, সে কি না আজ কোদালে মাটি তুলছে সাঁইসাঁই শব্দ করে। কিছুক্ষণ পর মিনহাজ কোদাল কাঁধে নিয়ে জমির চারধার ঘুরতে লাগল। সুরমান শুধু চেয়ে দেখল আর মনের মধ্যে মন মিশিয়ে হাসল।

॥ চার ॥

আজকে বাড়ির বাহির হলো না মিনহাজ। বিকালে বাপ-মায়ের সাথে গোল হয়ে বসে সেও বাঁশের ঝুড়িতে চাপা দেওয়া অঙ্কুরিত ধানের চাপচাপ দলা ঝুরঝুরে করেছে। জাগ খাওয়া ধানের মধ্যে এত যে গরম লুকিয়ে থাকে, তা এর আগে অনুভব করেনি মিনহাজ। অথচ দূর হতে এমন দৃশ্য কতবার দেখেছে। হাত ঢুকালেই একটা শিহরণ বয়ে যায় সমস্ত শরীরজুড়ে। পশম দাঁড়িয়ে যায় তরতর করে। তবে মিনহাজের আজকের কাণ্ডকে তার মতিভ্রম বা সুমতি যা-ই বলা হোক না কেন, এর জন্য বিস্মিত হয়েছে সবাই। বাড়িতে কানাঘুষাও হয়েছে, মিনহাজের কান চোখ বাঁচিয়ে।

মিনহাজ বাড়িতে এলে আর একটা কাণ্ড ঘটে। সে একলা ঘরে শোবে না। এ নিয়ে অনেকে ঠাট্টাও করে। কয়েকবার চেষ্টাও করেছে একা থাকবার; পারেনি। মাঝরাতে বালিশটা বগলে নিয়ে সুড়সুড় করে বাপের ঘরে গেছে। ছোটবেলা একবার ভয় পেয়েছিল ঘুমের ঘোরে। জ্ঞান হারিয়েছিল। স্পষ্ট দেখেছিল মিনহাজ, একটা ধবধবে সাদা পরি তুলে নিয়ে যেতে চায় তাদের দেশে। জানালা দিয়ে উড়ে এসেছিল। কবিরাজ আর মৌলবির লাইন পড়েছিল তাদের বাড়িতে। কোমর গলায় মিলে পাঁচটি তাবিজ উঠেছিল। এখন ভাবলে হাসি পায় তার। তবে এক জায়গায় এখনও আপস করেনি সে। বাড়িতে একলা একঘরে থাকবে না। অন্যদিকে বাড়ির বাহিরে উল্টো। শহরে ছাত্রাবাসে এক ঘরে একা। এতে আপত্তি বা ভয় কোনোটিই নেই। শুধু ব্যতিক্রম বাড়িতে। নিজ বাড়িতে। যেখানে নাড়ি পোতা আছে সেখানে। মাও তাকে একা রাখতে চায় না। একমাত্র পুত্র সন্তান। তিন মেয়ের পর এই মিনহাজ। বড় আদরের ধন। মিনহাজ বাড়িতে এলেই মা অন্য ঘরে। বাপ বেটা এক ঘরে। আজ শুয়ে ঘুম আসছে না। বাপের ঘুম সুইচে টিপ দেবার মতো। চোখ বুঁজলেই ঘুম। মিনহাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে। সামনে আকাশ নেই, আছে ছাদ। তালগাছের তিরের ওপর বাঁশের পাটাতন বিছানো ছাদ।

আজ গোটা দিনের ক্রমধারা ডায়রিতে লিখে রাখতে চেয়েছিল মিনহাজ। লেখা হয়নি। তবে বাপের পাশে শুয়ে মধ্যরাত ধরে আজকের ঘটে যাওয়া ঘটনা বা ঘটে যাওয়া কাজগুলো কয়েকবার খেয়াল করল মনে মনে। ডায়রিতে না লিখেই বারবার পড়ছে ঘটনাগুলো। আর এর ফাঁকে একবার তাকাল বাপের দিকে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত বারকয়েক খেয়াল করল। হাড্ডি-চর্মসার একটা মানুষ কীভাবে লেপটে আছে বিছানার সাথে। অথচ এই ষাট পার করা মানুষটা যখন কোদাল নিয়ে ভুঁয়ে নামে, তখন বড় অচেনা হয়ে ওঠে। কোনো শক্তির ফেরেস্তা যেন তার গায়ে ভর করে। আস্ত শ্যালোমেশিন কাঁধে নিয়ে অন্যপারের যুবকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঠিক পায়ে পা মেলায়। কীটনাশক ভর্তি ঢোপ পিঠে ঝুলিয়ে  হাঁটু কাদার ভুঁয়ে নিপুণভাবে বিষ ছিটায়। এই কাজপাগল মানুষটার সমস্ত শরীরজুড়ে কত ছন্দ, কত তাল। আজ হঠাৎ বাপকে নিয়ে গর্ব হতে লাগল মিনহাজের। ভাবতে লাগল এমন মানুষ আর দ্বিতীয়টি আছে কি না। এমন অলরাউন্ডার মানুষ মনে মনে খুঁজে দেখবার চেষ্টা করল চেনাজানা মানুষের মধ্যে। পেল না। সাধারণভাবে মানুষ যা পারে, তার বাপ সব পারে। বিমান চালাতে পারে না ঠিক, কিন্তু মোটরবাইকের গতি বাড়াতে পারে অনেক যুবকের থেকেও বেশি। সুরমান যখন শার্ট প্যান্ট পরে, চশমা লাগিয়ে হেলমেট এঁটে বাইকে বসে, কিংবা বাইকে বসে সিগারেট টানে, ঠিক মনে হয় সাহেব।  আবার নেংটি ঠুকে কোদাল বা লাঙল কাঁধে নিয়ে যখন জমিতে নামে কিংবা আলে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানে, তখন ঠিক পাকা কৃষক। সাইকেল বা মোটরসাইকেল খুলে যখন মেরামত করে, তখন ঠিক মেকার। আবার সেলাই মেশিনে যখন ছোটখাটো সেলাই করে, তখন টেইলর। মোটকথা ঝাঁকা-ডালি বানানো, ছিপ দিয়ে মাছ ধরা; সবই পারে। এই যে মাটির দোতলা বাড়িটা, তার সমস্ত দরজা-জানালা এমনকি একটি খাটও তার নিজের হাতে বানানো। বাপের আরও অনেক কাজই খেয়াল করল মিনহাজ। এই মুহূর্তে মনে হলো, তার বাপ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাপ। এমন মানুষ কেন পুরস্কার পাবে না, এই মর্মে একটা কারণ দর্শানোর নোটিশ মনে মনে পাঠাল নোবেল কমিটির কাছে।

আরও একবার বাপের দিকে এক ধেয়ানে তাকাল মিনহাজ। দেখাতে শেষ নেই। এক নতুন বাপকে যেন আবিষ্কার করে চলে। এর আগে এত করে দ্যাখেনি বা ভাবেনি বাপকে নিয়ে। যদিও বাড়িতে এলে প্রতি রাতেই বাপের সাথে ঘুমায়। ডিম লাইটের আলোতে বাপের কানের মধ্যে কী যেন দেখতে পেল। কোনো ফোঁড়া উঠল কি না, বুঝতে পারল না। হাত দিতে গিয়েও দিল না। অবশেষে বড় আলোটা জ্বালাল। স্পষ্ট দেখতে পেল, কাদার একটা ফোঁটা ঘাপটি মেরে আছে বাপের কানের গর্তে। বাপের শরীরের আর যতটুকু দেখা যায়, তা দেখবার চেষ্টা করল সে। না আর কোথাও কাদা নেই। কানের কাদার দিকেই আবারও বারকয়েক দেখল। হঠাৎ একটা কবিতা বা কবিতার কয়েক লাইন মাথায় এল। কবিতার সময় জ্ঞান কোনোদিনই ছিল না। হঠাৎ করেই এল, গত দুপুরে বাপ যেভাবে প্রশ্নটা করেছিল, ঠিক সেভাবে। কবিতা মাথায় এলেও পত্রস্থ করল না। তবে মনে মনে কয়েকবার আওড়াল। এক অগ্রজ কবির কথা মনে হলো। যিনি প্রায়ই বলতেন, মিনহাজ তোমার কবিতায় ইতিহাস, ঐতিহ্যের ব্যবহার কর, ছন্দ ঠিক রাখো, দেখবে কবিতা ঠিক দাঁড়িয়ে যাবে। কথাটা মনে হওয়াতে আপন মনেই হাসল মিনহাজ। আর অগ্রজ কবির কথা ভেবে আনমনে বলল―ভাই আমার কবিতা দাঁড়াবে কি, দেখে যান, কবিতা কীভাবে ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে আমার আব্বার কানের ভিতরে। এই এক ফোঁটা শুকনো কাদার মধ্যেই কত ঐতিহ্য, কত ইতিহাস, কত ছন্দ মিলেমিশে একাকার।

বড় আলোটা আস্তে করে উঠে গিয়ে নিভিয়ে দিল। বড় আলো নিভিয়ে দেবার পরও ঐ শুকনো কাদা কোনো এক মায়াবী আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে। যেন ঐ কাদা থেকেই এই আলো মৃদু ছন্দ তুলে এগিয়ে আসছে তার দিকে। অকস্মাৎ মিনহাজ অনুভব করল তার বাপের চারপাশে, সমস্ত শরীরজুড়ে কত কবিতা, কত ঐতিহ্য, কত ছন্দ। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত আর অক্ষরবৃত্তের ছন্দ। বাহিরে চোখ নিয়ে যেতেই দেখতে পেল, বৈশাখের রোদে সার বেঁধে কৃষকরা কীভাবে ছন্দ তুলে কাঁধে করে ধানের ভার নিয়ে যাচ্ছে। ধানের শিষে শিষে বাড়ি খেয়ে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে কিছু ধান। ধানের শিষগুচ্ছ ঘুঙুর হয়ে ছন্দ তুলে বাজে। এ কোন ছন্দ ? মিনহাজ খানিক থেমে নাম দিল স্বরবৃত্ত ছন্দ। এ বড় চটুল, বড় শ্বাসাঘাত। মা যখন কুলাতে করে ধানে ঢেউ তুলে বাতাসে ছাড়ে, তখনও স্বরবৃত্ত। গতকাল বিকালে বাপ যখন বিছনের অঙ্কুরিত ধান বিয়াতাতে ছিটালেন, তখনও কত সুন্দর শব্দ হলো। এক ধান আর এক ধানের সাথে পাল্লা দিয়ে কাদার বিছানাতে জায়গা করে নেয় ঝুরুক্ ঝুরুক্ শব্দ তুলে। এখানেও স্বরবৃত্ত। তবে বিছন ছিটাবার আগে জাগ দেওয়া ধান যে ভাঙলাম, এখানে কোন ছন্দ ? নিজেকে প্রশ্ন করল নিজেই। আবার উত্তরও একটা দিয়ে দিল। এ হলো অক্ষরবৃত্ত। এ যে চাপা ছন্দ; এর শোষণ ক্ষমতা অনেক বেশি। শুধু বদ্ধাক্ষর আর বদ্ধাক্ষর। তবে দাঁড়িতে ধান মাপা ? এটা ঠিক মাত্রাবৃত্ত। ধান রোপণ, এও ঠিক মাত্রাবৃত্ত। কখনও পাঁচ কখনও ছয়। ছুপছুপ শব্দ তুলে লুপলুপ করে কত নিখুঁতভাবে রুয়ে দেয় ধানের চারা। আরও অনেকক্ষণ চোখ বুঁজে নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করল মিনহাজ। পুলকিত হয় আর সামনে আগায়। যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এক কাব্যগ্রন্থের পাতাগুলো উল্টিয়ে পাল্টিয়ে পড়ছে মিনহাজ। যার প্রতিটি পাতাতে নতুন কবিতা, নতুন স্বাদ। তৎক্ষণাৎ কবিতাগুলোর নাম বা কাব্যগ্রন্থের নাম দিতে পারল না, তবে ভাবতে থাকল চোখ বুঁজেই। আরও একবার থমকে গেল মিনহাজ। বিদ্যুৎ চমকালো মাথাতে। গতকাল বাপ যে প্রশ্ন করেছিল, উত্তর ভালো করে দিতে পারেনি। যদিও সন্ধ্যাতে উত্তরটা একবার দিতে চেয়েছিল। বিয়াতাতে ধান ছিটিয়ে বাপ ফিরে আসবার সময় বলতে চেয়েছিল―আব্বা, এই তো তুমি ফলিয়ে এলে কবিতা। তুমিও কবি। বলতে চেয়েছিল আরও কথা। বলা হয়নি। কিন্তু না, আর নয়। এখনই বলতে হবে কথাটা। সকালে বাপকে পাওয়া যাবে না। আবার ব্যস্ত হয়ে পড়বেন কবিতার মাঠে। এই মাঝরাতে এমন একটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যতই বেমানান হোক, তবুও দিবে। বাপের ডান বাহুতে হালকা ধাক্কা দিয়ে ডাকল সে―আব্বা আব্বা। মিনহাজের মনে একটা খটকা আছে; বাপ লাফ দিয়ে চমকে ওঠে কি না। ভাবে কি না, ছেলে নতুন করে ঘুমের ঘোরে আবারও শৈশবের পুরনো ভয় পেল কি না। কিন্তু না, চমকে উঠল না বাপ। বরং পাশ ফিরে আবার শুলো। তবে মিনহাজই উল্টো চমকে উঠল বাপের কথায়। কোনো ঘুমকাতুরে গলায় নয়, একদম ঝরঝরে গলায় বলল―বাজান ঘুমাও, শরীল খারাপ করবে।

বাপের একতরফা কথায় হকচকিয়ে গেল মিনহাজ। বুঝতে বাঁকি থাকে না, বাপ এখনও ঘুমায়নি। যদিও তার বুঝা উচিত ছিল। জোর করে নিজেকে সামলিয়ে ভাবল, বাপকে আজ দিয়ে দিবে গতকালের প্রশ্নের উত্তর। নিজের ওপর রাগবার ফুরসত পেল না মিনহাজ। তাকে আজ দিতেই হবে গতকালের উত্তর। হোক অসময়, তবুও। তবে প্রশ্নকারীকেও ডাকল না, গলা ফাটিয়ে শুধু বলতে চাইল―আব্বা, তুমিও কবি, তোমার কবিতা বিশ্বময়। আমার কবিতা শুধু মনের খিদে মেটায়, পেটেরটা নয়। তোমার কবিতা মেটায় দুটোই। এই একই কথা আরও কয়েকবার বলল মিনহাজ। যদিও তার কথা কেউ শুনতে পেল না।

॥ পাঁচ ॥

বিকল্পের ভাবনায় বিভোর মোল্লা। অনেক সাত-পাঁচ ভেবে, সতের-বিশ ভেবে একটা ভাবনা উপস্থিত করেছে। তবে ভাবনার গূঢ়ার্থ একদম ভিতরেই থাকল। যা প্রকাশ পেল তা বাহিরেরটা। অনেক হম্বিতম্বি করল বাহির বাহির।―সব শালাদের দেখে নেব। মোড়লের কাছে নালিশ দিয়েছি। সন্ধ্যার বিচারেই হাত-মোড়া দিয়ে সবাইকে পিটন খাওয়াব। নাক ছেঁচড় খাওয়াব। শালাদের খুব বাড় বেড়েছে। এভাবেই বিচারের দাম বাড়ায় মোল্লা।

আরিফ মোল্লা সত্যি সত্যিই বিচার দিয়েছে গ্রামের মণ্ডলের কাছে। মোল্লা মোটা দামের পাঁচ প্যাকেট সিগারেট দিয়েছে তাকে। মণ্ডলেরও মনে মনে একটা রাগ ছিল কামলা গোষ্ঠীর ওপর। শালারা কথা শোনে না। ছাড়া পাওয়া ষাঁড় হয়েছে সবাই। সুযোগ পেলেই গুঁতো দেয়। মোল্লা একটা কাজের কাজ করেছে। এ সুযোগে দু’কথা শোনানো যাবে। গ্রাম্য বিচারের সময় যে ব্যক্তি মানুষ ডাকার কাজ করে, তাকে নগদ তিনশ টাকা ধরিয়ে দিয়েছে মোল্লা। গ্রামসুদ্ধ ডাকিয়েছে। আর বিচারক মণ্ডল ভিন গ্রামের বিশেষ বিশেষ জোতদারদের ডেকেছে; পক্ষ ভারি করবার জন্য। বোঝাপড়া একটা করেই ছাড়বে দু’পক্ষের মধ্যে। কামলা আর গেরস্থ। সমঝোতা স্মারকও বলা যেতে পারে। অন্যদিকে কবির বাহিনী গ্রামের সমস্ত কামলার দলকে ডেকেছে তার পক্ষে কথা বলার জন্য। এমনকি গ্রাম টপকে পাশের গ্রামেরও দু’চার জনকে ডেকেছে; যারা কথা বলতে পারে দশজনের মধ্যে। কবিরের দলই ভারি।

মোড়লের বাহির বারান্দার নিচে ছোট আমবাগান। সেখানেই বসেছে বিচার। দু’দুটো বড় লাইট জ¦ালানো হয়েছে। আজ কেউ মোড়ের ওপর যায়নি। বাগান ভর্তি লোক। যেন অনেক দিন পরে মোড়লবাড়িতে আলকাপ গান। খানিক দূরে সুযোগ বুঝে উটকো পয়সার লোভে আজগর মুন্সি চায়ের দোকান দিয়েছে। লাল চা। দু’পাশে দুই পুচকে ছোড়া বসেছে বাদাম নিয়ে। সবকিছু মিলে গমগম করছে বাগানময়। দু’পক্ষের মধ্যে ফিসফাস হিসহাস চলছে পুরোদমে। অনেকেরই ধারণা, উল্টো মোল্লাই নতুন করে অপমান হবে। বিশেষ করে কামলারা নতুন নতুন কৌশল আঁটছে মোল্লাকে ফাঁসানোর জন্য। ধনীক শ্রেণিরাও ফিকির আঁটছে। এমন সুযোগ আর আসবে না। এমন একটা আয়োজনের জন্য মোল্লাকে ধন্যবাদ দেয় গেরস্থরা সবাই। ডাক পাওয়া ধনীরা তো বটেই; এমন কী উৎসাহ নিয়ে পাশের গ্রাম থেকে বিনা ডাকে যেসব ধনী এসেছে তারাও। তাদের ইচ্ছা আজকেই একটা চুক্তি করবে কামলাদের সাথে। কয়েকটি চুক্তি ক্রমানুসারে সাজালো পর্যন্ত। যেমন গ্রামের কামলা নিজ গ্রামে কাজ রেখে অন্য গ্রামে যেতে পারবে না। এমন কি ধান লাগানো মৌসুমে অন্য কাজ করতে পারবে না। প্রয়োজনে মজুরি বাড়িয়ে দেওয়া যাবে। এর ব্যতিক্রম ঘটলে যে সমস্ত গরিব চাষার মধ্যে জমি বর্গা দেওয়া আছে তা ফেরৎ নেওয়া হবে। এ ছাড়া অনুকূলের আরও কিছু দফা তৈরি করল তারা।

ফিসফাস বেড়েই চলেছে। লোক সমাগম সত্যিই বেশি। গত মাসে পূর্বপাড়ার সোলেমানের বেটিকে ঠসা মোড়লের বেটা পাট ক্ষেতে ডেকে নিয়ে যাওয়াতে যে বিচার বসেছিল, তার চেয়েও মনে হয় লোক বেশি। ঠান্ডু নাপিত তার ছেলের ঘরের গম চুরি করে ধরা পড়ে যে বিচার বসেছিল, তার চেয়েও বেশি।

অবশেষে মোড়ল এল। একটা অশুদ্ধ সালাম দিয়ে বসল একধারে রাখা টেবিলের কাছের চেয়ারে। পাশে বসে থাকা পাতি মোড়লদের সাথে হাত মোসাফা করল ইঙ্গিতময় হাসির মাধ্যমে। তারাও হাসল একই ঢঙে। দু’পক্ষের হাসির মাহাত্ম্য এক।

প্রথমে কথা পাড়ল মোড়লই। বলা যেতে পারে ভূমিকা।― রাইত কইরা কোনো লাভ নাই। কদা শুরু করা যাইতে পারে। কী বুল তুমরা ? হ্যাঁ বাচক উত্তর আসতেই শুরু করল মোড়ল―শোন কবির, তুমরা যেই কাম করিজেন, তা কিন্তুক ঠিক করেননি। হামি ঘটনা কিজু কিজু শুনিজি। তা মোল্লা ভাই কিজুডা রাগিত মানুষ। রাইগলে অবশ্য মুখ খারাপ করে। আবক্তা বুলে। তবে এডা তো আর লতুন কিজু লয়। হামরা ছোটত হোনেই দেইগা আসোজি। তুমরা তার কাম করবেন না তা ভালো কদা; কিন্তু শুনোজি আরও পাঁচ কামলার দলকে মানা করিজেন। এডা কেমন কদা। একবার ভাইবা দেগলেন না, তার কত বড়ই সর্বনাশ হওজে। তুমরা বুইজতে পারোজেন না, তার প্যাটোত লাত্থি মারা মানে তুমারেও প্যাটোত লাত্থি মারা। মোড়ল আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, আরিফ মোল্লা তাকে থামিয়ে দিল।―ভাই হামাক এ্যকনা বুইলতে দাও।

তুমি তো বুলবেনই। আগে মুণ্ডলোক কিজু বুলতে দ্যাও। তুমার খালি ধরফড়ি স্বভাব। পাশে বসা এক পাতি মণ্ডল মোল্লাকে থামাতে চাইল। তবে মোল্লা থামল না।

না ভাই হামি আগে এ্যকনা বুলমু।

ঠিক আজে তাইলে তুমিই বুলো। মণ্ডল অভয় দিল।

মোল্লা মাঝামাঝি স্থানে এসে দাঁড়াল। যেন সবাই তাকে দেখতে পায়। একটা মৃদু গুঞ্জন বয়ে গেল বিচারশালায়। মোল্লা কী বলবে তা নিয়ে দু’পক্ষেরই মুখ চাওয়া চাওয়ি। মোল্লা নিশ্চয় ক্ষতিপূরণ চাইবে। একাব্বারের গালি দেবার বিচার চাইবে। চাইবার ফর্দতে অনেক কিছুই যোগ করবে মোল্লা। তবে যেভাবে মজলিস গুঞ্জরিত হয়েছিল ঠিক সেভাবেই থেমে গেল। সবাই থমকে গেল মোল্লার কথাতে। মোল্লা হাত দুটো বুকের কাছে এনে বলল―শোন, হামি খালি কবিরোক বুলোজি না। তামানোকই বুলোজি। সেদিনক্যা দুষ হামারই ছিল। তাছাড়া অতটা রাগতুন না, যুদি শালা মজিদের সাথে রাস্তাত ঝগড়া না হতো। সবাই সবার দিকে আবারও চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল। যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না তারা। বেশি অবাক হচ্ছে মোড়লেরা। কী এসব বকছে মোল্লা। সব কিছু তো শেষ হতে যাচ্ছে। গোছান দফাগুলো সব এলোমেলো হতে বসল। মোড়ল ইশারাতে একবার ডাক দিল।―মোল্লা ভাই, তুমি বস তো। কিন্তু মোল্লাই বরং মোড়লকে থামিয়ে দিয়ে আবার শুরু করল― সেদিনকার ভুলের জন্য হামি লজ্জিত। তুমরা হামাক ক্ষমা কর। হামি আসলে বিচারের ক্যানে লয়, তামানের সামনে একবার ছুটো হোমু তাই এত মানুষ ডাকিজি। তুমরা হামাক ক্ষমা কর।

মোল্লার এমন কাণ্ড দেখে সবাই যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। কেউ কাউকে কিছুই বলছে না; শুধু চাওয়া চাওয়ি করছে। এও কি সম্ভব, আরিফ মোল্লা হাতজোড় করে ক্ষমা চাচ্ছে, তাও আবার কামলাদের কাছে। যাকে সবাই সারা জীবন বদরাগী মানুষ বলে জেনেছে। তার হঠাৎ এমন পরিবর্তন! এত ছোট হওয়া তো দূরের কথা, কোনোদিন কথাতেও নতি স্বীকার করেনি সে। হেরে গিয়েও জিতেছে সবার কাছে। আজকের মোল্লা সত্যিই কি আগের মোল্লা; নাকি অন্য মোল্লা ? এমন প্রশ্নই সবার মনে। দু’একজন এও ভাবল, মোল্লার মাথা বুঝি খারাপ হয়েছে। মোল্লা এবার কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা গামছার এক প্রান্ত দুই হাতের মধ্যে নিয়ে আবারও জোড়হাত করল―তুমরা হামাক মাফ কইরা ধানডা লাগাইয়া দ্যাও। হামি নাতে বাঁচমু না। তুমরাই হামার বাপ-মাও। মোল্লা এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। দু’পক্ষের হাজার পরিকল্পনা চাপা পড়েছে অনেক আগেই। কিছুক্ষণ আগের গমগমে স্থান যেন দু’দিন আগে প্রিয়জন হারানো বাড়ি। অতীত স্মৃতি মনে করে ফুপিয়ে কান্নার যা শব্দ, তা মোল্লার। যেন সে-ই একমাত্র ব্যথিত ব্যক্তি। তারই বুকের একধার ফাঁকা হয়ে গেছে।

এবার আরও একবার অবাক হলো লোকজন, কবিরকে ঝেড়েঝুড়ে উঠে মোল্লার দিকে যেতে দেখে। সে নিশ্চয় মোল্লার গালে থাপ্পড় দিবে; নয় তো গলার গামছা ধরে টান  দিয়ে বলবে―শালা, অত ঢঙ করোজু ক্যান ? না, এবার সত্যি সত্যিই সবার চোখ ছানাবড়া হলো অথবা একটা মহামিলন দেখে খুশিতে দু’চোখ ভরে গেল। কবির মোল্লার দু’হাত চেপে ধরে বলল― দাদা, তুমিও হামারোক ক্ষমা করো। হামরাও অন্যায় করিজি। সেদিন তুমাক ওভাবে গালি দেওয়া ঠিক হয়নি। আর কুনোদিন এমন হোবে না। কালকাই তুমার ধান লাগায়া দিমু।’ দু’জন দু’জনকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। সবাই শব্দহীন হাসলেও ঐ দু’জনের চোখে পানি। চোখে পানি একাব্বরেরও। মোল্লাকে দেওয়া গালিগুলো এক এক করে মনে পড়ছে তার। সেও এগিয়ে গেল মোল্লার কাছে। দু’হাত মেলে ধরল মোল্লার দিকে তাকিয়ে।

॥ ছয় ॥

দুইদিন হলো মিনহাজ রাজশাহী এসেছে। সেঁজুর সাথে দেখা হয়নি। মিনহাজ সেঁজুতিকে ডাকে সেঁজু। সেঁজুতিও মিনহাজকে ডাকে মিনু। কাছের বন্ধুরাও ডাকে। সেঁজু বাড়ি গেছে। দিনাজপুর। আজ সকালের ট্রেনে আসবে। এসে যেখানে দেখা হবার কথা, সেখানে হবে। তারা প্রায়ই বিকালে যেখানে বসে, সেখানে। পদ্মার ধারে নির্দিষ্ট এক জায়গা আছে তাদের বসবার। যতটা নিরিবিলি ততটা পরিচ্ছন্ন। একেবারে লোকালয় না হলেও লোকজন আছে। চটপটি ফুচকাওয়ালা না থাকলেও দু-একটা বাদামওয়ালাকে দেখা যায় মাঝেমধ্যে। সেঁজু ফোনেই বলেছে, মিনু যেন বিকালে অবশ্যই সেখানে থাকে। জরুরি কথা আছে। কী এক রাজ্য জয় করে ফিরছে। পেট ফুলে উঠেছে। তার মিনুকে না বলা পর্যন্ত তা খালি হবে না।

মিনহাজ বসে আছে জায়গামতো। সেঁজুতি তখনও আসেনি। সে অবশ্য আগেই এসেছে। একাকী কিছুক্ষণ বসে থাকবে বলে। আকাশে মেঘের দৌড়া দৌড়ি অল্প হলেও আছে। ওজনহীন মেঘ। বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা সহসা নেই। ছায়া আছে। বাতাস ভেজা থাকলেও নদী থেকে উঠে আসা বাতাসে শরীর ভিজতে দেয় না। এই অদৃশ্য চামর-দোল উপভোগ করতে করতে নদীর পানিতে কী যেন ভেসে যেতে দেখল। পোড়া কাঠ। কোনো শ্মশানের উচ্ছিষ্ট হবে হয়তো। সেখানে থেকে দু’কিলো উজানে একটা শ্মশান থাকাতে এটাই মনে এলো মিনুর।

পদ্মাতে স্রোত আছে। সর্বনাশা না হলেও আছে। ঘোলা পানির স্রোত। অল্প ক’দিনেই নদীটা ভরে উঠবে, এটা তার আগাম আলামত। ডাঙাতে পানি নেই, নদীতে পানি। নয়া পানি। এটা আকাশের নয়, উজানের দেশ থেকে পালিয়ে আসা পানি। সেদিকেই তাকিয়ে আছে মিনহাজ। যদিও দেখবার মতো কিছু নেই; ঘোলা পানি আর ভাসমান খড়-কুটো ছাড়া। ঢেউ নেই, রোদের ঝিলিমিলি নেই। ঢেউয়ের ডগাকে খাপখোলা তলোয়ার মনে না হলেও মিনুর মনের মধ্যে কিছু একটা ঝিলমিল করে উঠল। ঢেউ উঠল মনে। গুনগুন করে উঠল ভেতরটা― পদ্মার ঢেউরে, মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা, যা রে .. .. । নজরুলের এই গানটা ফেরদৌসী রহমানের কণ্ঠে বারবার শুনতে ইচ্ছা করে। মিনুর প্রিয় গানের একটি। গানটা পুরোটাই গাইলো সুরে বেসুরে। এমন সময় সামনে দিয়ে দু’জন কৃষককে যেতে দেখল। তাদের পোশাক, শরীরের ফাঁকা অংশে লেগে থাকা কাদা, কাঁধে গামছা আর হাতের কৃষি উপকরণ দেখে তাই মনে হলো। তারা নদীর ওপার থেকে এলো। ওপার ঠিক নয়; চর থেকে। তাদের চোখে-মুখে দিকভ্রান্তের ছাপ। উৎকণ্ঠা কথা বলার ধরনে। মিনুর খানিক দূরে তারা দাঁড়াল। দম নিতে বোধহয়। পাতার বিড়ি ধরাল দু’জনেই। তাদের কথা শোনা যায়। একজন বলল―মুনটাই ভাইঙ্গা গ্যালো গো। মুনে কর‌্যাছিনু, এবার ভালোই হোবে। ধার-দেনা কিছু ছিল, শুধ দিব।

তাইলে আর বুলছি কী। আর সাতদিন পরে পানিটা আইসলে তাও কিছু কিছু পাতুক।

এবার বেশ গুমরা উঠ্যাছিল গো। স্বপন ধর‌্যাছিল চোখে।

এটাই নমুনা, বুঝাছো। যেবার দেখব্যা তুমার ফসল খালি বলক্যায়া যাছে, বুঝব্যা ও শালা ঠিক ডুববে। হামারঘে স্বপন ডুবাবে। সুড়সুড় কর‌্যা ঢুইক্যা পড়বে উজ্যানের পানি।

তাদের কথা আর শোনা গেল না। বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে সামনে আগালো। তবে বিড়িতে জমকালো দগদগে আগুন দেখে বোঝা যায়, এ টান দম আটকানো টান। মিনহাজের চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে উঠল আরও দুটি মুখ। আরিফ মোল্লা আর তার বাপের মুখ। একজনের মুখে হাহাকার, অন্যজনের মুখে নতুন বীজ অঙ্কুরোদ্গমের মিছিল। মিনহাজ মিলাতে পারে না, মোল্লা কেন এত ধান-কাতর। এক বছর দশবিঘা জমিন বিরান পড়ে থাকলে তার কিছুই যায় আসে না। এমনকি এক বছর আবাদ না করে বাবুগিরি করে  বসে থাকলেও না খেয়ে মরবে না। অথচ সাধারণ আউশের ধান রোপণ নিয়ে কী তুলকালাম। তুলকালাম ভেতরে, তুলকালাম বাহিরে। তার প্রেম-ভালোবাসা-স্বপ্ন, সব ঐ জমিনকে ঘিরে। বড় ফসল-পাগল মানুষ। অনেকে ঠাট্টা করে এ নিয়ে। কেউ আবার একটু ভদ্রভাবে বলে―মোল্লাজি এবার রণে ভঙ্গ দাও। অনেকই তো হলো। পশ্চিম থেকে ঘুরে আসো একবার। মোল্লা কিছু বলে না। মনে মনে হাসে।

পশ্চিম আকাশ এখন ফাঁকা। সূর্য দেখা যায়। একটা অবসাদ নিয়ে ডুবতে হচ্ছে তাকে। তেজ নেই। তবে রঙে কমতি নেই। সিঁদুরে রঙ। মিনহাজের চেনা এক মানবাধিকারকর্মীর কথা মনে হলো। মনে হলো, তার টিপ হয়ে ডুবে যাচ্ছে সূর্যটা। পঁচাত্তর পার করা সেই কর্মী যখন মিডিয়াতে বা কোনো সেমিনারে কথা বলে, তখন কথাগুলো বয়সের ধাক্কাতে কাঁপে। ঠোঁট কাঁপে, কুঁচকানো আর ঝুলে থাকা গাল কাঁপে। শুধু কাঁপে না তার  ঢাউস লাল টিপ। এখন কাঁপছে পৃথিবী; আকাশ, গাছ, নদী, মেঘ। সব। কাঁপছে না সিঁদুরে সূর্য। মিনুর হাসি পেল। একটা বাদমাওয়ালাকে কাছে দেখতে পেয়ে ডাক দিল। দশ টাকার বাদাম নিয়ে তাই খেতে লাগল আপাতত।

সেঁজুতি আসতে দেরি করছে বলে রাগ বা অভিমান তার জমেনি। বরং আরও উপভোগ্য হয়েছে সময়টা। কিছুটা ফুরফুরে লাগছে নিজেকে। দু’চারটা বাদাম খাওয়া হতেই মাথাতে ঠোকা অনুভব করল। পিছনে না তাকিয়েই বলল―বস। সেঁজু বসল ডান ধারে। চোখে মুখে একটা হালকা বিস্ময়। তবে পেছনে না তাকিয়েই বসতে বলবার জন্য নয়। এত দেরি হলো, তবুও মিনু কিছু বলল না কেন; এই ভেবে। মৃদু রাগ বা অভিমান কিছুই প্রকাশ পেল না। একটা শঙ্কা নিয়েই বসল। মনের মধ্যে এটাও রাখল―কিছু একটা অপেক্ষা করছে।

কী জনাব, কোনো কিছু উদ্ধারে বসিয়াছেন মনে হয় ? এ হেন এক সুন্দরী আসিয়া আপনার পার্শ্বদেশ আলোকিত করিল, ইহাতেও মুনিবের ধ্যান ভাঙিল না। এখন কি নৃত্য আরম্ভ করিব ? সেঁজুতি গড়গড় করে তার ডয়ালগ আবৃত্তি করল। মিনহাজ মণি ঋষির মতো হাত উত্তোলন করে বলল―তথাস্তু বৎস।

দু’জনেই শব্দ করে হেসে উঠল। মিনহাজের বাম হাতে বাদামের কয়েকটি ফল ছিল, তাই তুলে দিল সেঁজুতির হাতে। সেটাই মুখে পুরে  সাইড ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে কৃষ্ণচূড়ার কয়েকটি পাপড়ি মিনহাজের হাতে দিল। মিনহাজ কিছুটা অবাক হলো―অসময়ে একে কোথায় পেলে ?

অসময়ের বলেই তো আনলাম অর্ঘ্য দিতে। শোন, এখন সময়মতো কিছুই হয় না; বুঝলে ? শিউলিও ফোটে বর্ষাতে কিংবা হেমন্তে।  শুধু শরতের বুকেই ফোটে না।

হ্যাঁ, তা ঠিক বলেছে; কার্তিকে যেটা দেখা যেত, তা এখন ভাদ্র মাসে দেখি। মিনহাজ উদাস হবার ভানে অন্যদিকে মুখ ঘুরাল। ঠোঁটে মুখে ফুটে উঠল দুষ্টুমি রেখা।

ধ্যাৎ, কার মধ্যে কী ঢুকাও। তোমার রুচিবোধের অভাব দেখা দিচ্ছে দিন দিন। রুচি ফেরানোর একটা ডাক্তার দেখাতে হবে।

ডমপেরিডম খাওয়াও, ঠিক হয়ে যাবে। বলেই ঠোঁটটা কিঞ্চিৎ আলগা করে এগিয়ে দিল সেঁজুতির ঠোঁটের দিকে। এর বদলে সেঁজুতি তার পিঠে একটা কিল বসিয়ে দিল।

অসভ্য কোথাকার। আমি বলি কী, আর সে যায় কোন দিকে। আমি বলি শিউলির কথা আর সে বলে কুকুরের কথা। রুচিহীন কোথাকার।

এই হলো মানুষের এক স্বভাব। বাঘের বাচ্চা বল, খুব খুশি। কুকুরের বাচ্চা বল, তেড়ে আসবে। অথচ কুকুর একটা প্রভুভক্ত প্রাণী। পশুদের মধ্যে সে-ই একমাত্র প্রাণী, যে বেহেস্তে যাবে। অথচ বাঘ মাংসাশী হিংস্র প্রাণী। প্রায় সকল প্রাণীরই শত্রু।

তোমার সঙ্গে কথাতে কোনোদিন পারিনি। চেষ্টাও করব না। তবে মুডটাই নষ্ট করে দিলে। কত সুন্দর একটা ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে এলাম, তুমি তা মাটি করে  দিচ্ছ।

ঘাট হয়েছে মহারানি; আমি ভুলেই গেছিলাম, তুমি কৃষ্ণের মাথায় চড়ে এসেছ, রাধা-কীর্তন শোনাবে বলে।

মানে! আমি কিন্তু উঠে যাব।

বারে; তুমি কৃষ্ণচূড়া আনলে না, আমার জন্যে। আমি ভুল কী বললাম ?

পাজি কোথাকার। মিনহাজের আর একটা কিল বাঁকি ছিল, সেটাই পড়ল পিঠে। হাসল দু’জনেই।

শোন মিনু। এখানে এলাম ফুরফুরে মেজাজে তোমাকে একটা বিশেষ কথা বলব বলে। কিন্তু রাগিয়ে দিলে। ভাবলাম বলব না। আবার না বলে শান্তিও পাচ্ছি না। তবে ঘটনা পরে বলছি। আমার মুড অফ করে দেবার শাস্তিস্বরূপ একটা কবিতা শোনাও। তারপর অন্য কথা।

জ্বি আজ্ঞে মহারানি। মিনু কথা না বাড়িয়ে বাধ্য বালকের মতো পাঁচ লাইনের একটা কবিতা শুনিয়ে দিল; যা তার মুখস্থ ছিল :

প্রথম চুম্বন প্রথম স্বাদ

যা বাবলা আঠার

দ্বিতীয় চুম্বন মাতানো তাড়ির গাদ

তৃতীয় চুম্বন মাতালের মধুর কাতরানি

হাড়িকাঠে শায়িত পাঁঠার।

কী বলবে সেঁজু ভাষা খুঁজে পেল না। তবে কবিতার মাহাত্ম্য উদ্ধারে গেল না। তলানি পাবার সম্ভাবনা নেই। জোর করে পেতে চাইলেও পথ হারাবে। সেখানে সেঁজু পেরে উঠবে না। তাই প্রশ্ন করবার জন্যই একটা করল―তুমি কি কখনও বাবলা আঠা খেয়েছ ?

না খেলে মিলালাম কী করে ? খেয়েছি সেই ছোটবেলা। দাঁতের ফাঁকে একবার লাগলে গোটা বেলা সাবাড়

মানে গোটা বেলা চুম্বনের স্বাদ

তখন আর স্বাদ বুঝতাম। বুঝলাম তো এই হাল আমলে

বুঝেছি, আর আগাতে হবে না। এবার কবিতা থাক, আসল কথাতে আসি। শোন, এবার বাড়ি গিয়ে একটা কাণ্ড ঘটেছে।

তোমাকে দেখতে এসেছিল, নাকি পাকা কথা হয়ে গেছে একেবারে ?

ধ্যাৎতেরিকা, সবকিছুতেই ঠাট্টা। একটা সিরিয়াস কথা বলব, আর তুমি বারবার কথার মাথাতে বাড়ি দিচ্ছ। শোন, আমি কাহারোল গিয়েছিলাম।

কাহারোল! মানে যেখানে তেভাগা চত্বর আছে ?

হ্যাঁ মশাই, সেটাই। আমার বাড়ি দিনাজপুর বটে, কিন্তু কোনোদিন ঐ জায়গাতে যাইনি। এবার ঐ অপূর্ণ সাধ পূর্ণ হলো।

হঠাৎ ওখানে কেন ?

আর বোল না। আমার এক প্রতিবেশী ভাইয়ের বিয়েতে গিয়েছিলাম সেখানে। সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইনি।

কোন ভাই, যে তোমার পেছনে লাইন দিয়ে ছিল ?

আরে না না। সে নয়। একটা সিরিয়াস কথা বলছি আর তুমি ঠাট্টা করছ ?

তার মানে শঙ্কা আমার কাটল না।

আচ্ছা হয়েছে, চুপ তো।’ সেঁজু রাগল না। সে যে ঘটনাটা নিয়ে বেশ এক্সাইটেড, তা বুঝা যায়। আর সেটা মিনুকে বলবে বলে যে হিমশিম খাচ্ছে, তাও বুঝা যায় তার একমুখিনতা দেখে। মিনহাজ আর কিছু বলল না। বরং শোনার আগ্রহে নিখুঁতভাবে তাকাল তার সেঁজুর দিকে। সেঁজুর চোখে মুখে একটা ছায়াও আবিষ্কার করল। একটা দীপ্ততা। এ মুখ বাঙালি সহজাত রমণীর মুখ নয়।

তেভাগা চত্বরে একটা স্মৃতিস্তম্ভ আছে। যদিও তার ডিজাইন আমার ভালো লাগেনি। কিন্তু সেখানে আমি দেখে এসেছি জ্যান্ত স্মৃতিফলক।

জ্যান্ত স্মৃতিফলক! মিনু বিস্ময় প্রকাশ করল। তবে সে আরও বিস্মিত হলো সেঁজুর গুছিয়ে কথা বলা শুনে।

হ্যাঁ জ্যান্ত। ৯০ ছুঁই ছুঁই এক বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হলো। কথা হলো অনেকক্ষণ। প্রত্যক্ষদর্শী। সেও ছিল ঐ আন্দোলনের সাথে। মরতে মরতে বেঁচে এসেছে। গল্প করল, জোতদাররা কীভাবে একত্র হলো আর বর্গাদাররা কীভাবে একত্রিত হলো। বর্গাদার, ক্ষেতমজুররা এক হয়েছিল। সেইবার তারা ফসল তুলেছিল নিজেদের খামারে। এতে আরও ফুঁসে ওঠে জোতদাররা। এই আন্দোলন তখন ছড়িয়ে পড়েছিল বৃহত্তর দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, ২৪ পরগনা আর মেদেনীপুরে। উত্তরের জেলাগুলোতে এই আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিল রাজবংশীরা। তারা নারী-পুরুষ সবাই ছিল প্রচণ্ড লড়াকু আর জঙ্গি।

ঐ বৃদ্ধকে তুমি কোথায় পেলে ? তার বাড়ি কি সেখানেই ?

না না। তার বাড়ি দক্ষিণ দিনাজপুরের খাঁপুর।

সেখানেই তো তেভাগা আন্দোলন চরম আকার ধারণ করেছিল। সেখানেও একটা তেভাগা চত্বর আছে।

হ্যাঁ সে কথাও তিনি বললেন।

তার সন্ধান তুমি কীভাবে পেলে ?

তিনি এসেছিলেন তার আত্মীয়ের বাড়ি। আমি এক বৃদ্ধের কাছে সেই আন্দোলন সম্পর্কে জানতে চাইলে, তিনিই আমাকে নিয়ে গেলেন ঐ বৃদ্ধের  কাছে। ভাবতেই পারিনি এমন একটা লোকের সন্ধান পাব।

সেঁজুতি এমনভাবে বলছে যেন সেও সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী। দেখে বোঝা যায়, বলবার সময় তার চোয়াল দু’টি কীভাবে শক্ত হয়ে ওঠা-নামা করে। সেদিনের ক্ষোভ, না পাওয়া, কিংবা নিপীড়িত জনতার লাভা যেন বের হচ্ছে তার মুখ দিয়ে। দেখে মনে হয়, সেঁজু নিজেই অভিনয় করছে ঐ বৃদ্ধের নাম ভূমিকায়। ঘটনা শুনে মিনহাজ যতটা অবাক হয়, তার অধিক অবাক হয় তার বলার ঢঙে। অবাক হয় তেভাগা আন্দোলনের প্রতি সেঁজুর আগ্রহ দেখে। কত জীবন্ত করে বলছে এক এক করে। সেঁজুকে এমন রূপে কখনই আবিষ্কার করা হয়নি। আজ এক নতুন সেঁজুকে দেখছে। মাঝখানে কোনো কথা বলে না মিনু। সেঁজুর বলবার গতি, শেষে পথ না হারায়। সেঁজু আবার শুরু করল― ‘আমি পুরো এক ঘণ্টা রেকর্ড করেছি। মোবাইলে ছবিও নিয়েছি বেশকিছু। ট্রেনে আসবার সময় ঐ রেকর্ডটা কয়েকবার শুনেছি। নব্বই ছুঁইছুঁই মানুষটা এমনভাবে বলল, যেন সে ঐ ঘটনার মধ্যে এখনও দাঁড়িয়ে। আমাকেও দাঁড় করায় তার মধ্যে। তার আর আমার মাঝে ব্যবধান থাকে না কোনো। তেভাগার দাবি তাদের  মনে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, জোতদার আর পুলিশের আক্রমণ ঠেকাবার জন্য অগ্নি পরীক্ষা দিতেও প্রস্তুত ছিল। একই সময় রংপুর জেলার নীলফামারি মহকুমার একটি গ্রামে জোতদাররা বর্গাদারের খামার থেকে ফসল ছিনিয়ে আনতে গেলে কৃষক নেতা বাচ্চা মুন্সী এবং তৎনারায়ণ বর্মণের নেতৃত্বে হাজারও কৃষক, বর্গাদার, ক্ষেতমজুর ও সমর্থক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এখানে পুলিশের গুলিতে মারা যান রাজবংশী তৎনারায়ণ। তৎনারায়ণের মৃত্যুতে এই আন্দোলন হয়ে ওঠে চরম বেগবান। লুকিয়ে থাকা অনেক নেতা বেরিয়ে আসেন সামনে। দীনেশ লাহিড়ী ও মণিকৃষ্ণ সেন এদের অন্যতম। অবশ্য নেতাদের  মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন রাজবংশী আর মুসলমান। বড় ভূমিকা রেখেছিলেন কম্পরাম, পাস্তারাম। মেয়েদের মধ্যে জায়মণি ও ভান্দানি। এরপর দ্রুত ঘটতে থাকল একের পর এক ঘটনা। পুলিশের গুলিতে মরলেন সমীর উদ্দিন। এর প্রতিশোধ হিসেবে সাঁওতাল শিবরাম তীর ধনুক দিয়ে মারল এক পুলিশকে। অবশ্য পরে মরলেন শিবরামও। এর ক’দিন পর ঠাকুরগাঁও শহরে কৃষকের মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে পাঁচজন কৃষক মারা যান। এর কয়েকদিন পরে থুমনিয়া গ্রামে পুলিশের গুলিতে মারা যান আরও চারজন।’

যেন হাঁপিয়ে উঠেছে সেঁজুতি। একটু দম নেবার জন্য থামল। মিনহাজ এই বিরতিতে প্রবেশ করল না। বরং কাছে পানি থাকলে এক গ্লাস এগিয়ে দিত সেঁজুর দিকে। দম নিল মিনহাজও। সেও যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। টানটান উত্তেজনার হাঁপানি। চরম উত্তেজক ম্যাচ। দুই পক্ষই সমানে সমান। মিনহাজ কোন পক্ষ, তা ঠিক করতে ব্যর্থ। সে চায় দু’পক্ষই টিকে থাক। এক পক্ষ সেঁজুতির বলবার চমৎকারিত্ব; অন্যপক্ষ খাঁপুর গ্রামের সেই বৃদ্ধের নাম ভূমিকায় থাকা সেঁজুতি। উভপক্ষই সেঁজুতি। মিনহাজ নির্বাক তাকিয়ে আছে সেঁজুর চোখ মুখের দৃঢ়তায়। সেঁজুতিও আর থামল না, মিনহাজের কোনো প্রশ্নের অপেক্ষায়। তার বলার ধরনে যে কেউ বলবে, সে ইয়ারফোন লাগিয়ে কানে বাজা কথাগুলোর সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট মেলায় শুধু। মানুষ যা ভাবে ভাবুক।

মিনু এখন বিস্ময়-দিঘির কিনারে। যে দিঘির শাপলা, পদ্ম, ভাসন্ত হংস, পিটপিট করা দাড়কানির ঝাঁক, সবকিছুর সূত্র একটাই; বিস্ময়। সেঁজু-বিস্ময়। বিস্ময়-সেঁজু। সেঁজু নতুন করে প্রস্তুত হলো। তবে শুরু করল আগের গতিতে।―‘সবচেয়ে বড় আর বিষাদময় ঘটনা ঘটে খাঁপুরে। ১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। আত্মগোপনকারী কৃষকদের গ্রেফতার করতে খুব সকালে ৩ ট্রাকভর্তি পুলিশ আসে। চিয়ারসাই শেখের নেতৃত্বে গ্রামবাসী তাদের বাধা দেয়। তাদের সবার হাতে ছিল গ্রাম্য অস্ত্র। নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলমান, সবাই এই লাড়াইয়ে অংশ নিল। গুলিতে আহত হয়েও আহত বাঘের মতো চিয়ারসাই শেখ লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন। এক পর্যায়ে মারা যান তিনি। খাঁপুরে  সেদিন পুলিশ ১২১ রাউন্ড গুলি ছুড়েছিল। মারা যান ২০ জন আন্দোলনকারী। এই ঘটনার পর  পুরো এলাকা পরিণত হয় পুলিশ ক্যাম্পে। এলাকা হয়ে ওঠে জনশূন্য। কৃষকরা গ্রামছাড়া হতে বাধ্য হন। খাঁপুরের প্রিয়জন হারানো সেই পরিবারগুলোর কাছে লাশও ফেরত দেওয়া হয়নি। সবাইকে আত্রাই নদীর একটা খাড়ির মধ্যে গর্ত করে চাপা দেওয়া হয়। ঐ বৃদ্ধ শেষে হাউমাউ করে  কেঁদে উঠে বললেন―সেদিন আমিও ছিলাম চিয়ারসাই শেখের সাথে। আমার পাশেই মারা যায় সে। আমিও মৃত্যুর মুখ থেকে ঘুরে আসি।’ বৃদ্ধ আর বলতে পারেনি। তাকে সান্ত¦না দেবার ভাষা ছিল না। আর আমিও বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি তার কাছে। যদিও আমার উঠবার ইচ্ছা মোটেও ছিল না। আমাদের ফিরবার সময় হয়ে গিয়েছিল। তবে তার বর্ণনা দেবার স্টাইল আমি ভুলব না কোনোদিন।

ভুলব না তোমাকেও। একটা লম্বা শ্বাসের সঙ্গে কথাটা বেরিয়ে এলো মিনহাজের মুখ থেকে।

বুঝলাম না। চমকে উঠল সেঁজু।

বৃদ্ধ বলেছে তার দেখা ঘটনা বা তার জীবনের ঘটনা। তুমি বললে, তার মুখে শোনা কথা। অথচ কত জীবন্ত। তোমার বলবার ধরণে আমি মুগ্ধ। মনে হলো ১৯৪৭ সালের সেইদিন তুমিও ছিলে খাঁপুরে। তুমি ছিলে সেই মিছিলে, জায়মণি ও ভান্দানির মধ্যিখানে।

সেঁজুতি আর কিছু বলতে পারল না। বলল না মিনহাজও। তবে সেঁজুতির হাত দু’টো নিল তার হাতে। দু’জনেই তাকিয়ে থাকল নদীতে ভেসে যাওয়া পানাগুচ্ছের দিকে।

এভাবে কাটল কিছুটা সময়। নির্বাক দু’জনেই। সূর্যকে আর দেখা যায় না। তবে তার আলোর মোহ পদ্মাপাড় থেকে তখনও যায়নি। বরং আলোটা এখন আরও গাঢ় আরও উজ্জ্বল। সে রঙে উজ্জ্বল হয়েছে সেঁজুতির মুখও। হয়তো মিনহাজেরও। তবে কেউ কারও দিকে তাকিয়ে নেই। তাদের দৃষ্টি শূন্যতায় বিছানো। সেঁজু বারবার উঁকি দেয় খাঁপুর। মিনুও এবার আটকে গেল। আর সেই আটকে যাওয়াটা নীরবতা ভাঙল। নদীর দিকে তাকিয়েই মিনহাজ বলল―সেঁজু তুমি দেখে এলে তেভাগা চত্বর। শুনে এলো তেভাগা আন্দোলনের কথা। আমিও বোধহয় দেখে এলাম এক বড় আন্দোলন। কিংবা তার প্রস্তুতি পর্ব। খুব কাছে থেকে দেখলাম। যদিও এই আন্দোলন চিরকালীন। চলমান। অথচ এত কাছে থেকে দেখিনি কোনোদিন। হয়তো দেখবার মতো  করে তাকায়নি। এবার বাড়ি গিয়ে দেখলাম।

তুমি কী বলছ ? তোমার কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝতে পারছি না।

হ্যাঁ, সংগ্রাম। এই সংগ্রাম চলমান। ১৯৪৭-এ এর শুরু নয়। এ সংগ্রাম পৃথিবীর সংগ্রাম। সময় সময় যা একটু ধরন বদলায়।

কী সব বলছ? তোমাকে কেমন যেন লাগছে। মিনুকে হঠাৎ করে কিছুটা অচেনা মনে হচ্ছে সেঁজুর। সে তাকিয়ে থাকল তার দিকে। শোন সেঁজু, তুমি শুনে এলে কম্পরাম, পাস্তারাম, সমীর উদ্দিনের কথা। শুনে এলে জায়মণি, ভান্দানির কথা। আর আমি দেখে এলাম আরিফ মোল্লা, কবির, একাব্বরকে। আমার আব্বা সুরমানকে। তাদের সংগ্রামকে। টিকে থাকাকে।

হেঁয়ালী না করে আসল কথাটা বল। কী দেখে এলে ? মিনুকে বেশ বড় আর গম্ভীর মনে হলো সেঁজুর। বয়সে, জ্ঞানে। কথা বলার ধরনটাও আলাদা। মিনু তাকাল সেঁজুর দিকে। চোখে চোখ রেখে থাকল কিছুক্ষণ। সেঁজুর অস্থিরতা যে বেড়েছে, তা বুঝতে পারে স্পষ্ট। সে বলতে লাগল সব। এক এক করে বলে চলে সমস্ত ঘটনা। এই ক’দিনে আরিফ মোল্লাকে নিয়ে তার এলাকাতে ঘটে যাওয়া সব বলল এক এক করে। বলল তার বাপের কথাও। সেঁজু তার বলা পথে বাগড়া দেয়নি। নির্বাক শুনে গেল সব। মিনু থামলে সেঁজু ছোট করে বলল―‘আন্দোলন বদলে গেছে। উল্টো সব। মিনু কিছু বলল না। তাকাল সেঁজুর দিকে। কী যেন জিজ্ঞাসা করছে ভেবে সেঁজু আবার বলল― শোন, তখন জোতদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল মজুর বর্গাদাররা। এখন নামছে ক্ষেতমজুরদের বিরুদ্ধে জোতদাররা।

কথাটা মন্দ বলোনি। তবে দুই বিষয়টা এক করা যাবে না। আসলে বর্তমানের কথিত জোতদার মানে মধ্যবিত্তরা বড় বিপদে আছে। বলতে পার জিম্মি। তাদের ক্ষেত-ফসলকে না পারছে ফেলে দিতে, না পরছে ধরে রাখতে। জমিন ফাঁকা রাখতে পারে না, আবার ফসল তোলার পর শূন্যতাও ফুরায় না। খরচের টাকা উঠে আসে না ফসল বেচলে। কিন্তু উপায় নেই, এ ঘানি টানতেই হবে।

একই অবস্থা আমাদের দিকেও। বোধ হয় বেশিই। এবার তো আমার এক ফুপাতো ভাই তাজেল মরা মরল।

এ আবার কেমন মরা ? কপালে ভাঁজ পড়ল মিনুর।

হ্যাঁ গো, রূপবান যাত্রাপালার তাজেলের মতো। তাড়াতাড়ি বড়লোক হবার আশায় ভাই ৫০০ বস্তা আলু কোল্ডস্টোরে রেখেছিল। অবশেষে আলু আর তোলা হয়নি বেচারার।

মানে ?

তুলবে কী করে। আলু বেচে তো স্টোরের ভাড়াই জুটবে না। আলু আর তুলতে যায়নি সে।

দু’জনেই হেসে উঠল। তখন সন্ধ্যা কিছুটা পেরিয়ে গেছে। লাফ দিয়ে উঠল দু’জনে।―চল পালায়; দেরিই হয়ে গেল। আর একটু আগে ওঠা উচিত ছিল।’ সেঁজু কথাগুলো বলতে বলতে সাইড ব্যাগ কাঁধে ঢুকালো। দু’জনে হাঁটা দিল হাত ধরে। শহর রক্ষা বাঁধের ওপর উঠতেই দেখতে পেল, দেরি শুধু তাদেরই হয়নি; অনেকেরই হয়েছে। কোনো কোনো যুগলের কথা বা দেওয়া-নেওয়া গোটা বেলায়ও শেষ হয়নি। সেই আক্ষেপ ঢালছে কেউ কেউ; গায়ে ঢলে পড়বার মাধ্যমে। রসহীন বা অতি ভদ্রগোছেরা বিরক্ত হবার ভান করে, তাদের এগুলো দেখে। মুখে বিরক্তির শব্দ। মিনু-সেঁজু মূল রাস্তায় উঠে রিকশা নিল। রাস্তার দু’ধারে তখন জ্বলে উঠেছে সৌরবিদ্যুতের আলো। সিটি কর্পোরেশন সারা শহরে এখন এই ব্যবস্থা করেছে। সৌরবিদ্যুতের আলোতে সুন্দরকে আরও সুন্দর করার জাদু আছে। শহর রক্ষা বাঁধের ধার দিয়ে রাস্তা। বাঁধের ঢালে লাগানো চেরি, ভেলভেট, রং বেরঙের ফুল। এই আলোতে তাদের সৌন্দর্য ঠিকরে পড়ে। মিনহাজ তাকিয়ে আছে সেদিকে। সেঁজুতি তাকিয়ে আছে মিনহাজের মুখের দিকে। রিকশায় খানিক এগোতেই সেঁজু বলল―

একটা কথা বলব। তবে ভয়ে না নির্ভয়ে বলব বুঝতে পারছি না। কথাটা শেষ করে মিনুর বাম বাহুর মধ্যে তার ডান বাহু ঢুকিয়ে স্কাউটের গেরোর মতো বেঁধে বসাটা টাইট করল। বলা যায় নির্ভয়তা পাবার গেরো। তবে সেঁজুকে আর কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে মিনু বাঁধের দিকে তাকিয়েই বলল―সেদিন ফোনে ওভাবে বলা ঠিক হয়নি।’ মিনু খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল কথাটা। যেন সে জানত, সেঁজু এ সময় এ কথাটাই বলবে। আর তা শুনবার অপেক্ষাতেই ছিল।

না আমি ভাবতেই পারিনি, আঙ্কেল ফোনটা ধরবেন।

ভাবা উচিত ছিল। কেন তুমি ভাববে, আমি টয়লেটে গেলে, পানির মধ্যে ডুব মারলেও ফোনটা আমার কোমরে গোঁজা থাকবে ?’ সেঁজু কোনো উত্তর দিল না। তবে বাহু-গেরো আলগা হয়েছে ততক্ষণে। তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মেয়ে, অথচ ভাববে স্কুলের বারান্দা না টপকানো বাল্য-বিবাহ পার করা তিন সন্তানের জননীর মতো; তা তো হবে না।

আচ্ছা ডিয়ার, ঘাট হয়েছে। এই কান ধরছি। আর অমন ভুল হবে না। তুমি বাড়ি গেলে ভুলেও ফোন দিব না। হলো তো ?’ সেঁজু দু’হাতে কান ধরল।

এই তো এক ধাপ বেশি বুঝলে। শোন, ফোন করলে ভালো কথা, কিন্তু নেকিয়ে বলবার কী দরকার ছিল, কবি সাহেব, গ্রামে গেলে আর আসতে মন চায় না।

ও সেই কথা, আঙ্কেল তোমাকে বলেছে বুঝি ?

না, তা নয়। তবে যেই-ই বলুক না। তুমি আমাকে কবি বলাতে আব্বার মনে একটা ভয় কাজ করেছে।

মানে! সেঁজু চমকে উঠল।

হ্যাঁ। আব্বা কবি মানে বোঝেনি। বুঝেছে, কবি হলো একটা লোকের নাম। আব্বা এটাও মনে করেছে, আমি শহরে এসে নাম বদলিয়ে কবি হয়েছি। হেসে উঠল সেঁজু। গা লাগা হলো আবার। বলল―এটা মনে হবার কারণ কী ?

শোন আমার আব্বা লেখাপড়া তেমন জানে না। বড় সহজ সরল মানুষ। তবে সে শুনেছে অনেক ছেলে-মেয়ে শহরে পড়তে এসে নাম বদলিয়ে যত খারাপ কাজ করে। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনে নাম লেখায়। কাঁচা টাকার লোভে চোরা কারবারি হয়; মাদক ব্যবসায়ী হয়। প্রতিবার বাড়িতে গেলে আব্বার একই কথা; বাপ আমার ভালো হয়া থাকবা, পড়াশোনা করে একটা ভালো মানুষ হবা, আর লাগবে না আমার।

আঙ্কেলের এমন ধারণা করাটা ভুল নয়। আসলে ভুলটা আমারই। সেদিন ওভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি। ওপাশে কে ফোন ধরল, আগে তা জানা উচিত ছিল। হ্যালো না বলে একটা সালাম দিলেই ওপাশের জবাবে বোঝা যেত, কে ফোন ধরেছে।’ সেঁজুর চোখে মুখে একটা অপরাধীর ছায়া পড়ল।

আচ্ছা থাক ওসব। শোন সেঁজু, তুমি তো কাহারোল গিয়ে ‘তেভাগা’র অনেককিছু জেনে ফেলেছ। এবার একটা আর্টিকেল লিখে ফেল। তোমার বর্ণনা শুনেই বুঝে গেছি, তোমার মধ্যে এ বিষয়ে একটা প্রবন্ধের ছক অলরেডি অঙ্কিত হয়ে গেছে। এখন লিখতে যা দেরি। দু-একদিন লাইব্রেরিতে যেও; তা হলেই হবে। সেখানে তেভাগার ওপর, কৃষক আন্দোলনের ওপর কিছু বই আছে। কোনো সহযোগিতা লাগলে আমাকে বল।

আমার গুরুর আশীর্বাদ থাকলে, অসাধ্য থাকবে না কিছু আর। বর দাও গুরু। এই বলে মিনুর ডান হাতটা তুলে নিয়ে নিজের মাথার ওপর রাখল। রিকশা ততক্ষণে মুন্নুজান হলের কাছে চলে এসেছে। সেঁজু সেখানেই থাকে। নামল দু’জনেই।

[চলবে]

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares