লেখক বঙ্গবন্ধু : শামসুজ্জামান খান

ক্রোড়পত্র : বঙ্গবন্ধুর সাহিত্যসত্তা

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে দুটি বই। বই দুটির লেখক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বই দুটির নাম যথাক্রমে অসমাপ্ত আত্মজীবনী (২০১২) এবং কারাগারের রোজনামচা (২০১৭)। বই দু’খানি বাংলাদেশের প্রকাশনা ও বই বিক্রির ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ইতোমধ্যে অসমাপ্ত আত্মজীবনীর লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়েছে এবং কারাগারের রোজনামচা বইটিও এক বছরের কম সময়ের মধ্যে ৭০ হাজার কপি নিঃশেষিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রকাশনার ইতিহাসে আর কোনো রচনা এমন বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি। আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এ এক নতুন ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাসমৃদ্ধ বই হলেও তাঁর ভাষার গাঁথুনি আকর্ষণীয় এবং বেশ প্রাঞ্জল। যেমন :

‘আমার জন্ম হয় এই টুঙ্গিপাড়া শেখ বংশে। শেখ বোরহানউদ্দিন নামে এক ধার্মিক পুরুষ এই বংশের গোড়াপত্তন করেছেন বহুদিন পূর্বে। শেখ বংশের যে একদিন সুদিন ছিল তার প্রমাণস্বরূপ মোগল আমলের ছোট ছোট ইটের দ্বারা তৈরি চকমিলান দালানগুলো আজও আমাদের বাড়ির শ্রীবৃদ্ধি করে আছে। বাড়ির চার ভিটায় চারটা দালান। বাড়ির ভিতরে প্রবেশের একটা মাত্র দরজা, যা আমরাও ছোট সময় দেখেছি বিরাট একটা কাঠের কপাট দিয়ে বন্ধ করা যেত। একটা দালানে আমার এক দাদা থাকতেন। এক দালানে আমার এক মামা আজও কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন। আর একটা দালান ভেঙে পড়েছে, যেখানে বিষাক্ত সর্পকুল দয়া করে আশ্রয় নিয়েছে। এই সকল দালান চুনকাম করার ক্ষমতা আজ তাদের অনেকেরই নেই। এই বংশের অনেকেই এখন এ বাড়ির চারপাশে টিনের ঘরে বাস করেন। আমি এই টিনের ঘরের এক ঘরেই জন্মগ্রহণ করি’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-৩)।

বঙ্গবন্ধুর রচনায় কোনো অতিরঞ্জন বা কল্পকাহিনির বিবরণ নেই। সে বিষয়টি তাঁর উপযুক্ত রচনাংশ এবং নিম্নোক্ত লেখা থেকে বোঝা যায় :

‘১৯৩৮ সালের ঘটনা। শেরে বাংলা তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং সোহ্রাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। তাঁরা গোপালগঞ্জে আসবেন। বিরাট সভার আয়োজন করা হয়েছে। এগজিবিশন হবে ঠিক হয়েছে। বাংলার এই দুই নেতা এক সাথে গোপালগঞ্জে আসবেন। মুসলমানদের মধ্যে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হলো। স্কুলের ছাত্র আমরা তখন। আগেই বলেছি আমার বয়স একটু বেশি, তাই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করার ভার পড়ল আমার ওপর। … হক সাহেব ও শহীদ সাহেব এলেন, সভা হলো। এগজিবিশন উদ্বোধন করলেন। শান্তিপূর্ণভাবে সবকিছু হয়ে গেল। হক সাহেব পাবলিক হল দেখতে গেলেন। আর শহীদ সাহেব গেলেন মিশন স্কুল দেখতে। আমি মিশন স্কুলের ছাত্র। তাই তাঁকে সংবর্ধনা দিলাম। তিনি স্কুল পরিদর্শন করে হঁাঁটতে হাঁটতে লঞ্চের দিকে চললেন, আমিও সাথে সাথে চললাম। তিনি ভাঙা ভাঙা বাংলায় আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করছিলেন, আর আমি উত্তর দিচ্ছিলাম। আমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার নাম এবং বাড়ি কোথায়। একজন সরকারি কর্মচারী আমার বংশের কথা বলে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি আমাকে ডেকে নিলেন খুব কাছে, আদর করলেন এবং বললেন, ‘তোমাদের এখানে মুসলিম লীগ করা হয় নাই?’ বললাম, ‘কোনো প্রতিষ্ঠান নাই। মুসলিম ছাত্রলীগও নাই।’ তিনি আর কিছুই বললেন না, শুধু নোটবুক বের করে আমার নাম ও ঠিকানা লিখে নিলেন। কিছুদিন পর আমি একটা চিঠি পেলাম, তাতে তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন এবং লিখেছেন কলকাতা গেলে যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করি। আমিও তাঁর চিঠির উত্তর দিলাম। এইভাবে মাঝে মাঝে চিঠিও দিতাম’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-১১)।

এই বিবরণটির গুরুত্ব এখানে যে ইতোপূর্বে নানা লেখাজোখায় জেনেছি, এই স্কুলছাত্র শেখ মুজিব হক সাহেব এবং সোহ্রাওয়ার্দী সাহেব গোপালগঞ্জ থেকে ফিরে যাবার সময় তাঁদের পথ রোধ করে দাঁড়ান এবং বলেন, আমাদের স্কুলের টিনের চাল ভেঙে গেছে। এগুলো ঠিক করে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। এই মিথ ভেঙে দিয়ে শেখ সাহেব প্রকৃত ঘটনাটিরই একটি পূর্ণ বিবরণ তাঁর বইয়ে যুক্ত করেছেন। নিজেকে কোনোভাবেই বাড়িয়ে দেখানোর বা অতিরঞ্জনের প্রবণতা তাঁর লেখায় দেখা যায় না। এই সত্যনিষ্ঠাই তাঁর লেখালেখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

দুই

পৃথিবীর প্রত্যেক ইতিহাস সৃষ্টিকারী রাষ্ট্রনায়কই মূলত লেখক, দার্শনিক বা চিন্তক; তা না হলে তিনি শুধুই রাজনীতিক মাত্র। ফলে সংস্কৃতিমনস্কতা তাঁদের ব্যক্তিত্ব গঠনে মৌলিক ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রাচীনকাল থেকেই যেসব রাজনৈতিক নেতা রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি এবং রাষ্ট্রদর্শন ও মানবিকতার আদর্শগত তাত্ত্বিকতায় বুৎপত্তি অর্জন করেছেন তাঁরা লেখক, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তানায়ক হিসেবেও খ্যাতি লাভ করেছেন। প্রাচীন এথেন্সের রাষ্ট্রনায়ক পেরিক্লিস থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন, থমাস জেফারসন, আব্রাহাম লিংকন, ইংল্যান্ডের উইনস্টোন চার্চিল, ভারতের মহাত্মা গান্ধী এবং পণ্ডিত নেহেরু বা সেনেগালের সেংঘর বা দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা এঁরা সকলেই খ্যাতকীর্তি রাষ্ট্রনায়ক, স্বাধীনতাসংগ্রামী বা মানবতাবাদী লেখক-দার্শনিক এবং সংস্কৃতিতাত্ত্বিক ও ইতিহাস ব্যাখ্যাতা। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার নায়ক মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন বা মাওসেতুং, হোচিমিনও তেমনি। অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয়, আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও এঁদের ধারায় নিজেকে বিন্যস্ত করেছিলেন। তাঁরও এঁদের মতো একটি স্বকীয় রাষ্ট্রদর্শন ছিল, উপনিবেশ উত্তরকালে নতুন ধরনের কর্তৃত্ববাদী ও আধা ঔপনিবেশিক ধাঁচের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের রণনীতি ও কৌশল ছিল। এবং সে বিষয়ে তাঁর নিরন্তর সারাদেশব্যাপী জনসংযোগ, অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা প্রদান, সুচিন্তিত অমোঘ কর্মসূচি ঘোষণা এবং দীর্ঘ কারাবরণ ও নির্যাতন সহ্য করে দেশকে স্বাধীন করার গৌরবময় ইতিহাস আছে। সেই দীর্ঘ কারাবরণ-কালকেও তিনি অপচয়ে যেতে দেননি। অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে লিখেছেন তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (২০১২), কারাগারের রোজনামচা (২০১৭) এবং নয়াচীন ভ্রমণ শীর্ষক প্রকাশিতব্য ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা ও আগরতলা মামলার বিবরণসমৃদ্ধ রচনা। এই লেখালেখির ফলে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার মহান নেতা মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত নেহেরু প্রমুখের মতো নিজেকে ভিন্নতর উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর মানস-নির্মিতির ধারাবাহিক ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, তরুণ রাজনৈতিক কর্মী শেখ মুজিব ১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জ সফরে আসা তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ. কে ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। সেই সূত্রে কলকাতায় তাঁর ছাত্রজীবনে সোহ্রাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিমের নেতৃত্বে কাজ করার যে সুযোগ প্রতিভাবান, অঙ্গীকারদীপ্ত ও নিষ্ঠাবান শেখ মুজিবের ঘটে তার বহুমুখী গুরুত্ব ও তাৎপর্য আছে। বঙ্গবন্ধু এ বিষয়ে লিখছেন :

‘এই সময়ে আবুল হাশিম সাহেব মুসলিম লীগ কর্মীদের মধ্যে একটা নতুন প্রেরণা সৃষ্টি করেন এবং নতুনভাবে যুক্তিতর্ক দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করতেন যে পাকিস্তানের দাবি হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দু মুসলমানের মিলনের জন্য এবং দুই ভাই যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সুখে বাস করতে পারে তারই জন্য। তিনি আমাদের কিছু সংখ্যক কর্মীকে বেছে নিয়েছিলেন, তাদের নিয়ে রাতে আলোচনা সভা করতেন মুসলিম লীগ অফিসে। …হাশিম সাহেব আমাদের বললেন, একটা লাইব্রেরি করতে হবে, তোমাদের লেখাপড়া করতে হবে’ (পৃ.-২৪ অসমাপ্ত আত্মীজীবনী)। হাশিম সাহেব ছিলেন মওলানা আজাদ সোবহানীর ভক্ত। তিনি বিখ্যাত ফিলোসফার ছিলেন। মওলানা আজাদ সোবহানী সাহেবকে হাশিম সাহেব আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন কলকাতায়। আমাদের নিয়ে তিনি ক্লাস করেছিলেন (প্রাগুক্ত গ্রন্থ পৃ-৪১)।

সোহ্রাওয়ার্দী সাহেবের ঘনিষ্ঠ শিষ্য হওয়ার সুবাদে তৎকালীন উপনিবেশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের শীর্ষ নেতা মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে যেমন তাঁর সাক্ষাতের সুযোগ ঘটে, তেমনি সাহিত্য ও সংস্কৃতি-ক্ষেত্রের শীর্ষ পুরুষ কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির এবং অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ প্রমুখের সঙ্গেও পরিচয় ঘটে।

বিখ্যাত রাজনীতিবিদ এবং সাহিত্যিকদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জীবনের প্রথম পর্বে যে সম্পর্ক ঘটে তা তাঁর রাজনৈতিক জীবন গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে বলে আমরা মনে করি। পরবর্তী জীবনে এ. কে ফজলুল হকের সঙ্গে পরিচয় এবং তাঁর মন্ত্রিসভায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ফজলুল হকের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্থাপনের যে সহজাত প্রবণতা বাংলার রাজনীতির সেই মূল ধারাটিকেই বঙ্গবন্ধু আরও বিকশিত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। অন্যদিকে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক তাঁকে পশ্চিমি গণতন্ত্রের ধারারও সমর্থকে পরিণত করে। শুধুমাত্র এই দুটি ধারা নয়, কলকাতায় আবুল হাশিম এবং ঢাকায় মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে রাজনীতি করার সুবাদে বামপন্থি এবং সমাজতান্ত্রিক ধারার প্রতিও তাঁর আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। ফলত এই তিনটি ধারার সমন্বয় সাধন করেই বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত করেন। অন্যপক্ষে, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রের বিশিষ্টজনের সঙ্গে তাঁর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সখ্যের সুবাদে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে সংস্কৃতিরও সমন্বয় ঘটে। উদাহরণস্বরূপ তাঁর লেখা থেকে একটা অংশ উদ্ধৃত করছি :

‘একটা ঘটনার দিন-তারিখ আমার মনে নাই, ১৯৪১ সালের মধ্যেই হবে, ফরিদপুর ছাত্রলীগের জেলা কনফারেন্স, শিক্ষাবিদদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁরা হলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, ইব্রাহীম খাঁ সাহেব। সে সভা আমাদের করতে দিল না, ১৪৪ ধারা জারি করল। কনফারেন্স করলাম হুমায়ুন কবির সাহেবের বাড়িতে। কাজী নজরুল ইসলাম সাহেব গান শোনালেন। আমরা বললাম, এই কনফারেন্সে রাজনীতি আলোচনা হবে না। শিক্ষা ও ছাত্রদের কর্তব্য সম্বন্ধে বক্তৃতা হবে।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা- ১৫-১৬)

তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান যে সংস্কৃতি-ক্ষেত্রের বাস্তব কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হয়েছিলেন তারও প্রমাণ আছে। তিনি যখন সোহ্রাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিম সাহেবের সঙ্গে মুসলিম লীগের প্রগতিশীল গ্রুপের সঙ্গে কাজ করছিলেন তখন তাঁদের নতুন ও গণমুখী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রচার ও প্রকাশের লক্ষ্যে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন :

‘হাশিম সাহেব নিজেই সম্পাদক হলেন এবং কাগজ বের হলো। আমরা অনেক কর্মীই রাস্তায় হকারী করে কাগজ বিক্রি করতে শুরু করলাম। কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস সাহেবই কাগজের লেখাপড়ার ভার নিলেন। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর যথেষ্ট নাম ছিল। ব্যবহারও অমায়িক ছিল। সমস্ত বাংলাদেশেই আমাদের প্রতিনিধি ছিল। তারা কাগজ চালাতে শুরু করলেন। বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের কাছে কাগজটা খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করতে লাগল। হিন্দুদের মধ্যেও অনেকে কাগজটা পড়তেন। এর নাম ছিল মিল্লাত।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-৪০)

 উপর্যুক্ত দুটি ঘটনা থেকে বোঝা যায় তরুণ বয়সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে একটি সংস্কৃতিচেতন মন ও সাহিত্যিক সত্তা গড়ে ওঠে। স্মর্তব্য, বিশিষ্ট লেখক ও বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সার, সরদার ফজলুল করিম ও মুনীর চৌধুরী প্রমুখ তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।

তিন

বঙ্গবন্ধু বেঁচেছিলেন মাত্র ৫৪ বছর। এর মধ্যে এক যুগেরও বেশি সময় কেটেছে তাঁর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের এই মতো নানা ধরনের অত্যাচারও এই আপসহীন নেতার মনোবল ভাঙতে পারেনি। জেল জীবনকেও তিনি অত্যন্ত সৃষ্টিশীলভাবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর রচনাসমূহ জেল জীবনেরই সৃষ্টি। এ ছাড়া তিনি তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ কারাগারের রোজনামচায় জেলের নানা পরিভাষা, রীতি-কেতা নিয়মকানুন যে অভিনিবেশ, অনুপুঙ্খতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বর্ণনা করেছেন আর কোনো কারা-সাহিত্যেই তার বিবরণ মেলা ভার। জেলের দুঃখ-কষ্টের কথা বলেছেন, তাঁর মধ্যেই আবার বাগান করা, দুটো হলুদ পাখির সঙ্গে তার সখ্যের গল্প বলা, রান্না করা, অন্য রাজবন্দিদের খোঁজখবর নেওয়া এবং বিভিন্ন মেয়াদের অন্য কয়েদিদের স্বভাব, আচরণের যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিবরণ তুলে এনেছেন তা আমাদের বিস্মিত করে।

আমরা উপর্যুক্ত বইয়ের কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করি। জেলের নিয়মকানুনের মধ্যে নানা রকম দফা আছে, সে সব দফার নাম আমরা অনেকে জীবনেও শুনিনি। যেমন, রাইটার দফা, চৌকি দফা, জলভরি দফা, ঝাড়ু দফা, বন্দুক দফা, পাগল দফা, শয়তানের কল, ডালচাকি দফা, ছোকরা দফা ইত্যাদি। এর কিছু কিছু দফার নাম শুনে বিষয় হয়তো অনুমান করা যায়। কিন্তু বন্দুক দফা, শয়তানের কল, ডালচাকি এসব দফার বিষয়ে অনুমান করাও কঠিন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বন্দুক দফার কথা। বঙ্গবন্ধু এই দফা সম্পর্কে তাঁর লেখায় বলেছেন :

‘আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারেন বন্দুক দফা কেন বলা হয়? একটা গল্প আছে এর পেছনে। বাঁশ দিয়ে কাঁধে নিয়ে টিনে করে পায়খানার ময়লা দূরে নিয়ে লাল গাড়িতে ফেলতে হয়। তাই টিন ঘাড়ে করে টানতে টানতে দাগ হয়ে যায়। একজন কয়েদি মেথর দফায় কাজ করতে করতে তার কাঁধে দাগ হয়ে যায়। একবার তার ভাইরা তাকে দেখতে এসে কাঁধের দাগ দেখে জিজ্ঞাসা করে দাগ কিসের, তার উত্তরে মেথর কয়েদিটা বলে ‘আমি বন্দুক দফায় জেলখানায় কাজ করি, সিপাহি সাহেবদের বন্দুক আমার বহন করে বেড়াতে হয়। তাই দাগ পড়ে গেছে।’ সেই হতে এই দফার নাম বন্দুক দফা’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা-৩৩)।

জেলে এই ধরনের আজব সব দফা ছাড়াও মজার কিছু পরিভাষা আছে, যেমন, কেসটাকোল। বঙ্গবন্ধু তাঁর বইয়ে বলেছেন :

‘শাহাবুদ্দিনকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেসটাকোল কী রে ভাই? ও তো হেসেই অস্থির। আমাকে বলল, দেখেন তো ইংরেজি ডিকশনারিতে আছে নাকি। আমি বললাম জীবনে তো শুনি নাই, থাকতেও পারে। ইংরেজি তো খুব ভালো জানি না। পুরনো ডিভিশন কয়েদিরা সকলেই হাসে। আমি তো আহাম্মক বনে গেলাম, ব্যাপার কী! পরে হাসতে হাসতে বলল, কেস ফাইল, কেস টেবিল, কেসটাকোল। কয়েদিরা একে এই নাম বলে ডাকে’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা-৩১)।

এই রকম আরও অনেক মজার বিষয় আছে এ বইয়ে।

বঙ্গবন্ধু জেলে প্রচুর পড়াশোনা করতেন। আর প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে পড়তেন খবরের কাগজ। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিশ^ ক্লাসিকসও তিনি জেলে অবস্থানকালে পড়েছেন। একটা জায়গায় বলছেন তিনি :

‘ঘরে এসে বই পড়তে আরম্ভ করলাম। এমিল জোলার তেরেসা রেকুইনে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনটা চরিত্র জোলা তাঁর লেখার ভিতর দিয়ে। এই বইয়ের ভিতর কাটিয়ে দিলাম দুই তিন ঘণ্টা সময়’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা-১০১)।

আমাদের দেশের লেখকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ছাড়াও সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, শওকত ওসমান, শহীদুল্লা কায়সার প্রমুখের লেখাও ছিল তাঁর খুব প্রিয়। প্রতিদিন অত্যন্ত যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী প্রমুখ বিখ্যাত সাংবাদিকদের রাজনৈতিক কলাম পড়তেন। সেইসঙ্গে পড়তেন ইতিহাস এবং বিপ্লবী সাহিত্য। তিনি বলছেন, ‘১৭৮৯ সালের ১২ জুলাই ফরাসি দেশে শুরু হয় বিপ্লব। প্যারি নগরীর জনসাধারণ সাম্য, মৈত্রী, ও স্বাধীনতার পতাকা হাতে সামনে এগিয়ে যায় এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা করে। ১৪ জুলাই বাস্তিল কারাগার ভেঙে রাজবন্দিদের মুক্ত করে এবং রাজতন্ত্র ধ্বংস করে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৭ বৎসর পরেও এই দিনটি শুধু ফ্রান্সের জনসাধারণই শ্রদ্ধার সাথে উদ্যাপন করে না, দুনিয়ার গণতন্ত্রে বিশ^াসী জনসাধারণও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা-১৬১)। ১৫ জুলাই ১৯৬৬-’র রোজনামচায় তিনি তাঁর জেল জীবনের একটি নিষ্ঠুর চিত্র তুলে ধরেছেন এভাবে :

‘কি ব্যাপার, আমি যে ঘরে থাকি তা মাপামাপি করছে কেন? চল্লিশ ফুট লম্বা, চার ফুট চওড়া, কয়টা জানালা, কয়টা দরজা সব কিছু লিখে নিতেছে জমাদার সাহেব। বললাম, ব্যাপার কি? সরকার জানতে চেয়েছে? আরও একটু লিখে নেন না কেন, দক্ষিণ দিকে ছয়টা জানলা, কিন্তু তার এক হাত দূরে চৌদ্দ ফুট উঁচু দেওয়াল, বাতাস শত চেষ্টা করেও ঢুকতে পারে না আমার ঘরে। জানলা নিচে, দেওয়াল খুব উঁচু। উত্তর হলো, ও সব লেখা চলবে না। লেখুন না আর একটুÑদেওয়ালের অন্য দিকে গরুর ঘর, পূর্বদিকে পনের ফিট দেওয়াল ও নূতন বিশ। ভয়ানক প্রকৃতির লোকÑযারা জেল ভেঙে দুই একবার পালাইয়াছে তাদের রেখেছিল এখানে। আর উত্তর দিকে ৪০ সেল, সেখানে ৪০ পাগলকে রেখেছে। আর পশ্চিম দিকে একটু দূরেই ৬ সেল ও ৭ সেল, যেখানে সরকার  ফেরারী আসামি রেখেছেন। আর এরই মধ্যে ‘শেখ সাহেব’। তিনি বললেন ‘ও বাত হামলোক নেহী লেখ্নে ছাকতা হায়, নকরি নেহি রহে গা’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা-১৬৩)।

সহজ, সরল ও আকষর্ণীয় গদ্যে তিনি তাঁর জেল জীবনের চর্চার নান্দনিক অভ্যাসের কথা বলেছেন এভাবে :

ক.          ‘দুপুরের দিকে সূর্য মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে শুরু করেছে। রৌদ্র একটু উঠবে বলে মনে হয়। বৃষ্টি আর ভালো লাগছে না। একটা উপকার হয়েছে আমার দুর্বার বাগানটার। ছোট মাঠটা সবুজ হয়ে উঠেছে। সবুজ ঘাসগুলো বাতাসের তালে তালে নাচতে থাকে। চমৎকার লাগে, যেই আসে আমার বাগানের দিকে একবার না তাকিয়ে যেতে পারে না। বাজে গাছগুলো আমি নিজেই তুলে ফেলি। আগাছাগুলোকে আমার বড় ভয়, এগুলো না তুললে আসল গাছগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন আমাদের দেশের পরগাছা রাজনীতিবিদ যারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক তাদের ধ্বংস করে এবং করতে চেষ্টা করে।’ (কারাগারের রোজনামচা পৃ-১১৭)

খ.           আমার ঘরের দরজার কাছে একটা কামিনী ও একটি শেফালী গাছ। কামিনী যখন ফুল দেয় আমার ঘরটা ফুলের গন্ধে ভরে যাবে। একটু দূরেই দুইটা আম আর একটি লেবু গাছ। বৃষ্টি পেয়ে গাছের সবুজ পাতাগুলো যেন আরও সবুজ আরও সুন্দর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বড় ভালো লাগল দেখায়। পৃ. ১১৯

বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা হলেও তাঁর মতো করে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং বিশ^ শান্তি আন্দোলনেরও একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। পাকিস্তান আমলের প্রথমদিকে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান শান্তি কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন আতাউর রহমান খান। বঙ্গবন্ধু বলছেন :

‘আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই এই আমাদের স্লোগান।’ এরপর লিখছেন, ‘সেপ্টেম্বর মাসের ১৬/১৭ তারিখ খবর এলো দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিনিধিরা শান্তি সম্মেলনে যোগদান করবে। আমাদেরও যেতে হবে পিকিং এ, দাওয়াত এসেছে। সমস্ত পাকিস্তান থেকে ত্রিশজন আমন্ত্রিত। পূর্ব বাংলার ভাগে পড়েছে মাত্র পাঁচজন। আতাউর রহমান খান, ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, উর্দু লেখক [ইবনে] ইউসুফ হাসান ও আমি’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-২২১)।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, প্রথম বই অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তাঁর শান্তি সম্মেলনে চীন সফরের (১৯৪৯) একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বইয়ের পাণ্ডুলিপি রচনা করে গেছেন। বইটি দ্রুতই বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হবে। এ বইয়ের কিছু অংশ :

‘শান্তি সম্মেলন শুরু হলো। প্রথমেই অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ম্যাডাম সান ইয়াৎ-সেন তাঁর বক্তৃতা পড়ে শোনালেন। নয়াচীনের পিতা সান ইয়াৎ-সেনের নাম আপনারা জানেন, যিনি দেশকে পরাধীনতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করেন। বিদেশিদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু গড়ে যেতে পারেন নাই। তার পূর্বে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। ম্যাডাম সানইয়াৎ সেন তাঁরই স্ত্রী।

চিয়াং কাইশেকের নাম আপনারা সকলে জানেন―যিনি সান ইয়াৎ-সেনের প্রধান সেনাপতি ছিলেন। এবং দুই নেতা দুই বোনকে বিয়ে করেছিলেন। ম্যাডাম সান ইয়াৎ-সেন, চিয়াং কাইশেকের স্ত্রীর বড় বোন। দুঃখের বিষয় দেশের সাথে স্বামী-স্ত্রী বেঈমানী করেছিল বলে আর দেশে যেতে পারে না। জনগণ তাড়িয়ে দিয়েছে, তাই ফরমোজা দ্বীপে আমেরিকান সাহায্য নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছে। মাঝে মাঝে হুঙ্কার ছাড়ে, কিন্তু কেউ গ্রাহ্য করে না। কারণ, সকলেই জানে দেশ থেকে বিতাড়িত আমেরিকার দালাল।’

বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা এ সম্মেলনে তাঁদের দেশের শান্তি আন্দোলন, সামাজিক অগ্রগতি এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে চমৎকার বক্তৃতা প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু বলেন… আমিও বক্তৃতা করলাম বাংলা ভাষায়। ভারতবর্ষ থেকে বক্তৃতা করলেন মনোজ বসু বাংলা ভাষায়। বাংলা আমার মাতৃভাষা, মাতৃভাষায় বক্তৃতা করাই উচিত। কারণ, পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের কথা দুনিয়ার সকল দেশের লোকই কিছু কিছু জানে… এই সম্মেলন এগারো দিন চলে। অস্ট্রেলিয়ার এক প্রতিনিধি আমার সঙ্গে আলাপ করতে করতে বললেন, ‘তোমার দেশের রাষ্ট্রদূতরা মনে করে দুনিয়ার মানুষ আহাম্মক!’ আমি বললাম, ‘কেন এ কথা বলছেন?’ তিনি উত্তর করলেন যে, ‘রাষ্ট্রদূত ও কর্মচারীরা যেভাবে থাকেন, আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীও সেভাবে থাকতে পারে না। অন্যান্য যে সকল দেশের জনগণের অবস্থা খুব ভালো, খায়ও অনেক বেশি―আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রদূতরা যে অবস্থায় থাকে, তার চেয়েও অনেক ভালো অবস্থায় থাকে এবং যা তা ভাবে অর্থ ব্যয় করে। আমাদের বোঝাতে চায় যে, তোমরা কত ভালো আছ। আমরা রাজনীতি করি, দেশ-বিদেশের খবর রাখি। তোমাদের দেশের মাথাপ্রতি আয় কত? দেশের লোক না খেয়ে মরে, কাপড় পর্যন্ত জোগাড় করতে পারে না। এসব খবর আজ দুনিয়ার শিক্ষিত সমাজ ভালো করেই জানে। দেশের মানুষ না খেয়ে মরে আর সেই দেশের কর্মচারী অথবা রাষ্ট্রনায়করা যেভাবে বাজে খরচ করে তাহা ভাবলে আমাদেরও লজ্জা করে।’

উপর্যুক্ত বইয়ের আর একটা অংশে বঙ্গবন্ধুর লেখায় পাই :

‘পরের দিন নৌকায় আমরা রওয়ানা করলাম… পথে পথে গান চলল। নদীতে বসে আব্বাসউদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালী গান তাঁর নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন…গান গাইছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলিও যেন তাঁর গান শুনছে।…আমি আব্বাসউদ্দিন সাহেবের একজন ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন : মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলা কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালোবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদা নষ্ট হয়ে যাবে। …বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ-১১১)।

বঙ্গবন্ধুর লেখায় আর একটা অংশে তিনি লিখেছেন :

‘আমাদের বাঙালিদের মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হলো ‘আমরা মুসলমান’, আর একটা হলো আমরা বাঙালি। ‘পরশ্রীকাতরতা’ আর ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধ হয় দুনিয়ার কোনো ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, ‘পরশ্রীকাতরতা’। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে পরশ্রীকাতর বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সকল ভাষায়ই পাবেন, সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই, ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্য বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে (প্রাগুক্ত গ্রন্থ পৃ-৪৭-৪৮)।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাজনীতির মহানায়ক, কিন্তু তিনি যদি শুধু সাহিত্যচর্চা করতেন তাহলেও হতেন এক খ্যাতকীর্তি লেখক।

প্রতিকৃতি : আলপ্তগীন তুষার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares