ওপার বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু : মিল্টন বিশ্বাস

ক্রোড়পত্র : বঙ্গবন্ধুর সাহিত্যসত্তা

ভারতের সাবেক এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর আত্মজীবনীমূলক মাই ট্রুথ (১৯৮০) গ্রন্থে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে এক জায়গায় লিখেছেন :

‘বঙ্গবন্ধু খুবই আবেগচালিত, উষ্ণ হৃদয়ের মানুষ, একজন আইন প্রণেতার চেয়ে বেশি সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতা।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ঘাতকের বুলেটে সপরিবারে শাহাদৎ বরণ করেন। তার নয় বছর পর ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ইন্দিরা গান্ধী একইভাবে ঘাতকের বুলেটে নিহত হন। হত্যাকারীরা এই উভয় কিংবদন্তিরই পরিচিত ছিল। দু’জন নেতার করুণ মৃত্যু ঘটলেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সৌহার্দ্যরে মৃত্যু ঘটেনি। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই হাঁটছেন। শেখ মুজিবের শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে কলকাতার ইসলামীয়া কলেজের বেকার হোস্টেলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে। ১৯৭২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কলকাতায় গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতের সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আর তাঁর শাসনকালে বিরোধীপক্ষ ও শত্রুরা তাঁকে ‘ভারতের দালাল’ বলায় তার জবাবে ১৯৭৫ সালের ১৯ জুনের এক ভাষণে ‘বাকশালে’র মধ্য দিয়ে দেশ গড়ার লক্ষ্যে ভারত, রাশিয়া এমনকি আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেন; তেমনি তিনি ভারত-বাংলাদেশের বাঙালি সংস্কৃতির একই উত্তরাধিকারের কথা উল্লেখ করেন বারংবার। 

সাহিত্যিকের লেখায় শেখ মুজিবের কথা ১৯৫৩ সালে প্রথম বিবৃত হয়। তবে তাঁকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সৃজনশীল কাজের প্রসার ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর। তখন থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদরা সোচ্চার হন। সেসময় স্বৈরশাসকের দমন-নিপীড়নের কারণে রাজপথে মিছিল-মিটিংয়ের পরিবর্তে প্রতিবাদের ভাষা মশাল হয়ে জ্বলেছে কবিতা-গল্প-উপন্যাস ও চিত্রকলায়। এসব সৃজনশীলকর্ম জনচিত্তে অভিঘাত সৃষ্টি করে। ১৫ আগস্ট পরিণত হয় প্রতিবাদী কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রেরণা ও সৃষ্টিশীলতার অনুঘটকে। বেগবান হয়ে ওঠে পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলা সাহিত্য। শিল্প-সাহিত্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতিফলন সম্পর্কে অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ লিখেছেন :

‘জীবিতকালে যেমন, তেমনি মৃত্যুর পরে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও সাধনা নিয়ে, তাঁর মৃত্যু ও মৃত্যুঞ্জয়ী ভূমিকা নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক রচনা। এসব রচনার মধ্যে আছে কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, ছড়া―আছে গবেষণাধর্মী গ্রন্থ। এ কথা আজ গভীরভাবে সত্য, বঙ্গবন্ধু বাঙালি সাহিত্যিকদের কাছে সৃষ্টিশীলতার এক অফুরান উৎস। কেবল বাঙালি সাহিত্যিকই নন, অন্যভাষার লেখকরাও তাঁকে নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন, লিখেছেন সৃষ্টিশীল অনেক রচনা।’

(বাংলাদেশের কবিতায় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের সাহিত্য, আজকাল, ২০০৯, পৃ. ২৬)

অন্য ভাষার লেখক বলতে তিনি মার্কিন লেখক রবার্ট পেইন ও ব্রিটিশ লেখক মার্ক টালির গ্রন্থ এবং সালমান রুশদি ও অ্যানি লোপার উপন্যাসের কথা বুঝিয়েছেন। এ ছাড়া ভারতের উর্দু কবি কাইফি আজমী, সিন্ধু কবি শেখ আরজ, বালুচ কবি আজমল ঘটক, পাঞ্জাবি কবি হাবীব জাহেল, জাপানি কবি মুটসুত্ত সসুয়া, ব্রিটিশ কবি লোরী অ্যান ওয়ালশ প্রমুখের উল্লেখযোগ্য কবিতা রয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। এখানে পশ্চিমবঙ্গের কবিদের কবিতায় অভিব্যক্ত বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গই আলোচ্য প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড নিয়ে শিল্পী-সাহিত্যিকরা তাড়িত হয়েছেন নিরন্তর―‘এ এমন বেদনা যার সান্ত¦না/খুঁজবে তারা সকাল সাঁঝে/এ এমন অন্ধত্ব সহস্র আলোকবর্ষ/ হাঁটতে হবে শূন্যতার মাঝে।’ কেবল তাড়িত হওয়া নয় শিল্পরসোত্তীর্ণ কবিতা রচিত হয়েছে অসংখ্য। যেগুলো কালের বিবর্তনে টিকে থাকবে। তবে কিছু কবিতা স্লোগানসর্বস্ব। শিল্পের দাবি মেটাতেও ব্যর্থ হয়েছে আরও কিছু কবিতা।

২.

শেখ মুজিবুর রহমান নিজে লেখক ছিলেন না। তবে ২০১২ সালে তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ২০১৭ সালে কারাগারের রোজনামচা এবং ২০২০-এ ‘মুজিববর্ষে’ প্রকাশিত হয়েছে আমার দেখা নয়া চীন। কারাগারে বসে লেখা ডায়েরির পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ অক্ষর গ্রন্থগুলোর অবয়ব সৃষ্টি করেছে। এই গ্রন্থগুলো এবং তাঁর জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তিনি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কবিতা এবং সঙ্গীতের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। এছাড়া সমকালীন লেখক-সাহিত্যিক তথা গুণী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর সহজ আত্মীয়তার যোগ ছিল। হয়তো এজন্যই ১৯৭১ সালে সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছিলেন―‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা/ গৌরী মেঘনা বহমান/ ততকাল রবে কীর্তি তোমার/ শেখ মুজিবর রহমান।’ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একক গ্রন্থ রচনা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের অন্তত দশজন লেখক-সাহিত্যিক। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের সময় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এবং কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতি’। এই সমিতির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের অসংখ্য গুণিজন সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে চীনে অনুষ্ঠিত ‘এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলনে’ যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা এবং ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত কথাসাহিত্যিক মনোজ বসুর চীন দেখে এলাম গ্রন্থে সর্বপ্রথম শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হয়েছে। পারস্পরিক আলাপচারিতায় মনোজ বসু শেখ মুজিবের কাছ থেকে জানতে পারেন―পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের সাম্প্রদায়িক অপপ্রয়াস এবং পূর্ব বাংলার প্রতি তাদের বৈষম্যমূলক আচরণের বিস্তারিত কর্মকাণ্ড। এ গ্রন্থটির পর মনোজ দত্ত, নিরঞ্জন মজুমদার, পরেশ সাহা, শ্যামল বসু, পঙ্কজ কুমার মুখোপাধ্যায় প্রমুখ লেখক নিজেদের লেখায় মুজিবকে উজ্জ্বল করে বর্ণনা করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চাশের অধিক কবি কবিতা লিখেছেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। ১৯৭০ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রথম কবিতা লেখেন দক্ষিণারঞ্জন বসু ‘বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে। মণিপুর, ত্রিপুরা এবং হিন্দিভাষি কবিরাও নিবেদন করেছেন অর্ঘ্য। ঘাতকের বুলেটে জাতির পিতা শহিদ হওয়ার আগে ১৯৭৫ সালে ‘বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদকে’ ভূষিত হয়েছিলেন চারজন ভারতীয় বাঙালি। তাঁরা হলেন, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, অংশুমান রায় এবং প্রণবেশ সেন। তার আগে ১৯৭৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে সাহিত্য সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকরা।  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব-পশ্চিম উপন্যাসে মুজিব প্রসঙ্গ অথবা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের বিখ্যাত এবং এখনও জনপ্রিয় ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে’ গানের কলিতে ধৃত মহিমান্বিত বঙ্গবন্ধুকে স্মরণে রেখেই আলোচনাকে বিস্তৃত করা হয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত প্রথম বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শিল্প-সাহিত্যের বিষয়বস্তু সম্পর্কে চমৎকার কিছু কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে, শিল্প-সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলতে হবে এদেশের দুঃখী মানুষের আনন্দ-বেদনার কথা, সাহিত্য-শিল্পকে কাজে লাগাতে হবে তাদের কল্যাণে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতি শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে, লেখনীর মাধ্যমে তার মুখোশ খুলে দিতে হবে। তাঁর অভিমত ছিল জনগণই সব সাহিত্য ও শিল্পের উৎস। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনোদিন কোনো মহৎ সাহিত্য বা উন্নত শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে পারে না। তিনি নিজে সারাজীবন জনগণকে সাথে নিয়েই সংগ্রাম করেছেন। এই জনগণ কেবল শহরে থাকেন না, গ্রামে এক বিপুল জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের বিষয়েও তিনি মনোযোগ দিতে বলেন। বঙ্গবন্ধুর সেদিনকার ভাষণ সচেতন শিল্পী-সাহিত্যিককে উদ্বেলিত করেছিল। আর তিনি নিজে নিবিড় জনসংযোগের মধ্য দিয়ে ‘রাজনীতির কবি’ হয়েছিলেন বলেই তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে দুই বাংলার শিল্প-সাহিত্য আলোড়িত হয়েছে। জীবদ্দশায় যেমন তেমনি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের নির্মম ঘটনার পর তিনিই হয়ে ওঠেন শিল্প-সাহিত্যের অনুপ্রেরণার উৎস। কারণ তিনি নিজেই সেই সাধারণ জনগণের প্রতিনিধি ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শৈশব থেকেই নিজেকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন দেশের জন্য। দেশ ও মানুষের সেবক হতে চেয়েছেন নিঃস্বার্থভাবে। মানুষের দুঃখকষ্ট গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর কথা ও কর্মের সূত্র থেকেই বলতে হয়, সাধারণ মানুষের পাশে থেকে দাবি আদায়ের লড়াই ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ। এজন্য অতি অল্প সময়ে পশ্চিমবাংলার বাঙালিদেরও প্রিয় নেতায় পরিণত হন তিনি। বাংলার মানুষ তাঁর নেতৃত্বে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। দুই বাংলার মানুষের সমর্থন ছিল বলেই পাকিস্তানি শাসকরা মুজিবকে ভয় পেতে শুরু করেছিল। রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা ও হয়রানি নিত্যসঙ্গী হয়েছিল তাঁর। ছয় দফা আন্দোলনের সময় ছাত্ররা যুক্ত হয়ে তাঁর নেতৃত্বকে আরও মজবুত করেছিল। স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকারকে উৎখাত করার জন্য আন্দোলন বেগবান করেন বঙ্গবন্ধু। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মুজিব জনগণের রায়ে বারবার নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব আর সাহসী পদক্ষেপ আমাদের মুক্তি এনে দিয়েছে। একইভাবে সদ্য স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিপুল সমস্যার আবর্তে পড়েও দিশাহারা হননি কখনও। মানুষকে তিনি বড় বেশি বিশ্বাস করতেন, বড় বেশি সারল্যে মাখা ছিল তাঁর ব্যক্তিজীবন। একদিকে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করা অন্যদিকে দেশের উন্নয়নে, মানুষের অগ্রগতির চিন্তায় উন্মুখ বঙ্গবন্ধুর দিনগুলো এক একটি কবিতা, তাঁর পুরো জীবন এক একটি উপন্যাস আর তাঁর হাসি-কান্নার মুহূর্তগুলো এক একটি ছোটগল্পের প্রেরণা। তাঁর তর্জনী উঁচিয়ে ভাষণ দেওয়া, পাইপ ও চশমার অনন্য মুখচ্ছবি চিত্রকলার বিশিষ্ট উদ্দীপনা। আর তাঁর প্রকৃতি, পশুপাখি ও শিশুদের প্রতি মমত্ববোধ শিশু-কিশোর সাহিত্যের উৎস। এভাবে দেখলে ওপার বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রভাব ভেতর থেকে উদ্ঘাটন করা সম্ভব।

৩.

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা নামক মহাকাব্যের ‘মহাকবি’, তিনি বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টিতে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’। তাঁর ছিল দুর্নিবার গ্রন্থপ্রীতি। তিনি ছিলেন সচেতন পাঠক। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, উইনস্টন চার্চিল, আব্রাহাম লিংকন, নেলসন ম্যান্ডেলা, জন এফ কেনেডি, ফিদেল ক্যাস্ত্রো প্রমুখ রাজনৈতিক নেতার মতো যখনই অবসর পেতেন তখনই তিনি বইয়ের বিচিত্র জগতে হারিয়ে যেতেন। বঙ্গবন্ধু যে প্রচুর শিল্প-সাহিত্যের বই পড়তেন তা তাঁর ভাষণ, বক্তৃতা, চিঠিপত্র আর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা এবং আমার দেখা নয়া চীন গ্রন্থ থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে রবার্ট পেইন দেখেছেন, জর্জ বার্নার্ডশ, বার্ট্রান্ড রাসেলের রচনাবলি, মাও সেতুং স্বাক্ষরিত গ্রন্থ। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিপ্রেমী ছিলেন শেখ মুজিব। ১৯৪৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তান ভ্রমণকালে একই গাড়িতে করাচি আসার পথে উর্দুভাষি কয়েকজন পাকিস্তানিকে তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন।

(অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ ২১৭)

১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বরে চীনের শান্তি সম্মেলনে যোগদান করে তিনি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেছিলেন।

(অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ ২২৮)   

১৯৪৮ থেকে ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকদের রুদ্ররোষে ২৪টি মামলায় ১৮ বার জেলে নিক্ষিপ্ত হন শেখ মুজিব। তিনি সর্বমোট ১২ বছরে ৩০৫৩ দিন জেল খেটেছেন। আর দশ বছর কড়া নজরদারিতে ছিলেন। জেলবন্দি নিঃসঙ্গ জীবনেও বই ছিল তাঁর একমাত্র অবলম্বন। ২১ ডিসেম্বর, ১৯৫০ সালে ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট জেল থেকে বঙ্গবন্ধু একটি চিঠি লিখেছিলেন গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। সেই চিঠিটি তৎকালীন সরকার বাজেয়াপ্ত করলেও গবেষকরা পরবর্তী সময় উদ্ধার করেন। সেই চিঠিতে আছে- খধংঃ ঙপঃড়নবৎ যিবহ বি সবঃ রহ ঃযব উধপপধ ঈবহঃৎধষ ঔধরষ মধঃব, ুড়ঁ শরহফষু ঢ়ৎড়সরংবফ ঃড় ংবহফ ংড়সব নড়ড়শং ভড়ৎ সব. ও যধাব হড়ঃ ুবঃ ৎবপবরাবফ ধহু নড়ড়শ. ণড়ঁ ংযড়ঁষফ হড়ঃ ভড়ৎমবঃ ঃযধঃ ও ধস ধষড়হব ধহফ নড়ড়শং ধৎব ঃযব ড়হষু পড়সঢ়ধহরড়হ ড়ভ সরহব. (নিরীক্ষা, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১২, প্রেস ইনস্টিটিউট, ঢাকা)

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন :

‘১৯৪৯ থেকে আব্বা যতবার জেলে গেছেন কয়েকখানা নির্দিষ্ট বই ছিল যা সব সময় আব্বার সঙ্গে থাকত। জেলখানার বই বেশিরভাগই জেল লাইব্রেরিতে দান করে দিতেন, কিন্তু আমার মা’র অনুরোধে এই বই কয়টা আব্বা কখনও দিতেন না, সঙ্গে নিয়ে আসতেন। তার মধ্যে রবীন্দ্র-রচনাবলি, শরৎচন্দ্র, নজরুলের রচনা, বার্নার্ডশ’র কয়েকটা বইতে সেন্সর করার সিল দেওয়া ছিল। জেলে কিছু পাঠালে সেন্সর করা হয়, অনুসন্ধান করা হয়, তারপর পাস হয়ে গেলে সিল মারা হয়। পরপর আব্বা কতবার জেলে গেলেন তার সিল এই বইগুলোতে ছিল। মা এই কয়টা বই খুব যত্ন করে রাখতেন। আব্বা জেল থেকে ছাড়া পেলেই খোঁজ নিতেন বইগুলো এনেছেন কিনা। যদিও অনেক বই জেলে পাঠানো হতো। মা প্রচুর বই কিনতেন আর জেলে পাঠাতেন। নিউ মার্কেটে মা’র সঙ্গে আমরাও যেতাম। বই পছন্দ করতাম, নিজেরাও কিনতাম। সব সময়ই বইকেনা ও পড়ার একটা রেওয়াজ আমাদের বাসায় ছিল। প্রচুর বই ছিল। সেই বইগুলো ওরা (পাকিস্তানিরা) নষ্ট করে। বইয়ের প্রতি ওদের আক্রোশও কম না। আমার খুবই কষ্ট হয় ঐ বইগুলোর জন্য যা ঐতিহাসিক দলিল হয়ে ছিল, কিন্তু ১৯৭১ সালে সবই হারালাম।’

(শেখ হাসিনা, শেখ মুজিব আমার পিতা, আগামী প্রকাশনী, ২০১৪, পৃ ৭০-৭১)

বঙ্গবন্ধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কেবল সাধারণ মানুষ কিংবা কৃষক-শ্রমিকদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলেন না তিনি ছিলেন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি। স্বাভাবিকভাবে স্বীয় শ্রেণির শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তাছাড়া পূর্বেই বলা হয়েছে তিনি সাহিত্যের একজন অনুরাগী পাঠক ছিলেন। ১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি বলেন―‘শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিকবৃন্দের সৃষ্টিশীল বিকাশের যে-কোনো অন্তরায় আমি এবং আমার দল প্রতিহত করবে।’ (আতিউর রহমান, ‘বাঙালি সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক বঙ্গবন্ধু’, শোকাশ্রু, বঙ্গবন্ধু সমাজকল্যাণ পরিষদ, ২০১৫, পৃ. ৩০) ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের পরপরই বঙ্গবন্ধু কাজী নজরুল ইসলামকে ঢাকায় নেন। ১৯৭২ সালের ২৫ মে ঢাকায় কবির বাসায় যাবার সময় ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর থেকে বের হয়ে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করতে করতে পথ হেঁটেছেন বঙ্গবন্ধু। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র সূত্র অনুযায়ী আব্বাসউদ্দিনের ভাটিয়ালি গান শুনে মুগ্ধ হয়েছেন তিনি। এই কণ্ঠশিল্পীর বাংলা ভাষা রক্ষার আকুতিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে অবদান রাখেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হয়েও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে ‘স্যার’ সম্বোধন করতেন। প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলেছিলেন―‘এ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদের লেখনীর মধ্যে নির্ভয়ে এগিয়ে আসুন, দুঃখী মানুষের সংগ্রাম নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করুন। কেউ আপনাদের বাধা দিতে সাহস করবে না।’ (দৈনিক ইত্তেফাক ১৬/২/১৯৭১) তার আগে ৯ জুন ১৯৬৯ সালে বাংলার সবচাইতে জনপ্রিয় সাংবাদিক মানিক ভাই প্রবন্ধে শেখ মুজিবুর রহমান লেখেন―‘তিনি ছিলেন এক সার্বক্ষণিক প্রেরণা। অতি বড় দুর্দিনেও তাঁর উপর আমরা ভরসা রাখতে পেরেছি। কাছে গিয়ে সাহস ফিরে পেয়েছি। তিনি নিষ্ঠাবান সংগ্রামী ছিলেন। সংগ্রামীদের তিনি ভালোবাসতেন।’ (বঙ্গবন্ধু ও গণমাধ্যম, সম্পাদক ড. মোহাম্মদ হাননান, পৃ. ১৩) বেবি মওদুদ লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধকালে ক্ষতিগ্রস্ত দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ পত্রিকা দুটিকে বিজয় লাভের পর পুনরায় নিজের পায়ে দাঁড় করাতে সব রকম সহযোগিতা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।’ (সংবাদপত্র, সাংবাদিক ও শেখ মুজিব, নিরীক্ষা, জুলাই-আগস্ট ২০১৩) বঙ্গবন্ধুর সমকালে কয়েকটি দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদও ছিলেন কোনো না কোনো পত্রিকা বা রাজনৈতিক সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। মহাত্মা গান্ধী নিউ ইন্ডিয়া, মতিলাল নেহরু ইন্ডিপেনডেন্ট, মাওলানা মোহাম্মদ আলী কমরেড, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি বেঙ্গলি, জওয়াহেরলাল নেহরু ন্যাশনাল হেরাল্ড, অরবিন্দ ঘোষ বন্দেমাতরম, সুভাষচন্দ্র বসু ফরওয়ার্ড, বিপিন চন্দ্র পাল ইয়ং ইন্ডিয়া, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ নারায়ণ, ফজলুল হক কৃষক ও নবশক্তি পত্রিকার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন নতুন দিন, ইত্তেহাদ, ইত্তেফাক, মিল্লাতসহ কয়েকটি পত্রিকার সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি সব সময়ই কাছে পেয়েছেন শিল্পী-সাহিত্যিকদের। জসীম উদদীন, সুফিয়া কামাল, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, হাশেম খান, সমরজিত রায় চৌধুরী প্রমুখ কবি ও চিত্রশিল্পী এবং কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, খ্যাতনামা কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক ছবি রয়েছে। ১৯৭৩ সালে ফরাসি লেখক আঁদ্রে মালরোর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। বাংলাদেশ বেতারের নিজস্ব শিল্পীদের মাঝেও তাঁকে দেখা গেছে। ১৯৭৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে তিনি বলেন―‘মানবাত্মার সুদক্ষ প্রকৌশলী হচ্ছেন দেশের সুধী সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাব্রতী, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবী।’ এজন্য তাঁদের প্রতি তাঁর প্রাণের টান এত। অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্মৃতিচারণে আছে, ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মন্মথ রায়কে বাম পার্শ্বে ও তাঁকে দক্ষিণ পার্শ্বে বসিয়ে সেদিন নানা অন্তরঙ্গ কথা বলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি অসুস্থ কবি হুমায়ূন কাদির, আবুল হাসান ও মহাদেব সাহাকে সুচিকিৎসার জন্য বার্লিন, মস্কো, লন্ডন প্রেরণ করেন এবং একটি কবিতা লেখার জন্য দাউদ হায়দারকে ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাত থেকে রক্ষা এবং নিরাপত্তা দিয়ে কলকাতায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। কবি আল মাহমুদকে জেল থেকে মুক্ত করে শিল্পকলা একাডেমিতে নিয়োগ প্রদান করেন। তিনি ছিলেন নাটকের একজন সুহৃদ। টেলিভিশন ও মঞ্চ নাটকের ওপর থেকে প্রমোদকর ও সেন্সর প্রথা সহজতর করেছিলেন নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে। চলচ্চিত্রের উন্নয়নে তাঁর অবদান ছিল। প্রাদেশিক পরিষদে এফডিসি’র বিল উত্থাপন করেন তৎকালীন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল। তখন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ছিল চলচ্চিত্র বিষয়ক দপ্তর। ১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ ‘বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক’ প্রদান করা হয় বাংলাদেশের ১৮ এবং ভারতের ৪ জন বিশিষ্ট শিল্পী, সংস্কৃতিসেবী ও বেতারকর্মীকে। অর্থাৎ কবি-শিল্পী- সাহিত্যিকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নে তিনি যুক্ত করেছিলেন শিক্ষক-প্রকৌশলী ও পেশাজীবীদের, শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রশাসনের সঙ্গে রেখেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতাই বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্থ ছিল। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বঙ্গমাতা’ কবিতার পঙ্ক্তি―‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, / রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করনি’ এবং ১৯৭২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেবার সময় তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেছেন। ‘নিঃস্ব আমি রিক্ত আমি’ এবং ‘নাগিনীরা দিকে দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’ তাঁর কণ্ঠে সেদিন উচ্চারিত হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ছিল বেশি। তাঁর অন্তর দখল করে রেখেছিলেন বিশ্বকবি। রাজনৈতিক জীবনে দুঃখ-দৈন্য-সংকটে আবৃত্তি করতেন―‘বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা’ কিংবা ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে…’ বহুল পরিচিত চরণসমূহ। জেলে যাবার সময় সঞ্চয়িতা হাতে তুলে নিতেন। বোঝা যায় একমাত্র সঙ্গী বা অনুপ্রেরণা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলা একাডেমি আয়োজিত ১৯৭২ সালের ৮ মে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীতে তিনি বলেছিলেন :

‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রাণ ও অপরিমেয় ত্যাগের বিনিময়ে। কিন্তু সত্য, শ্রেয়, ন্যায় ও স্বাজাত্যের যে চেতনা বাঙালি কবিগুরুর কাছ থেকে লাভ করেছেন, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে তারও অবদান অনেকখানি। বাঙালির সংগ্রাম আজ সার্থক হয়েছে। বাঙালির রবীন্দ্র-সম্মাননার চেয়ে বড় কোনো দৃষ্টান্ত আমার জানা নেই।’

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি গভীর মনোযোগ সহকারে রবীন্দ্র সংগীত শুনতে শুনতে সকালের নাস্তা সারতেন। এক স্মৃতিচারণে মাহবুব তালুকদার টুঙ্গিপাড়ার সফরসঙ্গী হিসেবে সকালে ঘুম থেকে উঠে বঙ্গবন্ধুকে নৌযানে বসে নদীর দুপাড়ের গ্রাম-বাংলার দৃশ্য দেখে আবৃত্তি করতে শুনেছিলেন―‘নম নম নম সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি/ গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি’ রবীন্দ্র পঙ্ক্তিমালা। জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি ১৯৫৬ সাল থেকেই তাঁর প্ররোচনায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৬৬ সালে ঠিক করে ফেলেন সোনার বাংলা গড়ার। গানটি সর্বত্র প্রচারে শেখ মুজিবের সক্রিয় ভূমিকার কথা জানিয়েছেন প্রফেসর ড. সন্জীদা খাতুন। (দৈনিক জনকণ্ঠ, ২১ মে ২০০৫)    

 উপরের বিবরণ থেকে আমরা বুঝতে পারছি, শিল্প-সংস্কৃতির একজন রসবোদ্ধা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেশ-বিদেশের কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের গভীর সম্পর্ক ছিল। এজন্য ১৫ আগস্টের (১৯৭৫) হত্যাকাণ্ড রাজনীতিবিদদের সাথে সাথে অভিঘাত রাখে শিল্পী, সাহিত্যিক ও কবিদের চেতনায়। তাঁরা তাঁদের লেখনীতে সামাজিক দায়িত্ব পালন করেন। মূলত জাতিকে এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হতে প্রেরণা জুগিয়েছেন শিল্প-সাহিত্য সমাজের ব্যক্তিবর্গ।

বঙ্গবন্ধুর শিল্প সংস্কৃতি ভাবনায় দুঃখী মানুষের কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে। লোকজ সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বিস্তর। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সোনারগাঁ-এ ‘বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন’ স্থাপন করেন বঙ্গবন্ধুর প্রেরণায়। ১৯৭২ সালের ১-৫ মার্চ সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরকালে সেখানকার নেতৃবৃন্দের জন্য উপহার হিসেবে তিনি নিয়ে যান কচি-কাঁচার মেলার শিশুদের আঁকা চিত্রকর্ম। রাজনীতি করে যেমন গরিব কৃষক ও শ্রমিকের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছেন তেমনি শিল্প-সংস্কৃতির চেতনাসম্পন্ন উপযুক্ত জাতি গঠনে নিবেদিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

রাজনীতির অমর কবি বঙ্গবন্ধুর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার অঙ্গীকার পরবর্তীকালে দেশের শিল্পী-সাহিত্যিকরা ভুলতে পারেননি। দেশ পরিচালনায় খুব কম সময় পেলেও তাঁর আত্মবলিদান প্রেরণার শতধারায় উৎসারিত এখনও। তাঁকে আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী করে তুলেছেন শিল্পী-সাহিত্যিকরা―সৃষ্টি হয়েছে কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস, চিত্রকলা। আদর্শের মৃত্যু নেই যেমন কবি পাবলো নেরুদা লিখেছেন―‘কোনো কোনো রক্তের দাগ কিছুতেই শুকোবার নয়।’ বঙ্গবন্ধুর রক্তের দাগ এখনও শুকায়নি। প্রেরণার উৎসে মহীরুহ তিনি। এজন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন―‘শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হৃদয়ের জাগরণ হলো। বিনা দ্বিধায় আমরাও বলে উঠলাম, ওই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যতদিন লড়াই চলবে, ততদিন আমরাও সঙ্গে আছি। বাঙালি হিসেবে আমরাও সহযোদ্ধা।’

(আমরা কি বাঙালি, পত্রভারতী, কলকাতা, পৃ ১৪৩)

১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেওয়া মন্মথ রায় লেখেন (আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন স্মরণিকা) ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম অবলম্বনে লিখিত আমার দুইটি নাটক এক. স্বাধীনতার ইতিহাস, দুই. আমি মুজিব নই―গ্রন্থ দুইটি তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ্য দিয়ে ধন্য হতে পেরেছিলাম।’

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৬ সালের রাজনৈতিক দলবিধির ১০ ধারায় মৃতব্যক্তির মাহাত্ম্য প্রচার নিষিদ্ধ করে এক ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে ২১ বছর ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৯৬ থেকে পুনরায় ব্যবহৃত হতে থাকে শব্দটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতির পিতার আদর্শ প্রতিষ্ঠার যুগ শুরু হয়।

৪.

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত কবিতায় বাঙালি জাতির ভাষার স্মৃতি উচ্চকিত হয়েছে। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর মতো মহাপুরুষকে নিয়ে রচিত কবিতায় কবি সমাজ ও জীবনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য। কারণ কবিতার মাধ্যমে কবি একাত্মতার বাণী প্রচার করেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের একাত্ম হওয়ার এই বাণী অসংখ্য কবির অজস্র চরণে কখনও শেখ মুজিব, কখনও বঙ্গবন্ধু নামে প্রতীকায়িত হয়ে উঠেছে।

মহামানব : সুকান্ত ভট্টাচার্য

কবিতাটি মহামানব বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এ কবিতা অনুসারে আমরা বলতে পারি, কবি মুজিবকে মহামানব আখ্যা দিয়ে তাঁর পুনরুত্থানে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। স্বাধীনতার পর পরাধীনতার যে তিক্ত স্বাদ স্বাধীন বাংলায় বিরাজ করছে কবি তার বর্ণনা দিয়েছেন কবিতার ছত্রে―

এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার;

লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।

(কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০১০: ৩৮৪)

বুনো জন্তু আবার হানা দেয়; পালে পালে দিকে দিকে দাঁতাল শুয়োরের দল বাংলাকে আবার নিয়ে যেতে চায় মধ্যযুগে। মহামানব মুজিব নেই বলে মানবতা ভূলুণ্ঠিত। কবি তাই মহামানবের উপস্থিতি চান আরেকবার― ‘হে মহামানব, এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালো।’

(কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০১০: ৩৮৪ ) 

শিশুরক্ত : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

শিশু রাসেলকে নিয়ে লেখা অন্যতম কবিতা এটি। শেখ হাসিনা শিশু রাসেলকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে : 

‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিল ছোট্ট রাসেলকে। মা, বাবা, দুই ভাই, দুই ভাবী, চাচা―সকলের লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে ঘাতকরা সকলের শেষে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল রাসেলকে। ঐ ছোট্ট বুকটা কি তখন কষ্টে বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাদের সান্নিধ্যে স্নেহ-আদরে হেসে খেলে বড় হয়েছে তাদের নিথর দেহগুলো পড়ে থাকতে দেখে ওর মনের কী অবস্থা হয়েছিল―কী কষ্টই না ও পেয়েছিল! কেন কেন কেন আমার রাসেলকে এত কষ্ট দিয়ে কেড়ে নিল ঘাতকরা? আমি কি কোনো দিন এই কেনর উত্তর পাব?’

(শেখ রেহানা ও শেখ হাসিনা, ২০১২,  শেখ রাসেল, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, পৃ. ৩২)

শিশু রাসেল আর তার পিতার স্মৃতিচারণ করেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কবি তিক্ততা ব্যক্ত করেছেন খোকা রাসেলের পিতার তোষামোদকারীদের; যারা একদিন খোকার পিতার নামে আকাশ ফাটানো জয়ধ্বনি তুলেছিল, তারাই আজ খোকার পিতার অবর্তমানে ইতিহাসকে করে লাঞ্ছিত। এমন হীন তোষামোদকারীদের কবি উপাধি দিয়েছেন ‘বয়স্ক উন্মাদ’। কবি-হৃদয় রক্তাক্ত হয় যখন দেখেন পিশাচরা রক্তপানে গ্লানিবোধ করে না; খেলনা, গল্পের বই নিয়ে আচ্ছন্ন থাকা শিশু রাসেলদের হত্যা করা হয় নির্মমভাবে।

আজও কাঁদে নদী : মানসী কীর্তনীয়া

শেখ মুজিবুর রহমান একটি সংগ্রামের নাম। বাংলার স্বাধীনতার সুর তিনি। কবির ভাষায়―

লড়াই লড়াইয়ে যিনি

স্বাধীনতার সুর তিনি।

(কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০১০: ২৫৫)

মুজিব শোনালেন স্বাধীনতার সুর। যে সুরে আমরা পাই নদী জল আর অবারিত হাওয়া। পাই কথা বলার অবারিত স্বাধীনতা। মুজিব তাই আমাদের স্বাধীনতার বাসনা জাগানো একটি নাম। বাংলা আর বাঙালির সুরভিত সত্তা তিনি। তাঁকে হারিয়ে আমরা―‘হায়! সেই নামে আজও কাঁদে নদী…’

(কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০১০: ২৫৫)

দক্ষিণারঞ্জন বসু, বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়), মনীশ ঘটক প্রমুখ বঙ্গবন্ধুর স্তোত্র রচনা করেছেন। পূর্বেই বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অন্নদাশঙ্কর রায় কালজয়ী চরণ সৃষ্টি করেছেন, প্রেমেন্দ্র মিত্র শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়েছেন। বিমলচন্দ্র ঘোষ তাঁর ‘ইস্পাতসূর্য মুজিবর’ কবিতা লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে। মনীন্দ্র রায়ের ‘মানুষ’-এ বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত মহিমা কাব্যিক ধ্রুব ভাষ্যে প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে দুই বাংলার একীভূত রূপ আছে কবির আবেগময় উচ্চারণে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙলার এই রূপ’ কবিতায়। নচিকেতা ভরদ্বাজ ‘সে যে আসে আসে আসে’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুর নামকীর্তন করে তাঁর মহিমাকে উচ্চকিত করেছেন; বলেছেন ‘হে বাঙালী, ঐ নামে উৎসর্গিত কর’। সত্যেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ১৯৭১-এ রচিত ‘জয় বাংলা কর’ নজরুলের প্রলয়োল্লাস কবিতার ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ চরণের আদলে রচিত বঙ্গবন্ধু-বন্দনা। বঙ্গবন্ধু বন্দনা, তাঁকে কেন্দ্র করে কবিতা রচিত হয়েছে দুই বাংলার বাইরেও। এর মধ্যে বেলুচিস্তানের কবি মীর গুল খান নাসিরের ‘ভোর কোথায়’ উল্লেখযোগ্য কবিতা।

বঙ্গবন্ধু: দক্ষিণারঞ্জন বসু

কবিতাটি মুজিব মাহাত্ম্যের। গান্ধীমন্ত্র লক্ষ্য ছিল ‘মানব-ত্রাণ’―মুজিবের জীবনসাধনা এটাই। যুদ্ধপূর্ব সময়ে সারা বাংলায় প্রথমত যে বান এনেছেন মুজিব, কবি তা বর্ণনা করেছেন এ কবিতায়। তিলে তিলে না মরে অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান মুজিব। তাঁর আন্তরিক কিন্তু বজ্রগম্ভীর আহ্বানে হিন্দু-মুসলিম ভুলে গেল ধর্ম-বর্ণ বৈষম্য। তাঁরা বুঝতে পারল ধর্ম-বৈষম্য হতে পারে না ধর্মীয়-কীর্তি। শোষণ-ক্লিষ্ট বাঙালির স্বাধিকার সম্মান মুজিব-জীবনের কর্মসাধনা। তাই কবি বলেন―

বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান―

. . .          . . .       . . .

নিঃশেষে ভয়  তুচ্ছ করেছ নেই কোনো সংশয়,

কোটি কণ্ঠের গর্জনে তাই শুনি বাঙলার জয়।

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৭৭)

সহস্র সেলাম : বনফুল

১৯৭১ সালে রচিত এই কবিতাটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ওপার বাংলার সমর্থন আর সেই সাথে মুজিবের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা প্রস্ফুটিত হয়েছে―

আমি বাংলার কবি তাই বন্ধু ছুটিয়া এলাম

মুজিবুর রহমান লহ মোর সহস্র সেলাম।

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৬৭)

আবার কবিতার শুরুতেই পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম ভাইদের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের অনাচার ব্যাখ্যা করতে কবি ব্যবহার করেছেন ‘আত্মবন্ধু পুত্র-ভ্রাতা কষাই ঘাতক’ উপমা। অস্ত্রহীন আর যুদ্ধে অপটু বাঙালির ওপর রণে সজ্জিত পশ্চিম পাকিস্তানের গুন্ডা ও ডাকাতরা মহোল্লাসে মাতে তাণ্ডবে। শোষণ অনাচার আর হিংসার বন্যরূপ দেখা দেয় চারদিকে। অত্যাচার আর নির্যাতনের লেলিহান শিখা হয় অনায়াসলব্ধ। জাতির পিতার দৃঢ় কণ্ঠ শোনা যায় তখন পার্থিব নরকের মাঝে―

তখনও ওপার হতে দৃপ্তকণ্ঠ শুনিলাম কার

জয় বাংলার!

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৬৭)

সেই দৃপ্ত কণ্ঠের আহ্বানে নির্ভয়ে এগিয়ে গেছে স্বাধীনতার মহান বীজমন্ত্রে দীক্ষিত বাঙালি। এনেছে স্বাধীনতা। দৃপ্ত সেই কণ্ঠ আজও তাই ‘হিমাদ্রি-সমান’, ‘দ্যুতিমান’।

মুজিবের ডাকে : সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর

স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন মুজিব। তাতে উদ্দীপ্ত হয় বাংলার জনসমুদ্র। শোনা যায় জোয়ারের হুংকার। জোয়ারের স্রোতে বিলীন হবে ঘাতক হায়েনা পাকিস্তানি রক্তচোষা। মুজিবের ডাকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষ এক হয়ে গেছে পূর্ব পাকিস্তানকে এবার বাংলা করবে বলে। একটি ভাষার জন্য, একমুঠো জন্মভূমির জন্য, একটি স্বাধীন পতাকার জন্য অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয় এবার পূর্বভাগ। মুজিব বিপ্লবীদের রক্তে আগুন জ্বালান; রবীন্দ্রবাণ অভয়মন্ত্র প্রাণে দোলা দেয় বিপ্লবীদের। তারপর দেখা যায় আগুনের জয়গান বাংলার পথে ঘাটে; মুক্তির নেশায় অফুরন্ত রক্ত ঢেলে দেয় সবুজ বাংলায়―

বিশ্বের লোক বাংলার পানে বিস্ময়ে চেয়ে রয়,

জয় বাংলা, জয় বাংলা, জয় বাংলার জয়।

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৬৮)

বন্ধু: প্রেমেন্দ্র মিত্র

মুজিবের ব্যক্তিত্ব আর জয়গানে মুখর ‘বন্ধু’ কবিতাটি। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের এক সাগ্নিক বীর মুজিবুর রহমান।  বাংলার বন্ধু,  তিনি অনন্য একক। স্বাতন্ত্র্য রয়েছে তাঁর যেন সুদূর হিমগিরি। সমস্ত বাঙালির প্রাণের দাবিকে এক বুকে ধারণ করে তিনি জনতার ধূলিলিপ্ত সাথী।  অসাধারণ কিন্তু অনাড়ম্বর এ মানুষটি আলোকিত করেন তাদের যারা তাঁর সান্নিধ্যে আসে। আবার তাঁর স্পর্শে ছিঁড়ে যায় সত্য ও অলীক দলিতের সমস্ত শৃঙ্খল; শতাব্দীর   নাদিরেরা ক্রুর গর্বোদ্ধত তাঁরই দৃষ্টিপাতে ক্লিন্ন, নতফণা। শুধু হাত বাড়িয়ে পঙ্কিল সময়ের স্রোত টেনে তিনি আনলেন এক রাঙা প্রভাত। বাংলার ভাঙা যুগের রাঙা কবি তিনি―

কত যুগ কত দেশ ভিন্ন নামে তবু

শোনে তার একই বণ্ঠস্বর

আজ শুধু আমাদেরই মাঝে মুগ্ধ মন জানে

নাম তার বন্ধু মুজিবর ॥

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৭০)

ইস্পাতসূর্য মুজিবর : বিমলচন্দ্র ঘোষ

আমরা বিমোহিত, আমরা স্তম্ভিত―মুজিবের জ্বলন্ত আবির্ভাবের আলোয়। ইস্পাতে গড়া শানিত সূর্যের মতো  অভিশপ্ত বাংলার যন্ত্রণার অন্ধকার ফুঁড়ে মুজিব বেরিয়ে এলেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধ। আমরা সিংহচেতনায় জাগ্রত।  মুজিব জাগালেন সে চেতনা। দলাদলির পৈশাচিক চক্রান্তে লিপ্ত যারা, ভাই হয়ে ভাইয়ের বুকে ছুরি বসায় যারা, দেশকে খণ্ডে খণ্ডিত করতে চায় যারা; তাদের বিরুদ্ধে বাঙালি জাগ্রত। মুজিব জাগ্রত করেন সেই উদ্দীপনা। মহান উদ্গাতা মুজিবর মহাজাগরণের। আমাদের শোনান অতি বিক্রম সমুদ্রস্বর। আর সেই অতিবিক্রম সমুদ্রস্বরে বাধভাঙা স্রোতের মতো তন্দ্রাভঙ্গ বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ে ‘এবারের মুক্তি সংগ্রামে’―

আজ তুমি তোমার সাত কোটি মাথা আকাশে তুলে,

চোদ্দ  কোটি বজ্রবাহুতে খাপখোলা তরোয়াল উঁচিয়ে,

সৃষ্টি করেছ

বাঙালির আত্মমর্যাদার জ্বলন্ত ইতিহাস!

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৭২)

মানুষ : মনীন্দ্র রায়

প্রতিনিয়ত হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অনাচার, অত্যাচার, চিৎকার, রক্ত আর অভিশাপের ভিতর থেকে মুজিব টেনে বের করলেন বাংলাদেশকে। স্বাধীনতাই তাঁর ব্রত। শোক আর অশ্রুতে ভেজা বাংলাকে মুজিব অবারিত করলেন মুক্তির দীক্ষায়। মানবতাকে ধ্বনিত করেছেন তিনি; শুধু একটি ব্রত, একটি প্রতিজ্ঞা জয় করল বারুদ আর আগুনকে।  ১৯৭১ সালে রচিত এ কবিতায় কবি তাই বলেছেন―

মুজিব, এই লুপ্ত মহাদেশকে

নতুন করে আবিষ্কার করে

আমাদেরও বুকের মধ্যে ধ্বনিত করেছো তুমি

এক উজ্জ্বল নাম―

মানুষ।

তুমি ধন্য ॥

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৭৩)

বাংলার এই রূপ : বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

হাজার বছরের বহমান রক্তের ধারা আলাদা করতে চায়নি এপার-ওপার বাংলাকে। কিছু স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক মহল সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিকিয়ে কিনেছে ভেজাল স্বাধীনতা। তাতে আলাদা হয় দুই বাংলা। বিচ্ছিন্ন হয় নজরুল-রবীন্দ্রনাথের অবিচ্ছিন্নতা। কিন্তু হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি আলাদা হয়নি। দুই বাংলাতে প্রকৃতির রূপ-রস অনন্য―

বাঙলার এই রূপ, এত রূপ

যত চোখ মেলে দেখি, তত বুক ভরে

আর ভালবাসি, তত ভালবাসি ॥

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৭৪)

এপার বাংলার বেদনায় কাতর হয় ওপার বাংলাও। মুজিব কান্নার নদীকেও সাজান রূপসী―সেই গর্বে স্ফীত ওপার বাংলাও। মুজিব জীবন্ত স্মৃতি―দুই বাংলায় সমসাময়িকভাবে―

মুজিবর! শেখ মুজিবর!

তোমাকে সেলাম, তুমি কান্নার

নদীকেও সাজালে রূপসী―’

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৭৪)

মহানায়ক : শান্তিকুমার ঘোষ

একটি মানুষ শুধু মনোবলে

স্বদেশ ফোটায় রক্তোৎপলে ॥

মহানায়ক মুজিবের দৃঢ় পণ গড়ে তোলে বিধ্বস্ত একটি দেশকে। রাইফেলের নির্দেশে বাংলা যখন পতনোন্মুখ, পশ্চিমী শাসক পিশাচের চাবুকের শব্দে বাঙালি যখন হতোদ্যম, এমনি সময়ে মুজিব স্বপ্ন দেখালেন অবারিত জীবনের। স্বাধীনতার বীজমন্ত্রে দীক্ষিত করলেন বাঙালিকে। বাঙালী ঝাঁপিয়ে পড়ল মুক্তিসংগ্রামে। ত্যাগ আর রক্তক্ষয়ে এলো স্বাধীনতা। কবিতাটি মূলত মুজিবের সংগ্রামের স্তুতিবাদ :

নগর সেজেছে নটিনীর মতো :

একা একটি মানুষ সংগ্রামরত।

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৭৫)

আমরাও জেগে আছি: মৃণালকান্তি কালী

রাজনীতিকের দুষ্টনীতি ভূখণ্ড ভাগ করলেও দুই বাংলার হৃদয় ভাগ করতে পারেনি। তাই এপার বাংলার ধ্বংস―তাণ্ডবলীলায় কাতরায় ওপার বাংলা। দুই বাংলার মনের সেতারে একই সুর। একই হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি।  আলাদা হয়নি হাজার বছরের রক্তের ধারা। কবির ভাষায়―

দুই প্রান্তের একই গান―

জয় বাংলা, জয় মুজিবুর রহমান !

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৮১)

মুজিবের জয় বাংলায় পাশাপাশি এগিয়ে চলে হিন্দু-মুসলমান। জঙ্গি প্রভুর আসন ভেঙে দেবে―এই তাদের ব্রত। রক্ত-সাগর পাড়ি দিয়ে পূর্ব আকাশে সূর্য ওঠে, ওখান থেকেই এলো সোনালি রোদ আকাক্সক্ষার নিবিড় ঘরে বুকের জানালা দিয়ে।

এপার বাংলা ওপার বাংলা জাগে শপথ নিয়ে।

দুই প্রান্তের একই প্রাণ―

জয় বাংলা, জয় মুজিবুর রহমান!

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৮১)

প্রণাম জানাই: নলিনীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

যুগ-সন্ধিক্ষণের পরম লগ্নে ইতিহাসের প্রাণপুরুষ মুজিবুর রহমানকে ব্যথিত চিত্তে সশ্রদ্ধ ভক্তি প্রদর্শন করেছেন কবি। ইতিহাসের অক্ষয় মুজিবের ডাকে বাংলাদেশে স্বাধীনতার যে প্রাণস্পন্দন; কবি আশাবাদী―

‘নবীন আশার উজ্জ্বল আলোয় ভরে উঠবে এ-পৃথিবী। তাঁর ডাকে শতাব্দীর সঞ্চিত কালো অন্ধকার হবে বিদূরিত;  নব-সূর্যোদয় হবে পূর্ব দিগন্তে; বাংলার ধূলিকণা, আকাশ, মাটি, জল পবিত্র বঙ্গবন্ধুর স্পর্শে। কবির ভাষায়―‘সে শুধু তোমারই  নামে, বন্ধ― তোমারই প্রেমে।’

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৮৪)

জীবনমুক্তির উদাত্ত যে আহ্বান মুজিব দিয়েছেন, তাতে গঙ্গার কুলকুল প্রবাহে শোনা যাবে বিজয়ের প্রতিধ্বনি;  ধ্বংসস্তূপের ওপরেই গড়ে উঠবে জাতির ভবিষ্যৎ। আর―‘উন্মত্ত, হিংস্র পশুরা তখন লজ্জায় আত্মগোপন করবে নির্জন গুহা-গহ্বরে!’(ঐ)

বাংলাদেশের ডাক: গোবিন্দ মুখোপাধ্যায়

মুজিবের ব্যক্তিত্বের শক্তি প্রকটিত হয়েছে কবিতাটিতে। আর চিত্রিত হয়েছে মুজিবের ডাকে স্বাধীনতা সংগ্রামের তীব্রতা। বীর নেতা শেখ মুজিবকে সামনে রেখে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রতিজ্ঞা দুর্মর।  মায়ের সমান বাংলার প্রতি ইঞ্চি মাটিকে রক্ষায় প্রাণে বলীয়ান তারা। প্রিয় নেতা মুজিবের আদেশে উদ্দাম বাঙালি কুচক্রী বিদেশিদের আধিপত্য ছিন্ন করে, শত্রুকে ঘায়েল করে, বর্বর পশ্চিমী শত্রু আঁতাত বাহিনী নিশ্চিহ্ন করে, কামান, বিমান ট্যাঙ্ক রাইফেলকে উপেক্ষা করে ছিনিয়ে আনবে বাঙালির জয়। পিতার ডাকে আপামর জনতা বালক স্ত্রী-পুরুষ হাতে তুলে নেয় অস্ত্র যারা জানতো না রাইফেলের সংজ্ঞা। কবির ভাষায়―

গৃহস্থ ঘরের বৌ যেন লক্ষ্মীবাঈ কিংবা চাঁদ সুলতানা

বীর্যবতী, রাইফেল ধরেছে হাতে, বাধা দিতে হানা।

 …    . .                     .. .

. . .                  . . .                 . . .

ভয় নেই, পাশে আছে বীর নেতা শেখ মুজিবর,

আর সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রতিজ্ঞা দুর্মর।

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৯১)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে: বিনোদ বেরা

স্বাধীনতা হীনতায় বাঁচা

ঘৃণ্যতম মৃত্যুর শামিল―

এভাবেই মুজিব নতুন করে শোনালেন মানুষকে। বাঙালি তাই বুকের রক্তের বিনিময়ে চায় স্বাধীনতা। কিন্তু বাংলাকে দগ্ধ করতে চায় খল হিংসুক দস্যুদল। বাংলার বাতাসে উড়তে চায় চাঁন-তারা মার্কা এক বেঈমান পতাকা।  কবি মনে করেন―

মুক্তি বাহিনীর তেজে তারা

অচিরে মৃত্যুর খাদ্য হবে।

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৭৬)

দু’পারের প্রত্যেক বাঙালি বাংলাদেশ বলতে বোঝেন শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ, তিনি শুনিয়েছেন নির্মল দেশপ্রেমের উপকথা। বাঙালির আত্মার আত্মীয়, শ্রেষ্ঠদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ তিনি এক। কবি আশাবাদ ব্যক্ত করেন―

এ দৃঢ় জ্বলন্ত দেশপ্রেম

প্রাণ তুচ্ছ করা এ যৌবন

নিষ্ফল হবে না মুজিবর,

রাহুমুক্ত হবে বাংলাদেশ ॥

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৭৬)

জয় বাংলা কর: সত্যেশ্বর মুখোপাধ্যায়

বেঈমান ভরা রাজ্যলোভী পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী নিষ্ঠুর। ভালোবাসে ভোগবিলাস, ভালোবাসে বাঙালির রক্ত,  ভালোবাসে মদ আর বুলবুল। দয়া নেই, মায়া নেই; চায় বাংলার মাটি। বাংলার মানুষ চায় না। অনাচারের প্রেক্ষাগৃহে মানবতার ডাক দিলেন এক জাদুকর। জাদুকরের স্বাধীনতার বীজমন্ত্র জীর্ণ করে বাঙালির যুদ্ধবিমুখতাকে। জীবন-মরণ তুচ্ছ করে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে। রক্তে ভাসে বাংলা, ওড়ে স্বাধীন বঙ্গের কেতন।

দেখছে আজি বিশ্ববাসী,

রক্তে বাংলা যাচ্ছে ভাসি,

চণ্ডনীতির ধিক্কারে আজ বিশ্ব চরাচর ॥

তোরা সব জয় বাংলা কর ॥

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৯৬)

আঁধার বাংলায় উদিবেই দিনমণি : আনন্দগোপাল মণ্ডল

বিশ্বকে, বিশ্ব-ইতিহাসকে রক্তাক্ষরে অক্ষয় অমর করে বাংলার মুক্তিসংগ্রামকে আর সেই সংগ্রামের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে লিখে রাখার মাধ্যমে মুজিবকে সমর্থন করেছেন কবি―

লিখে নাও মহান জননায়ক বঙ্গবন্ধুর নাম

শেখ মুজিবর রহমান

বঙ্গের সন্তান পৃথিবীর সম্মান।

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৯৭)

স্বৈরাচারী লুণ্ঠনকারী বর্বর শয়তান দমন পীড়নের মাধ্যমে কোটি কোটি বাঙালিকে বঞ্চিত রাখে। বর্বর বলাৎকার গণহত্যা নারী লাঞ্ছনার উন্মত্ত বাসনায় মেতে ওঠে পাকিস্তানি বেঈমানরা। কবি হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন সেই রক্তলোলুপ হিংস্র শয়তানদের। মুজিবের আহ্বানে―

পুঞ্জ পুঞ্জ অন্ধকার ভেদ করে লক্ষ কোটি কণ্ঠে

ওঠে একটি ধ্বনি―

আমরা বাঙ্গালী

স্বাধীন বাঙলায় উদিবেই দিনমণি।

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৯৮)

বঙ্গবন্ধু মুজিবর: বিভূতি ভট্টাচার্য

বাংলার প্রিয় নাম বঙ্গবন্ধু,  সব সেরা নাম বঙ্গবন্ধু।  কবি তাঁর কবিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আখ্যায়িত করেছেন ‘পূবের সূর্য’ বলে।  অতঃপর জানিয়েছেন বহু সেলাম।  মুজিবের স্বাধীনতার ডাক যে কতটা তেজোদ্দীপ্ত হতে পারে, মুজিবের স্বাধীনতার ডাক কতটা সন্তপ্ত হতে পারে কবি তা ধৃত করেছেন এ কবিতায়।

গুলি ও বোমায়, সঙীন খোঁচায় কত প্রাণ কোরবানী

মুজিবর, ওরা পারেনি করতে স্তব্ধ তোমার বাণী,

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৯২)

মুজিবের এ স্বাধীনতার ডাক অনায়াসলব্ধ হয়ে অতিক্রম করে পদ্মা-মেঘনা-ধলেশ্বরী-কর্ণফুলি-মধুমতি আর মাঠ ও বনের সীমানা। শহর-গ্রাম-গঞ্জের আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় মুজিবের স্বাধীনতার ডাক। কাল থেকে কালান্তরে তার ব্যাপ্তি। সে ডাকে কম্পিত হয় শকুনেরা। সে ডাকে অবসান ঘটে বাঙালির দুঃস্বপ্নের অমাবস্যার রাত।  সে ডাকে এল বাঙালির সুপ্রভাত।  সে ডাক আজও বাঙালির জীবনে অক্ষয়।

এপার সীমান্তে: শান্তিময় মুখোপাধ্যায়

কবি বঙ্গবন্ধুর কমরেড হবার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন। কবির রাইফেল তাঁর কলম, তাঁর মন বারুদ, অগ্নিবর্ষী তার দৃষ্টিÑ এই উপকরণ নিয়ে সঙ্গী হতে চান বঙ্গবন্ধু মুজিবের। কঙ্গো-ভিয়েতনাম-কিউবার বিপ্লবের সাথে কবি তুলনা করেন মুজিবের বিপ্লবকে।

কঙ্গো-কিউবা-ভিয়েতনামের অংশীদার

বঙ্গবন্ধু,

জঙ্গী দানবের মুখোমুখি, আমিও তোমার সঙ্গী।

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৯১)

ওপার বাংলায় বসে কবি এপার বাংলার মুজিবের সংগ্রামে একসূত্রতা কামনা করেন―

তবুও এপারে রাত পোহাতে এখনো অনেক দেরী

তাই তোমার মৃত্যুঞ্জয়ী অহঙ্কারই আমার গর্ব। (ঐ)

বাংলাদেশ: শৈলেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

কবি জানতেন বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে। স্বাধীন হবে মুজিবের বাংলা।  কবি অদৃষ্টফল, ভোগ্যফল গণনায় বিশ্বাস না করে শতভাগ আস্থা স্থাপন করেন তাঁর আত্মবিশ্বাসে―স্বাধীন হবে সফল হবে কোটি মানুষের নায়ক মুজিবুর রহমান।  কবি জানতেন বাঙালির রক্তস্রোত একদিন আনবে নতুন দিন।  অবশেষে নতুন দিন আসে। কবি নতুন দিনকে স্বাগত জানান―

বিপ্লবী সুরের মূর্ছনায়

নতুন করে আমার

কবিতা সাজাবো  …

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৯৫)

কবি নিজেকে ধন্য মনে করেন মুজিবের বাংলায় নতুন দায়িত্বের শরিক হয়ে। আবার মহানায়ক মুজিবের উদ্দেশ্যে বলেন :

বাংলাদেশ :

তুমি ধন্য; তোমার স্বাধীন-পতাকা তলে,

সাত কোটি মানুষের নায়ক,

মুজিবর রহমান।

(দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, ২০০৫: ১৯৫)

৫.

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সংগ্রামী জীবন কবিতায় অন্তর্ময় উপলব্ধিতে অভিব্যক্ত হয়েছে। বাংলার সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হয় এ কবিতাগুলো থেকে। বঙ্গবন্ধুর আলোতেই বাঙালির জাতিসত্তার অন্তর্লোক আলোকিত; চেতনা সঞ্চারিত হয় এগিয়ে চলার মন্ত্র জপে। কখনও তাঁর ভাষাকে কেন্দ্র করে, কখনও আবার বাঙালির চেতনায় তাঁর শাশ্বত উপস্থিতি ব্যক্ত করে কবিতার ভাব নির্মিত হয়েছে। যুদ্ধকালীন সময়ে গানে বঙ্গবন্ধু উচ্চারিত হয়েছেন। যুদ্ধের স্লোগান ‘জয় বাংলা’-র সাথে ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ যুক্ত হয়েছিল। কবিরা সেই চেতনার সিঁড়ি বেয়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। শব্দ সৈনিকের মতো অপপ্রচার ও ভ্রান্ত প্রচারণা থেকে বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করেছেন। কবিতায় বঙ্গবন্ধুর জীবন্ত হয়ে ওঠা, সংগ্রাম ও বিজয় একান্তভাবেই মন্ময়। তবে কোথাও কোথাও কেবল বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।

মূলত স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু ত্যাগ-তিতিক্ষার ইতিহাস উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ওপার বাংলার কবিতায়। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল দিনরাতের কথা প্রসঙ্গেও জাতির পিতাকে স্মরণ করা হয়েছে। মুক্তিসংগ্রামের গৌরবগাথায় বঙ্গবন্ধু উন্মোচিত হয়েছেন। কোনো কবিতায় কবি সরাসরি বঙ্গবন্ধুকে জীবন্ত করেছেন। কেউ বা রূপক প্রতীকের আশ্রয় নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর ভাবব্যঞ্জনা কবিতার বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গে দীপ্তমান। ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত দেহ সময়ের হৃদয়দ্রাবী কবিতায় উৎসারিত। অনুভূতি অন্তরঙ্গ বর্ণনায় খুলে দিয়েছে কবিতার দিগন্ত। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসায় নত হয়ে আবেগময় বহিঃপ্রকাশ আছে কবিতার পঙ্ক্তিতে। স্বাধীনতার চিরায়ত অর্থ চিরঞ্জীব মুজিবকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে রচয়িতারা দেখেছেন ভালোবাসা ও অসীম কৃতজ্ঞতায়। ক) কবিদের কবিতায় ভালোবাসা-শ্রদ্ধা আত্মপ্রকাশ করেছে। খ) মহানায়কের কীর্তি তুলে ধরছেন কেউ কেউ। গ) মানুষকে আলোকিত করার স্বপ্নময় বিন্যাস রয়েছে কারও কারও পঙ্ক্তিতে। বঙ্গবন্ধুর তেজস্বিতা, দীপ্তি, মেধা, শৌর্যবীর্য ও পরাক্রম ভাস্বর এবং চিরন্তন হয়ে আছে এসব কবিতায়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জয় ও গৌরবই মহিমান্বিত করেছেন কবিরা।

গ্রন্থপঞ্জি

কবিতায় বঙ্গবন্ধু, লিয়াকত আলী লাকী ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১২

কবিতায় বঙ্গবন্ধু, বেলাল চৌধুরী ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ঢাকা, ২০১২

দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, আখতার হুসেন, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares