মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন দলিলপত্র : মুনতাসীর মামুন

প্রচ্ছদ রচনা : ৫০তম বিজয় দিবস ২০২০

রওশন আরা কাহিনি

অনেক সময় ভেবেছি মুক্তিযুদ্ধে গুজব কী ভূমিকা রেখেছিল তা নিয়ে একটি লেখা লিখব, নানা কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। আন্দোলনে, যুদ্ধে গুজব বিরাট ভূমিকা পালন করে। যারা আন্দোলন দমাতে চায় তারা এক ধরনের গুজব সৃষ্টি করে যাতে আন্দোলনকারীরা ভয় পায়। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীরাও এমন গুজব চায় যা তাদের অনুসারীদের চাঙ্গা রাখবে। অনেক গুজব পরে মিথে পরিণত হয়। যেমন রওশন আরার কাহিনিটি। ভারতীয় সংবাদপত্রে প্রায় ক্ষেত্রেই লেখা হয়েছে রোশেনারা যা শুদ্ধ উচ্চারণ নয়।

যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন অবরুদ্ধ বাংলাদেশে একটি খবর আমাদের বেশ চাঙ্গা করে তুলেছিল। তা’হলো, টিক্কা খানের মৃত্যু। রটেছিল মুক্তিযোদ্ধারা তাকে হত্যা করেছে। ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গেও তা ব্যাপকভাবে রটেছিল এবং ক্ষণিকের জন্য হলেও সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশের মানুষদের উদ্দীপ্ত করেছিল। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দর্পণ পত্রিকায় এপ্রিল মাসে ‘এই কলকাতায়’ দেখি সে খবরের উল্লেখ। এক চায়ের দোকানে তরুণ-তরুণীরা গল্প করছে। বাংলাদেশের গণহত্যায় তারা মর্মাহত। এপার বাংলার বুকের রক্ত অবরুদ্ধ স্রোতের মতো চলকে উঠল। আমাদের হৃৎপিণ্ডে কামানের গর্জন। কিন্তু অসহায়, সীমান্তের এপারে বন্দি এবং ওপারের … দোসর আমরা অসহায় আক্রোশে মূক হয়ে গেছি। সুদীপ্তর চোখে জল। আমাদের চোখের ওপর উত্তপ্ত জলীয় বাষ্প।

‘টিক্কা খা নিহত!’ কাগজ থেকে এক নরপশুর ভবলীলা সাঙ্গ হওয়ার কথা সোল্লাসে চিৎকার করে কেন যেন জানাচ্ছে।

‘সামসুদ্দীনের গুলিতে জঙ্গি জল্লাদ টিক্কা নিহত? জয়, জয় বাংলা!’ বিমর্ষ চায়ের দোকানে বিজয়ের সবের জয়ধ্বনি বেজে উঠল আবার।’

[দর্পণ, কলকাতা, ৯.৪.১৯৭১]

অমিতাভ চৌধুরীতো আনন্দবাজারে একটি ছড়াই লিখে ফেললেন। ঐ সময় বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু ছড়া লিখেছিলেন তিনি―

টিক্কা তোলেন হিক্কা

এক গুলিতেই কাৎ!

ভুট্টো এবং ইয়াহিয়া

ঠুঁটো জগন্নাথ।

অবশ্য, কয়েকদিন পর জানা যায় খবরটি মিথ্যা। আমরা তখন চুপসে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও গুজব রটেছিল যে তিনি গ্রেফতার এড়িয়েছেন। পরে ছবিসহ তাঁর গ্রেফতােেরর খবর প্রকাশিত হলে সবাই সেই কঠিন সত্য মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু কিছু কিছু খবর/গুজব মিথে পরিণত হয়। রওশন আরার কাহিনি সে রকম একটি মিথ যা এখনও অনেকে বিশ^াস করেন। যুদ্ধের পুরো নয় মাস রওশন আরার আত্মত্যাগের কাহিনি অবরুদ্ধ দেশের মানুষ, শরণার্থী, মুক্তিযোদ্ধা এবং যারা ভারতে আন্দোলন করছিলেন বাংলাদেশের জন্য তাদের সবাইকে উদ্দীপ্ত করেছিল। পত্র পত্রিকায় এ নিয়ে নানা কাহিনি প্রকাশিত হয়েছিল। কাহিনিটি হলো, ঢাকার এক তরুণী ছাত্রী বুকে মাইন বেঁধে পাকিস্তানি একটি ট্যাংক উড়িয়ে দিয়েছে এবং নিজে শহিদ হয়েছেন। খবরটি আমাদের কীভাবে উদ্দীপ্ত ও গর্বিত করেছিল তা আজ আর বোঝানো যাবে না।

১১ এপ্রিল বার্তা সংস্থা ইউ এন এ খবরটি পরিবেশন করে―

‘রোশোনারা বেগমের নামে মৃত্যু… জলপাইগুড়ি, ১১ এপ্রিল (ইউএন) বুকে মাইন বেঁধে পাক সমরাস্ত্র ট্যাঙ্কের সামনে জীবন উৎসর্গ করে ঢাকার রোশোনারা বেগম ট্যাঙ্ক ধ্বংস করে যে অতুলনীয় বীরত্ব দেখিয়েছিলেন তারই নামে বাংলাদেশে মুক্তিফৌজ একটি আত্মোৎসর্গ বাহিনী গড়ে তুলেছেন। নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে এরা রোশেনারা বেগমের মতো পাকিস্তানি সমরাস্ত্র ধ্বংস করবেন।

শীর্ষ স্থানীয় একজন আওয়ামলী লীগ নেতা জানিয়েছেন বিপুল সংখ্যক যুবক এ বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, এই বাহিনী ভারত ও অন্যান্য দেশ থেকে অস্ত্র ক্রয়ে আগ্রহী।’

[দৈনিক কালান্তর, কলকাতা, ১২.০৪.১৯৭১]

বামপন্থার সমর্র্থক ছিল সাপ্তাহিক কম্পাস। এর সম্পাদক ছিলেন ফরিদপুরের বিপ্লবী পান্নালাল দাশগুপ্ত [১৯০৯Ñ১৯৯৯], ১৯৭১ সালে কম্পাস― এর প্রতিটি সংখ্যাকেই বলা যায় বাংলাদেশ সংখ্যা। এ রকম এক সংখ্যায় আবদুল কাদের লিখলেন― ‘বাংলাদেশ বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় গেরিলা যুদ্ধের মূলসূত্র’। গেরিলারা কী পদ্ধতিতে যুদ্ধ করতে পারেন তার ১৯টি সূত্র তিনি দিয়েছিলেন। শেষ বা ১৯নং সূত্রে লিখেছিলেন―

‘১৯. শত্রুদের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বানচাল করা চাই। ধরা যাক, শত্রুরা ক্ষুধার্ত। আমাদের একজন ফেরিওয়ালা সেজে আম কাঁঠালের মতো ঠিক দেখতে কতগুলো বোমা পটকা বানিয়ে এদের সামনে গিয়ে হাজির হলেন। সুবিধা বুজে সব বোমা-পট্কা ছুড়ে তিনি শত্রুদের ঘায়েল করতে পারেন। একটি পাঁঠা, একটি ছাগল, খাসি বা গরুর গলায় মাইন বেঁধে শত্রুদের ঘাঁটির দিকে আমরা ছেড়ে দিলাম। শত্রু সৈন্যরা এর মাংস খাওয়ার লোভে দূর থেকে একে যদি গুলি করে, তা’হলে মাইন ফেটে মুহূর্তের মধ্যে সব শত্রু পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। [ কী অসম্ভব কল্পনা শক্তি!]

তখন বীরাঙ্গনা রোশেনারার (যিনি বাংলাদেশের রণাঙ্গনে নিজেকে বলি দিয়ে মাইন ফাটিয়ে শত্রুর ট্যাঙ্ক ধ্বংস করেছেন) কাজ বিনা আত্মবিসর্জনের সম্ভব হবে।’[কম্পাস, ১৯.৬.১৯৭১]

রওশন আরার কাহিনিটি প্রচারিত হয় ৩১ মার্চ। ২ এপ্রিল কলকাতায় মহিলারা ‘রোশোনারা’ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

মহিলা সভায় ‘রোশেনারা’ দিবস পালনের আহ্বান

(ষ্টাফ রিপোর্টার)

কলিকাতা, ১ এপ্রিল― আজ ‘বাঙলাদেশের’ মুক্তিসংগ্রামের সমর্থনে একটি মহিলা সভায় আগামী ৫ এপ্রিল ‘রোসেনারা দিবস’ হিসেবে পালন করার জন্য পশ্চিম বাঙলার নারী সমাজের কাছে আহ্বান জানানো হয়। শ্রীমতী রোশেনারা বেগম ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রথম বার্ষিক শ্রেণির ছাত্রী, যিনি নিজের বুকে মাইন বেঁধে পাক সৈন্যদের প্যাটন ট্যাঙ্কের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ট্যাঙ্কটি বিধ্বস্ত করেন। পূর্ব বাংলার ভাইÑবোনেদের আত্মত্যাগের জ¦লন্ত দৃষ্টান্তের… প্রকাশ শ্রীমতি বেগম।’ [ দৈনিক কালান্তর, ২.৪.১৯৭১]

এ সংক্রান্ত আরেকটি সংবাদ প্রকাশিত হয় দু’দিন পরÑ

৫ এপ্রিল ‘রোশেনারা দিবস’ উপলক্ষে মহিলা বিক্ষোভ মিছিল

ভারতীয় মহিলা ফেডারেশনের পশ্চিমবঙ্গ কমিটির উদ্যোগ

(স্টাফ রিপোর্টার)

কলিকাতা, ৩ এপ্রিল― ঢাকা মহিলা কলেজের যে ছাত্রীটি বুকে ‘মাইন’ বেঁধে পাকিস্তানি ট্যাঙ্কের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার আত্মবলিদানের জ¦লন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সেই রোশেনারা বেগমের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনার্থে ভারতীয় মহিলা ফেডারেশনের পশ্চিম বঙ্গ কমিটি আগামী সোমবার ৫ এপ্রিল ‘রোশেনারা দিবস’ পালনের আহ্বান জানিয়েছে।

ঐ দিন রাজ্যের সমগ্র মহিলা সংগঠন, ছাত্রী শিক্ষিকা সহ সকল নারী সাধারণকে বেলা ৩টায় শহীদ মিনার ময়দানে দলে দলে সমবেত হওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছে। ঐখান থেকে পাকিস্তান হাই কমিশন এবং ব্রহ্মদেশের কন্সুলেট দপ্তরের সামনে মহিলা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যাওয়া হবে। এই মিছিলে যোগদানের জন্যে বিশেষভাবে ছাত্রী সমাজের কাছে আবেদন করা হয়েছে। [ঐ, ৪.৪.১৯৭১]

৫ তারিখ পালিত হয় ‘রোশোনরা দিবস’। ঐ দিন কলকাতায় ‘সুদীর্ঘ জঙ্গী মহিলা বিক্ষোভ মিছিল’ হয়। পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ীÑ

রোশেনারা দিবসে মহিলাদের বিক্ষোভ মিছিল

(স্টাফ রিপোর্টার)

কলকাতা, ৫ এপ্রিলÑ আজ ভারতীয় মহিলা ফেডারেশনের পশ্চিমবঙ্গ শাখার উদ্যোগে এক সুদীর্ঘ …  মহিলা বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়। মিছিলটি শহীদ মিনার থেকে যাত্রা শুরু করে এবং বিভিন্ন … পরিক্রমার পর কলকাতাস্থিত পাক হাইকমিশনারের আবাসের সামনে এসে পাকিস্তানের ইয়াহিয়া সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

এপার বাঙলার মেয়েরা ওপারের নারী সমাজকে অভিনন্দন জানিয়ে মিছিলে আওয়াজ তোলেন― ‘এপারের মেয়েরা ওপার বাঙলার পাশে আছে’, এবং সেই সংগ্রাম নারী সমাজের মূর্ত প্রকাশ অমর শহীদ বীরাঙ্গনাকে স্মরণ করে ধ্বনি তোলে― ‘বীরাঙ্গনা রোশেনারা তোমায় আমরা ভুলিনি ভুলব না।’

মিছিলটির পক্ষ থেকে পাক হাই-কমিশনারের কাছে একটি প্রতিনিধিদল একটি স্মারকলিপি দিয়ে আসেন। স্মারকলিপির অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে ‘বাঙলাদেশ থেকে পাকিস্তানি ফৌজ প্রত্যাহার করা হোক এবং বাঙলাদেশের স্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।’ [ঐ, ৬.৪.১৯৭১]

বিক্ষোভ সমাবেশের মধ্যে মিছিলটি শেষ হয়। বক্তব্য রাখেন অরুণ মুন্সী, অর্পণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ইলা মিত্র প্রমুখ।

একই তারিখে… ‘রোশেনারা দিবস’ পালিত হয়। আরও পরে দৈনিক যুগান্তর এক সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করে―

অল্পদিন আগেই ঢাকা মহিলা কলেজের ছাত্রী রোশেনারা মাইন বুকে বেধে শত্রু ট্যাঙ্কের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মদানের মূল্যে ট্যাঙ্কটি ধ্বংস করে অমর হয়েছেন। আর একটি ছাত্রী নিবাসের অর্ধশতাধিক তরুণী মাত্র সেদিন কোন পথ না দেখে ছাদ থেকে নিচের তলায় লাফিয়ে পড়ে মৃত্যু বরণের দ্বারা জহরব্রতী রাজপুত ললনাদের ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবীত করেছেন। পূর্ব বাংলার বীরাঙ্গনাদের নামে তাই সত্য ও মনুষ্যত্বের পূজারি মাত্রেই জয়ধ্বনি দেবেন। প্রাণের চেয়ে মান বড় সবচেয়ে বড় দেশ ও জাতি, উপলক্ষে এই চিরপুরান কথাটি তাঁরাই মনে করিয়ে দিলেন নূতন করে। [ ১২.৪.১৯৭১]

বলা বাহুল্য, দ্বিতীয় খবরটিও সত্য নয়, কিন্তু, এ খবর দিয়েও উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

রওশন আরাকে নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় কবিতাও লেখা হয়েছে। এমনি একটি কবিতার উদ্ধৃতি দিচ্ছি। এটি লিখেছিলেন বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঠাকুর পরিবারের বিপরীতে ছিল তাঁর অবস্থান। বামপন্থায় ছিলেন বিশ^াসী। ইউরোপ, সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিলেন দীর্ঘ দিন। ৩ বৈশাখ, ১৩৭৮ (… এপ্রিল ১৯৭১] সাপ্তাহিক দেশ-এ ‘রোশেনারা’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল কবিতাটি―

ধূসর আকাশ তোমার পরশে সহসা হয়েছে নীল,

বাংলার নদী তোমার প্রাণের জোয়ারে দুকূলহারা,

তুমি খুলে দেছো মোদের প্রাণের রুদ্ধদ্বারের খিল,

চির-বসন্ত বাংলার তুমি, অতুলন্য রোশনারা।

আবার বুকের নীড়ে স্বপ্নদল করিয়াছে ভিড়,

আবার জেগেছে প্রাণে মৃত্যুক্ষয়ী আশার ফোয়ারা,

অবিশ^াস ঠেলে ফেলে ভালোবাসা তোলে তার শির,

এ সব তোমারই সৃষ্টি-বাঙলার মেয়ে রোশনারা।

দুর্জয় বিপ্লব বহ্নিজ¦লে নিত্য বাংলার প্রাণে,

ক্ষুদ্র যাহা, ভীরু যাহা অগ্নিভয়ে মিলায় তাহারা,

নিখিলের হিয়া তুমি ভরে দিলে আগুনের পানে,

বহ্নির রূপ ধরি দেখা দিলে তুমি রোশনারা।

করিমগঞ্জ ভারতের এক প্রান্তে। আসাম রাজ্যের অন্তর্গত। সেখান থেকে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সংবাদপত্র আজাদ। সেই পত্রিকায় প্রায় প্রতিসংখ্যায় থাকত কবিতা। নামহীন এইসব কবিদের কবিতায় ছিল কাঁচা আবেগ। এবং তা তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভারতের তৃণমূলের ভালোবাসা। রওশন আরার নাম সেখানেও পৌঁছেছিল। সম্পাদক মুসলমান ছিলেন দেখে শিরোনামে বানান ঠিকই আছে রওশন আরা। কবি কিন্তু ভারতীয় বাঙালিরা যে ভাবে নাম লিখতেন [বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের] সেভাবেই লিখেছেন রোশেনারা। কামরূপ থেকে গোলকেশ^র গোস্বামী লিখেছেন। কবিতাটি [৫. ৫. ১৯৭১]Ñ

রওশন আরা ।।

(শ্রী গোলকেশ^র গোস্বামী, কামররূপ)

রোশনি দেখেছি পদ্মার বুকে

রক্তাক্ত পূব বাংলার বুকে

আবাল বৃদ্ধ বনিতা আজ জেগেছে

নতুন সূর্য্যালোকে শ্যামলী বাংলায়

অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে তারা

আত্মহারা

এই রোশনি দেখার কামনা

মুক্তবায়ু সেবনের স্পৃহা

আদিম স্পৃহা। চিরন্তন

ধন্যা ভগিনী রোশনারা

তুমি আদ্যশক্তি রূপিনী

মহিষাসুর ধ্বংসের জন্যে

অবতরি সোনার বাংলার বুকে।

বুকে বেঁধে মাইন

এহিয়া ধ্বংসের কামনায়

আত্মাহুতি আজ বিশে^র মুখে

বিফল হবে না আত্মাহুতি তোমার

জয় বাংলাদেশ জয় ভগ্নী রোশেনারা

                আজাদ, কাছাড়, ১২.৫.৭১, ২৮ বৈশাখ ১৩৭৮

বেহেস্তের রোশনাই ‘রোশেনারা’

রমেন চৌধুরী

আমার দু-চোখ ভরা

এ কি বিষাদেরÑনা কি আনন্দের।

না কি দুয়েরই সংমিশ্রণ?

বিষাদÑকেননা নিষ্পাপ পবিত্র এক

স্বর্গের পারিজাত

নারকী দুশমন হানাদারকে চরম আঘাত হেনে

ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল অকালে।

কিন্তু তার সৌরভ দিকবিদিক প্লাবিত করেছে।

আর আনন্দÑ

আনন্দ সেই অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগের

অপূর্ব মহিমা স্মরণ ক’রে;

বাঙলাদেশের বুকভরা মধু

আমারি মা-বোন-কন্যার সমগোত্রীয়া

কী অবলীলায় না আত্মদান করলো সেই অগ্নিক্ষরা, দেবতার দর্শনীয় দৃশ্য

কল্পচক্ষে প্রত্যক্ষ ক’রে।

ওপার বাঙলার ওগো বেহেস্তের রোশনাই

বেগম রোশেনারা

তুমি ওপার এপার এই বাঙলারই শুধু নও

তুমি সারা দুনিয়ার মুখ উজ্জ্বল করেছো।

তোমার আত্মদানে

শুধু ট্যাংকই ধ্বংস হোলো না

সেই সঙ্গে ধ্বংস হ’তে চলেছে চিরতরে

আকাশচুম্বী শয়তানের স্পর্ধাও।

তোমার জীবনদান কখনও ব্যর্থ হবে না―

হতে পারে না !

স্বাধীনতার সাতরঙা সূর্য

বাঙলাদেশে উঠবেই

এই ঝঞ্ঝাবর্ত কুহেলিকা

অপসৃত হবেই।

আমরাই রোশনাই ‘রোশেনারা’

তোমার নাম―গান গেয়ে

এপার বাঙলার কবি গর্ব বোধ করেছে !!

কালান্তর; ১৪.৫.১৯৭

নামী কবি সিদ্ধেশ^র সেন পর্যন্ত তাঁর কবিতায় উল্লেখ করলেন রোশেনারার কথা―

……বুকে বেঁধে নিয়ে মাইন যে নব মমতা

প্যাটন ট্যাঙ্কে ঝাঁপিয়ে পড়া

জয়, জয়, জয় কিশোরী ঢাকেশ^রী

বাংলা, রোশেনারা

জনসাধারণ জয়

আজাদীর ঝঞায়……

[ বাংলাদেশ, অপারÑকালান্তর, ২৯.৪.১৯৭১]

৪ঠা এপ্রিল মনোজ বসু দৈনিক আনন্দবাজারে ছোট একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। তাতেও ছিল রোশনারার নাম। লিখেছিলেন তিনি― ‘আধুনিকা কলেজি মেয়ে, এই সেদিন অবধি অতি বড় শৌখিন মেয়ে― বিশৃঙ্খল বেশাভূষা, হাঁটুভর ধুলো, বিশুদ্ধ মুখ। সে মুখে কতদিন ভাত ওঠেনি কে জানে। তপস্বিনী মূর্তি এরাও সব ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। ফার্স্ট ইয়ারের মেয়ে রোশেনারা বেগম এদেরই একটি। বুকে যে মাইন বেঁধে শত্রুর প্যাটন ট্যাঙ্কের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ট্যাঙ্ক ঘায়েল হলো সোনার মেয়ে নিজেও ছিন্ন ভিন্ন। আমি তোমাদের কোন সেবায় লাগতে পারি মা জননীরা― ক্ষুধার অন্ন? অঙ্গ বস্ত্র? মাথার ওপরে আচ্ছাদন? তাঁরা বলে, অস্ত্র―

অস্ত্র দাও, অস্ত্র দাও― বলে হাজারে হাজারে হাত বাড়িয়ে ধরেছে।

২.

এবার দেখা যাক এ কাহিনির শুরু কী ভাবে? এ কাহিনির নির্মাতা সাংবাদিক বিকচ চৌধুরী। ১৯৭১ সালে আগরতলা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদ― এর সংবাদদাতা। লিখেছেন তিনি―

‘আমি তখন সীমান্তের বিভিন্ন প্রান্ত কখনও তেলিয়া পাড়া কখনও ব্রাহ্মণবাড়িয়া আবার কখনও বয়সগড় কখনও আখাউড়া ঘুরে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করি। বীরত্বের অমর কাহিনির সংবাদ পরিবেশন করি। কখনও বা রণাঙ্গনের শৌর্যবীর্যের কাহিনি সংগ্রহ করি। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশে অকুতোভয় মানুষের রঙ্গ কৌতুকের কাহিনিও তার থেকে বাদ যায় না। তবে বেশির ভাগ সংবাদই ছিল মানবতার মূল্যবোধকে তুলে ধরার তাগিদে। অন্যদিকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সংবাদের জন্য কখনও বাংলার দামাল ছেলে মেয়েদের কল্পিত বীর গাঁথা আমাকে তৈরি করতে হয়েছে, ১ এপ্রিল আমারই কলমে বেরুল এরকম একটি সংবাদ।

একটি কলেজ পড়ুয়া মেয়ে রাজপথে নেমে বুকে মাইন বেঁধে যখন সেনাদের একটি ট্যাঙ্ক উড়িয়ে দিয়েছে। মেয়েটির নাম দিয়েছিলাম ফাতেমা বা অন্য কিছু। (স্বভাবতই সেই সময়ের প্রয়োজনে একটি কল্পকাহিনি মাত্র) ছফা ভাই হাতে কলম নিয়ে বলে উঠলেন কলেজ পড়ুয়া মেয়ের আধুনিক নাম হওয়া উচিত। তিনি নামটি শুদ্ধ করে দিয়েছিলেন রওশন আরা বলে।’ [বিকচ চৌধুরী, … ঝড়ের ঠিকানা, আগরতলা, ২০০৩]

ছফা ভাই হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত লেখক প্রয়াত আহমদ ছফা। তখন তিনি গেছেন আগরতলা। কবিÑসাংবাদিক মিহির দেব লিখেছেন― ‘একদিন সন্ধ্যায় আমরা পত্রিকা অফিসে [ দৈনিক সংবাদ] বসে আছি। একজন লোক এসে বলল তার নাম আহমদ ছফা। সে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে যে কোন কাজ করতে চায়। ‘গভীর দায়িত্বশীলের’ মতো আমরা তাকে প্রথমেই গুপ্তচর বলে সন্দেহ করে ফেললাম। দু’তিন দিন পরে অবশ্য আমাদের ধারণা পরিবর্তিত হলো। আমেদ ছফা লেখালেখি মিটিং মিছিল ইত্যাদির ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিল।’ [ঐ]

বিকচ চৌধুরীর সঙ্গে ঐ পত্রিকা অফিসেই এভাবে আমেদ ছফার পরিচয়। এবং একত্রে কাজ করতে গিয়েই ফাতেমা নামটা বদলে রওশন আরা করে দিয়েছিলেন।

দৈনিক সংবাদের ১ এপ্রিল সংখ্যায় বিকচ চৌধুরীর প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়―

‘ঢাকার রওশান আরা তাঁর অমূল্য জীবনকে অর্ঘ্য দিয়ে মানুষের ইতিহাসে চিরস্থায়ী অধ্যায় রচনা করেছে। রওশন আরা ঢাকা মহিলা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। পাক নাজী বাহিনীর ট্যাঙ্কের আক্রমণে যখন ঢাকার নাগরিক জীবন বিধ্বস্ত তবু মানুষের মনে স্বাধীনতার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অবিশ^াস থাকেনি। তখন এই তরুণী তাঁর বুকে মাইন বেঁধে নিয়ে রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ট্যাঙ্কের নিচে। গোলা বোঝাই এই ট্যাঙ্ক তীব্র গর্জনে মুখ থুবড়ে পড়ে। রওশন আরা তাঁর জীবনকে সার্থক করে তুলেছে মহৎ আত্মাদনের মধ্য দিয়ে।’

ঢাকায় মহিলা কলেজ নামে ঐ সময় কোন কলেজ ছিল না। ট্যাঙ্ক তখন ঢাকার বুকে নেই। অপারেশন সার্চলাইট সেরে ফিরে গেছে সেনা নিবাসে। রওশন আরা মাইন পেল কোথায়? এ রকম অনেক প্রশ্ন তোলা যেত। কিন্তু, এসব প্রশ্ন কেউ তোলেনি। পত্রপত্রিকায় কখনও তাকে কলেজ কখনও বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রী বলা হলো। পশ্চিম বঙ্গের সাংবাদিক লেখকরা রওশন আরাকে ‘রোশেনারা’ বানিয়ে দিলেন। বিকচ চৌধুরী নামটি শুদ্ধ লিখেছিলেন। কিন্তু পশ্চিম বঙ্গের লেখকদের একটি ঝোঁক আছে বাংলাদেশের মুসলমানদের নাম বিকৃতভাবে লেখা (সচেতন ভাবে না)। ‘রোশেনরা’ নামেই তরুণী বিখ্যাত হয়ে গেলেন সারা ভারতে। গুজবের জোর এমনই।

সেই দিনই বিদেশী সাংবাদিকরা এটি লুফে নেন। বার্তা সংস্থা ইউএন আই সংবাদটি পরিবেশন করে। দৈনিক কালান্তর খবরটি পরিবেশন করে এভাবে―

‘বীরাঙ্গনা আগরতলা, ৩১ মার্চ (ইউ এন আই) ―বীরাঙ্গনা রোশেনারা বেগম ঢাকা মহিলা কলেজের প্রথম বার্ষিক শ্রেণির ছাত্রী এক তুলনাহীন শৌর্য ও আত্মত্যাগের জ¦লন্ত স্বাক্ষর রেখে গেছেন। গত শুক্রবার রোশেনারা নিজের বুকে মাইন বেঁধে পাকিস্তানি প্যাটন ট্যাঙ্কের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ফলে ট্যাঙ্কটি বিধ্বস্ত হয়ে যায়।’

[১.৪.১৯৭১]

পরদিন পত্রিকাটি সম্পাদকীয় লেখে―

‘প্রসঙ্গেক্রমে অবিস্মরণীয় আত্মদান’

স্বাধীন বাঙলাদেশ এর অতুলনীয় মুক্তি সংগ্রা সেখানকার মা-বোনদের অন্দরের অন্ধকার থেকে প্রকাশ্য রণাঙ্গনে টেনে এনেছে। বাঁচা নয় মেরে মরা―এই আদর্শে উদ্বেলিত রমণীদের প্রতি স্বাধীন বাঙলা বেতারকেন্দ্র থেকে আবেদন জানানো হচ্ছে, ‘আপনারা রাম দা, দা বঁটি, কুড়াল, খন্তা, এমন কি শুকনো মরিচের গুঁড়ো যা দিয়ে সম্ভব হানাদার বদমায়েশদের প্রতিরোধ করুন।’ সন্তানের প্রতি মায়ের মমতা ভালোবাসাই আজ এই বীরাঙ্গনাদের শত্রু দমনে উদ্বুদ্ধ করেছে। এমনই পটভূমিতে সীমান্তের ওপার থেকে এমন একটি মহান আত্মদানের সংবাদ এসেছে যাতে বাঙলাদেশ-এর সমগ্র সংগ্রামী নারীকুলের প্রতি শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত হয়ে যায়। ঢাকা মহিলা কলেজের প্রথম বার্ষিক শ্রেণির ছাত্রী রোশেনারা বেগম নিজের বুকে মাইন বেঁধে হানাদারদের একটি প্যাটন ট্যাঙ্কের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং ট্যাংকটি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। শঙ্কা ও মৃত্যুভয়ের ঊর্ধ্বে এই বালিকাটির জ¦লন্ত আত্মত্যাগের আগুন মুক্তিপাগল বাঙলাদেশ-এর লাখ লাখ প্রাণের বলিদানের অধ্যায়টিকে উজ্জ্বলতর করে তুলেছে। রুশ, চীন ও ভিয়েতনাম নিজেদের মৃত্যুর ভেতর দিয়ে শত্রু সৈন্যের সমরাস্ত্র ধ্বংস করার কাহিনি এখন কিংবদন্তী হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের অন্তর্কলহ ও আত্মধ্বংসী রাজ্যের প্রতিবেশী একটি দেশ মানবতা ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য এ যেন অভূতপূর্ব আত্মবলিদানের ঘটনা একটি তুলনাহীন নজির। একটি অসাধারণ দেশ প্রেমিকা কিশোরীর এমন দৃষ্টান্ত আমাদের ভ্রান্ত স্বস্তিকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্যও লজ্জিত করুক।’

অন্যদিকে আগরতলায় হৈ চৈ। ৮ এপ্রিল স্কুল কলেজের ছাত্রীরা রওশন আরা দিবস পালন করে। ‘নারী অভ্যুদয়’-এর রাজ্য কমিটির পক্ষে মায়া রায় চৌধুরী এক বিবৃতিতে ‘রওশন আরা দিবসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ভারত সরকারের কাছে মুক্তি সংগ্রামী সাহায্য করার আবেদন জানান। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গড়ে ওঠে রওশন আরা ব্রিগেড।

বিকচ চৌধুরী লিখেছেন, “১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রয়াত আহমদ ছফা আমাকে ‘রওশন আরার জনক’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।” কিন্তু, সেটি খুব একটা প্রচারিত হয়নি। আমরাও গবেষণাকালে পড়ে বিষয়টি জেনেছি। তবে, এখনও ১৯৭১ সালে যারা ছিলেন বাংলাদেশে তাদের জিজ্ঞেস করলে দেখবেন, এই কাহিনি এখনও তারা বিশ^াস করেন। গুজব এভাবেই মিথ হয় আর মিথের জোর এমনিই। যেমন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘সোনার বাংলা’র কথা। বাংলা কখনও সোনার ছিল না। এখানের মানুষ অধিকাংশ সময় না খেয়ে না দেয়ে এক কাপড়ে থেকেছে। কিন্তু বাংলাদেশ যুদ্ধে এই ‘সোনার বাংলা’ গড়ার কথা বিশেষ প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে। আমার ছাত্র তরুণ গবেষকদের বলেছিলাম গুজব/মিথ ও ১৯৭১-এর ওপর গবেষণা করতে। এ সংক্রান্ত ছিন্ন দলিলপত্রগুলো জোগাড় করতে। হয়তো ভবিষ্যতে কেউ এগিয়ে আসবেন এই গবেষণায়।

নিয়াজীর চিঠিতে গণহত্যার নীলনকশা

আমি ১৯৯৮ সালে লাহোরে লে. জে. নিয়াজীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন ইউপিএলের কর্ণধার মহিউদ্দিন আহমদ। নিয়াজী খুবই বিনয়ের সঙ্গে আমাদের গ্রহণ করেছিলেন। আপ্যায়ন করেছিলেন। কিন্তু আমরা সর্তকতার সঙ্গে আপ্যায়িত হওয়া থেকে বিরত থেকেছি। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছি। তাঁর গ্রন্থে তিনি যা বলেছেন, সাক্ষাৎকারেও মোটামুটি তাই বলেছিলেন। এর মূল হলো, তিনি যা করেছেন তা নির্দেশিত হয়েই। বাঙালিদের প্রতি তার বিদ্বেষ নেই ইত্যাদি। আমরা তাতে ভুলিনি। কারণ, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি জেনারেলরা শুধু নির্দেশিত হয়েই নয়, স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও বিভিন্ন কাজ করেছেন। এর প্রমাণ এই দলিলটি। নিয়াজী কর্তৃক লিখিত একটি চিঠি। চিঠির তিনটি পাতা পেয়েছি। খুব সম্ভব আরও দু’একপাতা ছিল ভূমিকা হিসেবে। এই চিঠি ছিল ব্যবসায়ী এহিয়া আহমদ বাওয়ানীর একটি ফাইলে। এর অর্থ পশ্চিমা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি জেনারেলরা বিশেষ সম্পর্ক রাখতেন। চিঠিটি সেই ফাইল থেকে সংগ্রহ করেছিলেন লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের তৎকালীন লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার মুস্তাফিজুর রহমান। পরে এটি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের আইবিএসের সচিব এসএম গোলাম নবীর সংগ্রহে আসে। দলিলটি আগে কেউ দেখেনি। এখন তা আছে খুলনার ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরে―যা প্রদর্শিত হচ্ছে। দলিলটি জাদুঘরে দান করেছেন ড. মাহবুবর রহমান।

এ নথিটি নিয়াজীর কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এর শেষ পাতায় লেখা ‘ডকুমেন্ট অব জে. নিয়াজী’স কনসপিরেসি’। স্বাক্ষর কার জানি না। তবে যিনি এটি সংগ্রহ করেছিলেন, জনাব রহমান, তিনি লিখেছেন―‘এই তথ্য এহিয়া আহমদ বাওয়ানীর ফাইল হইতে সংগ্রহ করা হইয়াছে। ইহা রাও ফরমান আলীর নিকট লিখিত চিঠির অনুলিপি।’ খুব সম্ভব এই নথির কপি সদর দফতর থেকে কেউ বাওয়ানীকে দিয়েছিলেন।

এটি ভাবার কারণ আছে। এ চিঠিটি অনুমান করছি এপ্রিল মাসে ঢাকায় এসে সব পর্যবেক্ষণ করে নিয়াজী লিখেছিলেন। এ নথিতে বাঙালিদের সম্পর্কে যে সব মন্তব্য করা হয়েছে তা সব পাকিস্তানিরাই মনে করতেন [বিস্তারিত মুনতাসীর মামুন পাকিস্তানি জেনারেলদের মন] এটি নতুন কিছু নয়। সমস্যা সমাধানের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা এক নির্বোধ ও হঠকারী মনের। নিয়াজী সম্পর্কে সবার ধারণা ছিল কম-বেশি তা। নিয়াজী একমাত্র নিজেকেই সবার ওপরে মনে করতেন। আর এ ধরনের উপদেশ বা পরামর্শ তিনিই দিতে পারেন যিনি দায়িত্বে ছিলেন।

 মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ঢাকা ত্যাগ করেন এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে। তিনি নিয়াজীর যে চরিত্র চিত্রণ করেছেন তার ছায়া পাওয়া যাবে এ নথিতে।

১০ এপ্রিল নিয়াজী ঢাকায় এক সভা আহ্বান করেন অফিসারদের। সেখানে বাঙালি কিছু অফিসারও ছিলেন। রাজা লিখেছেন, কিছুক্ষণ পর উর্দুতে নিয়াজী অশালীন ভাষায় কথা বলতে লাগলেন। তিনি বললেন, ‘ম্যায় ইয়ে হারামজাদা কৌম কি সল বদল দুঙ্গা, ইয়ে মুঝে কেয়া সমঝতা হ্যায়’ [ আমি এই হারামজাদা জাতির চেহারা বদল করে দেব। আমার সম্পর্কে এদের ধারণা কী?] তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, বাঙালি মহিলাদের ওপর তার সৈন্যদের তিনি লেলিয়ে দেবেন। তার এসব মন্তব্যে সভায় পিন পতন নিস্তব্ধতা।

সভা শেষ হলো। পরদিন দুঃখজনক সংবাদ জানা গেল। ক্যান্টনমেন্টের স্নানঘরে মেজর মুশতাক নামে এক বাঙালি অফিসার আত্মহত্যা করেছেন। আসলে এটি ছিল হত্যা।

রাজার মন্তব্যও এই অনুমান প্রমাণ করে―

‘It is a pity that he should have been the first casualty of Niazis words and deeds.’

১১ তারিখে রাজা গেলেন নিয়াজীর সঙ্গে তার অফিসে দেখা করতে। নিয়াজী তাকে বললেন―‘ইয়ার লড়াই কী ফিকর নাহি করো, ওইয়া তো হাম কর লয় গে। আভি তো মুঝে বেঙ্গলি গার্ল ফ্রেন্ডস ক্যা ফোন নম্বর দে দো’ [দোস্ত, লড়াই নিয়ে চিন্তা করো না, ওটা আমি করে নেব। তুমি বরং তোমার বাঙালি গার্ল ফ্রেন্ডদের ঠিকানা আমাকে দিয়ে যাও] পি আই এর এক অফিসাররের স্ত্রীকে নিজ অফিসে ধর্ষণের অভিযোগও তখন শোনা গেছে নিয়াজীর বিরুদ্ধে।

এ সব উদাহরণ থেকে অনুমান করে নেওয়া হয়েছে এটি নিয়াজীর নথি।

নিয়াজীর এই চিঠি  সত্য-মিথ্যা ও পূর্ব ধারণা মিশ্রিত এক চিঠি। তবে, বলতে পারি, পাকিস্তানি প্রায় সব কর্মকর্তার ধারণা নিয়াজী থেকে আলাদা কিছু ছিল না। নিয়াজী প্রকাশ্যে এসব ধারণার কথা বলেছেন এই যা তফাত।

বাংলাদেশে কী করা যেতে পারে তার প্রস্তাব ছিল চিঠিতে। ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিয়াজী তা পাঠিয়েছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর কাছে। চিঠির যে অংশটি আমাদের হাতে এসেছে তার শিরোনাম ‘দি রেমেডি।’ চিঠিতে নিয়াজী উল্লেখ করেছেন মার্চ/এপ্রিল ১৯৭১ সালে বাঙালিদের শেষ বিদ্রোহ ছিল সুপরিকল্পিত; ঠান্ডা মাথায় নিষ্ঠুরতার সঙ্গে বিহারি মুসলমানদের হত্যা করা হয়। এদের বিহারি বলে নয়, পাকিস্তানিদের সমর্থক বলেই হত্যা করা হয়েছে। অত্যাচার এমন ছিল যে অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয় হিন্দু সৈন্যরাও বিহারিদের বাঁচিয়েছে। অন্যদিকে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবাঙালি হিন্দু ব্যবসায়ীরা আছে। জয় বাংলা স্লোগানধারীরা তাদের ভাই মনে করে।

বিহারি হত্যাকে ২৬ মার্চ গণহত্যা চালাবার একটি অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করেছিল পাকিস্তানি জেনারেলরা। তাদের প্রত্যেকের বইতেই এ কথা আছে, যা সত্য নয়। হিন্দুদের প্রতি তাদের বিদ্বেষ ছিল চরম। নিয়াজী বোঝাতে চেয়েছেন― বিহারিদের প্রতি নিষ্ঠুরতা এত ভয়ঙ্কর ছিল যে হিন্দু ভারতীয় সৈনিকরা তাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু মার্চ/এপ্রিলে বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য আসবে কোত্থেকে?

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে নিয়াজী একটি সত্য কথা লিখেছেন। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগ একা শুধু বাংলাদেশ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত নয়। বাংলাদেশের প্রায় সবাই এর সঙ্গে জড়িত। শুধু তাই নয়, তাঁর মতে, বাংলাদেশ বিরোধী যারা তাদেরও বিশ^াস করা যায় না। নিয়াজী লিখেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি যে বিশ^াসঘাতক, ইসলামেরও সে বিশ^াসঘাতক। মর্ত্যে তার একমাত্র পুরস্কার মৃত্যু আর পরকালে সব সময় দোজখ। এই লাইন দুটি আন্ডারলাইন করা।

তৃতীয় পরিচ্ছেদে তিনি উল্লেখ করেছেন বাঙালিরা কেমন? তারপর তার প্রস্তাব, কমপক্ষে দশ বছর তাদের মগজ ধোলাই করা উচিত। আবেগজাত দিক থেকেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাদের আলাদা করতে হলে তাদের ভাগ্য বদলে দিতে হবে। এ দুটি লাইন আন্ডারলাইন করা।

এর পরের অনুচ্ছেদের সব কটি লাইন বড় অক্ষরে টাইপ করা। সেখানে তার মূল বক্তব্য, বাঙালিদের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর সময় এখনও আসেনি। তার ভাষায় ‘There must be more killing, more mopping up and more witch hunting.’

এর পরের ৫টি অনুচ্ছেদে নিয়াজী উল্লেখ করেছেন, ভারতীয় প্রচারণায় ভয় পাওয়ার কিছু নেই। একমাত্র অনুগত পাকিস্তানিরা পাকিস্তানে থাকবে। এরপর তিনি সুনির্দিষ্ট ৯টি  প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোর―৭৫ ভাগ  বাঙালি সিভিল অফিসার, ডাক্তার, প্রফেসরদের শেষ করে দিতে হবে। বাকিদের পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠাতে হবে। সব নিরাপত্তা বাহিনী থেকে বাঙালিদের সরাতে হবে। বিহারিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। আর সংবিধানে―

‘Bengal should be given a special status for 10 years or till all Mukti Bahini and/ or infiltrator activities, in the opinion of the Cnc of the Army, has been completely eliminated.’

সমাধান

১৯৭১ সালের মার্চ/এপ্রিলে বাঙালিদের সর্বশেষ বিদ্রোহের সময় পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় বিহারি মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছে। সব ধরনের অবাঙালিদের সংক্ষেপে বিহারি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা বিহার, উত্তর প্রদেশ, বোম্বে [মুম্বাই] এমনকি দক্ষিণ ভারত থেকে আসতে পারে। পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ, এমনকি বালুচিস্তানেরও হতে পারে। এসব দুর্ভাগাদের পশ্চিমা নামেও অভিহিত করা হতো। প্রায় ক্ষেত্রেই তাদের হত্যাকারীরা ছিল বাঙালি। এমনকি ভারতীয় হিন্দু সৈনিকরাও অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত বিহারিদের রক্ষা করেছে। তাদের হত্যা করা হয়নি একটি কারণেই যে তারা বহিরাগত [ভারতীয়রা]। তাদের হত্যা করা হয়েছে যেহেতু তারা পাকিস্তানি, কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থক এবং পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর শুভেচ্ছার্থী।

এ প্রদেশের অভ্যন্তরে এবং জেলা শহরগুলোতে প্রচুর হিন্দু ব্যবসায়ী বসবাস করে। এদের জয়-বাংলা স্লোগানধারীদের ভাই হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ আন্দোলন পরিচালনা করছে শুধু আওয়ামী লীগ নয়; এটি পুরো বাঙালি সম্প্রদায়ের আন্দোলন। সচিবালয়ের সচিব থেকে শুরু করে জমাদার, মসজিদের একজন মাওলানা থেকে মুয়াজ্জিন, বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে একজন পিয়ন, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে প্রধান খানসামা, এমনকি ইপিআর, পুলিশ এবং সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্য, সবাই এই বিদ্রোহে যুক্ত। সরকারি সব পরিকল্পনা শেখ মুজিব আগেই জানতে পারতেন। এমনকি ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত প্রকাশিত পত্রপত্রিকা দেখলেও বিষয়টি অনুধাবন করা যাবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিভাগ থেকে মিছিলের পর মিছিল বেরিয়েছে। সব পর্যায়ের বাঙালিরা প্রস্তাব নিয়েছে। এমনকি মুসলিম লীগ, পিডিপি, জামায়াতে ইসলামীর পরিচিত নেতারাও পিছিয়ে থাকেনি। বিচ্ছিন্নতাবাদের বিষ গভীরে ছড়িয়েছে। প্রয়াত আগা খান তাঁর স্মৃতি কথায় লিখেছিলেন, গত মহাযুদ্ধ শুধু হিটলারের যুদ্ধ ছিল না, ছিল পুরো জার্মান জাতির। সুতরাং এ বিদ্রোহ শুধু আওয়ামী লীগ বা মুক্তি বাহিনীর নয়, এটি পুরো বাঙালি সম্প্রদায়ের। কেউ কোনো প্রতিবাদ করেনি, বরং সবাই আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছে। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্যরা সবাই সশস্ত্র বাহিনীর শাস্তি থেকে বাঙালিদের রক্ষা করার কাজে নিয়োজিত। তারা বাংলাদেশ সমর্থকদের নিজের দলে না ভিড়িয়ে তাদের আশ্রয় দিচ্ছে [শান্তি কমিটির দু’একজন হয়ত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষকে সহায়তা করেছে। সেটি ব্যতিক্রম]। তারা গ্রামে যাচ্ছে না যেখানে এখনও জয় বাংলা স্লোগানধারীরা স্লোগান দিচ্ছে। জানা গেছে, যখন সেনাবাহিনী কোনো গ্রামে যাচ্ছে তখন সবাই নিশ্চুপ থাকে। তারা চলে গেলেই জয় বাংলা ধ্বনি ওঠে। সামরিক আইন কর্তৃপক্ষকে বিনীতভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে, পাকিস্তানপন্থি রাজনৈতিক দলের বাঙালি নেতাদের পরামর্শ গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করতে। তাদের শো-বয় হিসেবেই শুধু ব্যবহার করা যেতে পারে। তাদের নিজেদের লোকেরাই গত নির্বাচনে তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের কোনো অধিকার নেই জাতির পক্ষে ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের কাছে তদবির করার। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে একজন বিশ^াসঘাতক, ইসলামের প্রতিও বিশ^াসঘাতক। পার্থিব জীবনে তাদের পুরস্কার মৃত্যু, অন্য জীবনে আজীবন শাস্তি। বাঙালিদের সম্পর্কে লর্ড ম্যাকাওলের বই ‘এ স্টাডি অব ইন্ডিয়া’ পড়লেই চোখ খুলে যাবে।

এটি কাপুরুষদের এক সম্প্রদায়; এবং একজন কাপুরুষ হচ্ছে নিপীড়ক ও ফন্দিবাজ। বিশে^র যুদ্ধের এবং দাঙ্গার ইতিহাসে এমন নিষ্ঠুরতার নজির পাওয়া যাবে না যে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে অবাঙালি মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছে। ম্যাকাওলে যেমন বলেছেন, একটি বাঘের যেমন থাবা, মৌমাছির যেমন হুল, মহিষের যেমন শিং, তেমনি বাঙালির হচ্ছে শঠতা। দিনাজপুর এবং শান্তাহার শান্তি কমিটির সভায় যারা কোরআনে হাত রেখে শপথ করেছে তারাই হত্যার মিছিলে যোগ দিয়েছে। এ ধরনের লোকদের ওপর সশস্ত্র বাহিনী কীভাবে আস্থা রাখবে। এ প্রদেশকে জয় করা হয়েছে [ এখানে খুব সম্ভব ভুল বাক্য টাইপ করা হয়েছে, হবে এ প্রদেশ জয় করলে] ১৯৪৪/৪৫ সালে রুশীরা জার্মানদের সঙ্গে যে ব্যবহার করেছে, এ প্রদেশের অধিবাসী বিদ্রোহীদের সঙ্গেও একই ধরনের ব্যবহার করা উচিত। ২০ থেকে ৩০ লক্ষ জার্মানকে হত্যা করা হয়েছিল। বাঙালিদের সম্পূর্ণভাবে ভীত করতে না পারলে কিছুই ঠিক করা যাবে না।

পাকিস্তানের প্রতি যাদের আছে অখণ্ড বিশ^াস, তার সংহতির প্রতি আছে আস্থা তাদেরই শুধু এ দেশ শাসনের অধিকার আছে। লাল দেশগুলোতে যদি শুধু কমিউনিস্টরা শাসন করতে পারে, তা হলে, যাদের  আনুগত্যের প্রতি সন্দেহ আছে তাদের কেন নির্বাচনে দাঁড়াতে দিতে হবে, গণতন্ত্র পাকিস্তানে এলেও। শুধু শুদ্ধ পাকিস্তানিদের এ দেশ শাসনের অধিকার আছে। এবং এখনই সময় বিদ্রোহিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিনাশ করার। একটি দেশে এ ধরনের সুযোগ খুব কমই আসে এবং তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে।

খালি হিন্দুদের নিশ্চিহ্ন করলে চলবে না, তাদের সশস্ত্র ভ্রাতা, ইসলামের প্রতি বিশ^াসঘাতক, মুরতাদদেরও নিশ্চিহ্ন করতে হবে।

 কোনো সাহায্য থেকে দেশের সংহতি আরও বেশি প্রিয়। যদি পাকিস্তানের অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন হয় তা হলে কাদের জন্য সাহায্য নেব? আমাদের কোমরবন্ধ শক্ত করে বাঁধা শিখতে হবে।

[তারপর ইকবালের কবিতার দুটি লাইন]

                খুদি বিচ গারিবি ম্যায় নাম পয়দা কর        

মেয়া তরিকা আমেরি নাহি ফকিকি হ্যায়

এ বিদ্রোহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তথাকথিত বিহারি বা অবাঙালিরা। এ আন্দোলনের প্রথম বলি তারা। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছে। ইতিহাসে আছে বাঙালিরা সব সময় কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। প্রত্যেকবারই কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব বিদ্রোহ দমনের পর কিছুদিন সব ঠিক ছিল। যতদিন এই কাপুরুষদের ভীত রাখা যাবে ততদিন তারা চিমটি কাটবে না। এখন ভারত তাদের বন্ধু যদিও তারা দেখেছে, আমাদের সৈন্যরা যে সব জায়গা দখল করেনি সে সব জায়গা থেকে আমাদের লাখ লাখ মন খাদ্যশস্য, যানবাহন, কী না সব ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এখনও তারা লাখ লাখ হিন্দুদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে। এখনও তারা ঘরোয়া আলোচনায় বাংলাদেশের কথা বলছে। এখনও নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে আলোচনা করছে সামরিক শাসন কতদিন থাকবে তা নিয়ে। এখনও তারা তাকিয়ে আছে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দিকে। ব্যতিক্রম খুব কম। দশ বছর ধরে সম্পূর্ণভাবে তাদের মগজ ধোলাই করতে হবে। আবেগজাত দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এদের আলাদা করতে হলে তাদের ভাষা বদল করতে হবে।

[এরপর বড় হরফে ১০টি লাইন]

সামরিক শাসন কর্তৃপক্ষের হয়তো এখন মনে হতে পারে, যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে, এখন বাংলার দরজা বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া যেতে পারে! স্বাভাবিকতা দেখাবার জন্য স্কুল-কলেজ খুলবে, সরকারি অফিসে যারা পরে যোগ দিয়েছেন তাদের প্রতি শৈথিল্য দেখানো যাবে। এ যদি চিন্তার ঝোঁক হয়ে থাকে, তা হলে আমরা বলব, পাকিস্তানের সংহতি হবে কিনা সন্দেহ, এখনও শৈথিল্য দেখাবার সময় আসেনি। এখনও আরও হত্যা করতে হবে, নিশ্চিহ্ন করতে হবে আরও এবং উইচহান্টিং চালিয়ে যেতে হবে। এখনও তারা বোমা ছুঁড়ছে, এখনও তারা রকেট স্টিমার চলাচলে বাধা দিচ্ছে এবং এখনও তারা আমাদের বার্জ ডুবিয়ে দিচ্ছে।

ভারতীয় প্রচরণায়, পাশ্চাত্যের ইহুদি প্রভাবাধীন পত্রিকায় অবিশ^াস্য মন্তব্যে আমাদের ভয় পাওয়া চলবে না। বাঙালি বিদ্রোহীদের হাতে নিহত অবাঙালিদের কথা তারা লেখেনি। সরকারের প্রতিও তাদের মনোভাব উষ্ণ নয়। ভারতে মুসলমানবিরোধী দাঙ্গার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইসরায়েলে আরবদের ওপর ইহুদি নিপীড়নের ক্ষেত্রে তারা চোখ বন্ধ রেখেছে। কমিউনিজম বাঁচাতে যদি রাশিয়া লাখ লাখ ক্ষুদ্র জমির মালিক-কে হত্যা করতে পারে তা হলে পাকিস্তানের শক্রদের বিনাশে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী শৈথিল্য দেখাবে কেন? [বিহারি] তাদের হত্যা এত ব্যাপক ও সম্পূর্ণ যে তারা এখন খুবই [ ‘ভেরি ভেরি’] নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যারা বেঁচেছে তাদের একটা বড় অংশ শরণার্থী ক্যাম্পে। আর জয় বাংলা মানুষদের নিপীড়ন থেকে যারা বেঁচেছে তারা খুব ভীত। নিহত বিহারিদের সংখ্যা হয়তো ৫ লাখে দাঁড়াবে। যারা বেঁচে আছে তাদের অনেকে জীবিকা নির্বাহে অসমর্থ। বিহারিদের পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়া সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানের সংহতি ও স্থায়িত্বের স্বার্থে তা বন্ধ করতে হবে। সে কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তার ভাব ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রতিরোধের দ্বিতীয় সারি হিসেবে তাদের তৈরি করতে হবে। ভারতীয় আক্রমণের ক্ষেত্রে, স্থানীয় অভ্যুত্থান দমনে তাদের ব্যবহার করা যেতে পারে।

নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো প্রস্তাব করা হলো

১. ডাক্তার, অধ্যাপকসহ ৭৫ ভাগ বাঙালি কর্মকর্তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। উচ্চপদস্থ বাকিদের পাকিস্তানে বদলি করতে হবে। সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সামরিক সশস্ত্র ফোর্স থেকে বাঙালিদের বাদ দিতে হবে।

২. সেনাবাহিনী, প্রাদেশিক এবং কেন্দ্রীয় দফতরে অন্তর্ভুক্ত সব গোয়েন্দা বিভাগ থেকে বাঙালিদের বাদ দিতে হবে। এরা সরকারকে বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং ষড়যন্ত্র সম্পর্কে খবর না দিয়ে অন্ধকারে রেখেছে।

৩. সারা পাকিস্তানে একটি জাতীয় ভাষা থাকবে এবং শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম হবে সেই ভাষা।

৪. প্রাদেশিক শিক্ষা বিভাগ ঢেলে সাজাতে হবে।

৫. পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলাকে [বাংলাদেশ] ১০ বছরের জন্য ‘স্পেশাল স্টেটাস’ বা বিশেষ মর্যাদা দিতে অথবা যতদিন পর্যন্ত সেনাপ্রধান নিশ্চিত না হবেন যে মুক্তিবাহিনী বা অনুপ্রবেশকারীদের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়েছে।

৬. পাকিস্তানের চারটি অঞ্চলে বিহারিদের রাখতে হবে―১. ঢাকা, ২.চট্টগ্রাম, ৩.খুলনা, ৪. সৈয়দপুর-পার্বতীপুর। ঐ ৩টি [চারটি] শহরে বিহারিরা হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ যাতে ভবিষ্যতে এই প্রদেশের এইসব স্নায়ুকেন্দ্র থেকে পাকিস্তান বিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড উৎসারিত হতে না পারে।

৭. ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সব বিহারিদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে সশস্ত্র রাখতে হবে। সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা যাদের বিরুদ্ধে বিরূপ রিপোর্ট দেবে তাদের ঐ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হবে।

৮. গৃহসংস্থান ও ত্রাণ বিভাগের দায়িত্বে থাকবে অবাঙালিরা অন্তত উপরে উল্লিখিত চারটি কেন্দ্রে।

ক. মিরপুরে [ঢাকা] ৫০০ প্লট তৈরি এবং খালি আছে নিম্ন আয়ের লোকদের জন্য। শীঘ্রই এগুলো অ্যালট করতে হবে।

খ. মিরপুর এবং মোহাম্মদপুরের সব স্টাফ কোয়ার্টার শরণার্থীদের [বিহারি] মধ্যে বণ্টন করতে হবে।

গ. মিরপুর এবং মোহাম্মদপুরের আশেপাশের খালি জমি অবাঙালিদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।

ঘ. মিরপুর এবং মোহাম্মদপুরের সব খালি দোকান বিহারিদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।

ঙ. মিরপুর এবং মোহাম্মদপুরের সব রেশন দোকান অবাঙালিদের অ্যালট করতে হবে। যারা পালিয়ে গিয়েছিল তাদের দিয়েই প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

৯. ঢাকায় রাত ১২ থেকে ৪টা পর্যন্ত কার্ফ্যু বলবৎ থাকবে যতদিন না বিদ্রোহিদের সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করা যাচ্ছে।

যাদের অবদান স্মরণ করা হয় না

বাংলাদেশ আন্দোলনের প্রকাশ্য ইতিহাস যেমন আছে, তেমনি আছে অপ্রকাশ্য ইতিহাসও। শেষোক্তটি আরও রহস্যজনক। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর শিষ্য। সাংবিধানিক পথে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ছিল যার লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সুভাষ চন্দ্রেরও ভক্ত। যিনি সশস্ত্র পন্থা বেছে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশকে মুক্ত করার জন্য বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্য সাংবিধানিক ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করেছেন। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণাও দিয়েছেন নিয়ম মেনে। যে কারণে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলা যায়নি।

বঙ্গবন্ধু জানতেন, সাংবিধানিক আন্দোলন পাকিস্তান সরকার আমলে আনবে না। অন্তিমে তাঁকে সশস্ত্র পন্থা বেছে নিতে হবে। আর সেটি ভারতের সাহায্য ছাড়া করা যাবে না কারণ, বাংলাদেশের তিনদিক ঘিরে আছে ভারত। ১৯৭১ সালের পূর্ব পর্যন্ত পাকিস্তান যে ধারণাটি আমাদের মনোজগতে গেঁথে দিতে পেরেছিল তা’হলো―ভারত হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্র এবং তাই তা মুসলমানদের রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। ভারত শত্রু রাজ্য, কখনও সে বন্ধু রাষ্ট্র হতে পারবে না যে কারণে, প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুকে সবসময় বলতে হয়েছে, তারা স্বায়ত্তশাসন চান, পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চান না। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে চলেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁকে অনেকে সহায়তা করেছেন কিন্তু তা আমারা জানি না। এ বিষয়ে লিখেছি আমি ও শাহরিয়ার কবির। ‘আমার গ্রন্থ বঙ্গবন্ধু কীভাবে স্বাধীনতা এনেছিলেন’ ও শাহরিয়ারের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ও জনকণ্ঠে কয়েক কিস্তিতে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতির এক দশক প্রবন্ধে এ বিষয়ে তথ্যমূলক বিবরণ আছে। শাহরিয়ার গত শতকের শেষের দিকে ভারতের অনেক নীতি নির্ধারকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এবং তার ভিত্তিতে প্রবন্ধগুলো রচনা করেছেন। এর একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস পেলে আমরা জানতে পারতাম কীভাবে বঙ্গবন্ধু তার মিশন সফল করেছেন। এ সংক্রান্ত দলিলপত্র এখন পাওয়া যাবে না। শাহরিয়ারের ওরাল হিস্ট্রি এ ক্ষেত্রে প্রধান অবলম্বন হতে পারে। উল্লেখ্য, শাহরিয়ার যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তাঁদের কেউ আর এখন বেঁচে নেই।

অপ্রকাশ্য পন্থার সঙ্গে চিত্তরঞ্জন সুতারের কথা বারবার আসে। তাঁর নামটি এখন প্রায় বিস্তৃত। ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মের কোনো গবেষক যদি গবেষণা করেন তাঁর সম্পর্কে, তারই কিছু সূত্র এখানে দিয়ে যাচ্ছি।

গত শতকের পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশকের মধ্যে চিত্তরঞ্জন সুতার বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপরিচিত ছিলেন না। তাঁর জন্ম বরিশালের স্বরূপকাঠির ব্যাসকাঠি গ্রামে। ছেলেবেলায় তাঁর বাবা-মা ও ছোট ভাই মারা যান। স্কুল খুব সম্ভব বরিশালে। তবে, আই এ পড়েছেন কলকাতার স্কটিশ চার্চে। ছাত্রকালীন সময়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ব্রহ্মনন্দ গিরির। তাঁর প্রভাবেই খুব সম্ভব সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন।

১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর অনেক হিন্দু চলে গেলেন জন্মভূমি পূর্ববঙ্গ ছেড়ে। অনেক মুসলমান চলে এলেন পূর্ববঙ্গে এবং চিত্তরঞ্জনও ফিরলেন। রাজনীতির সঙ্গেও তাঁর তখন পরিচয় হয়। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময় নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী। পূর্ব পাকিস্তানের সংসদের সংসদ সদস্য হন। চিত্তরঞ্জন পূর্ববঙ্গের সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ছিলেন। আতাউর রহমান খান যখন প্রধানমন্ত্রী তখন রব ওঠে যে, দেশে যে কালোবাদামি বাড়ছে তার কারণ সংখ্যালঘুরা। এরা চোরাচালানির সঙ্গে যুক্ত। আতাউর রহমান চিত্তরঞ্জনকে সভাপতি করে একটি তদন্ত কমিশন করেন। তারা সীমান্ত অঞ্চল পরিদর্শন করে প্রতিবেদন পেশ করেন যার মূল বক্তব্য ছিল, চোরাচালানের সঙ্গে সংখ্যালঘুরা যুক্ত নন।

এবারের শাহরিয়ারের ভাষ্য নিয়ে আলোচনা করা যাক। তিনি লিখেছেন, চিত্তরঞ্জন প্রথমে করতেন কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৫৭ সাল থেকে ন্যাপ। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় তাঁর আগে থেকেই ছিল। সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয় জেলে গিয়ে। শাহরিয়ার লিখেছেন, কাজী আরেফ ও চিত্তরঞ্জন তাকে জানিয়েছেন, ১৯৬১ সালেই বঙ্গবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও রুহুল কুদ্দুসকে নিয়ে ‘পূর্ব মুক্তিফ্রন্ট’ নামে একটি গোপন সংগঠন করেন। এই মুক্তিফ্রন্ট থেকে পূর্ব বাংলা স্বাধীন করার আহ্বান জানিয়ে একটি লিফলেট ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে বিলি করেন আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমদ।

অচিন্ত্য বিশ্বাস এর সঙ্গে একমত নন। তিনি মনে করেন, চিত্তরঞ্জন এ দুটি দলের কোনোটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

১৯৬৪ সালে আইয়ুব খান ‘ইস্ট পাকিস্তান ডিস্টার্বড ভার্সন রিহ্যাবিলেটশন অর্ডিন্যান্স জারি করেন যার লক্ষ্য ছিল হিন্দুরা তাদের জমিজমা বিক্রি করতে পারবেন না। চিত্তরঞ্জন এর বিরুদ্ধে রিট করে জয়ী হন। ঐ সময় এটি ছিল সাহসী একটি কাজ।

১৯৬৫ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ‘পাকিস্তান ডিফেন্স রুলের’ অধীনে চিত্তরঞ্জনকে গ্রেফতার করা হয়। বরিশাল জেলে কিছুদিন থাকার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তিনি স্থানান্তরিত হন। ১৯৬৬ সালে ছয়দফা ঘোষণার পর শেখ মুজিবও গ্রেফতার হন। জেলে চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। অচিন্ত্য জানাচ্ছেন, এ সময়েই স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হয়। এবং দু’জনই এ বিষয়ে একমত হন যে, ভারতই তাদের একমাত্র সাহায্য করতে পারে। এবং বাংলাদেশের তিনদিক ঘিরে ভারত। তাকে ছাড়া দেশ স্বাধীন করা সম্ভব নয়। ভারতের সঙ্গে মৈত্রী―এ কথা ভাবাও তখন ছিল দেশদ্রোহিতা। চিত্তরঞ্জন তখনও জানতেন না যে বঙ্গবন্ধু ১৯৬২ সালে এ উদ্দেশ্যে ভারত গিয়েছিলেন এবং ঐ বছরই নেহেরুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা ও অটুট রাখার জন্য চিত্তরঞ্জন হবেন বঙ্গবন্ধুর প্রতিনিধি। অচিন্ত্য জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু তখন চিত্তরঞ্জনকে সম্বোধন করতেন ‘মাই লিডার’ হিসেবে।

বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্তি পাননি কারণ এরপর তাঁকে জড়ানো হয় আগরতলা মামলায়। চিত্তরঞ্জনের স্ত্রী মঞ্জুশ্রী বিশ^াস তাঁর স্বামীর মুক্তি চেয়ে রিট করেন। ১৯৬৮ সালের মার্চ মাসে চিত্তরঞ্জন মুক্তি পেলেন।

সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় ফরাসডাঙ্গায় চিত্তরঞ্জন একটি সংখ্যালঘু সম্মেলন আহ্বান করেন। এর আগে তিনি মুজিবকে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ এতবড় দল অথচ এর নীতিনির্ধারণে কোনো সংখ্যালঘু নেই। এই দুর্বলতা বঙ্গবন্ধুও স্বীকার করেছিলেন।

সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন মুনীন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য। এ সম্মেলনে ভবানীশঙ্কর বিশ^াস ও ন্যাপের নীরদ নাথকে বক্তব্য রাখতে দেওয়া হয়নি সরকার ঘেঁষা হিসেবে তারা পরিচিত ছিলেন। ঐ সম্মেলনে সংখ্যালঘুদের নিয়ে একটি কমিটি করা হয় যার আহ্বায়ক ছিলেন চিত্তরঞ্জন। এর ওপর ভিত্তি করে চিত্তরঞ্জন প্রতিষ্ঠা করেন ‘জাতীয় মুক্তি দল’। চিত্তরঞ্জন বলেছিলেন, তাঁর দল নির্বাচনে অংশ নেবে না, তবে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করবে।

এ পর্বটির কথা শাহরিয়ারও উল্লেখ করেছেন। তিনি জানাচ্ছেন ১৯৬৯ সালের অক্টোবরে বঙ্গবন্ধু লন্ডন যান অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশনের জন্য। আসলে এটি ছিল অজুহাত। তিনি লন্ডন গিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর গোপন দূতের সঙ্গে কথা বলতে। এই দূত ছিলেন ফণীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যিনি পরিচিত ছিলেন নাথ বাবু নামে। নাথ বাবু জানিয়েছেন, স্বাধীনতা ও অন্যান্য বিষয়ে আলাপের জন্য বঙ্গবন্ধু যেন দিল্লিতে এমন একজনকে পাঠান যিনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তেমন পরিচিত নন। কিন্তু বিশ^স্ত।

বঙ্গবন্ধু তাঁর দূত হিসেবে ঠিক করলেন চিত্তরঞ্জনকে। লন্ডন থেকে ফিরে তিনি চিত্তরঞ্জনকে বললেন, তাকে ভারত যেতে হবে।

এ পর্বটির প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা একবার বলেছিলেন, লন্ডনে নাথ বাবুর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনার সময় তিনিও ছিলেন হাসপাতালে। নাথ বাবু ১৯৭০-৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শেখ হাসিনা তা জানতেন এবং তাঁকে তিনি ভোলেননি। আরও পরে, স্বাধীনতার সময় যে সব বিদেশিরা সাহায্য করেছিলেন তাদের সম্মান জানাচ্ছিল বাংলাদেশ। ঐ সময়, এক আলোচনাকালে, আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তালিকায় নাথ বাবুর নাম আছে কিনা। নাথ বাবুর নাম ছিল, শাহরিয়ারই তালিকায় নাথ বাবুর নাম যুক্ত করার প্রস্তাব করেছিলেন।

১৯৭০ সালে বিধ্বংসী সেই সাইক্লোনের পরপর চিত্তরঞ্জন গোপনে চলে আসেন কলকাতায়। যোগাযোগ হয় ফণীন্দ্রনাথের সঙ্গে। শাহরিয়ারকে চিত্তরঞ্জন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনি তিনটে বাড়ি ভাড়া করুন। কলকাতায় একটা, বনগাঁ-বারাসাতের দিকে বর্ডারে একটা। ত্রিপুরায় একটা। আমাদের ছেলেরা গিয়ে গেরিলা ট্রেনিং নেবে। সেখানে গিয়ে তো থাকতে হবে।’

চিত্তরঞ্জনের কাছে অতো টাকা না থাকায় বর্ডারে বাড়ি ভাড়া করতে পারেননি। ২১ রাজেন্দ্র রোডে তিনতলা ‘সানি ভিলা’ ভাড়া নেন। সেখানেই তখন তিনি থাকতেন। অন্যদিকে, ফরাসডাঙ্গায় ব্রোজমোহন দাসের বাড়িতে থাকতেন মঞ্জুশ্রী। অচিন্ত্য বিশ^াস জানাচ্ছেন, কলকাতা থেকে ছানু দা নামে চিত্তরঞ্জন ফোন করতেন তাঁর স্ত্রী মঞ্জুশ্রীকে। সাংকেতিক ভাষায় বার্তা পাঠাতেন। মঞ্জুশ্রী সেই বার্তা নিয়ে ফরাশগঞ্জের কালিবাড়িতে যেতেন। সেখানে উপস্থিত থাকতেন মুজিবের দূত। সেখানে বার্তা বিনিময় হতো।

শাহরিয়ার লিখেছেন, ‘১৯৭০ এর এপ্রিল মাসে চিত্তবাবু বঙ্গবন্ধুর বার্তা নিয়ে মিসেস গান্ধীর সঙ্গে দেখা করলেন। এরপর সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুকে তিনি বার্তা পাঠালেন।’

অচিন্ত্য বিশ^াস লিখেছেন ১৯৭০ সালের ৩০ জানুয়ারি ভারতের একটি বিমান ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া হয় রাওয়ালপিন্ডিতে। এবং সেখানে বিমানটিকে ধ্বংস করা হয়। ভারত সরকার এতে ক্ষুব্ধ হয়। ভারত সরকার চিত্তরঞ্জনের মাধ্যমে একটি বার্তা পাঠায় বঙ্গবন্ধুকে। ‘ছানু দা’ বার্তাটি জানালেন মঞ্জুশ্রীকে। তিনি জানালেন বঙ্গবন্ধুর দূতকে। বার্তার মূল বক্তব্য ছিল―মুজিব চাইলে ঐ ঘটনার প্রতিবাদে ভারত পাকিস্তানকে তার জলস্থল ও আকাশ পথ ব্যবহর করতে দেবে না। এবং সে সুযোগে মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন। চিত্তরঞ্জন তাঁর স্ত্রী জানিয়েছিলেন, মুজিবের বার্তা নিয়ে যেন তিনি গোপনে সীমান্ত পাড়ি দেন। মঞ্জশ্রী তাই করলেন। পৌঁছলেন কলকাতায়।

এখানে অচিন্ত্য ও শাহরিয়ারের দেওয়া তারিখ মিলছে না। অচিন্ত্য লিখেছেন, চিত্তরঞ্জন গোপনে যখন কলকাতায় যান তখন সবাই জানল ভোলায় ঝড়―বন্যার ত্রাণ সাহায্য করতে গেছেন। আবার লিখছেন [৩০ জানুয়ারি, ১৯৭০] ভারতীয় বিমান হাইজ্যাক করার পর বার্তা পাঠান। শাহরিয়ার লিখছেন, এপ্রিল ১৯৭০ সালে চিত্তবাবুকে ভারত পাঠান বঙ্গবন্ধু। সাইক্লোন হয়েছিল ২৮ নভেম্বর ১৯৭০। তারিখের অসঙ্গতি বাদ দিলে বয়ানটি গ্রহণ করা যেতে পারে।

সানি ভিলার বর্ণনা দিয়েছেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। বাংলাদেশ থেকে আগত উচ্চপর্যায়ের নেতৃবৃন্দের জন্য এই বাড়িটি সংরক্ষিত। বাসাটির তিনতলায় বেতারযন্ত্র ছাড়াও যোগাযোগ স্থাপনের অন্যান্য উপকরণ ছিল। আব্দুর রাজ্জাক ১৯৮৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন। কোলকাতার ২১ রাজেন্দ্র রোড, যেখানে চিত্তরঞ্জন সুতার বঙ্গবন্ধুর রিপ্রেজেনটেটিভ ছিলেন।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ চিত্তরঞ্জন তাঁর অনুসারী বিপদরঞ্জনকে বললেন, বার্তা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে।  বিপদরঞ্জন ঢাকা পৌঁছে ৭ মার্চ সকালে গেলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। অনেক সাক্ষাৎপ্রার্থী সেখানে। বিপদ রঞ্জনকে আলাদা ডেকে বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন আছেন মাই লিডার।’ তারপর বললেন তাঁর মাথা কাজ করছে না। পরদিন দেখা করতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ স্বাধীনতার ডাক দিলেন। চিত্তরঞ্জন নাকি তা পছন্দ করেন নি। তিনি চেয়েছিলেন আরও প্রস্তুতি নিয়ে এই ধরনের ঘোষণা দেওয়া উচিত ছিল।

বিপদরঞ্জন পরদিন দেখা করলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘কলকাতায় ফিরে গিয়ে চল্লিশটি লাইট মেশিনগান, কিছু রাইফেল আর একটি ট্রান্সমিটারের ব্যবস্থা করুন জরুরি ভিত্তিতে।’ ৯ মার্চ তিনি আবারও দেখা করেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। তিনি বললেন, ডা. আবু হেনাকে তিনি সানি ভিলার ঠিকানায় পাঠিয়েছেন। জরুরি ভিত্তিতে ট্রান্সমিটারটি আনতে। অচিন্ত্য লিখেছেন, এ থেকে মনে হয়, মুজিবুর রহমান অন্য সূত্রেও ‘সানি ভিলা’র সংবাদ জানতেন। ফণীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বা আরও কোনো উচ্চস্তর থেকে এই সংবাদ তাঁর কাছে নিয়ে গিয়ে থাকবে। মুজিব আরও বললেন, বিপদরঞ্জনের নাম এখন থেকে হবে বরিশালের হামিদ। আর তিনি যেন আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে দেখা করেন। বিপদরঞ্জন তা করেছিলেন, ‘ঐ দিন ঢাকার মগবাজারে একটি বাড়িতে রাজ্জাকের সঙ্গে বহুক্ষণ কথা হয়, বিপদবাবু জানলেন, রাজ্জাক জানেন না কোন দেশ কীভাবে সাহায্য করবে। হতে পারে শেখ মুজিব একথা একান্ত গোপনে রেখেছিলেন।’ বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চের আগে রাজ্জাকদের কলকাতায় কোথায় যেতে হবে তার ঠিকানা দিয়েছিলেন।

অচিন্ত্য জানাচ্ছেন, ১১ মার্চ কলকাতায় ফিরে চিত্তরঞ্জনকে বঙ্গবন্ধুর বার্তা পৌঁছে দিলেন। ‘চাহিদা একটু বাড়িয়ে বললেন। অন্তত একটি ক্যান্টনমেন্ট দখলের মতো অস্ত্র শস্ত্র চান তাঁরা।’ ট্রান্সমিটারের কথাও বললেন, ১৪ মার্চ সিরাজগঞ্জের এম এন এ ডা. আবু হেনা পৌঁছলেন ১ মার্চ। ১৯ মার্চ হয়ত ট্রান্সমিটারটি তিনি নিয়ে যান।

তোফায়েল আহমদ ১৯৮৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ‘সত্তরের নির্বাচনের আগেও বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রতিনিধিকে ভারত পাঠিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় গিয়ে আমরা ‘সানি ভিলা’য় উঠি। একাত্তরের শুরু হবার আগেই এ বাড়িটি নেওয়া ছিল। গণহত্যা শুরু হলে আমরা ভারতে গেলাম। ভারতে গিয়ে আমাদের আশ্রয়, যেটার ঠিকানা বঙ্গবন্ধু আমাদের মুখস্থ করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ঠিকানায় শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক এবং আমি গিয়ে উঠি।’

অচিন্ত্য লিখেছেন, ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে কলকাতায় আসেন। সেদিন রাজভবনে এক নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু দিল্লি থেকে ফেরার পথে কলকাতায় নেমে ছিলেন ও বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এ তথ্য ভুল। বঙ্গবন্ধু কলকাতা যান ৬ ফেব্রুয়ারি। স্টেটসম্যান পত্রিকা লিখেছিল, রাজভবনে চিত্তরঞ্জন ও মঞ্জুশ্রী ছিলেন। মিসেস গান্ধীর সঙ্গে মঞ্জুশ্রী দেবীর পরিচয় করিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন―‘The Pakistanis could easily hang this lady at least 10 times for the kind of sensitive messages she brought and conveyed in these turbulent times. For a house wife to take such risks in just incredible’. ২০১১ সালে ১৯ নভেম্বর মঞ্জুশ্রী দেবীর মৃত্যুর পর স্টেটসম্যান সংবাদ দিয়েছিল ‘A patient passes away’. সেখানে আরও লেখা হয়েছিল―‘The death of Manujshre Sutar, 74, wife of Sheik Mujibs personal emissary Chittaranjan Sutar who has been living in voluntary exile in the city for over three decades in Kolkata last week left a void.’

অচিন্ত্য বা শাহরিয়ারের লেখায় তারিখের গোলমাল আছে, ফাঁকফোকরও আছে। কিন্তু, এটি তো সত্য চিত্তরঞ্জন সুতার মুক্তিযুদ্ধে একটি ভূমিকা পালন করেছিলেন। এরকম ভূমিকায় হয়ত আরও অনেকে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর বিকল্প পথ নিয়ে ভালো গবেষণা হতে পারে। আর সে জন্যই এ নিবন্ধ।

সূত্র

১. অচিন্ত্য বিশ^াস, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চিত্তরঞ্জন সুতারের অবদান’, স্বস্তিকা, পূজাসংখ্যা, কলকাতা, ১৪২১

২.  শাহরিয়ার কবির, ‘বঙ্গবন্ধু এক স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতির একদশক’, দৈনিক জনকণ্ঠ, ঢাকা, আগস্ট, ২০২০

৩. মাসুদুল হক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ ও ‘সিআই এ’, ঢাকা, ১৯৯০

৪. হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, ১৫তম খণ্ড, ঢাকা, ১৯৮৫

* এই রচনায় উল্লিখিত সমস্ত ঐতিহাসিক তথ্যাবলি পরিবেশনের দায়িত্ব এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিশ্লেষণ একান্তভাবে লেখকের। এর কোনও দায় পত্রিকা কর্তৃপক্ষের নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares