চট্টগ্রাম ১৯৭১ : চৌধুরী শহীদ কাদের

প্রচ্ছদ রচনা : ৫০তম বিজয় দিবস ২০২০

একাত্তরে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম পরিণত হয়েছিল লাশের শহরে। মার্চের অসহযোগ আন্দোলন থেকে শহর চট্টগ্রামের বুকে যে লাশের মিছিল, সেটি অব্যাহত ছিল মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়। গণহত্যা-নির্যাতনের এই নারকীয়তা চলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। একাত্তরে চট্টগ্রাম জেলায় কি পরিমাণ লোককে হত্যা করা হয়েছিল তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। ১৯৭২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ চট্টগ্রামে শহিদের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ বলে উল্লেখ করেন। স্থানীয় প্রভাবশালী দৈনিক আজাদীতে ১৯৭২ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা পাঁচ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ভারতের অমৃতবাজার পত্রিকা ১৮ জুলাই ১৯৭১ চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহ গণহত্যার সংবাদ ছাপায়। চট্টগ্রামে গণহত্যায় এক লাখ লোক মারা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। একই পত্রিকা ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ আরেকটি প্রতিবেদনে গণহত্যায় চট্টগ্রামে চার লাখ লোককে হত্যা করার সংবাদ প্রচার করে।

তথ্যের যথেষ্ট অপ্রতুলতার পরও একাত্তরের সমসাময়িক সময়ের পত্র-পত্রিকা, রণাঙ্গনের সাথে সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার, প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যে চট্টগ্রাম জেলায় গণহত্যায় সর্বনিম্ন তিন লাখ লোক শহিদ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। যার মধ্যে শুধুমাত্র শহরে প্রায় দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার। যা অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমাদের বীরত্বের গল্পের ভিড়ে বিস্মৃত হয়েছি আত্মত্যাগের এই অধ্যায়।

২.

চট্টগ্রাম থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর অনেকগুলো গ্রন্থ বের হয়েছে, কোনোটাতেই একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার বিবরণ পরিপূর্ণভাবে উঠে আসেনি। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, চট্টগ্রাম জেলা ইউনিট কমান্ড মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম শীর্ষক প্রায় ১৫০০ পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। যেখানে জেলা-উপজেলার কমান্ডারদের ছবি, তাদের জীবন কীর্তি, ছেলেমেয়েরা কে কোথায় পড়ে, রঙিন ছবি সব আছে। যেটা নেই সেটা হলো একাত্তরের গণহত্যায় চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার বর্ণনা। এই গ্রন্থে চট্টগ্রামের ৪০টি গণহত্যা, বধ্যভূমি ও  গণকবরের উল্লেখ আছে।

জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমি, সম্মুখযুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ শিবিরের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে গঠিত চট্টগ্রাম বধ্যভূমি সংরক্ষণ কমিটির তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে এই তালিকা। প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী নগরসহ জেলায় বধ্যভূমির সংখ্যা ১১০টি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম শহরের নির্যাতন কেন্দ্র ও বধ্যভূমিসমূহের একটি তালিকা স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত গ্রন্থগুলোতে, ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। চট্টগ্রামে সম্মুখযুদ্ধের ১০৯টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ শিবির ১৩টি। তবে তালিকা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সব জায়গার সঠিক তথ্য আসেনি। অনেক জায়গায় শহিদের তালিকা, কোনো কোনো বধ্যভূমির স্থান তালিকায় ওঠেনি। ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের আমলে করা এক তালিকায় চট্টগ্রামে বধ্যভূমির স্থান দেখানো হয় মাত্র ৩১টি। এর মধ্যে অনেক বধ্যভূমির ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই বলে মন্তব্য করা হয়। তালিকায় পটিয়া, বোয়ালখালি, হাটহাজারি, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, ডবলমুরিং ও চান্দগাঁওয়ে কোনো বধ্যভূমির উল্লেখ নেই।

নতুন তালিকায় সবচেয়ে বেশি বধ্যভূমি চিহ্নিত হয়েছে আগ্রাবাদ সার্কেলে (ডবলমুরিং, বন্দর, পাহাড়তলি, হালিশহর ও পতেঙ্গা এলাকা) ৩০টি। দ্বিতীয় সদর সার্কেলে (কোতোয়ালি) রয়েছে ২১টি এবং তৃতীয় চান্দগাঁও সার্কেলে রয়েছে ১২টি বধ্যভূমি। এ ছাড়া, ফটিকছড়িতে দশ, আনোয়ারায় সাত, সাতকানিয়া ও মিরসরাইয়ে পাঁচটি করে, বোয়ালখালিতে চারটি, রাউজানে তিনটি, চন্দনাইশ, রাঙ্গুনিয়া, বাঁশখালি, সীতাকুণ্ডতে দুটি করে এবং পটিয়া, হাটহাজারি, বায়েজিদ, হালিশহর ও পাহাড়তলিতে (খুলশি) একটি করে বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে।

সম্মুখযুদ্ধের স্থানের মধ্যে রয়েছে আগ্রাবাদ সার্কেলে ৩০, সদর সার্কেলে ২৪, মিরসরাইয়ে ১৩, ফটিকছড়ি ও সীতাকুণ্ডে সাতটি করে, আনোয়ারা ও চান্দগাঁওয়ে ছয়টি করে, বোয়ালখালি ও পটিয়ায় পাঁচটি করে, চন্দনাইশে চারটি এবং সাতকানিয়া ও সীতাকুণ্ডে একটি করে। ১৩টি প্রশিক্ষণ শিবিরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সন্দ্বীপে সাতটি, পটিয়ায় চারটি এবং লোহাগাড়ায় দুটি শিবির চিহ্নিত করা হয়েছে।

সুকুমার বিশ^াসের লেখা একাত্তরের বধ্যভূমি ও গণহত্যা এবং এম এ হাসানের গণহত্যা যুদ্ধাপরাধ ও বিচারের অন্বেষণ গ্রন্থে এই সংখ্যা যথাক্রমে ১০ ও ১২। ডা. মাহফুজুর রহমানের বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম এই বিষয়ে প্রথম প্রামাণ্য গ্রন্থ। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে চট্টগ্রাম শহরের ১৬টি ও এর বিভিন্ন উপজেলায় ৩৫টি বধ্যভূমি ও গণহত্যার কথা উল্লেখ আছে। চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ৩৫ টি নির্যাতন কেন্দ্রের বর্ণনা পাওয়া যায়। মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধ কোষে চট্টগ্রাম জেলার ১৮টি বধ্যভূমি, গণহত্যা, গণকবরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এম এ হাসান উল্লেখ করেছেন ৩৫টি, স্থানীয় গবেষক জামাল উদ্দীন চট্টগ্রাম শহরে গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবরের সংখ্যা প্রায় ১৫৫ বলে উল্লেখ করেছেন। ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি চট্টগ্রামে ছোট বড় ১১৬টি বধ্যভূমির খোঁজ পেয়েছে। এর মধ্যে ২৫টির বর্ণনা তারা সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

উপজেলা ভিত্তিক বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে রাউজান গ্রন্থে রাউজানের গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবরের তথ্য পাওয়া যায়। আনোয়ারা নিয়ে কাজ করেছেন জামাল উদ্দীন। মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় গণহত্যা ও গণকবরের প্রকৃত সংখ্যা ও তথ্যের সাথে গ্রন্থটির অনেক অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা গেছে। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নিয়ে যে কাজ সেটাতে মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা, গণকবর ও বধ্যভূমির কোনো তথ্য নেই।

৩.

একাত্তরে চট্টগ্রামে গণহত্যার শুরুটি হয়েছিল চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে। এখানে প্রায় ২৫০০ নিরস্ত্র বাঙালি সৈনিককে হত্যা করা হয় একাত্তরের প্রথম প্রহরে। পাশাপাশি আশপাশের এলাকাগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক সাধারণ লোকজনকে এখানে এনে হত্যা করা হয়।

সেনানিবাসের বাইরে প্রথম গণহত্যা ঘটে চট্টগ্রাম বন্দরে। বন্দরের ১৭ নম্বর জেটিতে ২৭ মার্চে প্রায় ১১২ জন নিরস্ত্র বাঙালি সৈনিক পাকিস্তান বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান বলে উল্লেখ করেন মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া।

গরীবউল্লাহ শাহ মাজারের পাশে সম্ভবত বাংলাদেশের  সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি। সম্ভবত শব্দটি ব্যবহার করলাম কারণ এর পেছনে যথেষ্ট প্রমাণ এখনও সংগ্রহ করা যায়নি। তবে একাত্তরে পাকিস্তান বাহিনী এই বধ্যভূমিতে হাজার হাজার লাশ এনে গর্ত করে গণকবর দেয় তার বর্ণনা পরবর্তীকালে অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্যে উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনে কর্মরত এক সুইপার ১৮ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, প্রতিদিন রাতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ৫-৬টি ট্রাক এসে লাশ ফেলে যেত এখানে। ১৯৭২ এ দৈনিক বাংলা এখানে প্রায় ৫০০০ নাম না জানা শহিদের লাশ দেখতে পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস ছিল পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সেনা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। এখানে একদিকে ছিল উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের নারী নির্যাতনের, ধর্ষণের নিরাপদ কেন্দ্র। অন্যদিকে ছিল শত শত নিরপরাধ লোককে হত্যার সাক্ষী। এটি চট্টগ্রামের অন্যতম নির্যাতন কেন্দ্রও বটে। ছিল নির্যাতনের জন্য ইলেকট্রিক চেয়ার। এখানে হত্যা করা হয়েছে কয়েক হাজার লোককে। লাশগুলো নিয়ে ফেলা হয়েছে পাহাড়তলী ও গরীবউল্লাহ শাহ মাজার বধ্যভূমিতে।  

১৯৭১ সালের ২০ জুন সানডে টাইমস এর রিপোর্টে উঠে এসেছে চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহ গণহত্যার বিবরণ। তারা লিখেছে, এই শহর এখন শকুন, অবাঙালি আর পাকিস্তানি সেনাদের দখলে। এত বেশি লাশ এখানে সেখানে পড়ে আছে, শকুনদের অরুচি ধরে গেছে।.. কর্ণফুলির মোহনায় নাম না জানা শত শত মানুষের লাশ।

চট্টগ্রাম শহরের পাশাপাশি চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় হত্যাকাণ্ড চালায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা। বোয়ালখালী, পটিয়া, সাতকানিয়া, আনোয়ারাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রাম, উত্তর চট্টগ্রাম প্রত্যেকটি ইউনিয়ন আক্রান্ত হয়েছিল একাত্তরে। পটিয়া উপজেলা সদর থেকে ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে আরাকান সড়ক সংলগ্ন মুজাফরাবাদ গ্রাম। ৩ মে ১৯৭১ গ্রামে চালানো হয় নারকীয় গণহত্যা। মাহবুব উল আলম বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে লিখেছিলেন, যদি গণহত্যা কাকে বলে দেখতে চান, তবে মুজাফরাবাদ গ্রামে এসে দেখে যান। বোয়ালখালীর শাকপুরা গ্রামে প্রায় ২০০ লোককে হত্যা করা হয়েছে একদিনে। কালুরঘাট ব্রিজকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল নির্যাতন কেন্দ্র। রাউজানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও ফজলুল কাদেরের নেতৃত্বে গণহত্যার মিছিল শুরু হয়েছিল একাত্তরে। উনসত্তর পাড়া, জগতমল্লপাড়া, বণিক পাড়া, পালিত পাড়া, কুণ্ডেশ^রী ভবন সেই সব নির্মমতার সাক্ষী। একাত্তরে রাউজানে মোট ১৩টি গণহত্যা সংঘটিত হয়। এসব গণহত্যায় প্রায় ২০০ লোককে হত্যা করা হয়। আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করে অনেকেই। পাকিস্তানি বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় রাজাকাররাও সম্পৃক্ত হয়েছিল এই হত্যাযজ্ঞে। গণহত্যাগুলোর মধ্যে ১২টি সংঘটিত হয়েছে একই দিনে ১৩ এপ্রিল। মূলত এই দিনটি রাউজানের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক দিন। গণহত্যায় শহিদদের বড় একটি অংশ ছিল হিন্দু। পরিকল্পিতভাবে হিন্দু পাড়াগুলোকেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল ১৩ এপ্রিল ১৯৭১।

১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল চট্টগ্রাামের মিরসরাইয়ের মায়ানী ইউনিয়নের সৈদালী গ্রামে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ আর অগ্নিসংযোগ চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গ্রামে ঢুকে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ সময় গ্রামের ২২ জন নিরীহ নারী পুরুষকে গুলি করে পুড়িয়ে হত্যা করে তারা। অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে পুরো গ্রামকে বিরান ভূমিতে পরিণত করে পাকিস্তানি সেনারা।

১৯৭১ সালের ২০ মে ভোর চারটা থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত আনোয়ারা উপজেলার বন্দর গ্রামে গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। সেদিন এ গ্রামে ২২৮ জন নিরীহ গ্রামবাসী ও আশ্রিত মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার ও এদেশীয় দোসররা। সেদিন মৃত্যুপুরী খ্যাত এ গ্রামের দৃশ্য যারা দেখেছে তারা আজও ভুলতে পারেনি লোমহর্ষক এ গণহত্যার তাণ্ডব।

৪.

খুলনায় অবস্থিত দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র গণহত্যা জাদুঘরের উদ্যোগে চট্টগ্রাম জেলায় একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। যেটাতে চট্টগ্রামের ইউনিয়ন ভিত্তিক জরিপ করে গণহত্যা, বধ্যভূমি, গণকবর ও নির্যাতনকেন্দ্রের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। জরিপে চট্টগ্রাম শহর ও  এর উপজেলাগুলোতে প্রায় ৮৪৮টি গণহত্যা, বধ্যভূমি, নির্যাতন কেন্দ্র ও গণকবরের তথ্য পাওয়া যায়।

চট্টগ্রাম একাত্তরে পরিকল্পিত গণহত্যার শিকার। বিপুলসংখ্যক অবাঙালি পরিবারের উপস্থিতি ছিল এই বন্দরনগরীতে। পাকিস্তানি বাহিনীর পাশাপাশি তারাও অংশ নেয় হত্যা আর নির্যাতনে। এই জরিপে চট্টগ্রামে গণহত্যা, গণকবর, বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্রের নতুন ইতিহাস উঠে এসেছে।

জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে রাজধানী ঢাকার পরে দেশের সবচেয়ে বেশি নির্যাতন কেন্দ্র, গণহত্যা, গণকবর ও বধ্যভূমি চট্টগ্রামে। জরিপে আলোচিত গণহত্যা, বধ্যভূমি গণকবরের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম শহর অঞ্চলে অনেক গণহত্যা ও বধ্যভূমির বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ শহিদের পরিচয় অজ্ঞাত। প্রায় পাঁচ দশক আগে সংঘটিত গণহত্যা-নির্যাতনের ইতিহাস বিস্মৃত হয়েছে সাধারণের স্মৃতি থেকে। হারিয়ে গেছে নির্মমতা ও বর্বরতার স্মৃতিচিহ্নগুলো।

৫.

চট্টগ্রামের গণহত্যার একটি বড় বৈশিষ্ট্য এটি লিঙ্গ ও ধর্মভিত্তিক সহিংসতায় রূপ নিয়েছিল। আনোয়ারা উপজেলায় কাজ করার সময় এক বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হযেছিল। শুধুমাত্র নারী এবং হিন্দু হওয়ার কারণে তাদের তিন বোন, এক পিসি ও মার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা আমাকে এখনও ঘুমাতে দেয় না। এই শারীরিক অত্যাচারের মধ্যে একমাত্র বেঁচেছিলেন লক্ষ্মী রানী দাশ। তিন মেয়ের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর পাশবিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তাদের মা আত্মহননের পথ বেঁচে নিয়েছিল। ধর্ষণের পর হত্যা করেছে তাঁর দুই বোনকে। পিসি যে কই হারিয়ে গেল জানতেই পারল না লক্ষ্মী দাশ। এই হত্যা কি গণহত্যার অংশ নয়? শুধুমাত্র হিন্দু হওয়ার কারণে চট্টগ্রামের পটিয়া, রাউজান, বোয়ালখালীতে শত শত লোককে হত্যা করা হয়েছে। শত শত নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে শুধু হিন্দু বলে। 

চরম অযত্ন ও অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের অধিকাংশ বধ্যভূমি। এসব বধ্যভূমি হারিয়ে যাওয়ায় মুছে যাচ্ছে চট্টগ্রামের গণহত্যার ইতিহাস। বছরের পর বছর ধরে নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বধ্যভূমিগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় এগুলো বেদখল হয়ে যাচ্ছে। শহরের বধ্যভূমি-গণকবরগুলো হারিয়ে যাচ্ছে নগরায়নের ভিড়ে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সামনে অ্যাপোলো ফার্মেসির পেছনের বধ্যভূমিতে প্রায় ১৫০ জনকে গণকবর দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের সময়। ওই জায়গাটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। বর্তমানে সেখানে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। লালখানবাজার ও চকবাজার এলাকার দুটি গণকবরে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন।

একাত্তরের গণকবর কিংবা সম্মুখযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো এভাবে একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। নগরসহ চট্টগ্রাম জেলার চিহ্নিত বধ্যভূমি ও মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযুদ্ধের স্মৃতিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ¢ নির্মাণ প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই। প্রকল্পের জন্য স্থান নির্ধারণ ও তালিকা তৈরিতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের স্থানীয় কমান্ড ও জেলা কমান্ডের কাজের সমন্বয়হীনতা, অস্পষ্টতা, চিহ্নিত জায়গার মালিকানা নিয়ে জটিলতা এবং অর্থাভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। এ ব্যাপারে অনেকের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা। অনেক জায়গায় নামমাত্র ও জরাজীর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ¢ থাকলেও দেখে বোঝার উপায় নেই এগুলো বধ্যভূমি। অথচ বধ্যভূমি রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে চট্টগ্রামের সচেতন মানুষ। পাহাড়তলী বধ্যভূমি রক্ষায় অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, গাজী সালেহ উদ্দীন দ্বারস্থ হয়েছিলেন আদালতের। এ আবেদনের প্রেক্ষিতে বধ্যভূমি রক্ষায় হাইকোর্ট যুগান্তকারী রায় প্রদান করে। কিন্তু এরপরও রক্ষা করা যাচ্ছে না শহিদদের স্মৃতি বিজড়িত বধ্যভূমিগুলো। পাহাড়তলীতে যেমন শহিদের স্মৃতির ওপর গড়ে উঠেছে বহুতল বিশ^বিদ্যালয়, ফয়’স লেকে গণহত্যার স্মৃতি আর ইতিহাসকে নষ্ট করে কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।  বধ্যভূমির জায়গার ওপর নির্মাণ করা হয়েছে শপিং কমপ্লেক্স।

নগরীর বাইরে জেলার চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও বোয়ালখালিতে থাকা বধ্যভূমিগুলোর অবস্থাও প্রায় অভিন্ন। চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী ইউনিয়নের জামিজুরী গ্রামে অযত্ন-অবহেলা ও অরক্ষিতভাবে পড়ে রয়েছে একটি বধ্যভূমি। সাতকানিয়ার কাঠগড়ে, পটিয়ার কচুয়াই, হাটহাজারি, ফটিকছড়ি কিংবা সীতাকুণ্ডে অধিকাংশ বধ্যভূমি অরক্ষিত।

জেলা জরিপের কাজে চট্টগ্রাম নগর থেকে শুরু করে জেলার প্রায় প্রত্যেকটি গ্রামে গ্রামে ঘুরেছি আমি, প্রত্যক্ষ করেছি শহিদ পরিবারগুলোর দুরবস্থা, কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পাওয়ার গ্লানি। পটিয়ার মুজাফরাবাদ, আনোয়ারার বন্দর গ্রাম, রাউজানের উনসত্তর পাড়া, জগতমল্লপাড়া, রাঙ্গুনিয়ার পোমরা, বোয়ালখালির শাকপুরা কিংবা নগরের নাথ পাড়া গণহত্যায় শহিদ পরিবারগুলোর সাথে আমি একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছি। শুনেছি তাদের নানা অভাব অভিযোগ। প্রায় পাঁচ দশকেও এরা কেউ পায়নি শহিদ পরিবারের স্বীকৃতি। কোনো শহিদ সন্তান পায়নি কোনো রাষ্ট্রীয় প্রাধিকার। এই বঞ্চনা জেলা ও নগরীর প্রত্যেকটি শহিদ পরিবারে।

প্রায় পাঁচ দশক ধরে স্বজন হারানো পরিবারগুলো পায়নি কোনো সরকারি সাহায্য, সহযোগিতা কিংবা স¦ীকৃতি। এখন তারা সেই ক্ষোভ থেকে এই বিষয়ে আর কোনো কথাই বলছেন না। তাদের জন্য কিছু করতে না পারা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। বিষয়টি লজ্জার, হতাশার।

 (৬)

শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে একাত্তরে চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় তিন লাখ লোককে হত্যা করা হয়েছে। চট্টগ্রাম পরিণত হয়েছিল মুক্তিসংগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গনে। শহরজুড়ে ছিল লাশের মিছিল। চট্টগ্রাম একাত্তরে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত জেলা। চট্টগ্রাম শহরের পাশাপাশি এর প্রত্যেকটি উপজেলা একাত্তরের বর্বরতার মুখোমুখি হয়েছিল। চট্টগ্রাম শহরে শত শত গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। বলা যায় বধ্যভূমি গণকবরের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি নগর। এখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েকটি গ্রামের গণহত্যা একত্রে এক নামে উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো আলাদা করলে গণহত্যার সংখ্যা আরও অধিক হবে। গণহত্যার শিকার অনেক শহিদের লাশ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে। নদীর তীরের গণকবরগুলো এখন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বধ্যভূমি ও গণকবর অনেক ক্ষেত্রে একই স্থানে অবস্থিত। এসব ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও এক এবং কোথাও কোথাও একাধিক গণহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কালুরঘাট কর্ণফুলি নদীর তীরে, দোহাজারি শঙ্খ নদীর তীরে, হালদার পাড়ে শতাধিক গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার ক্যাম্প ছিল। ঐসব ক্যাম্পে গণহত্যা ও নির্যাতন হয়েছে। জেলার অনেক গণহত্যা, নির্যাতন কেন্দ্র, বধ্যভূমি, গণকবর এমনকি শহিদ মুক্তিযোদ্ধার কবরও চিহ্নিত করা হয়নি।

 যেসব এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে সে সবের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্মৃতিচিহ্ন বা স্মারক নির্মাণ করা হয়নি। তাই অবহেলায় পড়ে থেকে অনেক গণহত্যা, বধ্যভূমি, গণকবর, নির্যাতন কেন্দ্র ও মুক্তিযোদ্ধার কবর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কয়েকটি স্মৃতিচিহ্ন সরকারিভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এগুলোই যথেষ্ট নয়। এগুলোর বাইরেও অসংখ্য গণহত্যা, বধ্যভূমি, গণকবর, নির্যাতন কেন্দ্র ও শহিদ মুক্তিযোদ্ধার কবর রয়েছে। সেগুলোও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে শহিদদের স্মরণে এলাকায় স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করা, সড়কের নামকরণ করা, পাঠাগার স্থাপন করা, স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা প্রভৃতি উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে কিছুই যে হচ্ছে না তাও নয়, কিছু কিছু হয়েছে। যেগুলো হয়নি সেগুলোর প্রতিও দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। পর্যায়ক্রমে তা হবে বলেও আমরা আশা করি।

মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আর একটি বিষয় লক্ষ করেছি যে, বহু গণহত্যা ও বধ্যভূমিতে যারা শহিদ হয়েছেন তাদের অধিকাংশের নাম পরিচয় জানা সম্ভব হচ্ছে না। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় বধ্যভূমিগুলোতে মানুষ হত্যা করা হতো। কিন্তু তাদের নাম পরিচয় তারা জানাতে পারছেন না। গণহত্যায় শহিদের সংখ্যা বলছি তিন থেকে পাঁচ লাখ কিন্তু মাঠ পর্যায়ের জরিপে গণহত্যায় শহিদের সেই অনুপাতে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ছিল বন্দরনগরী, দেশের নানা প্রান্তের লোকজন কর্মসূত্রে নানা পেশায় চট্টগ্রামে বসবাস করত। গণহত্যায় যাদের অনেকেই শহিদ হয়েছেন, কেউবা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র সরে পড়েছিল, কেউবা হয়েছেন নিখোঁজ। চট্টগ্রাম শহরে একাত্তরে গণহত্যায় ঠিক কত লোক শহিদ হয়েছে, কিংবা তাদের তালিকা প্রণয়ন, সনাক্তকরণ বেশ দুরূহ। উপজেলাগুলোতে গণহত্যায় শহিদ শনাক্তকরণ ও শহিদের সংখ্যা নিরূপণেও ছিল নানা রকম প্রতিবন্ধকতা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেকে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল। বিশেষ করে শহরের কাছাকাছি পটিয়া, বোয়ালখালী ও রাউজানে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিল, যাদের অনেকেই গণহত্যায় শহিদ হন। ভারতে পালাতে গিয়ে ফটিকছড়ি, রাউজান, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই ও হাটহাজারীতে অনেকেই গণহত্যার শিকার হয়েছেন।   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares