রশীদ হায়দারকে ভুলি কি করে : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

শোকাঞ্জলি : রশীদ হায়দার

রশীদ হায়দারকে আমি কখনও রিকশায় দেখেছি বলে মনে পড়ে না; দেখেছি হয় সাইকেলে নয়তো পায়ে হাঁটতে। মনে হয়েছে অত্যন্ত স্বাবলম্বী এবং অতিশয় ব্যস্ত। বাংলা একাডেমিতে দেখা হলে যখন গল্প করেছে তখনও মনে হয়েছে কাজ থেকে সদ্য উঠে এসেছে এবং কাজে যাবে এক্ষুনি।

সেটা একটা কথা। তার চেয়েও বড় কথা এই যে, আমি কখনও ভাবিনি যে তাকে স্মরণ করে আমাকে কিছু লিখতে হবে। কারণ বয়সে সে আমার ছোট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবসিডিয়ারি ক্লাসে সে আমার ছাত্র ছিল সরাসরি।

রশীদের বড় ভাই জিয়া হায়দার আমার সমসাময়িক ও বন্ধু ছিলেন; লিখতে গিয়ে তার কথাও স্মরণে আসছে। চলে গেছেন তিনি হঠাৎ করে। আরেক ভাই দাউদ হায়দার ছিল আমার অত্যন্ত আপনজন। দাউদকে দেশ ছাড়তে হয়েছে একবারেই অপ্রত্যাশিত ও ভীষণ দুঃখজনকভাবে। দাউদ আমাদের নতুন দিগন্ত পত্রিকার জন্য লেখা পাঠিয়েছে জার্মানি থেকে। ক্লাসিকাল মিউজিকের সিডি পাঠিয়েছে আমার আগ্রহের কথা জেনে। ফোনও করে কখনও কখনও। মাকিদ হায়দার নতুন দিগন্তে নিয়মিত লেখে। জাহিদ হায়দারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ অনেক দিনের। তার কৈশোরিক লিটল ম্যাগাজিনে আমি লিখেছি এবং সেও লেখে আমাদের পত্রিকায়। জিয়া হায়দার জীবিত থাকলে তাঁর লেখাও অবশ্যই পেতাম। এক পরিবারে এমন কয়েকজন মেধাবান লেখক থাকাটা বিরল ঘটনা। আমার নিজের দুই ভাই ও এক বোন অকালে চলে গেছে, তাদের কথাও খুব মনে পড়ে। জীবিতরা সৌভাগ্যবান কিন্তু তারা আবার ভারবাহীও বটে, যারা চলে গেছে তাদের স্মৃতির।

রশীদকে আমি প্রথম দেখি বাংলা একাডেমির তিনতলার সভাকক্ষে। সেখানে মঞ্চস্থ শেক্সপিয়ারের নাটকাবলম্বনে রচিত বিদ্যাসাগরের ভ্রান্তিবিলাস। রশিদ অভিনয় করছিল ভৃত্যদের একজন ভূমিকায়। কাজের ছেলে। গামছা কাঁধে চঞ্চল পদে তার অপ্রতিভ প্রবেশের ভঙ্গিটি ভুলবার নয়। রশীদ হায়দার কেবল যে কাজে প্রাণবন্ত থাকতো তাই নয়, কৌতুকেও ছিল সে সমান প্রসন্ন। প্রাণবন্ততা যেন কিছুতেই সঙ্গ ছাড়বে না তার কৌতুকবোধের। ওর প্রথম নাটক ‘তৈলসংকেটে’ তাই হাস্যপরিহাসের কোনো অভাব ঘটেনি। একটি নাট্যসংগঠনের সঙ্গেও সে যুক্ত ছিল, অগ্রজ জিয়া হায়দারের পথানুসরণে।

সাবসিডিয়ারি ক্লাসে আমার পড়াবার বই ছিল অলডাস হাক্সলির মিউজিক এট নাইট। সেটি একটি প্রবন্ধের সঙ্কলন। সেকালে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা এখনকার মতো এত প্রচুর ছিল না। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কটা অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। আমি তখন নবীন শিক্ষক, উৎসাহের অভাব নেই, অনার্স ও সাবসিডিয়ারির অনেক ছাত্রের সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল প্রীতির। রশীদ হায়দারের সঙ্গে ওই রকম সম্পর্কটা গড়ে উঠতে সময় লাগেনি। দুই কারণে। দেখতাম সে মনোযোগী ছাত্র, হাক্সলির ওই প্রবন্ধগুলো পড়তে ও বুঝে নিতে আগ্রহী। দ্বিতীয় জানতাম সে  লেখে; এবং মঞ্চাভিনয়েও দক্ষ।

ওই সম্পর্কটা রয়েই গেছে। দেখা হলেই প্রসন্নতার দৃষ্টি হতো। সে খুশি হতো, খুশি হতাম আমিও। সহিত্য বিষয়ে কোনো কিছু নিশ্চিত হওয়া দরকার মনে করলে অনেক সময় সে আমকে ফোন করতো। ফোন আমিও করতাম; বিশেষ কোনো উদ্ধৃতির বিষয়ে নিশ্চিত হতে। মনে আছে সেবার সে কলাকাতা যাচ্ছিল আন্তর্জাতিক বইমেলায় যোগ দিতে। একটি আলোচনা সভাতে তার বলবার কথা; যা বলবে ঠিক করেছে সেটা ঠিক হচ্ছে কিনা জানতে সে তার বক্তব্যটা শেনালো, টেলিফোনে। আমিও যোগ করে দিলাম দু-একটা প্রসঙ্গ। পরে দেখি আমার জন্য সে একটা বই কিনে নিয়ে এসেছে। ওই সময়টা ছিল সিপাহি অভ্যুত্থানের দ্বিশতবর্ষ উদ্যাপনের। বেশ কিছু নতুন বই বের হয়েছিল সে উপলক্ষে। রশীদ অভ্যুত্থানটি সম্পর্কে আমার আগ্রহের কথা জানতো, তাই অভ্যুত্থান-বিষয়ে একটি বই সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছিল আমার জন্য।

বাংলা একাডেমিতে রশীদ নিজের জন্য উপযুক্ত কর্মক্ষেত্রটি পেয়ে গিয়েছিল। একাডেমি যে কাজগুলো করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার মধ্যে একটি হলো সঙ্কলন। একাডেমির সৌভাগ্যের ব্যাপার এটি যে প্রতিষ্ঠানটি প্রথমদিকে মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে সঙ্কলন বিভাগের জন্য পেয়েছিল। অভিধান সঙ্কলনের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে। রশিদ হায়দারও সঙ্কলনের কাজে নিজেকে নিযুক্ত করেছিলেন। তবে তার এলাকাটি ছিল স্বতন্ত্র। স্মৃতির ১৯৭১ নামে ১৩ খণ্ডে যে সঙ্কলনটি বাংলা একাডেমি প্রস্তুত ও প্রকাশ করেছে তার পেছনে রয়েছে তার মেধা, শ্রম ও আগ্রহ। অন্য কারও পক্ষে অমনভাবে ঐ কাজটি করা সম্ভব ছিল বলে আমি ধারণা করি না।

মনে পড়ে দাপ্তরিক কাজে একবার সে একটা ভুল করেছিল। ভুলটা কি তা মনে নেই, তবে ভুলের বাখ্যা করে কর্তৃপক্ষকে সে যে পত্রটি দিয়েছিল সেটি স্মরণে আছে। বিশেষ করে ব্যাখ্যা শেষে চূড়ান্ত বাক্যটির জন্য। রশীদ লিখেছিল ‘ভুল তবু ভুলই’। আমি তখন একাডেমির কার্যকর পরিষদের একজন সদস্য; পত্রটি যখন পড়া হয় তখন আমি উপস্থিত ছিলাম। বাক্যটি শুনে সবাই একসঙ্গে হেসে উঠেছিলেন। এ ত্রুটি স্বীকার কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, তবু ওই রকমের একটি বাক্য শুধু রশিদ হায়দারই যে লিখতে পারতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভুল কীভাবে ঘটেছে তার ব্যাখ্যা দিয়েছে, না-ঘটাই যে উচিত ছিল তাও মেনে নিয়েছে, তবে ভুল মানুষের হয় এবং ভুল জিনিসটা যে ভুলই শুদ্ধ নয় এটাও সে ভোলেনি। কিন্তু তার উপস্থাপনাটা একেবারেই মৌলিক।

মৃত্যুর আগে বেশ কিছুদিন সে শয্যাশায়ী ছিল এবং তার স্মৃতিশক্তিও লোপ পেয়েছিল বলে শুনেছি। তার সম্বন্ধে এ দুটির একটিও মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। সে তো ছিল কাজের মানুষ এবং তার স্মৃতিশক্তি তো ছিল অসাধারণ রকমের প্রখর।

বহুজনের পক্ষে যেমন  আমার পক্ষেও তেমনি তাকে ভোলা সহজ নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares