প্রিয় বন্ধু আবুল হাসনাত : সুব্রত বড়ুয়া

শোকাঞ্জলি : আবুল হাসনাত

বিগত মার্চ মাসের (২০২০) শেষ সপ্তাহের এক দিন বিকেলে কালি ও কলম অফিস থেকে ফেরার পথে আবুল হাসনাত আমাকে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন সেন্ট্রাল রোডে আমাদের ফ্ল্যাটবাড়িটির সামনে। তখন তো সত্যিই জানতাম না―এই আমাদের শেষ দেখা, আর কোনোদিন দেখা হবে না আমাদের। করোনার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে অফিস, এখন কাজ হবে যথাসম্ভব অনলাইনে। যাঁদের বাড়িতে সে ব্যবস্থা আছে তাঁরা পত্রিকার কম্পোজ ও অন্যান্য কাজ করে যাবেন। হাসনাত যাচ্ছিলেন শাহবাগের আজিজ মার্কেটে বইয়ের দোকান ‘তক্ষশিলা’য়। খবর পেয়েছেন, নতুন কিছু বই এসেছে। বই সংগ্রহ করতে ও পড়তে ভালোবাসতেন তিনি। দুষ্প্রাপ্য পছন্দের বই হলে প্রয়োজনে সযত্নে ফটোকপি করিয়ে বাঁধাই করে রাখতেন। প্রায় দেখতাম, নতুন বই হাতে এলে অন্যসব কাজ ফেলে রেখে তাতেই মগ্ন হয়ে যেতেন, খুঁটিয়ে না পড়লেও মনোযোগ দিয়ে দেখতেন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। ধানমণ্ডির কালি ও কলম কার্যালয়ে আমরা দুজন একই কক্ষে বসতাম। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নানা বিষয় নিয়ে আলাপ হতো, বই নিয়েও। আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বইয়ের খোঁজ দিতেন, পড়তেও দিতেন বিনা দ্বিধায়। হাসনাতের টেবিলের বড় একটা অংশ জুড়ে থাকত নানা ধরনের চমৎকার সব বই। আমাকে বলতেন, এখান থেকে বই নিতে সংকোচ করবেন না। পড়ার পর ফেরত দিলেই হলো।

বছর চারেক আগে একদিন হঠাৎ করেই আবুল হাসনাতের ফোন পেয়েছিলাম। স্বভাবসুলভ বিনয়ের সঙ্গেই জানতে চেয়েছিলেন কালি ও কলম-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে কাজ করতে রাজি আছি কি না। আকস্মিক এই প্রস্তাবে বিস্মিতই হয়েছিলাম প্রথমে। তিনি বলেছিলেন, সপ্তাহে দুদিন এলেই চলবে। রাজি হয়ে গিয়েছিলাম তখনই। তখন নতুন এয়ারপোর্টের কাছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সেই গাছপালায় ঘেরা সুন্দর বাড়িটিতে ছিল কালি ও কলম-এর অফিস। পরে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের প্রয়োজনে সে বাড়ি ভাঙার প্রয়োজন পড়লে আমরা চলে আসি ধানমণ্ডিতে। আমার সুবিধা-অসুবিধা, আসা-যাওয়ার গাড়ির ব্যবস্থা―সব ব্যাপারেই খেয়াল রাখতেন হাসনাত। তাঁর আন্তরিকতা ও বিনয়ের কোনো তুলনা হয় না।

তবে এও সত্য, বন্ধু হাসনাতের সঙ্গে হৃদ্যতার সম্পর্ক আজ পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হয়েছিলাম স্নাতকোত্তর শেষ পর্বে। তবে হাসনাতের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তারও আগে। ছাত্র ইউনিয়নের সূত্রে। লেখালেখির শুরুতেই আশ্রয় পেয়েছিলাম দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সাময়িকীর পাতায়। প্রায় কিংবদন্তিসম ব্যক্তিত্ব প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক শ্রদ্ধেয় রণেশ দাশগুপ্ত তখন সাহিত্য সাময়িকীর পাতা সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর কাছে প্রশ্রয় পেয়ে কবিতা থেকে প্রবন্ধেও উত্তরণ ঘটেছিল। অতএব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এসে তরুণ সাহিত্যসেবী ও সাহিত্যপ্রেমীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে দেরি হয়নি। ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক শাখা ‘সংস্কৃতি সংসদ’ তখন নানা উদ্যোগ-আয়োজনে তৎপর ছিল। এর মাধ্যমেই ঘনিষ্ঠতা হয় আবুল হাসনাতের সঙ্গে। জানা গেল কবি মাহমুদ আল জামান আসলে তিনিই।

আবুল হাসনাত সংবাদ-এর বার্তা বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে। দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও সংস্কৃতি সংসদের নানা কাজের ব্যস্ততা ছিল, রাতে যেতেন সংবাদ অফিসে। বুঝতে কষ্ট হয় না, কী অপরিসীম পরিশ্রম করতে হচ্ছিল তাঁকে তখন। সঙ্গে আরও ছিল প্রগতিশীল রাজনৈতিক কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্টতা। খুব কাছে থেকে দেখেছিলেন ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনকে। নিজেও পুরোপুরি জড়িয়ে ছিলেন তার মধ্যে। তাঁর ভাষায় ‘পুরনো আর্টস বিন্ডিংয়ের আমতলা, নতুন আর্টস বিল্ডিংয়ের বটতলা আর মধুর ক্যান্টিন এক সময়ে প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছিল। এখানেই অনন্য সাধারণ কিছু ছাত্রনেতাকে দেখেছিলাম, প্রত্যয়ে দীপ্ত; ধমনিতে ধারণ করেছিলেন তাঁরা সমাজ বদলানোর অনিঃশেষ শক্তি, যে কোনো ত্যাগের জন্য প্রস্তুত ছিলেন তারা। জীবন ছিল সরল ও নিরাভরণ। ভেবে দেখেছি, এঁদের অধিকাংশ এসেছিলেন গ্রামীণ কৌম সমাজ থেকে। গড়ে তুলেছিলেন প্রমত্ত ছাত্র আন্দোলন এবং দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সংযোগ রেখে দেশের রাজনৈতিক কর্মপ্রবাহে প্রবল ও তীব্র অভিঘাত সৃষ্টি করেছিলেন। পৃথিবীর যে কোনো যুব ও ছাত্র আন্দোলনের মতো এর গুরুত্ব কম তাৎপর্যবাহী ছিল না। ষাটের দশক হয়ে উঠেছিল মুক্তির দশক।’

আবুল হাসনাত মুক্তিযুদ্ধকালে ছিলেন কলকাতায়, কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব নিয়ে। এর বিস্তারিত বর্ণনা আছে তাঁর আত্মজৈবনিক হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে গ্রন্থে। এ বছর (২০২০) ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত এ বইটি, যতদূর জানি, তাঁর সর্বশেষ বই। মনে পড়ছে, বইটি লেখার সময় মাঝে মাঝে কোনো কোনো অংশ পড়তে দিতেন আমাকে। জানতে চাইতেন মতামত। হাসতে হাসতে বলতেন, ‘লোকে আমায় মারতে আসবে না তো?’

আবুল হাসনাত সংবাদ এর বার্তা বিভাগে কাজ করেছেন ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, মার্চ থেকে তিনি সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনায় দায়িত্ব পান। তাঁর সম্পাদকত্বে সংবাদ-এর এই বিভাগীয় পাতাটি যে সুধীজনদের ও তরুণ কবি-লেখকদের বিশেষ আকর্ষণ আদায় করে নিতে পেরেছিল সে কথা আমাদের সবারই জানা। সংবাদ সাহিত্য সাময়িকী ছাড়াও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘মুক্তধারা’ থেকে প্রকাশিত সাহিত্যপত্রের সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন আবুল হাসনাত। আর তাঁর সম্পাদিত সাহিত্যপত্রিকা গণসাহিত্য তো সবারই দৃষ্টি কেড়েছিল একসময়। সম্পাদক হিসেবে মানসম্পন্ন রচনা সংগ্রহ করার জন্য তিনি যে নিয়মিত চেষ্টা করতেন তাঁর সে চেষ্টার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। হাসনাতের অনুরোধকে যে না বলা যায় না সে অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। তবে সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রে আবুল হাসনাতের রুচি ও দক্ষতার ছাপ বিশেষভাবে লক্ষণীয় কালি ও কলম পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের কবি ও লেখকদের মধ্যেও তাঁর প্রতি যে বিশেষ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল তার পরিচয় ফুটে উঠেছে কালি ও কলম-এর প্রতিটি সংখ্যায়। এই পত্রিকাটির সূচনা থেকেই আবুল হাসনাত এর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করে এসেছেন বিগত প্রায় সতেরো বছর ধরে। পত্রিকাটির মান সমুন্নত রাখার এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ রচনার সমাহারে একে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য তিনি নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। এ আমার খুব কাছ থেকে দেখা।

কালি ও কলম ছাড়াও একই সঙ্গে আবুল হাসনাত সম্পাদনা করেছেন শিল্পবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা শিল্প ও শিল্পী। সংগীত ও চিত্রকলার প্রতি তাঁর আগ্রহের বিষয়টি অনেকেরই অজানা হয়তো। বাংলাদেশের অনেক গুণী শিল্পীর আঁকা ছবি তাঁর সংগ্রহে ছিল। চিত্রকলা ও চিত্রশিল্পীদের নিয়ে লেখা তাঁর গ্রন্থের নাম জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দিন ও অন্যান্য। হাসনাতের অনুরোধে শিল্প ও শিল্পী পত্রিকার জন্য আমি সংগীত ও চিত্রকলা বিষয়ে দুটি প্রবন্ধ অনুবাদ করে দিয়েছিলাম। হাসনাত খুবই খুশি হয়েছিলেন।

মনে হয় সম্পাদক আবুল হাসনাতের কিছুটা আড়ালে পড়ে গিয়েছিলেন কবি ও প্রাবন্ধিক আবুল হাসনাত। কবিতা ও প্রবন্ধের বই তাঁর খুব কম নয়। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক, কোনো একদিন ভুবনডাঙায়, ভুবনডাঙার মেঘ ও নধর কালো বেড়াল ও নির্বাচিত কবিতা। প্রবন্ধগ্রন্থ রবিশঙ্কর, মানিক, সতীনাথ ও অন্যান্য। প্রবন্ধের বিষয় নির্বাচনের দিকে লক্ষ করলেই বুঝতে পারা যায় তাঁর পঠন-পাঠন ও রুচির দিগন্ত। সর্বশেষ প্রকাশিত আত্মজৈবনিক গ্রন্থ হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে বইটিতে আবুল হাসনাত উজাড় করে লিখেছেন নিজের কথা, নিজের সময়ের কথা, নিজের চেনাজানা নিকটজনদের কথা। এবং তা শুধু নিছক বিবরণ নয়, বিশ্লেষণেও সমৃদ্ধ। বইটির ‘ভূমিকা’র এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘আমার জীবন কোনো অর্থেই বর্ণময় নয়। সাধারণ ও আটপৌরে। তবে প্রত্যক্ষ করেছি এদেশের মানুষের সংগ্রাম ও বিজয়। এই বিজয় আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে বাঙালি সমাজকে স্বাজাত্যবোধে উদ্দীপিত করেছে। জাতীয় বিকাশ, শিল্প ও সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রকে করে তুলেছে দীপিত। এ যে কত বড় অভিজ্ঞতা তা বলে শেষ করা যাবে না।’

আমাদের চারপাশে কতজনকেই তো দেখি―নিজেকে জাহির করার জোরে ভালোভাবেই বিভিন্ন জায়গায় স্থান করে নিয়েছেন। স্বভাবে রোমান্টিক ও আত্মপ্রচারবিমুখ আবুল হাসনাত, মনে হয়, নিজের প্রাপ্য স্বীকৃতিটুকুও ঠিকভাবে পাননি। কেবলই নিজের কাজটুকু করে গেছেন নিরলসভাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares