আবুল হাসনাত : উজ্জ্বল নীরবতা : মফিদুল হক

শোকাঞ্জলি : আবুল হাসনাত

সাহিত্যে আধুনিকতা আমাদের কাছে উচ্চমূল্য পায়, যে কারণে যদি কেউ হতে পারেন উত্তর-আধুনিক তবে তার মান্যতা ঘটে আরও অধিক। হালের এই সাহিত্যচিন্তা শাসিত হয় পাশ্চাত্যের পঠন-পাঠন দ্বারা, সেটার গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এইসব চিন্তার ফলে টেক্সট যে ক্রমে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, ইশারা-ইঙ্গিতের মধ্য দিয়ে বুঝে নিতে হচ্ছে অনেক কিছু কিংবা বলা যায় বুঝে নেওয়ার চেষ্টায় অবতীর্ণ হওয়া যায়, ফলে স্থিত হওয়ার মতো কিছু আর খুঁজে পাওয়া যায় না, আর এই না পাওয়াটাই বুঝি নিয়তি, একালের মানুষের ভাগ্যলিপি। নির্মাণ ও অনির্মাণ নিয়ে সাহিত্যক্ষেত্রে চলছে এক খেলা, অন্যদিকে সংবেদনশীল সাহিত্যব্রতী কিংবা কবি সময়ের প্রবাহ, এই ঘূর্ণিপাক, এই চোরাস্রোতের মধ্যে জীবনের হদিস খুঁজে ফেরেন, তত্ত্বের অনুশাসনের চাইতেও মনন ও হৃদয় তাদের কাছে পায় গুরুত্ব। এর ফলে তত্ত্ব ও কবিতার মধ্যে একটা ফারাক তো থেকেই যায়, আমাদের প্রচলিত সাহিত্যচিন্তা, হোক তা যতই অগ্রসর, হালফিল, নতুন নতুন তত্ত্ব কাঠামো নিয়ে যতই সোচ্চার, কোনো কবিকে সেখানে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তার স্বাক্ষর প্রকৃত কবি স্বয়ং নানাভাবে রেখে যান, সেই ভাষ্য পাঠের মতো মনোযোগ ও মানস আমাদের রয়েছে কিনা, সেটা বিশেষভাবে দেখার রয়েছে।

আবুল হাসনাতকে সম্পাদক হিসেবে দেখতে সবাই অভ্যস্ত, এ ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যও বুঝি সবাইকে এদিকে আকৃষ্ট করেছে। কিন্তু তিনি তো আপাদমস্তক কবি, নানা সংকটে দীর্ণ এক কবি, স্বভাবের ভীরুতা, কুণ্ঠা দ্বিধা নিয়ে নিজের অবস্থান বিষয়ে সদা জড়োসড়ো থাকেন, সাফল্য তাঁকে আরও বিব্রত করে, পাদপ্রদীপের আলোয় তিনি অস্বচ্ছন্দ, আড়াল থেকে মঞ্চমাতানো কুশীলবদের খেলা দেখতে বরং তাঁর আগ্রহ ও আনন্দ বেশি। তবে সব কিছুর পর তাঁর নিজস্ব যে জমিন, যেখানে তিনি শক্ত পায়ে দাঁড়ান, প্রচলিত ধারার পরোয়া না করে একেবারে নিজের মতো চলেছেন, কাব্যভূমি তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন, কবিতার পঠন-পাঠনে ছিলেন মগ্ন এবং কাব্যসৃষ্টি করে গেছেন নিভৃতচারীর উচ্চারণের মতো, নিজস্ব ভঙ্গিতে আপন উপলব্ধির নির্যাস অবলম্বন করে। সেখানে জীবনপ্রবাহের ছাপ বিশেষ মিলবে না, বরং আছে অবলোকন ও উপলব্ধির পরিচয়, টুকরো ছবির মতো যা অসংলগ্ন, চকিতে দেখা দিয়ে হয়তো আবার মিলিয়ে যায়, সংহতি খোঁজে না, মেলে ধরে সংবেদী ভাবনা। তার কবিতা মনে হতে পারে স্বগতোক্তি, নিজের সঙ্গে কথোপকথন, যেভাবে তিনি বোঝাপড়া তৈরি করেন জীবনের সঙ্গে।

হাসনাত ভাইয়ের সঙ্গে জীবনের দীর্ঘ পথচলায় সঞ্চিত হয়েছে কত না মধুর অভিজ্ঞতা। ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে যে কঠিন সময়ে আমরা দেশমুক্তি তথা মানবমুক্তি দ্বারা আলোড়িত হয়েছি তখন বিশ্বজুড়ে বামপন্থার জয়জয়কার। সমাজতান্ত্রিক শিবির চীন-সোভিয়েত দ্বন্দ্বে দ্বিখণ্ডিত হওয়ার সময়ে ছাত্র আন্দোলনে আমাদের হাতেখড়ি, তখন রুশপন্থার দিকে যে ঝুঁকেছিলাম বেশি, তার জন্য সাহিত্যের আকর্ষণ কাজ করেছে প্রবলভাবে। তবে আমাদের সাহিত্য-বোধ ও পঠন-পাঠন কেবল বামপন্থি সিলেবাস অনুযায়ী পাঠে সীমিত ছিল না, সেটা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। আবুল হাসনাত, আমাদের হাসনাত ভাইয়ের ক্ষেত্রে এটা ছিল আরও বেশি সত্য, তাঁর স্বভাবের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ ছিল সাহিত্যের পাঠ। স্বল্পপ্রজ লেখক নরেশ গুহের কবিতা, তাঁকে টানতো বেশি, ‘দূরে এসে ভয়ে থাকি/পাছে সে এসে ফিরে চলে যায়’, এই পঙ্ক্তি বা ‘শান্তিনিকেতনে ছুটি’ কবিতা কেন তাঁকে টানতো তখন বুঝিনি, এখন কিছুটা বুঝতে শুরু করেছি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সাহিত্যের চাইতে মানবিক সম্পর্কের কাহিনির প্রতি তাঁর পক্ষপাত ছিল বেশি, যেমন চতুষ্কোণ অথবা অতসী মামী ছিল তাঁর প্রিয় লেখা। এ-কারণেই বোধ করি অসীম রায়ের একালের কথার চাইতে গোপাল দেবের অসমবয়েসী অসামাজিক প্রেম-এর উপন্যাস তাঁকে আলোড়িত করে বেশি।

পাকিস্তানি আমলে রাজনৈতিক প্রণোদনা থেকে তিনি অনুবাদ করেছিলেন ‘পশতু গণমুখী কবিতা’। পাঠানদের মধ্যে ধর্মীয় রাজনীতি তথা মুসলিম লীগের কিংবা জামায়াতে ইসলামের প্রভাব বিশেষ ছিল না। উপরোন্তু তারা ছিলেন সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খানের অনুগামী, প্রবলভাবে স্বাধীনতাকামী। ঢাকায় তামাকের ব্যবসা করেন এক পাঠান, নাম বোধ করি আবদুর রহমান, বিশেষভাবে তাঁর সখ্য ছিল মতিউর রহমানের সঙ্গে, মতি-হাসনাত সম্পর্ক তো একেবারে বাল্য থেকে বহমান। তো এই পাঠান বন্ধুর সহযোগে পশতু কবিতা অনুবাদ করেন আবুল হাসনাত। অধুনা দুষ্প্রাপ্য এই বই তখন বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, বিশেষভাবে গণ-আন্দোলনে উত্তাল পূর্ব-বাংলায় সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আরেক জাতিগোষ্ঠীর সংগ্রাম হয়েছিল বিশেষ প্রেরণাদায়ক। খোশাল খটকের পঙ্ক্তি তো এখনও স্মৃতি থেকে মুছে যায় নি, ‘কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে/ এবার আমাদের লড়াই।’

সেই সময়ে আমরা কাজেই মজেছি বেশি, ছাত্র ইউনিয়ন, সংস্কৃতি সংসদের একুশে সংকলন প্রকাশ ছিল বিশেষ আনন্দের, রাজনৈতিক লেখালেখি ছাপার জায়গা খুব একটা ছিল না, সংবাদ-এর সাহিত্য সাময়িকী ছাড়া। আমাদের বৃত্তে আবুল হাসনাতই লিখতেন কবিতা, খুব বেশি নয় তাঁর কাব্যপ্রকাশ, তবে যা-ই লিখতেন সেখানে পশতু গণমুখী রচনার উচ্চকিত স্বর থাকতো না, রাজনীতির বাইরে যাওয়ার সময় সেটা ছিল না, কিন্তু সেই সময়েও আবুল হাসনাতের কবিতায় রাজনীতি পরোক্ষেই এসেছে, ব্যক্তিগত কথনে, অন্তরের দোলাচলের সূত্রে।

একেবারে যৌবনে কবিতায় যে-আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন আবুল হাসনাত, সেটা তার লেখাকে স্বাতন্ত্র্য জুগিয়েছিল, তাঁর দ্বিধা, কুণ্ঠা, ভীরু পদচারণা সবকিছু সমেত। তাঁর কবিতায় মাঝে মধ্যে উঠে আসত প্রিয় কোনো কবির পঙ্ক্তি, টুকরো টুকরো বাক্য, নিজের ভালোবাসা প্রকাশের পাশাপাশি মহাজনের শরণ নেওয়াও ঘটে। তবে সব ছাপিয়ে যা বৈশিষ্ট্য হিসেবে ফুটে ওঠে তা টুকরো ছবি, ছেঁড়াখোঁড়া চিত্রকল্প, এসব মিলিয়েই আবুল হাসনাতের কবিতা। আধুনিক কালের জীবনজিজ্ঞাসার সঙ্গে এই কবিতা তাই মানানসই থেকেছে, ইঙ্গিতে বলতে চেয়েছে অনেক কথা, যে-বোধ আপন অন্তরে ঘুরপাক খেলেও স্থিতি বুঝি পায় না, কিংবা হয়তো পাওয়ায় নয়, ভুবনডাঙ্গার মাঠ তাঁকে আপ্লুত করে, তিনি জ্যোৎস্নাভুক, সমুদ্র, মাঠ, কাঁটাবন, মেঘ প্রকৃতির সব উপাদানের জন্য তাঁর আকুতি, তবে অধরা থেকে যায় লালিত স্বপ্ন, কালো বেড়াল হানা দেয় জীবনে, ‘ভয়ঙ্কর এক কালো বেড়াল/ভয়াল হয়ে/আমার অস্তিত্ব ধরে দেয় টান আলো-আঁধারে/দগ্ধ হৃদয়ে/ভুবনডাঙ্গার মেঘে/আমার ভালোবাসা পড়ে থাকে।’

স্বাধীনতার পর শঙ্খ ঘোষ যখন প্রথম এসেছিলেন বাংলাদেশে, তাঁকে নিয়ে আমি আর হাসনাত ভাই গিয়েছিলাম পাকশি, কবির বাল্যতীর্থ, সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা, আমাদের দু’জনের জীবনে। পাকশির কাছাকাছি পৌঁছতেই শঙ্খ ঘোষ অস্থির হয়ে উঠছিলেন ভেতরে ভেতরে, বাইরে তাঁর প্রকাশ ছিল না, অন্তরের তোলপাড় আমরা বুঝলেও কথা প্রায় হচ্ছিল না, যা-কিছু বলবার তিনিই বলছিলেন, স্বভাবের বাইরে গিয়ে, একটু বোধহয় বেশিই বলছিলেন। ফিরে গিয়ে স্বভাব অনুযায়ী ছড়া লিখে পাঠিয়েছিলেন তাঁর সফরের সহযাত্রী বিভিন্ন জনকে নিয়ে, একান্ত ব্যক্তিগত লেখা, বাইরের কেউ বুঝতে পারবেন না। তাঁর আতিথ্য-দানকারী গৃহকর্ত্রী পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের ডাকসাইটে অধিকর্তা সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘এক দুই তিন ব্যাস/বলেছেন ডাক্তার/নার্গিস আক্তার।’ আমাদের নিয়ে লিখেছিলেন, ‘হাসনাত মফিদুল/দুই পাশে দুই/উজ্জ্বল নীরবতা।’

আমি উজ্জ্বল নই, নীরবও নই, কিন্তু আমি জানি কবি আবুল হাসনাত কীভাবে ধারণ করেছেন উজ্জ্বল নীরবতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares