মাহমুদ আল জামান, আবুল হাসনাত কবি ও নিভৃতচারী সম্পাদক : মোহিত কামাল

শোকাঞ্জলি : আবুল হাসনাত

সম্পাদক হিসেবে তিনি পরিচিত আবুল হাসনাত নামে। আর তাঁর আসল নাম মাহমুদ আল জামান। এ নামে তিনি লিখে গেছেন কবিতা, জীবনঘনিষ্ঠ সব কবিতা। তাঁর কবিতার মুগ্ধ পাঠক আমি। শব্দঘর ছেপেছে তাঁর বেশ কিছু কবিতা। প্রাবন্ধিক  হিসেবেও তিনি অসাধারণ কাজ করে গেছেন। নিজের উপলব্ধির ভেতর থেকে যেকোনো বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ কিংবা ডিটেইলিং করার অনন্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। বাংলা একাডেমি মঞ্চে তাঁকে পড়ে শোনাতে দেখেছি নিজের হাতের লেখায় রচিত মূল প্রবন্ধ। দেখে দেখে পড়তে তিনি পছন্দ করতেন। একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘দেখে পড়লে মূল কথাগুলো উপস্থাপন করা যায় সবিস্তারে। না দেখে পড়লে বা বক্তৃতা করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সে-ক্ষেত্রে প্রবন্ধ উপস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।’

মাহমুদ আল জামানকে কবি কিংবা কথাসাহিত্যিক হিসেবে বিভিন্ন দৈনিকের সাহিত্যপাতায় খুব একটা দেখা যায় নি। তাঁর সম্পাদকসত্তার তলে চাপা পড়ে গেছে সাহিত্যসত্তা। অনেকে তা দেখেও দেখেননি। বিষয়টি আমাকে বেদনাহত করেছে। তাই শব্দঘর-এর গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যাগুলোতে ছেপেছি তাঁর  কবিতা, প্রবন্ধও। যখনই তাঁকে ফোন করেছি, লেখা চেয়েছি, হাজার ব্যস্ততার মাঝেও মৃদু ভাষায় সম্মতি  জানিয়েছেন, জানাতেন। নির্দিষ্ট তারিখের আগেই পেতাম তাঁর কবিতা, কাক্সিক্ষত প্রবন্ধও। কখনও ফিরিয়ে দেননি আমাকে। অতি ব্যস্ততার মাঝেও উপেক্ষা করেননি আমার আবদার।

তাঁর শিল্পচেতনার প্রতিফলন আমরা দেখার সুযোগ পেয়েছি শিল্পবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা শিল্প ও শিল্পী সম্পাদনায় ও অনন্য উপস্থাপনায়। আর কালি ও কলম পত্রিকাটির ‘প্রচ্ছদ-পরিচিতি’ বিভাগও একদম অনন্য সংযোজন। কোনো  সাহিত্য পত্রিকায় এ ধরনের বৈচিত্র্য আমার চোখে পড়েনি। প্রচ্ছদ-শিল্প একটি পত্রিকার সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা প্রকাশ করে। তারও যে মূল্যায়ন হওয়া দরকার বিষয়টি গভীরভাবে অনুভব করেছেন আবুল হাসনাত। আর তাই আমরা দেখি প্রচ্ছদশিল্পী এবং প্রচ্ছদ-চিত্রকলা নিয়ে পত্রিকাটির শুরুতেই সূচিপত্রের পাশে বর্ণনা থাকে, যা নিশ্চিত যেকোনো শিল্পীর জন্য একটি বড় উপহার, প্রণোদনা বা রিওয়ার্ড বা  পুরস্কার হিসেবে কাজ করে। এভাবে শিল্পীর মর্যাদা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন আবুল হাসনাত।

তাঁর কাব্যেও প্রতিফলন ঘটেছে শিল্পীমনের গভীরতর বোধের। জীবন-দর্শন, সামাজিক জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, হাহাকার, ভালোবাসা, মর্মযাতনা, দহন―এসব মনস্তাত্ত্বিক অনুষদের যথাযথ রূপায়ণ দেখা যায় তাঁর কাব্যে। এ ক্ষেত্রে সমকালীন জীবনকে  প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। রূপক-উপমা ব্যবহারের অসাধারণ নৈপুণ্য তাঁর কবিতার প্রাণরসায়ন। সাধারণ জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা ছিল তাঁর। শব্দের বাহুল্য এবং আবেগের আতিশয্য নিয়ন্ত্রণে রেখে তিনি কবিতার ফর্ম ও কনটেন্টের মধ্যে অসাধারণ সমন্বয় সাধন করতে পেরেছেন বলে  মনে করি। বিশ্বাস, কোনো না কোনো সময় তাঁর কাব্যসত্তার অসাধারণ বৈশিষ্ট্য আমাদের সাহিত্যকে আলোকিত করবে। সাহিত্যবোদ্ধা- গবেষকদের প্রতি আমার আহ্বান: আসুন, আমরা কবি মাহমুদ আল জামানের কাব্যপ্রতিভা আবিষ্কার করি, তা পাঠ করি এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সেটা উপস্থাপন করে রেখে যাই।

তিনি শুধু নিজেই কবিতা লিখেছেন তা নয়। কবিতার একজন ক্ষুরধার পাঠকও তিনি।

তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের কবিতার সংকলন, গল্পসংকলন এবং কালি ও কলম পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রকাশিত লেখার সংকলন গ্রন্থ।

গ্রন্থ তিনটি হলো :

১. মুক্তিযুদ্ধের কবিতা

সম্পাদনা : আবুল হাসনাত

প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ

প্রকাশক : অবসর প্রকাশনা সংস্থা

প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০০০

মূল্য : ৩৫০ টাকা

…………………

২. মুক্তিযুদ্ধের গল্প

সম্পাদনা : আবুল হাসনাত

প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ

প্রকাশক : অবসর প্রকাশনা সংস্থা

৮ম প্রকাশ: ২০১৮

মূল্য : ৪৫০ টাকা

…………………

৩. রবীন্দ্রনাথ : কালি ও কলমে

সম্পাদনা : আবুল হাসনাত

প্রকাশক : বেঙ্গল পাবলিকেশন্স

প্রথম প্রকাশ : ২০১২

মূল্য : ৫০০ টাকা

বাংলা সাহিত্যে সংকলন দুটি উত্তরপ্রজন্মের জন্য অবশ্যপাঠ্য বলে মনে করি। কেউ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবিতা-গল্প লিখতে চাইলে আগে পূর্বপ্রজন্মের কবি ও কথাসাহিত্যিকদের সৃষ্টিজগৎ একবার উন্মোচন করে দেখা উচিত। তার জন্য সহজ ক্ষেত্র তৈরি করে রেখে গেছেন  নিভৃতচারী সম্পাদক আবুল হাসনাত। জাতি অবশ্যই তার এ মহান শ্রমকে মূল্য দেবে আশা রাখি।

সৃজনশীল জগতে আমার আদর্শ ব্যক্তিত্ব, আমার প্রিয় মানুষ সম্পাদক আবুল হাসনাত। ধানমন্ডির এক পাড়াতেই আমাদের বসবাস। ভৌগোলিকভাবেই শুধু কাছের নয়, মানসিকভাবেও তিনি ছিলেন আমার কাছের অগ্রজ, ভরসাস্থল। তাঁর মধ্যে কোনো ধরনের নেতিবাচক মনোভাব দেখিনি―ঈর্ষা-হিংসা-বিদ্বেষ কখনও প্রকাশ পায়নি তাঁর কথায়, লেখা এবং আচরণে। যখনই কাছে গিয়েছি খুব আপন করে নিয়েছেন, প্রাণ খুলে নরম ভাষায় কথা বলেছেন। সরাসরি প্রশংসা, সমালোচনা বা পরামর্শ দিতেন না তিনি। গল্পচ্ছলে, কথার ছলে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতেন। তার মধ্য থেকে আমি আমার করণীয়টা ঠিক করে নিতাম। খুব কৌশলে শব্দঘর-এর ঘাটতিগুলো তুলে ধরতেন। বুঝে তা উত্তরণের চেষ্টা করে যেতাম আমি। ঠিক যেন ছোট ভাইকে বড় ভাইয়ের গাইড করার মতো ব্যাপার ছিল আমাদের সম্পর্কটি।

শব্দঘর তৃতীয় বর্ষশুরু সংখ্যায় (জানুয়ারি ২০১৬) তিনি তাঁর সম্পাদক জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন, ‘সমকালীন জীবনের নানা সংকট রূপায়ণকে অধিক প্রশ্রয় দিয়েছি’।

তাঁর এ কথার আলোকে আমার লেখালেখির জগতেও আমি প্রাধান্য দিয়েছি সমকালীন জীবন।

শব্দঘর-এ প্রকাশিত গল্প-কবিতা- প্রবন্ধ প্রকাশেও তাঁর কথার গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করে গেছি, চেষ্টা করে যাচ্ছি।

শব্দঘর-এর প্রকাশনা প্রসঙ্গে আনন্দ সংবাদে শুভকামনা জানিয়েছিলেন সজ্জন এ নিভৃতচারী শব্দ কারিগর :

‘পূর্ণাঙ্গ মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বাণিজ্যিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে― এমনটি আশা করা যায় না। তবু লক্ষ করছি শব্দঘর তৃতীয় বর্ষশুরু করতে যাচ্ছে। সব বাধা দূর করে এগিয়ে যাক পত্রিকাটি। শুভকামনা রইল।’

বারবার তাঁর বাসায় গিয়েছি। কথা বলেছি। সম্পাদনার বিষয়ে আলোচনা করেছি। তাঁর অভিজ্ঞতা শুনেছি তাঁর মুখেই। শব্দঘর সম্পাদক হিসেবে অর্জিত সে-অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছি, লাগাচ্ছি। ভবিষ্যতেও তাঁর দেখানো পথ আমাকে আলোকিত করবে বলেই বিশ্বাস করি।

বর্তমানে তিনটি সাহিত্য পত্রিকা বাজারে নিয়মিত বেরোচ্ছে: মাসিক কালি ও কলম, শব্দঘর এবং মাসিক উত্তরাধিকার। উত্তরাধিকার নিয়ে তিনি বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন। শব্দঘর নিয়েও মৃদু ভাষায় বলেছেন, ‘ভালো হচ্ছে, ভালো হচ্ছে।’

আর নিজের সম্পাদিত কালি ও কলম নিয়ে কখনও প্রশংসাসূচক কিছু বলতেন না। মনে হতো এ নিয়ে অতৃপ্তি তাঁর মধ্যে থেকেই গেছে। আরও ভালো কিছু করার, আরও অনন্যভাবে পত্রিকাটিকে উপস্থাপন করার একটা গোপন তাগিদ আমৃত্যু তাঁর প্রেষণার মধ্যে লুকিয়েছিল। আর তাই সম্পাদনায় তিনি মগ্ন থেকেছেন, উত্তরোত্তর কালি ও কলম মাসিক সাহিত্য পত্রিকাটিকে বিশ্বজুড়ে প্রায় সকল বাংলা ভাষাভাষী সাহিত্যপ্রেমীর মনে স্থান করে দিয়ে গেছেন।

বলতে দ্বিধা নেই তাঁর জ্ঞানগর্ভ দূরদৃষ্টি, পদক্ষেপ-পরিকল্পনা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা সাহিত্যকে উপহার দিয়েছে হিমালয় সমান উঁচু সম্পাদনার মাইল- ফলক, চূড়া। আর তাই কথাসাহিত্যিক, চিত্রকলা-সমালোচক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক এবং প্রগতিশীল চিন্তার অগ্রদূত আবুল হাসনাত এসব পরিচয় ছাপিয়ে শক্ত আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন সম্পাদক হিসেবেই।

তাঁর সর্বশেষ সম্পাদিত কীর্তিগাথা হচ্ছে কালি ও কলম অক্টোবর-নভেম্বর সংখ্যা ২০২০। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশতজন্মবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে কালি ও কলম-এর এ সংখ্যাটি তাঁর আন্তরিক উৎসাহ, চেষ্টা ও পরিকল্পনায় প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে সম্পাদকীয়তে। আবুল হাসনাত সংখ্যাটি দেখে যেতে পারেননি। তার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু প্রকাশিত সংখ্যাটিতে রয়েছে আবুল হাসনাতের অনন্য যত্নের ছাপ,  মগ্নসাধনা, গভীর দূরদর্শিতা এবং পত্রিকাটির প্রতি মৌলিক ভালোবাসা। পাঠক ও সম্পাদক হিসেবে তাঁর এ ভালোবাসা বুকে তুলে রাখলাম। উত্তরপ্রজন্ম নিশ্চয়ই মনে রাখবে তাঁকে একজন ক্ষুরধার শব্দসৈনিক, শব্দকারিগর, শব্দ প্রেমিক, নীবর কবি ও সফল সম্পাদক হিসেবে।

২০১৭ সালে প্রথমা প্রকাশন থেকে বেরিয়েছে সমকালীন সামাজিক ক্ষত নিয়ে লেখা আমার উপন্যাস সুস্মিতার বাড়ি ফেরা।

কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত এবং প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান উভয়েই সমকালীন ঘটনা, সামাজিক সমস্যা নিয়ে উপন্যাস লেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এ  গুণী দুই সম্পাদকের পরামর্শ মাথায় রেখে লিখেছিলাম উপন্যাসটি। অন্তর্গত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকে বইটি উৎসর্গ করেছি সম্পাদক আবুল হাসনাতকে। উৎসর্গপত্রে লিখেছিলাম:

আবুল হাসনাত

নিভৃতচারী সাহিত্য-কারিগর

সম্পাদক, কালি ও কলম

বইটি যখন হাতে তুলে দিলাম অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তিনি তা গ্রহণ করলেন। খুশি হলেন। উৎসাহ দিলেন। অনুপ্রাণিত করলেন মৃদুভাষী এ মহান সম্পাদক। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাঁর জন্য।

বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে তিনি আমার একটি বই প্রকাশের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কয়েকবার ফোন করেছিলেন। পারিনি তাঁর কথা রাখতে। এই অপরাধবোধ মাথায় রেখে হীনমন্যতায় ভুগছি এখন। তবু বলব, প্রিয় হাসনাত ভাই, আপনি আমার শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার মানুষ। শব্দঘর ডিসেম্বর সংখ্যা ২০২০ কথাশিল্পী রশীদ হায়দার ও আপনাকে উৎসর্গ করে নিজের মানসিক দৈন্য কাটানোর চেষ্টা করছি। মন থেকেই করেছি। ওপারে নিশ্চয়ই আপনি ভালো থাকবেন। প্রার্থনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares