প্রবন্ধ : অতিমারি আর অভিকরণ : পবিত্র সরকার

ভূমিকা

অভিকরণ কথাটা আমি বছর বিশেক হলো ঢ়বৎভড়ৎসধহপব-এর বাংলা হিসেবে ব্যবহার করছি। যে অভিকরণ করে সে অভিকার, performance. ‘অভিকর’ও হতে পারে, তবে এটা মনে হয় ভালো শোনায়। যাই হোক, এই করোনার বিপর্যয়কর অভিকরণের মধ্যেও আরও এক বিপুল বিপন্নতা দেখা দিয়েছে। থিয়েটার বন্ধ, জলসা বন্ধ, এমনকি সিনেমা হলও বন্ধ। নেতাদের মঞ্চের বক্তৃতা বন্ধ, এমনকি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ। খেলার মাঠ দর্শকশূন্য, খেলাও বন্ধ।

হ্যাঁ, বক্তৃতা, শিক্ষাদান, খেলা―এগুলোকেও আমি এক ধরনের অভিকরণ বলে মনে করি।

বহু লোক একসঙ্গে মিলে পাশাপাশি বসে দেখবে বা শুনবে, বিনোদন বা শিক্ষার জন্য, আর এক-দিকে, বা (বিশেষভাবে খেলায়, থিয়েটারেও হয় না তা নয়) মাঝখানকার পরিসরে একজন বা একাধিক মানুষ কথা বলে, গান গেয়ে, নেচে, অভিনয় করে, খেলে, তাদের সেই বিনোদন বা শিক্ষা দেবে, উত্তেজিত বা উদ্বোধিত করবে, সুখে-দুঃখে আলোড়িত করবে এই ব্যবস্থাটা কয়েক মাস ধরে স্থগিত আছে, চিরকাল স্থগিত হয়ে যাবে এমন সম্ভাবনা বা আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। প্রায় তিন-চার হাজার বছরের ঐতিহ্য, আজ একটা অতিমারির আতঙ্কে পুরো বন্ধ হয়ে গেল। আর-একবার প্রমাণ হলো যে, অগ্রাধিকার জীবনের, শিল্পের নয়। মানুষ হেরে যাচ্ছে একটা রোগের কাছে। সামান্য রোগ নয়, অতিমারি। এইটা মানুষের চূড়ান্ত, অপরিবর্তনীয়, শেষ পরাজয়, না সাময়িক পশ্চাদপসরণ―উৎপল দত্ত যাকে বলতেন strategic flexibility, লেনিনের One step forward, two steps backward-এর অনুসরণে, তা অন্তত আমি বলতে পারব না।

কিন্তু শিল্পের তুলনায় জীবনের অগ্রাধিকার মানে এই নয় যে শিল্পকে সম্পূর্ণ বর্জন করে জীবনকে রক্ষা করতে হবে। তাতে জীবন যে পরিমাণ দরিদ্র হবে, সেই জীবন কতটা রক্ষণীয় তাই নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাবে। মানুষের হাজার হাজার বছরের সভ্যতার যা শ্রেষ্ঠ অর্জন, তার শিল্পতা যদি দর্শক- শ্রোতাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে ভাগ করে নেওয়ার জীবন্ত অভিজ্ঞতা আমরা বিসর্জন দিই, তা হলে আমাদের কী থাকবে জীবনে? এটা ঠিক যে, অন্য প্রাণীদের যেমন ভাষা নেই তেমনই তাদের শিল্পও নেই, কাজেই শিল্প হলো মানুষের মনুষ্যত্বের একটা অনাহত চিহ্ন। সে যে আর কিছু বা কেউ নয়, মানুষ, তার সেই identity-র অন্যতম ভিত্তি। সেই শিল্পই যদি চলে যায় তা হলে মানুষ কি অন্য প্রাণীদের আহার, নিদ্রা আর সন্তান-উৎপাদন আর সন্তান-পালনের জীবনমাত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে? যদিও এ কথা জানি যে, অন্য প্রাণীদের সবাই সন্তান পালন করে না। তার মনুষ্যত্বের একটা বড় নিশানা হারাবে?

আমি জানি, শিক্ষা আর খেলাধুলাতেও সমস্যা প্রায় একই রকম, তবু আমি এই নিবন্ধে খেলা আর শিক্ষার বিষয়টাকে একপাশে সরিয়ে রাখব, পুরোপুরি উপেক্ষা না করে। মূলত চেনা অভিকরণগুলোকে নিয়েই কথা বলব।

শিল্পের নানা ভেদ

অবশ্যই কিছু কিছু শিল্প আছে, যেখানে স্রষ্টা বা অভিকারের দর্শক-শ্রোতার সান্নিধ্যে আসার, এমনকি মুখোমুখি হওয়ার দরকার পড়ে না। যেমন ছবি, ভাস্কর্য, স্থাপত্য ইত্যাদি। সাহিত্যও অবশ্যই তার মধ্যে পড়ে। এগুলো সে অর্থে অভিকরণ নয়। দর্শক শারীরিক দূরত্ব-বিধি মেনে প্রদর্শশালা বা অকুস্থলে গিয়ে এগুলো দেখতে পারে, লকডাউন উঠে যাচ্ছে ক্রমশ, তার সুযোগ ক্রমশ বাড়বে। বই তো নিজের বাড়িতে বসেই পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রস্তুত শিল্পগুলো অজীব বস্তু তাদের সংসর্গে দর্শকদের করোনাক্রান্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কা সম্ভবত নেই। আর এসবের স্রষ্টারাও, যদি জীবিত থাকেন, নিজেদের কাজ দেখানোর জন্য দর্শকদের কাছাকাছি আসার অনিবার্য প্রয়োজন বোধ করবেন না। হতেই পারে যে, প্রদর্শনীতে এক সময় শিল্পী বা ভাস্কর উপস্থিত থাকতেন, তিনি নিজে দর্শকদের ঘুরিয়ে দেখাতেন, প্রশ্নের উত্তর দিতেন, কিন্তু সেটা দর্শকের এসব দেখার অনিবার্য শর্ত ছিল না। স্থাপত্যে তো তার প্রশ্নই নেই। এসব শিল্পের উপভোক্তাদের সম্পর্ক শুধু শিল্পবস্তুর সঙ্গে ছবি, মূর্তি, স্থাপত্য ইত্যাদিতে। আর সাহিত্যে পাঠকের সম্পর্ক অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুদ্রিত রচনার সঙ্গে। তার স্রষ্টাদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক হওয়ার বা কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা খুবই কম। অবশ্যই প্রকাশক তাঁর কার্যালয়ে বা বইমেলার স্টলে জনপ্রিয় লেখককে বইয়ে স্বাক্ষর করার একটা সুযোগ করে দেন, ক্রেতারা লাইন দিয়ে তাঁদের কেনা বইয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। অবশ্যই সেসব জন-সংসর্গ আপাতত বন্ধ থাকবে।

কিন্তু আমি অভিকরণ বলতে যা বোঝাচ্ছি তার সব ক্ষেত্রেই দর্শক-শ্রোতাদের সঙ্গে স্রষ্টাদের একটা জটিল সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। অবশ্যই নাটকের, গানের, নৃত্যের স্রষ্টারা ‘সাধারণভাবে’ মঞ্চে থাকেন না, নিজেরা প্রায়ই ‘অভিকার’ বা performerহন না। হতেও পারেন, গ্রিসে থেসপিস যেমন নিজেই দল করে অভিনয় করতেন, সারা পৃথিবীতে প্রচুর নাট্যকার তাই করেছেন, বিলেতে শেক্সপিয়ার তাই করেছেন, আমাদের এখানে গিরিশ চন্দ্র ঘোষও তাই করেছেন। গানের রচয়িতারাও মঞ্চে গান গেয়েছেন, নৃত্য রচয়িতারা নিজেরাই নেচেছেন, এ দেশে উদয়শংকর যেমন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এসব শিল্পে একদল মধ্যস্থ বা mediator তৈরি হয়ে যায়, যাঁদের আমরা বলি অভিকার। গানের ক্ষেত্রে গায়ক, নাচের ক্ষেত্রে নর্তনশিল্পী, নাটকের ক্ষেত্রে পরিচালক তথা অভিনেতারা। এটা গেল একদিকের ব্যাপার, যারা মঞ্চে থেকে অভিকরণ করবেন, তাঁদের দিকটা। তাঁরা কোথায় বসবেন বা দাঁড়াবেন বা অন্য কোনো ভঙ্গিতে থাকবেন, সেই নিছক ভৌগোলিক পরিসরটুকুকে নিয়ে পৃথিবীতে (মঞ্চ)- স্থাপত্যশিল্পীরা হাজার বছর ধরে মাথা ঘামিয়ে আসছেন। শিল্পের কারণেই তাঁরা মঞ্চ থেকে দর্শকদের মধ্যে কম বেশি ‘ফাঁকা জায়গা’ রেখেছেন, মঞ্চ আর দর্শকাসনের উচ্চতারও হেরফের ঘটিয়েছেন। শুধু একটা মঞ্চ গড়ে দিলেই হলো না। প্রত্যেকটি অভিকরণের আলাদা আলাদা চাহিদা, আলাদা আলাদা প্রকল্প। একক গায়কের জন্য মঞ্চের গভীরতা, একশ দেড়শ গায়কের জন্য মঞ্চের গভীরতা এক নয়। মঞ্চটা ডাইনে-বাঁয়ে সামনে-পেছনে, এমনকি উপরে নিচে কতটা জায়গা নেবে সবই স্থাপতিকে ভাবতে হয়।

ব্যাপারটা কতটা সূক্ষ্ম ভাবনা দাবি করে তার একটা উদাহরণ দিই। ধরা যাক আমাদের রবীন্দ্র-সদন মঞ্চ। এখানে প্রথম সারিতে বসে মঞ্চের মেঝেটা খুব একটা দেখা যায় না। নাটকে হয়তো সেটা চলে যায়, কিন্তু ভালো নাচ দেখার সময় নৃত্যশিল্পীদের পায়ের কাজ বা footwork একটা অবশ্য-দ্রষ্টব্য জিনিস, সেটা না দেখলে নাচ, বিশেষত ধ্রুপদী নাচ, দেখা অসম্পূর্ণ থাকে। সেটা পিছনের সারির দর্শকরা দেখবেন, ব্যালকনির দর্শকরা দেখবেন, আর সামনের দুটি সারির দর্শকরা দেখবেন না, এ এক অদ্ভুত বৈষম্য। বিশেষত সামনের ওই দুটি সারির দর্শক যেখানে শহরের বা দেশের সবচেয়ে দামি বা সম্মানিত দর্শক। কাজেই মঞ্চ যারা তৈরি করবেন তাঁদের এসব কথা মনে রাখতে হয়। সবাই যে সব মনে রাখেন তা নয়। নাটকের লোক মঞ্চ তৈরির সময় হয়তো নাচের কথা মনে রাখেন না।

আবার বাদল সরকারের মতো কেউ কেউ এক সময়ে মঞ্চ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানও করেছেন, স্থাপত্যকলার কোনো পরোয়া করেননি। দর্শকদের সঙ্গে দূরত্বের ধারণাটিরও রূপান্তর ঘটিয়েছেন। কিন্তু দর্শকদের বর্জন করতে পারেননি, তা করার প্রশ্নই ছিল না, কারণ দর্শক-শ্রোতা না থাকলে তাঁদের অভিকরণের কোনো অর্থই দাঁড়ায় না।

করোনাকালে কে বা কী আসল বিপদ

আসল বিপদ, দেখা যাচ্ছে, অভিকাররা নয়। যাকে ভুল করে বলা হচ্ছে ‘সামাজিক দূরত্ব’, আসলে শারীরিক দূরত্ব, তাকে হয়তো অভিকাররা একভাবে রক্ষা করতে পারেন, খেলার মাঠে তা সম্ভব না হোক। খেলার মাঠে অনেক খেলায় খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়, তারা পরস্পরকে খুশিতে জড়িয়ে ধরেন, কোলে তুলে ধরেন তা আমরা দেখি। আমাদের ফুটবলে, বিলেতে রাগবিতে, আমেরিকানদের ফুটবলে (রাগবির মার্কিন সংস্করণ), এটা প্রায়ই হয়। কুস্তি আর মুষ্টিযুদ্ধ তো শারীরিক সংঘর্ষেরই খেলা। এই খেলাগুলোর কী গতি হবে তা নিয়ে ভাববার জন্য প্রচুর দামি লোক আছে, যারা এসব ভাবনার জন্য লাখ লাখ টাকা পায়। আমি গরিব মানুষ অভিকারদের নিয়েই ভাবি।

এখন দেখা যাচ্ছে যে, এই দর্শক-শ্রোতারাই বেশি মাথাব্যথার কারণ, মঞ্চে যারা থাকবেন তাঁদের চেয়েও। কারণ তাঁরা রঙ্গালয়ে বা খেলার মাঠে যেভাবে বসতে অভ্যস্ত তাতে ‘শারীরিক দূরত্ব’ (অন্তত এক মিটার) বিষয়টা তত গুরুত্ব পায়নি। দর্শক-শ্রোতাদেরও একটা একত্রিত হওয়ার ব্যাপার আছে, মঞ্চের উলটো দিকে, কয়েক হাজার বছর ধরে তার জন্য নানা স্থাপত্যও তৈরি হয়েছে, গ্রিসের পাহাড় কেটে গ্যালারি থেকে আজকের মহার্ঘ থিয়েটার হল বা মহার্ঘ অপেরা হাউস পর্যন্ত। কত তার অসামান্য স্থাপত্য, কী তার ভেতরকার সাজ-সরঞ্জাম! কোথায় অর্কেস্ট্রার গর্ত হবে, ছাদের কোন কোন ফোকর থেকে আলো আসবে, ধ্বনি কীভাবে সারা প্রেক্ষাগারে ছড়িয়ে যাবে―এ নিয়ে মানুষের মস্তিষ্কচর্চার বিরাম ছিল না। সবই দর্শক-শ্রোতাদের জন্য, যারা রঙ্গালয়ে পাশাপাশি সিটে ঘন হয়ে বসে অভিকরণ দেখবে শুনবে।

তাই বলা হচ্ছে, সেই দর্শক-শ্রোতারাই আসল বিপদ, নিজেদের কাছে, অন্যদের কাছে। তাঁরা পাশাপাশি বসেন, মাঠে, মঞ্চে, ক্লাসঘরে সর্বত্র এবং তাঁদের সেই সামাজিক অবস্থান, যা শিল্পের অভিকরণের অনিবার্য তাগিদে তৈরি হয়েছে, যাতে এখনকার ‘সামাজিক/শারীরিক দূরত্ব’-এর ধারণাটি অভাবিত ছিল, তাই এই করোনা-উত্তর পৃথিবীতে বিপদের উৎস হয়ে উঠেছে। তাঁরা বিপদ নন, বিপদ হলো তাঁদের পাশাপাশি শারীরিক অবস্থিতি, কখনও গায়ে-গায়ে লেগে যাওয়া অস্তিত্ব, পাশের লোকের পিঠে চাপড়-মারা, করমর্দন করা, কানের কাছে মুখ নিয়ে কথা বলা, একসঙ্গে হাততালি দেওয়া বা সিটে দাঁড়িয়ে ওঠা অস্তিত্ব, সারিতে বসা লোকদের হাঁটু ঠেলে বাথরুমে যাওয়ার অস্তিত্ব, খেলায় কখনও পরস্পরের সঙ্গে ঘুসোঘুসি মারপিট করার অস্তিত্ব।

কথা হচ্ছে এখন তাঁদের ওই সামাজিক অবস্থান অনুমোদন করা সম্ভব নয়। ক্লাসঘরে ছাত্রদের নয়, খেলার মাঠে দর্শকদের নয়, প্রেক্ষাগৃহে দর্শক- শ্রোতাদের নয়। কী সর্বনেশে কথা। দর্শক-শ্রোতাই যদি না রইল অভিকরণ-শিল্পের রইল কী? ধর্ম রাষ্ট্রের নানা নিষেধ অগ্রাহ্য করতেই পারে, ধর্ম নিজেকে রাষ্ট্রের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে। তাই করোনার দিনেও ধর্মের সমাবেশ হয়, তাতে করোনা আরও ছড়ায়, ধর্ম প্রশাসকদের এবং ধর্ম ব্যবসায়ীদের তাতে ভ্রƒক্ষেপ নেই। শিল্পীরা সেই ক্ষমতা ভোগ করেন না। ফলে তাঁদের সেই অভিকরণের কথা ভাবতে হচ্ছে যাতে সামনে দর্শক-শ্রোতা থাকবে না।

এর মাঝামাঝি একটা সমাধান অবশ্য ছিল, তাদের ওই ‘শারীরিক দূরত্ব’ বজায় রেখে বসার ব্যবস্থা করা। কিন্তু তাতে প্রার্থিত সংখ্যক দর্শকদের বসাতে যে বিপুল জায়গা, আসন ইত্যাদি দরকার হবে, সে জায়গাই বা কোথায়, সে সম্পদই বা কোথায়! আর যে জায়গা আছে তাতে বসার ওই ব্যবস্থা করতে হলে দর্শকের সংখ্যাকে যেভাবে কমিয়ে আনতে হবে, অভিকরণের অর্থনীতিতে তা কি সম্ভব? কম দর্শক মানে টিকিটের দাম বাড়িয়ে তার ক্ষতিপূরণও কি সম্ভব?

শুধু আত্মপ্রকাশ নয়,

অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত

অবশ্যই এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই যে, জিনিসটা একটা সাময়িক, নিরুপায় ব্যবস্থা না দীর্ঘ, চিরস্থায়ী ব্যবস্থা। আর প্রশ্নটার সঙ্গে শিল্পীদের অস্তিত্বও জড়িয়ে আছে, এটা শুধু তাঁদের সৃষ্টিশীলতার প্রকাশের প্রশ্ন নয়, অনেকের বাঁচা-মরারও প্রশ্ন। এমন হতেই পারে যে যারা নাটক, গান, খেলাধুলায় জড়িত থাকেন তাঁরা অনেকে মধ্যবিত্ত বা তারও ওপরে একটা অবস্থান পেয়ে গেছেন, তাঁরা বাঁচা-মরার সংকটে পড়বেন না। কিন্তু তাঁদের ঘিরে অনেকে বাঁচেন তাঁদের অবস্থা তো ভয়াবহ হয়েছে। ধরা যাক বেসরকারি মঞ্চের নেপথ্যকর্মীরা, ওই সব তুচ্ছ চাকরিই যাঁদের একমাত্র জীবিকা। তাঁরা যে এর মধ্যে বিপন্ন হয়ে পড়েছেন সে খবর তো পাচ্ছি। আনন্দের বিষয় এই যে, নাট্যকর্মী বন্ধুগণ তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে যাচ্ছেন, সংগঠিতভাবে।

অন্যান্য অভিকারদের―গায়ক, নাট্যকর্মী, যাত্রাশিল্পী, যাত্রার বা নাটকের দল ইত্যাদির মূল আয় ছিল ‘বায়না’র ওপর, আমরা নাটক করার সময় যাকে বলতাম ‘কল শো’। নাটকের দলগুলো নিজেরা যে সব প্রদর্শনের আয়োজন করত তাতে আয় খুব-একটা কিছু হতো না, কখনও কখনও ক্ষতিও হতো। কিন্তু ‘কল শো’তে তার ক্ষতিপূরণ হতো, নাটকের দল বাঁচত সেই আয়ে। যাত্রার ব্যাপারটা আমি ততটা জানি না, কিন্তু তার প্রধান আয় যে ওই ‘কল শো’ বা বায়না থেকে, সে কথায় নিশ্চয়ই বিশেষ ভুল নেই। এই যাত্রা বা নাটকের দলগুলো কীভাবে বাঁচবে? এখন একেকটি শোয়ের আয়োজন যত খরচ-সাপেক্ষ, তাতে নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিয়ে তার ব্যবস্থা করা অসম্ভব। এখন সরকারি আনুকূল্যও কমে আসার কথা, তার অগ্রাধিকার হবে টালমাটাল অর্থনীতিকে খাড়া রাখার বিষয়ে। চিতপুরের যাত্রার দলগুলো বা পশ্চিম বাংলার চতুর্দিকে ছড়িয়ে থাকা নাটকের দলগুলো কীভাবে বাঁচবে তা হলে? জলসা থেকে যে সব গায়ক, নৃত্যশিল্পী, কৌতুকাভিনেতা মোটামুটি ভালো আয় করতেন, তাদের অবস্থা কী হবে? আয়ের প্রধান উৎসগুলোই যদি বন্ধ হয়ে যায়? দেখছি দর্শকহীন ক্রিকেটেরও আয়োজন হতে চলেছে। তার আয়ের উৎস কী হবে? এ নিয়েও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা দরকার, কারণ বিপন্ন শিল্পের মধ্যে এগুলোও পড়ে।

ফিলমের কথাটা একটু আলাদা করে বলি। ফিলমে যারা অভিনেতা তাদের শারীরিক ছোঁয়াছুঁয়ির ভয় (শুটিঙের পরে) আর থাকে না। কিন্তু তার দর্শকদের নিয়ে তো বেশি ভয় আছে। পর পর সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল আগে থেকেই, আর এখন করোনা এসে মাল্টিপ্লেক্সকেও সমস্যায় ফেলেছে। তার কী গতি হবে?

আংশিক এবং দুর্বল বিকল্পের সন্ধান

এর আগে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি অন্তত গায়কদের জন্য একটা পার্শ্বিক সমর্থন তৈরি করেছিল, তা হলো ক্যাসেট, সিডি ইত্যাদির প্রকাশ। আমি জানি না, তাতে গায়কদের আয় কতটা হতো বা আদৌ হতো কি না। লেখকদের গ্রন্থস্বত্বের রয়ালটি পাওয়ার মতোই এটা একটা অস্পষ্ট এলাকা। এটা তাঁদের একটা বিকল্প রোজগারের জায়গা হয়ে উঠেছিল এমন কথা এই বাজারে, অন্তত দক্ষিণ এশিয়ার নৈতিক ব্যবস্থায়, ভাবা বেশ কঠিন।

কিন্তু অর্থনীতির এই জরুরি প্রশ্নটা যদি জোর করে একপাশে সরিয়ে রাখি, তা হলে অন্তত এটা স্বীকার করতে হবে যে, এতে অভিকারের অভিকরণ অন্তত ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে শ্রোতার কাছে পৌঁছাত। শ্রোতা বাজার থেকে ক্যাসেট-সিডি কিনতেন এবং তা নিজের বাড়িতে প্লেয়ারে লাগিয়ে শুনতেন। এতে যে মুদ্রা বিনিময় হয় তা অভিকারের হাতে না পৌঁছোক। এই সিডি ডিভিডি বিক্রি একটা রাস্তা। তাতে কারা কতটা লভ্যাংশ পাবেন, তা যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য বিকল্প না নিরুপায় বিকল্প, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা ভাবুন। আমি অর্থনীতি অনার্স এক বছর পড়ে তা ছেড়ে দিই, আমার তা ভাবার সাধ্য নেই।

তবে অনেক টেলিভিশন চ্যানেল হয়েছে, তাতে ফিল্মগুলো যাচ্ছে, তাতে বোধ হয় প্রযোজক কিছু অর্থ পাচ্ছেন। হয়তো এ ভাবে নাটক, গানবাজনা, খেলাধুলা সবই ব্যক্তিগত আর পারিবারিক প্রদর্শনের ব্যবস্থায় আনা যায়। টেলিভিশনে সিডি ডিভিডি চালানো যায়, কম্পিউটারেও তা চালানো যায়। আপাতত এই দুটি রাস্তা আমাদের হাতে আছে। ফিল্মেও সেই জন্য ওয়েব সিরিজ হচ্ছে, সেটা কতটা বিকল্প হবে তাও আমি জানি না।

আমরা এই বিচ্ছিন্ন, লকডাউন আক্রান্ত দর্শক-শ্রোতাদের কাছে অভিকারের পৌঁছোনোর কথাটাই যদি আর-একটু ভাবি। খেলার মাতব্বরেরাও ভাবছেন দর্শকশূন্য মাঠে আইপিএল বা টেস্ট ক্রিকেট খেলা হবে। অর্থাৎ সবকিছুর এক ধরনের ব্যক্তিগত বা গৃহবদ্ধ উপভোগের ব্যবস্থা করা হবে, এও এক ধরনের privatization, privatization of consumption. আমরা ঘরে বসে যেমন ক্যাসেট বা সিডিতে গান শুনি, তেমনই স্মার্টফোনে কম্পিউটারে গান শুনব, নাটক দেখব, সিনেমা দেখব, খেলা দেখব। শিক্ষার ব্যবস্থাও সেই ভাবেই করা হচ্ছে, বলা হচ্ছে যে অনলাইন শিক্ষাই আমাদের ভবিষ্যৎ। কথাটার মধ্যে যে একটা নিষ্ঠুরতা আছে তা কেউ খেয়াল করছেন না। দরিদ্র আর নিরক্ষরের দেশে সকলের কাছে স্মার্টফোন ল্যাপটপ নেই, সব জায়গায় টাওয়ারও পৌঁছায় না। কাজেই অনলাইন শিক্ষার সুযোগ নানা স্তরে খুবই সংকীর্ণ থেকে যেতে বাধ্য। তবু ধরে নিচ্ছি যে, শিল্প বা অভিকরণের অতটা বিস্তারিত হওয়ার দরকার নেই, শিক্ষা, অন্তত প্রথম দিকে, যতটা বিস্তৃত হওয়া দরকার। মূলত মধ্যবিত্তরাই সিনেমা, থিয়েটার, নৃত্যনাট্য, জলসা এগুলোর উপভোক্তা। তাদের কাছে অনলাইনে অভিকরণ নিয়ে পৌঁছানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। আমি এর মধ্যে শূদ্রকের ‘গ্রহণের পর’ নামে একটি সুন্দর একাঙ্ক দেখলাম ভিডিওতে। আবার শুনছি চেতনার সেই বিখ্যাত ‘মারীচ সংবাদ’-এর ভিডিও সংস্করণ প্রস্তুত আছে দর্শকদের জন্য। এ রকম নিশ্চয়ই আরও অনেক প্রয়াস চলছে, যার খবর আমি পাইনি। কিন্তু যাত্রার দর্শকরা তো আলাদা, তাঁদের সকলের কাছে স্মার্টফোন ল্যাপটপ আছে তো? পশ্চিম বাংলার কয়লাখনি অঞ্চলের শ্রমিকরাও তো যাত্রা দেখেন। তবু দেখি, যাত্রা ভিডিওতে অনেক দিন এসেছে, আমার বাড়ির গৃহসহায়িকা তার স্মার্টফোনে প্রচুর যাত্রা দেখেন। আশা করি যাত্রা তাতে প্রকাশ্য প্রদর্শনের কিছুটা ক্ষতিপূরণ করে। কতটা করে জানি না। নাটক, জলসা ইত্যাদিও ফিল্মের মতো টেলিভিশন এবং ওয়েবে ঢুকে যেতে পারে। তার প্রয়াস তো শুরু হয়েছে। কিন্তু যারা বাদল সরকারের ধরনে থার্ড থিয়েটার করেন, কিংবা গ্রামে গিয়ে থিয়েটার করেন? তাঁরা একই গ্রামে যাওয়া ছেড়ে দেবেন? তাঁরাও ওয়েবের দ্বিমাত্রিক বিশ্বের অধিবাসী হবেন? এ কথা ভাবতে মন সায় দেয় না।

সেমিনারের বদলে চালু হয়েছে ‘ওয়েবিনার’। আরও চতুর্দিকে নানা ব্যক্তিগত চ্যানেলে নানা রকম বক্তব্যের জন্য আমন্ত্রণ আসছে, বলতেও হচ্ছে নানা জায়গায়। সেগুলো নাকি সব ইউটিউব নামে আকাশের মতো বিশাল এক আর্কাইভে চলে যাচ্ছে, তার অনন্ত স্পেস―তাতে কত ব্রহ্মাণ্ড ঢুকে যেতে পারে কে জানে। আমারও একাধিক কীর্তি ইউটিউবে ঢুকে গেছে বলে আমি জানি।

এর অর্থনীতিটি কী?

সে সম্বন্ধে আমার ধারণা খুব অস্পষ্ট, আশা করি আর সকলেই ব্যাপারটা বোঝেন। যেমন যা যা ইউটিউবে যাচ্ছে তাতে ইউটিউবকে পয়সা দেওয়ার একটা ব্যাপার আছে, subscribe কথাটা লেখা থাকতে দেখি এক কোণে। আমি এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ একজনের কাছে শুনলাম যে, ইউটিউবে যে সব দ্রষ্টব্য বেশি জনপ্রিয় হয়, অর্থাৎ যাতে বেশি strike পড়ে তাতে ইউটিউব বিজ্ঞাপন পেতে শুরু করে, আর সেই বিজ্ঞাপনের টাকা এবং চাঁদা দাতাদের দেয় অঙ্ক থেকে ইউটিউব কিছু একটা রয়ালটি দাতাকে পাঠায়। সেটা কারও কারও পক্ষে দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, কারও কারও পক্ষে মানবজীবন পেরিয়ে যাওয়ারও ব্যাপার।

হয়তো আগেই যেমন বলেছি, আরও কাছে টেলিভিশনে দেখানো সম্ভব, কিংবা ফেসবুকে, ইন্টারনেটে। তার অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত কী হবে, কার ভাগে কতটা যাবে, কে ছাগলের তৃতীয় ছানার মতো বাদ পড়বে―আমি সে সব কিছুই বুঝতে পারছি না। শুধু আমার এক ভরসা যে, আজকালকার বাংলায় যাদের stakeholders বলা হয় তাঁরা আমার মতো অশিক্ষিত নন, তাঁরা এ বিষয়টা আমার চেয়ে অনেক ভালো বুঝবেন। অর্থাৎ ওই সব (এবং আমি জানি না আরও অনেক বৈদ্যুতিক) উৎস থেকে টাকা আদায় করতে পারবেন।

কিন্তু যদি কখনও পায় কেউ ওই টাকা, কে পাবে? গায়ক? অভিনেতা? পরিচালক? নাট্যদল? খেলোয়াড়? কে কতটা কীভাবে পাবে তাও নিশ্চয়ই আলোচনা করে সকলের পক্ষে সন্তোষজনকভাবে স্থির করা সম্ভব হবে। পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে একটা প্রশ্নসংকুল জায়গা। ভরসা করি, অন্যদের কাছে নয়।

কিন্তু এক সঙ্গে দেখার মজা?

এটা কি তা হলে প্রাগৈতিহাসিক এক ইতিবৃত্ত হয়ে গেল? এর তো দুটি দিক ছিল। এক, অভিকারদের সঙ্গে আদান-প্রদানের দিক, আর দুই, নিজেদের যূথবদ্ধ আচরণের দিক। আমার অল্পদিনের থিয়েটারের অভিজ্ঞতায় জানি, বন্ধুদের আর অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকেও জানি যে, একজন অভিনেতার হাসির সংলাপে সমস্ত দর্শক নানারকম আওয়াজ করে হাসছে, তার দুঃখের অভিনয়ে রঙ্গালয় স্তব্ধ, হয়তো দু-একটি ফোঁপানির শব্দও শুনছে, অভিনেতাদের কাছে তার দামই আলাদা, তার অভিনয় আরও চনমনে হয়ে যেত, সে তার কাজের পুরস্কার সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যেত। খেলোয়াড়রাও বল নিয় গোলের দিকে দৌড়লে সমর্থকদের উৎসাহব্যঞ্জক চিৎকার হইহই মুদারা থেকে তারা বা তারও উপরে চড়তে থাকা, গোল করলে সমর্থকদের লাফালাফি, মাঠে নেমে ডিগবাজি―এসব কিছুই থাকবে না। খেলোয়াড় হোক, অভিকার হোক, এক দিকের বিপুল দর্শকশূন্য  নৈঃশব্দ্যের মধ্যে―এভাবে তাঁদের ক্ষমতা দেখাতে পারবেন? দর্শকদের উপস্থিতি তাঁদের যেভাবে প্রণোদিত করত তা তো আর করবে না। জানি না, এক সময় হয়তো তাঁদের মস্তিষ্ক তারও জন্য ‘programmed’ হয়ে যাবে। তারা হয়তো ফিল্মের অভিনেতাদের মতো হয়ে যাবেন, পুরোটাই শুটিং হবে, যেখানে দর্শকের উপস্থিতিই অবাঞ্ছিত।

আর দর্শকরা? যারা পাশাপাশি আরও অনেক সঙ্গে বসে একসঙ্গে মঞ্চে বা মাঠে তৈরি সুখদুঃখের উৎপাদন দেখেন, যখন সবাই হাসে, সবাই উত্তেজনা চেপে রেখে দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করে, বেদনায় স্তব্ধ হয়, কাঁদে সেই সব প্রত্যক্ষ ‘সামাজিক’ আর ‘অংশিত’ অনুভব থেকে তাঁরা সরে আসবেন। তখন দর্শন আর ত্রিমাত্রিক থাকবে না, সিনেমার মতো দ্বিমাত্রিক হয়ে যাবে। অঙ্কে একটা মাত্রা (dimension) কম হবে। কিন্তু উপভোগের মাত্রা? তখন তাঁদের উপভোগ কি এক রকম থাকবে? আমার তো মনে হয় না। দু’পক্ষই অনেক কিছু হারাবে।

এই কথাগুলো যখন লিখছি, তখন এই ঝুঁকি নিয়েই লিখছি যে এর জন্য আমাকে প্রযুক্তিবিরোধী, পশ্চাৎ-মুখী, প্রতিক্রিয়াশীল― ইত্যাদি অনেক কিছুই বলা হতে পারে। তবে নিন্দার ভয়ে যা ভাবি তা বলব না, সে বদভ্যাস আমি অনেকদিন পরিত্যাগ করেছি।

আমি জানি না ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কী ব্যবস্থা করে রেখেছে। যদি এটা সাময়িক, অস্থায়ী ব্যবস্থা হয় সেটা এক কথা। ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ হলেও হয়তো কিছুটা সহনীয় হবে। ‘চিরকালের জন্য’ হলে অনেক সমস্যা হবে। আবার হয়তো একটা ‘প্রগতিবিরোধী’ সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলাম। প্রযুক্তিই প্রগতি-এ দুয়ের সর্বাঙ্গীন সমীকরণে আমি এখনই বিশ্বাস করি না, যখন আর যেখানে সে-প্রযুক্তি সকলের কাছে পৌঁছায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares