প্রবন্ধ : সেকালের বাঙ্গালা মুদ্রিত গ্রন্থ : ভূমিকা ও সংগ্রহ : খান মাহবুব

যান্ত্রিক সভ্যতার অগ্রযাত্রায় আগুনের আবিষ্কার যেমন তাৎপর্যময় ঠিক তেমনি মানবিক সভ্যতার সারথি মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কার। জোহান্স গুটেনবার্গ ১৪৫৬ সালে জার্মানিতে ধাতব অক্ষর ব্যবহার করে মুদ্রণ যন্ত্রের গোড়াপত্তন করেন। এই আবিষ্কার বিশ্ব সাংস্কৃতিক রেনেসাঁয় নব উদ্যম সৃষ্টি করে। ইউরোপে নব নব পুস্তক রচনা ও মুদ্রণের হিড়িক পড়ে যায়। জ্ঞান সম্প্রসারণের মোক্ষম মাধ্যম হয় মুদ্রণ যন্ত্র। সেকালের মুদ্রিত গ্রন্থপাঠে পাঠকেরা পরিতৃপ্ত হয়। লেখক তাঁর চিন্তা ও মনন ছড়িয়ে দেয় এক মানুষ থেকে হাজার মানুষে।

              ভারতবর্ষে সনাতনী মুদ্রণের কিছু প্রকরণ লক্ষ করা গেলেও আধুনিক মুদ্রণের পরিচয় ঘটে পর্তুগিজ পাদ্রিদের মাধ্যমে গোয়াবে ১৫৫৬ সালে- মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপনের মাধ্যমে। গাণিতিক হিসেবে দেখা যাচ্ছে ইউরোপে মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের ১০০ বছর পর ভারতে মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয়। ভারতবর্ষে যখন মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয় তখন ভারতীয় শাসকদের পূর্ব-পুরুষদের শৌর্যের গল্পের স্মৃতি মন্থন ছাড়া অন্য কোনো করণীয় ছিল না। এই সুযোগে বিদেশি বেনিয়া-ফিরিঙ্গিরা ব্যবসার নাম করে ভারতবর্ষকে গ্রাস করে পর্যায়ক্রমে ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করে।

              ভারতবর্ষে উপনিবেশের প্রাকলগ্নে ইংরেজ-পর্তুগিজরা এ দেশে ব্যবসা, শাসন সম্প্রসারণে দেশীয় ভাষা আয়ত্ত ও চর্চার আবশ্যিকতা অনুভব করে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজসহ (স্থাপিত ১৮০০ সাল) অনেক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে ঔপনিবেশিক শাসকরা। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় ভারতবর্ষে ইউরোপীয় আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার সংশ্লেষ ঘটে। দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতিও আধুনিক মুদ্রণ যন্ত্রের সহায়তায় বিকশিত হয়। দখলবাজ ঔপনিবেশিক শাসকরা টিকে থাকার স্বার্থে সীমিত মাত্রায় দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতিকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। দেশীয় সাহিত্যিকরা নিজ মেধা মননের সংযোগে দেশজ সংস্কৃতির ঝাণ্ডা উড্ডীন করতে অগ্রসর হয়। এই সময় বিদেশি বেনিয়াদের মধ্যে কিছু মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারে এই ভাষার চর্চাকে এগিয়ে নিতে বাংলা অক্ষরের ঢালাই তৈরি করে ইউরোপ থেকে আমদানি করা মুদ্রণ যন্ত্রে বাংলা বই মুদ্রণের ব্যবস্থা করেন। এই যাত্রায় যাদের নাম প্রাতঃস্মরণীয় সেই তালিকায় আছে―উইলিয়াম কেরি, জন ক্লার্ক মার্শম্যান, উইলকিনস, নাথানিয়েল ব্রাসি হলহেড প্রমুখ। উল্লেখ্য,  হলহেড রচিত ‘অ এৎধসসধৎ ড়ভ ঃযব ইবহমধষ খধহমঁধমব’-এ সর্বপ্রথম বাংলা অক্ষর ব্যবহৃত হয় যা চার্লস উইলকিনস খোদাই করেছিলেন। তিনিই প্রথম সম্পূর্ণ  বাংলা অক্ষরের নকশা প্রস্তুত করেন।

              বাংলা মুদ্রণ সংস্কৃতিতে আরেক প্রণিধানযোগ্য ব্যক্তি হলেন উইলিয়াম কেরি। তিনি বাংলা ভাষাকে এতটাই আয়ত্ত করেছিলেন যে ভারতবর্ষের গভর্নর লর্ড ওয়েলমলি উইলিয়াম কেরিকে ১৮০১ সালের ১২ মে ৫০০ টাকা মাসিক বেতনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বঙ্গ ভাষার অধ্যাপক নিযুক্ত করেন। দীর্ঘদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম করে কেরি সাহেব ১৮০৯ মালে ৫ খণ্ডে সমাপ্য বাইবেলের বঙ্গানুবাদ মুদ্রণ করেছিলেন শ্রীরামপুর মিশনারি প্রেস হতে।

              বিদেশিদের বাংলা প্রীতিতে এদেশের সাহিত্যিক ও সংস্কৃতির শেঠরা উদ্যোগী হয়। বাংলা ভাষায় প্রণীত বই, সাময়িকী মুদ্রণের সূচনা হয়। এক্ষেত্রে মিশনারিদের জনবান্ধব কাজের অংশ হিসেবে শিল্প সংস্কৃতি প্রচারে কিছু তৎপরতা ছিল। যদিও মিশনারিদের এসব কাজের পিছনে বিদেশি সংস্কৃতির বিকাশের এক ধরনের কূটনৈতিক কূটচালের অভিযোগ ব্যাপক ছিল।

              অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ হতে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত খ্রিস্টান মিশনারিদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। মিশনারিরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপন করে পুঁথি ও দেশীয় পুস্তিকা মুদ্রণ করে বাঙালিকে মাতৃভাষা শিক্ষা দিতেন। প্রণীত হতো নানান বাংলা অভিধান।

              বাঙালি তখন বাংলা লিখতে, ছাপতে ও পড়তেও যথার্থ জানত না। বাংলা গদ্য সাহিত্যের জন্মদাতা বলে মান্য মুন্সি রামমোহন দেশের কালেক্টরগুলোতে মুন্সিখানার দেওয়ানি ছেড়ে বেদান্ত দর্শন ও উপনিষদের অনুবাদসহ বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রাকলগ্নের কাঠামো তৈরিতে ব্যস্ত। এই সময় গঙ্গাধর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় ১৮১৬ সালে কলকাতা হতে প্রকাশিত হয় প্রথম সাময়িক পত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’ স্বল্পমাত্রায় এই সময় পুস্তক ও সাময়িকী প্রকাশের অভিপ্রায় লক্ষণীয়। বাংলা প্রকাশনার প্রাকলগ্নে কী কী বই, সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছিল এ নিয়ে অনুসন্ধিৎসু বাঙালিদের আগ্রহ আছে। এই আগ্রহকে মাথায় নিয়ে আজ থেকে শতবর্ষ পূর্বে ময়মনসিংহ থেকে কেদারনাথ মজুমদার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সৌরভ’ পত্রিকার একটি নিবন্ধের শরণাপন্ন হলাম। ময়মনসিংহের কৃতী সন্তান শ্রী রাজেন্দ্র কিশোর সেন রচিত প্রবন্ধটি সৌরভের শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩২৩ বঙ্গাব্দ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধে বাংলা প্রকাশনার প্রাকলগ্নে প্রায় ১০০টি প্রকাশনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায়। প্রবন্ধের আদ্যোপান্ত পাঠক পাঠান্তে আস্বাদন করুক এই লক্ষ্যেই শতবর্ষে আবারও প্রকাশ করা হলো। রচনার বানানরীতি ও আদি ঢং অবিকল রেখে নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।]

জাতির ভিতর চিন্তাশীল সুলেখক প্রস্তুত হইলেই জাতীয় সাহিত্যের উন্নতি হয়―তখন সেই সাহিত্যে বিবিধ মাসিক, সাপ্তাহিক, দৈনিক প্রভৃতি সংবাদ, সাহিত্য ও সমালোচনা পত্রাদি জন্মগ্রহণ করিতে পারে। জাতির ভিতর সুসাহিত্যিক বা সুলেখক সৃষ্টি না হইলে সৎগ্রন্থের আবির্ভাব বা সাময়িক পত্রিকার উদ্ভব কখনই সম্ভবপর নহে।

ইংল্যান্ডে যখন প্রথম সাময়িক পত্রের আবির্ভাব হয়, তখন ইংরেজি সাহিত্যে গৌরবময় এলিজাবেথিয়ান-যুগ। অতঃপর সমুন্নত আগস্টিয়ান যুগে ইংরেজ জাতির প্রথম সাময়িক সাহিত্যগুলো বাহির হইয়াছিল। ফরাসী সাহিত্যেরও উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে চতুর্দশ লুইর কাব্য-সাহিত্য-সমুজ্জ্বল যুগে ফরাসি জাতির প্রাথমিক সংবাদপত্র এবং সাহিত্যপত্র প্রচারিত হইয়াছিল। সাময়িক পত্রের জন্য লেখা চাই এবং লেখার জন্য লেখক প্রয়োজন। সুতরাং জাতীয় সাহিত্যের উন্নত-সময় ব্যতীত সাময়িক পত্র-পত্রিকা পরিচালিত হইতে পারে না।

বাঙ্গলায় বাঙ্গালা সাময়িক পত্র প্রচারে কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ঘটিয়াছিল।

বাঙ্গলায় যখন প্রথম বাঙ্গালা সাময়িক পত্রিকার আবির্ভাব হইয়াছিল, তখন বঙ্গদেশে জাতীয় সাহিত্যের অবস্থা অত্যন্ত হীন ছিল। পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখিতে পারেন এমন লোক বাঙ্গালায় কেহ ছিলনে না―সাহিত্য নামে পরিচিত হইবার উপযুক্ত এমন মুদ্রিত পুস্তকও ছিল না, বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। বিদ্যাপতি চণ্ডী দাসের অমূল্য কবিতা নিচয়, কৃত্তিবাস কাশীদাসের রামায়ণ মহাভারতের অমৃত লহরী এবং বৈষ্ণব যুগের রস সাহিত্য পুরুষাণুক্রমে কাষ্ঠফলকের নিষ্পেষণে থাকিয়া থাকিয়া বাঙ্গালীর গৃহকোণে ধ্বংস ও জীর্ণ হইতেছিল; কচিৎ কোনো কোনো স্থানে কায়া পরিবর্তনের সৌভাগ্য লাভ করিয়া আত্মরক্ষা করিতেছিল মাত্র। অপেক্ষাকৃত আধুনিক রামপ্রসাদ ও ভারতচন্দ্র রস বিভোর-প্রাণগুলিকে বিমুগ্ধ করিতে ভাবুকজনগণের রসনাগ্রে সময় সময় গীত হইত মাত্র।

বাঙ্গালীর নিকট বাঙ্গালা সাহিত্যের এ দুর্গতির কারণ বঙ্গদেশে বাঙ্গালা লেখাপড়ার তখন একেবারেই চর্”া ছিল না। ইংরেজ দেশ অধিকারের সনন্দ লইয়া চলিত পারস্য ভাষারই পঠনপাঠন চলিতে আরম্ভ করিয়াছিল।

পারস্য ভাষা না শিক্ষা করিলে বাঙ্গালীর ছেলে কোম্পানীর কাছারিতে, ব্যবসায়ীর আড়তে কিম্বা দেশীয় জমিদারের সেরেস্তায় কার্য করিতে পাইত না। সুতরাং বাঙ্গালী অভিভাবকগণ তাহাদের স্ব স্ব ছেলেদিগকে পূর্ব্বমত পারস্য ভাষাই শিক্ষা করিতে লাগিলেন, বাঙ্গালা ভাষা অধ্যয়ন বাঙ্গালাভাষী বাঙ্গালীর নিকট চির অপরিচিত এবং চির অনাদৃতই রহিয়া গেল।

ইয়ুরোপীয় বণিকেরা এদেশে আসিয়া ব্যবসায় আরম্ভ করিলে দেশীয় ভাষা শিক্ষা করা তাঁহাদের প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছিল। তদনুসারে বাঙ্গালা ভাষা শিক্ষার জন্য দুই একখানা প্রয়োজনীয় পুস্তক তাঁহারা নিজেরাই লিখিয়াছিলেন এবং নানা উপায়ে মুদ্রিত করিয়া প্রকাশ করিয়াছিলেন।

ক্রমে ইংরেজ মিশনারিগণও অজ্ঞ বাঙ্গালীর সহিত বাক্যালাপ করিবার জন্য বাঙ্গালা ভাষা শিক্ষা করা এবং বাঙ্গালীকে বাইবেলের সুসমাচার পাঠ করাইবার জন্য তাহাদিগকেও বঙ্গভাষা শিক্ষা দান করা প্রয়োজন বলিয়া মনে করেন। এদেশে তখন মুদ্রণ যন্ত্র ছিল না। সুতরাং বাঙ্গালা পুস্তকও মুদ্রিত হইত না। উক্ত মিসনার মহাত্মাগণই প্রথম বাঙ্গালা অক্ষর প্রস্তুত করাইয়া তাহা দ্বারা তথা হইতে সেই সকল পুস্তক মুদ্রিত করাইয়া আনিয়া এদেশীয়দিগকে তাহাদের মাতৃভাষা শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন এবং নিজেরাও বাঙ্গালা ভাষা শিক্ষা করিতে থাকেন এবং অবশেষে ১৭৯৩ অব্দে এদেশে বাঙ্গালা মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করিয়া বাঙ্গালা কাঠের অক্ষরে বাঙ্গালা গ্রন্থ প্রকাশ করিতে ব্রতী হন।

অতঃপর ইংল্যান্ড হইতে আগত ইংরেজ সিভিলিয়ানদিগকে দেশি ভাষা শিক্ষা দিবার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হইলে ১৮০০ অব্দে কলিকাতার ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ স্থাপিত হয়। এই কলেজের সাহেব ছাত্রদিগের জন্য বাঙ্গালা পাঠ্যপুস্তক লিখিয়া প্রকাশ করা অত্যন্ত  প্রয়োজনীয় হইয়া পড়িলে, এই সহৃদয় মিশনারিগণই প্রথম বাঙ্গালা ভাষায় বিবিধ গ্রন্থ লিখিয়া ও লিখাইয়া সেই অভাব দূরীভূত করিয়াছিলেন। এইরূপে বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা মিশনারিদিগের চেষ্টাতেই― বাঙ্গালী কর্তৃক পরিত্যক্ত হইয়াও―সজীব থাকিতে সমর্থ হইয়াছিল। সে জন্য আমরা মিসনা- রিদিগের নিকট কৃতজ্ঞ।

এই সময় এবং তাহার পূর্Ÿে বাঙ্গালা ভাষায় যে সকল পুস্তক মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহার অধিকাংশই ছিল― ইয়ুরোপীয়দিগের ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যাকরণ, অভিধান প্রভৃতি গ্রন্থ, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাহেব ছাত্রদিগের পাঠোপযোগী বিবিধ শ্রেণির গ্রন্থ ও মিশনারিদিগের প্রতিষ্ঠিত বঙ্গ বিদ্যালয়সমূহে পাঠের বর্ণমালার পুঁথি, ধারাপাত ও অন্যান্য নিম্নশ্রেণির বাঙ্গালা পাঠ্যপুস্তক। উচ্চ শ্রেণির সুসাহিত্য তখন কিছুই ছিল না।

মিশনারিদিগের যত্ন চেষ্টায় যখন বাঙ্গালা ভাষার পুঁথি এইরূপে লিখিত ও প্রচারিত হইতে ছিল―সেই সময়, ১৮১৬ অব্দে বঙ্গদেশে প্রথম বাঙ্গালা সাময়িক পত্র পরিচালিত হইতে আরম্ভ করে। সুতরাং বাঙ্গালার প্রথম সাময়িক পত্র পরিচালন সময় বাঙ্গালা সাহিত্যের অবস্থা যে অত্যন্ত শোচনীয় ছিল, তাহা সহজেই অনুমিত হইবে।

কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় এই যে এই প্রথম বাঙ্গালা পত্রিকাখানা একজন বাঙ্গালী দ্বারা পরিচালিত হইয়াছিল। ইহার দুই বৎসর পরে ১৮১৮ অব্দে মিসনারিগণ কলিকাতার নিকটবর্তী শ্রীরামপুর হইতে আর একখানা বাঙ্গালা সাময়িক পত্র বাহির করিতে আরম্ভ করে, সে পত্রের নাম ছিল ‘দিগদর্শন।’

এই সময়, বাঙ্গালা সাহিত্যের এই প্রাথমিক মিসনারি যুগে বাঙ্গালা ভাষায় কি কি পুস্তক ও পত্রিকা মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইয়াছিল, কুতুহলী পাঠকগণের বোধ হয় তাহা জানিতে কৌতূহল জন্মিতে পারে; আমরা তাঁহাদিগের কৌতূহল নিবারণের জন্যও আমাদের সেকালের জাতীয় সাহিত্যের অবস্থা প্রদর্শন জন্য ঐ সকল পুস্তক পত্রিকার পরিচয় নিম্নে প্রদান করিতে চেষ্টা করিলাম।

উদ্ভিদ মাত্রেই যেমন বৃক্ষ নহে; সেইরূপ পুস্তক মাত্রেই ‘সাহিত্য’ নহে। কিন্তু যে স্থলে মোটেই সাহিত্য নাই, সেখানে অঙ্ক পুস্তক বা অভিধানই সাহিত্যের আসন অধিকার করিবে; তাহাকে স্থানচ্যুত করিবে কে? কেন না, ‘পাদপহীন দেশে এড়গুই দ্রুম’।

(১) বাঙ্গালা ভাষার প্রথম পুস্তক একখানা ‘ব্যাকরণ ও অভিধান’। ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে এই গ্রন্থখানা মুদ্রিত হয়। তখন বাঙ্গালা অক্ষর মুদ্রণযন্ত্রে আবিষ্কৃত হয় নাই। পর্তুগিজ বণিকরা চট্টগ্রাম প্রভৃতি স্থানে থাকিয়া তথাকার লোকের মুখে যেরূপ প্রাদেশিক বাঙ্গালা শুনিয়াছিল ঐরূপ প্রাদেশিক বাঙ্গালায় রোমান অক্ষরে এই পুস্তকখানা মুদ্রিত করিয়াছিল। পুস্তকের প্রচ্ছদপত্রে পুস্তকের নাম ও পরিচয় এইরূপ লিখিত হইয়াছে― ‘Vocabulatioem Idioma Bengalla e Portuguez dividido emduas Partes dedicado as Excellent e Rever. Senhor D. F. Miguel de Favora Arcebs po…de Evora do Concelbo de Sua Magestade Foy Delegencia do Padre Fr. Manoel da Assumpcam Religioso Eremita de Santo Agostinho da Congregacao da India OrientalÑLisbon.’

রোমান অক্ষরে মুদ্রিত এই বাঙ্গালা গ্রন্থের ১ পৃষ্ঠা হইতে ৪০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বাঙ্গালা ব্যাকরণ এবং ৪৭ পৃষ্ঠা হইতে ৩০৬ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বাঙ্গালা-পর্তুগিজ অভিধান, অবশিষ্ট ৩০৭ পৃষ্ঠা হইতে ৫৫৭ পৃষ্ঠা পর্য্যন্ত পর্তুগিজ-বাঙ্গালা অভিধান। পতুর্গিজরা বাঙ্গালা শিখিবার জন্যই এই পুস্তক প্রকাশ করিয়াছিল, এই গ্রন্থের বাঙ্গালার নতুন নমুনা এইরূপ―

বাঙ্গালা শব্দ যেরুপভাবে মুদ্রিত হইয়াছে

মুই যাইবাসছি

Moui Zeibasschee

মুহর খোওয়া যাইতেছি

Mouhore khoah dohah

অর্থাৎ আমি যাইতেছি আমার খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি।

২ ও ৩-দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রন্থ বেন্টো সাহেবের ‘প্রার্থনামালা ও প্রশ্নমালা’ ইহাই তখনকার সাহিত্য পুস্তক। ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে রেভারেন্ড বেন্টো এই গ্রন্থদ্বয় লণ্ডন নগরে মুদ্রিত করেন। বাঙ্গালা অক্ষরে মুদ্রিত পুস্তকের মধ্যে এই দুখানিই আদি পুস্তক। তখনও বাঙ্গলায় মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয় নাই। সুতরাং লণ্ডন নগরের বাঙ্গালা মুদ্রণযন্ত্রে এই পুস্তক ছাপা হইয়াছিল। গ্রন্থকার বেন্টো পূর্Ÿে রোমান কাথলিক সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন, ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে ৭ ফেব্রুয়ারি প্রটেস্টান্ট দলভুক্ত হইয়া এই গ্রন্থদ্বয় রচনা করেন। ইহার পূর্Ÿে ১৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দে লিপজিকে জন ফ্রেডারিক্ ফ্রিজ (Johann Friedrich Fritz) ১০০টি ভাষার বর্ণমালা প্রকাশ করিয়াছিলেন। তাঁহার পুস্তকের নাম ‘Orientalisch and Occidentalischer SprachmeisterÕ’ (অর্থাৎ প্রাচ্য ও প্রতীচ্য ভাষাধিকার) এই পুস্তকের ৮৪ পৃষ্ঠায় যে বঙ্গীয় বর্ণমালা প্রদত্ত হইয়াছে, কেহ কেহ বলেন তাহা জর্জ জেকবকার প্রণীত Aurenchszeb (ঔরঙ্গজেব) গ্রন্থ হইতে গৃহীত। বর্ণমালার উপরে লিখিত আছে-‘Alphabetum Bengalicum et Jentivicum.

৪র্থ গ্রন্থ – হলহেড সাহেবের … ব্যাকরণ। এই ব্যাকরণের নাম ‘A Grammar of the Bengali Languge.Õ ’ ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে Sir Charles Wiklins হুগলী হইতে বাঙ্গালা অক্ষরে এই ব্যাকরণ খানা প্রকাশ করেন। গ্রন্থকারের নাম Nathaniel Brassey Halhed. উইলকিন্সের উপদেশে পঞ্চানন কর্ম্মকার নামক হুগলীর এক ব্যক্তি এই পুস্তকের জন্য কাঠের বাঙ্গালা অক্ষর প্রস্তুত করিয়াছিল। বাঙ্গলা দেশে বঙ্গাক্ষরে ইহাই প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ। এই পুস্তকের আবরণী পত্রের শীর্ষ দেশে লিখিত আছে―

‘বোধ প্রকাশং শব্দ শাস্ত্রং ফিরিঙ্গিনামুপকারার্থং ক্রিয়তে হালেদঙ্গ্রজী।’

প্রচ্ছদ পত্রের মধ্যস্থলে আছে

‘ইন্দ্রাদয়োপি যস্যান্তং নযষুঃ শব্দ বারিধেঃ।

প্রক্রিয়া ন্তস্য কৃৎস্নস্য ক্ষমো বক্তুং নর কথং॥’

গ্রন্থের প্রারম্ভে ইংরেজি ভাষায় একটি দীর্ঘ ভূমিকা আছে। গ্রন্থাভ্যন্তরে গ্রন্থকার উদাহরণ প্রদর্শন স্থলে সর্ব্বত্রই রামায়ণ, মহাভারত, অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দর প্রভৃতি হইতে কথা উদ্ধৃত করিয়াছেন।

৫ম গ্রন্থ -আইন H. P. Forster  সাহেবের কৃত ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের গবর্নমেন্ট রেগুলেশনের বঙ্গানুবাদ। এখানেও কাঠের অক্ষরে মুদ্রিত। গ্রন্থের আকার ৪০০ পৃষ্ঠা মূল্য ২৫ টাকা, মুদ্রণের সময় ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দ।

(৬) রামতারক রায় সঙ্কলিত―‘সদর দেওয়ানি আইন বিধি’। গ্রন্থকারের নিবাস চুঁচুড়া। গ্রন্থকার ১৭৯৬ অব্দে ইংরেজি আইন গ্রন্থ হইতে সার সঙ্কলন করিয়া সে কালের বাঙ্গালায় এই গ্রন্থ প্রকাশ করেন। গ্রন্থের আকার ৭৬ পৃষ্ঠা।

৭- ‘নিজামৎ আইন বিধি’- গবর্ণমেণ্টের পৃষ্ঠপোষকতায় রাধারমন বসু Sadar Dewany Nezimaut Cereular Orders গ্রন্থ অবলম্বনে ১৭৯৬ অব্দে এই গ্রন্থ সঙ্কলন করেন। গ্রন্থের আকার ২২১ পৃষ্ঠা।

৮-“Vocabulary in Two parts, English and Bengalee and Vice versa” by H. P. Forster. Senior Merchant of the Bengal Establishment. অর্থাৎ ফরষ্টার সঙ্কলিত ইংরেজি বাঙ্গালা ও বাঙ্গালা ইংরেজি ২ ভাগে বিভক্ত অভিধান। এখানি ঋবৎৎরং ধহফ পড়র মুদ্রাযন্ত্র হইতে ১৭৯৯ অব্দে প্রকাশিত হয়। ইহাই বঙ্গাক্ষরে মুদ্রিত প্রথম অভিধান গ্রন্থ।

৯-ফরষ্টারের অভিধান-১৭৯৯ অব্দে মুদ্রিত হয়। এই অভিধান ও দুই খণ্ডে বিভক্ত; ইহাতে প্রায় ১৮০০০ শব্দ প্রদত্ত হয়, ইহার মূল্য নির্দ্ধারিত হইয়াছিল ৬০ টাকা।

১০-“বত্রিশ সিংহাসন”―সাহিত্যের অন্তর্গত উপাখ্যান গ্রন্থ। শ্রীরামপুরের মিসন প্রেসে ১৮০১ অব্দে এই গ্রন্থ প্রথমবার মুদ্রিত হয়। রচয়িতার নাম নাই। ১৮০২ অব্দেই এই পুস্তক পুনর্মুদ্রিত হয়।

১১-হিতোপদেশ―গোলকনাথ বসু প্রণীত, সাহিত্য পুস্তক। ১৮০১ অব্দে শ্রীরামপুর মিসন প্রেস হইতে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। গল্পচ্ছলে নীতিশিক্ষা বিষয়ক গ্রন্থ। আকার ডিমাই ৮ পেজি ১৪৭ পৃষ্ঠা। এই পুস্তক প্রায় ২০০০ হাজার বিক্রয় হইয়াছিল। নিম্নে এই পুস্তক হইতে ইহার ভাষার কিঞ্চিৎ নমুনা প্রদত্ত হইল।

“মগদ দেশ ফুল্লোৎপন্ন নামে সরোবর থাকে। তাহাতে অনেক ফাল শঙ্কট বিকট নামে দুই হংস বসতি করে আর তাহাদিগের সখা কম্বগ্রীব নামে কচ্ছপ বাস। অনন্তর এক দিবস ধীবরেরা আসিয়া সে স্থানে কহিল যে এস্থানে আজি বাস করিয়া কল্য প্রাতঃকালে মৎস্য কচ্ছপাদি নষ্ট করিব। তাহা শুনিয়া কচ্ছপ দুই হংসকে কহিল হে মিত্রেরা ধীবর কথোপকথন শুনিলা। এক্ষণে আমার কর্ত্তব্য কি? হংসেরা কহিল পূনর্ব্বার তাহা জন্য প্রাতঃকালে যাহা উপযুক্ত হয় করা যাইবে। কচ্ছপ বলিতেছে সে কথা কিছু নয়, যে হেতুক এই স্থানে আমি ব্যতিক্রম দেখিয়াছি।”

১২-মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র চরিত―রাজীব লোচন মুখোপাধ্যায় এই গ্রন্থের প্রণেতা। তিনি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের একজন পণ্ডিত ছিলেন। কেরি সাহেবের উপদেশে তিনি এই পুস্তক রচনা করিয়াছিলেন। রাজীব লোচনের এই গ্রন্থ সে কালের বঙ্গ-সাহিত্যের অমূল্য নিধি। ইহার ভাষা সে কালে এমনই আদর লাভ করিয়াছিল যে গ্রন্থকার তাহার জন্য বঙ্গ সাহিত্যের ‘এডিসন’ বলিয়া সন্মানিত হইয়াছিলেন। এই পুস্তক ১৮০১ অব্দে প্রথম মুদ্রিত হয়। পরে ১৮১১অব্দে গবর্ণমেণ্ট বিলাত হইতে পুনমুর্দিত করিয়া আনেন। এই গ্রন্থের ভাষার নিদর্শন প্রদত্ত হইল।

‘পরে নবাব স্রাজেরদৌলা সকল বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া মনে মনে বিবেচনা করিলেন কোন মতে রক্ষা নাই আপন সৈন্য বৈরি হইল অতএব আমি এখান হইতে পলায়ন করি। ইহাই স্থির করিয়া নৌকাপরি আরোহণ করিয়া পলায়ন করিলেন। পরে ইংরাজ সাহেবের নিকটে সকল সমাচার নিবেদন করিয়া মীরজাফরালি খান মুরসিদাবাদের গড়েতে গমন করিয়া ইঙ্গরাজী পতাকা উঠাইয়া দিলে সকলে বুঝিল ইঙ্গরাজ মহাশয়ের দিগের জয় হইল। তখন সমস্ত লোক জয়ধ্বনি করিতে প্রবর্ত্ত হইল এবং নানা বাদ্য বাজিতে লাগিল।”

১৩- তোতা ইতিহাস লং সাহেব এই পুস্তককে হায়দর বক্স নামক কোন মুসলমান লেখক কর্ত্তৃক পারস্য ভাষা হইতে অনুদিত গ্রন্থ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলেন গ্রন্থকার ঢাকা নিবাসী এবং গ্রন্থখানা ১৮০১ অব্দে কলিকাতার কোন মুসলমানে প্রেসে মুদ্রিত হইয়াছিল। “বিশ্বকোষে” লিখিত হইয়াছে “তোতা ইতিহাসের রচয়িতা চণ্ডীচরণ মুন্সী ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের মুন্সি ছিলেন। সংস্কৃত পারসী ও বাঙ্গালা এই তিন ভাষাতেই চণ্ডীচরণের অধিকার ছিল।” আমরা যে “তোতা ইতিহাস” পাঠ করিয়াছি তাহাতে প্রচ্ছদ পত্র ছিল না। পুস্তক খানা পারস্য ভাষার অনুবাদ হইলেও অনুবাদে সংস্কৃত শব্দেরই বহুল প্রয়োগ দৃষ্ট হইবে। ভাষার নমুনা নিম্নে প্রদত্ত হইল।

“যখন সূর্য্য অস্ত গেলেন এবং চন্দ্র উদয় হইলেন তখন খোজেস্তা মনোদুঃখেতে কাতরা হইয়া তোতার সন্নিধানে বিদায় চাহিতে গেলেন। তোতা খোজাস্তাকে স্তব্ধ দেখিয়া জিজ্ঞাসিলেক কই তুমি এখন স্তব্ধ কেন আছ? খোজেস্তা উত্তর করিলেন যে নিত্য রাত্রিতে আপন মনোদুঃখ তোমাকে জানাই কিন্তু এক দিবসও বন্ধুর নিকট যাইতে পরিলাম না এমন দিন কবে হইবে যে আমি যাইয়া পারিলাম না এমন দিন কবে হইবে যে আমি যাইয়া প্রিয়তমের সহিত সাক্ষাৎ করিব। যদি তুমি এই রাত্রিতে বিদায় দাও তবে যাই নতুবা ধৈর্যাবলম্বন করিয়া নিজ গৃহে যাইয়া বসিয়া থাকি।”

১৪-“সাগর দ্বীপের শেষ নৃপতি মহারাজা প্রতাপা দিত্য চরিত্র”―রামরাম  বসু এই গ্রন্থের প্রণেতা। ইহার নিবাস ছিল চুচুড়ায়। অল্প বয়সেই পারস্য ও আরবি ভাষায় ব্যুৎপন্ন হইয়া সংস্কৃত ভাষা অধ্যয়ন করেন। পরে ইংরেজি শিখিয়া কেরি সাহেবের মুন্সি হন। অবশেষে তিনি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে বাঙ্গালা ভাষার অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ইঁহাদ্বারা মিসনারিগণ অনেক খৃষ্ট ধর্ম্মের পুস্তক লিখাইয়াছিলেন। ইঁহার লেখায় পারস্য ভাষার প্রভাব অত্যন্ত অধিক ছিল। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের ছাত্রদিগের জন্যই তিনি প্রতাপাদিত্য চরিত্র লিখিয়াছিলেন। ১৮০১ অব্দে এই পুস্তক প্রকাশিত হয়। মুশলমান রাজত্বকালে হিন্দু রাজাদিগের অবস্থা কিরূপ ছিল তাহা অবগত হইবার জন্য জর্ম্মানেরা এই গ্রন্থ সংগ্রহ করিয়াছিলেন। ভাষার নমুনা এইরূপ :

“শোভাকর দ্বার অতি উচ্চ। আমরি সহিত হস্তি বরাবর যাইতে পারে। দ্বারের উপর একস্থান তাহার নাম নহবৎখানা তাহাতে অনেক অনেক প্রকার বাদ্যযন্ত্রে দিবারাত্রি সময়ানুক্রমে যন্ত্রিরা বাদ্যধ্বনি করে। নহবৎ খানার উপরে ঘড়ীঘর। সে স্থানে ঘড়িয়ালেরা তাহারদের ঘড়ীতে নিরীক্ষণ করিয়া থাকে। দণ্ড পূর্ণ হবা মাত্রই তারা তাহাদের ঝাঁজের উপর মুদ্গর মারিয়া জ্ঞাত করায় সকলকে।”

১৮৫৩ অব্দে পণ্ডিত হরিশচন্দ্র তর্কালঙ্কার এই গ্রন্থের ভাষা সংশোধন ও পরিবর্ত্তন করিয়া এক সংস্করণ প্রকাশ করিয়াছিলেন।

১৫-“Bengalee Grammar” by W. Carey. অর্থাৎ কেরি সাহেবের বাঙ্গালা ব্যাকরণ। হ্যালহেড সাহেবের ব্যাকরণের পর ইহাই বাঙ্গালা ব্যাকরণের দ্বিতীয় গ্রন্থ। ১৮০১ অব্দে ইহার ১ম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। পরে ইহার আরও তিনটি সংস্করণ হইয়াছিল।

১৬-“জ্ঞানোদয়” রামরাম বসু সঙ্কলিত খৃষ্টিয় ধর্ম্ম গ্রন্থ। এই গ্রন্থে হিন্দুর আচার ও ধর্ম্ম অপেক্ষা খ্রিষ্টানের আচার ও ধর্ম্মের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা হইয়াছে। শ্রীরামপুর মিসন প্রেস হইতে ১৮০১ সনে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইয়াছিল।

১৭- Missioaeries Address to the Hindoos অর্থাৎ হিন্দুদিগের প্রতি পাদরীদিগের সম্ভোধন। রাম রাম বসু কৃত খ্রিষ্টধর্ম বিষয়ক গ্রন্থ। ১৮০১ সনে মুদ্রিত।

১৮- Colloquies বা কথোপকথন। জন সাধারণের কথিত বাঙ্গালা ভাষা যাহাতে ইংরেজেরা সহজে বুঝিতে পারেন তজ্জন্য ডবলিউ কেরি এই পুস্তক রচনা করেন। ইহাতে তৎকালের কথিত বাঙ্গালা ও তাহার ইংরেজি অনুবাদ আছে। গ্রন্থের বিষয় সুচী এইরূপ―সাহেব ও খানসামা, সাহেব ও মুন্সী, পরামর্শ, ভোজনের কথা, ভ্রমণ, পরিচয়, ভূমি, মহাজন ও আসামী, বাগান করিবার হুকুম, সুপারিসি, মজুরের কথাবার্ত্তা, খাতক মহাজনী, ঘটকালি হাটের বিষয় স্ত্রীলোকের হাট করা, স্ত্রীলোকের কথোপকথন, তিয়রিয়া কথা, ইজারার পরামর্শ, ব্রাহ্মণ ভিক্ষুকের কথা, কার্য্য চেষ্টার কথা, কন্দল, যাজক ও যজমান, স্ত্রীলোকে স্ত্রীলোকে কথা, জমিদার ও রায়তে বৈঠকি কথোপকথন ইত্যাদি। এগুলি যথাযথ উচ্চারণের সহিত লিখিত হইয়াছে। ভাষার নমুনা স্বরূপ স্ত্রীলোকের কন্দলের একাংশ উদ্ধৃত হইল :

“হালো ঝি জামাই খাগি কি বলছিস, তোরা শুনছিস্ গো এ আঁটকুড়ী রাঁড়ির কথা।*” তিন কুল খাগি।** তোর ভালডার মাতা খাই। হালো ভালো ডা খাগি, তোর বুকে কি বাঁশ দিয়াছিলাম হাড়ে।”

উত্তর―“থাকলো ছাড়কপালি গিদেরী থাক্। তোর গিদেরে ছাই পল প্রায়। যদি আমার ছেল্যান কিছু ভাল মন্দ হয় তবে কি তোর ইটা ভিটা কিছু থাক্বে।** তখন তোমার কোন্ বাপে রাখে তা দেখব। হে ঠাকুর তুমি যদি থাক, তবে উহার তিন বেটা যেন সাপের কামড়ে আজ রাত্রেই মরে। হা বউ রাঁড়ি তোর সর্ব্বনাশ হউক। তোর বংশে বাতি দিতে যেন কেউ থাকে না।”

প্রত্যুত্তর―“ওলো তোর শাপে আমর বাঁপার ধূলা ঝাড়া যাবে। তোর ঝি পুত কেটে দি আমার ঝি পুতের পায়। ষোলো বা বারো দুয়ারী ভারানী হাট বাজার কুড়ানী, খানকী, যা তোর গালাগালিতে আমার কি হবে লো কুঁদলী।”

 সে কালের মিসনারি সাহেবেরা বাঙ্গালী জাতির পারিবারিক জীবনের চিত্র সংগ্রহ করিতেও যে কিরূপ চেষ্টা করিয়াছেন এ পুস্তকে তাহার সুস্পষ্ট পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। গ্রন্থের আকার ডিমাই ৮ পেজি ২২৪ পৃষ্ঠা। ১৮০১ সনের ৪ঠা আগষ্ট শ্রীরামপুর মিসন প্রেসে কাঠের অক্ষরে গ্রন্থ মুদ্রিত হয়।

১৯-ocabulary in two parts Bengalee and English by H. P. Forster. Senior Merchant of the Bengal Establishment.  অর্থাৎ র্ফষ্টর সঙ্কলিত বাঙ্গালা ইংরেজি অভিধান। ১৮০১ সনে মুদ্রিত। ৪৪২ পৃষ্ঠায় অন্যূন সাড়ে ষোলো শত শব্দ সম্বলিত।

২০-মিলার সাহেবের অভিধান― ১৮০১ অব্দে মুদ্রিত, মূল্য বত্রিশ টাকা।

২১-লিপিমালা―রামরাম বসু প্রণীত, ১৮০১ অব্দে শ্রীরামপুর মিসন প্রেস হইতে কাঠের অক্ষরে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। গ্রন্থখানা দুই ভাগে বিভক্ত ও ২২৫ পৃষ্ঠায় সমাপ্ত। ভূমিকায়  গ্রন্থের উদ্দেশ্য বিবৃত হইয়াছে, তাহা এইরূপ :

“সৃষ্টি-স্থিতি প্রলয় কর্ত্তা জ্ঞানদ সিদ্ধিদাতা পরম ব্রহ্মের উদ্দেশ্যে নত হইয়া প্রণাম ও প্রার্থনা করিয়া নিবেদন করা যাইতেছে এ হিন্দুস্থান মধ্যস্থল বঙ্গদেশ কার্য্যক্রমে এ সময় অন্যান্য দেশীয় ও উপদ্বীপীয় ও পর্ব্বতস্থ ত্রিবিধ লোক উত্তম মধ্যম অধম অনেক লোকের সমাগম হইয়াছে এবং অনেকের অবস্থিতিও এই স্থানে। এখন এস্থলের অধিপতি ইংলণ্ডীয় মহাশয়েরা। তাহারা এ দেশীয় চলন ভাষা অবগত রহিলে রাজক্রিয়া ক্ষয় হইতে পারেন না। ইহাতে তাঁহারদিগের আকিঞ্চন এখানকার চলন ভাষা ও লেখা পড়ার ধারা অভ্যাস করিয়া সর্ব্ববিধ কার্য্যে ক্ষমতাপন্ন হয়েন। এতদর্থে এভূমির যাবতীয় লেখা পড়ার প্রকরণ দুই ধারাতে গ্রন্থিত করিয়া লিপিমালা নামক পুস্তক রচনা করা গেল। প্রথম ধারা দুই তিন অধ্যায়। তাহার প্রথমতো রাজগণ অন্য রাজারদিগকে লেখেন। তাহার প্রত্যুত্তর পূর্ব্বক দ্বিতীয় রাজগণ আপন সচিব লোককে অনুজ্ঞা ও বিধি ব্যবস্থা ক্রম দান। ইতি প্রথম ধারা। দ্বিতীয় ধারা সামান্য লেখা পড়া। সমান সমানীকে, লঘু গুরুকে, প্রভু কর্ম্মকরকে এবং অঙ্কমালা এই মতে পুস্তক লেখা যাইতেছে। ইহাতে অন্যান্য বিদ্যান লোকের স্থানে আমার এই আকাক্সক্ষা যদি আমার রচিত এই পুস্তকের মধ্যে কদাছিৎ ক্রমে কচিৎ দোষ হইয়া থাকে তবে অনুগ্রহপূর্বক দৃষ্টি মাত্রে নিন্দামদে মত্ত না হয়েন। এ কারণ কোন লোক দোষ ভিন্ন হইতে পারেন না।”

পুস্তকের ৫ম পৃষ্ঠায় পুস্তক প্রকাশের সময় এইরূপ প্রদত্ত হইয়াছে।

“শকাদিত্য বসু বর্ষ পশু শ্রেষ্ঠ মাস।

পরম আনন্দে রাম করিল প্রকাশ॥”

অর্থাৎ ১২০৮ সালের ভাদ্র মাসে গ্রন্থ লিখিত হয়। গ্রন্থকারের অন্যান্য গ্রন্থে পারস্য শব্দের যেমনি বাহুল্য দৃষ্ট হয়, এই গ্রন্থে পারস্য শব্দ তেমনি বিরল। ভূমিকার রচনা অপেক্ষা গ্রন্থের ভিতরের রচনায় আরও কৃতিত্ব পরিলক্ষিত হইবে। একটু নমুনা উদ্ধৃত করা গেল।

“অন্যের দিগকে নীতিভ্যাসে ক্ষমতাপন্ন হওয়া নহে। বরং তাহাতেই অন্তে মরিবেক, এমত লোকেরদের পরিবার- গণের নির্ব্বাহ নিস্পত্তির মনোযোগ করিবা।…

করে অতএব তাহার সাহায্যার্থে অযুত তুরগারূঢ় প্রেরণ করিবা যাহাতে তাহার বৈরী দমন হয়। সেই এই খানের পুষ্টি।”

২২-কাশীদাসী মহাভারত―১৮০২ সনে প্রথম মুদ্রিত।

২৩-“কৃত্তিবাসী রামায়ণ” ১৮০৩ সনে প্রথম মুদ্রিত হয়। এই রামায়ণের প্রচ্ছদ পত্রে এইরূপ লেখা ছিল-“বাল্মীকি কৃত রামায়ণ মহাকাব্য কীর্ত্তিবাস বাঙ্গালা ভাষায় রচিল। মূল্য দুই টাকা।” ইহার এক সংস্করণ ইটালীয় ভাষায় ও আর এক সংস্করণ ফ্রান্সের রাজধানী পারিশে মুদ্রিত হইয়াছিল।

২৪-‘দাউদের গীত’ গ্রন্থকারের নাম নাই। এক খানা খ্রিষ্টীয় ধর্ম্ম পুস্তক, ১৮০৩ সনে মুদ্রিত হয়।

২৫-“ঈসপের ও অন্যান্য গল্পের বঙ্গানুবাদ’। তারিণী চরণ মিত্র ও ডাঃ গিলক্রাইষ্ট কর্ত্তৃক অনুদিত। ইঁহারা দুইজনেই এই পুস্তক বাঙ্গালায় অনুবাদ করেন। পরে ডাঃ গিলক্রাইষ্ট উর্দ্দু, পারসি, আরবী প্রভৃতি নানা প্রাচ্য ভাষায় ইহার অনুবাদ প্রকাশ করেন। ১৮০৩ সনে এই বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয়।

২৬। ধর্ম্ম পুস্তক―খ্রিষ্টীয় ধর্ম্ম সম্বন্ধে ডাঃ কেরি ও অন্যান্য মিশনারিদিগের লিখিত সুসমাচার পুস্তক। ১৮০১ হইতে ১৮০৫ অব্দ পর্য্যন্ত কয়েক বৎসরে মুদ্রিত।

২৭। বাঙ্গলার জাতিভেদ―ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের ছাত্র হাণ্টার সাহেবের লিখিত একটি ক্ষুদ্র প্রবন্ধ পুস্তিকা ১৮০৪ অব্দে লিখিত। ভাষার নমুনা প্রদত্ত হইল।

“হিন্দুরোকেরা যদিও আপন শাস্ত্রের নিশ্চয়েতে থাকে তবে অন্য দেশের বিদ্যা ও ব্যবহার যদি ভালও হয় তবু তাহা গ্রহণ করিতে পারে না। যদি অন্য দেশের বিদ্যা ও ব্যবহার দেখে কিম্বা শুনে তথাপি তুচ্ছ করিয়া আদর করে না। অতএব অন্য লোকের ব্যবহারেতে তাহাদের জ্ঞানলাভ হইতে পারিবে না।”

২৮। “ঠাকুরের বাঙ্গালা ও ইংরাজি শব্দাবলী”― Sanders Cones and Co কর্ত্তৃক প্রকাশিত। কেরি সাহেবের উপদেশে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের সহকারী গ্রন্থরক্ষক এই অভিধান খানা সংগ্রহ করেন। ইহাতে ধর্ম্মতত্ত্ব, শরীর বিদ্যা, প্রাণীতত্ত্ব প্রাকৃতিক ইতিহাস, গার্হস্থ্য নীতি, অর্থনীতি, উদ্ভিদবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ক বহু শব্দ সংগৃহীত হইয়াছে। এই গ্রন্থ বাঙ্গালা ও রোমক অক্ষরে ১৮০৫ অব্দে প্রথম মুদ্রিত হয়। গ্রন্থের আকার ছোট―১৬৬ পৃষ্ঠা, মূল্য আট আনা। ইহা তৃতীয় সংস্করণ, ১৮৫২ অব্দে প্রকাশিত হয়।

২৯। “দায় রত্নাবলী”Ñপণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার অনুদিত আইন গ্রন্থ। সংস্কৃত দায়ভাগের বঙ্গানুবাদ, ১৮০৫ অব্দে মুদ্রিত।

৩০। “বর্জিলের ইলিয়দের প্রথম সর্গের বঙ্গানুবাদ”―অনুবাদক- Carey’s Dictionary একজন সিভিলিয়ান ও ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের ছাত্র ছিলেন। পুস্তক ৬৫ পৃষ্ঠায় সমাপ্ত ও ১৮০৫ সনে মুদ্রিত।

৩১। “খৃষ্ট চরিত্র”―রাম বসু প্রণীত। ১৮০৫ অব্দে মুদ্রিত।

৩২। “রাজাবলী”―পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার সঙ্কলিত ইতিহাস গ্রন্থ। ইহাতে “কলির প্রারম্ভ হইতে ইংরাজের অধিকার পর্য্যন্ত ভারতবর্ষের রাজা ও সম্রাটদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” প্রদত্ত হইয়াছে। বিদ্যালঙ্কার মহাশয় ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের হেড্ পণ্ডিত ছিলেন। পরে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান পণ্ডিত নিযুক্ত হন। তাহার নিবাস ছিল উড়িষ্যা প্রদেশে। তিনি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের ছাত্রদিগের জন্য অনেকগুলি পুস্তক লিখেন। ইহার ভাষা প্রথমে পারস্য শব্দবহুল ছিল। “রাজাবলী” হইতে তাহার নমুনা উদ্ধৃত করা গেল।

“মহারাজ দুর্ল্লভ রায় ও জাফরালী খাঁ প্রভৃতি সরদারদের সলাতে নবাবী সকল সৈন্যরা দাদনির উজর করিল। ইহাতে নবাব সিরাজদ্দৌলা মহারাজ দুর্ল্লভরাম প্রভৃতিকে হুকুম দিলেন যে আমার বেগমদের নাকের নথ পর্য্যন্ত যত ধন আছে সে সকল ধন লইয়া যে যে সরদারেরা আপন আপন বিরাদারিদের দরমাহ যত বাকী বলে তাহাদিগকে তাহাই দেও, হিসাবের অপেক্ষা করিও না, পশ্চাৎ হিসাব হইবে, এইরূপে আজি দুই প্রহর রাত্রি পর্য্যন্ত সকল ফৌজদের বেবাক দাদনি করিয়া সকল সরদারদিগকে হুকুম দেও যে চারি দণ্ড রাত্রি থাকিতে যেন সকলে আপন আপন বিরাদারি সমেত আসিয়া উপস্থিত হয়।”

এই গ্রন্থ ১৮০৮ অব্দে গবর্ণমেন্টের ব্যয়ে “লন্দন নগরে চাপা” হইয়াছিল। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের সংস্কৃতজ্ঞ হেড্পণ্ডিতের এই রচনা তখন তেমন আদর লাভ না করায় তিনি তাহার বিদ্যাবত্তা দেখাইবার জন্য “প্রবোধ চন্দ্রিকা” গ্রন্থ প্রণয়ন করিতে আরম্ভ করেন। এই উৎকট সাধুভাষায় রচিত গ্রন্থ বিদ্যালঙ্কার মহাশয়ের মৃতুর পর ১৮৩৩ অব্দে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইয়াছিল। এই গ্রন্থ যে ভাষায় লিখিত হইয়াছিল তাহার নমুনা এইরূপ―

“কোকিল কলালাপবাচাল যে মলয়া- চলা- নিল, সে উচ্ছলচ্ছিকরাত্যচ্ছনির্ঝরাম্ভঃ কণাচ্ছন্ন হইয়া আসিতেছে।”

৩৩। “শব্দসিন্ধু”― পীতাম্বর মুখোপাধ্যায় সঙ্কলিত, ইহা সংস্কৃত অমরকোষের বঙ্গানুবাদ। গ্রন্থের প্রচ্ছদ পত্রে লিখিত হইয়াছে-“ভগবান অমরসিংহ কৃত অভিধান―অকারাদিক্রমে ভাষায় বিবরণ করিয়া শব্দসিন্ধু নাম রাখিয়া কলিকাতায় ছাপা হইল।” ১৮০৯ অব্দে এই গ্রন্থ মুদ্রিত হয়। গ্রন্থকারের নিবাস বালী উত্তরপাড়া। বড় বড় অক্ষরে ৪৮৮ পৃষ্ঠায় গ্রন্থ সমাপ্ত।

৩৪। বাঙ্গলা অভিধান-রচয়িতার নাম নাই। হিন্দুস্থানী প্রেসে ১৮০৯ অব্দে মুদ্রিত। ইহাতে ৩৬০০ সংস্কৃত শব্দের বাঙ্গলা প্রতিশব্দ আছ; ২০০ পৃষ্ঠায় সম্পূর্ণ।

৩৬। সরদ দেওয়ানি নিষ্পতি―আইন পুস্তক। ১৮১০ সনে মুদ্রিত।

৩৭। সতী সহমরণ সংবাদ― রামমোহন রায় প্রণীত। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে বাদ প্রতিবাদ প্রবন্ধ ১৮১০ অব্দে মুদ্রিত। ভাষার নমুনা এইরূপ :-

“এ সকল বচন যাহা কহিলে তাহা স্মৃতি বটে এবং এ সকল বচনের দ্বারা ইহা প্রাপ্ত হইয়াছে যে স্ত্রীলো সহমরণ ও অনুমরণ করে তবে তাহার বহুকাল ব্যাপিয়া স্বর্গভোগ হয় কিন্তু বিধবা ধর্ম্মে মনু প্রভৃতি যাহা কহিয়াছেন তাহাতে মনোযোগ কর।”

৩৮। পুরুষ পরীক্ষা―বিদ্যাপতি প্রণীত সংস্কৃত পুরুষ-পরীক্ষা গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ― একখানা হিতোপদেশ পূর্ণ গল্পগ্রন্থ। কোর্ট উইলিয়ম কলেজের ছাত্রদিগের জন্য হরপ্রসাদ রায় এই গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ইহার ভাষা সে কালের হিসাবে প্রাঞ্জল ও সুখবোধ্য। রচনার নমুনা উদ্ধৃত করা গেল : ―

“জয়ন্তী নগরীতে ধীরবিক্রম নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি নিজ যোগ্যতাতে ধন উপার্জ্জন করিয়া নির্ভীক ও বহুপুত্রযুক্ত হইয়া সুখে কালযাপন করেন। এক রাত্রিতে রাজা খট্টাতে শয়ন করিতেছেন, এমন সময়ে কোন স্ত্রীর রোদনের শব্দ শুনিয়া তৎক্ষণাৎ বাহিরে আসিয়া ঐ শব্দানুসারে অনুসন্ধান করিতে করিতে নগর প্রান্তে সর্ব্বাঙ্গ সুন্দরী নব যুবতী নানাভরণ ভূষিতা আর উত্তম বস্ত্র পরিধানা এমন এক স্ত্রীকে দেখিলেন।” ১৮১৪ অব্দে উধু ্ ঈড় এই গ্রন্থ প্রকাশ করেন। মূল্য এক টাকা―পৃষ্ঠ সংখ্যা ১৮৬। বিশপ টার্ণারের অনুরোধে মহারাজা কালীকৃষ্ণ ঠাকুর ১৮৩০ অব্দে এই পুস্তকের একখানা ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশ করেন।

৩৯। “Carey’s Dictionary” অর্থাৎ  কেরি সাহেবের অভিধান। ইহা একখানা বিরাট কোষ-গ্রন্থ। ইহার সঙ্কলনে কেরি সাহেবের ত্রিশ বৎসর লাগিয়াছিল। ১৮১৫ অব্দে তিনি এই ১ম খণ্ড প্রকাশ করেন। গ্রন্থ সুবৃহৎ চারি খণ্ডে সমাপ্ত, শব্দসংখ্যা প্রায় আশি হার্জা কেরি অনেক শব্দ নিজে প্রস্তুত করিয়াও ইহাতে সন্নিবেশিত করিয়াছেন। সম্পূর্ণ গ্রন্থের মূল্য একশত কুড়ি টাকা। ১৮২৭ অব্দে মার্সম্যান সাহেব কেরির এই অভিধানের একখানি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশ করেন।

৪০। ইতিহাসমালা―ইহা একখানা গ্রল্প গ্রন্থ। সেকালে গল্পকেই সাধারণত ইতিহাস বলিত। কেরি সাহেব এই গ্রন্থ লিখিয়াছিলেন। ইহাতে ১৫০টী ক্ষুদ্র গল্প আছে―১৮১২ সালে শ্রীরামপুর মিসন প্রেস হইতে এই গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বলিতে গেলে মহাত্মা কেরিই নানা উপায়ে বাঙ্গালা সাহিত্যের জীবন দান করিয়াছিলেন। ইতিহাসমালা অনুবাদ গ্রন্থ নহে। কেরি বাঙ্গালীর ঠাকুরমার কথাগুলি সংগ্রহ করিয়া ইতিহাসমালা রচনা করিয়াছিলেন। তাহার ভাষা বিশুদ্ধ বাঙ্গালা রচনার আদর্শ। নিম্নে একটী গল্প নমুনা স্বরূপ উদ্ধৃত করা গেল।

“এক কৃষক লাঙ্গল চসিতে গিয়া কোন খালে গোটা চব্বিশেক মৎস্য ধরিয়া গৃহে আসিয়া আপন গৃহিণীকে পাক করিতে দিয়া আপনি পুনর্ব্বার চসিতে গেল। তাহার গৃহিণী সে মৎস্য কয়টী পাক করিয়া মনে বিবেচনা করিল যে মৎস্য পাক করিলাম কিন্তু কি প্রকার হইয়াছে চাখিয়া দেখি ইহা ভাবিয়া কিঞ্চিৎ ঝোল লইয়া খাইয়া দেখিল যে ঝোল সুরস হইয়াছে। পরে পুনর্ব্বার মনে ভাবিল মৎস্য কিরূপ হইয়াছে তাহাও চাখিয়া দেখি, ইহা ভাবিয়া একটী মৎস্য খাইল। পুনর্ব্বার চিন্তা করিল ওটি কিরূপ হইয়াছে তাহাও খাইতে একটী মাত্র অবশিষ্ট রাখিল। পরে কৃষক ক্ষেত্র হইতে বাটী আইলে তাহার গৃহিণী সেই মৎস্যটী আর অন্ন তাহাকে দিলে কৃষক কহিল যে, এ কি? চব্বিশটী মৎস্য আনিয়াছি, আর কি হইল। তখন তাহার স্ত্রী মৎস্যের হিসাব দিল।

মাছ আনিলা ছয় গণ্ডা

চিলে নিল দুই গণ্ডা,

বাকী রহিল ষোল।           

তাহা ধুইতে আটটী জলে পলাইল ॥

তবে থাকিল আট।

দুইটায় কিনিলাম দুই আটি কাঠ ॥

তবে থাকিল ছয়।

প্রতিবাসীকে চারিটা দিতে হয় ॥

তবে থাকিল দুই।

তার একটা চাখিয়া দেখিলাম মুঁই ॥

তবে থাকিল এক।

অই পাত পানে চাহিয়া দেখ ॥     

এখন হইস যদি মিন্সের পো।

তবে কাটা খান খাইয়া মাছখানা থো ॥

আমি যেঁই মেয়ে

তঁই হিসাব দিলাম কয়ে ॥

এইরূপে মৎস্যের হিসাবে কৃষকের প্রত্যয় জন্মাইল।”

৪১-বেদান্ত গ্রন্থ―রামমোহন রায় অনুদিত ও ১৭৩৭ শকাব্দে বা ১৮১৫ অব্দে মুদ্রিত। গ্রন্থের ভাষার নমুনা স্বরূপ ভূমিকার এক অংশ উদ্ধৃত হইল।

“বেদের পুঃন পুঃন প্রতিজ্ঞার দ্বারা এবং বেদান্ত শাস্ত্রের বিবরণের দ্বারা এই প্রতিপন্ন হইয়াছে যে সকল বেদের প্রতিপাদ্য সদ্রƒপ পরব্রহ্ম হইয়াছেন। যদি সংস্কৃত শব্দের ব্যুৎপত্তি বলের দ্বারা ব্রহ্ম পরমাত্মা সর্ব্বজ্ঞ ভূমা ইত্যাদি ব্রহ্ম বাচক প্রসিদ্ধ শব্দ হইতে কোন কোন দেবতা কিম্বা মনুষ্যকে প্রতিপন্ন কর তবে সংস্কৃত শব্দে যে সকল শাস্ত্র কিম্বা কাব্য বর্ণিত হইয়াছে তাহার অর্থের স্থৈর্য্য কোন মতে থাকে না যেহেতু ব্যুৎপত্তি বলেতে কৃষ্ণ শব্দ আর রাম শব্দ পশুপতি শব্দ এবং কালী দুর্গাদি শব্দ হইতে অন্য অন্য বস্তু প্রতিপাদ্য হইয়া কোন শাস্ত্রের কি প্রকার তাৎপর্য্য তাহার নিশ্চয় হইতে পারে না।”

৪২-৪৩-তলবকার উপনিষৎ ও ঈশোপণিষৎ এই দুই খানা উপনিষদের বঙ্গানুবাদ ও রামমোহন রায়ের কৃত। ১৭৩৮ শকাব্দে বা ১৮১৬ অব্দে মুদ্রিত হইয়াছিল।

৪৪Ñ “শ্রীবিক্রমাদিত্যের বত্রিশ পুত্তলিকা” গ্রন্থকার পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। এই গ্রন্থ ১৮১৬ অব্দে বিলাতে মুদ্রিত হইয়াছিল। গ্রন্থের প্রচ্ছদ পত্রে লেখা ছিল―

              শ্রী

              বিক্রমাদিত্যের

              বত্রিশ পুত্তলিকা সিংহাসন সংগ্রহ

              বাঙ্গালা ভাষাতে

              শ্রী

              মৃত্যুঞ্জয় শর্ম্মণ রচিত

              লন্দন মহানগরে চাপা হইল

              ১৮১৬

৪৫-“লিপি ধারা”- ব র ক ধ ঝ এইরূপ অক্ষরের আকৃতি অনুসারে স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণের অক্ষর গুলি এক এক স্থানে প্রদত্ত হইয়াছে। ১৮১৬ অব্দে মুদ্রিতÑ১২ পৃষ্ঠার পুস্তিকা।

৪৬-“জ্যোতিঃ সংগ্রহ”―রামচন্দ্র ভট্টাচার্য্য বিদ্যাবাগীশ প্রণীত। ইহাই বাঙ্গালা প্রথম জ্যোতিষ গ্রন্থ। ভট্টাচার্য্য মহাশয়ের নিবাস পালপাড়া। ১৮১৬ অব্দে মুদ্রিত। ভাষা সরল, ÑযথাÑ

“জন্ম মাসে পুরুষের বিবাহ নিষিদ্ধ হয়, কিন্তু কন্যার বিবাহ প্রসস্ত হয়। আর অগ্রহায়ণ মাসে এবং জ্যৈষ্ঠ মাসে জ্যেষ্ঠ পুত্রেরও জ্যেষ্ঠ কন্যার বিবাহ নিষিদ্ধ হয়। ইহাতে বিশেষ জ্যৈষ্ঠ মাসেতেও প্রথম দশ দিন পরিত্যাগ করিয়া জ্যেষ্ঠ পুত্রের বিবাহ হয়।”

৪৭-ব্যাকরণ-গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য্য প্রণীতÑ১৮১৬ অব্দে মুদ্রিত হয়। ইহাই বাঙ্গালীর কৃত প্রথম বাঙ্গালা ব্যাকারণ।

৪৮-“বেঙ্গল গেজেট” গঙ্গাধর ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত, বাঙ্গলার প্রথম সাময়িক পত্র। লং সাহেব তাঁহার বাঙ্গালা গ্রন্থ তালিকায় বেঙ্গল গেজেটকে সংবাদ পত্র বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছেন। বাস্তবিক পক্ষে তাহা সংবাদ পত্র ছিল না। ইহা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইত এবং ইহাতে সম্পাদকের লিখিত “বিদ্যাসুন্দর, বেতাল পঁচিশ প্রভৃতি কাব্য সকল প্রতিকৃতি সহ মুদ্রিত হইত।” বাঙ্গালা সাময়িক সাহিত্যের ইহাই আদিম পথ প্রদর্শক। ১৮১৬ অব্দে বেঙ্গল গেজেট বাহির হয়। এবং বৎসর কাল মধ্যেই লীলা সম্বরণ করে।

৪৯-“জমিদারী হিসাব”-স্মিথ সাহেব প্রণীত; ইহা জমিদারী সংক্রান্ত হিসাব পত্র শিক্ষার পুস্তক, তিন খণ্ডে সম্পূর্ণ; ১৮১৭ অব্দে মুদ্রিত।

৫০- Lowson’s Singhur Bibaran  অর্থাৎ লাউ সেন কৃত সিংহের বিবরণ। ১৮১৭ অব্দে মুদ্রিত।

৫১-জীব জন্তুর বিবরণ বা Natural History. অনুবাদ গ্রন্থ, ৪ ভাগে সম্পূর্ণ। ১৮১৭ অব্দে মুদ্রিত।

৫২ ধারাপাত (Arithmetical Table). ১৮১৭ অব্দে চুঁচুড়ার মে সাহেব তাঁহার প্রতিষ্ঠিত বঙ্গ বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষার্থ ছাত্রদিগের জন্য বিলাতের উন্নত প্রণালীর সহিত সাদৃশ্য রাখিয়া এই ধারাপাত প্রকাশ করেন।

৫৩-“সঙ্গীত পুস্তক”-ইহাই বাঙ্গালার প্রথম সঙ্গীত পুস্তক ১৮১৭ সনে মুদ্রিত।

৫৪-“ধাতু শব্দজ”-শ্রীরামপুর ভার্নিকুলার স্কুল বুক সোসাইটী কর্ত্তৃক ১৮১৭ অব্দে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। ধাতুকে কিরূপে শব্দে পরিণত করিতে হয় এই অভিধান থানায় তাহা প্রদর্শিত হইয়াছে। ইহাতে প্রায় দশ হাজার শব্দ আছে।

৫৫-চানক্য শ্লোকÑ১০৮টী নীতি পূর্ণ সংস্কৃত শ্লোক ও তাহার বঙ্গানুবাদÑ১৮১৭ অব্দে মুদ্রিত হয়। ১৮৪০ অব্দে দিগম্বর রায় ইহার ইংরেজী অনুবাদ করেন, অতঃ-পর গ্রীক ও লাটীন ভাষায় ইহার অনুবাদ প্রকাশিত হয়।

৫৬-“শিশুবোধক” প্রথম শিক্ষার্থী বালকদিগের জন্য এই পুস্তক খানা ১৮১৭ অব্দে প্রথম মুদ্রিত হয়। ইহাতে ক খ হইতে আরম্ভ করিয়া স্বামী ও স্ত্রীর পরম্পরের নিকট পত্র লিখিবার ধারা পর্য্যন্ত প্রদত্ত হইয়াছে। সে পত্রের ভাষা কিরূপ পাঠক তাহা পাঠ করুন।

স্ত্রীর পত্র-

“শিরোনামা―ঐহিক পারত্রিক ভবার্ণব নায়িক শ্রীযুক্ত প্রাণেশ্বর মধ্যম ভট্টাচার্য্য মহাশয় পদ পল্লবাশ্রয় প্রদানেষু।

“শ্রীচরণ সরসী দিবা নিশি সাধন প্রয়াসী দাসী শ্রীমতী মালতী মঞ্জুরী দেবী প্রণম্য প্রিয়বর প্রাণেশ্বর নিবেদন ঞ্চাদৌ মহাশয়ের শ্রীপদ সরোরুহ স্মরণ মাত্র অত্র শুভম্বিশেষ। পরং মহাশয় ধনাভিলাষে পরদেশে চিরকাল কাল যাপন করিতেছেন। যে কালে এ দাসীর কালরূপ লগ্নে পাদক্ষেপ করিয়াছেন, সে কাল হরণ করিয়া দ্বিতীয় কালের কালপ্রাপ্ত হইয়াছে। অতএব পরকালে কালরূপকে কিছুকাল সান্ত¦না করা দুই কালের সুখকর বিবেচনা করিবেন।

অতএব জাগ্রত নিদ্রিতার ন্যায় সংযোগ সঞ্চালন পরিত্যাগ পূর্ব্বক শ্রীচরণ যুগলে স্থানং প্রদানং করু নিবেদন মিতিÑ

              স্বামীর উত্তরÑ

“শিরোনামাÑপ্রাণাধিকা স্বধর্ম্ম প্রতিপালিকা শ্রীমতী মালতী মঞ্জুরী দেবী সাবিত্রী ধর্ম্মাশ্রিতেষু।

“পরম প্রণয়ার্ণব গভীরনীরতীরনিবসিত কলেবরাঙ্গ সম্মিলিত নিতান্ত প্রণয়াশ্রিত শ্রীঅনঙ্গমোহন দেব শর্ম্মণঃঝটিত ঘটিত বাঞ্ছিতান্তঃকরণে বিজ্ঞাপনঞ্চাদৌ শ্রীমতীর শ্রীকর কমলাঙ্কিত কমল পত্রী পঠিত মাত্র অত্র শুভবিশেষ। বহু দিবসাবধি প্রত্যাবধি নিরবধি প্রয়াস প্রবাস নিবাস তাহাতে কর্ম্মফাঁস ব্যতিরিক্ত উত্তক্তান্তঃকরণে কালযাপন করিতেছি। অতএব মন নয়ন প্রার্থনা করে যে সর্ব্বদা একতাপূর্ব অপূর্ব সুখোদ্ভব মুথারবিন্দ যথা যোগ্য মধুকরের ন্যায় মধুমাসাদি আশাদি পরিপূর্ণ হয়। প্রয়াস মীমাংসা প্রণেতা শ্রী শ্রীঈশ্বরেচ্ছা শীতান্তে নিতান্ত সংযোগ পূর্ব্বক কাল যাপন কর্ত্তব্য, বিত্তোপার্জ্জন তদর্থে তৎসম্বন্ধীয় কর্ত্তৃক দুঃখিতা এতাদৃশ উপার্জ্জনে প্রয়োজন নাই স্থির সিন্ধান্ত করিয়াছি। জ্ঞাপনামিতি।

৫৮-শান্তিশতক-১৮১৭ অব্দে মুদ্রিত।

৫৯-গুরু শিষ্যের প্রশ্বোত্তর ধারাতে সৃষ্ট্যাদির বিবরণ। ১৮১৭ অব্দে মালদহের নীলকর এলার্টন তাহার স্থাপিত বঙ্গ বিদ্যালয়ের ছাত্রদিগের জন্য এই পুস্তক প্রণয়ন করেন। তিনি তাহার স্কুলের জন্য আরও অনেক পুস্তক লিখিয়াছিলেন তাহা মুদ্রিত না হওয়ায় উল্লেখ করা গেল না।

১৮১৭ অব্দে আরও কতকগুলি পুস্তক মুদ্রিত হইয়াছিল। ঐ সকল গ্রন্থের রচয়িতার নাম পাওয়া যায় নাই। প্রায় সকল গুলিই সংস্কৃতের অনুবাদ। নিম্নে পুস্তক গুলির নাম প্রদত্ত হইল।

৬০-শাস্ত্র পদ্ধতি। ৬১-রতিবিলাশ। ৬২-সম্ভোগ রত্নাকর। ৬৩-রমণীরঞ্জন। ৬৪Ñরসমঞ্জরী। ৬৫-রসসাগর। ৬৬- রসরসামৃত। ৬৭-রসতরঙ্গিনী। ৬৮- রসেন্দু-প্রেম-বিলাস ও ৬৯Ñরতিকেলি। ৭০Ñস্ত্রী শিক্ষা পুস্তক-গৌরমোহন কৃত। ইহাই বাঙ্গলার স্ত্রী শিক্ষা বিষয়ক প্রথম পুস্তক। ১৮১৮ অব্দে মুদ্রিত হয়।

৭১-নীতিকথা (প্রথম ভাগ) রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুর কর্ত্তৃক বিদ্যালয়ের বালকদিগের জন্য ইংরেজী ও আরবী ভাষা হইতে সংগৃহীত। T.C. Mitraনামক একব্যক্তি রাজা বাহাদুরকে ইহার অনুবাদ কার্য্যে সাহায্য করেন। ১৮১৮ অব্দে শ্রীরামপুরের মিশনারিরা এই পুস্তক প্রকাশ করেন। মূল্য এক আনা মাত্র।

৭২- “Vocabulary of the Bengalee Language” বা বাঙ্গালা শব্দাবলী রামচন্দ্র নামক কোন একব্যক্তির সংগৃহীত অভিধান পুস্তক; ১৮১৮ অব্দে মুদ্রিত।

৭৩- “Pearson’s Tables” ১৮১৮ অব্দে মুদ্রিত।

৭৪-নীতবাক্য ১ম ও ২য় খণ্ড। ১৮১৮ অব্দে শ্রীরামপুরের মিসনারিগণ তাহাদের প্রতিষ্ঠিত স্কুল সমূহের ছাত্রদিগের পাঠের জন্য বাইবেল হইতে কয়েকটী উপদেশ লইয়া এই পুস্তক প্রকাশ করেন।

৭৫-“বানান শিক্ষা” ষ্টুয়ার্ট সাহেব কৃত; মূল্য ছয় আনা। ১৮১৮ অব্দে মুদ্রিত হয়।

৭৬-বিদ্যাহারাবলী কেরিসাহেব কৃত চিত্র সম্বিলত কোষ গ্রন্থ। ইংরেজী এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটেনিকা হইতে এনাটমির বঙ্গানুবাদ করিয়া রেঃ কেরি এই গ্রন্থের শরীর ব্যবচ্ছেদ নামক ১ম খণ্ড ১৮১৮ অব্দে মুদ্রিত ও প্রকাশিত করেন। অতঃপর ১৮২০ অব্দে সম্পূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছিল। মূল্য ছয় টাকা, পত্র সংখ্যা ৬৩৮।

৭৭-কলেরা চিকিৎসা ১৮১৬ অব্দে এদেশে কলেরা রোগ দেখা দেয়। ঐ রোগের চিকিৎসার জন্য ডাঃ রবিনসন ১৮১৮ সালে এই পুস্তকখানি প্রকাশ করেন।

৭৮-বাঙ্গালা পঞ্জিকাÑশ্রীরামপুর হইতে রামহরি কর্ত্তৃক প্রকাশিত। ইহাই প্রথম মুদ্রিত পত্রিকা। ১৮১৮ হইতে প্রকাশিত হইতে আরম্ভ হয়।

৭৯-মনোরঞ্জন ইতিহাস তারাচাঁদ দত্ত প্রণীত, বালকদিগের পাঠ্য পুস্তক। ১৮১৮ অব্দে ১ম সংস্করণে দুই হাজার পুস্তক মুদ্রিত হইয়াছিল।

৮০-অস্থিবিদ্যা-কেরি সাহেবের সংগৃহীত অস্থিবিদ্র্যা বিষয়ক গ্রন্থ, ১৮১৮ অব্দে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

৮১-ধর্ম্মগ্রন্থের চুম্বক-১৮১৮ সনে শ্রীরামপুর মিস নারিগণ কর্ত্তৃক প্রকাশিত।

৮২-“বর্ণামালা ও ব্যাকরণ” ১৮১৮ অব্দে রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুর বালক বালিকাদিগের শিক্ষার্থ এই ব্যাকরণ খানি প্রণয়ন করেন।

৮৩-“দিºর্শন” মাসিক পত্রিকা ১৮১৮ অব্দের এপ্রিল মাসে শ্রীরামপুর হইতে মিসনারিগণ কর্ত্তৃক প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকা ২৬ মাসে ২৬ সংখ্যা মাত্র বাহির হইয়াছিল এবং ঐ ২৬ সংখ্যায় মোট ১০৬৭৬ খানা পত্রিকা মুদ্রিত হইয়াছিল।

প্রথম বাঙ্গালা সাময়িক পত্রিকা বেঙ্গল গেজেট জন্মগ্রহণ করিয়া কালকবলিত হইলে এক বৎসর কাল বাঙ্গলা ভাষায় আর কোন সাময়িক পত্রিকা বাহির হয় নাই। অতঃপর “দিºর্শন” বাহির হয। দিºর্শনের সময় হইতে অবিচ্ছিন্ন ভাবে বাঙ্গালায় বাঙ্গলা সাময়িক পত্রিকা চলিয়া আসিতেছে। সুতরাং আমরা বাঙ্গলা সাময়িক পত্রিকার অবিচ্ছন্ন যুগ-আরম্ভ কাল পর্য্যন্তের বাঙ্গলা মুদ্রিত গ্রন্থের তালিকা প্রদান করিয়া বিদায় গ্রহণ করিলাম। ইহার পর বাঙ্গলা সাহিত্য দিনে দিনে উন্নতির সোপান হইতে সোপানে আরোহন করিতেছিল ইহা বলাই বাহুল্য।

* এই রচনায় উল্লিখিত সমস্ত ঐতিহাসিক তথ্যাবলি পরিবেশনের দায়িত্ব এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিশ্লেষণ একান্তভাবে লেখকের। এর কোনও দায় পত্রিকা কর্তৃপক্ষের নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares