প্রবন্ধ : শামসুর রাহমানের কবিতা : ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা : ফারুক সুমন

বাংলা কবিতাঙ্গনে এমন এক সময়পর্বে শামসুর রাহমানের আবির্ভাব, যখন রাজনৈতিক বিভিন্ন ঘটনাবর্তের ভেতর দিয়ে তৎকালীন পূর্ববাংলার জনগণ একটি স্বাধীন দেশ প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে ক্রমশ নানাভাবে সংগঠিত হচ্ছিল। তবে সংগঠিত হওয়ার ইতিহাস মোটেও সহজ ছিল না। তাদের রক্ত ঝরাতে হয়েছে, নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হওয়ার অব্যবহিত পর থেকেই পূর্ববাংলার জনগণ নানামুখী বৈষম্য, শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার জোর করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার অন্যায় পাঁয়তারা শুরু করে। বস্তুত এভাবেই পূর্ববাংলার জনগণের মনে ধীরে ধীরে অন্তর্গত ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে শুরু হয়।

আদতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ এদেশের মানুষের মনে দৃঢ় মনোবল নিয়ে উপ্ত হয়েছিল ১৯৫২ সালে। এ বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি রক্তঝরা ভাষা-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ডের মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিল যে, আর যা-ই হোক এই পাকিস্তানি জুলুমবাজ সরকারের অধীনে মুক্তি সম্ভব নয়। ফলে রাজনীতিকদের পাশাপাশি কবি-সাহিত্যিকগণও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রের লক্ষ্যে কাজ করতে থাকলেন। সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যম অর্থাৎ কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি রচনায় স্বাধীনতার স্বপ্নসুর ছড়িয়ে দিতে শুরু করলেন। সাতচল্লিশের দেশবিভাগ, বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন, আটান্নর সামরিক শাসন, বাষট্টির শিক্ষা কমিশন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এই ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহের ভেতর দিয়ে আমাদের যেতে হয়েছে। অতঃপর দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র যুদ্ধ শেষে আমরা স্বাধীন হয়েছি।

শামসুর রাহমান স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের নেপথ্যে ঘটে যাওয়া এইসব ঘটনার সমানবয়সী। একজন সংবেদনশীল কবি হিসেবে ইতিহাসের এই রক্তভেজা আন্দোলন সংগ্রামের বৃত্তান্ত রাহমান তাঁর কিছু কবিতায় তুলে ধরেছেন। ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী নানা ঘটনাপঞ্জি তাঁর কবিতায় স্ফূর্তি নিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। ১৯৫০ সালে আশরাফ সিদ্দিকী ও আবদুর রশীদ খানের যুগ্ম-সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘নতুন কবিতা’ সংকলন। এ ছাড়া ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারী সাহিত্য সংকলনটি প্রকাশিত হয়। এই সংকলনগুলো মূলত পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে কবি-সাহিত্যিকদের মনোবেদনা ও আক্ষেপের বহিঃপ্রকাশ। সংকলনে হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-৮৩), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৭), বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর (১৯৩৭), আবদুল গনি হাজারী (১৯২১-৭৬), ফজলে লোহানী (১৯২৮-৮৫), আনিস চৌধুরী (১৯২৯-৯০) আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১), আতাউর রহমান (১৯২৭-৯৯), শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) এবং সৈয়দ শামসুল হকসহ (১৯৩৫-২০১৬) বিভিন্ন কবির কবিতা স্থান পায়।

বাংলা বর্ণমালা তথা ভাষার প্রতি নিবেদিত চিত্তের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় শামসুর রাহমানের ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’  শীর্ষক একটি কবিতায়। মূলত ভাষাকে কেন্দ্র করে একদিন স্বাধীনতার যে বীজ উপ্ত হয়েছিল। সেই ভাষার বিকৃত ব্যবহার এবং অবহেলা কবিকে বিক্ষুব্ধ করেছে। যে বর্ণমালা কবির অন্তর্গত সত্তায় চেতনার নক্ষত্র হয়ে দীপ্যমান। দুঃখিনী বর্ণমালার এমন অবহেলা ও উপেক্ষা কবি মেনে নিতে পারেননি। কবির ভাষায় :

নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়।

মমতা নামের প্লুত প্রদেশের শ্যামলিমা তোমাকে নিবিড়

ঘিরে রয় সর্বদাই। কালো রাত পোহানোর পরের প্রহরে

শিউলি শৈশবে-পাখি সব করে রব’ বলে মদনমোহন

তর্কালঙ্কার কী ধীরোদাত্ত স্বরে প্রত্যেহ দিতেন ডাক। তুমি আর আমি,

অবিচ্ছিন্ন, পরস্পর মমতায় লীন,

ঘুরেছি কাননে তাঁর নেচে নেচে, যেখানে কুসুম কলি সবই

ফোটে, জোটে অলি ঋতুর সঙ্কেতে।

…                         …                         …

তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার?

উনিশ শো’ বায়ান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি

বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।

সে-ফুলের একটি পাপড়িও ছিন্ন ‘হলে আমার সত্তার দিকে

কত নোংরা হাতের হিংস্রতা ধেয়ে আসে।

এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামি

এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউরের পৌষ মাস!

তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো,

বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।’

এছাড়া ‘বরকতের ফটোগ্রাফ’ কবিতায় ভাষাশহীদ বরকতের প্রসঙ্গ এসেছে স্মৃতির অবয়বে। যেমন-

‘ভর সন্ধেবেলা বরকতের পুরনো এক ফটোগ্রাফ

আমার হাতে এসে যাবে, ভাবিনি। তার মায়ের যত্নের আশ্রয় ছেড়ে সেটি এখন

আমার হাতের উষ্ণতায়

…                         …                         …

এই ফটোগ্রাফের দিকে তাকিয়ে

নীরব থাকো, সময় হোক পরিপক্ব ফল, সন্তের ধ্যান,

বলল আমাকে সন্ধেবেলার মুহূর্তগুলো।’

‘ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯’ শীর্ষক কবিতায় তিনি অনুভব করেছেন ভাষা-আন্দোলনে শহিদ রফিক, শহিদ বরকত, শহিদ সালামের প্রতিবাদী ও দেশপ্রেমমূলক চেতনা। ১৯৬৯ সালে যখন পাকিস্তানি জুলুমবাজ শাসক এদেশের জনগণের ওপর নির্মম স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে অমানবিক অত্যাচার চালায়। শামসুর রাহমান ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের দুঃসময়ে ভাষাশহিদদের অভাববোধ করছিলেন। তাঁর কাছে মনে হয়, আবার পতাকা হাতে রাজপথে নামবে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার। ফেব্রুয়ারিতে ফোটা কৃষ্ণচূড়ার রঙকে কবি শহিদের রক্তের প্রতীকে কল্পনা করে চেতনার রঙ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন :

‘আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে

কেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা

একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়- ফুল নয়, ওরা

শহিদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর।

একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রং।

…                         …                         …

বুঝি তাই উনিশশো উনসত্তরেও

আবার সালাম নামে রাজপথে, শূন্যে তোলে ফ্ল্যাগ,

বরকত বুক পাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে।’

ছাত্রনেতা আসাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র ছিলেন। এ ছাড়া তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম নেতা ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন আসাদ। স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে চানখাঁরপুল এলাকায় তিনি বুকে গুলিবিদ্ধ হন।

রক্তভেজা শরীর নিয়ে লুটিয়ে পড়েন রাজপথে। আসাদ শহিদ হওয়ার পর আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শামসুর রাহমান অতঃপর শহিদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে সৃষ্টি করেছেন কালজয়ী কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। কবির ভাষায় :

‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের

জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট

উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।

…                         …                         …

ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর- শেভিত

মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট

শহরের প্রধান সড়কে

কারখানার চিমনি-চূড়োয়

গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে

উড়ছে, উড়ছে অবিরাম

আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,

চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।

আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা

সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;

আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তিনি ইতিহাস, রাজনীতি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ-সহ বহুবিধ বিষয় কবিতার অনুষঙ্গ করেছেন। তাঁর লেখায় দেশ ও জাতির প্রতি অন্তরঙ্গতার স্ফুরণ ঘটেছে। বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নেপথ্যে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের কথা কবিতায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে মওলানা ভাসানী এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলো শৈল্পিক বিচারে অনবদ্য। স্বাধীনতাপূর্বকালেই মওলানা ভাসানীকে নিয়ে শামসুর রাহমান লিখেছেন ‘সফেদ পাঞ্জাবি’। কবিতার ভাষাপ্রয়োগের ওজস্বিতা, উপমা, রূপক, প্রতীক ও চিত্রকল্পের বিন্যাসে মওলানা ভাসানীর অসাধারণ অবয়ব তুলে ধরেছেন কবি। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এই কবিতার প্রসাদগুণে আরও অনন্য হয়ে উঠেছেন।

‘শিল্পী, কবি, দেশী কি বিদেশী সাংবাদিক,

খদ্দের, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবিকা,

নিপুণ ক্যামেরাম্যান, অধ্যাপক, গোয়েন্দা, কেরানি,

সবাই এলেন ছুটে পল্টনের মাঠে, শুনবেন

দুর্গত এলাকা-প্রত্যাগত বৃদ্ধ মৌলানা ভাসানী

কী বলেন। রৌদ্রালোকে দাঁড়ালেন তিনি, দৃঢ়, ঋজু,

যেন মহাপ্লাবনের পর নুহের গভীর মুখ

সহযাত্রীদের মাঝে ভেসে ওঠে, কাশফুল-দাড়ি

উত্তরে হাওয়ায় ওড়ে।

…                         …                         …

বল্লমের মতো ঝল্সে ওঠে তাঁর হাত বারবার

অতি দ্রুত স্ফীত হয়, স্ফীত হয়, মৌলানার সফেদ পাঞ্জাবি,

যেন তিনি ধবধবে একটি পাঞ্জাবি দিয়ে সব

বিক্ষিপ্ত বেআব্রু লাশ কী ব্যাকুল ঢেকে দিতে চান।’

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বেশকিছু কবিতা লিখেছেন শামসুর রাহমান। কবিতাগুলোর প্রেক্ষাপটও স্বতন্ত্র। বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধকালীন তৎকালীন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক কর্তৃক পাকিস্তানে বন্দি অবস্থায় ছিলেন। তখন এদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা নিয়ে ভীষণরকম উদ্বিগ্ন ছিল। বন্দিদশা থেকে পিতা কবে অক্ষত অবস্থায় মুক্ত হয়ে ফিরে আসবেন এই শঙ্কা মনে। এই নিয়ে এদেশের মুজিবভক্ত লক্ষ কোটি জনতা নির্ঘুম প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে আছে। শামসুর রাহমান তাঁর লেখা ‘একটি পাখি’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ইঙ্গিত করে পাখির প্রতীকে অনবদ্য একটি কবিতা লিখেছেন। প্রাসঙ্গিক ভেবে সম্পূর্ণ কবিতা পাঠ করা যেতে পারে। যেমন :

‘বহু দূরের পথ পেরিয়ে, বন পেরিয়ে

এই শহরে আসবে উড়ে

একটি পাখি ভাল।

তার দুচোখে মায়াপুরীর ছায়া আছে,

দূর পাতালের স্বপ্ন আছে.

আছে তারার আলো।

সেই পাখিটা এই শহরে আসবে বলে

পথের ধারে ভিড় জমেছে,

সবাই তাকায় দূরে।

চোখগুলো সব আকাশ পাড়ে বেড়ায় সেই-

মস্ত রঙিন পাখা নেড়ে

আসবে পাখি উড়ে।

রাঙা ঠোঁটের সেই পাখিটা ঝড়ে-কাঁপা

আকাশ ছেড়ে নামবে পথে,

সবাই নেবে পিছু।

সেই পাখিটা স্বর্গপথের নানান গানে

শহরটাকে করবে মধুর,

বলবে খবর কিছু।

কিন্তু কোথায় সেই পাখিটা? এই শহরে

বাজল না তার পাখা দুটি।

আকাশ করে ধু-ধু।

শহরবাসী ক্লান্ত হয়ে ফিরল ঘরে,

সবাই ঘুমে সেই পাখিটার

স্বপ্ন দেখে শুধু।’

‘ধন্য সেই পুরুষ’ শীর্ষক কবিতায় শামসুর রাহমান এমন একজন পুরুষকে কাব্যভাষায় নির্দেশ করেছেন, তিনি বঙ্গবন্ধু। এই বাংলার নৈসর্গিক আবহ থেকে শামসুর রাহমান নানা আলঙ্কারিক ভাষা-সৌকর্যে বঙ্গবন্ধুকে এঁকেছেন। এমন পুরুষ একটা জাতির ভাগ্যে সবসময় আসে না। বঙ্গবন্ধু বাঙালি-অন্তপ্রাণ নেতা ছিলেন। তাঁর আবির্ভাব মানেই যাবতীয় অন্ধকারের অবসান। মানুষে মানুষে ভালোবাসার জয়গান। বঙ্গবন্ধু এমনই একজন, যিনি নদী সাঁতরে পানি থেকে উঠে আসেন। যিনি নীল পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসেন রঙবেরঙের পাখি ওড়াতে ওড়াতে। যেমন :

‘ধন্য সেই পুরুষ, নদী সাঁতরে পানি থেকে যে উঠে আসে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে;

ধন্য সেই পুরুষ, নীল পাহাড়ের চূড়া থেকে যে নেমে আসে

প্রজাপতিময় সবুজ গালিচার মতো উপত্যকায়;

ধন্য সেই পুরুষ, হৈমন্তিক বিল থেকে সে উঠে আসে

রঙ-বেরঙের পাখি ওড়াতে ওড়াতে।

…                         …                         …

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর রৌদ্র ঝরে

চিরকাল, গান হয়ে

নেমে আসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা; যাঁর নামের ওপর

কখনো ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া,

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর পাখা মেলে দেয় জ্যোৎস্নার সারস,

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর পতাকার মতো

দুলতে থাকে স্বাধীনতা,

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর ঝরে

মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।

বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর শোকে মূহ্যমান হয়ে শামসুর রাহমান লিখেছেন অনবদ্য কবিতা :

‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?

তেমন যোগ্য সমাধি কই?

মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো

অথবা সুনীল-সাগর-জল-

সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই!

তাইতো রাখি না এ লাশ আজ

মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে,

হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই।’

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর দীর্ঘসময় সামরিক সরকারের অধীনে চলে যায় দেশ। সেসময় নানা মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে গোপন রাখার হীন প্রয়াস চালায় তৎকালীন সরকার। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করা শুরু করে। শিল্পসাহিত্যেও তখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখালেখি করাটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শামসুর রাহমান তাঁর লেখা ‘ইলেক্ট্রার গান’ শীর্ষক কবিতায় গ্রিক পুরাণের ‘আগামেমনন’ চরিত্রের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে স্থাপন করে অন্তর্গত দুঃখবোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। যেমন :

‘নিহত জনক, আগামেমনন, কবরে শায়িত আজ

আড়ালে বিলাপ করি একা একা, ক্ষুধার্ত পিতা

তোমার জন্যে প্রকাশ্যে শোক কারাটাও অপরাধ।

এমন কি হায়, আমার সকল স্বপ্নেও তুমি

নিষিদ্ধ আজ; তোমার দুহিতা একি গুরুভার বয়!’

মুক্তিযুদ্ধের সময় শামসুর রাহমানের লেখা কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জুুগিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকেন্দ্রিক অসংখ্য কবিতায় শামসুর রাহমানের যে অভিব্যক্তি আভাসিত হয়েছে, এতে একজন দেশপ্রেমিক কবি’র পরিচয় মেলে। কবি রফিক আজাদ বলেন :

‘আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি তাদের হাতে ছিল অস্ত্র। অস্ত্র হাতে নেওয়ার জন্য নিশ্চয়ই অনুপ্রাণিত করেছিল একটি শক্তি। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে যদি বলি যুদ্ধ ময়দানেও কিছু কিছু বিষয় আমাদের সাহস জুগিয়েছিল। হ্যাঁ, সেই সাহস অনুপ্রেরণার অন্যতম ছিল শামসুর রাহমানের কবিতা।’

(মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণা / রফিক আজাদ)

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় শামসুর রাহমানের ‘বন্দি শিবির থেকে’ (১৯৭২) কাব্যগ্রন্থটি এক অনন্য দলিল। গ্রন্থটির উৎসর্গপত্রে লেখা- ‘একাত্তরের শহীদদের প্রতি, যাঁদের আত্মদান অব্যর্থ; যাঁরা রক্তের অক্ষরে লিখেছিলেন অবিনাশী স্লোগান’। গ্রন্থভুক্ত কবিতার পঙক্তিতে মুক্তিযুদ্ধের নির্মমতা, নানা সংকট ও অসহায়তার চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশের দুর্দিনে একজন উৎকণ্ঠিত কবির আর্তচিৎকার ধ্বনিত হয়েছে। কবি’র ব্যথিত চিত্তের প্রকাশ কবিভক্তদেরও প্রভাবিত করে। দেশমাতার বিভীষিকাময় অবস্থার মর্মন্তুদ বিবরণ কাব্যভাষায় মন ছুঁয়ে যায়, বেদনায় ভিজে ওঠে চোখ। কাব্যগ্রন্থের শুরুতে ‘পূর্বলেখ’-এ শামসুর রাহমান লিখেছেন :

‘শ্রদ্ধেয় আবু সয়ীদ আইয়ুব ও তাঁর সহধর্মিণী গৌরী আইয়ুবের উৎসাহ ও উদ্যোগে ‘বন্দি শিবির

থেকে’ প্রথম প্রকাশিত হয় কলকাতায়, ১৯৭২ এর জানুয়ারি মাসে। এ-বইয়ের কোনো কোনো কবিতা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় মজলুম আদিব ছদ্মনামে বেরিয়েছিল। এই নামটি রেখেছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুব। মজলুম আদিব-এর অর্থ হচ্ছে নির্যাতিত লেখক। বইটি তাড়াহুড়ো করে ছাপা হয়েছিল বলে তখন সে-সময়কার অনেক কবিতাই গ্রন্থভুক্ত হতে পারেনি। বাংলাদেশের সংস্করণে সেগুলো সন্নিবেশিত হলো।’

রাহমানের এই উদ্ধৃতি যুদ্ধকালীন দুঃসময়ে অসহায়ত্বের অবয়বকে হাজির করে। একজন কবি জীবননাশের আশঙ্কায় পড়ে ছদ্মনামে কবিতা ছাপতে বাধ্য হন। যুদ্ধকালীন গ্রাম ও শহরের ভয়াবহতার বীভৎস দৃশ্য ধৃত হয়েছে ‘তুমি বলেছিলে’ এবং ‘কাক’ শীর্ষক কবিতায়।

‘দাউদাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐ নয়াবাজার।

পুড়ছে দোকানপাঠ, কাঠ,

লোহা লক্কড়ের স্তূপ, মসজিদ এবং মন্দির।

দাউদাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐ নয়াবাজার। ( তুমি বলেছিলে)

কিংবা,

‘গ্রাম্য পথে পদচিহ্ন নেই। গোঠে গোরু

নেই কোনো, রাখাল উধাও, রুক্ষ সরু

আল খাঁখাঁ, পথপার্শ্বে বৃক্ষেরা নির্বাক

নগ্ন রৌদ্র চতুর্দিকে, স্পন্দমান কাক, শুধু কাক।’ (কাক)

এ-কাব্যের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’, ‘বন্দি শিবির থেকে’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘না, আমি যাব না,’ ‘পথের কুকুর’, ‘গেরিলা’, ‘উদ্বাস্তু’সহ প্রভৃতি কবিতায় স্বাধীনতা লাভের উদগ্র বাসনা, পাকবাহিনীর অবর্ণনীয় জুলুম-নির্যাতন, জীবনের অনিশ্চয়তা ও উদ্বাস্তু জীবনযাপন, গেরিলা সেজে যুদ্ধ পরিচালনা, স্বাধীনতার স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ ইত্যাদির কাব্যময় প্রকাশ ঘটেছে। কেবল স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রত্যাশায় কত ত্যাগ, কত বিসর্জন, কত নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে, তার প্রমাণ স্বাধীনতাকে উদ্দেশ্য করে কবি’র পুনঃপুন প্রশ্নাকুল হওয়া। কবির প্রশ্ন :

‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,

তোমাকে পাওয়ার জন্যে

আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?

আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?

তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,

সকিনা বিবির কপাল ভাঙল,

সিঁথির সিঁদুর মুছে গল হরিদাসীর।’

অনুরূপভাবে, শহরের বুকে দানবের মতো জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক নামে, ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হয়। গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে হয় ছাই। প্রভুর বাস্তুভিটায় কুকুরের আর্তনাদ। পিতা-মাতার লাশের ওপর অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দেওয়ার মতো অনেক মর্মভেদী ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

শামসুর রাহমান আমৃত্যু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর কবিচৈতন্যে স্বাধীনতা ও স্বদেশের দায়বদ্ধতা ছিল। যার ফলে,স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নানা দুঃসময়েও স্বদেশের তরে তাঁর কবিকণ্ঠ উচ্চকিত হয়েছে । সামরিক সরকারের শাসনামল তথা স্বৈরাচারী, স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে শামসুর রাহমান প্রতিবাদী কবিতা লিখেছেন। দুঃসময়ের মুখোমুখি, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, শূন্যতায় তুমি শোকসভা, বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে, উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ, দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে-সহ বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থে এর প্রমাণ মেলে।

নব্বইয়ের স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনে নূর হোসেন শহীদ হন। স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী, ইঙ্গিতবাহী কবিতা ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’। অর্থাৎ যে গণতন্ত্রের জন্য একদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। সেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনে যখন নূর হোসেন বুকে গুলি বিদ্ধ হয়। তখন এই বুক বাংলাদেশের বুক। কবির ভাষায়:

‘উদোম শরীরে নেমে আসে রাজপথে, বুকে-পিঠে

রৌদ্রের অক্ষরে লেখা অনন্য স্লোগান,

বীরের মুদ্রায় হাঁটে মিছিলের পুরোভাগে এবং হঠাৎ

শহরে টহলদার ঝাঁক ঝাঁক বন্দুকের সীসা

নূর হোসেনের বুক নয়, যেন বাংলাদেশের হৃদয়

ফুটো করে দেয়; বাংলাদেশ

বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে, তার

বুক থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে থাকে, ঝরতে থাকে।’

কিংবা,

‘মনে হয় যেন সে উঠেছে জেগে সুদূর বিদেশে

যেখানে এখন কেউ কারো চেনা নয়, কেউ কারো

ভাষা ব্যবহার আদৌ বোঝে না; দেখে সে

উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,

হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।’ (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ)

মোদ্দা কথা, শামসুর রাহমানের কবিতায় এই বাংলার জলহাওয়া বিরাজমান। তাঁর কবিতা বাঙালি জাতির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সংগ্রামের কাব্যময় দলিল। যুগপৎ স্বাধীন ও পরাধীন মানুষের আর্তি আভাসিত হয়েছে তাঁর কবিতা। কবির ব্যক্তিগত দুঃখবোধ ক্রমশ সামষ্টিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। ভাষার প্রতি নিবিড় ভালোবাসা এবং দেশের প্রতি অন্তরঙ্গ দায়বদ্ধতা থেকেই শামসুর রাহমান আমৃত্যু কবিতা লিখেছেন। সমকালীন নানা ঘাতপ্রতিঘাত, বৈরী পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর কবিতা কখনও কখনও স্লোগানের আঙ্গিক পেয়েছে। তবুও দিনশেষে মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতার হৃদয় নিংড়ানো কবিতা মানেই শামসুর রাহমানের কবিতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares