ধারাবাহিক জীবনকথা : যে জীবন আমার ছিল : ইমদাদুল হক মিলন

দ্বিতীয় পর্ব

বরবাড়ির দিকে নতুন পুকুর। আলমগিরমামার সঙ্গে সেই দিকটায় খেলতে গেছি। মামু আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। কিছু করিনি। তাও ধাক্কাটা দিল। গায়ে শক্তি বেশি। আমি ওর সঙ্গে পারি না। এমনিতে খুব ভাব দুজনে। সে আমাকে মামু ডাকে, আমি তাকে মামু ডাকি। মামু দেখতে ভারি সুন্দর। নানার গায়ের রং পেয়েছে। শক্তিও পেয়েছে। আমার বয়সি। তবে আমার চেয়ে একটু লম্বা। ধাক্কা খেয়ে মনটা এত খারাপ হলো। বাড়ি চলে এলাম। না ওর সঙ্গে আর খেলব না। রাগটা মনের ভিতর রয়ে গেল। তিনচার দিন ওর সঙ্গে আর মিশি না। কথা বলি না। খেলতে যাই হাফিজদ্দি আর রবের সঙ্গে।

নানা নতুন একটা শার্ট কিনে দিয়েছেন আলমগিরকে। সেই শার্ট গায়ে দিয়ে আমাকে খুঁজতে খুঁজতে এলো। দুপুরের পর আমি বাগানের দিকে একা একা ঘুরছি। মামু এসে আমার কাঁধে হাত দিল। ‘ল মামু, খেলতে যাই।’

আমার মনে ধাক্কা খাওয়ার রাগ। তার ওপর মামুর পরনে নতুন শার্ট। ভারি একটা ঈর্ষাও হলো ওই নিয়ে। প্রথমে যেতে চাইনি। সে আমাকে পটিয়ে পাটিয়ে নিয়ে গেল। আবার সেই নতুন পুকুরের কাছে। বাড়ি থেকে নামার পর একটুকরো সবুজ ঘাসের মাঠ। তারপর নতুন পুকুর। ছোট্ট পুকুর। পানিটা ভারি স্বচ্ছ। খরালিকালে আমরা এই পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি করি। বড় পুকুরে নামি না শিকলের ভয়ে। এই পুকুরটায় ভয়ের কিছু নেই। অনায়াসে আমরা এপার ওপার করি।

আলমগিরের বড় জাহাঙ্গির। ওই বয়সেই ওরা খুব পাকনা। চওড়া এক মহিলা থাকত ওদের ঘরে। আমাদের বয়সি একটা মেয়ে ছিল মহিলার। সফুরা নাম। চরের ভাষার সঙ্গে আমাদের ভাষা মেলে না। ভোরবেলা শুনতাম মহিলা তার মেয়ের ঘুম ভাঙাচ্ছে। ‘ও সফুরা! গা তোল, গা তোল!’ সফুরাকে দেখলেই আমরা ‘ও সফুরা! গা তোল, গা তোল’ বলে চেতাতাম।

এই মেয়েটা গোসল করতে গেছে নতুন পুকুরে। জাহাঙ্গির মামার সঙ্গে আমিও গেছি। আমি তখনও পুকুরে নামিনি। সফুরা আর জাহাঙ্গিরমামা নেমেছে। বাড়ির ছেলেরা সেদিন ধারে কাছে নেই। কে কোথায় আছে কে জানে! কিছুক্ষণ পর হয়তো নাইতে আসবে। জাহাঙ্গির মামাকে দেখি কিছুক্ষণ পর পরই সফুরাকে জড়িয়ে ধরছে। কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে কিছু একটা করার চেষ্টা করছে। মেয়েটি বাঁধা দিচ্ছে না। যেন সেও মজার একটা খেলা খেলছে। আমাকে বুঝ দেওয়ার জন্য জাহাঙ্গির মামা বেশ কয়েকবার বলল, ‘আমরা খেলতাছি মিলু, বুজলি? কী রে সফুরা, খেলতাছি না?’

সফুরাও হুঁ হুঁ করে।

কথাটা আমি কাউকে বলিনি। একটু বড় হয়ে বুঝেছিলাম কাণ্ডটা কী করছিল জাহাঙ্গির মামা।

নতুন পুকুরের ধারে এসে নতুন শার্ট সেই বিকেলে খুলে রাখল আলমগির। আমরা দুজন ছুটোছুটি করছি। এদিক ওদিক দৌড়ে যাচ্ছি। কোনো খেলা না, আবার খেলাও। আমার মনে ধাক্কার জ্বলুনিটা আছে। মামু নতুন শার্ট পরেছে সেই ঈর্ষাও আছে। কিছুক্ষণ পর মেজোনানা বাড়ি থেকে ডাকলেন, ‘আইলম্মা, ওই আলইম্মা।’ শার্টের কথা ভুলে বাড়ির দিকে দৌড় দিল মামু। আমি দাঁড়িয়েই আছি।

এসময় প্রতিশোধের ইচ্ছাটা হলো। কী করেছিলাম আমি? কেন আলমগির আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল?

চৈত্রমাস। চষা জমিতে বড় বড় মাটির চাকা। দুয়েক দিনের মধ্যে ইটামুগুর দিয়ে ভাঙা শুরু হবে। দুতিনটা চাকা শার্টটার সঙ্গে প্যাঁচিয়ে নতুন পুকুরে ফেলে দিলাম। নির্বিকার ভঙ্গিতে বাড়ি ফিরে এলাম। যেন পৃথিবীর কিছুই আমি জানি না।

নানা বোধহয় কোনো কারণে আলমগিরকে বকাঝকা করেছিলেন। বকা খেয়ে দিশেহারা আলমগির। পুকুরপাড়ে শার্ট ফেলে এসেছে, ভুলেই গেল। পরদিন দেখি তার মুখটা শুকনা। আমাকে বলল, মামু আমার শার্টটা দেখছস? নতুন শার্টটা পাই না।’

আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। ‘কচ কী? ওদিন না পরলি? হেই শাট গেল কই?’

‘বোজতাছি না। বাবায় জানলে মাইরা হাগায় হালাইবো (হাগিয়ে ফেলবে)।’

মনে মনে বললাম, ‘আমি সেটাই চাই।’

মারটা আলমগির খেল তারও দুদিন পর। বাড়িতে জানাজানি হয়ে গেছে সে নতুন শার্ট হারিয়ে ফেলেছে। ঘর থেকে ঘেঁটি ধরে তাকে উঠানে নিয়ে এলেন নানা। তাঁর প্রিয়গাল ছিল ‘বউয়ার পো’। অর্থাৎ বউয়ের ছেলে। অবিরাম সেই গাল দিচ্ছেন আর গরু চড়াবার লাঠি দিয়ে পিট্টি। ‘এত বাদাইরা হইছ তুমি, বউয়ার পো? নতুন শার্ট হারাইয়া ফালাও।’

একেকটা বাড়ির সঙ্গে একেকটা ত্রাহি ডাক আলমগিরের। ‘বাবা রে গেছি রে, গেছি রে।’

উত্তর দিককার ছনছায় (সানসেট) দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছি আমি আর ভিতরে ভিতরে আনন্দে ফেটে যাচ্ছি। আমাকে ধাক্কা দেওয়ার প্রতিশোধ অন্যভাবে নিচ্ছি।

এই ঘটনা লিখেছিলাম এসেছিলে উপন্যাসে। এসেছিলেতে সেলিম গুণ্ডার কথাও ছিল। আব্বাকে অপমান করার পর থেকে কল্পনায় কতবার আমি সেলিম গুণ্ডার উপর প্রতিশোধ নিয়েছি। এসেছিলের নায়ক বাস্তবে নিয়েছিল সেই প্রতিশোধ।

গেণ্ডারিয়ার সেলিম গুণ্ডার কথা আছে একাত্তর ও একজন মা উপন্যাসে। আহা রে, কত বেদনায় জড়ানো আমার এই উপন্যাস।

বারবাড়ি থেকে সোজা উত্তরের বাড়িটি দারোগা বাড়ি। ইব্রাহিম না কী যেন নাম দারোগা সাহেবের। সেই লোককে আমরা কখনও দেখিনি। তার নামও কারও মুখে শুনতাম না। দারোগাবাড়ি নামেই বাড়ির নাম। আরেক দারোগাবাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির কয়েকটা বাড়ির পর, দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে। সেই বাড়ি আমার মায়ের ফুফাতো ভাইয়ের। দারোগার নাম আদিলউদ্দিন দারোগা। ডাকনাম ‘রঙ্গু’। আমরা ডাকতাম ‘দারোগা মামা’। উঁচু লম্বা বিশালদেহী মানুষ। গায়ের রং ঝিমকালো। গমগমা গলায় কথা বলতেন। তাঁর ছোটভাই দলিল মামা। তাঁর একটা চোখ নষ্ট ছিল। মাতব্বর মানুষ। গ্রামের লোকে ডাকে ‘দলিল মাতবর’। প্রচুর ক্ষেতখোলা ছিল তাঁর। ওই নিয়েই থাকতেন। পাড়ার সবাই কোনো না কোনোভাবে আত্মীয়স্বজন। বিচার সালিশে দলিল মামার বড় ভূমিকা থাকত। আর থাকত মন্নাফ মামার। মন্নাফ হাওলাদার। তিনিও মায়ের আরেক ফুফাতো ভাই।

বারবাড়ি থেকে নামলেই সবুজ একটুখানি মাঠ। তারপর বড় বড় কয়েকটা জমি। তারপর পুবে পশ্চিমে চলে গেছে একটা হালট। হালটের উত্তর পাশে সারধরা কয়েকটা বাড়ি। দারোগা বাড়ির উত্তর পুবকোনার বাড়িটা বারেক সারেঙের বাড়ি। তিনি রঙ্গু দারোগা আর দলিল মাতবরের বোনজামাই। তাঁর ছেলে রাজ্জাককে আমরা ডাকি ‘রাজ্জাদা’। লম্বা স্বাস্থ্যবান যুবক। খুবই আমুদে থাকা মানুষ। কথা বলতেন উচ্চস্বরে। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান আর্মিতে যোগ দেন। একাত্তরে পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলেন

বর্ষাকালের এক বিকেলে দেখি বারবাড়ির ওদিকে হারমোনিয়াম বাজছে। অতি হেঁড়ে গলায় হারমোনিয়ামের সঙ্গে গানও গাইছে একটি পুরুষকণ্ঠ। বাড়ির মহিলাদের সঙ্গে ‘পোলাপান’রাও ছুটে গেছে। দেখি একটা কোষানাওয়ে বসে হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন রাজ্জাকদা। গানও গাইছেন। কী গান মনে নেই। তবে হারমোনিয়াম বাজছে এক সুরে আর গান হচ্ছে অন্য সুরে। বাড়ির মহিলারা হাসাহাসি শুরু করল। কোষানাও বাইছিল কামলা মতন একজন লোক। সেও দেখি হাসে।

বুজি হাসতে হাসতে বললেন, ‘ওই রেজজেইকা, তুই কচ কী আর তর দোতারায় কয় কী!’ গান থামিয়ে রাজ্জাকদাও দেখি খ্যা খ্যা করে হাসে!

রাজ্জাকদাদের বাড়ির উত্তর শরিকের ঘরে আমার বয়সি একটা ছেলে। নাম নীলু। সবাই নীলা নীলা ডাকে। মেয়েদের নাম। তাতে নীলার কিছুই যায় আসে না। ফর্সা সুন্দর চেহারা। আলমগির মামার মতো লম্বা। নীলার সঙ্গে আমার কেমন করে বন্ধুত্ব হলো। আমি স্কুলে যাই না। নীলা খাইগোবাড়ির (খানবাড়ি) প্রাইমারি স্কুলে যায়। নীলার বড়ভাই ঢাকায় থেকে নাইট কলেজে পড়েন। চাকরিও করেন। নীলা তার ভাইয়ের খুব গল্প করত। একবার সেই ভাইকে আমি দেখেছিলাম। অহঙ্কারী ধরনের মানুষ। নীলার মা আমাকে খুুবই আদর করতেন। বড়ছেলেকে বললেন, ‘মেন্দাবাড়ির আনোরার পোলা মিলু। নীলার লগে দুস্তি পাতাইছে।’ সেই ভাই আমার দিকে ফিরেও তাকালেন না। পাত্তাও দিলেন না। তখন শীতকাল। ওই এলাকায় শীতের পিঠা হয় নানা রকমের। বিবিখানা, ভাঁপা। দুধকুলইচা (মালপোয়া), পাটিশাপটা। সিদ্ধকুলই পিঠাটা অর্ধেক চাঁদের মতো। বাচ্চা ছেলের বিঘত পরিমাণ সাইজ। ভিতরে নাড়কেল বা ক্ষিরসা দিতে হয়। চাউলের গুঁড়ি সিদ্ধ করে, আটার দলা বানিয়ে ছোট ছোট রুটি বানিয়ে তার ভিতর নাড়কেল বা ক্ষিরসা দিয়ে ভাঁপা পিঠার কায়দায় ভাঁপ দিতে হয়। চিতইপিঠা আর খাঁজের পিঠা দুধে ভিজিয়েও করা যায়, খেজুরের রসে ভিজিয়েও করা যায়। রসের পিঠায় গুড় লাগে না। রস নিজেই গুড় হয়। দুধে ভিজানো পিঠায় গুড় দিতে হয়। এসব খুবই পরিচিত পিঠা। আরেকটা পিঠার নাম ছিল ‘সেউই কুলুই’। সেউই মানে বাচ্চাদের কাইয়া আঙ্গুলের (কড়ে আঙুল) সাইজের এক ধরনের সেমাই। চাউলের আটা দিয়ে বানাতে হয়। আর কুলুইটা হচ্ছে ওই সিদ্ধ কুলুইয়ের ক্ষুদে সংস্করণ। রস কিংবা দুধের হাঁড়িতে এই পিঠা জ্বাল দিতে হয়। বনেদিপিঠা। সেই সকালে নীলার মা আমাকে সেউই কুলুই পিঠা খেতে দিলেন। অনেকখানি পিঠা। রেকাবি ভরা। নীলার বড়ভাইয়ের অহঙ্কারী মুখ দেখে পিঠাটা পেটভরে আমি খেতেই পারলাম না।

সেই বয়সে নীলা আমাকে একটা ঘটনা বলেছিল। তখনও মানুষের জন্ম রহস্য আমি বুঝি না। নীলা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল। পাশের বাড়ির এক মহিলার বাচ্চা হওয়ার সময় সে নাকি টিনের বেড়ার ফুটো দিয়ে দেখেছিল। বাচ্চাটার মাথা একটু বেরিয়েছে। ধরনী আলার মা দুহাতে টেনে টেনে সেই বাচ্চা বের করছে। শুনে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

ধরনী আলার মায়ের কথা আছে আমার অনেক লেখায়। নূরজাহান উপন্যাসের বেশ বড় এক চরিত্র আলার মা। তিনি আমার দূর সম্পর্কের নানি। তাঁর ছেলেদের নাম আলাউদ্দিন, তোতা। আমরা ডাকতাম আলামামা, তোতামামা। নোয়াব আলি নানার মূলবাড়ি, মানে পুরানবাড়ির দক্ষিণপুব কোণের শরিক তোতামামারা। তাদের অংশে একটা তালগাছ ছিল। বিশাল উঁচুগাছ। বহুদূর থেকে দেখা যেত। সেই গাছ ভর্তি বাবুই পাখির বাসা। সারাদিন পাখিগুলো কিচির মিচির করছে। বাসায় ঢুকছে, বেরুচ্ছে। ছানারা চিঁ চিঁ করছে। বাসা বাঁধার সময়ে যত্ন করে ধানপাতা কাঁশপাতা ছিঁড়ে এনে নিপুণ শিল্পীর ভঙ্গিতে বাসা তৈরি করছে।

নূরজাহান লেখার সময় হঠাৎ আমার একদিন মনে হলো পূর্ণ গর্ভবতী নারী দেহের সঙ্গে বাবুই পাখির বাসার যেন আশ্চর্য রকমের মিল আছে। বাবুইছানা আর মানবশিশুও যেন একই রকম। মায়ের গর্ভ থেকে বেরিয়ে দিনে দিনে পূর্ণতা পায় তারা। তারপর একদিন নিজেই আকাশে উড়াল দেয়।

নূরজাহান একটানা আমি লিখতে পারিনি। তিরানব্বই সালে শুরু করেছিলাম। সাড়ে বারোশো পৃষ্ঠার উপন্যাসটি লিখতে আঠারো বছর লেগেছিল। তিনপর্বের উপন্যাস। তাও টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন ঈদসংখ্যায় লিখেছি। দ্বিতীয় পর্বের অনেকখানি ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলাম ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’ পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। ‘জনকণ্ঠ’ সম্পাদক আতিকুল্লাহ খান মাসুদ মেদিনীমণ্ডলের খানবাড়ির ছেলে। বীর মুক্তিযোদ্ধা। এখন ভাবতে খুব ভালো লাগে, একই গ্রামের আমরা দুজন দুটো বিশাল জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক। ‘জনকণ্ঠ’ আর ‘কালের কণ্ঠ’। বাংলাদেশে এ এক বিরল দৃষ্টান্ত।

নূরজাহান উপন্যাস এই গ্রামের পটভূমিতে। ‘অন্যদিন’ পত্রিকার ঈদসংখ্যায় নূরজাহান এর একটা অংশ লিখেছিলাম। ধরনী আলার মার অংশ। নাম দিয়েছিলাম ‘বাবুই পাখির জীবন’। পড়ে আমাদের ধ্রুব এষের নাকি ঘোর লেগে গিয়েছিল। ধ্রুব অবশ্য আমাকে একটু বেশিই ভালোবাসে। আমার ব্যাপারে একটু বেশিই দুর্বল।

 শৈশবের শুরুর কাল। ইব্রাহিম দারোগার বাড়িতে বড় একটা টিনের ঘর। ঘরটা বাড়িতে ঢোকার মুখে। বাড়ির পিছন দিকে বিশাল উঠোন। পরিষ্কার উঠোন ছাড়িয়ে অনেকগুলো আমগাছ। পুকুরের দিকে হিজল বউন্নাগাছ। বড় একটা বাঁশঝাড়ও আছে। দারোগাদের কেউ এই বাড়িতে থাকত না। থাকত পারুরা। বোধহয় দারোগার লতায় পাতায় গরিব আত্মীয়। বোধহয় আমাদেরও তাই হবে।

বর্ষায় চকেমাঠে আটদশ হাত পানি হতো। বাড়িগুলো মাঠ থেকে অনেকটা উঁচুতে। নিম্নাঞ্চল বলে বাড়ি বানাতে হতো পুকুর কেটে। কাটা মাটিতে বাড়ির ভিত হতো। সেই ভিতের ওপর ঘর। এক কাজে দুই কাজ। পুকুরও হলো, বাড়িও হলো। এজন্য এলাকার প্রত্যেক বাড়ির সঙ্গে একটা দুটো পুকুর। বর্ষাকালে বাড়িগুলো হয়ে যায় বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। বাড়ির নারী শিশুরা বাড়িবন্দি। বাড়ির চৌহদ্দির ভিতরই কাটে তাদের দিন রাত্রি। কোনো কোনো বিকেলে এদিক ওদিককার আত্মীয় বাড়িতে একটু যাওয়া আসা।

ও রকম এক বিকেলে দারোগাবাড়িতে গেছি। পারু কিশোরী মেয়ে। হতদরিদ্র। ওদের পরিবার এই বাড়িতে আশ্রিত। আমাকে খুবই আদর করত পারু। হাত ধরে নিয়ে গেল তাদের উঠোনে। সেখানে অনেকগুলো মুরগি নিজেদের মতো চলাফেরা করছে। বড় সাইজের একটা মোরগ আছে। সেটা সর্দার। যেন অন্যগুলোকে কঠিন শাসনে রেখেছে। রাজার মতো ভাব তার। পারুর সঙ্গে আমি এদিক ওদিক হাঁটছি। হঠাৎ মোরগটা ছুটে এসে আমার পায়ের পাতায় একটা ঠোকর দিল। ভালোই ব্যথা পেলাম, তারচে’ হতভম্ব হলাম বেশি। সাধারণত ‘উমা’ (ডিমে তা দিতে বসা) মুরগির কাছে গেলে ঠোকর খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চড়ে বেড়ানো মোরগ মুরগি এভাবে ঠোকর দেয়?

পারু রেগে গিয়ে মোরগটাকে বিরাট দৌড়ানি দিল।

পারু একসময় বুজির কাছে চলে এসেছিল। কিশোরী থেকে ধীরে ধীরে যুবতী হচ্ছে। দারোগাবাড়ি থেকে ওদের পরিবার বিতাড়িত। সেই বাড়িতে এসে থান গেড়েছে দারোগার নিকট আত্মীয় খালেক নায়েব। পারুদের পরিবার চলে এসেছে লতিফ খাঁদের বাড়ির দক্ষিণ পুবকোণে। এই বাড়িটা ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের মতো। দক্ষিণপূর্ব দিকটার মাঝামাঝি একচিলতে উঠোন আর একটা দরিদ্র ঘর পারুদের। মা, বাবা আর বড়বোনটা থাকে। তার পিছনের অংশ আমিন মুন্সি সাহেবের।

মুন্সি সাহেব অতি অমায়িক লোক। বেশ ভুঁড়ি আছে তাঁর। ভুঁড়ির কাছে ছাই রঙের পাঞ্জাবি টাইট হয়ে থাকতো। মাথায় সারাক্ষণ টুপি। লুঙ্গি পরে হাট বাজারে যাচ্ছেন  ‘মুন্সিসাব’। তাঁর ছেলে সালাম রউফ মামাদের বয়সি। কাজির পাগলা স্কুলে পড়ে। নিরীহ চুপচাপ ধরনের ছেলে। পড়াশোনায় খুবই মনোযোগী। এক দুপুরে নিজেদের ঘরের জানালার ধারে বসে অতি মনোযোগ দিয়ে অঙ্ক করতে দেখেছিলাম তাকে। পারুর বড়বোনটার বিয়ে হচ্ছিল তখন। দুতিনদিন ধরে সেই বাড়িতে আমাদের আসা যাওয়া। পারুর হতদরিদ্র বাবা লোকজন আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেছে।

আমিন মুন্সি সম্পর্কে গ্রামে একটা কথা চালু ছিল। এতই কামেলদার মানুষ তিনি, প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ে কোরআন শরিফ পড়তে বসেন আর কোরআন শরিফের ভিতরে পান পাঁচ টাকার একখানা নোট। তখনকার দিনে পাঁচ টাকা মানে বিরাট ব্যাপার। ষাটের দশক মাত্র শুরু হয়েছে।

পাঁচ টাকার কাহিনি আরও জোরালো হলো যখন নিজের টাকায়, বাড়ির দক্ষিণ পাশের জমিতে তিনি একটা বড়সড় মাদ্রাসা ঘর তৈরি করতে লাগলেন। এই গ্রামের প্রথম মাদ্রাসা।

আরেক কামেলদার মানুষের কথা শুনতাম আমরা। তাঁর নাম কদম ফকির। লোকে বলত ‘কদমা পাগলা’। একবার তাঁকে দেখেওছিলাম। রোদেপোড়া খালিগায়ের একজন মানুষ। নিতান্তই সাধারণ। সারা শরীর খালি। নিম্নাঙ্গে একটুকরো কাপড় নেংটির মতো পরা। গ্রামে ‘কদমা পাগলা’ এসেছে শুনে বহু মানুষ জুটেছে পিছনে। তাঁর নিজস্ব কিছু মানুষও সঙ্গে ছিল। সব বাড়িতে তিনি উঠতেন না। কী মনে করে যেন আমাদের বাড়িতে উঠলেন। নানা আর টগরমামার কবরের কাছটায় কয়েকটা ‘বিচ্চাকলা’র (বিচিকলা) গাছ সেইসব গাছ থেকে অবিরাম কলাপাতা ছিঁড়তে লাগলেন। টান দিয়ে দিয়ে কলাপাতা ছিঁড়ে কাগজের মতন কুটিকুটি করেন। আমি বিস্মিত চোখে মানুষটাকে দেখছি। চোখে সুদূরের দৃষ্টি। যেন এই জগতে থেকেও তিনি আসলে জগৎটায় নেই। তাঁর চোখ যেন অন্য জগতে। কোনো অচিনলোকের সন্ধান যেন তাঁর দৃষ্টিতে। আনমনা ভাবুক মুখখানি যেন অলীক কোনো জগতের চিন্তায় মগ্ন।

‘কদমা পাগলা’র সঙ্গে আমিন মুন্সিকে নিয়ে একটা গল্প আছে। মুন্সিসাব গেছেন দিঘলীর হাটে। ফিরতে রাত হয়ে গেছে। অমাবশ্যার রাত। অন্ধকারে পথ ঠাওর করতে পারছেন না। মাইল পাঁচেক দূরের পথ পাড়ি দিতে হবে চকের উপর দিয়ে। হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ালেন এক মানুষ। ‘কী মুন্সি? খবর কী’?

গলা শুনেই মুন্সিসাব চিনলেন, ‘কদমা পাগলা’। পাঁচ মাইল দূরের বাড়িতে ফিরবেন। অমাবশ্যার রাত ইত্যাদি বললেন তিনি। শুনে পাগল বললেন, ‘চোখ বোজ। চোখ বোজ। আমি বললে খুলবি।’

মুন্সিসাব চোখ বুজলেন। কয়েক মুহূর্ত মাত্র। পাগল বললেন, ‘এইবার চোখ খোল।’ মুন্সিসাব চোখ খুলে দেখেন বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছেন।

পারুরা দুবোনই দেখতে ভালো ছিল না। কালো, চেহারা খারাপ। পারু একটু আছে, চলে, বড়টা একদমই ভালো না। তাও বিয়ে হচ্ছে। তিনদিন ধরে বিয়ের আয়োজন চলছে। খাওয়া দাওয়া আমোদ আল্লাদ চলছে। পারুর আনন্দের সীমা নেই। বোনটা গায়ে হলুদ মেখে ঘরে বসে আছে। আমাকে নিয়ে বুজি গেছেন সেই বাড়িতে। দুপুরের দিকে ভাতের একহাঁড়ি চাল ধুতে ঘাটে গেছে পারু। অর্ধেক চাল পুকুরে পড়ে গেল। বুজি বেদম বকা দিলেন পারুকে। ‘তুই বেশি ফরফরাস পারি! গরিব মাইনষের মাইয়ার এত ফরফরানি ভালো না।’ পারু অপরাধী ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে রইল।

সন্ধ্যার দিকে বরযাত্রী এলো। পারুদের মতোই কয়েকজন মানুষ। জামাইটা আলফুর মতো। তারা পালকি আনতে পারেনি। সঙ্গে একটা হ্যাজাগ বাতি আছে। ওই বাতির আলোয় বউ নিয়ে হেঁটে যাবে শ্রীনগরের দিককার গ্রাম গাদিঘাটে। তাদের হ্যাজাগ এখন পারুদের ছোট্ট উঠোনে শো শো করে জ্বলছে। কন্যাবিদায়ের আগে বর কনেকে বড় একটা পিঁড়িতে দাঁড় করাতে হয়। কোত্থেকে একটা পিঁড়ি জোগাড় করা হয়েছে। লুঙ্গি পাঞ্জাবি পরা বরের মাথায় টুপি। বিয়ে উপলক্ষে খেরি (ক্ষৌরকর্ম, চুল ছাঁটানো) করিয়েছে। মুখও বানিয়েছে। অর্থাৎ সেভ করেছে। অদ্ভুত লাগছে দেখতে। পারুর বোনের পরনে অতিসস্তা লালশাড়ি। প্রথমে বর দাঁড়ালো পিঁড়িতে। এবার তার পাশে দাঁড়াবে কনে। বাড়ির দুই মহিলা মেয়েটাকে পিঁড়ির কাছে নিয়ে গেল। পিঁড়িতে পা রাখতে গিয়ে সে হোঁচট খেল। পড়ে যেতে যেতে বরকে আঁকড়ে ধরলো। এই দেখে বাড়ির বউঝিরা হাসির রোল তুলল। ফাজিল টাইপের একটা বউ আস্তে করে বলল, ‘তর ধরতে হইব না। রাইত্রে তরেই ধরবো নে।’

আমাদের বাড়িতে থাকার সময় পারু একটা বিড়াল হত্যা করল।

তার আগে চোখের সামনে একদিন একটা বীভৎস কাণ্ড দেখলাম। দুপুরের মুখে মুখে। খরালিকাল। চৈত্রমাস হবে। ইব্রাহিম দারোগার যে ঘরটায় পারুরা থাকত সেই ঘরে এখন থাকে খালেক নায়েব। হালটের দক্ষিণ পাশটার এক জমিতে কাজ করছিলেন তিনি। আমি গিয়ে দাঁড়িয়েছি বারবাড়ির সামনে। হঠাৎ চার পাঁচজন লোক দৌড়ে এলো পুবদিক থেকে। পুবদিকে মোতাহারদের বাড়ি। বাড়ির দক্ষিণে বড় পুকুর। পুকুরের দক্ষিণে লতিফ খাঁদের বাড়ি। পুবে কার বাড়ি জানি না। মুকসেদ চোরকে গ্রামের সবাই বলে ‘মুকসেইদ্দা চোরা’। পুলিশের হাতে ধরা পড়লে পুলিশ যখন তাদের চকচকে কাঠের রুলটা দিয়ে প্রথম বাড়িটা দিত, মুকসেইদ্দা নাকি ‘বিসমিল্লাহ’ বলতো। ওই দিকটায় বোধহয় মুকসেদের বাড়ি। লোকগুলো দৌড়ে এলো ওদিক থেকে। তাদের হাতে লাঠিসোটা আর চকচকে দা। খালেক নায়েবকে মারতে লাগল, দা দিয়ে অবিরাম কোপাতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে হৈ চৈ পড়ে গেল গ্রামে। সমেদ খাঁ নানার বড়মেয়ের ছেলে তাগড়া জোয়ান আইয়ূবদা আরও কারা কারা যেন ‘ধর ধর’ বলে দৌড়ে গেল। রক্তারক্তি কাণ্ড। বারবাড়িতে দাঁড়িয়ে আমি হতভম্ব হয়ে আছি। চারদিকের বাড়ি থেকে লোকজন চকেমাঠে বেরিয়ে এসেছে। মহিলারাও।

ঘটনা কী? জমির বিরোধে এই কাণ্ড? আততায়ী লোকগুলোকে ধরা গেল না। তারা পালিয়ে গেল। খালেক নায়েবকে নিয়ে শুরু হলো টানাহ্যাঁচড়া। তার পরের ঘটনার কিছুই আর জানা হয়নি। তবে নায়েব সাহেব সেরে উঠেছিলেন। তিনিও ছিলেন দুর্দান্ত সাহসী মানুষ।

মোতাহারদের বাড়িতে আমার খুব যাওয়া আসা ছিল। তাদের তিন ভাইয়ের কথা মনে আছে। মোতাহার আজাহার আর আতাহার। আমি তাদের দাদা ডাকতাম। আজাহার দাদা আমাকে খুবই আদর করতেন। বাড়িতে অনেকগুলো ঘর। বড় সাদা উঠোন। গোয়াল। বাড়িতে ঢোকার মুখে বাংলাঘর। সেই ঘরে মোতাহার দাদা আর আজাহার দাদা পড়াশোনা করতেন। কাজির পাগলা হাইস্কুলে বোধহয় সেভেন এইটে পড়েন তখন। এই বাড়িটা এমনভাবে চোখে লেগে আছে আমার! নূরজাহান উপন্যাসের অনেকগুলো চরিত্রকে এই বাড়ির বাসিন্দা বানিয়ে ছিলাম। মান্নান মাওলানা, হাসু, মাকুন্দা কাসেম। আর আমার খুব প্রিয় চরিত্র পারু। বাড়ির পিছনের অংশে কারা থাকত জানি না। সেই অংশেও একটা দুটো চরিত্র ছিল। একটা সাপ আনাগোনা করতো ওই দিককার উঠোনে। মুকসেইদ্দা চোরাও চরিত্র। পাশেই তার বাড়ি। চোরস্বভাব অনুযায়ী রাত দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে সে। ওই বাড়ির উঠোনে এসে সাপটা দেখেছিল প্রখর জ্যোৎস্নায়। বাড়ির আশ্রিত গরিব মাস্টারের সঙ্গে সমীহের এক সম্পর্ক তৈরি হয় মুকসেদের।

লতিফ খাঁদের বাড়ির এক শরিকের ছেলে ওহাবদা। প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর যুবক। ঢাকায় থেকে চাকরি বাকরি করেন। ছুটিছাটায় গ্রামে গিয়ে থাকতেন। খুবই ভালোবাসতেন আমাকে। অদ্ভুত এক অসমবয়সের বন্ধুত্ব। মোতাহার আজাহারদের সঙ্গে, আমাদের রউফ মামার সঙ্গে বাড়ির সামনের হালটে দাঁড়িয়ে গল্প গুজব করতেন বিকেলবেলা। ও রকম এক বিকেলে তাঁর হাতে দেখি একটা বই। উপন্যাসকে তখন দেশগ্রামে বলে ‘নভেল’। কেউ কেউ বলে ‘আউট বই’। অর্থাৎ পাঠ্য বইয়ের বাইরের বই। উপন্যাস শব্দটা তখনও পর্যন্ত শুনিইনি। বানান করে মাত্র পড়তে শিখেছি। বইয়ের নামটা পড়লাম রূপসাগর। লেখকের নামটাও পড়লাম। সুবোধ ঘোষ। পরে জেনেছি সুবোধ ঘোষও বিক্রমপুরের লোক। ‘বহর’ গ্রামে বাড়ি ছিল তাঁদের। যদিও তাঁর জন্ম ভারতের হাজারিবাগে।

কত লেখা সুবোধ ঘোষের। সুজাতা, শ্রেয়সী, জতুগৃহ, শুন বরনারী, জলকমল, বন্ধু গোলাপ। আরেক অসামান্য গ্রন্থ ভারত প্রেমকথা। ভারত প্রেমকথার মতো বই বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয়টি নেই। সুবোধ ঘোষের কাহিনি নিয়ে কত সিনেমা হয়েছে। জতুগৃহ হিন্দি বাংলা দুই ভাষাতেই হয়েছিল। বাংলাটির নায়ক উত্তমকুমার। হিন্দিতে নাসিরউদ্দিন শাহ আর রেখা। সুজাতা বাংলায় হয়েছে কিনা জানি না। হিন্দিটা দেখেছিলাম। নায়িকা ছিলেন নূতন সমর্থ। তনুজার বড়বোন। তনুজার মেয়ে কাজল ভারতীয় সিনেমার বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় নায়িকা। শুন বরনারীও সিনেমা হয়েছে। উপন্যাসের নায়কের নাম হিমু। হোমিওপ্যাথি চর্চা করত। এজন্য নাম পড়ে যায় ‘হোমিও হিমু’। সরল সত্যবাদী পরোপকারী যুবক। মানে দাগ কেটে যাওয়া লেখা। উপন্যাসের একটি লাইন এখনও আমার মনে আছে ‘পরিতিক কথা শুন বরনারী।’

সুবোধ ঘোষের প্রথম গল্প ‘অযান্ত্রীক’। প্রথম গল্পেই তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালি পাঠককে। ঋত্বিক ঘটক ছবি করলেন সেই গল্পের। গল্পের নায়ক একটা মোটরগাড়ি। ‘দেশ’ পত্রিকার আমৃত্যু সম্পাদক সাগরময় ঘোষ। সম্পাদকের বৈঠকে তাঁর বিখ্যাত বই। সেই বইতে আছে সুবোধ ঘোষের ‘থির বিজুরী’ গল্প লেখার ইতিবৃত্ত। সুবোধ ঘোষের দ্বিতীয় গল্পটিও খুবই বিখ্যাত। ‘ফসিল’। জীবিকার জন্য এমন সব কাজ করেছেন, ভাবা যায় না। বাস কনডাকটারি করেছেন, ট্রাক ড্রাইভার হয়েছেন। মুম্বাই মিউনিসিপ্যালিটিতে কিছুদিন ঝাড়ুদারের কাজ করেছেন। সার্কাস পার্টিতে ছিলেন। মহামারির টিকা দেওয়ার চাকরি নিয়ে চলে গিয়েছিলেন ইস্ট আফ্রিকায়। তিরিশ দশকের শেষদিকে যোগ দেন আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় বিভাগে।

ইব্রাহিম দারোগার পশ্চিম পাশের বাড়িটি ফকিরবাড়ি। বাড়ির পশ্চিম পাশে বড় একটা পুকুর। তার পশ্চিম পাশে আরেকটা বাড়ি। সেই বাড়ির পাটাতন ঘরটা দূর থেকে দেখা যায়। ঘরের নতুন টিন খরালিকালের রোদে চকচক করে। পুকুরটার উত্তরে ব্যাপারি বাড়ি। ওইসব বাড়ির বাসিন্দাদের আমি তেমন চিনি না।

একটু বড়বেলার কথা। ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় বসবাস আমাদের। মুরগিটোলার আফতাব মিয়ার বাড়ি। এই বাড়ি এবং সেই সময়কার কথা আছে মায়ানগর উপন্যাসে। আজাদ গেণ্ডারিয়া হাইস্কুলে এইটে ভর্তি হয়েছে। আমি ক্লাস সিক্সে। খরালিকালে দেশে গেছি। বুজির কাছে মন পড়ে থাকত। মা অন্য ভাইবোনদের নিয়েও সেবার বাড়িতে। আব্বার কাছে শুধু আজাদ। ফাল্গুন চৈত্রমাসে একেকদিন গ্রামের একেক পুকুরে মাছ ধরা হতো। সে এক উৎসব। লোকে বলত ‘মাছ গাবাইছে’। গ্রামের সব লোক একত্র হয়ে নামল এক পুকুরে। বেশিরভাগ লোকের হাতে পলো। কারও কারও হাতে ঝাঁকিজাল। আমি ঝাঁকিজাল ছুড়তে পারি না। ডুলা (খালুই। মাছ রাখার বেত বা পলোর পাত্র) রাখতে যাই বড়দের সঙ্গে। তাতেও লাভ আছে। মাছের একটা ভাগ পাওয়া যায়।

ফকির বাড়ির পুকুরে মাছ ধরা হবে। সেন্টুদা একটা ঝাঁকিজাল নিলেন। একটা মাঝারি সাইজের পলো আছে মুরগির বাচ্চা আটকে রাখার জন্য। সেটা নিলেন। ডুলাটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ল আমার লগে।’

খালি গা, হাফপ্যান্ট পরা। গেলাম তার সঙ্গে। গিয়ে দেখি বিস্তর মানুষ নেমেছে পুকুরে। পলোর সংখ্যা অনেক। সেন্টুদা বললেন, ‘ডুলা রাখনের কাম নাই। তুই পলো চাবা। আমি ঝাঁকিজাল বাই।’ কিন্তু কোথায় জাল ছুড়বেন? দুহাত জায়গাও ফাঁকা নেই। শুধু পলো পড়ছে। তার আগে আমি কোনোদিন পলো চাবাইনি (পলো চাপ দেওয়া, বা পলো চেপে মাছ আটকানো)। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে পলো নিয়ে নামলাম। কাজটা কঠিন কিছু না। হাঁটু বা কোমর পানিতে দুহাতে পলো চেপে ধরা আর তোলা। পলোর ঘেরে মাছ আটকা পড়লে ভালো রকম শব্দ হবে। পলোর মুখ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে কায়দামতো ধরে মাছটা তুলে আনতে হবে। এই কাজ।

আমি আমার মতো পলো ‘চাবাতে’ লাগলাম। সেন্টুদা জাল বাগিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ছোঁড়ার চান্স পাচ্ছেন না। তিন বা চার চাবের সময় দেখি পলোর ভিতর বিরাট ঘুটুর ঘুটুর শব্দ। মাছ পড়েছে। আমি দিশেহারা ভঙ্গিতে সেন্টুদাকে ডাকলাম। ‘সেন্টুদা, মাছ পড়ছে।’ সেন্টুদা নির্বিকার গলায় বললেন, ‘হাত দিয়া উডা।’

হাত দিয়ে ভয় পেয়ে গেলাম। বেশ বড় সাইজের একটা কিছু আটকা পড়েছে। শরীরটা কী রকম পিছলা। ‘সেন্টুদা, বড় মাছ।’

সেন্টুদা তাও পাত্তা দেন না। আমার পাশে পলো ফেলছে নোয়াব আলি নানার ছেলে কালু মামা। সেন্টুদা কালু মামাকে বললেন, ‘কাউল্লা, দেখ তো মিলুর পলোয় আসলেই কিছু পড়ছে নি।’

কালু মামা হাত দিয়ে বিশাল একটা আঁইড় মাছ তুললেন। পুকুরে সাড়া পড়ে গেল। ‘আরে বাপরে বাপ! এত বড় আইড়?’ আমি খুশিতে তখন পাগল হয়ে গেছি। ভিতরে ভিতরে একটু চিন্তিতও। মাছের ভাগ তো সেন্টুদাকেও দিতে হবে। অত বড় আইড় দেখে সেন্টুদার মুখে তখন বিরাট কেলানো হাসি। ‘কাম তো সাইরা ফালাইস রে মিলু। সাবাস বাপের বেডা।’

তারপর যে কাণ্ডটা হলো, বিস্ময়কর। এত মানুষ নেমেছে পুকুরে, কেউ তেমন কিছুই পেল না। আমি পেলাম আটটা আইড়। পলো চাব দিই আর আইড়। মানুষজন হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি এসেছিলাম সেন্টুদার ধরা মাছ রাখতে, এখন উল্টো সেন্টুদা আমার মাছ রাখছেন। সে আর ঝাঁকিজাল ছোড়েইনি। তার পায়ের কাছে ছাই রঙের পিঠঅলা আইড়মাছগুলো ডাঁই হয়ে আছে।

বীরের মতো বাড়ি ফিরলাম। আমার দুহাতে সবচে’ বড় আইড় দুটো। বাকিগুলো সেন্টুদার হাতে। আমার মনে সেই ভয়। সেন্টুদাকেও ভাগ দিতে হবে। আধাআধি ভাগ। চারটা আইড় সেন্টুদা ‘আজাইরা’ নিয়ে যাবেন।!

বাড়িতে এসে, চিন্তা করা যায় না এমন একটা কাজ করলেন সেন্টুদা। মাছগুলো নিয়ে সোজা চলে এলেন আমাদের বাগানে। নিমতলার চুলায় দুপুরের রান্না বসিয়েছেন মা আর বুজি। মাছগুলো সেখানে রাখলেন। আমাদের এলাকায় ফুফু খালা চাচি মামি সবাইকেই ‘আম্মা’ ডাকার নিয়ম। আমার মা হচ্ছে সেন্টুদার ফুফু। মাকে সেন্টুদা বললেন, ‘আম্মা, দেহেন মিলুর কারবার। পলো চাবাইয়া আটটা আইড় পাইছে। আমি ঝাঁকিজাল বাইতেই পারি নাই।’

বাড়িতে বিরাট হৈ চৈ। মহিলা আর বাচ্চারা সবাই ছুটে এসে মাছ দেখছে। বিশাল গৌরব নিয়ে আমি একটা ভাব ধরে আছি। মনে অবিরাম খোঁচাচ্ছে একটা বেতকাঁটা। সেন্টুদাকে চারটা মাছ দিয়ে দিতে হবে!

আশ্চর্য ব্যাপার, সেন্টুদা দেখি মাছ না নিয়েই চলে যাচ্ছেন!

মা জানেন আমি তার সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। অর্ধেক ভাগ তাকে দিতেই হবে। তিনি বললেন, ‘ওই সেউন্টা, মাছ লইয়া যা।’

সেন্টুদা থামলেন। ‘কিয়ের মাছ?’

‘তর ভাগের মাছ।’

‘আমার আবার ভাগ কী? না না, আমার কোনো ভাগ নাই। এই মাছ মিলুর। বেবাক মাছ ও-ই নিবো।’

গভীর আনন্দ নিয়ে সেন্টুদার চলে যাওয়া দেখলাম। জীবনে প্রথম বড় রকমের লোভ সামলানো একজন মানুষ দেখা হলো। তাও কিশোরকাল পেরিয়ে যাচ্ছে এমন একজন মানুষ।

পরদিন মা ভাইবোনদের নিয়ে ঢাকায় চলে আসব। সীতারামপুর ঘাট থেকে বেলদারদের কেরায়া নৌকা নিয়ে শ্রীনগরে আসব। সেখান থেকে লঞ্চে ঢাকার সদরঘাট। আটটা আঁইড় মাছ কুটে জ্বাল দিয়ে রেখেছেন মা আর বুজি। বিরাট একটা এলুমিনিয়ামের হাঁড়িতে সেই মাছও সঙ্গে নেওয়া হলো। হাঁড়ির মুখ পুরনো গামছায় ঢাকা। শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছে। সৈয়দপুর লঞ্চঘাটের উত্তর পাশে বাসস্ট্যান্ড হয়েছে। জিঞ্জিরা থেকে ইট বিছানো পথে লক্কর ঝক্কর বাস আসে। ঢাকা থেকে বিক্রমপুরের দিকে ওই হচ্ছে প্রথম রাস্তা। প্রথম বাস চলাচলের ব্যবস্থা। বাস কোম্পানি ‘মমিন মোটর কোম্পানি’। লঞ্চ যাত্রাটা বড়ই একঘেয়ে আমার কাছে।

সৈয়দপুরের কাছাকাছি এসে মাকে বললাম, ‘মা, আমি বাসে কইরা যাইগা। মাছের পাতিল লইয়া যাই। নাইলে মাছ নষ্ট হইয়া যাইব।’ মা প্রথমে পয়সার হিসাবটা করলেন। দশআনা ভাড়া বাসের। এদিকের নদী পার হতে লাগবে দুইআনা, বুড়িগঙ্গা পার হতে লাগবে দুইআনা। মোট খরচ চৌদ্দআনা। পুরো একটা টাকাই লাগে। তাও আঁইড় মাছের মুখ চেয়ে রাজি হলেন। আমি মনের আনন্দে রওনা দিলাম। তখনও বুঝিনি এতবড় মাছের হাঁড়ি কীভাবে সামলাবো! আহা, কী যে কষ্ট করে সেই হাঁড়ি নিয়ে মুরগিটোলার বাসায় এলাম! ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে। বাড়ি ঢুকে দেখি, যে রুমটায় মা থাকেন সেই রুমের দরজাটা খোলা। চৌকির ওপর দিনেরবেলাই মশারি টাঙিয়ে আজাদ শুয়ে আছে।

ব্যাপার কী? ‘কী হইছে দাদা?’

মাছের হাঁড়ি বারান্দায় নামিয়ে আমি মাত্র ঘরে ঢুকব, মশারির তলা থেকে দাদা বলল, ‘সামনে আহিচ না। আমার জলবসন্ত উঠছে।’

সেবার একে একে আমাদের সবারই জলবসন্ত হলো। জলবসন্ত, হাম এই সব রোগে মাছ খাওয়া যায় না। বাড়িতে মাছ আনাই যায় না। আমার আটটি আঁইড় মুখেই দেওয়া হলো না কারও।

সেই সময় হামিদ মামা থাকতেন আমাদের মুরগিটোলার বাসায়। কুসংস্কারে ভরা দিন। বসন্ত কলেরা এইসব রোগের সঙ্গে নাকি অশরীরী ব্যাপার স্যাপারের আনাগোনা হয় বাড়িতে। মুরগিটোলা মসজিদের দক্ষিণ দিকে পুবে পশ্চিমে একটা গলি। পুবদিকে গলিটা গিয়ে শেষ হয়েছে ধূপখোলা মাঠে। পশ্চিম দিকে গলির মুখে একটা মেসবাড়ি। টিনের দোচালা বেশ কয়েকটা ঘর। বাঁশের বেড়া। নানানপদের মানুষজনের বাস। সাদেক নামে নোয়াখালির এক যুবক থাকে সেই মেসে। এস এস সি পাস। ছোট চাকরি করে কোন কোম্পানিতে। দাদার সঙ্গে কেমন কেমন করে তার বন্ধুত্ব হয়েছে। জলবসন্ত ছোঁয়াচে রোগ। তারপরও সেই যুবক যখন তখন এসে দাদাকে দেখে যায়। এক সন্ধ্যায় দাদাকে দেখে গেল সে। পাশের রুমে আমি আর হামিদ মামা বসে আছি। হারিকেন জ্বলছে ঘরে। তারপরও বাড়িটা কেমন ভুতুড়ে ভুতুড়ে লাগছে। হঠাৎ হামিদ মামা বললেন, ‘কী রে, কী ঢুকল ঘরে?’

আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ‘কী ঢুকছে?’

‘কী জানি! ছায়ার মতন একটা জিনিস ঢুকতে দেখলাম। এইসব দেখন ভালো না। বাসার আরও মাইনষের জলবসন্ত হইব।’

পরদিন আমার জলবসন্ত উঠল।

মিল ব্যারাকের ওদিককার এক হিন্দু মহিলা জলবসন্তের ঝাড়ফুঁক করতে আসত। পোড়া লাকড়ির মতো চেহারা। আটআনা করে পয়সা নিতো একেকবার ঝাড়ফুঁকের জন্য। সঙ্গে পাতাসহ নিমের ডাল নিয়ে আসত। নিমের পাতা শরীরে বুলাতো আর বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তো। তার ঠোঁট নাড়ার ভঙ্গিতে একটা শব্দই অনুমান করতাম আমি। ‘টিপপি, টিপপি।’

খানবাড়িকে লোকে বলে ‘খাইগোবাড়ি’। বনেদিবাড়ি। পুরনো দিনের মসজিদ আছে বাড়িতে, বাঁধানো পুকুর আছে। প্রাইমারি স্কুল আছে, দালানকোঠা আছে। এ রকম দালান সীতারামপুরের তালুকদার বাড়িতে আছে। দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডলের লাভি ঠাকরুনের বাড়িতে আছে। লাভি ঠাকরুনকে লোকে বলে ‘লাভি ঠাইরেন’। জাঁদরেল মহিলা।

খাইগোবাড়ির প্রাইমারি স্কুলটার সামনে ভারি সুন্দর একটুকরো সবুজমাঠ। মাঠের পুবদিকে পুকুর। একটা ঝাপড়ানো আমগাছ মাঠের ধারে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা এই স্কুলে পড়তে যায়। আমার খালাতো ভাই জহুদা এই স্কুলে মাস্টারি করেন। খানবাড়ির শহিদদা আরও একটু পরে এই স্কুলে পড়াতেন। জহুদাকে তখন থেকেই লোকে জহু মাস্টার বলে। মার বড়বোনের মেজোছেলে। সৎবোনের ছেলে। নানার আগের ঘরের।

মসজিদের ইমাম ছিলেন অসাধারণ ভালো একজন মানুষ। গ্রামের ছেলেমেয়েরা সকালবেলা তাঁর কাছে কায়দা সিপারা পড়তে যায়। আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরাও যায়। আমার কেন যেন যাওয়া হয়নি।

এই ইমাম সাহেবের কথা আছে ‘নূরজাহান’ উপন্যাসে। তাঁর আদলে তৈরি করা চরিত্র। ‘ছনুবুড়ি’র জানাজা পড়িয়েছিলেন।

আমার ওই বয়সে খাইগোবাড়ির সিরাজ খান সাহেব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। খুবই রাশভারি বনেদি চেহারার মানুষ। ঘোড়ায় চড়ে চলাফেরা করেন। কাজি বাড়ির আকবর তাঁর ঘোড়ার দেখভাল করত। প্রায়ই তিরের বেগে সেই ঘোড়া ছুটিয়ে খাইগো বাড়ি থেকে বেরোত সে। কালিরখিলের দিকে চলে যেত। কালিরখিলে তেপান্তরের মতো বিশাল একখানা মাঠ। পহেলা বৈশাখের দিন সেই মাঠে মেলা বসতো। এই মেলাকে আমরা বলি ‘গলুইয়া’। চৈত্রসংক্রান্তির দিন ছোট্ট একটা গলুইয়া মিলতো তালুকদার বাড়ির সামনের মাঠে।

আমার খুব ঘোড়ায় চড়ার শখ। আকবরকে দাদা ডাকি। আজাদের বন্ধু। একদিন সে আমাকে ঘোড়ায় চড়ালো। দুহাতে শক্ত করে তার ‘মাজা’ জড়িয়ে ঘোড়ায় বসেছি। ঘোড়ার পিঠের হাড় পিছনে লাগছিল। বেশ একটা অস্বস্তি। ঘোড়ায় জিন ছিল না। তারপরও কষ্ট করে বসে আছি। হাওয়ার বেগে ছুটছে ঘোড়া। কালিরখিলের মাঠের দক্ষিণে শুকনো একটা খাল। খালের দক্ষিণে সারধরা বেলদার বাড়ি। বাড়ির কলাগাছের পাতা পদ্মার হাওয়ার নিশানের মতো উড়ছে। খালের ভাঙনের দিকে ঘোড়াটা সাবধানে নামলো। দুপুরের রোদে খাঁ খাঁ করছে চারদিক। মাওয়ার বাজার তখন এখন যেখানে পদ্মা সেতু তার দক্ষিণ পশ্চিম কোণে মাইলখানেক দূরে। রিশিপাড়া ছাড়িয়ে, ওদিকটায়। মাওয়ার বাজার পর্যন্ত যাওয়া হলো না। তার আগেই ফেরার পথ ধরল আকবরদা। ফেরার সময় আবার ওই শুকনো খাল পার হওয়া। ভাঙনের দিকে ঘোড়াটা একটা লাফ দিয়ে নামল। সঙ্গে সঙ্গে আমি ছিটকে পড়লাম খালের বালি মাটিতে। ব্যথা তেমন পেলাম না। পেলাম লজ্জা। কারণ ঘোড়ায় বসে আকবরদা মিটমিট করে হাসছেন।

আকবরদার পিঠোপিঠি দুই বোন ছিল। আমার চেয়ে একটু বড় হবে। একজন ধবধবে ফর্সা আরেকজন কুচকুচে কালো। ফর্সা মেয়েটিকে সবাই বলতো ‘ফর্সুনি’ আর কালো মেয়েটিকে ‘কালোনি’। ফর্সা মেয়েটি রোগাপাতলা, কালা মেয়েটি মোটা। তাদের আসল নাম আমার কখনও জানাই হয়নি। আকবরদাও ফর্সা ছিলেন। সুন্দর ছিলেন দেখতে। তাদের ভাইয়ের নাম রমেশ। তার একটা মুদিদোকান ছিল মাওয়ার বাজারে।

মুসলমান ছেলের নাম ‘রমেশ’। তাও আবার কাজিবাড়ির ছেলে! ভাবাই যায় না। এ রকম নামের কারণ আছে। এলাকাটা ছিল হিন্দুপ্রধান। মুসলমান বাড়িগুলোতে হিন্দুদের অনেক আচার অনুষ্ঠান মানা হতো। ছেলেমেয়েদের নাম হিন্দুদের মতো। মেজো নানার পরের ঘরের বড়ছেলের নাম ননী। হাফেজ মামার ছেলেদের নাম সানা সেন্টু মিন্টু মাখন। মাখনকে আমরা ডাকতাম ‘মাখম’। বাদল বিমল অমল সুধন এ রকম বিস্তর নাম মুসলমান ছেলেদের। আমার বাবার ডাকনাম ‘গগন’।

কাজিবাড়িটা ফকির বাড়ির পিছনে। উত্তর দিকটায়। ওইদিকে বেশ কয়েকটা বাড়ি। সব বাড়িতে আমার যাওয়া হয় না। চিনিও না সবাইকে। কাজিবাড়িতে যেতাম। ‘ছোছাকদম’ গল্পে কদম যে বাড়ি থেকে পিঠা চুরি করে ধরা পড়ে সেই বাড়িটা এই বাড়ি মাথায় রেখে।

সিরাজ খান সাহেবকে লোকে বলে ‘সেরু খাঁ’। তাঁকে কাছ থেকে একবারই দেখেছিলাম। আমাদের বাড়ির তিন শরিকের মধ্যে সীমানা নিয়ে, আমগাছ নিয়ে, জমিজমা নিয়ে বিরোধ একটা লেগেই থাকতো। মেজোনানা আর ছোটনানার পরিবার একত্র হয়ে বুজিকে নানা রকমের অত্যাচার করতো। আমরা মোটামুটি একঘরে হয়ে যেতাম ওরকম সময়ে। শুধু হাফেজমামার পরিবার মিলতো আমাদের সঙ্গে। হাফেজ মামা বুজিকে খুবই মান্য করতেন।

ওরকম এক সালিশের সময় আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন সেরু খাঁ। সকাল দশটা এগারোটা বাজে। ঘোড়ায় চড়ে বাড়ি থেকে বেরোলেন তিনি। সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা। ‘সেউল্লার বাড়ি’র ওদিক দিয়ে চকে নামলেন। আমরা পোলাপানরা বারবাড়িতে দাঁড়িয়ে আছি। চকের রোদ ভেঙে তিনি আসছেন। শীতের শেষদিক। বাড়িতে বেশ একটা সাড়া পড়ল। উঠোনে হাতলঅলা একটা চেয়ার রাখা হয়েছে। বুজির সিন্দুকে কাচের সুন্দর সুন্দর চায়ের কাপ পিরিচ আছে। নানা কলকাতা থেকে এনেছিলেন। ওই প্রথম সেই জিনিস বের করতে দেখলাম। খুবই যত্নে চা বানিয়ে সেই কাপ পিরিচে করে দেওয়া হলো তাঁকে। দলিলমামা মন্নাফমামাও আছেন। তাঁরাও মাতব্বর। বিচার সালিশ কী হলো না হলো বুঝিনি। গভীর বিস্ময়ে মানুষটাকে দেখেছিলাম। বাড়ির মহিলারা জানালার কপাট ফাঁক করে তাকিয়ে ছিল উঠোনের দিকে।

খাইগোবাড়ির ঝিলুদা আর শহিদদা আমাকে খুবই আদর করতেন। বৈশাখ মাসে বড় ফুটবল খেলা হবে লৌহজং মাঠে। মেদিনীমণ্ডল থেকে মাইল পাঁচেক দূর। মাওয়ার ওদিককার পদ্মার পাড় দিয়ে হেঁটে গেলে তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে। ঝিলুদারা কয়েকজন যাবেন সেই খেলা দেখতে। আয়ূবদাও আছেন দলে। ঝিলুদা আমাকেও নিয়ে গেলেন। দুপুরবেলাই রওনা দিলাম আমরা। সময় মতোই খেলা শুরু হলো। কিন্তু শেষ আর হলো না। তার আগেই আকাশ ঘোরতর কালো হয়ে গেল। মেঘ ডাকতে শুরু করল। ‘খাড়াজিলিক’ (বিদ্যুৎচমক) শুরু হলো। পদ্মার তীর ধরে আমরা দৌড়াতে লাগলাম। বাড়ি ফিরতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি আর ঝড়। কালবৈশাখি। বিকেলবেলাই চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। কয়েকহাত দূরের কোনো কিছুই চোখে দেখা যায় না। খাড়াজিলিকের পর খাড়াজিলিক চলছে। তাতে আলোকিত হয় চারদিক। সেই আলোয় পথ দেখে চলা। কিন্তু বৃষ্টিতে এমন পিছল হয়েছে নদীতীর, ঠিকমতো পা ফেলা যায় না। একসময় ধপাস ধপাস করে আছাড় খেতে লাগলাম আমরা। কাদায় লেপটা লেপটি জামাকাপড়। দলের সবচাইতে ছোট সদস্য আমি। ঝিলুদা আমার হাত ধরে রেখেছেন। তিনি আছাড় খেলে তার সঙ্গে আমিও খাচ্ছি। কী যে দিশেহারা একটা অবস্থা! একসময় আমার অবস্থা খুবই কাহিল। হাঁটতেই পারছি না। শীতে ঠক ঠক করে কাঁপছি। হাত ধরে আছেন বলে আমার কাঁপুনি টের পেলেন ঝিলুদা। শুধু শীতেই কাঁপছিলাম না। সঙ্গে ভয়ও ছিল। এই দুর্যোগ থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরতে পারব কিনা। নদীতীরের বাড়ি থেকে বড় কোনো গাছ ভেঙে পড়বে কিনা মাথার ওপর। সঙ্গে সঙ্গেই হয়তো মারা যাবো। বুজির সঙ্গে এই জীবনে আর দেখা হবে না। বাড়িতে এতক্ষণে বুজিও নিশ্চয় আমার জন্য অস্থির হয়ে গেছেন।

এই অবস্থায় ঝিলুদা আমাকে বিরাট সাহস দিলেন। ‘ডরাইচ না মিলু। আমি আছি। কিচ্ছু হইব না। ওঠ, আমার কান্ধে ওঠ।’

ওই অবস্থায় ঝিলুদা আমাকে কাঁধে তুলে নিলেন। অনেকটা পথ কাঁধে করে আনলেন।

ঝিলুদা একাত্তরের বীরমুক্তিযোদ্ধা। মাসুদভাই, আতিকুল্লাহ খান মাসুদ মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর বড়ভাই হামিদুল্লাহ খান সেক্টর কমান্ডার। একাত্তরে মেদিনীমণ্ডলের ঘরে ঘরে মুক্তিযোদ্ধা।

আব্বার সঙ্গেও একবার বৈশাখি ঝড়ে পড়েছিলাম। ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছি। বিকেল হয়ে গেল শ্রীনগর ঘাটে নামতে না নামতেই। আব্বা দ্রুত হাঁটতে পারতেন। দুই হাতে দুটোব্যাগ, কাঁধে এক ব্যাগ আব্বা তাঁর ভঙ্গিতে হাঁটছেন। আমার হাতে চটের ছোট একটা ব্যাগ। সেই ব্যাগ নিয়ে আব্বার পিছন পিছন ছুটছি। হাঁটায় আব্বার সঙ্গে পারি না। আব্বা হাঁটেন, আমি দৌড়াই। কোলাপাড়ার ওদিকে আসতে না আসতে শুরু হলো ঝড়বৃষ্টি। আকাশ আগেই কালো হয়ে গেছে। বিকেল ফুরাবার আগেই সন্ধ্যা। ঘোরতর অন্ধকার চারদিকে। আমরা পথ আন্দাজ করে করে হাঁটছি। একসময় আর পারা গেল না। পথপাশের একটা বাড়িতে আব্বা আমাকে নিয়ে উঠলেন। পাটাতন করা ঘর বাড়িতে। দরজা ধাক্কাতেই হারিকেন হাতে একলোক দরজা খুললেন। আমাদের আশ্রয় দিলেন। ঘরের সামনে অনেক আমগাছ। ঝড়ের দাপটে ঢিল পড়ার ভঙ্গিতে আম পড়ছে। দরজা খুলে আব্বা কয়েকটা আম কুড়িয়ে আনলেন। নিজে একটায় কামড় দিয়ে আমাকে দিলেন একটা। ‘নে বাজান। খা।’

পিতাপুত্রের ঝড়ো কাকের মতো অবস্থা। সেই অবস্থায় কাঁচা আম কামড়ে কামড়ে খাচ্ছি। বাড়ির লোকটি অবাক চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। ওই ঘরটি ছিল বারবাড়ির দিকে। বাংলাঘর। লোকটি বোধহয় একাই ঘরটায় থাকতেন।

ছেলেবেলায় বোধহয় পোলিও হয়েছিল শহিদদার। অত্যন্ত মেধাবী মানুষ। পরিষ্কার গলায় কথা বলেন। হাঁটাচলা করতে হয় অতিকষ্টে। তারপরও আনন্দ উৎসবে মেতে আছেন সারাক্ষণ। আমি যখনকার কথা বলছি তখনও তিনি পড়াশোনা করছেন। তার পরের জীবন শিক্ষকতা।

একদিন এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটালাম শহিদদার সঙ্গে। আমার তখন আট নয় বছর বয়স হবে। দুপুরের পর বাড়ির ছেলেপুলেদের সঙ্গে খাইগোবাড়িতে গেছি। কোনো কাজ নেই। হয়তো বাড়ির সামনের মাঠে বড়রা ফুটবল খেলবে সেই খেলা দেখবো। অথবা এমনিতেই গল্পআড্ডা। ছোটদের চেয়ে বড়দের সঙ্গেই আমার বেশি ভাব। প্রাইমারি স্কুলের আমগাছটার তলায় শহিদদার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছি আর কী কথায় যেন খুব হাসছি। শহিদদা ঠাট্টা করে বোধহয় আমাকে কিছু বলেছেন। বাচ্চা ছেলে বাচ্চা ছেলেকে যেভাবে ধাক্কা দেয় আমি ঠিক সেই ভাবে শহিদদাকে একটা ধাক্কা দিলাম। দিয়েই বিস্মিত, হতবাক। আমার ওইটুকু ধাক্কায় শহিদদা হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। আহা রে, কী করুণ দৃশ্য! ব্যাপারটার কিছুই আমি বুঝতে পারলাম না। আমার মতো এইটুকু একটা ছেলের ধাক্কায় শহিদদা পড়ে যাবে কেন?

কে যেন শহিদদাকে টেনে তুলল। আমাকে কিছুই বললেন না শহিদদা। যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে আমার কাঁধে হাত দিলেন। আগের মতোই গল্প করতে লাগলেন। আসলে পোলিওগ্রস্ত পায়ে তিনি ব্যালেন্স রাখতে পারেন না। এজন্যই ওভাবে পড়ে গেছেন। তারপর কতদিন শহিদদার ওভাবে পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা আমি চোখের অনেক ভিতর থেকে দেখেছি। সেই ছেলেবেলায় যখন একা একা আমাদের বাড়ির বাগানে ঘুরে বেরিয়েছি, চকেমাঠে ঘুরে বেরিয়েছি, শহিদদার পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা ভেবে আমার চোখে পানি এসেছে।

একবার অঙ্ক পরীক্ষা চলছে খাইগোবাড়ির প্রাইমারি স্কুলে। জহুদা ওই স্কুলের টিচার। আমি কাজির পাগলা হাইস্কুলে টুতে বা থ্রিতে পড়ি। সেদিন আমার স্কুল ছিল না। আমি গিয়ে খাইগোবাড়ির প্রাইমারি স্কুলের পরীক্ষা দেখছি। ছেলেমেয়েরা টিনের ঘরটার বেঞ্চে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে। আমি বাইরের ছোট্ট মাঠটায় ঘুর ঘুর করছি। মাঠের পশ্চিম পাশটায় লম্বা সিঁড়ি দেওয়া সুন্দর একটা পায়খানা ঘর। একটা কাক পায়খানা ঘরের চালায় বসে ডাকছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে ওদিকটায় যাই আবার স্কুল ঘরটার কাছে ফিরে আসি। মাঝারি সাইজের একটা ঘরেই স্কুল। ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত ওই ঘরেই ছেলেমেয়েরা পড়ে। তবে ছাত্রছাত্রী বেশি না। এই অবস্থায় জহুদা আমাকে আর শহিদদাকে দেখতে পেলেন। জহুদা ডাকলেন। কাগজ পেন্সিল ধরিয়ে দিলেন আমাকে। পরীক্ষা হচ্ছিল ক্লাস টুয়ের। ব্লাকবোর্ডে চক দিয়ে অঙ্ক লেখা আছে। সেই অঙ্ক মন দিয়ে করছে ছেলেমেয়েরা। শহিদদা খাইগোবাড়ির ছেলে। সিদ্ধান্ত দেবেন তিনি। বললেন, ‘পরীক্ষা দে তো মিলু। দেখি তুই অঙ্কে কেমুন?’

আমি আগ্রহ নিয়ে পরীক্ষা দিলাম। এই ধরনের বেশিরভাগ লেখায় দেখা যায় লেখক জীবনে সেকেন্ড হননি। বরাবর ফার্স্ট। আমি সত্যি সেদিন ফার্স্ট হলাম। একশোতে একশোই পেলাম। একাত্তরে এসএসসি দেওয়ার কথা ছিল আমার। মুক্তিযুদ্ধ চলছে। কিসের পরীক্ষা? পরীক্ষা হলো স্বাধীনতার পর। সায়েন্স পড়তাম। পাঁচ সাবজেক্টে পরীক্ষা হলো। বাংলা ইংরেজি জেনারেল ম্যাথ আর ফিজিক্স কেমিস্ট্রি। পরীক্ষা হচ্ছিল পঞ্চাশ মার্কসের। আমি জেনারেল ম্যাথে পঞ্চাশই পেলাম। চল্লিশে লেটার মার্কস। ফিজিক্স কেমিস্ট্রিতে পেলাম পঁয়তাল্লিশ করে। বাংলা ইংরেজিতে কম। তাও হায়ার ফার্স্ট ডিভিশন।

একবার বর্ষাকালে দুপুরের পর হঠাৎ জহুদা একটা কোষানাও দিয়ে মজনুদাকে পাঠালেন। মজনুদা তাঁর চাচাতো ভাই। জহুদাদের বাড়িতেই থাকে। এসে বলল, ‘জহুদায় তরে যাইতে কইছে’। এসময় জহুদা আমাকে কেন এভাবে ডেকেছেন বুঝতে পারলাম না। বুজি বললেন, ‘যা’। সেদিন বৃষ্টি বাদল ছিল না। চনমনে রোদ চারদিকে। আমি ক্লাস থ্রির ছাত্র। গেলাম জহুদাদের বাড়ি। জহুদা তাঁদের বাংলাঘরে বসে পরীক্ষার খাতা দেখছেন। ওই অতটুকু আমাকে ক্লাস থ্রির অঙ্কের কয়েকটি খাতা দিয়ে বললেন, ‘খাতা দেক। দশটা কইরা অঙ্ক। একশোতে নম্বর দিবি।’ ভাবা যায়! ক্লাস থ্রির একটা ছেলে ক্লাস থ্রিরই ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার খাতা দেখছে! শেষ বিকেল পর্যন্ত জহুদার সঙ্গে বসে বসে আমি খাতা দেখলাম।

কী ভালো মানুষ ছিলেন আমার জহুদা!

জহুদাদের বাড়ি মাথায় রেখে নূরজাহান উপন্যাসের মরনির বাড়ি তৈরি করেছিলাম। মজনুর খালা। মায়াবতী মরনি ‘নূরজাহান’কে আশ্রয় দিয়েছিল। মজনুর বাবাকে আশ্রয় দিয়েছিল। উত্তর মেদিনীমণ্ডলের প্রায় প্রতিটি বাড়িই এসেছে ‘নূরজাহান’এ। চেনা চরিত্রগুলো নানারকম চেহারায় এসেছে। আমার কাছে এখনও পর্যন্ত গ্রামজীবন মানে সেই ফেলে আসা মেদিনীমণ্ডল। সেই চকমাঠ, গাছপালা ঘেরা গৃহস্থবাড়ির উঠোন পালান। সেইসব রোদ বৃষ্টির দিন। ফাল্গুন চৈত্রের হাওয়ায় ভাসা ফুলের গন্ধ। ঘোরতর বর্ষার রাত। শীতের কুয়াশা মশারির মতো ঢেকে রেখেছে চারদিক। জোয়ার আসার কালে মাছ ধরার উৎসবে মেতেছে গ্রাম। বৃষ্টি ভেজা হাওয়ায় ভাসছে মাছের আঁশটে গন্ধ। এসবের ভিতর ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল একটি মিলু। শৈশব থেকে কৈশোরে পা রাখছে।

আমিনুল মামাদের বাড়িতে আশ্রিত ‘পইন্নার মা’। তার দুরন্ত স্বভাবের যুবক ছেলে আজিজ। আমার নামের সঙ্গে প্রায়ই ঠাট্টা করে সে ‘কর্তা’ কথাটা জুড়ে দিত। ‘মিলুকর্তা’।

‘নূরজাহান’ এ আজিজ গাঁওয়ালের বাড়ি তৈরি হয়েছে আমিনুল মামাদের বাড়ি মাথায় রেখে। আজিজের মায়ের আদলে ‘ছনুবুড়ি’। মেটে তেল খেয়ে মারা যায়। ওই তেলকে আমরা বলি ‘মাইট্টা তেল’।

বসন্তকালের শুরুতে স্পোর্টস হতো গ্রামে গ্রামে। আমাদের কাজির পাগলা হাইস্কুলেও। বর্ষাকালে হতো সাঁতার প্রতিযোগিতা। খাইগোবাড়ির পুকুরে এক বর্ষায় সাঁতার প্রতিযোগিতা চলছে। প্রাইমারি স্কুলের ছেলেমেয়েদের প্রতিযোগিতা। আমি ওই স্কুলের ছাত্র না। প্রতিযোগিতা দেখতে গেছি দাদার সঙ্গে। বাড়ির আরও কেউ কেউ আছে সঙ্গে। খালি গা, পরনে ইলাস্টিক দেওয়া প্যান্ট। এবারও সেই জহুদা। আমার বয়সী ছেলেদের সাঁতার হবে। পশ্চিমপাড় থেকে পুবপাড়ে সাঁতরে যেতে হবে। জহুদা বললেন, ‘সাতর দিবিনি মিলু?’ আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি। ‘দিমু’।

‘তয় নাম।’

ইলাস্টিক লাগানো প্যান্টকে বলি, রবারের (রাবারের) প্যান্ট। সেই রবারের প্যান্ট খুলে আমগাছ তলায় রেখে লাফ দিয়ে নামলাম পুকুরে। বাঁশিতে ফুঁ দিলেন জহুদা। ন্যাংটাপুটো আমি পাগলের মতো সাঁতরাতে লাগলাম। চোখের পলকে ওপাড়ে। ফার্স্ট। ওপারে ছিলেন শহিদদা। তিনি ঘোষণা করলেন আমাদের কেউ কেউ নাকি বাঁশি বাজবার আগেই সাঁতার শুরু করেছিল। সুতরাং এটা হবে না। আবার সাঁতার হবে। এবার পুবপাড় থেকে পশ্চিমপাড়। এবার বাঁশিতে ফুঁ দিলেন শহিদদা। আমি আবার উন্মাদের মতো সাঁতরাতে লাগলাম। এবারও ফার্স্ট।

খেলাধুলার ব্যাপারে আমি সত্যিকার অর্থেই অপদার্থ। কোনো খেলাই পারতাম না। সাইকেলটা পর্যন্ত চালাতে শিখিনি। সাইকেল চালাতে জানি না শুনে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার এমন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, যেন আমার প্রকারের অকর্মা তিনি জীবনে দেখেননি।

তবে সাঁতারটা আমি সত্যি ভালো শিখেছিলাম। খাইগোবাড়ির পুকুরে সাঁতার প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হয়ে প্রাইজ পেয়েছিলাম একটা শক্ত মলাটের অঙ্কখাতা। আরেকবার স্পোর্টস হলো নোয়াব আলি নানার বাড়ির পশ্চিম দিককার মাঠে। গনি মামার গলা সুন্দর। মাইকে কখন কোন খেলা সেইসব ঘোষণার দায়িত্ব তাঁর। মাইক, গান এসব আমি খুব পছন্দ করি। আমার খুব ইচ্ছা গনি মামার মতো আমিও মাইকে ঘোষণা দিই। গনি মামার কাছে গিয়ে দু তিনবার ঘ্যান ঘ্যান করলাম। তিনি পাত্তাই দিলেন না।

ওই স্পোর্টসের একটা খেলায় আমি ফার্স্ট হলাম। ‘অঙ্ক দৌড়’ বলে একটা খেলা ছিল। ধরা যাক দশজন খেলাটা খেলবে। ক্লাস ধরে ধরে খেলা। তারা হয়তো ক্লাস ফোরের ছাত্র। দশজনে খেলবে। মাঠের একপাশে দশটা সাদা কাগজে অঙ্কটা লেখা থাকবে। একটা পেন্সিলও থাকবে। মাঠের অন্যপাড় থেকে দৌড়ে গিয়ে মুহূর্তে অঙ্কটা করে, নিজের নামটা লিখে কাগজ পেন্সিল হাতে নিয়ে দৌড়ে আসতে হবে। যে আগে আসবে এবং যার অঙ্ক কারেক্ট হবে সে ফার্স্ট। তবে নামটাও অবশ্যই লেখা থাকতে হবে।

একটা বিয়োগ অঙ্ক দেওয়া হয়েছে। অদ্ভুত অঙ্ক। ১০,০০০ (দশ হাজার) থেকে ৯৯৯৯ (নয় হাজার নয়শো নিরানব্বই) বিয়োগ করতে হবে। এটা একটা চালাকি ধরনের বিয়োগ। ওই বয়সেই আমরা শিখে গিয়েছিলাম। রেজাল্ট হবে ১ (এক)। মুহূর্তে অঙ্ক করে আমি দৌড়ে এলাম। ফার্স্ট।

কিন্তু কাজ হলো না।

অঙ্ক সঠিক হয়েছে। দৌড়েও এসেছি সবার আগে। নামটা লিখিনি। আমার প্রাইজ চলে গেল আরেকজনের হাতে।

ঘটনাটা ভুলিনি। সেই ঘটনা ভাবলে মনে হয়, জীবনে কত কী পাওয়ার ছিল, পাইনি। আমার প্রাপ্য চলে গেছে অন্যের হাতে। জীবন তো এরকমই। কত কী দেবে, কত কী দেবে না।

তারপর আমি আর কখনও স্পোর্টসে নামিনি। তবে স্পোর্টস থেকে একটা প্রাইজ পেয়েছিলাম।

পুব কুমারভোগে চন্দ্রেরবাড়ির মাঠ নামে বিশাল একটা মাঠ ছিল। কালিরখিলের ওদিককার সড়ক ধরে পুবদিকে গেলে তিনদিকে সড়ক চলে গেছে এরকম জায়গায় বিশাল একটা বটগাছ। জায়গাটার নাম ‘নুরইতলি’। শুনতাম এই বটগাছের তলায় পদ্মার ‘সাতকাহন’ ইলিশ মাছ আটকা পড়ে আছে। যেদিন ‘দুনিয়া গারদ’ (রোজ কিয়ামতের দিন) সেদিন এই বটগাছ উপড়ে পড়বে আর তার তলা থেকে পদ্মায় গিয়ে নামবে সাতকাহন ইলিশ মাছ। পদ্মায় আর পানি দেখা যাবে না, দেখা যাবে শুধু ইলিশ মাছ। রূপার মতো চকচক করবে নদী।

হাজাম বাড়ির মইজ্জাদা (মজিদদা) ছিল এইসব গল্পের ওস্তাদ। চন্দ্রেরবাড়ির মাঠে স্পোর্টস হবে। দাদার বন্ধু শফি ভাইদের বাড়ি ওই গ্রামে। পাশের গ্রামে হামিদ মামার বন্ধু আবু বকরদের বাড়ি। আশপাশের গ্রামের মানুষজন সবাই আসছে স্পোর্টস দেখতে। কিশোর কিশোরীরা অংশগ্রহণ করবে। দাদার সঙ্গে আমি গেছি। বাড়ির আরও কেউ কেউ আছে। শফিদা তাঁর বড়ভাই রফিদা আমাকে আদর করেন খুব। রফিদা আবুবকর ওরা মাতব্বর গোছের। কেমন কেমন করে জেনেছেন আমি গান গাইতে পারি। আমাকে ডাকলেন গান গাওয়ার জন্য। হাতে স্পিকার ধরিয়ে দিলেন। আমিও সঙ্গে সঙ্গে গাইতে শুরু করলাম।

ছেলেবেলার গল্প শোনার দিনগুলি

এখন কতদূরে

আজ আসে না রাজার কুমার পঙ্খিরাজে উড়ে।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান। পুরোটা আমাকে লিখে দিয়েছিলেন ফজল কাকা। আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। জ্যোৎস্না রাতে বাগানে ফজল কাকার হাত ধরে হাঁটছি। কাকা এই গানটা গাইছেন। কী সুন্দর গলা! বললাম, ‘কাকা, এই গানটা আমারে লেইখা দিবেন?’ পরদিন চলে যাওয়ার আগে গানটা কাকা লিখে দিয়ে গেলেন। সকালবেলা আমার হাতে কাগজটা ধরিয়ে দিয়ে ‘পয়সা’ গ্রামের পথ ধরলেন। মেদিনীমণ্ডল থেকে পুবদিকে ছয়সাত মাইল দূরের গ্রাম। প্রকৃত অর্থে ‘পয়সা’ই আমাদের গ্রাম। আমার পৈতৃক গ্রাম। ফজল কাকা আব্বার সৎভাই। ছোটভাই।

সেই স্পোর্টসে লোকজন আমার গান শুনে মুগ্ধ। একেকটা খেলার ফাঁকে ফাঁকে আমার ডাক পড়ছে। মাইকে ঘোষণা হচ্ছে আমার নাম। তখনকার দিনের স্পিকার (মাইক) বেশ ভারি। আমি দুহাত দিয়েও ধরে রাখতে পারি না। হাত ব্যথা হয়ে যায়। বড়রা একজন কেউ ধরে রাখে আর আমি গান গাই। অদ্ভুত অদ্ভুত সব গান।

চুপ চুপ লক্ষ্মীটি

শুনবে যদি গল্পটি

এক যে ছিল তোমার মতো

ছোট্ট রাজকুমার…

অমল মুখোপাধ্যায়ের গান। এই গায়কের দুটো গান খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল ষাটের দশকের শুরুর দিকে। দুটো গানই আমি সেদিন গাইলাম। অন্য গানটি

এই পৃথিবীতে সারাটি জীবন

কি পেলাম বলো হায়

যেটুকু পাবার ছিল সবই তায়

ভেসেছে আঁখি ধারায়।

এইসব গান রেকর্ডে শুনে শুনে শেখা। তখনকার দিনে গ্রামের বিয়ে বাড়িতে, মুসলমানি, আকিকা এইসব অনুষ্ঠানে দিনরাত মাইক বাজতো। একটা রেওয়াজই ছিল মাইক বাজানোর। মাইক না বাজালে যেন উৎসবই হয় না। স্পোর্টস, থিয়েটার সব অনুষ্ঠানেই মাইক চাই। মাইক না থাকলে উৎসব যেন উৎসবই না। যে বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে কিন্তু মাইক বাজছে না, সেই বাড়ি বিয়েবাড়ি মনেই হতো না। লোক দেখানোর জন্য গরিব মানুষেরও ছেলেমেয়ের বিয়েতে মাইক ভাড়ায় আনতো। সঙ্গে সেভেনটি এইট আর পি এমের বাক্স ভর্তি রেকর্ড। কত শিল্পীর গান! হেমন্ত, সন্ধ্যা, শ্যামল, সতীনাথ, মান্নাদে, মানবেন্দ্র, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, লতা মুঙ্গেশকর। পান্নালাল ভট্টাচার্যের ‘মা আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুড়িল’, কী বিখ্যাত গান লতা মুঙ্গেশকরের ‘একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি’ আর ‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে, আমার এ দুয়ার প্রান্তে’। সন্ধ্যা মুখার্জীর ‘মধুমালতী ডাকে আয়’। শ্যামল মিত্রের ‘ভ্রমরা, ফুলের বনে মধু নিতে অনেক কাঁটার জ্বালা, তুই যাসনে সেখানে’। তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কাজল নদীর জাল, ভরা ঢেউ ছলছলে’। হেমন্তের ‘মেঘ কালো আঁধার কালো’, সতীনাথের ‘জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারো, সমাধি পাড়ে মোর জ্বেলে দিও।’ এইসব গান আমার ছেলেবেলা আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

সেই স্পোর্টসের অনুষ্ঠানে তালাত মাহমুদের একটা বাংলা গান গাইলাম।

‘এই তো বেশ এই নদীর তীরে বসে গান শোনাই

একটি দুটি কথা একটু মাঝেমাঝে আনমনা।’

এই গানটির আনুষঙ্গিক যন্ত্রের সঙ্গে নদীর জল বয়ে যাওয়ার ছলাৎ ছলাৎ একটা শব্দও ছিল।

আরেকটা গান গেয়েছিলাম। সেই গানটা যে কার গাওয়া মনে নেই। কিন্তু গানের কয়েকটা লাইন পরিষ্কার মনে আছে।

‘আশার খেলা এই জীবনে অনেক ভাঙে গড়ে

পূর্ণিমা চাঁদ যায় ডুবে যায় কালবৈশাখির ঝড়ে

পথের পাশে যে ফুল ফোটে

ছড়ায় যখন হাসি

কেউ বা দেখে কেউ দেখে না

তারে ভালোবাসি

আবার যখন যায় শুকিয়ে

শুধুই মনে পড়ে

অনেক ভাঙে গড়ে।’

আরেকজন গায়কের একটা গান তখন খুবই জনপ্রিয়। সুবীর সেন।

এত সুর আর এত গান

যদি কোনোদিন থেমে যায়

সেইদিন তুমিও তো ওগো

জানি ভুলে যাবে যে আমায়।

এই গানটাও আমি গাইতাম। কী যে ভালো লাগতো গানটা। গান শুনে শুনে গায়ক গায়িকার একটা চেহারা কল্পনা করে শ্রোতারা। সুবীর সেনের চেহারাও আমি কল্পনা করতাম। লম্বা চওড়া ফর্সা সুন্দর রোমান্টিক চেহারার একজন মানুষ। একটু উদাসীন ধরনের। মানুষ মুগ্ধ হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে।

সেই ছেলেবেলার পঞ্চাশ বাহান্ন বছর পরের কথা। কলকাতায় গেছি। কলকাতায় গেলেই আমার তখনকার সারাদিনের সঙ্গী দীপ মুখার্জি। সে ছড়াকার। ছোটদের জন্য লেখালেখি করে। পাগলা টাইপ। আমি ‘পাগলা’ বলেই ডাকি। আমার খুবই অনুরাগী। এক বিকেলে দীপ নিয়ে গেল রবীন্দ্রসদনে। ওখানটায় তো প্রতিদিনই কোনো না কোনো অনুষ্ঠান থাকে। চিত্র প্রদর্শনী, গানের আয়োজন। প্রচুর সিডি ক্যাসেটের দোকান বসেছে। লেখক কবি শিল্পপ্রেমিক মানুষের সমাবেশ। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী লোপামুদ্রা বসে আছেন একটা স্টলে। এই শিল্পীর গান আমি পছন্দ করি। পরিচয় হলো তাঁর সঙ্গে। তাঁর গানের একটা সিডি আমাকে উপহার দিলেন। দীপ ফুক ফুক করে সিগ্রেট টানে। সিগ্রেট টানতে টানতে আমার সঙ্গে হাঁটছে। আধা পাগল টাইপের একজন বৃদ্ধ মানুষ এসে সামনে দাঁড়ালেন। মাথার কাঁচাপাকা চুল প্রায় জট বেঁধে গেছে। গোঁফদাড়িতে একাকার ভাঙাচোরা মুখ। পরনের কাপড়ের দিকে তাকানো যায় না। পায়ের চপ্পল বহুদিনের পুরনো। ছেঁড়া। দীপের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘একটা সিগ্রেট দিন তো?’ দীপ বিরক্ত হয়েই সিগ্রেট দিল। ‘দেশলাই দিন।’ দীপ তাও দিল। মানুষটা যত্ন করে সিগ্রেট ধরালেন। টানতে টানতে অন্যদিকে চলে গেলেন।

ভদ্রলোককে চেনেন?

দীপের মুখের দিকে তাকালাম। আমি কী করে চিনবো?

নাম বললেই চিনবেন। একসময় গান গেয়ে ফাটিয়ে দিয়েছিলেন। সুবীর সেন।

আমি আপাদমস্তক কেঁপে উঠলাম। বলো কী? সুবীর সেন? এই অবস্থা কেন তাঁর?

পারিবারিক অবস্থা জানি না। এভাবেই রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াতে দেখি।

চলো, খুঁজি ভদ্রলোককে। ‘এত সুর আর এত গানের গায়ক।’ আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলবো।

আমার অস্থিরতা দেখে দীপ একটু অবাকই হলো। রবীন্দ্রসদন তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম সুবীর সেনকে। পেলাম না। মনটা খুবই খারাপ হলো। ছেলেবেলার সেই কল্পনার নায়ক আমার, কোথায় হারিয়ে গেল! তারপর অনেকদিন ভেবেছি, মানুষটার সঙ্গে দেখা না হলেই ভালো হতো। সিগ্রেট নিয়ে চলে যাওয়া মানুষটার নাম দীপ আমাকে না বললেও পারতো। আমার কল্পনার নায়ক কল্পনাতেই থাকতো।

চন্দ্রেরবাড়ির মাঠের স্পোর্টস শেষ হলো বিকেল চারটার দিকে। এখন পুরস্কার দেওয়ার পালা। শুরু হলো পুরস্কার দেওয়া। একে একে ছেলেমেয়েদের নাম ঘোষণা করা হচ্ছে আর তারা এসে পুরস্কার নিচ্ছে। সবশেষে ঘোষণা করা হলো আমার নাম। গান গাওয়ার জন্য স্পেশাল পুরস্কার দেওয়া হলো আমাকে। প্লাস্টিকের প্যাকেটে বারোটা রঙ পেন্সিল। সেদিনের আগে অতো সুন্দর রঙ পেন্সিল আমি চোখেই দেখিনি। কত যত্নে যে জিনিসটা আগলে আগলে রেখেছিলাম।

কালিরখিলের স্পোর্টসেও একবার গান গাইলাম। চন্দ্রেরবাড়ির মাঠের স্পোর্টসের মতো করে কেউ পাত্তা দিল না। দুপুরের পর একা একা বাড়ি ফিরছি। খালপারের রাস্তায় নোয়াব আলি নানার সঙ্গে দেখা। তিনি স্পোর্টসের মাঠে যাচ্ছেন। সকালের দিক থেকে ছিলেন। দুপুরে ভাত খেতে গিয়েছিলেন বাড়িতে। এখন আবার যাচ্ছেন। লম্বা ধবধবে ফর্সা সুন্দর মানুষ। মুখে সারাক্ষণ অমায়িক হাসি। কথা বলেন সুন্দর করে। আমাকে ফিরতে দেখে অবাক। ‘তুমি বাড়িত যাইতাছো ক্যা নানা? মাইকে গান দিছো, প্রাইজ পাইবা তো। লও, লও।’

মাইকে ওভাবে গান গাওয়াকে বলা হতো ‘গান দেওয়া’। আমি গান দিয়েছি। নোয়াব আলি নানা বলছেন প্রাইজ পাবো। তিনি গ্রাম পঞ্চায়েতের লোক। পরিচিতজনরা তাঁকে বলে ‘নোয়াব আলি পঞ্চাইত’। তিনি যখন বলছেন, নিশ্চয় প্রাইজ পাবো। আর গান তো আমি খারাপ গাইনি!

নানার সঙ্গে ফিরে গেলাম স্পোর্টসের মাঠে। ভিড়ভাট্টার মধ্যে নানা কোথায় হারিয়ে গেলেন! তাঁকে আর খুঁজেই পেলাম না। আমি গিয়ে প্রাইজ নেওয়ার জায়গাটার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকি। কর্তা ব্যাক্তিরা যেন আমাকে দেখতে পান। তারা দেখলেন আমাকে। কিন্তু প্রাইজ দিলেন না। যেন চিনলেনই না আমাকে। যারা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড হয়েছে তারা প্রাইজ নিয়ে চলে গেল। আমি ফিরলাম ভগ্নমনোরথ হয়ে।

খাইগোবাড়ির নোনা ভালো গান গাইতো। তার সঙ্গে আমার একটা প্রতিযোগিতা ছিল। কাজির পাগলা স্কুলেই পড়ে। ওরা দুভাই আতিক আর নোনা দুজনেই পড়ে দাদার সঙ্গে। দাদার বন্ধু। একবার কাজির পাগলা স্কুলের স্পোর্টসে নোনা আর আমি দুজনেই গান দিলাম। নোনা খুবই ভালো গাইলো। আমি তার সঙ্গে পাত্তাই পেলাম না। বিকেলবেলা সদলবলে, সগৌরবে ফেরার সময় সে আমার দিকে এমন তাচ্ছিল্যের চোখে একবার তাকালো, লজ্জায় আমি একেবারে কেঁচো হয়ে গেলাম।

চন্দ্রেরবাড়ির মাঠের পটভূমিতে একটা কিশোর গল্প লিখেছিলাম। ভূতের গল্প। ‘জ্যোৎস্নারাতে, চন্দ্রেরবাড়ির মাঠে’। খাইগোবাড়ি আমার অনেক লেখায় এসেছে। নূরজাহান, কেমন আছ, সবুজপাতা। সেরু খাঁ চরিত্র হয়ে এসেছেন ‘অধিবাস’ উপন্যাসে। লেখাটি ধারাবাহিক ছাপা হয়েছিল ‘জনকণ্ঠ’ পত্রিকায়। মালিক সম্পাদক ওই বাড়ির। কল্পনায় এই বাড়িটা রেখে লিখেছিলাম ‘পলাশ ফুলের নোলক’ উপন্যাসটি। এই বাড়ি আর পশ্চিম দিককার ঠিক পাশের বাড়ি, বড় মেন্দাবাড়ির পটভূমিও ছিল কল্পনায়। কোন বাড়ি, কোন মাঠ প্রান্তর বা কোন এলাকা যে কীভাবে কোন লেখায় এসে জায়গা করে নেয় লেখক নিজেও অনেক সময় তা বুঝতে পারেন না। লেখার সময় লেখকের অজান্তেই একটা চেনা জায়গা নতুন চেহারায় হাজির হয়।

গানটা পেয়েছিলাম গনিমামার কাছ থেকে আর কিছুটা ফজল কাকার কাছ থেকে। ফজল কাকার গলা খুব সুন্দর ছিল। ‘পয়সা’ গ্রামে গেলে সারাক্ষণ থাকি ফজল কাকার সঙ্গে। তিনি আমুদে মানুষ। নভেল পড়েন, গান করেন। তাঁর মুখে প্রথম শুনেছিলাম আকবর হোসেন নামের পূর্ব পাকিস্তানের একজন লেখকের নাম। ফজল কাকা সেই লেখকের খুবই ভক্ত। তাঁর বইগুলোর নামও শুনলাম কাকার মুখে। অবাঞ্ছিত, মোহমুক্তি, কি পাইনি, ঢেউ জাগে। নাইন টেনে পড়ার সময় বইগুলো আমি পড়ে ফেলেছি। আমার ভালো লাগেনি। ‘অবাঞ্ছিত’ সিনেমাটাও দেখেছিলাম। সেই সিনেমায় আবদুল আলীমের একটা গান ছিল,

কেহই করে বেচাকেনা, কেহই কান্দে

রাস্তায় পড়ে ধরবি যদি তারে

চলো মুরশিদের বাজারে

গনিমামা প্রথমে ছিলেন খুলনায়। ছোট নানার বড়ছেলে। মাঝারি হাইটের ফুটফুটে সুন্দর মানুষ। চেহারায় ব্যক্তিত্বে শিক্ষিত বনেদি মানুষের ছাপ। নিম্নকণ্ঠে সুন্দর করে কথা বলেন। খুলনায় থেকে বোধহয় কলেজে পড়েন আর চাকরি করেন। একবার শুনলাম তাঁর টাইফয়েড হয়েছে। হামিদ মামা ভাইকে আনতে রওনা দিলেন খুলনায়। পরিষ্কার মনে আছে তাঁর চাদর বালিশের গাট্টির সঙ্গে একটা নতুন এলুমিনিয়ামের বদনাও বাঁধা হয়েছিল। আলফু যেভাবে তার গাট্টির সঙ্গে নাড়কেলের হুকাটা ঝুলিয়ে এনেছিল।

গনি মামা পরে ঢাকার জগন্নাথ কলেজে নাইট শিফটে বি কম পড়তেন আর চাকরি করতেন। আমরা তখন জিন্দাবাহারে থাকি।

গনি মামা উত্তম-সুচিত্রার ভক্ত। হেমন্ত সন্ধ্যার ভক্ত। প্রতিবারই বাড়ি আসতেন নতুন নতুন গান গলায় নিয়ে। জ্যোৎস্না রাতে উঠোনে বাগানে পায়চারি করতে করতে সেইসব গান গাইতেন। শুনে শুনে আমি শিখে নিতাম। বিয়েবাড়ি বা অন্যান্য উৎসবের মাইকে শুনে তো শিখতামই।

কোনো কোনো গভীররাতে হঠাৎ হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেত। হয়তো বসন্তকাল মাত্র শুরু হয়েছে। গাছপালা আর ফুলের বনে শুরু হয়েছে আনন্দের দিন। গভীর রাতের হাওয়ায় একটুখানি ভেসে এলো এক অপূর্ব কণ্ঠের গান। কী উদাস করা সুর।

‘ও নদী রে, একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে

বলো কোথায় তোমার দেশ, তোমার নেই কি চলার শেষ।’

হাওয়ার টানে এই গান একবার কাছে আসে, একবার দূরে যায়। যেন গানের নদীটিই বয়ে চলে যায় দূরে। আমার আর ঘুম আসে না। বুজি আম্মা পারু সবাই গভীর ঘুমে। শুধু আমার ঘুম আসে না। একলা জেগে রই।

একদিন দুপুরের পর শুনি গনি মামা গান গাইছেন। বাগানের দিক থেকে আসছে সুর। কিন্তু তাঁকে আর কোথাও দেখি না। এদিক খুঁজি, ওদিক খুঁজি। না, কোথাও নেই। শুধু গানের সুর আসছে। কিছুক্ষণ পর দেখি আমাদের পায়খানা ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন তিনি। হাতে বদনা। পায়খানায় বসে গান গাইছিলেন!

‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’ শব্দটা প্রথম শুনলাম গনিমামার মুখে। রবীন্দ্রনাথের একটা গানের কয়েকটা লাইন শিখালেনও আমাকে। ‘মায়াবনবিহারিণী হরিণী’। নতুন ধরনের গান। হাওলাদার বাড়ির এক বিয়েতে রাতেরবেলা সেই গান দিলাম। পরদিন সকালবেলা গনিমামা বললেন, ‘তর গানটা রবীন্দ্রসঙ্গীত হয় নাই। পল্লীগীতি হইছে।’

পরদিন এক জায়গায় গান দিতে যাবার কথা। আগের সন্ধ্যায় বারান্দায় বিরাট একটা ভাব ধরে বসেছি। বুজিকে বলেছি আঁদা কুঁচি করে দিতে। আমার এইসব কাণ্ডে বুজি খুবই মজা পান। দিলেন আঁদা কুঁচি করে একটা তস্তরিতে। আমি আঁদা খাই আবার গান গাই। প্র্যাকটিস করছি আর কি! পরদিন সকালবেলা উঠে দেখি কথাই বলতে পারি না। গলা ভেঙে গেছে। কথা বলতে গেলে হাঁসের মতো ফ্যাস ফ্যাস শব্দ বেরোয়। বুজি আর আম্মা হেসে খুন। আমার গান দিতে যাওয়া হলো না।

এক সন্ধ্যায় হযরতদের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান। সেন্টুদা বললেন, ‘ল মিলু, তরে গান দেওয়াইয়া আনি’। আমি সঙ্গে সঙ্গে রেডি। সেন্টুদা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘দেহিচ, গান য্যান ভালো হয়। আমার মান ইজ্জত ডুবাইচ না।’

আমি তার মান ইজ্জত ডুবাইনি। ভালোই গেয়েছিলাম।

মেজোনানার দ্বিতীয় ঘরের বড়মেয়ের নাম শফি। আমরা ডাকি শফিআম্মা। কোলাপাড়া গ্রামে তাঁর বিয়ে হয়েছে। স্বামী সাবরেজিস্ট্রি অফিসে চাকরি করেন। টাকা পয়সা আছে। অবস্থা ভালো। তিনি একটা রেডিও কিনেছেন। ফিলিপস কোম্পানির বড় সাইজের রেডিও। বাপের বাড়ি বেড়াতে এসে শফিআম্মা সেটা নিয়ে এসেছেন। উঠোনের মাঝখানে একটা হাতলঅলা চেয়ারে রেডিও রাখা হয়েছে। গান বাজছে রেডিওতে। বাড়ির সবাই ভিড় তো করেছেই, হাজামবাড়ির লোকজনরাও এসেছে। সেই প্রথম রেডিও দেখলাম আমি। রেডিওতে গান শুনলাম। ‘আকাশবাণী কলকাতা’ থেকে ‘অনুরোধের আসর’ হয়, ‘পাঁচমিশালী’ গানের অনুষ্ঠান হয়। একেকজন গায়কের নাম শুনি হেমন্ত সতীনাথ সন্ধ্যা মানবেন্দ্র। সঙ্গে আরেকটা শব্দ বলে। সেটা যে পদবি সেটুকু বুঝি। শব্দটা বুঝি না। আলমগির মহা পাকনা। শব্দটা সে নিজের মতো করে বানিয়ে নিল। আমাকে বলল, ‘বুজছস মিলু, নামটা হইল সন্ধ্যার মুখে ‘পাদ’ দেয়। সন্ধ্যা শব্দটা সে ঠিক মতো উচ্চারণ করতে পারল। কারণ শেষ বয়সে মেজোনানার একটা মেয়ে হয়েছে। তার নাম সন্ধ্যা। কিন্তু মুখে পাদ দেয়, ছি ছি, এ কেমন নাম! দুতিনবার এই উচ্চারণটা সে করছে শুনে শফিআম্মা বেরিয়ে এসে ওকে একটা ধমক দিলেন। ‘চুপ কর! ফাজিল কোথাকার। নাম হইল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়।’

আমার খুব শখ আমাদেরও একটা রেডিও হোক। আমিও যখন ইচ্ছা গান শুনবো। আব্বা বাড়িতে এলেই ইনিয়ে বিনিয়ে বলি। মা বুজি আম্মারও শখ। কারণ নানা আমার মাকে গ্রামফোন কিনে দিয়েছিলেন, হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছিলেন। গ্রামফোনকে সবাই বলে ‘কলেরগান’। আমার মায়ের কলেরগান আর হারমোনিয়াম নিয়ে গেছেন বুজির একমাত্র ভাই আবদীন খাঁ। তিনি গানের সমঝদার। গান শোনেন, হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করেন।

আব্বার নিজেরও শখ আছে। ‘মারফি’ কোম্পানির একটা রেডিও কিনে ফেললেন। সামনের দিকটা ঘি রঙের, পিছনটা টকটকে লাল। ভারি সুন্দর দেখতে জিনিসটা। আমাদের তখনও দুঃখের দিন শুরু হয়নি। ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটিতে আব্বা চাকরি করেন। বুজির জমাজমি বিস্তর। ধান পাট তিল কাউন হয় বছর চলে যাওয়ার চেয়েও বেশি। রমরমা অবস্থা। বর্ষাকালে রেডিও নিয়ে বেড়াতে এসেছেন আব্বা। শফি আম্মাও ওই সময় বাপের বাড়ি বেড়াতে এলেন তাঁর রেডিও নিয়ে। সেদিন ঝকঝকে রোদ। বৃষ্টির দেখা নেই। উঠোনে রাখা হয়েছে শফি আম্মার রেডিও, আমাদের ঘরের বারান্দায় আমাদের রেডিও। দুটোই সমানে বাজছে। ফুল ভলিউম দেওয়া হয়েছে। কারটা কত জোড়ে বাজে। অদ্ভুত এক প্রতিযোগিতা। আমি দাঁড়িয়ে আছি বারান্দার দরজায়। জাহাঙ্গির মামা এগিয়ে এসে বলল, ‘তগোডায় আওজ বেশি হয় না। আমগোডার আওজ বেশি।’

কোনটায় যে আওয়াজ বেশি আর কোনটার যে কম কিছুই বুঝতে পারছি না। কারণ আমার তখন মন চলে গেছে আমাদের রেডিওর একটা গানে। ‘পদ্মার ঢেউ রে, মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা’। কী অসামান্য কণ্ঠস্বর! যেন কণ্ঠ নয়, বাঁশি। আব্বা বললেন, এই শিল্পীর নাম ফেরদৌসি বেগম। আব্বাসউদ্দিনের মেয়ে।

মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনলাম ফেরদৌসি বেগমের গান। পরম করুণাময় কত সৌভাগ্য দিয়ে এই পৃথিবীতে আমাকে পাঠিয়েছেন। এক জীবনে এসে ফেরদৌসি আপার কত ভালোবাসা আমি পেয়েছি! তাঁর বড়ভাইয়ের মেয়ে বিচারপতি মোস্তফা কামাল সাহেবের মেয়ে নাসিদ কামাল আমার বন্ধু। সেও এক বড়শিল্পী। লেখেও ভালো।

নানা জাহাজের সারেঙ ছিলেন। এজন্য বড়ঘরটা তৈরি করেছিলেন জাহাজের মতো করে। একেকটা কামড়ার একেক নাম। কেবিন, খাটাল, বারান্দা, খোপ। মাথার উপরকার জায়গাটার নাম ‘আপার’। আপারের অপভ্রংশ ‘কার’।

এই ঘরের খাটালে আমার জন্ম হয়েছিল। ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫। বৃহস্পতিবার। বাংলা ২২ ভাদ্র ১৩৬২। তারপর থেকে জীবনের পথে আমি হাঁটি। আমার সঙ্গে হাঁটে আমার ছেলেবেলা। শৈশব, কৈশোর। আমার সঙ্গে হাঁটে এক নিরীহ অভিমানী বালক! মিলুকর্তা। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘যার পকেটে সমৃদ্ধ শৈশব কৈশোর না থাকে সে কখনও লেখক হয় না।’        [চলবে]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares