ধারাবাহিক উপন্যাস : ফসলের ডাক : মঈন শেখ

সূচনা পর্ব

প্রথম ডাক

ছাতা বগলে গোঁজা। সূর্যের তাপ যে কম, তা নয়। ছাতা মেলতে হয়তো ভুলে গেছে। একে তো মনভোলা, তার ওপর দিকভ্রান্ত পথিক। মন-মগজ পড়ে আছে উদোম ভুঁয়ে। মজে ওঠা কাদা আছে, পানি আছে। বাহাদুরি দেখাবার মতো বিছনও আছে। ঘাটতি শুধু জমিন ঢাকবার মানুষের। অনেক কষ্টে কয়েকজন কামলা পাওয়া গেছে। ক’দিনেই ঢাকতে হবে ভুঁইগুলো। এমনিতেই নামলা হয়ে গেল। আর দেরি হলে ধানগাছে জমিন ভরবে ঠিকই; ফলনে ভরবে না গেরস্থের খৈয়লান। গোলা থাকবে আধপেটা। জমিনও হবে এক ফসলা। আমন আর হবে না। এমন হাজার চিন্তার জট মাথায় নিয়ে হাঁটছে মোল্লা।

আপন মনেই বকতে বকতে হাঁটছিল মোল্লা। আরিফ মোল্লা। বিড়বিড় করে; ডানে-বামে আঙুল তুলে। ঢেঁকি-চাপা ঢঙে হাঁটলেও পা ফেলায় ছন্দ পতন নেই এতটুকুও। তালে লয়ে সমানে সমান। তার পায়ের এই অসমতা জন্ম থেকে না পরে কোন দুর্ঘটনায়, তা এখন আর কেউ তলিয়ে দেখে না। মানুষের যা ভাবনা, তা মোল্লার কোনখানে খোঁচা দিয়ে রাগানো যায়। রাগতেও পারে মোল্লা! আর ঐ কারণেই ছোট-বড় সবার কাছেই হালকা সে। জমি-জমা, অর্থ-কড়ির দিক দিয়ে হিসাব করলে গ্রামে সে পাঁচজনের একজন। তবুও সে হালকা। ওজনহীন। এমন কি, বাড়ির বাৎসরিক কামলার কাছেও।

আরিফ মোল্লার অবস্থা পড়তির দিকে হলেও এখনও শেষ হয়ে যায়নি। জমি-জিরেতের দিক দিয়ে গ্রামের মধ্যে গুনতে হবে তাকে। তাছাড়া মোল্লাবাড়ির একটা নাম আগে থেকেই ছিল। পাঁচগ্রাম টপকেও মানুষজন চিনত সেই পরিবারকে। আহের মোল্লা, আরিফ মোল্লা আর সবের মোল্লা। তিন ভাই। আতর মোল্লার এই তিন ছেলে। অঢেল সম্পদ এই আতর মোল্লার। বেশি পড়াশোনা ছেলেদের করাননি তিনি। তার এক কথা― বেশি পড়াশোনা করে অন্যের গোলামি খাটতে যাবে কেন, তার চেয়ে নিজেরগুলোই দেখেশুনে খাও। দশ পিঁড়ি (প্রজন্ম) এমনিতেই কেটে যাবে। গ্রামে উঠতি যন্ত্রপাতির যা কিছু প্রথম, তার সবই মোল্লার বাড়িতে আসে। প্রথম মোটর সাইকেল মোল্লার, প্রথম রাইস মিল মোল্লার;  প্রথম শ্যালোমেশিন, সেটাও মোল্লার। সবাই ভিড় করে সেগুলো দেখতে আসে। মোল্লা বাহুতোলা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে মুচকি মুচকি হাসে। কায়দা করে পানের পিক ফেলে। দু-একজনকে বাইকের পিছনে বসিয়ে মোড়ের দিক থেকে ঘুরিয়ে আনে। ধুলায় ঢেকে যায় রাস্তা। ঢাকে বাইক। কাউকে দিয়ে তা ঝেড়েও নেয়। পাল্লা দিয়ে বাইক পরিষ্কার করে কেউ কেউ। বাইক মোছাতেও আনন্দ। ভাগ্যের ব্যাপার।

আতর মোল্লার থিওরি টিকল না। মরল মোল্লা। ভাগ হলো সব। জমি, বাড়ি, বাইক, শ্যালো, রাইস মিল। সব। বড়টা নিল মোটর সাইকেল। মেজটা নিল রাইস মিল। আর ছোটজন নিল শ্যালো মেশিন। বড়টা বড়র মতোই থাকল। টিকিয়ে রাখল সব। বরং বাড়াল সম্পদ। সম্পদ বাড়ল ছোট মোল্লারও। কমল মেজ মোল্লার। আরিফ মোল্লার। কমল না বলে বলা চলে বাড়েনি। সম্পদ বা যা কিছু, এক জায়গায় থিতু থাকলে দীর্ঘদিন পর যেমন কম কম দেখায়, তেমনি। তবে মোল্লা যেমন বদমেজাজি তেমনি দিলদার। দানে-ধ্যানে কম যায় না। ধারে কাছের মসজিদে, মাদ্রাসায় এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তার দানের ছোঁয়া আছে। তার এক কথা; দান আর চুল এক জিনিস। চুল যত কাটবে ততই বাড়বে। দান যতই করবে সম্পদ তত বাড়বে। তার নিজের ক্ষেত্রে এই ফরমুলা কাজ করেছিল কি-না, কেউ জানে না। জানে না হয় তো মোল্লা নিজেও। দুই একটি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতেও তার নাম আছে। তার দোষ বলতে একটাই, অল্পতেই রাগ। রাগলে মুখে কোনো কথাই আটকে না। মুখের ভাষা শুনে অনেকেই মেলাতে পারে না, আগের আর বর্তমান মোল্লার সাথে।

দ্রুত লয়ে হাঁটছে মোল্লা। পাকা রাস্তায় তার পায়ের ছন্দ আরও স্পষ্ট। হাঁটছে আপন মনে বিড়বিড় করে। কিছুটা শব্দ করে। ডানে-বামে হাত উঁচিয়ে; আঙ্গুল তুলে। তার চলা, বলা ও আঙ্গুল তোলার ঢঙের কারণ কেউ প্রত্যক্ষ পরখ করতে না পারলেও পরোক্ষভাবে স্পষ্ট বুঝতে পারবে; সে কারও না কারও সাতগুষ্টি উদ্ধার করছে। ধুয়ে মুছে শেষ করছে। রাগের আভা ঠিকরে পড়ছে তার চলার ঢঙে।

ভ্যানটা খানিক দূর থেকেই গতি কমিয়ে তার পিছু পিছু আসছিল। এটাও একটা পরিকল্পনা। হয় ভ্যানচালকের না হয় আরোহীর। মোল্লার গা ঘেঁষে আসতেই দু’হাতের সমস্ত শক্তি বা কেরামতি দিয়েই যেন বেলদ্বয় বাজালো চালক। একেবারে দশ নম্বর সংকেত। বোধহয় উঠেই গেল গায়ের ওপর। যেন লাফ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল মোল্লা। ত্বরিত লাফ দিয়ে বাম দিকে পড়ে গেল। ভ্যানও থামল। দেগা শুইনা হাঁটা লাগে না গো নানা। ভ্যানে বসে থাকা লোক কথাটা বলল। ভ্যানের দিকে তাকাতেই মোল্লার গায়ে আগুন ধরল। এ যে অপাদানে ষষ্ঠী।

ভ্যানের ওপর বসে আছে তার জন্মের শত্রু। চেনু কবিরাজের বেটা মজিদ। যাকে দেখলেই মোল্লার পিত্তথলিটা পর্যন্ত জ¦লে যায়। জ¦লারই কথা। মোল্লার কাছাকাছি হলেই কোনো না কোনো ফোড়ন কাটা চাই। মোল্লার গালিগালাজ হজমও করতে পারে মজিদ। মোল্লার গালি তার কাছে খুব উপাদেয়। মোটকথা জোঁকের মতো লেগে থাকে।

মোল্লাকে মজিদ নানা ডাকে। কোনো এক সময় মজিদের মা মোল্লার বাড়িতে মাঝে মধ্যে ফরমায়েস খাটত। ঘর লেপা, চাল বাছা বা কুলাতে ধান উড়ানো ইত্যাদি। মজিদের মা মোল্লাকে তখন আব্বা বলে ডাকত। এখনও ডাকে। সেই সূত্রে নানা। এতে মোল্লা আপত্তি তোলেনি। বরং উপভোগ করেছে। এখন অবশ্য নানা ডাকটা ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। ভিন্নমাত্রা মোল্লার কাছে। মজিদের কাছে। নানা বলার ধরনের মাঝে কী যেন আছে। লম্বা করে ডাকে, দরদে মাখো মাখো। ডাকটা কানে আসামাত্রই মোল্লার রাগ কুণ্ডলি পাকায়। আজ এ ক্ষেত্রে মোল্লার বুঝতে বাকি থাকলো না যে, পুরো ঘটনাটা মজিদের সাজানো। আরিফ মোল্লা হামাগুড়ি দিয়ে জোর করে উঠতে লাগলো। ওঠার সময় তাকে মনে হলো দৌড় প্রতিযোগিতায় বাঁশি বাজার পূর্ব মুহূর্তের দৌড়বিদ। আরিফ মোল্লার চোখের দিকে তাকিয়ে ভ্যানচালক একেবারে থমকে গেল। প্যাডেলে জোরে চাপ দিয়ে সে যে পালাবে, তাও মাথায় এলো না। ভেতরের হাসিটা যেভাবে বের হয়ে এসেছিল ঠিক সেভাবেই ঢুকে গেল। গর্তের মুখে বসে থাকা কাঁকড়া, শিয়াল দেখে যেভাবে ভেতরে পালায় টুপ করে, ঠিক সেই ভাবে। প্রথম আষাঢ়ের সমস্ত খরানী-আগুন মোল্লার চোখে জ¦লছে। ধিকি ধিকি নয়, একেবারে দাউদাউ করে। মৌরাল কিংবা চিংড়ি মাছের চোখের মতো তার চোখও বের হয়ে এসেছে অনেকটা। মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে কাঁপতে উঠল মোল্লা। ডানে-বামে আড়চোখে একবার দেখে নিল । ঢিল, পাথর কিংবা ইট খুঁজে থাকবে হয়তো। কিছুই পেল না। ঘাড়ের অস্বাভাবিক ফুলে ওঠা রগগুলোর ভারেই যেন কাঁধটা একটু নুয়ানো ঢঙে এক ধিয়ানে তাকালো সে। ছোঁ পাগল মাছরাঙা, চিল বা বাজ যাই হোক না কেন, তবে নির্ঘাত ছোঁ পাগল দৃষ্টি। দৃষ্টি ভ্যানচালকের দিকে নয়, মজিদের দিকে। চোখ বরাবর, আর চোখ দিয়ে হৃৎপিণ্ড বরাবর। মজিদের হাসিটা তখনও মুখে লেগে ছিল। হাসিটা এবার কথার সাথে শব্দ করে প্রকাশ হলো। বিজয়ী হাসি যেমন হয়। ‘আচ্ছা নানা, তুমার হুঁশটা ক্যামন, ওই ভাবে কেউ হাঁটে? বাড়ির চিন্তা রাস্তাত ক্যান? নানির সাথে ঝগড়া হইজে বুজি? বাড়ির রাগ বাড়িত মিটাও। যদি কিজু একটা হইয়া যাইত?’ হাসিমাখা কথাগুলো দিয়েই উপদেশ দিলো মজিদ। মোল্লা তখনও নির্বাক। ভিতরের ভাষাগুলো বারবার সংশোধন হচ্ছে; তবুও পূর্ণতা পায় না। উপযুক্ত হয় না মজিদের জন্য। আরও কংক্রিট ভাষা দরকার। সংশোধনী প্রক্রিয়ার মধ্যেই কাঁপছে মোল্লা। আবারও মজিদ বলল―‘নানা আইসো, ভ্যানোত উডো। তুমাক মুড়োত নামাইয়া দিমুনি। ভয় নাই, ভাড়া হামিই দিমুনি।’ চালকের কাঁধ থেকে গামছা নিয়ে ডান পাশে বসার জায়গাটা ঝাড়তে লাগল মজিদ। যেন অবশ্যই যাবে মোল্লা। মোল্লার আর কথা গোছানো হলো না। হোক এলোমেলো। আজকেই হোক একটা হেনোতেনো। সড়সড় করে এগিয়ে এলো ভ্যানের দিকে। খোঁড়া পা যেন দিব্যি ভালো, স্বাভাবিক। ভ্যানচালকের কপালে ভাঁজ পড়ল। অবাক হলো মোল্লার আসা দেখে। সত্যিই যাবে নাকি মোল্লা। মজিদ কয়েকবার ফুঁ দিলো ডান পাশের কাঠে। তবুও হাত দিয়ে পাশ দেখিয়ে দিয়ে বলল―‘বস নানা, বস!’

‘এই তুর ট্যাকাত ভ্যানোত যামু ক্যান? ফকিন্নির ব্যাটা! ট্যাকার গরম দ্যাখাস নাকি? এই শালা, এক বেলা খাইয়া আর এক বেলাতো না খাইয়া থাকিস, বউ তো মানুষের বাড়িত কাম কইর‌্যা বেড়ায়, আর এমন কামের দিনে শালা বাবু সাইজ্যা মুড়োত যাওজে। কিসের ন্যাঙটা ফুটানি করিস, শরম লাগে না?’

প্রতিপক্ষের মাথা ফাটানো রাগ হলেও মাথা ফাটালো না। পায়ের গোড়ালি তুলে জোর করে কয়েকবার লম্বা হলো শুধু; মজিদের বুক বরাবর। মোল্লার আগুনি নিঃশ^াস হয়তো লেগেছে মজিদের চোখে, নাকে, মুখে, বুকেও। ঘাড়ের রগগুলো ক্ষুদ্রান্ত্রের স্পষ্ট বিছানো নাড়ি। ফোলা ফোলা নাড়ি। মোল্লা এক নিঃশ^াসে কথাগুলো বলে হাঁফিয়ে উঠেছে। কথাগুলো যেন পূর্বের মুখস্থ। পাকা যাত্রা অভিনেতার মতো বলে ফেলল লম্বা ডায়ালগ। হাত তালিটাই পড়েনি শুধু। চলমান কিছু লোকও জড় হয়েছে সেখানে। একটু দূরের কেউ হায় হায় করছে, সর্বনাশ হয় হয় ভেবে। ধারে কাছের দু’একজন স্বাভাবিক ঘটনা ভাবল। তবে এও ভাবল, আজকের মাত্রাটা বেশি। ভীতু দু’চারজন পালিয়ে গেছে, সাক্ষী দেবার ভয়ে।

রামপদ মাস্টার সেদিক দিয়ে যাচ্ছিল। অবসর নিয়েছে পাঁচ বছর। তবুও মাস্টার। ছোট-বড় সবার মাস্টার। গ্রামের লোকজন সম্মান করে। যথেষ্ট ধনী মানুষ। ধনী সম্মানেও। মাস্টার আসতেই সবাই তার দিকে তাকালো। কেউ কেউ হাত উঁচিয়ে নমস্কার করল। মোল্লার দিকে তাকিয়ে মাস্টারের বুঝতে বাকি থাকল না ঘটনাটা। আরিফ মোল্লার রাগ সম্বন্ধে তার জানা আছে। মোল্লার কাছেই গেল মাস্টার। পিঠে হাত দিয়ে বলল―‘তোমারও যেমন রাগ বাপু; চ্যাংড়াপিল্যার কথায় অত রাগে?’

লোকজন ভেবেছিল মাস্টারের ওপরও ক্ষেপে যাবে মোল্লা। অন্য কেউ হলে হয়তো এমনটিই হতো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হলো না। বরং নালিশ দিলো। ‘না বাপু, তুমি জানো না, ঐ শালা হামার সাথে জুঁকের মুতন লাইগা থাকে। ঐ শালার আসলে জন্মেরই ঠিক নাই, চেনু অক পাগারোত১ জন্মায়জে।’ হাঁপিয়ে উঠল মোল্লা। মাস্টার এবার নাতি সম্বন্ধীয় মজিদের দিকে তাকালো―‘আর তোমারও শালা কাজ নেই, খালি মোল্লার সাথে লেগে থাক। পেয়েছটা কী? তুমি দেখি সব সময় এই সহজ সরল ভালো মানুষটার পেছনে লেগে থাক। খুব বাড় বেড়েছে।’ মজিদকে কৃত্রিম রাগ দেখালেও ভ্যানচালককে একটা ইশারা করল। ভ্যানচালক এমন একটা ইশারার জন্য যেন কয়েক যুগ ধরে অপেক্ষা করছিল। সে দ্রুত কাক্সিক্ষত কাজটা করল। মোল্লা আটকালো না ভ্যানকে। শুধু মাস্টারের দিকে একবার তাকালো, লোকজনের গুনগুন একটু বাড়তেই সে হাঁটা দিল জমির উদ্দেশে। পিচঢালা পথের ভুলত্রুটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার দায়িত্ব যেন সে পেয়েছে। মাথা নিচ দিকে ঝুলিয়ে সেভাবেই হাঁটছে।

আরিফ মোল্লা রাস্তার ধার ঘেঁষেই হাঁটছে। তবুও সবার চোখে সে হাঁটছে মধ্য পথেই। কারণে অকারণে সকল ভ্যান বা সাইকেল চালক বেল বাজায়। কেউ কাছে এসে কেউ অনেকটা দূরে থেকেই। যারা দূর থেকে বাজায় তারা খানিক আগের ঘটনাটা হয়তো শুনে থাকবে। বেলের প্রতিটি টুংটাং তির হয়ে মোল্লার বুকে লাগলেও তার রাগ বাঁক নিয়েছে অন্যদিকে। এবার নেতার গুষ্টি উদ্ধার করতে লাগল। বিড়বিড় করে, কিছু শব্দ করে―‘কত বড়বড় রাস্তা কাঁচা পইড়া আজে, তা থুইয়া শালারা পাকা করিজে এই ঘোর গাঁয়ের রাস্তা। আসল কথা, কাদোর দিনে শালারে গাড়ি ঢুকতে পারে না তো তাই।’ মোল্লার কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়। কেউ বিশ^াসই করেনি এই অজোগ্রামের রাস্তাটা পাকা হবে। কিন্তু হয়ে গেল।

বড় নেতার শ^শুরবাড়ি এই গ্রামে। রাস্তা তো পাকা হবেই। মাসে দু’একবার সে আসে এই গ্রামে। খরানিকালে ধুলোর অত্যাচার, আর বর্ষাকালে  গ্রামের বাহিরে বড় রাস্তায় গাড়ি রেখে হাঁটুঅব্দি প্যান্ট গুছিয়ে, হাতে জুতা নিয়ে পা টিপে তবেই গ্রামে ঢোকা। ইচ্ছা থাকলেও হাত মিলিয়ে সালাম দিতে পারে না কারও সাথে। পিছলা পথের দিকে নিখুঁত দৃষ্টি রাখতে গিয়ে মূল্যবান লোকও মাঝে মাঝে ফসকে যায়। যে লোকটা ভোটের সময় তার কাছে খুব কাজের। রাস্তাটা হওয়াতে জনপ্রিয়তা বেড়েছে। অন্তত এই গ্রামে। খুশি হয়েছিল আরিফ মোল্লাও। আসলে রাস্তা আদায় করে নেবার দলে সেও ছিল। রাস্তা তৈরি করার সময় দু’বার গণ্ডগোলও হয়েছিল ঠিকাদারের সাথে। ওখানে খোয়া কম হলো, এখানে পিচ কম হলো ইত্যাদি নিয়ে। রাস্তা হলো অবশেষে। বিদ্যুৎও এলো গ্রামজুড়ে। রাস্তার ধূলো-কাদা গেল, গ্রামের অন্ধকার গেল। তবে মোল্লার মতো গেরস্থদের একদিক কিছুটা অন্ধকার হলো।

বিদ্যুৎ আসার আগে গ্রামসুদ্ধ মোটেই তিনটা বাড়িতে টিভি ছিল। উঠান, বারান্দা ভর্তি হয়ে লোকজন টিভি দেখে যেত। বিরক্ত হতো আরিফ মোল্লা বা মোল্লারা। কখনও কখনও ক্ষেপে যেত মানুষের ওপর। তবুও তিতা ওষুধের মতো হজম করে লোকজন। কারণ ধারাবাহিকটা জমে উঠেছে। আগামী সপ্তাহে নাটকের মূল রহস্য উন্মোচন হবে। ঘটনাগুলো উপভোগও করত মোল্লারা। টিভি খোলার আগে কেমন কাঙালের মতো বাহিরে ঘুর ঘুর করত সবাই। মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারে না তারা। খাসি কেটে খাওয়ালেও অত খুশি হবে না, যতটা টিভি খুললে হবে। আজকের ধারাবাহিকের আলোচনাই কালকে কাজের গতি বাড়াবে। নইলে দেখা লোকের গল্প শুনতে আন্ধার আন্ধার মনে হবে। গল্পের মধ্যে ঢিলও ছুড়তে পারে না অদেখা ব্যক্তি। সুযোগগুলো কাজে লাগায় আরিফ মোল্লা। দাতা হয়ে বলে―‘এই পিন্টু, ঐ সেন্টু, ব্যাটারিডা বাইর কর, টিভি সাবধানে বাইর করিস।’ যক্ষের ধন পাওয়া ব্যক্তিরা ছুটে যায় ভেতরে। কেউ টিভি বাহির করে, কেউ  সুবিধামতো জায়গা দখল করে। আর ঐ পিন্টু সেন্টুদের মাতব্বরিতেই মোল্লাদের কাজের লোকের অভাব হয় না।

এখন বাড়ি বাড়ি টিভি। তেমন কেউ আসে না টিভি দেখতে। যে দু’একজন আসে, তাদেরকে আগেও যেমন সহ্য হতো না, এখনও হয় না। মোল্লাদের কোনো কাজে লাগে না তারা। অন্যদিকে রাস্তাঘাট পাকা হয়ে কামলারা যেন জমিদার সেজে গেছে। অনেকেই ভ্যান কিনেছে, কেউ কেউ ভটভটি নছিমন। ক’দিন হলো আবার নতুন ফিকির এসেছে। লোকজন বলে ভংচঙের ব্যবসা। ব্যবসাটার নাম হয়তো না বুঝেই দিয়েছে তারা। মেয়েদের চুল আর হাঁসের পালক কেনার ব্যবসা। সেই ভোরে তারা বের হয় আর দু’তিন দিন পর বাড়িতে ফেরে। কেউ আবার সপ্তাহ। এতে নাকি মানুষের বাড়িতে কামলা খাটার চেয়ে তিনগুণ বেশি আয় হয়। মৌসুমে কামলাদের অভাবে হাহাকার পড়ে যায়। টাকা বাড়তি দিলেও কামলা পাওয়া যায় না। তেল মাখিয়ে লোক ঠিক করতে হয়। কাজের ধরনও বদলেছে। একবার জমিতে নামবে এবং একবারেই উঠে আসবে। যোহরের আজান দিতে যা দেরি। আজানে বলে, ‘আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর’, আর তারা যেন শুনতে পায়, ‘উঠে যা উঠে যা’। গেরস্থমহল এতে ক্ষ্যাপা হলেও উপায় নেই। লোকের অভাব, তাদের সাথেই সুর মিলাতে হবে। একে বলে এক ভাওয়া কাজ। বাড়ি ফিরে গোসল, খাওয়া-দাওয়া। কিছুটা বিশ্রাম নিয়েই বাবু সাজা। হাতে ঘড়ি বাঁধে অনেকেই। মোড়ের বাজার তাদের চুম্বক হয়ে টানে। ঘর থেকে বেরুলেই পাকা রাস্তা। রাস্তার ধারে এসে এক ঘণ্টা দাঁড়াবে পায়ে হাঁটা পনের মিনিটের জন্য। কখন একটা ভ্যান আসবে, সেই ভ্যানের আশায়। পাঁচ টাকা ভাড়া দিয়েই মোড়ে যাবে। কেউ যেন কৃপণ বলতে না পারে। আত্মসম্মান বড় টনটনে। অথচ রাস্তা পাকা হবার আগে বিশ মিনিট কেন তিন-চার ঘণ্টার কাঁচা রাস্তাও পায়ে হেঁটে গেছে তাদের অনেকেই। এখন কি খরানি কি বর্ষালি দিন। মোড়ে যাবে, চা খাবে, জিলাপি খাবে, পিঁয়াজু খাবে। এমন কী, গেরস্থ যে টেবিলে বসে চা খাচ্ছে তার পাশের টেবিলে বসে খাবে। পা দুলিয়ে, চোখে-মুখে হাসি নিয়ে, কেউ কেউ গেরস্থের সাথে পাল্লা দিয়ে খাবে। মোটকথা, ঘরে খাবার থাকুক না থাকুক, মোড়ে যাওয়াই চায়, দু’টাকা খরচ করাই চাই। কেউ আছে, রাতে খাবার জোগাড় নিয়ে বউয়ের সাথে ঝগড়া করবে, দু’ঘা দরকার হলে দিবে, তবুও মোড়ে যাবে। রাত দশটা পর্যন্ত আড্ডা দিবে, চা খাবে। শুধু কি চা, চায়ের সাথে টা-ও থাকে। টা মানে টেলিভিশন, ভিসিডি; সিনেমা। ‘সুজন সখী’ কিংবা ‘দেবদাস’ নয়। বর্তমানের সিনেমা। বিদ্যুৎ আসাতে প্রায় চায়ের স্টলে ভি.সি.ডি চলে। রঙিন টেলিভিশনে ছবি। এক দোকানদার আরেক দোকানের সাথে পাল্লা দিয়ে গানের সময় ভলিউম দেয়। কাস্টমার তখন হিড়হিড় করে ঢুকে পড়ে। এদের মধ্যে কামলার দলই বেশি।

মাঠের মধ্যে পা ফেলেই দাঁড়াল মোল্লা। বিশাল মাঠ। তাকে দু’ভাগে ভাগ করেছে জেলা পরিষদের রাস্তা। পশ্চিমভাগের অংশ বড় আর পুব অংশ ছোট। পশ্চিমভাগের নাম ভাতারমারি পাথার। কোনো এক কালে কোনো এক বউ নাকি তার স্বামীর জন্য লাহারি২ নিয়ে গিয়েছিল সেই মাঠে। লাহারি নিয়ে যেতে দেরি হবার কারণে স্বামী তাকে হাল বাওয়া পান্টি৩ দিয়ে বেধড়ক মারলে বেভাগে লেগে মরে যায়। সেই থেকে মাঠটার নাম ভাতারমারি পাথার। বউমারি পাথার হলে বোধহয় ঠিক ছিল। কিন্তু হয়ে গেল ভাতারমারি পাথার। এই কাহিনি এলাকাতে এখন কিংবদন্তি। পুবের অংশের তেমন নাম নেই। তবে নাম আছে উর্বরতার জন্য। আউশ না করলে আমন ভালো হয় না। আমন উর্বরতার বলকের তোড়ে গলে যায়। তাই আউশ করে সেই টকবগে বলকে পানি ঢালা। মাঠের চারধারে ছবির মতো গ্রাম। পাড়িশো, দুর্গাপুর, হরিপুর, বারঘরিয়া, বাতাসপুর, মহাদেবপুর, ধানোরা, মাদারীপুর, বিহারৈল। বাহারি সব নাম। তার মাঝে এই মাঠ। মাঠের সৌন্দর্য গ্রাম অথবা গ্রামের সৌন্দর্য মাঠ। তবে সঠিকভাবে বলা মুস্কিল, কে কার অলংকার। এই মাঠের মধ্যে সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে দু’টি দিঘি। বিশাল দিঘি। মিরা দাওয়ানের দিঘি। দিঘির পাড়েই পির মিরা দাওয়ানের মাজার। অনেকের ধারণা, এই দাওয়ানের আশীর্বাদেই এখানের জমিন এত উর্বর। দাওয়ানের নামে পিরপালের যত সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানায় দখল হয়ে গেলেও দিঘি দুটি এখনও হয়নি। এতে আরও বেহাল অবস্থা তাদের। ভিখারির মহাসুন্দরী বউয়ের মতো। যে যখন পারে। দখলে রাখা বলে কথা। দিঘিও তাই। যে ক্ষমতায়, দিঘি তার। ক্ষমতাসীন দলের কোনো লেজুড় হলেই চলে। দুই দিঘিকে ঘিরে একটা সমবায়-সমিতিও গড়েছিলেন এলাকার সকল কৃষক মিলে। নাম দিয়েছিলেন ‘পরশমণি বহুমুখী সমবায় সমিতি’। দিঘি দু’টি সরকারের কাছ থেকে লিজ নিল সমিতি। পরিষ্কার হলো দিঘির পানা। মাছচাষ হলো নানা পদের। শত বিঘায় বোর ধান চাষও হলো সেই দিঘির পানিতেই। সোনালি ধানে ভরল মাঠ। পুকুর ভরল মাছে। স্বপ্ন ফলল মাঠে, স্বপ্ন ফলল দিঘিতে। স্বপ্ন ফলল শত কৃষকের চোখে। আবার সেই স্বপ্ন হঠাৎ উড়ালও দিল স্বপনখেকোর চাহনিতে। মারামারি হলো, যখম হলো। আবার উল্টো হাজতেও গেল শত কৃষক। দিঘি দখল নিল ক্ষমতার লেজুড়। এলাকার মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল, পরশমণির পরশে এলাকায় সোনা ফলবে। সোনা ফলেনি। সোনা গলাতে গিয়ে বরং অঙ্গার হয়েছে স্বপ্নচারী।

মোল্লা দেখছে মাঠ। যে যার মতো ব্যস্ত ভুঁই ঢাকাতে। রোদের চিটপিটানি জানান দেয়, দ্রুত মাঠ ঢাকবার কথা। পানি শুকালে আর হবে না। তবুও ধান রোপণের ছুপছুপ শব্দ মোল্লার শুনতে ভালোলাগে। এ এক আদিম শব্দ। চিরকালীন আর ভালোলাগার শব্দ। কুঁহুুক জাগায় মনে, শাণিত করে চিন্তার ডালপালা। মোল্লা আর দাঁড়ায় না। হাঁটা দেয় তার সুখ আর শান্তির আবাসে। তার ভুঁয়ে। দু’দিনের মধ্যেই ঢেকে যাবে ভুঁই। তার পরেই স্বাদ ফিরে আসবে সকল গ্রন্থিতে। পানের পিকে, লালিগুড়ে টোকা দেওয়া রুটিতে। ভাতের থালাতে, রুই মাছের পেটিতে। স্বাদ ফিরে আসবে লবণ-ভাতেও। ধান না লাগানো পর্যন্ত সবকিছু বিস্বাদ।

আরিফ মোল্লা তার জমির আলের কাছে আসা মাত্রই তার সব কিছু সপ্তমে পৌঁছালো। জমিতে একজনও কামলা নেই। বিছনের আঁটিগুলো ছড়ানো ছিটানো। পাঁচ বিঘার দাগ। আউশ ধান না করলে এই জমিতে আমন ভালো হয় না। খুবই উর্বর জমি। প্রতি বছর আউশ ফলিয়ে কিছুটা শক্তি কমাতে হয়। তারপর আতপ ধান লাগায়। এবার অবস্থা কিছুটা বেগতিক। আকাশের অবস্থা ভালো নয়। আষাঢ় মাসে বৈশাখের খরা। তবে এক ঝলক বৃষ্টি হয়েছিল। জোরতাল বৃষ্টি। অনেকের ধারণা এবার বন্যা খুব তাড়াতাড়ি হবে। জমির আল ডুবিয়ে দু’দিন ধরে বৃষ্টি হয় ঠিকই, কিন্তু পরে আর বৃষ্টির দেখা নেই। আকাশ অনেক ওপরে উঠে গেছে। পানি কমতে শুরু করেছে। আর এই পানিতেই তাড়াহুড়ো করে সবাই ধান লাগাচ্ছে। যেন জমি কোনো রকমে ঢাকবার উৎসব। আরিফ মোল্লা এই উৎসবের বড় হোতা। বাজারদরের চেয়ে দশ টাকা বেশি দিয়ে পনের জন কামলা ঠিক করেছে। যত তাড়াতাড়ি জমিতে বিছন পুঁতা যায়। ধান মরণের জাত নয়। যতই খরা হোক, বৃষ্টি একদিন হবেই।

আরিফ মোল্লা জমি দেখতে এসে চোখে সরষে  ফুল দেখল। ফাঁকা ভুঁই। ঘোলা পানি টলটলে হয়ে এসেছে। তার মানে অনেকক্ষণ থেকেই কামলারা নেই জমিতে। খানিক দূরে বাঁঠু সাত্তার ও তার ছেলে ধান লাগাচ্ছে। তাদের ধান রোপণের ছুপছুপ শব্দ মোল্লার উনুনে বাতাস দিল। তা ফুলকি দিয়ে মাথার মধ্যিখানে উঠে এলো। সাত্তারকে চিল্লিয়ে ডাকলো মোল্লা― ‘এই ছোঁড়া, এই শালারা কুনডে গেজেরে?’

বাঁঠু সাত্তার হাত হতে বিছনের গোছাটা ফেলে দিয়ে মাজা খাড়া করে দাঁড়াল। আরিফ মোল্লা কী জিজ্ঞাসা করল সে স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে। মোল্লা যে প্রচণ্ড মাত্রায় ক্ষেপেছে তাও সে বুঝতে পারল। তারপরও জিজ্ঞাসা করল আবার―কী গো দাদা, কী বুইললেন?

‘ধান লাগান থুইয়া কুইত্তার বাচ্চারা কুনডে গেজে?’

‘ও, তুমার ভুঁয়ের মানুষেরা?’ বাঁঠু সাত্তার এবার তার জমি থেকে এক পা দু’পা করে উঠে এলো। নেংটির গিটটা খুলে দু’বার ঝাড়ল লুঙ্গিটা। মনে মনে হয়তো একটা ফন্দিও আঁটল। মোল্লার কাছাকাছি এসে বলল―‘বুইঝতে পারোজেন না, যেই গরম পড়িজে; অতক্ষণ ভুঁয়ে থাকা কি মুগের কথা। ওরা মুনে হয় মুড়ের ওপর চা খাইতে গেজে। স্টলে বইস্যা একটু আরাম করোজে।’

‘ও শালা, গরম খালি ওরোকই লাগোজে, তুমাক লাগে না?’

‘দাদা, এইড্যা বুইঝলেন না; এই জমি হামার লিজের। দিন গেলে কেউ তো আর পয়সা দিবেনানি। তুমার ভুঁয়ে দিন গেলেই পয়সা। ওরা মুনে হয় ফেচ্চুর দুকানোত চা খাইতে খাইতে সিডি দ্যাগোজে। আইজক্যা এ্যকটা ফাটাফাটি সিনেমা দিজে।’

‘শালারোক জম্মের সিনেমা দ্যগামু আইজক্যা।’ হাঁপাতে হাঁপাতে খোঁড়া পায়ে ছন্দ তুলে মোড়ের দিকে হাঁটতে লাগল মোল্লা। বাঁঠু সাত্তার শুধু মাথা চুলকিয়ে বলল―‘অরে সাথে ঝগড়া লাইগো না য্যান দাদা। ওরে না থাকুক তুমার মান-সম্মান আজে, নাকি? আর হ্যাঁ, তুমি আবার বুইলো না, হামি তুমাক কদাগুল্যান বুলনু।’ মোল্লা কোনো উত্তর না দিয়ে হাঁটা দিলো সোজা মোড় বলে। মোড়ের কাছাকাছি আসতেই মোল্লা দেখতে পেল কামলারা দল বেঁধে জমির দিকে আসছে। তারা দূর থেকেই দেখতে পেয়েছে মোল্লাকে। একে অপরের মধ্যে ফাসফুস শুরু করে দিয়েছে। কাছাকাছি আসতেই দলের সর্দার কবির বলল― ‘দাদা গরমে জান যাওয়া-আসা হইয়া গেজে একেবারে। এ্যকনা জি আরাম খামু, একটা গাছ টাছও নাই পাথারোত। তাই মুড়ের উপর যাইয়া এককাপ চাও খাওয়া হইলো, এ্যকনা আরামও খাওয়া হইলো।’

‘এ্যকনা সিনেমাও দ্যাগা হইল।’ কবিরের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে মাড়ি পিষে কালাই ডলা করে বলে ফেলল মোল্লা।

‘তুমাক আবার সিনেমার কদা কে বুইললো?’ সঙ্গতিহীন একগাল হাসি দিয়ে কবির বলল কথাটা। দলের সর্দার হলেও এমন হাসিতে তাকে বোকা মনে হলো। প্রচণ্ড রোদের মধ্যেও ছাতাটা মোল্লার বগলেই ছিল। এবার ছাতাটা নিয়ে মাটিতে ঠেস দিয়ে মাজা হিলায়ে কতকটা লাগামহীন বলে ফেলল―‘এই শমুন্দিরা, তুইরে ম্যাগেরা নাঙ কইর‌্যা হামাক ট্যাকা দিয়া যাই। যেডা তুইরোক দিই। নাকি ট্যাকা বলদের পাছা দিয়া পড়ে।’

‘দাদা মুগের ভাষা ঠিক কর।’ কবিরের পাশ থেকে একাব্বর বলল।

‘এই ফকিন্নির বেটা, তুর কাজে ভাষা শিগা লাইগবে। শালা ন্যাঙটা কুনডেকারা।’ মোল্লা হাঁপিয়ে উঠেছে।

কবিরও এবার সত্যি সত্যিই ক্ষেপে গেল। ‘দাদা, তুমার এক পা কব্বরের মধ্যে চইল্যা গেজে তাও মুগের ভাষাডা ঠিক হইল না। তুমি কিসের শালা বড়লোক গো, পাইটের৪ সাথে কীভাবে কদা বুলা লাগে তাও জানেন না?’

পাশে থেকে অন্যজন বলল―‘চলো তো, এই শালার কামই করমু না। দেগি শালা কুনডে মানুষ পায়।’

‘ও শালা, জমিদার সাজোজেন। হামার ইয়ের লেলপি-ছেদলি না খাইলে তো জান বাঁচে না। আবার বড় বড় কদা।’

দলের মধ্যে সবচেয়ে একাব্বরের মাথাটা বেশি গরম। সহজেই রেগে যায়। নিজেদের মধ্যেই অনেক সময় তার ঠোক-ঠুকি হয়। সে আর থেমে থাকতে পারল না। বলেই ফেলল অবশেষে―এই শালা ন্যাংড়ার বাচ্চা, আর একটা কদা বুইললে ভালো ঠ্যাংডাও ভাইঙ্গা দিমু।

‘ওরে ছুটোলুকের বাচ্চারে; শালা হামার ঠ্যাং ভাঙ্গার আগে তুরডাই ভাংমুরে শালা।’ ছাতাটা তুলে একাব্বরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল মোল্লা। পেছন থেকে বাঁঠু সাত্তার জাপটে ধরলো। ‘এই দাদা থামো, মাথা অত গরম কইরলে চলে।’ বাঁঠু সাত্তার কিছুটা আগেই সেখানে এসেছিল। শুধু সে নয় আরও দু’দশজন জুটেছে। অশ্লীল গালিগালাজ অনেক হলো দু’পক্ষের মধ্যে। মালিক আর কামলার মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকল না। যার মুখে যা এসেছে তাই বলেছে। জমা হওয়া লোকজন উপভোগ করছে ব্যাপারটা। তারা শুধু হাতা-হাতিই হতে দেয়নি। অবশেষে কবির সমাপ্তি টানলো দলের লোকদের এই কথা বলে―‘এই চল, হামরা এই শালার কামই করমু না। দেগি শালা পাইট কুনডে পায়?’ আরিফ মোল্লাও এই বলে সমাপ্তি টানলো―‘যাও যাও ফকিন্নির বেটারা, ভাত ছিটালে কাকের অভাব হবেনানি।’

দু’দিন গত হলো, আরিফ মোল্লার ঘুম নেই। কোনো কামলার দলই তাকে কাজ করে দিতে চায় না। কোনো না কোনো অজুহাতে সবাই এড়িয়ে যায়। মনে মনে কামলার গুষ্টি উদ্ধার করে। আবার গুষ্টি উদ্ধার করতে কবিরকেও ছাড়ে না। ঐ শালাই যত সব ল্যাঠা লাগিয়েছে। গ্রামের সব কামলাকে সে-ই বারণ করে এসেছে। এসব মোল্লার ধারণা। বিষ হজম করে হলেও দশ কামলার হাত ধরে, মজুরি বেশি দিতে চায়। তবুও কামলা আসে না। বাড়ির বাহিরে মনের আগুন জোর করে চেপে রাখলেও, বাড়ির মধ্যে তা জ¦লে। বউয়ের আর পাঁচ দিনের মতো স্বাভাবিক কথাতেও তেলে বেগুনে জ¦লে ওঠে মোল্লা। বাড়ির অন্যরা ভয়ে কথা বলে না। বাড়িতে মোল্লার উপস্থিতি মানেই শ্মশানের নীরবতা। কোনো দিকে খেয়াল নেই মোল্লার। তার অস্তিত্বজুড়ে অসম্পূর্ণ কাদাময় ভুঁই। দিনে দু’তিনবার ভুঁইয়ের দিকে যায়। কাদা এঁটে আসতে শুরু করেছে। ভুঁয়ের দিকে তাকিয়ে কান্না আসে। আর দু’একদিনের মধ্যে না ঢাকতে পারলে সার, পাউষ, চাষ-মই-বিছন সব মাটি হয়ে যাবে। কাঁদরে ভুঁই। একেবারে বেলে-দোঁআশ। পানি কমলেই সিমেন্টের মতো জমে যায়। তখন আর কিছুই করার থাকে না গেরস্থের। আবার হাল-মই। অর্থাৎ নতুন করে তৈরি করা। কিন্তু সেই উপায়ও নেই। পানির যেই অবস্থা!

না, আর বসে থাকা যায় না। বিকল্প কিছু একটা করা দরকার। কিন্তু মোল্লার মাথাতে কাজ করে না। মাথা মিলিয়ে যায় শূন্যতায়। মাথার ওপর কী যেন সারাক্ষণ ওড়ে। বাজপাখি, চিল, না হয় কাক। দাঁড়কাক, পাতিকাক। তবে তাদের ওড়াউড়ির ভাষা এক। মোল্লা দিব্যি শুনতে পায়, সবাই বলছে―কা কা। সর্বনাশে ডাক। মোল্লা আকাশের দিকে তাকায়। কিছুই দেখতে পায় না। দেখতে পায় শূন্য আকাশ। নিচে তাকালে দেখে, বিছনের আঁটি ছড়ানো ছিটানো ভুঁই।

দুই.

মোড় থেকে এসে এইমাত্র দাঁড়াল মিনহাজ। দাঁড়াতেই প্রশ্নটা এলো। হঠাৎ এমন একটি প্রশ্ন আসবে বুঝতে পারেনি। এমন সময় এমন একটি প্রশ্নের জন্যে মিনহাজ কেন, কারও প্রস্তুত থাকবার কথা নয়। ভয়ংকর তাপমাত্রার দুপুর। পৌনে দুপুর। তাছাড়া এমন গরমে বিয়াতাতে অর্থাৎ ধানের চারা ফেলবার ভুঁয়ে লাঙল দিয়ে, মই টেনে, হাত পায়ের কাদা না ধুয়েই এমন একটা প্রশ্ন বা চিন্তা কী করে বাপের মাথায় এলো, তা ভেবে পেল না মিনহাজ। বুঝে উঠতে পারল না এর উত্তরই বা কী দিবে। বাপ তখনও তাকিয়ে আছে ছেলের দিকে।

আজ সকালে প্রশ্নটা ঢুকেছে সুরমানের মাথায়। প্রশ্নটা তার মাথায় আসত না, যদি ছেলের মোবাইল ফোন কানে না ধরত। ছেলে ভুল করে মোবাইলটা রেখে মোড়ের দিকে গিয়েছিল। আরিফ মোল্লাকে নিয়েই আলোচনা এখন মোড়ে মোড়ে। ভেবেছিল যাবে আর আসবে। কিন্তু মাল্লার কাহিনি শুনতে গিয়ে এমনটা হলো। দেরি হলো ফিরতে। আর ফোনটাও এলো এমন সময়। পরপর দুবার বাজলো ফোন। তৃতীয়বার বাজতেই তুলেছিল সুরমান। ঠিক তখনই ওপাশ থেকে এলো কথাটা―

কি কবি সাহেব,  গ্রামে গিয়ে আসতে মন চায় না?

নারে বাবা হামি কবির আব্বা? সে বাড়িত নাই।

স্যরি আঙ্কেল, সে আসলে ফোন করতে বলবেন।

আচ্ছা।

ফোনটা রেখে দেয় সুরমান। ওপাশে কাটল কি না, তার বালাই নেই। সুরমান কাটল না, রেখে দিলো। কিন্তু মনের মধ্যে প্রশ্নটা ঠিক গজিয়ে উঠল। তার মিনহাজ কী করে কবি  হলো। সেও কি নামটা বদল করল? শঙ্কিত হলো মনে মনে। সে জানে, তার গ্রামের সফিক ঢাকাতে গিয়ে কী করে সেলিম রেজা হয়েছিল। অনেক টাকাও কামিয়েছিল। আবার জেলেও গেল। এখনও সে গারদে। তার ছেলেও কি…? নাকি শহরের মানুষ ভালো কোনো পদবি দিয়েছে তার ছেলেকে?

কইরে বাপ, উত্তর তো দিল্যা না? আবারও প্রশ্নটা করল সুরমান।

কোন উত্তর? ছেলের না বুঝার ভানে বাবার মনের খটকা আরও দানা বাঁধে।

ক্যান বুলনু না, মানুষ কগন কবি হয়? বাপ আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে গেল সন্তানের দিকে।

ও সেই কথা! বিষয়টা হালকা করবার চেষ্টা করলো মিনহাজ। মুখে হাসির রেখাগুলো স্পষ্ট হলো।

হঠাৎ এ কথা কেন আব্বা? কেউ কি কিছু বলেছে?’

দ্যাখো বাপ, তুমি কিন্তুক পাশ কাটাবার ফন্দি আঁটছো। হামার কাছে কিছু লুকাবা না। হামি তুমার বাপ। তুমি কুনো সব্বনাশে কাজে যাওনি তো? নাম বদলাওনি তো?

ছি ছি আব্বা, এসব কথা বলছো কেন? হঠাৎ এসব কথাই বা তোমার মাথায় এলো কেন?

তুমিও তো প্যাঁচাল পাড়ছো বাপ। বুললেই তো হয়, কবি মানে আসলে কী?

শোন, কবি ঐ মানুষটাকে বলে, যে কবিতা লেখে। এটা কোন লোকের নাম নয়। তুমি অত সব বুঝবে না।

তা বুঝালেই তো হয়।

অভিমান ভরা মুখে সুরমানকে কতকটা শিশুর মতো দেখালো। তারপরও নতুন করে প্রশ্ন করল―তা বাজান, তুমিও কি কবিতা ল্যাখো?

আমি বুঝতে পারছি না, তুমি হঠাৎ কবি, কবিতা নিয়ে পড়লে কেন?

বিরক্তি আর রাগ মিশিয়ে কথাগুলো বলে আগাতে চাইল মিনহাজ। কিন্তু বাপের হাতে একটা অদৃশ্য দড়া ছিল। তাতেই টান দিলো।

মেয়েটি যে ফোন কইর‌্যা বুইলল, কবি সাহেবের কদা?

ফোন করেছিল? কখন ফোন করেছিল সেঁজু?

হঠাৎ চোখ মুখ লাল হয়ে উঠল মিনহাজের। রাগে, লজ্জায় আর বোকামির জন্য। রাগ হলো সেঁজুতির ওপরও। ফোন করবার আর সময় পেল না হারামি। রাগ হলো নিজের ওপর। কেন যে ফোনটা সাথে করে বের হলো না, তার জন্য। বাবা কিন্তু তখন মুখ ঘুরিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। তবে ফোঁড়ন কাটতে ছাড়লেন না―তা কবি সাহেব, তুমার মা মুনে হয় ডাকোজে, বাড়ির মইদ্দে যাও। মিনহাজ আরও রাগল, তবে মনে মনে। বাপের ওপর, নিজের ওপর আর তার সেঁজুর ওপর। দ্রুত জায়গা ত্যাগ করল, বাড়ির মধ্যেও গেল কিন্তু বাড়ির মধ্যে থাকল না। ফোনটা হাতে নিয়ে দ্রুত বাহিরে এলো। গেল বাড়ির পেছন দিকটার দিকে। যেখানে নিমগাছের ছায়া আছে, নিরিবিলি বসবার অবকাশ আছে। ফোন নিয়ে গিয়ে গাছের গোড়ায় বসবে। ঝগড়া হবে সেঁজুতির সাথে।

মাটি থেকে কিছুটা ওপরে পিঠ তুলে থাকা শিকড়ে বসল মিনহাজ। পা লম্বা করে বসলেও স্বস্তি নেই মনে। মিলমিলে বাতাস ছিল; তবুও। ফোনটা হাতে নিয়ে সেঁজুতির নাম্বার স্ক্রিনে তুলল। ডায়াল করতে গিয়েও ডায়াল করল না। ঝগড়া করবার মুড নেই। বাবার কাদা মাখা শরীরটা সামনে ভেসে উঠল। কল্পনা করল আরিফ মোল্লার চিন্তা-কাতর মুখ। উঠে দাঁড়াল মিনহাজ। আবার কোনো লক্ষ্য ছাড়াই সামনের দিকে হাঁটা দিল; মাঠ বরাবর। খোলা মাঠে ঘুরলে হয়তো ভালো লাগবে। গ্রামে তার ভালোলাগবার জায়গা এখন একটাই; খোলা মাঠ। উদার হস্তে দান করে মাঠের প্রকৃতি। যত উপমা, যত উৎপ্রেক্ষা, ছন্দ-মাত্রা, চিত্রকল্প গড়াগড়ি খায় মাঠের জমিনে, আলে। যতকিছু নাও কিংবা ধারণ কর মননে-মগজে; ফুরাবার নয়।

মিনহাজ শহর থেকে বাড়ি এলে যেন অতিথি হয়ে আসে। গ্রামের অতিথি। নতুন করে গ্রামকে দ্যাখে। গ্রামেই জন্ম, গ্রামেই বেড়ে ওঠা। তবুও গ্রামকে তার সব সময় নতুন লাগে। প্রায় সাত বছর হলো সে শহরে গেছে। রাজশাহী শহরে। কলেজ শেষ করে এখন বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ে; বাংলা সাহিত্যে এমএ ক্লাসে। সে কবিতা লিখে। দেশের নামি দামি পত্রিকায় ছাপাও হয়। স্যারেরা বলেন, লেগে থাক, তোমার হাত আছে। ভালোকিছু করবে একদিন। মিনহাজ মনে করে তার কবিতার আধার পড়ে আছে গ্রামে। সে নগরে পড়ে থাকলেও নাগরিক কখনই হতে পারবে না। নগরের ইট-পাথরে শিকড় ফুটানো বড় শক্ত। তাই তো কবিতার কাঁচামালের গোডাউন হয়েছে তার গ্রাম। গ্রামে এলেই ক্ষেতে-খামারে, জমির আলে ঘুরে বেড়ায়। জমির আলে শামুকের ডিম দেখে পুলকিত হয়, আবার শামুকে পা কেটেও আনন্দ পায়। বকের মাছ ধরা দেখে হাসে, আবার দাঁড়কানি মাছের লাফালাফিতেও হাসে; শিহরিত হয়। অথচ শৈশবে এসব দেখে দেখেই সময় কেটেছে তার। তবে এখনকার মতো পুলকিত হয়নি কোনোদিন। এখন দেখে নতুন করে। জানার জন্য দেখে, সুন্দরের জন্য দেখে। নিজেকে সমৃদ্ধি দেবার জন্য দেখে।

আজকেও মিনহাজ এলো মাঠে। মাঝ মাঠে। অন্যদিনের তুলনায় একটু দূরেই গেল। হাঁটছে। এমন সময় হঠাৎ সামনে কাকে দেখল। ছায়াবাজির মতো পালাতে চায়। কে যেন আঁচলে মুখ ঢাকছে। জোর করে ঢাকা। কাপড়ে কুলায় না, তবুও ঢাকা। মুখ ঢাকতে উদোম হয় কাঁকাল। কাঁকালের টানটান ভাঁজ। যেন দানা ধরতে যাওয়া লালিগুড়ের পড়ন্ত ভাঁজ। হাঁটনের তালে তালে তারা ভাঁজ-তরঙ্গ খেলে। সেই ঢেউয়ের তালে লাফিয়ে মরে কোমরের ডালি। কিছু কুড়াতে বা জ¦ালানি নিতে এসেছে মাঠে। দেরিতে হলেও মিনহাজ ঠিকই চিনতে পারে, এটা আলো। ছোট করে একটা ডাকও দিল, আলো বলে। আলো শুনতে পেয়েও দাঁড়াল না। সোজা পা বাড়াল সামনে। আর মিনহাজের সামনে ভেসে উঠল এগার বছর আগের এক পুকুর, পুকুরপাড়, পুকুরে ভাসন্ত শাপলা। কায়াপুকুর। একটু দূরেই দেখা যায় পুকুরটাকে। তার কাছে এটা একটা রূপকথার পুকুর। অতীতে, বর্তমানে। হয়তো ভবিষ্যতেও এ পুকুর তার জীবনে রূপকথা হয়েই থাকবে।

অনেক গল্প ছড়িয়ে আছে এই পুকুরকে নিয়ে। আয়তনে ছোট হলেও গভীরতা কূপের মতো। তার গভীরতা আন্দাজ করা যায় পানির রং আর চারধারের উঁচু পাড় দেখে। নিচের ভুঁই থেকে ঘাড় উঁচু করে তাকাতে হয়, পাড়ের মাথা দেখতে হলে। পুকুরের পানি কাকের ন্যায় কালো। অনেকে বলে এই কারণেই এর নাম কায়াপুকুর। আবার কেউ বলে অন্য গল্প। খরাদাহে চারদিক শুকালেও এই পুকুর শুকায় না। অন্য পুকুরের তলাতে ঘাস জন্মালেও দিব্যি পানি টলমল করে কায়াপুকুরে। অর্থাৎ কাকে খাবার মতো পানিও যদি কোথাও না থাকে, তবে এই পুকুরে থাকে। তাই কায়াপুকুর। আরও পুরান আমলে গভীর জঙ্গলে ঢাকা ছিল পুকুরের চারধার। বাঘ থাকত এখানে। কোনো এক সময় বাঘও নাকি মারা পড়েছে এখানে। সেই থেকে এই মাঠকে কেউ কেউ বাঘ মারার বিলও বলে। মিনহাজ তার শৈশবে কিছু কিছু জঙ্গল দেখেছে। তখন বাঘের ভয় ছিল না। মানুষের যাতায়াত ছিল। অনেকে ছাগল, গরু চরাতে আসত এখানে। তবে পানি সেই আগের মতোই কালো। পুকুরে নামত না কেউ। সেই কালো পানিই আজ টানছে মিনহাজকে। পানির কথা মনে হতেই, তার পিছু পিছু আর একটা কথা চলে এল আনমনে। থমকে গেল মিনহাজ। আবার হাসি পেল মনে মনে।

তখন মিনহাজ পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। বড় দুরন্ত আর স্কুল ফাঁকি দেওয়ায় ওস্তাদ। সেদিন স্কুলে যায়নি। ঠিক দুপুর। সে গেল কায়াপুকুর। কী কারণে গেল, তা আর মনে নেই। হয় স্কুলে যাবার ভয়ে, নয়তো মায়ের তাড়ানি খেয়ে। ভাসা ভাসাও মনে আসে না, কেন গিয়েছিল। তবে যাবার পরের ঘটনাটা বিসিজি টিকার দাগের মত স্পষ্ট সেঁটে আছে মনে।

আলো, আরতি আর বুড়ি। তারা সেদিন ছাগল-ভেড়া চরাচ্ছিল কায়াপুকুর। বুড়ির ভালো নাম কিছু একটা আছে। মিনহাজ জানে না। মিনহাজ পুকুরপাড়ে উঠতেই তারা তিনজন একসাথে এলো। আসার ধরনটা এমন, যেন তারা আগে থেকেই মিনহাজকে দেখেছে। আর কিছু একটা মতলবও এঁটেছে। অপেক্ষা করছিল মিনহাজের উপস্থিত হবার। সে পাড়ে উঠতেই কাছে এলো আলো। পিছে পিছে আরতি আর বুড়ি। আলো কোনো ভূমিকা ছাড়াই বলল- এই ছোঁড়া হামাক কটা ল্যাল  তুলে দিবু। ম্যালা বড় বড় ফুল ফুটে আজে দ্যাক? এই বলে পুকুরের দিকে আঙ্গুল তুলে ফুলগুলো দেখাল। মিনহাজ দেখল কালো পানির ওপর বেশ কয়েকটা সাদা শাপলা ফুটে আছে। বাতাসে মাথা দোলায়। যেন ডাকছে কাউকে। সত্যই ডাকার মতো আকর্ষী আছে তাদের। ফুল আর পাতার ফাঁকে শোল মাছের পোনা খেলা করে। হাবুডুবু খেলা। মা শোল বোধহয় নিচের দিকে আছে। শাপলার ডাটা আর পাতা, মাঝে মাঝে নড়ে উঠছে। আলো আরও খানিকটা এগিয়ে এলো মিনহাজের নাক বরাবর। মিনহাজ একধাপ পিছে সরে গেল। কথা বুলিস না ক্যান? এ্যকনা তুলে দিলে কী হোবে?

ক্যা, হামি দিমু ক্যান? তুই তুল্যা খা।

জুঁক আজেরে ভাই। ভয় লাগোজে। তুই তো বেটা মানুষ, নামেক না।

ক্যা, তুরোক জুঁক কামড়াবে আর হামাক আদর করবে?

এই ছোঁড়া, হামরা কি কামড়ের ভয় করোজি? তুক বুঝামু ক্যামন কইর‌্যা।

তাহলে ভয় করোজু ক্যান?

ভয় করিনি রে ছোঁড়া, জুঁক তুর লাগলে তো পায়ে লাগবে, কোমরে লাগবে। হামার তো অন্য জাগাতেও লাগতে পারে। তগন যে বাইর করা যাবে না নি। বতকের গুশতো খাওয়া লাগবেনি। আরতি আর বুড়ি হাসতে লাগল খিটখিট করে। হাসল আলোও। মিনহাজ তাদের কথার মধ্যে ঢুকতে পারল না। ঢুকার চেষ্টাও করল না। তাদের সাথে তাল মিলিয়ে হাসার জন্যই শুধু হাসল। হাসার জন্য হাসা হলেও মিনহাজকে এই হাসিতে খুব নির্ভীক আর সাহসী ঠেকল। কার্তিকীয় গড়নের ফর্সা মুখটায় সূর্যের এক ঝলক আলো ঝাপটা মেরে পালাল। ঠিক এমন সময় বাকি তিনজনের চোখই হুমড়ি খেল ঐ মুখটার জমিনে।

তা হামি তুইল্যা দিমু ক্যান? অন্যদিকে তাকিয়ে কিছুটা ভাবলেশহীন প্রশ্নটা ছুড়ল মিনহাজ।

হামরা খামু তাই। একই ঢঙে তারাও উত্তর দিল।

তুরোক খাওয়াইয়া হামার লাভ কী?

ওরে ছোঁড়া, লাভ লোকসানও বুজিস যে? তা কী চাস বুল; চুমা খাবি? লে আয়। আলো নির্লজ্জের মতো কথাগুলো বলে আরও এগিয়ে গেল মিনহাজের দিকে। মিনহাজ দু’পা পিছনে সরে গেল। লজ্জা পেল সে। মুখটা আরও লাল হয়ে উঠল। ঘাম জমলো নাকের ঢিবিতে। হাতের উল্টো পিঠে নাকের ঘামটা মুছে নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টাও করল। বলল―না ভাই, প্যান্ট ভিজায়ে নামতে পারমু না। বাড়িত যাইয়া কী বুলমু তগন?

ওরে ছোঁড়া, বিনিময় চাস। প্যান ভিজাতে ভয়? তাহলে প্যান খুইল্যাই নাম। হামরা মুখ ঘুরাইয়া থাকোজি। শব্দ করে হাসল তিনজন।

তুমরা খুব পাজি। থাক, হামি গেনু।

আরে থাম থাম। এই লে গামছা; এডা পিন্দা নামেক। আলো তার বুক থেকে গামছা নামিয়ে দিল। গামছাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ধরে থাকল মিনহাজ। ফেলেও দিল না।

আরতি, বুড়ি আর আলো। তিনজনের মধ্যে আলোই বড়। ওড়না পরার বয়স হয়েছে তখন। ওড়না নেই। গামছা ছিল। তাও ফেলে দিল। আরতি আর বুড়ির পরনে ফ্রক। বুকে ঝালর লাগানো। ওড়না-ঝালর। ডানপিটে বেশি আলো। তার বয়সের সাথে এই ডানপিটে স্বভাবটা যায় না। এই নির্জন দুপুরে কিংবা জংলা পুকুর পাড়ে মিনহাজের চুমো খাবার বয়স হয়নি ঠিকই; তবে আলোর হয়েছে। তার এমন খোলামেলা কথা মানায় না। মাঝখানে লজ্জায় মরে মিনহাজ। লাল মুখটা সূর্যের লালে আরও একবার ডুবিয়ে মুখটা তুলল। তাকালো তিনজনের দিকে। তবে দেখতে পেল শুধু আলোকে। খোলা চুলে কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে আলো। বড় বড় চোখ। মুখে মায়াবী হাসির পোচ। তাকিয়ে মিনহাজের দিকে। মিনহাজের মনে হলো, আলো দেখছে গোটা মাঠ। গিলছেও বলা চলে। কোনো এক শক্তি তাকে ভর করেছে যেন। অপশক্তি নয়; শুভশক্তি। সৌন্দর্য-শক্তি। আলো এমনিতেই সুন্দর। যেমন ফর্সা তেমন লম্বা। ঢিঙি লম্বা। এখন তার সৌন্দর্য আরও ঠিকরে পড়ছে। মিনহাজ মেলাতে চেষ্টা করে, কার  মতো যেন লাগছে। আজকেই দেখেছে তাকে। মনে পড়েছে। সে এখানে আসবার সময়ই দেখেছে তাকে; রাসতলার মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজনে। মূর্তিগুলোতে রং লেপার শেষ কাজ চলছিল। তাদেরই কারও মতো লাগছে তাকে। দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী। কার মতো লাগছে তা নির্দিষ্ট হলো না। তবে তিনজনের কোনো একজনের মতো লাগছে আলোকে। আলোর দিকে আরও একবার তাকাতেই কী একটা খেলে গেল মনে। ভয়, সাহস না অন্যকিছু; তার অভিব্যপ্তিতে তা প্রকাশ পেল না। তবে সুবোধ বালকের মতো গামছা পরে পানিতে নামল।

বেশ কয়েকটা শাপলা তুলে আনল মিনহাজ। তার হাত থেকে খামচে নিল তিনজন। অবশেষে তারা চারজন পুকুর পাড়ের এক কোণায় ঝুপড়ির আড়ালে বসল। নির্জন জায়গা। বসার মতো সুন্দর। তারা বোধহয় প্রতিদিন এখানে বসে খেলে। আলো নিজেই মিনহাজের গা মুছিয়ে দিল। নিজের বুকের গামছা দিয়ে সুন্দর করে কাঁধ, কানের পিঠ, বাহুর নিচে; শরীরের সমস্ত কোণা-খন্দক মুছে দিল রগড়িয়ে রগড়িয়ে। মিনহাজ কোনো আপত্তি তোলেনি। পুলকিত হয়েছে মনে মনে। কে কবে কখন তাকে এভাবে মুছিয়ে দিয়েছে, মনে নেই। মনে করতে চাইলও না। বর্তমান নিয়েই ভাবতে ভালো লাগছে।

আরতি একটা শাপলার ল্যালকে ফাটিয়ে মালা বানাতে ব্যস্ত। এতে মগ্ন থেকেই জিজ্ঞাসা করল―মিনহাজ তুমার ভয় করল না, কালো পানিতে নামতে। এই পগুরোত পেত্নি আজে।

পুরুষ মানুষের ভয় কিসে? বুক ফুলিয়ে বলল মিনহাজ।

খুব বীরপুরুষ। মিয়া মানুষ বুলল, অমনি লাফ দিলা। নায়ক হয়া গেলা, না? বুড়িও ফোঁড়ন কাটল।

থামতো তুরা। ল্যাল পাইজু ল্যাল খা। কথাটা বলেই আরতির হাত থেকে মালাটা ছিনিয়ে নিল। নিজে পরল না। মিনহাজকে পরিয়ে দিল। আপত্তি করবার সুযোগ ছিল না মিনহাজের। সে ভাবনাতেই আনেনি, আলো এমন একটা কাণ্ড করবে। আরতি জিবায় কামড় দিল। বুড়ি নিজের মাথায় নিজেই একটা থাবড়ানি দিল। বলল―কী করলিরে ছুঁড়ি, একেবারে মালা বদল। আরতি বলল―লে এবার সাতপাক ঘুর। আরতি বুড়ি হেসে উঠল খিলখিল করে। আলো হাসল মনে মনে। মিনহাজ মাথা নিচু করে আছে। লজ্জায় না রাগে, বোঝা যায় না। তবে সমস্ত শরীরটাই এখন পাকা বেদানার টুকটুকে দানা। ফাটল বলে। কিন্তু ফাটল না, মালাটাও ছিঁড়ে তুলে ফেলে দিল না। মাথাও তুলল না। আলো মিনহাজের চিবুকে হাত দিল।―কিরে হিরো, এত লজ্জা ক্যান? হামাক চুমা খাবু বুলে।

ভালো কদা তুমার মুগে নাই? থাকো হামি যামু।

এই ছোঁড়া থাম থাম। পালাবু ক্যান, তুই না পুরুষ মানুষ। মাগির ভয়ে পালাবু। খুব তো বাহাদুর সাজলু তগন। মিনহাজ কথা বলল না। আলোর কথাতে যথেষ্ট যে রেগেছে, তা স্পষ্ট হলো। ফোঁপানির শব্দ শোনা যায়।

কিরে, অত রাগলু ক্যান; মুনে হওজে ধইরা খাবু। রাগ ভাঙ্গামু নাকি?

মানা করিজে কে? না বুঝেই বলে ফেলল কথাটা। অপরাধী ভাবল নিজেকে।

এবার সত্যি সত্যি পালাতে চাইল মিনহাজ। মাথা তুলেই আরও একবার বোকা সাজল। আরতি আর বুড়ি কোথায়? সামনে শুধু আলো। আলো নয়, দুর্গামন্দিরের সেই মূর্তি। সমস্ত শরীরে ঘাম-তেল। চকচক করছে নাক, মুখ, গলা। সব। কিন্তু সে কি আলো, নাকি কায়া পুকুরের পেত্নি। না পেত্নিও নয়। পরি। হুরপরি। ভয় ধরানো পরি। উঠে পালানোর ফন্দি আঁটল মিনহাজ। তাছাড়া বাঁচার উপায় নাই। দাঁড়ানোর ভঙ্গি করতেই খপ করে চেপে ধরল আলো। গর্তের সামনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা বিড়াল যেন সুযোগ বুঝে ইঁদুর ধরল। চিল্লিয়ে ওঠার আগেই ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরল তার ঠোঁটে। আলো এখন পুরো উন্মাদ। ভাবার সময় নেই, মিনহাজ তার চেয়ে ছোট। মনেই হলো না, ওপাশ থেকে সাড়া পাবার আশা নেই। আলো তখন গোখরো সাপ। ছোবল পাগল। ছোবল নয়; বরং নিঃশ^াসেই নীল হবে সব। সামনে পিছে ডানে বামে। ওপর নিচও। তাই বুঝি মাথার ওপরের নিমগাছের ডাল থেকে ঘুঘু, শালিক উড়ে গেল বিরক্ত নিয়ে। পাশেই ভেড়ার এক পাঁঠা আর পাঁঠি ফিচলেমি খেলছিল, তারাও পালাল। আলোর নিঃশ^াসের শব্দ ক্রমশ বাড়ে। শোনা যাবে খানিক দূর থেকেও। মিনহাজের যা শব্দ, তা গোঁঙানীর। এর মাঝেই মিনহাজ বাঁচতে চাইল। পালাতে চাইল জান নিয়ে। কায়া পুকুরের পেত্নি নির্ঘাত পেয়েছে তাকে। চুষে ছোবড়া করে দিবে আজ। জান-প্রাণ ছেড়ে নিচে থেকেই কষে একটা লাথি মারল। আলোর কোথায় লাগল, কে জানে। মা গো বলে চিল্লানি ছেড়ে দূরে ছিটকে পড়ল। আর এই সুযোগে বড়শি থেকে ছোটা মাছ হয়ে মিনহাজ বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটল গ্রামের দিকে। পেছনে যা আছে থাক।

মিনহাজ বাড়িতে কাউকে কিছু বলল না। নির্ঘাত হইচই পড়বে। এ ক্ষেত্রে বড় মানুষ সাজল। তবে অনেক দিন আলোর সামনে যেতে পারেনি। বরং চলা পথে আলোকে যে রাস্তাতে দেখেছে সে রাস্তাও বদলিয়েছে। দূরপথে গেছে, তবু আলোর সামনে পড়তে চায়নি। আলোও বড় বেলাজ। মিনহাজকে দেখলেই কেমন করে হাসে। ল্যাল তুলে নিতে চায়। মিনহাজ রেগে পালায়। গালি দেয় মনে মনে। পাশে থাকা মানুষ কিছু না বুঝেই হাসে।

এখন মিনহাজ বড়। আলো ছোট। মননে, মগজে। আলোর আলো নেই। মিনহাজের সামনে নেই। মিনহাজের সামনে পড়লেই, হঠাৎ ছায়া পড়ে। আলো পালায় কোন আড়ালে। মিনহাজ মনে মনে খুঁজলেও আলো পালায়। আঁচলে মুখ ঢাকে। অন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটে। বার বছর আগে মিনহাজ যেমনটি করত।

আলোর বিয়ে হয়েছিল। দশ গ্রাম টপকে অন্য উপজেলায়। দুই বছরের বেশি টেকেনি সংসার। আলো ফিরে এলো বাবার বাড়ি। আসলে মায়ের বাড়ি। বাবা নেই। শ্মশানে ঘাপটি মেরেছে, আলো যখন পাঁচ বছর। আলো ফিরে এলো মায়ের কাছে। সাথে নিয়ে এলো ছয় মাসের সন্তান। ছেলে। এখন অনেক কিছুর মধ্যেই সংসার চলে আলোর। নতুন সংসার। মা, আলো আর তার ছেলে। মিনহাজ শুনেছে, আলো এখন শুধুই আলো। সস্তা আলো। অন্ধকারের আলো। অল্পতেই আলো ছড়ায় আলো। তার আলোতেই নাকি পুড়ছে অনেকেই। ছোট বড় অনেক পতঙ্গ ঝাঁপ দেয় তার শিখাতে।

সেই আলোকেই অনেকদিন পর দেখল মিনহাজ। কিছুটা শীর্ণ চেহারা। কোমরের খাঁজে আটকে আছে মাঝারি এক ডালি। হয়তো গোবরের ডালি। ডালিটা হাঁসফাঁস করে মরে কোমরের দোলানিতে। কাঁকালের ভাঁজে। শরীরের রোশনাই কমলেও চলনে থমক আছে বেশ। কাচে কালি পড়লেও ভেতরের শিখা যে বেশ জ¦লন্ত, তা বোঝা যায়। হারিকেন দেখনেওয়ালাকে মনে করিয়ে দেয়, কাচ মুছলে হ্যাজাকের মতো আলো ছড়াবে। জোয়ার নেই ঢেউ আছে; গোঙানি নেই আছড়ে পড়া আছে। চাবুক মারার মতো শরীর বটে। মিনহাজের চেনাতে ঝাপসা ভাব থাকলেও, আলো চিনেছে ঠিকই। আঁচলে নিজেকে আড়াল করে হাঁটাতে গতি দিল। আল দিয়ে নয়, জমির মধ্যে দিয়ে সড়সড় করে ছুটছে। দিঘল দাঁড়াশ যেন বাজপাখি দেখেছে। তাই তো লতা-পাতা, উঁচু-নিচু মাড়িয়ে সামনে ছোটা। তবে বাড়ির দিকে নয়। সে সোজা কায়া পুকুরের দিকেই ছুটছে। বোধহয় উঁচু পাড়ের ওপাশটাই আড়াল করবে নিজেকে। তবে আড়াল না ইশারা, সেটাই বুঝতে সময় নিচ্ছে মিনহাজ। সে বুঝল ইশারা। হাত উঁচিয়ে ডাকতে গিয়ে ডাকল না। সে তো কায়া পুকুর দর্শনেই যাবে। পুকুরে এখন শাপলা থাকবার কথা নয়। তবে শাপলা খাওয়া মানুষটাকে পাওয়া যেতে পারে।

বিদ্যুৎ চমকালে বাজ পড়তে পারে, ঘরে থাকাই ভালো। তবুও মানুষ বাহির হয়; মরে। কার্তিকের সকালে ধান-ক্ষেতের আলে হাঁটলে লুঙ্গি ভিজবে, লুঙ্গি গুটালে ভেতরও ভিজবে নির্ঘাত। তবুও মানুষ হাঁটে; লুঙ্গি গুটায়। সুন্দরবনে বাঘ, বিষধর সাপ আছে, তা কে না জানে। তবুও যায় বাওয়াল, মৌয়াল। পর্যটকও যায় মরণ হাতে নিয়ে মন জুড়াতে। মিনহাজও গতি বাড়ালো কায়া পুকুরের দিকে। শব্দটা বাহিরে এখনও না ফুটলেও বিদ্যুৎ চমকের ঝাপটা চোখে জ্বালা ধরিয়েছে। হয়তো মনেও। তবে বাজ পড়ার ভয়কে সে আমল দিল না।

কায়া পুকুর আর কায়া পুকুর হয়ে নেই। তা এখন ঘোলা পুকুর। উঁচু পাড় কেটে জমি করা হয়েছে। মাটি গেছে ঐ পুকুরের পেটেই। পুকুর এখন ডোবা। গভীরতা যে গেছে, তা বোঝা যায় এর ঘোলা পানি দেখে। মিনহাজের চোখে এর কিছুই পড়ল না। সেই বার বছর আগের উঁচু পাড়ের ওধারে লুকিয়ে থাকা কাউকে খুঁজে মরে। পুকুরের চারদিক ঘোরে কিন্তু দেখবার জিনিস দেখতে পায় না। পেলও না। নিরাশ হয়ে বসল শিমুল গাছের গোড়ায়। কত পথ পাড়ি দিয়ে একটু জিরাবার ঢঙে বসল। আরও কত পথ বাঁকি। কত পথ বাঁকি সেটাই দেখবার জন্য চোখ দু’টো বুঁজল বোধহয়। কিন্তু চোখ যখন খুলল, তখন চমকে উঠল। এ কোন কায়া পুকুর। পাড় নেমে এসেছে পানির কাছাকাছি। ঘোলা পানি। না আছে কালো পানি, না আছে পানির ওপরে ফোটা স্বপ্নের সাদা শাপলা কিংবা শাপলা খাওয়া মানুষ। না আছে সিঙাড়ার পানা, না আছে শাপলার কোনো পাতা। মিনহাজের মনে হলো, খানিক আগে একপাল শুয়োর পুকুরের এ ধারে নেমে ওধার দিয়ে চলে গেছে। ঘোলা পানির গাবানিতে তখনও তলানি পড়েনি।

মিনহাজের স্বপ্নের পুকুর যেন স্বপ্নভঙ্গের সাথে সাথে লীন হলো। মিনহাজ উঠল বাড়ি যাবে বলে। পেছনে লাগা খড়কুটো-পাতা হাতের থাবড়ানিতে ঝাড়তে ঝাড়তে বলল―যা শালা! না এলেই ভালো হতো।

বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই খানিক দূরে মিনহাজের চোখে পড়ল, আরিফ মোল্লা আসছে। মিনহাজ মোল্লাকে ডাকে দাদা বলে। আজ সকালেই শুনেছে মোল্লার হালহকিকত। সে থামল মোল্লার জন্য।

মোল্লা কাছাকাছি আসতেই মিনহাজ ডাক দিল―দাদা, একটু এদিকে আসেন, ছায়াতে বসে যান। মোল্লা মাথা তুলল। বুঝতে পারল না, কে তাকে ডাকে। কণ্ঠটা অচেনা ঠেকল। চেনা কণ্ঠরাও তাকে ডাকে না ইদানীং। ডাকে না সহানুভূতি দেখাবার জন্যও। তাদের মনে শঙ্কা, মোল্লা যদি ভুল বোঝে। সে যদি ভাবে, তাকে খোঁচা দিতে চায়। রাগাতে চায়। চামড়া ছিলা শরীরে লবণ দিতে চায়। মোল্লার ব্যথায় তারাও মনে মনে ব্যথিত। সারা মাঠ আড়াল হয় আউশের বিছনে। শুধু ফাঁকা আর দিগম্বর হয়ে পড়ে আছে মোল্লার ক্ষেত। যেন ক্ষেত নয়, লগ্নভ্রষ্টা রমণী। ছাঁদনাতলা বসে রণে ভঙ্গ। দিশেহারা পিতা ছুটে বেড়ায় দিগি¦দিক।

মোল্লা খানিকটা এগিয়ে এসে মুখ তুলল। চিনতে পারল মিনহাজকে। সুরমানের বেটা। সে কাছে এসে কাঁধ হতে গামছাটা নিয়ে মুখ, কপাল আর কাঁধের ঘাম মুছল। গামছা কাঁধ বদলিয়ে রাখতে রাখতে বলল―কী রে ভাই কখন এলি, এদিকটাই কেন? মোল্লা স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নটা করল। তার কথাতে না আছে জড়তা, না আছে আঞ্চলিকতা। একদম ভদ্রলোকের ভাষা। মোল্লার এটা একটা গুণ বলা যেতে পারে। শুধু রাগলে তাকে চেনা যায় না। যতটা গ্রামীণ ততটাই অশ্লীল। আজকের মোল্লা বড় শান্ত। কথাতে কিংবা প্রকাশে। ভাবে ভাষাতে। যতটা ভদ্র ততটাই গোছাল। যেন ক’দিন আগের পাইন দেওয়া লোহা। পানিতে ডুবিয়ে ঠাণ্ডা করা নয় তবে। কড়া নয়। মাটিতে ফেলে রেখে ঠাণ্ডা করা। নরম পাইন।

মোল্লা নাগালে আসতেই মিনহাজ বলল―দাদা কোথায় গেছিলে?

হাতিনন্দা গেছলাম। পাইট ঠিক করতে।

পেলেন?

না রে ভাই, কেউ রাজি হয় না। কোনো না কোনো বাহানা তুলে ফসকে যায়। আসলে কি জানিস ভাই, সব কামলারা এক হয়াছে। শালারা জোট বান্ধ্যাছে।

দাদা, ঘটনাটা আমি শুনেছি। সকালে মোড়ের ওপর কারা যেন আলোচনা করছিল তোমাকে নিয়ে।

এখন তো আলোচনার বস্তু একজনই। মোল্লা। হাসি ঠাট্টার বস্তু আমি। মোল্লার বুকটা ভারি হয়ে উঠল। ডুকরে কাঁদলে হালকা হতে পারত। মিনহাজ তার কাঁধে হাত দিল। বসল দু’জনেই।

দাদা, তোমার এই ঘটনা শুনে আমার খুব খারাপ লেগেছে। কামলা আর গেরস্থের মধ্যে কবে গণ্ডগোল হয়নি? তবে এমন তো হয়নি কখনও। আমার বয়সে শুনিনি এমন কথা।

তোর বয়স আর ক’দিন। আমিও দেখিনি এমন। তবে কি জানিস, সেদিন দুষ  আমারও যে একেবারে ছিল না, তা বুলমু না। আমার রাগটা চিরদিনই বেশি। রাগলে মাথায় রক্ত ওঠে। সেদিন বোধহয় খানিক বেশিই উঠেছিল। কী বলতে কী বলেছি মুনে নাই। তাই বলে এতবড় ক্ষতি করবে তারা। আমি তাদের জন্যে কুনো দিন কিছুই করিনি? তাদের পাশে দাঁড়াইনি কুনোদিন। জানিস ভাই, আমি কবিরের কাছে গেছি; ভুল স্বীকার করেছি, তবুও এলো না। উল্টো কথা শুনাল। ক্ষেত-ফসলই যে আমার সম্বল। ধান না হলে খাব কী?’

আর বলতে পারল না মোল্লা। গলাটা ধরে এলো। চোখও ভেজা। মিনহাজ কী বলবে, ভাষা পেল না। এমন একটা জাঁদরেল মানুষ কেমন চুপসে গেছে। যেন প্রিয়জন হারানোর শোকে কাতর সে।

দাদা আপনি বড় মানুষ, অত ভেঙে পড়লে চলে। সব ঠিক হয়ে যাবে এক সময়। দেখবেন তারাই একদিন আপনার কাছে আসবে। ক্ষমা চাইবে আপনাকে কষ্ট দেবার জন্য।

না রে ভাই, তারা আসবে না। এখন আর সেই সময় নেই যে, তারা আমার দয়ার জন্য অপেক্ষা করবে। বরং এখন উল্টো হয়েছে সব। তবে আমি বুঝতে পারছি, যা করবার আমাকেই করতে হবে। মানুষ যা ভাবে ভাবুক।

কী করবে দাদা?

কিছু একটা তো করতেই হবে। খুব তাড়াতাড়িই করব। তাদের দিয়েই ধান লাগাব।

দাদা, তাদেরকে মারতে-টারতে যেও না যেন। তোমার মান-সম্মান আছে। তাছাড়া মারলে কিন্তু সবাই তাদের পক্ষেই কথা বলবে।

তা জানি। মোল্লা উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে থাকল না। ধীর লয়ে হাঁটতে লাগল বাড়ির দিকে। মিনহাজও তাকে আটকাতে চাইল না। তবে শঙ্কিত হলো মনে মনে; মোল্লার আগামী দুর্দিনের কথা ভেবে। ভাবল, কামলারা নয় বরং কষ্টে আছে গেরস্থরা। মধ্যবিত্তরা। তারা না পারে নেংটি ঠুকে জমিতে নামতে, না পারে ফসল তুলে খরচা সামলাতে। তবু নিরুপায়। ভাত-কাপড় দেবার আশ্রয় সেই জমিন।    [চলবে]

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares