গল্প : আলোকিত অন্ধকার : আসাদ মান্নান

ঘরের পাশে অন্ধকার। শুয়ে আছে গাছটার নিচে। পশুদের কাছে গাছের কোনো দাম নেই―বিশেষ করে আমার এ গাছটার। আর সব মানুষ সব গাছের ভাষা বোঝে না―এ আপনার জানা সংলাপ। ওরা অনেক গাছের নাম জানে; কেবল বিদ্যার জোরে। ওরা বলে, ওটা গাছ নয়-পরগাছা, অস্তিত্বহীন; এর কোনো বর্ণমালা নেই, ভাষা নেই। আসলে কি জানেন, যারা পরগাছা তারা আজ বিপন্ন খুব।

‘দুর্বলের আস্ফালনে সবলের নীরব থাকাই উচিত’―আপনার মন্তব্যটা সত্যিই মনে রাখার মতো। এবং তাই  হবে। নির্ভার ফলের ছায়ায় আপনাকে দেখি না; আপনার উপস্থিতি টের পাই প্রতিক্ষণে। এমন অন্ধকারে আপনাকে কাছে পেতে চাই। স্মৃতির প্রদীপ জ্বেলে মানচিত্রের বর্ণমালা খুঁজে নিতে অদ্ভুত ইচ্ছে জাগছে। আপনার সময় হবে?

বাড়ির পাশে পদ্মা। তার তীরে মানুষের ঘরবাড়ি, কিছু স্বপ্ন, আকাক্সক্ষার বেলাভূমি জেলেনীর লাল ঠোঁটে শুয়ে থাকা পদ্মার মেয়ে ইলিশ―তার খসে যাওয়া আঁইশ মুখে নিয়ে একাকী একটি চাঁদ আমার মাথার ওপরে, শনের চালে―ধানের ক্ষেতে কৃষকের ফেলে রাখা  রুপালি কাস্তের মতো―আমাকে এরা ডাকছে। আমার কি যাওয়া উচিত? আপনিও যাবেন? ঠিক আছে।   

…না, না আমার আপত্তি থাকবে কেন? আপত্তি থাকার কথা নয়। তা ছাড়া আপনার সঙ্গসুখে আমার হৃদয় কাঁপে না শুধু, হাতও কাঁপে; সৃষ্টির নেশায়।…আসুন একটু গল্প করি। অবশ্য গল্প করার মতো তেমন কিছু নেই, সময়ও নয় এটা; তবে আপনার সম্মতি থাকলে আপনাকে একটা গল্প বলতে পারি। গল্প নয় ঠিক, আমার গাছটার কিছু রহস্য যার সাথে আপনিও জড়িত। কী, আপনার আপত্তি আছে? নেই? … আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

সেদিন আকাশে চাঁদ আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে ছিল। সম্ভবত আপনার চোখেও তা ধরা পড়েছিল। ম্লান পাণ্ডুর জ্যোৎস্নার কামিজ গায়ে কুয়াশার হাত ধরে পদ্মা যাচ্ছিল সমুদ্রের দিকে। পদ্মা খুব ধার্মিক নদী। হাজার হলেও খান্দানি ঘরে তার জন্ম! অথচ আমি তাকে কোনোদিন বিশ্বাস করিনি। না করার কথা। জানেন, তার বুকে ছিল একটা যাদুর পাহাড়―যেখানে দুর্নিবার আকর্ষণ আছে। আমি কখনও সেই পাহাড় দেখিনি। অবশ্য এ আমি জানতাম, আপনিও জানতেন তার ডাকে কোনো মানুষ সাড়া না দিয়ে পারেনি। হয়তো, বিদেশি নাবিককুল সাড়া দিয়েছিল তাই। তার ডাক একবার যে শুনেছে, বিশ্বাস করুন আপন মায়াজালে সংসার তাকে কোনোদিন বেঁধে রাখতে পারেনি। এক মায়াজাল ছিন্ন করে যুগ যুগ ধরে নাবিকরা আরেক মায়াজালে আবদ্ধ হয়েছে। যাদুর পাহাড় হয়তো চোখে জা¡লে দূরতম পৃথিবীর আলো। তেমনি এক আলো জ্বলেছিল বাবার চোখে। চতুর্দিকে স্তব্ধ রাত― আমার মায়ের চোখের কাজল মুছতে পারেনি। বাবা মাকে সব সময় ঐভাবেই দেখতে চাইতেন। তাই মা শাড়ি পাল্টিয়েও চোখের কাজল মুছতে পারেননি। এ ব্যাপারে তার যুক্তি : স্মৃতি অন্ধকারে থাকে―ফুলের মতো কোমলতা লাভ করে।

…হ্যাঁ কি যেন বলছিলাম, ধ্যাৎ! এত আত্মভোলা হ’লে কি চলে? প্লিজ কিছু মনে করবেন না―এ আপনার জানা আছে―আমি এক আত্মবিস্মৃত জাতির বংশধর; অনেক কিছুই মুহূর্তে ভুলে যেতে পারি। মাঝে মধ্যে একটু স্মরণ করে দেবেন।

…হ্যাঁ বলছিলাম, চারদিকে স্তব্ধ রাত―মায়ের চোখের কাজল যেন। অদ্ভুত এক মায়াবী টানে বাবাকে ঘরছাড়া করে। বাবা গেলেন পদ্মায়; কারণটা আপনি জানতেন। ‘ভোরের আলোতে আমাকে খুঁজে নিবি’―বাবা বললেন যাবার সময়।

তারপর অনন্ত মৃত্যুর মতো একটি রাত আমার চারপাশে শুয়ে থাকে ভাল্লুকের বাচ্চার মতো। আমি তার সন্তান―এ কথা আপনার মতো বাবাও জানতেন। আমি তা স্বীকার করি। ভোরের পদ্মার মোহনার জাগরণে আমিও জেগে থাকি সারারাত । … বাবা আসবেন ভোরের আলোতে। আমাদের ঘরে আসবে অন্য এক পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীর সুবাস―ভাবতেই বুকটা পদ্মার মতো ফুলে ওঠে। আপনার সাথে তখন দূর থেকে আমার একটা সম্পর্ক ছিল। আপনার মনে আছে হয়তো। আপনাকে আমি মনে মনে ধন্যবাদ দিয়েছিলাম: আপনি চমৎকার, অদ্ভুত ভালো, একটু খেয়াল রাখবেন। আপনার মঙ্গল হবে, আপনার সৃষ্টি সুখে থাকবে।

কুসুমের মতো লাল একখানি ছাতা মাথায় দিয়ে ভোর আসে। ছাতার শরীর ছুঁয়ে পদ্মায় কাছে আসে একঝাঁক ভোরের পাখি। আমি একটা সুন্দর পাখির ডানার ভাঁজে সাত কোটি মানুষের চোখ রেখেছিলাম। চোখের মধ্যে ছিল মধ্যরাতে দেখা একটা স্বপ্নের কøান্ত নিঃশ্বাস। সেই নিঃশ্বাসে হাওয়া লাগে, ঢেউ জাগে―নাচতে নাচতে সব চোখ মিছিল করে পদ্মার তীরে। কোথাও জনমানবের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। বিধ্বস্ত লোকালয় আমাকে ডাকে। আমি বাবাকে ডাকলাম, বাবা! ও বা…বা… বা … বা…।

কোথাও কারও কেন সাড়া নেই। চারদিকে কবরের মতো নীরবতা। নদীর পাশে নীরবতা ঝরা পাতার নিচে শুয়ে থাকা ঘাসের মতো। আপনাকে তখন কাছে পেলে দারুণ ভালো হতো। জানেন, এমন সময় পদ্মার লবণাক্ত সুরে জীবনের উচ্চারণগুলো দুর্লভ আবেগে স্মৃতি হয়ে যায়―হওয়ার কথা।

কী বললেন? আমি কানে একটু কম শুনি। আপনি প্রায়ই পদ্মার তীরে যান বুঝি? যাবেন, অবশ্যই যাবেন। দেখবেন, স্বাস্থ্য কেমন ভালো হয়ে যায়! আমি তো আজকাল পদ্মাকে না দেখলে ঘুমোতেই পারি না। এক নদী স্মৃতি নিয়ে ঘরে বসে থাকা যায় না যে, তা ছাড়া স্মৃতি বড় পরগাছা―বলা যায়, অবাধ্য বাতাসের মতো; বারবার দোলা দেয়, স্পর্শ করে। কিন্তু ধরতে গেলে স্মৃতি আর স্মৃতিই থাকে না, খরগোশের বাচ্চা হয়ে যায়; ধরতে পারি না। বলছিলাম, সেদিন মনে হয়েছিল স্মৃতি মানুষের ছায়া। তাই, ‘ছায়া, ছায়া দাও’ বলে আমি বাবাকে পুনর্বার ডাকলাম, বাবা সাড়া দিলেন না। কিছুক্ষণ পর যা দেখলাম তা কি শুনবেন? আপনাকে ধন্যবাদ। একটা কুমির দেখলাম। ভয়ংকর কুমির―ভাসমান, আমার কাছ থেকে কয়েক গজ দূরে ।

কুমির মানুষ খায়। ডুবন্ত জাহাজের যাত্রীদের মাংসের গন্ধ তাকে মাতাল করে, তার রসনায় তৃপ্তি আনে। দেহে জাগায় অসহায় মানুষের প্রতি হিংস্রতা; সাথে কিছু অবাধ্য লোভ। জন্মের পর আমি এ প্রথম কুমির দেখি। আপনি তো প্রায় কুমির দেখে থাকেন, না? অবশ্য আপনার ভয় পাবার কথা নয়। কিন্তু নিঃসঙ্গ পদ্মার তীরে কুমিরটাকে দেখে আমি ভয় পেয়েছিলাম।…তা’হলে বাবা বুঝি কুমিরের…! না, অমঙ্গলকে হৃদয়ের মতো মসজিদে স্থান দিতে নেই―আপনি দুঃখ পান তাতে―এ আমি জানতাম। এ সময় আমার কিছু টাটকা বিশ্বাস ছিল, জলের মতো স্বচ্ছ আর নিষ্পাপ। আমি বিশ্বাসে আংশিক আগুন জ্বেলে বাবাকে জিজ্ঞেস করি; বাবা তুমি কখন আসবে?  আমি কি অপেক্ষা করতে পারি? না, একটু কাঁদব? বাবার কোনো জবাব পাইনি।

এ মুহূর্তে চোখ বুজে থাকাই ভালো। জানি, চোখ বুজে একটু আধটু কাঁদতে পারলে তা স্বাস্থ্যের পক্ষে লাভজনক। কিন্তু যে পদ্মার বুকে হাজার বছরের জলরাশি বাবাকে ডাকল, আপন করে নিল তার কাছে আমার ক’ফোঁটা চোখের জলের দাম কত আর হবে! আমি তাই চোখ বুজে কাঁদতে পারিনি। নানান বাস্তবতার মধ্যও সম্ভবত আপনি লক্ষ করেছিলেন যে, কান্নার অন্তর্মুখী প্রবাহে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারিনি।

আমার চোখ মেলা ছিল―কুমিরটার দিকে দৃষ্টি ফেললাম। যা দেখলাম, তা কি আপনিও দেখেছিলেন?… হ্যাঁ, দেখারই কথা! আপনি আশপাশে কোথাও ছিলেন হয়তো। এ আপনার এক চমৎকার স্বভাব, যা আমাকে মুগ্ধ করে। … দেখুন, এরই মধ্যে আবার ভুলে গেলাম। ধুত্তরি ছাই! আমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না। মনে করবেন না তো কিছু! আমি এক আত্মবিস্মৃত জাতির বংশধর।

… হ্যাঁ, বলছিলাম―এক অবাককাণ্ড! কুমিরটার পিঠে একটা গাছের চারা। বাতাসে দুলছে, আমাকে কাছে ডাকছে। কিন্তু চারাটা কোত্থেকে এলো! আর আমার সাথেই বা তার সম্পর্ক কী? সময়ের প্রতিটি ধাপ পার হয়ে পদ্মার জাদু আর রহস্য ক্রমশ ঘনীভূত হতে থাকে। বুকের মধ্যে দীর্ঘকাল অনুপস্থিত, এমন কিছু হঠাৎ যেন উড়ে এলো। এ মুহূর্তে যাকে একান্ত প্রয়োজন তাকে আপনি চেনেন―আমার পলাতক সাহস। তাকে পেয়ে খুব আদর করলাম―ঠোঁটে, পিঠে এমনকি তার সবচেয়ে কঠিন বিন্দুতে চুমো খেলাম। আমার আনন্দের কথা আপনাকে কী আর বলব! আপনি তো সব জানেন।

বাবা, তুমি সাড়া দাও, আমি চিৎকার করে অদৃশ্য বাবাকে বললাম, বাতাস অনুকূলে―তুমি কোথায়? এবার আসতে পার।

পদ্মার ঢেউ কাঁপতে থাকে। জলের পিঠে জল, তার পিঠে সূর্যের আসা-যাওয়া। শানিত কিরণ তীক্ষè হয়ে ঢুকতে থাকে পদ্মার নরম দেহে। পদ্মার অসুস্থ বুকে হিমেল ছোঁয়া। কয়েকটি সূর্যজ্বলা সিঁড়ি পদ্মার ঠোঁট থেকে শুরু করে আমার পায়ের গোড়ালিতে এসে থেমে যায়। ‘এ কেমন জাদুর খেলা রে বাবা! শালার কুমিরটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলো বুঝি। শেষমেশ আমিই তার শিকার!…

…আপনি বলতে চাচ্ছেন আমি ভয় পেয়েছি, না? দেখুন, আমি কাপুরুষ নই। আমার বংশে কাপুরুষতার কোনো স্থান নেই; আমি কার ছেলে―এসব আপনি জানেন। তা ছাড়া আমার কাছেও অস্ত্র আছে, ভয়ংকর অস্ত্র। সর্বোপরি আপনিও আছেন। অস্বীকার করার মতো মিথ্যে আপনার নেই―অস্বীকার করেন? জানি, আপনার উত্তর সব সময় পজিটিভ। হয়তো তাই আমি দাঁতে দাঁত চেপে ধরে কুমির বাবাকে ভয় দেখিয়েছি―হিম্মত থাকলে বাবাজান, একবার উঠে আসেন, দেখবেন কে কার জন্যে।…হ্যাঁ, এতে আমার অনেকটা ঔদ্ধত্য ছিল, যা ফালতু নয়।

বাবা উঠে আসছেন, আমি দিব্যি দেখতে পেলাম, সিঁড়ির নয়টি ধাপ অল্পক্ষণেই পার হয়ে বাবা আসছেন। কি, ভয় পেলেন দেখছি?… পাননি? আপনার সৃষ্টির মঙ্গল হবে। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

আপনাকে একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছে। কি বললেন? ঘুম পাচ্ছে? … গুড আইডিয়া, চমৎকার প্রস্তাব। … হ্যাঁ, একটু চা হলে ভালো হতো। আসলে প্রস্তাবটা আমারই হওয়া উচিত ছিল। অবশ্য চায়ে আমি খুব অভ্যস্ত নই।

আপনি তো সব জানেন দেখছি: আধভাঙা ঘরটা মেরামত করা দরকার। গিন্নি রক্তহীন হয়ে পড়েছে। শালিটা বছর বছর বিয়োচ্ছে। চতুর্দশ শ্রীমান কুত্তার বাচ্চা নিয়ে ঘুমোয়। ওদের মধ্যে অভিন্ন সম্পর্ক আজকাল। বাদ বাকিগুলো আশা করেছিলাম বন্যার জলে মরবে; কিন্তু বন্যাটা আজকাল খুব একটা নির্ভেজাল নয়। ধুত্তরি ছাই! কী কুলক্ষণে কথাটাই না মুখ দিয়ে ফসকে বের হয়ে গেল। প্লিজ, আপনি কিছু মনে করবেন না। গল্পের ফাঁকে পরিবারের কথাটা এসে যাবে আমি ভাবতেও পারিনি। আপনি কিছু মনে করবেন না। ওরা বাঁচবে, অবশ্যই বাঁচবেÑওরা মরতে আসেনি। আপনি একটু খেয়াল রাখবেন, যাতে ওরা মানুষ হয়।

আপনার ঘুম পাচ্ছে? সত্যিই আমি লজ্জিত। আপনাকে কবরের ওপরে ঘুমোতে দিতে পারি না। আমার ঘর আমার কবর। কিছু মনে করবেন না, প্লিজ।

… হ্যাঁ, বাবা এলেন―আমার কাছ থেকে কয়েক গজ দূরে। তার চোখে জল নয়, জলের মতো কাচের টুকরো। ভোরের আলোতে যার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। বাবা আমাকে পরখ করলেন―আমি তার সন্তান কিনা।

বাবা আমাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলেন। ঠাণ্ডা হাত। ‘খোকন! আরও কাছে আয়, বহুদিন তোর মাথায় হাত রাখিনি।’ আমি তার বুকে বুক মিশালাম। তিনি আমাকে পদ্মার দিকে চোখ রাখতে বললেন। আমি চোখ রাখলাম।

কিছু দেখতে পাচ্ছিস, বাবা বললেন।

কই, কিছুই দেখছি না যে!

ভালো করে দেখ।

খুব ভালো করে দেখলাম। জীবনে এমন ভালো করে তীক্ষè দৃষ্টি ফেলে কোনো কিছু দেখেছি বলে মনে হয় না। আমি কিছু দেখছি না―এ কথা না বলতেই বাবা বললেন, মানুষ পৃথিবীতে অনেক কিছুই দেখে, কিন্তু সব কিছু মনে রাখার মতো নয়।

তাই বাবা!  অনেক কিছু মনে রাখার মতো নয়। আমি সম¥তি দিলাম।

বাবা বললেন, ঐ যে পদ্মার জল, একটু ভালো করে দেখ, আসলে তা জল নয়। কী আপনিও দেখছি চমকে উঠছেন। হ্যাঁ চমকে ওঠারই কথা। আমিও আপনার মতো চমকে উঠেছিলাম। তাই তো! পদ্মার জল লাল কেন? জল কী লাল, বিশেষ করে পদ্মার মতো নদীর জল! পদ্মার জল তো কোনো কালেও লাল ছিল না! রক্তের মতো লাল জলে দুরন্ত পদ্মা পূর্ণবতী রাঙা যুবতীর মতো শুয়ে আছে; গভীর ঘুম চোখে। কিছু বলবেন বলে মনে হচ্ছে?  হ্যাঁ, আমিও পদ্মার চোখে কোনোদিন ঘুম দেখিনি। ঘুম দেখিনি পদ্মার তীরে বসবাসী পুরুষ শিশু আর পদ্মাবতী নারীদের চোখে।

আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করি; পদ্মার দেহে জল নেই, তবে ঐ লাল তরলরাশি কি রক্ত? তাকে কি কেউ খুন করেছে? বাবা আঁৎকে উঠলেন। আমার দিকে একবার চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকি আমি। বাবাকে দেখি―পদ্মাকে দেখি―ডানাহীন এক ঝাঁক পায়রার নাচন দেখি।

বাবা আপন মনে বিড় বিড় করে  বলতে থাকলেন, খোকন, পদ্মা মানুষের নদী―ও মরে না; ওকে কেউ খুন করতে পারে না। জানিস, ঐ পদ্মার দেহে মিশে আছে, আমাদের জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া , স্বপ্ন- সুখ,  যাকে পেতে হয় রক্ত, মৃত্যু এবং দুঃখ দিয়ে।

বাবার এসব কথার কোনো অর্থ  ইতিপূবে  আমার জানা ছিল না। আমি বাবাকে বললাম, তোমার এ কথাগুলো আমাকে না বলাই ভালো। ঘরে চলো। মা, ভাই বোনদের নিয়ে অপেক্ষা করছে। হয়তো কাঁদতেও পারে। তাছাড়া তোমার অভিজ্ঞতা আমাকে না বললে কি নয়? বাবা হাসলেন, প্রচুর অভিজ্ঞতালব্ধ এ হাসি―সচরাচর যা তাকে হাসতে দেখিনি। ‘তোকে না বললে নয় খোকন! তোর জন্যেই আজ পদ্মা লাল। বাবার উদাস চোখে পদ্মার শরীর।

আমার জন্য পদ্মা আজ লাল-এ আবার কী বলছো তুমি?

তোর জন্য নয় ঠিক, তোর সুখের জন্য।

আমি বিশ্বাস করি না। পদ্মার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।

বাবা তীব্রভাবে চিৎকার করে ওঠেন। পদ্মার বুকে গর্জন, চঞ্চল বাতাস, বাবার চোখে মুখে আগুনের ছায়া। সবকিছু মিলে আমার কাছে একটা ভৌতিক ব্যাপার বলে মনে হলো। বাবার অস্থির নিঃশ্বাস আমাকে রীতিমত কাঁপাতে থাকে! মনে হচ্ছে বাবা আমাকে খুন করবেন এক্ষুণি। ধারালো ছুরি নিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন নাকি! আমি ভয় পেলাম। বাবাকে সচরাচর আমি ভয় করি না। আমি একটু সরে দাঁড়ালাম।

না, বাবা আমাকে খুন করতে পারেননি। ধীরে ধীরে বাবা শান্ত হয়ে পড়েন। হাত ইশারায় আমাকে কাছে ডাকলেন। আমি তার কাছে এলাম। তার ডান হাত তিনি আমার বুকে রাখলেন। সাপের মতে ঠাণ্ডা কী যেন আমার শার্টের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। আমার বুকটা হঠাৎ দু’ভাগ হয়ে গেল। ক্ষীণ আর্তনাদ আমার কণ্ঠে জন্ম নেয়। আমি টের পাই―বাবা তীক্ষè একটা ধারালো ছুরি চালাচ্ছেন আমার বুকে। আমি বেশ বুঝতে পারছি বাবা আমাকে খুন করছেন। আমি চোখ বুজে শুয়ে পড়ি।

আপনি জানেন, বাবা আমাকে খুন করতে পারেননি। কী বললেন? আমাকে অজ্ঞান করা হয়েছিল? সম্ভবত তাই। বাবা আমাকে পরম চেতনায়  উজ্জীবিত করলেন। জ্ঞান দান করলেন। আমি চেতনা পেয়েই বাবাকে বললাম― বাবা! আমি স্বাধীনতা চাই―তুমি পারলে আমাকে একট স্বাধীনতা দেবে। তোমার উত্তরাধিকার হিসেবে আমি আর কিছুই চাই না―শুধু স্বাধীনতা চাই। বাবা হাসলেন। পরম তৃপ্তির হাসি। বাবা তার পাঞ্জাবির নিচে বাম হাত রাখলেন এবং ধীরে ধীরে হাত বের করে বললেন; এই নে স্বাধীনতা! কথাটা বলেই তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন একটি গাছের চারা… হ্যাঁ, অদ্ভুত বটে। এমন গাছ পৃথিবীতে আর একটিও দেখা যায় না।

… কি বললেন? এ চারাটাই কুমিরের পিঠে ছিল?  হ্যাঁ, বাবাও তাই বলেছিলেন।

এর পরের কাহিনি অতি সংক্ষেপ। আপনাকে আর কষ্ট দেব না। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম; বাবা, এ গাছের চারাটা স্বাধীনতা-এর কি কোনো অর্থ আছে?

হাসালি খোকন। বাবা হাসলেন। বাবার এ হাসির রহস্য আমি বুঝি না। বুঝলি খোকন! এর ভেতরে স্বাধীনতা আছে―ফুলের মতো কিছু অন্ধকার, যেখানে ঈশ্বর থাকেন। চারাটি কোথায় ছিল জানিস?

না তো বাবা।

বাবা বলতে লাগলেন, আমাদের  একটা অদ্ভুত চারা গাছ ছিল। যা মাটিতে রাখলেই সাথে সাথে বড় হয়ে যেত, ফল ধরত। গাছটার ডানায় ছিল রোদ; সেই রোদ খেয়ে গাছটি মৃত্যুর মতো অনন্ত জীবন লাভ করে। তার অস্তিত্বের ভাঁজে জমা করত কিছু ফল, কিছু রস―যা খেলে মানুষ হাসতে হাসতে মরতে পারে। অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেও গাছটা টিকে ছিল পৃথিবীতে। তার শাখায় শাখায় ছিল সহস্র পাখির বাসা। পাতায় পাতায় ছিল পাখিদের গান। আমি গাছটাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। একবার কী হলো জানিস―ঝিলাম নদী থেকে একটা কুমির এসে পদ্মায় পড়েছিল। পদ্মার মাছ তো খেলো, সাথে সাথে আমাদের গাছটার ফল খেতে খেতে একেবারে মূল ধরে টান দেয়। সত্যিই, একদিন রাত্রির অন্ধকারে গাছটা সে নিয়ে যায়। পদ্মার সেকি কান্না! হাজার হলেও আমাদের নদী তো। মাত্র কিছুক্ষণ আগে পদ্মার দুরন্ত স্রোত বুকে নিয়ে ‘তিরিশ লক্ষ’ তোর জীবনের বিনিময়ে কুমিরের কাছ থেকে গাছটা ছিনিয়ে আনি। কুমিরের রক্তে আমাদের পদ্মাদেবী তার দেহ শীতল করে। আর তিরিশ লক্ষ তোর রক্ত আজ তোর স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা দেখবি―দেখ, বলে বাবা আমার হাত থেকে চারাটি নিয়ে মাটিতে রাখতেই চুয়ান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে গাছটি পূর্ণাঙ্গ জীবন লাভ করে। তিরিশ লক্ষ ফুল ধরল তাতে। ফুলের সুবাসে পৃথিবী বিমোহিত হলো। গাছের মধ্যেখানে সূর্যের মতো লাল একটা ফল ঝুলছে। আমি আনন্দে নাচতে নাচতে ফলটা ছিড়ে আনি। ফলটা ছিড়ে আনতেই দেখলাম, চারদিক হতে লাখো লাখো মানুষ মিছিল করে গাছটার দিকে আসছে। বাবা বললেন, ‘ওরা তোর ভাই। আশ্রয়হীন। অনেক দূর থেকে আসছে, বড় ক্লান্ত।’

রঙিন জামার মতো দিনটা। আকাশের আলনায় ঝুলছে। সূর্যের শানিত রশ্মি তীক্ষ্মতর হচ্ছে। বাবা ফলটা আমার হাত থেকে নিলেন। তার চোখে জল। কি বললেন?… হ্যাঁ, সম্ভবত তিরিশ লক্ষ সন্তানের আত্মজ স্মৃতি বিবর্ণ স্বপ্নের মতো তাঁর চোখে। বাবা তবু আমার ঠোঁটে হৃদয়ের মতো আলপিন দিয়ে একখানি হাসি গেঁথে দিলেন। ক্লান্ত, ঘুমন্ত ভাই-বোনদের চোখগুলো এনে আমার চোখে রাখলেন। এর ফলে আমি যা দেখলাম, তা শুধু দেখা যায় অনন্তকাল, অনন্তের ভাষা দিয়েও তা লিখা যায় না। সূর্যের রশ্মি দিয়ে বাবা ফলটা দু’ভাগ করতেই ফুলের মতো এক গুচ্ছ অন্ধকার, যা আলোরও অধিক, বেরিয়ে আসে ফলটার বুক থেকে। সেই অন্ধকারে বাবা ধীরে ধীরে মিশে গেলেন। আমার কাঁদো কাঁদো অবস্থা। এমন সময় নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্রের মতো সেই অন্ধকার থেকে আপনি এসে আমার সম্মুখে দাঁড়ালেন। আপনার মুখে সহানুভূতির ভাষা। হাতে কি ছিল মনে আছে?… আপনার স্মরণ শক্তি অদ্ভুত। আপনার হাতে ছিল রক্তে আঁকা একটা সবুজ মানচিত্র। মায়ের জরায়ু হতে পৃথিবীতে পড়ে সর্ব প্রথম যা দেখলাম এবং প্রতিদিন যা আঁকতাম ঠিক তার মতো―কোথাও গরমিল নেই, শুধু তার ওপরে লাল কালিতে (?) লিখা Ñ

‘যে দেশে কুহরে পিক বসন্ত কাননে;

দিনেশে যে দেশে সেবে নলিনী যুবতী;

চাঁদের আমোদ যথা কুমুদ-সদনে,

সে দেশে জনম মম;’

মানচিত্রটা আপনি আমার হাতে দিয়ে হাওয়ার সাথে মিশে গেলেন। এর পর বহুদিন আপনার সাথে দেখা নেই। আজ এ দুঃসময়ে আমার ঘরে এলেন। কিন্তু ভাঙা ঘর, ঘরে চাল নেই। চোখে শুয়ে আছে অনন্ত স্বপ্নের মতো আপনার প্রদত্ত মানচিত্রটা; চারদিকে ফুলের মতো গুচ্ছ গুচ্ছ অন্ধকার―হাসছে। চলুন, অন্ধকার আপনাকে দিয়ে আসি।

[ রচনাকাল : ১৫-১৬ আগস্ট ১৯৭৭। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে  লিখা প্রথম গল্প

প্রথম প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮, অন্তরে অনির্বাণ।]

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares