গল্প : অধ্যায় : ধ্রুব এষ

অক্টোবর ২৩, শুক্রবার আজ। এখন দুপুর। ১২টা না ১টা বাজে বোঝা যাচ্ছে না। আকাশ মেঘলা। গতকাল থেকেই মেঘলা। থেকে থেকে ঝিপঝিপ বৃষ্টিও হচ্ছে। পত্রিকায় নিউজ হয়েছে, বঙ্গোপসাগর অস্বাভাবিক উষ্ণ, রাজধানীসহ দেশের মধ্যাঞ্চলে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। আনন্দের কথা। খুবই আনন্দিত, বিরক্ত এবং সংক্ষুব্ধ হয়েছে অধ্যাপক। এটা কোনো কথা হলো নাকি? ভারী বৃষ্টি হোক, খুবই ভারী, বাটখারার মতো ভারী বৃষ্টি হোক, কিন্তু সেটা গতকাল থেকে শুরু হতে হবে কেন? আজ সারাদিন ধরে হবে কেন? আজ সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত নাকি? দুর!

দুর্গাপূজা শুরু হয়ে গেছে দুইদিন। প্রতিমা দেখতে যায়নি এখনও অধ্যাপক। কাল যাবে। মহাঅষ্টমী কাল। করোনার কারণে পূজার আয়োজন এবার অনেকটাই সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। কুমারী পূজা যেমন হচ্ছে না রামকৃষ্ণ মিশন মণ্ডপে। ফি বছর হয়।

দোলায় আগমন গজে গমন এবার দেবীর। খারাপের পর ভালো। দোলায় আগমন মানে রোগ ব্যাধির প্রাদুর্ভাব, গজে গমনের কারণে আবার শস্যভাণ্ডার বৃদ্ধি পাবে দেশের, পৃথিবীর।

সত্যি কি?

অধ্যাপকের বন্ধুদের কেউই এখনও পূজামণ্ডপে যায়নি। করোনার কারণে। কাল নিশ্চয় যাবে তারাও। কল করে দেখবে?

শংকর দেবনাথ (খোকন)। মুক্তি আর্ট হাউসের প্রোপ্রাইটার।

ফরিদ আহমদ। জাহেদা ফার্মেসির প্রোপ্রাইটার।

অনল কান্তি বর্মণ (খোকন)। লাভলী বুক মার্টের প্রোপ্রাইটার।

কোন প্রোপ্রাইটারকে কল দেবে মনস্থির করতে পারল না অধ্যাপক। স্বয়ংক্রিয়ভাবে কল দিল রিভাকে। এমন দুপুরে মোনালি ঘুমাত। রিভা দুপুরে ঘুমাতে পারে না। কল ধরে হাসল, ‘পণ্ডিত মশাই!’

অধ্যাপক বলল, ‘কী করো তুমি?’

‘ভিজি পণ্ডিত মশাই।’

‘বৃষ্টিতে?’

‘বৃষ্টিতে? না। নাহ্্! হি: হি: হি:!’

অধ্যাপক বলল, ‘অ।’

‘অ কী পণ্ডিত মশাই? অ কী? অ কী? হি: হি: হি:। আপনি ভিজেন না? একা ভিজেন না? হি: হি: হি:!’

দেবব্রত সাহা (দেবু)-র বউ রিভা। সতের বছর ধরে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে আছে দেবু। ভারতীয় মাওবাদী হিসেবে আছে। রিভা বলেছে, তার নাম দেবব্রত সাহা (দেবু) নাই আর, সন্তোষ পাঁজা হয়ে গেছে। নকশালবাড়ির মাওবাদী সন্তোষ পাঁজা। সতের বছরেও বউকে সে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যেতে পারেনি। তাদের একমাত্র মেয়েটা থাকে শিলঙে। নেহুতে পড়ে। নর্থ ইস্ট হিল ইউনিভার্সিটি। মেয়ের সঙ্গে কয়েক বছর রিভা শিলঙের লাবানে ছিল, বার-তের বছর ধরে আছে টাউনে। শ্বশুরালয়ে ওঠেনি। বাসা ভাড়া নিয়েছে চাণক্য পাড়ায়। একা থাকে। ভার্চুয়াল এবং কোণঠাসা পৃথিবী। সব মানুষ এখন হলুদ সাংবাদিক। টাউনে রিভা সম্পর্কে যত রিপোর্ট হয় নিত্য, পত্রিকায় ছাপতে হলে উপায় থাকত না।

অধ্যাপকের সঙ্গে কী সম্পর্ক রিভার? বন্ধুত্বপূর্ণ। উস্কানিমূলক রিভার দিক থেকে। অধ্যাপক ধরতে পারে না তা নয়, কিন্তু রিভাকে বোধহয় সে ভয় পায়। ছলবলে খলবলে রিভা। রং ঢং করে যত কথা বলে, সব কথা ধরলে সর্বনাশ। কলকব্জা বিগড়ে যেতে পারে। অধ্যাপকের মধ্যে কিছু পুরনো নীতিবোধ অটল এখনও। বন্ধুর বউয়ের সঙ্গে কোনোরকম অনৈতিক সম্পর্কে জড়াবে না সে। রিভা যতই প্রলোভিত করুক। এ ছাড়া এ রকম কিছু না যে অধ্যাপককে ছাড়া রিভার চলছে না। রিভা একটা চলমান গাড়ি। দেবুকে ছাড়াই চলছে, আর অধ্যাপক! টাউনের বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবী মানুষের কথা শোনা যায়। ভ্রমর পার্টি। মাঝখানে চাউর হয়েছিল সেক্স ভিডিও ভাইরাল হয়েছে রিভার। বানোয়াট কথা। অধ্যাপক পর্নহাব ডটকমে ১৮ বার সার্চ দিয়ে দেখেছে। পর্ন ওয়েব সাইট তখন দেশে নিষিদ্ধ ছিল না। লকডাউনের আগে টাউনের আরেক মেয়ের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। অধ্যাপককে ফরোয়ার্ড করেছিল কে?− রিভা।

মোনালি থাকলে কি অধ্যাপক এখন কল দিতে পারত রিভাকে? সম্বন্ধ করে বিয়ে। কুষ্টি-ঠিকুজি মিলিয়ে দেখা হয়েছিল। পাত্রী অতি সুলক্ষণা। রাজযোটক হবে। রাজযোটক! না অধ্যাপকের সঙ্গে ভালো ভাবে থেকেছে, না সংসার করেছে মোনালি। যেভাবে ছিল থাকা বলে না। দুই বছর আট মাস। কেন ছিল?

ফেসবুকে আছে মোনালি। বিয়ে করেছে আবার, বাচ্চার মা হয়েছে। ষণ্ডাগুণ্ডা মতো দেখতে তার জামাইটা। বাংলা সিনেমার ফাইটারদের মতো। ফেসবুক পোস্ট দেখলে বোঝা যায় ফাইটার ভাইয়ের সঙ্গে ভালো আছে মোনালি। মুশকিল হলো অধ্যাপক চেষ্টা করেও মোনালিকে ভুলতে পারে না। অথচ ৯৭০ দিন যদি হিসাবে ধরা যায় তাদের মধ্যে কোনো কিছুই হয়নি। ভাব-ভালোবাসা, নৈকট্য ইত্যাদি।

জুমার নামাজ শেষ হয়ে গেছে। কোর্ট মসজিদ থেকে মুসল্লিরা ফিরছেন। আব্দু মিয়া স্যার, সালেহ চাচা, সালেহ ভাই, আশরাফ ভাই, মঞ্জু ভাই, মাহবুব, রিপন। চুল দাড়ি লম্বা হয়ে গেছে, আশরাফ ভাইকে তরুণ সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো লাগছে। কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ কয়েকবারই এসেছেন টাউনে। আশরাফ ভাইকে তাঁর সিনেমা নাটকে অভিনয় করতে বলেছিলেন।

দৃষ্টি বিভ্রম হলো ছোটখাটো একজনকে দেখে। মনে হলো আবদুর রহিম মধু স্যার যাচ্ছেন। কীভাবে? আবদুর রহিম মধু স্যার লকডাউনের সময় মারা গেছেন। করোনা পজিটিভ হয়নি। একশ বছর বয়স হয়েছিল।

আব্দুর রহিম মধু স্যার বেজায় স্নেহ করতেন অধ্যাপককে।

চাঞ্চল্য দেখা দিল মুসল্লিদের মধ্যে। পা চালিয়ে, পা চালিয়ে। আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। ঝিপঝিপ বৃষ্টি। গার্লস স্কুলের মাঠ দেখল অধ্যাপক। সরকারি সতীশ চন্দ্র উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। পুরনো স্কুল। শতবর্ষী  প্রায়। ১৭১-এর পর টানা এতদিন বন্ধ মনে হয় কখনও থাকেনি। টাউনের কি, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বন্ধ। প্রতাপ কী কোভিড-১৯ ভাইরাসের!

গার্লস স্কুলের মাঠের ঘাস লম্বা হয়ে গেছে। ডুবে যাবে ফোর ফাইভের মেয়েরা। গার্লস স্কুলের বারান্দায় কে? প্রমোদ হাঁটে। স্কুলের দফতরি। ছোট থেকে দেখছে অধ্যাপকেরা। বুড়ো হয়ে গেছে প্রমোদ, পা টেনে হাঁটে।

মেঘালয়ের সব পাহাড় মেঘে ঢেকে গেছে। মেঘলা দিন না হলে স্পষ্ট দেখা যায়। ঝকঝকে নীল পাহাড়ের সারি। একা থাকলে বারান্দায় বসে দেখে অধ্যাপক। আগে এ রকম দেখা যেত না। ছয় ভাই এক বোন তারা। দুই বছর হলো ভাইয়েরা মিলে চার তলা বিল্ডিং উঠিয়ে ফ্ল্যাট ভাগজোক করে নিয়েছে। বোনকেও ফ্ল্যাট দিয়েছে একটা। বোন বাপের বাড়ি নাইওর এলে থাকে।

অধ্যাপকের ভাগে দুটো ফ্ল্যাট পড়েছে। তিনতলা এবং চারতলায়। চারতলার ফ্ল্যাটটায় সে থাকে। তিন তলার ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

লকডাউনের ঠিক আগে তারা উঠেছে। তরুণ দম্পতি। গ্রাস এনজিওর এরিয়া ম্যানেজার ছেলেটা, মেয়েটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষয়িত্রী। বাচ্চা একটা, মহা রঙিন সে। জামাই মেয়ে নাতনির সঙ্গে মেয়ের বিধবা মাও থাকেন। দেখাশোনা করেন নাতনির। নাতনি টুনটুনি বুড়ি। তার নাম অথই নীলিমা।

অথই নীলিমার মা সিঁথি। সাতাশ-আটাশ বছর হবে বয়স। দুর্গা প্রতিমার মতো দেখতে। রং চাপা কিছু, তাতে রূপ আরও ফুটেছে। সব দিন না, কোনো কোনো দিন, সিঁথিতে সিঁদুর দেয়। নাকের ডগায় কিছু সিঁদুর লেগে থাকে। স্নিগ্ধ এক দৃশ্য পৃথিবীর। দেখা হতো না। লকডাউনের দ্বিতীয় মাসে আতান্তরে পড়েছিল অধ্যাপক, সম্ভবত তার করোনা হয়েছে। তরাসের সেই কয়েকটা দিন। লকডাউন, কোয়ারেন্টিন এবং নিরাপদ সামাজিক দূরত্বের।

লকডাউনের সময় টাউনের কয়েকজন মরেছেন। কেউ করোনা পজিটিভ হয়ে, কেউ বয়স, কেউ আর কোনো রোগে। ভীষণ তরাস ছিল (এবং আছে) টাউনে। এর করোনা, তার করোনা, শোনা যাচ্ছিল, অনলাইন হচ্ছিল। কী অবস্থা! টাউন সুনসান থাকে দিনমান। পারতে কেউ ঘরের বার হয় না। ষোল ঘরের ভজন কাকা মারা গেলেন হার্ট অ্যাটাক করে। তার মরদেহ দেখতে গিয়েছিল অধ্যাপক। মাস্ক গ্লাভস পরেই গিয়েছিল। ভজন কাকার ছেলে সাধন। বাপের মৃত্যুসংবাদ শোনা মাত্রই বাংলা মদের ড্রামে একাধিকবার অবগাহন করে থাকবে, অধ্যাপককে জড়িয়ে ধরে না কচলে-মচলে কাঁদল বলা মুশকিল। সাধনের কান্নায় সিক্ত হলো ভজন কাকার শ্মশানবন্ধু অধ্যাপক।

দুপুরে খাওয়া হয়নি, মৃতদেহ সৎকার করে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে স্নানাহার সেরে সবে টিভি খুলে বসেছে অধ্যাপক, মুস্তফা কল দিল মানে মিস কল দিল। অধ্যাপক কল ব্যাক করল। দিনে থাকে না, সন্ধ্যারাতে স্বাভাবিক থাকবে, মুস্তফা সেই বান্দা না। কল ধরে বলল, ‘হ্যালো? কী রে দাদা?’

অধ্যাপক বলল, ‘কী রে দাদা! কয় গ্লাস হইছে?’

‘মাত্র নিলাম রে দাদা। চুমুকও দিই নাই। সাধনের বাবারে দাহ করতে তুই শ্মশানে গেছলি শুনলাম।’

‘গেছলাম। তো?’

‘সাধন শুনলাম তোরে জাপটায়ে ধরে কানছে?’

‘কানছে। তো?’

‘সাধনের তো করোনা ব্যাটা।’

‘কী?’

‘হ্যাঁ-এ-এ। টাউনের সব মানুষ জানে।’

‘কী বলিস!’

‘কসম বলতেছি। বিশ্বাস না হইলে তুই ফরিদরে ফোন কর। মসরু, লিখন, রোমেন, রাজিবরে ফোন কর। শামীমরে ফোন কর।’

‘টাউনের সব মানুষের নাম বল।’

‘কী?’

‘না, কিছু না।’

ফোনের লাইন কেটে দিল এবং সাময়িকভাবে ফোন অফ রাখল অধ্যাপক। মুস্তফা একটা ফুলটাইম পাড় মাতাল। সকালে দুপুরে সন্ধ্যায় রাতে। এর কথার কোনো দাম নাই। বলে দিল সাধনের করোনা! ফোন খোলা রাখলে আবার জ্বালাতন করবে।

আধঘণ্টা পর ফোন খুলতেই জাহেদা ফার্মেসির প্রোপ্রাইটার কল দিল, ‘এই হারামজাদা, ফোন বন্ধ কেন রে তোর?’

অধ্যাপক বলল, ‘চার্জে দিছলাম।’

‘অ। আমি তো আরও চিন্তায় পড়ে গেছি। ভজন কাকার শ্রাদ্ধে গেছলি নাকি তুই?’

‘ভজন কাকার শ্রাদ্ধ!’

‘আরে দুর! কী বলি? শ্মশানে গেছলি? সাধন শুনলাম তোরে ধরে কানছে।’

‘তোরে কে বলল? মুস্তফা?’

‘মুস্তফা! মুস্তফার লগে তো আমার লকডাউনের পরে আর দেখাও হয় নাই, কথাও হয় নাই। লিখনরে ফোন করছি, লিখন বলল।’

‘অ। লিখনরে মুস্তফা বলছে।’

‘হইতে পারে। শোন রে ভাই, কথায় বলে সাবধানের মার নাই, শ্মশানঘাট থেকে ফিরে গরম পানি দিয়া গোসল করছিস তো তুই?’

‘করছি।’

‘স্যানিটাইজার দিয়া হাত ধুইছিস?’

‘ধুইছি।’

‘শোন, জ্বর জ্বর ভাব যদি হয় সাথে সাথে কল দিবি আমারে।’

‘জ্বর জ্বর ভাব হয় নাই।’

‘সাধনের−।’

‘করোনা?’

‘হ্যাঁ। তবে তোর অত চিন্তার কিছু নাই। মদ গানজা পান বিড়ি কিছুর অভ্যাস নাই, সকালে হাঁটিস, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যথেষ্ট ভালো তোর। সাধন করোনা টেস্ট করতে দিছে। টেস্টের রেজাল্ট এখনও দেয় নাই। করোনা পজিটিভ নাও হইতে পারে তার।’

জাহেদা ফার্মেসি বিশ্বাসযোগ্য। সাধন হারামজাদার সত্যি করোনা তাহলে! হারামজাদা মাতাল! শেষ করে দিয়েছে! জাহেদা ফার্মেসির পর কল দিল বিশু কাকা। বিশু কাকার পর লিখন। সিরিয়াল পড়ল। রোমেন, অহিদ ভাই, শামীম, মসরু, লাভলী বুক মার্টের প্রোপ্রাইটার, অনজন, অনজনের বউ লিপি, রাজিবÑ টাউনবাসী বেজায় চিন্তিত করোনা রোগী সাধন জাপটে ধরেছিল, বলতে গেলে করোনায় অর্ধেক আক্রান্ত হয়ে গেছে অধ্যাপক। ধারাবাহিক উৎপাতে অতিষ্ঠ অধ্যাপক রাতের খাবার খেয়ে যখন ঘুমাবে মুক্তি আর্ট হাউসের প্রোপ্রাইটার কল দিল, ‘এই তোর কী হইছে রে?’

অধ্যাপক ঠান্ডা গলায় বলল, ‘করোনারি থ্রম্বোসিস।’

‘বুঝলাম না। আমি তো শুনলাম করোনা হইছে তোর। করোনা পজিটিভ।’

এত দূর! অধ্যাপক খেপল, ‘আমার করোনা! করোনা পজিটিভ! তোরে কে বলছে? আমার এত শুভাকাক্সক্ষী টাউনে!’

‘তা টাউনে তোর শুভাকাক্সক্ষীর সংখ্যা কি কম? কত ছাত্রী।’

‘ছাত্রী মানে? ছাত্রীদের কথা কেন বললি তুই? এই ইতর! ছাত্রীরা শুধু আমার শুভাকাক্সক্ষী? এই খবিস! আমি কি তোর মতো সাইনবোর্ড লিখে খাই? আমার কি তোর মতো সাইনবোর্ডের দোকান?’

‘এই তুই একটা ভুল কথা বললি। আমি একবারও বলছি বল আমার দোকান আর তোর দোকান এক?’

‘আমার দোকান মানে? দোকান মানে কী? আমি ছাত্রী পড়াই, এইটা দোকান? তোর কাছে দোকান মনে হয়?’

‘আরে তুই এত খেপতেছিস কেন?’

‘না না  তুই বল দোকান মানে কী? দোকান! শোন, আই রিপিট, আমি সাইনবোর্ড লিখে খাই না, শিক্ষকতা করি! শিক্ষকতা বুঝছিস? শিক্ষকরা কী? জাতির বিবেক। বাজারে বিবেক দত্তর হার্ডওয়ারের দোকান থাকতে পারে জাতির বিবেকের দোকান থাকে না। আর একটা কথা শুনে রাখ তুই, আমি যদি করোনা হয়ে মরে যাই, তোরা কেউ আমার শ্মশানবন্ধু হবি না! রাখি!’

রাতে স্নান করেছে বলেই হয়তো অধ্যাপকের জ্বর হলো এবং দুই দিন জ্বর থাকল। করোনার আর কোনো উপসর্গ দেখা দিল না। তাও আতঙ্কিত অধ্যাপক কঠিন নিয়ম করে চৌদ্দ দিন সেলফ কোয়ারেন্টিনে থাকল। ভালো যে আর জ্বর উঠল না বা কিছু হলো না।

চৌদ্দ দিন পর বিকালে মাস্ক পরে ছাদে উঠে এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখল অধ্যাপক। এ কে? মাস্ক পরে ছোট্ট এক পরি ছাদে নাচছে। একা নাচছে। না, একা না, ছোট্ট পরির মাস্ক পরা মাও আছেন সঙ্গে। ছোট্ট পরির মাও পরি। মেঘ রঙের টি-শার্ট, গাঢ় নীল রঙের ট্রাউজারস, হলুদ স্লিপার, চুল পনিটেইল, সিঁথিতে সিঁদুরÑ নাকের ডগায়। কেন যে বিব্রত বোধ করল অধ্যাপক? কেন যে ম্রিয়মাণ হলো? ছাদ থেকে নেমে যাবে কি না ভাবল। পরির মা বলল, ‘নমস্কার, দাদা।’

‘নমস্কার।’ অধ্যাপক বলল।

‘আমি সিঁথি। গত মাসে আমরা তিন তলায় উঠছি।’

‘আমার ফ্ল্যাটে।’ অধ্যাপক বোকার মতো বলল এবং মনে মনে কষে একটা না, তিনটা চড় দিল নিজেকে। এ কথা বলার কী দরকার ছিল? তার কাছ থেকে তারা বাসা ভাড়া নেয়নি। এসব দেখাশোনা করে মেজদা।

সিঁথি অপ্রতিভ হলো না মোটে, তরল গলায় বলল, ‘আমি জানি।’

‘অ।’

‘এই আমার মেয়ে।’

ছোট্ট পরি নাচ রেখে মায়ের কনুই ধরে অধ্যাপককে দেখছে। বড় বড় চোখ। অধ্যাপক বলল, ‘তোমার নাম কী?’

ছোট্ট পরির মুখে কথা সরল না।

ছোট্ট পরির মা বলল, ‘একী! তুমি কি কথা বলতে পারো না? তোমার নাম বলো, নমো করো মামাকে।’

বাচ্চা এক নিঃশ্বাসে বলল, ‘আমার নাম অথই নীলিমা নমস্কার।’

অধ্যাপক হেসে ফেলল, ‘নমস্কার মিস অথই নীলিমা। তোমার মতো তোমার নামও চমৎকার। কে রেখেছে?’

‘আমার মা অথই রেখেছে, আমার বাবা নীলিমা রেখেছে। আনন্দ দাদা পঙ্খী রেখেছে। আনন্দ দাদাকে তুমি দেখোনি। আনন্দ দাদা থাকে অসটেরেলিয়ায়।’

আরও দুই চার কথা হলো এবং আরও একটা বোকামার্কা কথা বলল অধ্যাপক, ‘আপনি শিক্ষক, আমিও শিক্ষক। কলেজে পড়াই।’

কেন যে বলল? অপ্রতিভ হলো না সিঁথি। বলল, ‘জানি দাদা।’

বিল্ডিং হওয়ার পরে দুয়েক বার উঠেছে তবে সেদিন থেকে বিকালে একেবারে নিয়মিত ছাদে ওঠে অধ্যাপক। মাস্ক পরে ওঠে। নিয়মিত মাস্ক পরা সিঁথি এবং অথই নীলিমার সঙ্গে দেখা হয় তার। নানা কথা হয়। দেখবে না কেউ?

লাভলী বুক মার্টের প্রোপ্রাইটারের বউ লাভলী তাদের ভাড়া বাসার ছাদ থেকে দেখল। নিচে নেমে অনল কান্তি বর্মণ (খোকন)-কে বলল, ‘তোমাদের কি সন্ধ্যা হয় না?’

অনল কান্তি বলল, ‘আমাদের মানে? আমরা কারা?’

লাভলী হাসল, ‘প্রফেসর দাদার কথা বলি।’

‘প্রফেসর! সে আবার কী করল?’

‘কয়েকদিন ধরে দেখতেছি প্রফেসর দাদা এক মহিলা আর এক বাচ্চারে নিয়া তাদের ছাদে উঠে হাঁটে।’

‘কী বলো? ভুল দেখো নাই তো?’

‘আমার তোমার মতো বয়স হয় নাই। আমি চোখে কম দেখি না।’

‘সাড়ে সর্বনাশ!’

বই বিক্রেতা খোকন কল দিল সাইনবোর্ড আর্টিস্ট খোকনকে, ‘ও বন্ধু, সাড়ে সর্বনাশ! ভাই তো মেয়েমানুষ নিয়া ছাদে হাঁটাহাঁটি করে ইদানীং। দেখা যায়।’

সাইনবোর্ড আর্টিস্ট খোকন উত্তেজিত হলো। কল দিল মসরুকে, ‘ও মসরু, ভাইয়ের ঘটনা কিছু শুনছ? ভাই তো এই লকডাউনের মধ্যে সিংকিং সিংকিং ড্রিংকিং ওয়াটার! মাস্ক পরে বিকালে ছাদে হাঁটে এক বাচ্চা এবং বাচ্চার মাকে নিয়ে।’

মসরু কল দিল ফরিদকে, ‘ফরিদ ভাই, কাহিনি শুনছেন? সাইনবোর্ড খোকনদারে একটা কল দিয়া দেখেন তো। ভাইরে নিয়া কী বলে না বলে।’

ফরিদ কল দিল সাইনবোর্ড আর্টিস্ট খোকনকে। বিস্তারিত শুনল। কনফারেন্স কল করে শামীম, রাজিব, রোমেন এবং কাওসারকে যুক্ত করল আলোচনায়। কাওসার অবগত করল দিশু কূটনাকে। দিশু কূটনা উনত্রিশ বছর ধরে আছে ঢাকায়। সহসা টাউনে আসে না। তবে বিন্দু বিসর্গের খবরও রাখে টাউনের। কাওসারও থাকে ঢাকায়। শ্যাওড়াপাড়া, মিরপুরে। তার রিপোর্ট শুনে দিশু কূটনা তৎক্ষণাৎ কল দিল অধ্যাপককে, ‘এইসব কী কথা শুনি ভাই?’

অধ্যাপক বলল, ‘কী শুনিস?’

‘ছাদে তোমার সাথে কে হাঁটে ভাই?’

‘ও-ও-ও। তোরে এই খবর কে দিল?’

‘দিছে! ঘটনা সত্যি তো নাকি?’

‘সেই রকম কিছু না রে দিশু।’

‘কোন রকম কিছু? আমি কোনরকম বলছি, ভাই? এক বাচ্চার মা শুনলাম। বনলতা সেনের বইন শুনলাম।’

‘বনলতা সেনের বইন!’

‘ওই আর কি! রূপবতী মাস্টারনি।’

‘আরে! এরা তিনতলায় ভাড়া থাকে রে। বিকালে ছাদে ওঠে। কথাবার্তা হয় দুই একটা। এর বেশি কিছু না। মহিলার জামাই আছে, শাশুড়ি আছে।’

‘রিভার জামাই নাই? শাশুড়ি নাই?’

‘রাখ তোর রিভা! এ আর রিভা এক হইল? কই প্রিয়াঙ্কা গান্ধি আর কই ঘরের বান্দি ব্যাটা।’

‘মাস্টারনি তবে প্রিয়াঙ্কা গান্ধি। আচ্ছা।’

দিশু কূটনা ফেসবুক বিরোধী। না হলে হয়েছিল। তাও তার সাধ্যমত সে করল। আন্তর্জাতিক একটা রূপ দিল ব্যাপারটার। অস্ট্রেলিয়া থেকে বাপি, যুক্তরাজ্য থেকে মৃদুল, কানাডা থেকে টুকু, কল দিল অধ্যাপককে। রসসিক্ত এবং কৌতূহলী তারা, দিশু কূটনার আন্তরিক প্রচেষ্টায়। বয়স কম হলে হয়তো খেপত অধ্যাপক। বয়স নাই আর। সত্যি কি নাই? এত অস্থির লাগে কেন তবে? হা হা শূন্য লাগে কখনও কখনও। কেন? হৃদয় দৌর্বল্য?

একা মানুষের কিছু ফ্যান্টাসি থাকে। একা রাতের, একা দুপুরের। মোনালি ছিল রূঢ় বাস্তবতা, অধ্যাপকের ফ্যান্টাসি কারা টাউনের? তুলতুল আপা, সামিরা আপা, নিরুপমাদি, জলি বৌদি। ফ্যান্টাসি। কখনও রিভা।

সিঁথি না। কখনই না। এ হবে না। অধ্যাপক বিবেচনা করে দেখেছে। মোনালি, রিভা এবং সিঁথি এক না। সিঁথি খুব আরেক রকমের। এই মেয়ে করোনার তরাস ভুলিয়ে তারার ফুল ফোটাতে পারে সন্ধ্যায়।

বৃষ্টি সর্বনাশ করে দিয়েছে। আজ আর ছাদে ওঠা যাবে না। এ জন্য খুবই রাগত ভাব এবং ভঙ্গি ধরে আছে অধ্যাপক। ফোন অফ করে রেখেছে। ঝিম মেরে বসে আছে চেয়ারে। ওরে ও বৃষ্টি! শুয়োরের বাচ্চা বৃষ্টি! বিকালের আগে ধরে গেলেও নিশ্চয়ই সিঁথি আজ ছাদে উঠবে না আর!

সিঁথির জামাই উপজেলায় থাকে। কাল রাতে ফিরেছে। সকালে দেখা হয়েছে অধ্যাপকের সঙ্গে। সিঁথি কয়েকদিন ধরেই বলছে, তার জামাইও সকালে যথেষ্ট বিনয়ের সঙ্গে অবগত করেছে অধ্যাপককে, আজ রাতের লঞ্চে দ্যাশে যাচ্ছে তারা। দশমীর দুই দিন পর ফিরবে। তার মানে? সপ্তমী আজ। অষ্টমী, নবমী, দশমী, যোগ আরও দুই দিন। বৃষ্টিতে যোগ দিল আজকের দিনটাও। মানে বিকালটা। হিসাব, ছয় দিন আর দেখা যাচ্ছে না সিঁথিকে। কী তাতে?

মুশকিল এখানেই।

কী তাতে?

অধ্যাপক দর্শন পড়ায় ছাত্রদের। থেলিস, সক্রেটিস, ডায়োজিনিস, প্লেটো, হিউম, কান্ট, কিয়োর্কেগার্দে পড়ায়। সিঁথি-মুশকিলের দার্শনিক কিছু একটা ব্যাখ্যা সে দাঁড় করাতে পারবে সহজেই। তাতে কী হবে? কিছু কি হবে? গতকাল না, আড়াই হাজার বছর আগে দার্শনিক হেরাক্লিটাস একটা কথা বলে গেছেন, ‘বৃহত্তর বিষয়াদি নিয়ে আমাদের বোঝাপড়া কখনই সম্পূর্ণ হবে না।’

তবে আর কী, এই অধ্যায় কখনই সম্পূর্ণ না হোক।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares