গল্প : খোঁজ : মিলা মাহফুজা

শীত আসছে। পাতা ঝরার সিম্ফনি শোনা যাচ্ছে। সবুজ পাতা এখন প্রতিদিন রঙ পাল্টায়। বিচিত্র রঙে দেখতে দেখতে চারপাশটা মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। পাতা ঝরার এই কাল এখানে ‘ফল্’। পতন। পাতার পতন। পাতার পতনেরও যে এমন অনন্য রূপ হতে পারে চোখে না দেখলে বোঝা কঠিন।

ফল্-এর সময় প্রচুর পর্যটক আসে প্রকৃতির এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে। পার্কেও তাই আজ বেশ লোকের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। অভ্যাস মতোই, গত বছর দেড়েক ধরে এই অভ্যাস তৈরি হয়েছেÑ সিদ্ধার্থ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর, অফিসের পর অন্য খণ্ডকালীন কাজে না গেলে পার্কে সন্ধে অব্দি কাটিয়ে ঘরে ঢোকে  সে। গ্রীষ্মের কটা দিন এই রুটিন প্রায় নিয়মিত। পাতা ঝরার গান শুনতে তার ভালো লাগে। কিন্তু আজ কোনোদিকে তার মন নেই। সে বিভ্রান্তের মতো বসে আছে। প্রতিদিন যে দুটো কাঠবেড়ালিকে সে বাদাম দেয়, তারা পায়ের কাছে ঘুরঘুর করেছে কিছুক্ষণ, জুলজুল করে কাচের চোখে তাকিয়ে দেখেছে জিনিয়াকে। তারপর হয়তো জিনিয়াকে একা থাকার অবসর দিতেই চলে গেছে অন্যদিকে। পার্কের উঁচু উঁচু ওক গাছের শীর্ষে সূর্যালোকের শেষ চুম্বন জানান দিচ্ছে রাত আসছে।

জিনিয়া স্থানুর মতো বসেই আছে, আসলে সে এক প্রবল বিস্ময়ের ভেতর আচ্ছন্ন। সারাহ’র কাছে শোনা কথাগুলো প্রবল ধাক্কায় তার ভুলে যাওয়া অতীতকে একেবারে সামনে এনে তছনছ করে দিয়েছে তার নিয়ম শৃঙ্খলার জীবন। গত কয়েক বছর ধরে একটু একটু করে যে জীবন গড়ে তুলেছে সে। 

প্রায় বছর দুই আগে সারাহ’র সাথে তার পরিচয়। জানাশোনাটা তেমন গভীর ছিল না। তবে একটা সম্পর্কের টান দুজনেই টের পেত। দেখা না হওয়া কয়েকটা দিন কাটার পর দেখামাত্র ‘ইউ’! বলে যে হাগটা তারা করত তার স্থায়িত্ব হতো দীর্ঘ এবং বেশ উষ্ণ। সারাহ’র সাথে প্রথম দেখা এক শপিং স্টোরে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তারা একই জিনিস বাছাই করছিল। কি কারণে যেন মুখ ঘুরাতেই পাশের জনের চেহারাটায় হঠাৎ আটকে গিয়েছিল জিনিয়ার চোখ। কেমন চেনা চেনা চেহারা। পোশাক কিংবা হাঁটাচলায় যদিও সম্পূর্ণ আলাদা ধরন আলাদা কেতা। ইউরোপীয় স্মার্টনেস। তবু কেন তার চেনা চেনা লাগে বোঝে না জিনিয়া। পরপর কয়েকদিন একই স্টোরে দুজনের দেখা হয়ে যেতে থাকে। জিনিয়া সাধারণত অফিসের কাজ শেষ করে ওই স্টোর থেকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে একবারে ঘরে ফেরার বাসে ওঠে, সারাহ কেন ওখানেই যায় সেটা সে-ই জানত  কেবল। তারপর একদিন হাই, হাই থেকে শুভসন্ধ্যা, শুভরাত্রিতে পৌঁছাল। কবে কখন তারা প্রথম কথা বলেছিল মনে নেই। সারাহ একদিন আচমকা স্টোরে ঢোকার পরই প্রস্তাব করেছিল- আমার সাথে এক কাপ কফি পান করতে কি তোমার আপত্তি হবে?

অফ কোর্স না।

সারাহ নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছিল সেদিন। অন্য সময় একটি দুর্দান্ত সুপুরুষ তাকে তুলে নেয়, দেখেছে জিনিয়া। পুরুষটির মতো গাড়িটিও ঝকঝকে। দাম অনুমান করতে না পারলেও বোঝে এ রকম একটা গাড়ির জন্য প্রচুর প্রচুর ডলারের মালিক হতে হয়।

কফির সাথে এক পিস করে কেকেরও অর্ডার দেয় সেদিন সারাহ। দেখে জিনিয়া বোঝে কোনো বিশেষ কথা বলতে এসেছে সারাহ। জিনিয়া বিশেষ মাথা ঘামায়নি। সারাহ জানে সে একটি সরকারি সংস্থায় কাউন্সিলারের কাজ করে। নূতন অভিবাসীদের এদেশে বসবাস সহজতর করার পরামর্শ দেওয়া, তাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দেওয়া, বিশেষ করে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য আর আইনগত অধিকার ঠিক রাখার জন্য করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া জিনিয়ার কাজ। জিনিয়া আন্দাজ করেছে সারাহ এদেশের উপরতলার  মানুষ। সেই অবস্থান থেকে জিনিয়ার মতো সাধারণ মানুষের―এ দেশে এসেই সাইকোলজির ওপর একটা ডিগ্রি না করা পর্যন্ত যাকে অড জব করে কোনো রকমে দিন গুজরান করতে হতো―কাছে কোনো দরকার থাকার কথা নয়। 

কফির কাপ টেবিলে ফেলে রেখে উদাসভাবে কেকের টুকরোয় ছোট ছোট কামড় বসাতে থাকা সারাহ’র দিকে জিনিয়া গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখেও অনুমান করতে পারেনি কিছুই। শেষ পর্যন্ত সে কফিটা গরম গরম খাওয়ার দিকেই মন দেয়। দামি কফি, সারাহ নামটা বলেছিল ওয়েটারকে, জিনিয়া ভালো করে শোনেনি, কিন্তু স্বাদই বলে দিচ্ছে এর জন্য বেশ ভালো কিছু ডলার খরচ হলো সারাহ’র। জিনিয়া যেটা করতে অন্তত দশবার ভাবত।

জিনিয়া এদেশে সেটেলড হয়ে গেছে। তার এখন পার্মানেন্ট জব আছে। সপ্তাহে দুদিন ছুটি। অফিস ছুটি হয় বিকেল সাড়ে তিনটেয়। সে ছুটির পর একটা অল্পসময়ের কাজ জুটিয়ে নেয়। সপ্তাহের ছুটির দুদিনের একদিন অবশ্যই কাজ করে। ছেলে সিদ্ধার্থ এখানে থাকলে, সন্ধ্যের কাজটা করে না। ছেলেকে সময় দিতে চায়, রেঁধে খাওয়ায়। ছেলের ভার্সিটির গল্প শোনে। ভালো একটা ফ্ল্যাট কেনা, ছেলের খরচ চালানো, ভবিষ্যতের সঞ্চয়- সবের ভাবনা তার মাথায় ছিল প্রথম থেকেই। খুব ভেবেচিন্তেই সে এগিয়েছে। প্রথম যখন আসে, একই প্লেনে আসা যুবক আহির, যে এখানে কোনো একটা ইউনির্ভাসিটিতে পড়ে, আর সাথে অড জব করে ডলার কামায়, যে ডলারের অধিকাংশ দেশে মাকে পাঠায় সংসার চালাতে। সেই মূলত সাহস জুগিয়ে জিনিয়ার এদেশে আসার ইচ্ছেকে শক্ত করেছিল। তা নইলে দেশটা সোনার খনি―গিয়ে পড়তে পারলেই হলো, সোনা মানে ডলার হাতের তেলোয় উঠে আসে আপসে এই রকমটা শোনা ছিল মাত্র। আহির তার ধারণা বারবার ভেঙে দিত―প্রচণ্ড ঠান্ডায় টিকে থাকা কঠিন। প্রথম প্রথম কাজ পাওয়া খুব কঠিন। প্রচুর খেটেই কিছু ডলার পাওয়া যাবে যা দিয়ে খাবার, পোশাক কেনা আর ঘর ভাড়া দেওয়া সহজ হবে না। কেবলই নেগেটিভ কথা। কিন্তু আহিরের কথার শেষ কথাটি থাকত―চেষ্টা করলে সবই সম্ভব।

জিনিয়া চেষ্টা করার চেষ্টাই করে। একা হলে চিন্তা করত না, কিন্তু সাথে দু’ বছরের সিদ্ধার্থ। এ দেশে পৌঁছানোর পর আহিরের অক্লান্ত সাহায্যে সোশাল হেল্প, মাথা গোঁজার জায়গায়, সিদ্ধার্থের জন্য স্কুলের ব্যবস্থা করতে কিছু কম কষ্ট পেলেও আরও একটু স্বস্তি একটু ভালো থাকার জন্য কী না করেছে সে! এ দেশে  সোশাল হেল্পে খাওয়া-থাকা সমস্যা না হলেও ভালো থাকা, নিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য যথেষ্টই খাটতে হয়। জিনিয়া এ দেশে, এমনকি এ শহরেও আহির ছাড়া আর কাউকে চিনত না। আহিরই বা কতটুকু করতে পারে। তার নিজের ঘাড়েই দশমনি বোঝা। তবু ছেলেটা একেবারে সরে যায়নি। সমস্ত সমস্যায় পরামর্শ দিয়েছে, ভালো কাজের সন্ধান ওর কাছেই পেয়েছে। আহিরের কাছে কৃতজ্ঞ জিনিয়া। অথচ আহির তার কেউ নয়। একদিন ঘটনাক্রমে রক্তাক্ত জিনিয়াকে সে এক গলিপথ থেকে রিকশায় তুলে এক ওষুধের দোকানের কর্মচারীর কাছে নিয়ে গিয়েছিল। মাথার ব্যান্ডেজ আর ওষুধের টাকাও দিয়েছিল। কিন্তু জিজ্ঞেস করেনি, কি কারণে জিনিয়া ওখানে ওভাবে রক্তাক্ত জ্ঞানহীন পড়েছিল। বাড়ি পর্যন্ত এগিয়েও দিয়েছিল। পরদিন যে সে আবার আসবে জিনিয়া কল্পনাও করেনি। বাসার দরজায় তাকে দেখে বিব্রত। কিছুক্ষণ আগে আরিফ দেয়ালে মাথা ঠুকে দেওয়ায় কপালের একদিকে ফুলে উঠেছে গোল আলুর মতো। আহিরেরও প্রথমে সেদিকেই চোখ পড়েছিল, কিন্তু সে নিয়ে কিছু না বলে হাতের তেলোয় একটা কানের দুল এগিয়ে দিয়ে বলে, কাল ওষুধের দোকানে ফেলে এসেছিলেন।

মাথায় ব্যান্ডেজ করার সময় কম্পাউন্ডার দুলটা খুলে রেখেছিল। দুলের কথা মনে পড়ার অবসর জিনিয়ার হয়নি। আহিরের হাতে দুলটা দেখেও খুব আগ্রহ বোধ করে না। তবু নেয়, শুকনো মুখে ধন্যবাদ বলে বিদায় দিতে চায়। আহির কিছু বলতে গিয়েও না বলে সিঁড়িতে নেমে যেতে উদ্যত হয়েও ঘুরে প্যান্টের পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে এগিয়ে দেয়―আমার পরিচিত এডভোকেট, মহিলা পরিষদের সদস্য।

এডভোকেট তামান্নার সাহায্য নিয়ে আরিফের সাথে সম্পর্কে ছেদ টানার কাজটা খানিকটা নিজের অনুকূলে নিতে পেরেছিল। যেটা নিয়েছিল ছেলের জন্য। যে ছেলেকে আরিফ তখন পুরো অস্বীকার করছিল, তবে আইনের বেড়ায় আটকে বাধ্য হয়েছিল ছেলের দায়িত্ব শেয়ার করতে। লোকটাকে একেবারে এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল না জিনিয়ার। তারপর তো তার নিজের টিকে থাকার রসদের খোঁজ করা। এডভোকেট তামান্না একটা কাজ জুটিয়ে দিয়েছিল কিন্তু ঠিক ওইটুকুতে সব সামলে ওঠা কঠিনই ছিল। আবার এও তো ঠিক ঝপ করে কাদায় পড়া জীবনটাও তার চিরকালের জীবন হতে পারে না। আরিফের অপমানটা তাকে এতটাই করাত চেরা করত যে সে তাকে খুন করার কথাও ভাবত। তবে তার আগে নিজের পায়ের তলার মাটিটা শক্ত করতে চেয়েছিল জিনিয়া। কিন্তু জুৎসই কিছু করে উঠতে পারছিল না।   

আহিরের সাথে যোগাযোগটা ছিল অনিয়মিত। হঠাৎই একদিন ওকেই বলে, আমিও কানাডায় যাব।

তার পরের দিনগুলোর যন্ত্রণাটা উপেক্ষা করেছে আশার পলতেয় আগুন ধরাতে। পলতে জ্বলে উঠতে তিন বছর সময় লেগেছিল। ছেলে সিদ্ধার্থকে নিয়ে বিমানে উঠে বসেছিল চেনা জগৎ থেকে হারিয়ে যাওয়ার এক বাসনা নিয়ে।

তারপর দশ বছর কেটে গেছে। ভয়ংকর নিষ্ঠুর ঠান্ডার দেশ কানাডায় নতুন শিকড় ছড়াতে যে পরিশ্রম করতে হয়েছে তার মধ্যে কবে যেন আরিফ, সবুজ শ্যামল জন্মভূমি, মা―সব বিস্মৃতির অতলে চলে গেছে। জন্ম দিয়েছে নতুন জিনিয়াকে। নতুন পরিচয়ে।

জিনিয়া স্ট্রাগলার, জিনিয়া সেটলার। সেই পরিচয়েই জানে তাকে সারাহ।  প্রাচীন অভিবাসী- যাদের হাতে প্রচুর বিত্ত, শিক্ষা, ক্ষমতা। অভিজাত এলাকায় যাদের বসবাস। সারাহ তাদেরই একজন। সে জিনিয়ার কাছে কি চায় তা নিয়ে বেশি ভাবতে চায়নি জিনিয়া। চমকপ্রদ কিছু হতে পারে ধরে নিয়েছে। কিন্তু এত ভনিতা করারও কোনো মানে পায় না  সে। নিজের কফির মগে মনোযোগী চুমুক দেয় সে।

কফি ঠান্ডা হচ্ছে দেখেও সারাহ’র নীরবতা ভাঙে না জিনিয়া। ওর গরজ থাকলে নিজেই মুখ খুলবে। তাই হলো, হঠাৎই ঘুরে বসে কফির কাপে লম্বা দুটো চুমুক দিয়ে বলল, জিনি, আমার লাইফ নিয়ে তোমার কোনো কৌতূহল নেই কেন?

জিনিয়া কথাটা হজম করতে কিছুটা সময় নিল। এটা অভিযোগ নাকি অনুযোগ? নাকি নিছক কথা শুরু করার প্রিলুড?

ওর উত্তর না পেয়ে সারাহ বলল, তুমি কি খেয়াল করেছ আজ কীথ আসেনি?

করেছি নিশ্চয়ই।

কেন আসেনি জানো?

না, মানে কীথ, ওর নামটাই তো এই মাত্র জানলাম, পরিচয়ও তো হয়নি কখনও।

ও আমার মতো না, ব্রিটিশ অরিজিন, ওর নাকটা উঁচু। মেশামেশির ব্যাপারে কিছুটা কনজারভেটিভ। 

কিছু বলার না পেয়ে জিনিয়া কাপের তলানিতেই চুমুক দেয়। সারাহ বলে, ও আর কোনোদিন আসবে না। আমাদের কাল ডিভোর্স হয়ে গেছে।

জিনিয়া চমকে ওঠে। কীথ আর সারাহ বিবাহিত দম্পতি ছিল কিনা জানা নেই। এদেশে বিয়ে করা খুব ইমপোর্টেন্ট নয়, প্রেম হলে, এমনকি না হলেও বৈষয়িক প্রয়োজনেও দুজনে একসঙ্গে সংসার করে। সন্তান জন্ম দেয়। সন্তান সাবালক হওয়ার পর কেউ কেউ বিয়ে করে। বিয়ে এখানে প্রাচীন ধারণা।

সারাহ নিজেই বলল, দশ বছর একসাথে ছিলাম আমরা। ভীষণ ভালো ছিলাম। কীথ খুবই ভদ্র। খুব কেয়ারিং। দারুণ শিষ্টাচারসম্পন্ন মানুষ। স্বামী হিসেবে ঈর্ষা করার মতো। যে কোনো বিষয়ে ওর মাত্রা-জ্ঞান সমীহ করার মতো।

ঠোঁটের গোড়ায় এসে যাচ্ছিল, তাহলে আলাদা হলে কেন?

সারাহ আর ঠোঁট ফাঁক করে না। সারাহ তার কাছে কোনো সান্ত¦নার কথা শুনতে চায় তেমন মনে হয় না জিনিয়ার। বরং আরও কিছু বলবে বলেই মনে হয়, কিন্তু না, কিছুটা সময় চুপচাপ বসে থেকে সারাহ একসময় বলে, চলো উঠি।

গতকাল সে আবারও জিনিয়াকে নিয়ে যায় কফি খেতে। সারাহ’র চেহারা মলিন। খুব ক্লান্তও দেখায় তাকে। কীথের চলে যাওয়া কি এতটাই পোড়াচ্ছে সারাহকে! নাকি অন্য কিছু? কোন সমস্যা?

সারাহ ওকে প্রশ্ন করার সুযোগ দিল না। সোজা হয়ে বসে বলল―আমার বাবা মাইকেল ওয়ার্ড আর মা এলিসা ওয়ার্ড মারা গিয়েছেন কিছুদিন আগে তোমাকে বলেছিলাম। বাবা-মা কীথকে খুব পছন্দ করতেন। কীথও তাদের পছন্দ করত। প্রায়ই আমরা মায়ের ওখানে যেতাম। কীথের পছন্দের ডিশ মা তৈরি করত নিজে হাতে। খুবই একটা মাখোমাখো সম্পর্ক ছিল তাদের মধ্যে। কীথের সঙ্গে বাবা টেনিস খেলতে ভালোবাসত। কীথের স্মুথ ড্রাইভও বাবার পছন্দ ছিল। আর কাউকে কোনোদিন না দিলেও কীথের হাতে বাবা নিজের প্রিয় … গাড়িটা ছেড়ে দিত।

বাবার যথেষ্ট টাকাপয়সা ছিল। খরচও করত তেমনি। জীবনটা দারুণ করে উপভোগ করতে জানত। নানা এডভেঞ্চারে ভরা ছিল আমাদের জীবন। বাবা-মা দুজনেরই এটা দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। কিন্তু তারা খুব সুখি দম্পতি ছিল। একসঙ্গে পঞ্চাশ বছর কাটিয়েছে। আমি একটা হ্যাপি ফ্যামিলির সন্তান ছিলাম। কীথের সাথে আমার জীবনটাও খুব সুন্দর কাটছিল।  বাবা-মায়ের হঠাৎ মৃত্যু আমাকে কষ্ট দিয়েছে খুব। কিন্তু কীথ পাশে থাকায় আমি ভেঙে পড়িনি। বরং সামলেই নিচ্ছিলাম। এ সময় বাবার সলিসিটার পল স্মিথ আমাদের দুজনকেই যখন ডেকে পাঠালেন, তাতে কীথ কিছুটা বিব্রত। বলছিল, আমি কেন যাব? তোমার ব্যাপার, তুমিই যাও।

কিন্তু মি. স্মিথ খুব জোর দিয়ে কীথকেও যেতে বলেছিলেন। সলিসিটারের অফিসে পৌঁছানোর পর আমার খটকা লাগে। মি. স্মিথ যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত আন্তরিকতা দেখাচ্ছেন! যা হোক, বসার পর তিনি একটা ফাইল আমাদের দিকে ঠেলে দিলেন দেখে  বললাম, আপনি মুখে বলুন না, পরে ফাইল পড়ে সই করে দেব।

মি. স্মিথ একটা ঢোক গিলে বললেন, মি. এন্ড মিসেস ওয়ার্ড তাঁদের সমস্ত সম্পত্তি তিনটি চ্যারিটি হোমকে দিয়ে গেছেন। একসেপ্ট…

মি. স্মিথের বলা ‘সমস্ত সম্পত্তি’ শব্দ দুটো আমার মাথায় পেরেক হয়ে পুঁতে যাচ্ছিল। পরের কথা শুনতে পাইনি।

মি. স্মিথ কিছুক্ষণ পরে আমাকে দ্বিতীয়বারের মতো শোনালেন উইলের বয়ান। আমার জন্য একটা বাড়ি আর ব্যাংকে কিছু টাকা বরাদ্দ করেছেন আমার বাবা-মা। কীথকে বাবা নিজের গাড়িটা ও একটা ফার্ম গিফট করেছেন।

ধাক্কা খেলেও বাবার সম্পত্তি তিনি যা ইচ্ছে করেছেন―নিজেকে সান্ত¦না দিয়ে মি. স্মিথকে ধন্যবাদ দিয়ে উঠে পড়তে তিনি বললেন, আপনার জন্য উনি এই খামটা রেখে গেছেন।

কিসের খাম? আলাদা করে খামই বা কেন? মি. স্মিথ বললেন খামের ভিতর কি আছে তা তিনি জানেন না। বহুদিন আগে দিয়েছেন আর নির্দেশ ছিল তাদের মৃত্যুর পর আমাকে দেওয়ার।

ওখানেই খুললাম খামটা। কিছু পেপার কাটিং, একটা অতি পুরনো পাসপোর্ট, কিছু আইনি কাগজপত্র।

পেপার কাটিংগুলো ছিল কয়েকটা নিউজ পেপারে প্রকাশিত নিউজের কাটিং। ১৯৭২ সালের। বাংলাদেশ নামের একটা দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতিতা নারীদের খবর। যাদের অধিকাংশ ছিল গর্ভবতী। তাদের অনাকক্সিক্ষত সন্তানদের করুণ অবস্থার কথা। সেই অনাকক্সিক্ষত শিশুদের দত্তক নিতে আগ্রহ জানানো কিছু মানুষের কথা। একটি শিশু হোম থেকে মাইকেল আর এলিসার কাছে একটি মেয়ে শিশুকে দত্তক দেবার ছাড়পত্র। ছাড়পত্রে শিশুর বাবা নামের জায়গায় লেখা-অজানা, মায়ের নাম-মর্জিনা। ঠিকানা ওই শিশু হোম। একজন মহিলার সাথে শিশু কোলে হাস্যোজ্জ্বল মাইকেল ওয়ার্ড  ও এলিসার ছবি। পাসপোর্টে দুই মাস বয়সী এক শিশুর ছবি। শিশুটা আমি। আমি সারাহ একজন যুদ্ধশিশু।  

সেদিনের পর কীথ বদলে গেল। আমি যে মাইকেল আর এলিসার পালিত সন্তান সেটা কীথের জানা ছিল। সেটা নিয়ে সমস্যা ছিল না তার। এখন সে আমাকে এড়িয়ে চলতে লাগল। একদিন ধরে পড়লাম। আমি যুদ্ধশিশু এটা সমস্যা নাকি আমার বাবা-মার কোনো সম্পত্তি পেলাম না সেটা। কীথ মানুষটা সরল। কোনো ভান ভণিতা না করেই বলে, ডার্লিং, আমার মাথা থেকে ওয়ারচাইল্ড বিষয়টা বের করতেই পারছি না। কোনোদিন পারব বলে মনে হয় না। দেখো তোমার বাবা-মা মানে মাইকেল আর এলিসাও পারেনি। তুমি ওদের নিজের সন্তান হলে ওরা এমনটা করত না নিশ্চয়ই। তোমাকে ওরা দয়া করেছিলেন। তোমার প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে―তোমরা অনাথ শিশুর প্রতি তোমাদের দায়িত্ব পালন করলে ঈশ্বর খুশি হবেন। নিঃসন্তান ওরা ঈশ্বরের নির্দেশ পালন করেছেন মাত্র। কিন্তু আমি… প্লিজ সারাহ, ফরগিভ মি।

তাই ছেড়ে দিয়েছি কীথকে। কাউকে কি জোর করে ধরে রাখা যায়, বলো জিনিয়া?

না, যায় না। জিনিয়ার চেয়ে সে কথা আর কে ভালো জানে? আরিফকে জিনিয়া ধরে রাখার কম চেষ্টা করেনি। তারপর তো ছেড়ে দিতেই হয়েছে। মধ্যখানে অনেক কষ্ট অনেক অপমান-অসম্মান মগজে গেঁথে গেছে। যেটা কিছুতেই উপড়ে ফেলতে পারে না।

কিন্তু সারাহ’র জীবন কাহিনির সাথে জিনিয়ার কাহিনি প্রায় হুবহু মিলে যাওয়া কতটা কাকতালীয়? সে যুদ্ধশিশু নয়, কিন্তু তার মা যুদ্ধ নির্যাতিতা। শুধু এই জানাটা আরিফকে আমূল বদলে দিয়েছিল। তাও বিয়ের আট বছর পরে। কী ঘেন্নাটাই আরিফ করতে শুরু করেছিল জিনিয়াকে! একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে এতটা ঘেন্না করতে পারে? নিজের ছেলেটাকেও তার ঘেন্না করত ছুঁতে। পঁচা আপেলের মতো তাদের দুজনকেই ছুড়ে ফেলে দিয়েছে বারবার। শেষপর্যন্ত নিষ্কৃতি নিয়েছে।

খুব ইচ্ছে করল সারাহকে নিজের কথাগুলো বলে। জিনিয়া চোখের পানি ঠেকাতে ঠেকাতে সারাহ’র দিকে তাকাল। সারাহ আবার উদাসীন। জিনিয়া এ সময়টায় নিজেকে সামলাল। সারাহ এবার সোজা হয়ে বসে বলল, আমি আমার মায়ের খোঁজ করতে চাই? অন্তত আমার একটা শেকড় আমি দেখতে চাই। তুমি আমাকে সাহায্য করবে?

জিনিয়া উত্তর দিতে পারেনি। একটু ভেবে দেখি বলে উঠে এসেছে। সারাহ’র শেকড়? সে শেকড় খোঁজা কি সহজ? জিনিয়া নিজের শেকড়টাই কি ঠিকমতো চেনে? আটাশ বছর বয়সে হঠাৎ একদিন বীরাঙ্গনার মেয়ে পরিচয়ে পরিচিতি পেয়েছিল সে। সত্যতা যাচাই করার আগেই আরিফের ঘৃণার ঢলে সে সিদ্ধার্থসহ প্রবলভাবে হাবুডুবু খাচ্ছিল। তারপর আর ইচ্ছে করেনি পিছন খুঁড়তে। দৈব প্রাপ্তির মতো আহিরের আগমন, পরামর্শ, নতুন জীবন ভাবনা অবসর দেয়নি জিনিয়াকে আর। তারপর তো সে-সব ভুলে যাওয়ার চেষ্টায় একগুঁয়ে ষাঁড়ের মতো কেবলই সামনে ছুটেছে। ছুটতে ছুটতে এখানে থিতু হয়েছে। কিন্তু শেকড় কি পুরো উপড়াতে পেরেছে? সারাহ’র কথায় শেকড় টান দিচ্ছে কেন?

ক্লান্ত বিষণ্ন হতাশ একটি দীর্ঘশ্বাস ওক গাছের পাতায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। রাত্রি গাঢ় হয়েছে অনেকটাই। নির্ঘুম রাতে জিনিয়া তন্দ্রার মধ্যে মাকে দেখল কয়েকবার।

সারাহ করিৎকর্মা মেয়ে। সে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের দুটো এনজিও, যারা যুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের নিয়ে কাজ করেছে, বা এখনও করছে তাদের সাথে আর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করেছে। আশাব্যঞ্জক কিছু অগ্রগতি হয়নি। একটি এনজিওর এক মহিলা কর্মী তাকে আশ্বাস দিয়েছে, সে গিয়ে নিজে খোঁজাখুঁজি করলে ভালো ফল পাবে। সারাহ’র উদ্যম জিনিয়াকে সচল করে। সে তার অফিসে বলে দুই সপ্তাহের ছুটির ব্যবস্থা করে।

বিমানে উঠে সারাহ বলল, বাংলাদেশের মানুষ একটা অসম্ভব যুদ্ধে জয় লাভ করেছিল। পাকিস্তানের মতো ট্রেইন্ড আর্মির সাথে যুদ্ধে জয়, নিয়ার এবাউট ইমপসিবল ছিল। শুধু মনোবলই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। এটা ইতিহাসে বিরল। কিন্তু যুদ্ধশিশু, যুদ্ধে নির্যাতিতা নারী―সবই তো যুদ্ধের অংশ। এই অংশটাকে পুরোপুরি অস্বীকার করল কেন সেই একই মানুষ? আমি পড়েছি―বাংলাদেশে যুদ্ধে রেপড মহিলারা পরে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে খুবই অসম্মানিত হয়েছেন। তাদের বাড়িতে স্থান দেওয়া হয়নি। সরকারও তাদের দায়িত্ব নেয়নি। কিছু নারীকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সেটাও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ওইসব নারী পরেও অনেক রকম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আমি পুরোই বিস্মিত, জিনিয়া। ভাবতে ইচ্ছে করছে যে ও রকম কিছু ঘটেনি। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ, কিছু অনিয়ম হয়েছিল হয়তো। কিন্তু না জিনিয়া, যত পড়ছি তত আমি হতাশ।

সারা পথ সারাহ নিচু গলায় যুদ্ধে নির্যাতিতা নারী বিষয়ে কথা বলেই চলে। একবার সে  উত্তেজিত হয়ে বলে, ওই সব মহিলার স্বাধীন হবার মাত্র ছয়দিন পরে সরকার ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাব দিয়ে সম্মানিত করেছিল। কিন্তু খেতাবের চেয়ে দরকার ছিল তাদের পুরোপুরি পুনর্বাসন। ভালো শেল্টার, চাকরি, কাজ। নিজের রোজগার। অর্থ অনেক প্রবলেম সহজ করে। ওদের রোজগার থাকলে ওরা রুখে দাঁড়াতে পারত। ওদের আবার নির্যাতিত হতে হতো না।

জিনিয়া অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে সারাহকে। তার ভেতরে এসব প্রশ্ন কোনোদিন জাগেনি। মা চাকরি করে তাদের দুজনের সংসার চালাত। মা ছাড়া তার আর কেউ ছিল না। কোনো আত্মীয় না। মায়ের কোনো বন্ধু ছিল না। তার বন্ধুদেরও মা বাড়িতে নেওয়া পছন্দ করত না। মা বলেনি, সে নিজেই বন্ধুদের বলেছিল তার বাবা মারা গেছে। খুব খারাপ ছিল না জীবনটা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী আরিফ নিজেই আগ্রহ করেছিল বিয়ের। গ্রামে থাকা নিজের পরিবারের বিষয়ে আরিফ তেমন কিছু জানায়নি কোনোদিন। আর পরিবারহীন হয়ে বেড়ে ওঠা জিনিয়াও কৌতূহল বোধ করেনি সে বিষয়ে। কাজি অফিসে বিয়ে করে নিজের ভাড়া বাসায় সংসার পেতেছিল আরিফ। ভালোই কাটছিল। হঠাৎ একদিন আরিফ জেনে আসে―জিনিয়ার মা উনিশশ একাত্তর সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনা ছাউনিতে বন্দি ছিল তিন মাস। তারপর আরিফ একেবারে অচেনা মানুষ। জিনিয়া যেদিন সিদ্ধার্থকে নিয়ে মায়ের কাছে ফিরে যায় তার কয়েকদিন পরে অফিসের টেবিলেই মা লুটিয়ে পড়েছিল প্রাণহীন হয়ে। মায়ের জীবনের আরও অনেক কথার মতোই এই পর্বটিও জিনিয়া জানার চেষ্টা করেনি। সারাহ’র শেকড় সন্ধানী অভিযাত্রায় তাই তার বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। সারাহকে কেবল সঙ্গ দিচ্ছে মাত্র।

বুক করা হোটেলেই উঠল দুজনে। এনজিওর কর্মী তাসনুভা রাহাতের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। ঠিক হলো পরদিন সকালেই তারা বেরুবে―সারাহ’র সেই শেল্টার হোমের খোঁজে। ঢাকায় পা দেওয়ার পর থেকে সারাহ’র মধ্যে এক ধরনের পরিববর্তন লক্ষ করছে জিনিয়া। শান্তশিষ্ট সারাহ কেমন অস্থির হয়ে আছে। কোথাও ঠিকমতো দাঁড়াচ্ছে বা বসছে না? কী এক উত্তেজনায় সে অধীর।

জিনিয়া কাচের জানালার ওপাশে শরতের নীল আকাশের দিকে তাকাল। অল্প কিছু সাদা মেঘ আলগোছে ভেসে বেড়াচ্ছে। দেখতে দেখতে সে টের পেল তার ভেতরটা কেমন ভিজে উঠছে। এই দেশে সে জন্মেছে, কিন্তু একটা মানুষ নেই যার কাছে জিনিয়া ছুটে যেতে পারে!

কখন তার চোখ জলে ভরেছে টের পায়নি, টের পেল সারাহ তার কাঁধে হাত রেখে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে।

সকালে দেখা গেল তাসনুভা সাথে একজনকে নিয়ে এসেছেন, পরিচয় করিয়ে দিলেন- সাংবাদিক, গৌতম দত্ত।

গৌতম দৈনিক সংবাদপত্রে ফিচার রাইটারের কাজ করে। গৌতম খুব আন্তরিক মনোযোগে সারাহ’র কথা শুনলেন, কাগজপত্রগুলো দেখলেন। তারপর একটা প্রোগ্রাম সূচি রাখলেন সারাহ’র সামনে। সারাহ নিজে খুঁটিয়ে দেখে জিনিয়াকে দিল। কিছুক্ষণ পরে তারা বেরিয়ে পড়ল। প্রথম লক্ষ্য সেই শেল্টার হোমের খোঁজ করা। ধানমন্ডির ঠিকানায় গিয়ে কিছু পাওয়া যাবে না জানা ছিল তবু সেখানটায় যাওয়া হলো। যে রকম বাড়ির ছবি পেপার কাটিংয়ে দেখা যাচ্ছে সেরকম কোনো বাড়ি সেখানে নেই।  আকাশ দখল করা সব উঁচু উঁচু বাড়ি। আশেপাশে চায়ের টং দোকান, পথচারি, অফিসকর্মী কারও কাছেই শেল্টার হোমের কোনো তথ্য পাওয়া গেল না। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে গেছে। সারাহ গৌতম দত্তকে লাঞ্চ করার আমন্ত্রণ জানাল। গৌতম হেসে বললেন, লাঞ্চ টাইম তো অনেক আগেই শেষ হয়েছে। আমরা আফটার নুন মিল পাই কিনা দেখতে হবে। বলে হা হা করে হাসলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে গৌতম দত্ত মেনু কার্ড নিয়েই যেভাবে একটার পর একটা ডিসের নাম করতে লাগলেন তাতে বোঝা গেল এই রেস্টুরেন্টে তিনি নিয়মিত আসেন। সারাহ নিজের হাতের মেনু কার্ড জিনিয়াকে দিয়ে বলল, প্লিজ, মেক এ অর্ডার সামথিং লাইট ফর মি।

গৌতম দত্ত অগত্যা―বিরিয়ানিটা এখানে চমৎকার হয়―বলে বিরিয়ানি খাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে কার্ড বন্ধ করে ফেললেন। জিনিয়া গৌতম দত্তকে নিরাশ করল না। তাসনুভার অনুমতি নিয়ে তার জন্যও অর্ডার করল। নিজেরা নিল স্যুপ আর চিকেন মিলিয়ে।

খাওয়া শেষে হোটেলে ফিরতে চাইল সারাহ। গৌতম চাইলেন সারাহকে তার অফিসে নিতে। একটা স্টোরি করবেন। সারাহ এড়িয়ে গেল, এত এক্সপোজার সে চায় না, বলল, আমি নিজে খুঁজে দেখব আগে।

দ্বিতীয় দিন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে দেখা করা হলো। তিনি কোথাও যাওয়া নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে বললেন, ওই শেল্টার হোমের হোয়ারএবাউটস বের করা এতদিন পর সম্ভব বলে মনে হয় না। হোমের কোনো রেকর্ডস আছে কিনা তা বের করতে অনেক সময় লাগবে। সেই বাহাত্তর সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করে তার আন্ডারে ওই শেল্টার হোম করা হয়েছিল। শেল্টার হোমের দায়িত্বে যারা ছিলেন ড. নীলিমা ইব্রাহিম, নূরজাহান মুরশিদ, বাসন্তী গুহঠাকুরতা… অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। বেটার হবে মি. গৌতম যদি একটা স্টোরি করেন ওনার পত্রিকায়, আর দু’একটা চ্যানেলে, তাহলে হয়তো কোনো সোর্স থেকে ইনফরমেশন পাওয়া যেতে পারে। 

নিজের একটা কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, দেখছেন তো আমার অবস্থা! তবে তেমন কোনো দরকার হলে ফোন করবেন, আই উইল হেল্প ইউ এজ মাই বেস্ট।

সারাহ কোনো এক্সপোজার চাচ্ছিল না, তাই আরও দুটো দিন নানাজনের কাছে তারা ঘোরাঘুরি করল। যা শুনল তা শুধু হতাশার খবর। কিন্তু সারাহ অবিচল। নিশ্চয়ই পাব খোঁজ। শিশুটিকে দত্তক দেওয়া পর্যন্ত মা ওই হোমে ছিল তারপর কোথায় গেছে? নিশ্চয়ই কোনো ট্রেইল আছে। সে গৌতম দত্তকে কয়েকদিন তার সঙ্গে থাকার জন্য চুক্তি করে এডভান্স দিয়ে দিয়েছে। তাসনুভা রাহাত ক্ষান্ত দিয়েছেন, তার অফিস কামাই হচ্ছিল। তবে যোগাযোগ রাখছেন।

গৌতম টাকা নিয়েছেন বটে কিন্তু ঠিক টাকার জন্য নয়, কাজটা করছেন খুব আন্তরিকতার সঙ্গে। তিনি তার সব সোর্স কাজে লাগিয়ে খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা করছেন কোনো একটা সূত্রের।

গৌতমের চেষ্টা সফল হলো পঞ্চম দিনে। সকালে হোটেলের লবিতে তার উজ্জ্বল হাসিমুখই বলে দিল, ভালো কোনো খবর আছে।

গৌতম যে খবর দিলেন সেটা খুব ভালো না হলেও আশা জাগানিয়া। পুনর্বাসন কেন্দ্রের একজন অফিসারের সন্ধান দিয়েছেন গৌতমের এক সহকর্মী। তবে তিনি শয্যাশায়ী মেরুদণ্ডের অসুখে। পরিবারের লোকরা চান না তাকে বিরক্ত করা হোক। সারাহ সুদূর কানাডা থেকে এসেছে শুনে তিনিই বলেছেন যেতে।

লালমাটিয়ার বি ব্লকের এক এপার্টমেন্ট হাউজের ফ্ল্যাটে জিনিয়াদের সরাসরি তাঁর শোবার ঘরেই নিয়ে যাওয়া হলো।

গৌতম সবার পরিচয় দিলেন। তিনি হাসিমুখে সারাহকে অভ্যর্থনা জানালেন। অনেকক্ষণ তার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন। তারপর কাছে ডেকে সারাহ’র হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন, বড় সুন্দর আর পবিত্র তুমি! এত দূর থেকে এসেছ। আশা করছি আশাভঙ্গের কোনো কারণ না ঘটুক। আর আশাভঙ্গ হলেও তুমি যেন ভেঙে পড়ো না।

সারাহ জিনিয়ার অনুবাদ শুনে চুপ করে রইল। তার মুখ লাল এখন। সে আবেগ চেপে রাখার চেষ্টা করছে। নিজের হাত দিয়ে ওনার শিরা ওঠা হাতের ওপর বুলাতে বুলাতে বলল, আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আপনার প্রতি যে আপনি ওই সময় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সাহায্য করেছিলেন।

তিনি বললেন, যতটা করার ছিল তার কিছুই করে উঠতে পারিনি। কত বিচিত্র বাধার মধ্যে দিয়ে যে কাজ করতে হয়েছিল, সে কথা মনে হলে এখন অসুস্থ লাগে। খুব খুব কঠিন ছিল সেসময়টা।

সারাহ বলল, আমার মা ওই শেল্টার হোমে ছিল, সেটা আমি জেনেছি। হোমে যখন রাখা হয়েছিল তখন নিশ্চয়ই তার নাম রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল। ঠিকানাও ছিল। ওই ঠিকানাটা আমার দরকার।

কোনো কোনো মেয়ের মানসিক ভারসাম্য ছিল না। তাদের সবার ঠিকানা বের করা যায়নি। তবে অন্য মেয়েরা একটু সুস্থ হয়ে নিজেই বাড়ির ঠিকানা দিয়েছিল। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ কোনো কিছুরই ঠিক ছিল না। তবু মেয়েদের বাড়িতে চিঠি দিয়ে, লোক পাঠিয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিল। খুব কম লোকই যোগাযোগ করেছিল। তার মধ্যে এক/দুইজন মেয়ে বা বউকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল মাত্র। মেয়েরা বাড়ি যাওয়ার জন্যে কান্নাকাটি করত। বারবার চিঠি পাঠাতে বলত। অনেকে নিজেই চিঠি লিখত। কিন্তু চিঠির উত্তর পেতো না তারা। শুধু সেনাবাহিনীর নির্যাতন তো নয়, অনাকাক্সিক্ষত মাতৃত্ব তার ওপরে পরিবারের নিগ্রহ। বাবা-মা চিনতে চায়নি। বাড়ি থেকে কেউ যদি এসেছে, বলে গেছে―বাড়িতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। সমাজে জায়গা হবে না তাদের। এক মা তার পনেরÑষোল বছরের মেয়েকে যাওয়ার সময় বলে যায়―এ জীবন রাইখে আর কী করবি? তার চেয়ে গলায় দড়ি দে’ মর। সত্যি সত্যি কেউ কেউ আত্মহত্যা করে। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর কিছু কিছু দেশ তাদের পুনর্বাসনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে এগিয়ে এসেছিল। তখন নতুন বিড়ম্বনা। অন্য দেশে যেতে পাসপোর্ট লাগে। পাসপোর্টে ঠিকানা লাগে, বাপের নাম লাগে। মেয়েরা জন্মদাতা বাপের নাম আর মুখে আনে না। ঠিকানা দেয় না। পাসপোর্ট ছাড়া দেশ ছাড়তে পারবে না, তাও তাদের এক কথা―আমার বাপ নেই, ঠিকানাও নেই। বঙ্গবন্ধুকে নীলিমা আপা জানালেন সমস্যার কথা। বঙ্গবন্ধু বলে দিলেন―ওরা আমার মেয়ে। ওদের বাবা আমি। এখন থেকে আমার বাড়িই ওদের ঠিকানা। বঙ্গবন্ধুর  মেয়েরা তারপর অনেকে চলে যায় দূর-দূরান্তে। শেল্টার হোমের রেজিস্টারে তাদের সম্বন্ধে কিছু তথ্য ছিল। কিন্তু একদিন সেই নথি সব আগুনে পুড়িয়ে দিতে বাধ্য হতে হয়। সেই আগুন ছিল হতভাগ্য মেয়েদের চিতার আগুন। চিতাভস্মও আমরা পানি দিয়ে ধুয়ে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছি।

ভগ্ন কণ্ঠে কথা শেষ করেন তিনি। ঘরজুড়ে নীরবতার চাদর বিছানো থাকে অনেকক্ষণ। সারাহ তখনও ধরে রেখেছে তাঁর হাত।

এক সময় হাত ছেড়ে দিয়ে বলে ওঠে, চলো, জিনি, একবার বুড়িগঙ্গা দেখে যাই।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares