গল্প : জীবন একফোঁটা মধু : মণীশ রায়

‘বদমায়েশ বৃষ্টি।’ ভেবে জাকিয়া একদলা থুতু ছিটিয়ে দেয় আকাশের দিকে তাকিয়ে, ‘ অত গুনাগুনতি করে কী সুখ পাস, বেজন্মার বাচ্চা?’ সঙ্গে এ প্রশ্নটাও ।

এ রকম আচমকা  প্রশ্ন আজকাল প্রায়ই নিজের ভেতরে শিং মাছের পোনার মতন কিলবিল করে ওর। মাঝে মাঝে  নিজেকে  বুঝতে না পেরে বোবা বনে যায় নিজেরই ওপর ! 

আসলে  কথাগুলো নিরুপায়  জাকিয়া  ফড়িয়া  বৃষ্টিটাকে নয়, আপন ভাতারের  বজ্জাত-বদখত  চেহারা-সুরতের কথা  ভেবেই  ছুড়ে দেয় অন্ধকার আকাশটার দিকে।  এগুলো আপনাআপনি ঘটে  যায় ওর ভেতর, অহেতুক কোনো  গুঁতোর প্রয়োজন পড়ে না। শুধু পরিবেশ-পরিস্থিতি মিললেই হলো, ব্যস!

 ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে নাকাল হচ্ছে জাকিয়া?  সঙ্গে সঙ্গে এসব বেতাল-বেশরম গালি-গালাজ চলে আসে  জিহ্বার ডগায়, আপনাআপনি।  আবার রাস্তা পারাপারের সময় কোনো রিকশা-গাড়ি ওর সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে? ভাব এমন যে ওকে পিষে ফেলতে চায়?  তখনও প্রচণ্ড ভীত-সন্ত্রস্ত জাকিয়া রাগে-ক্ষোভে বেবাক আকথা-কুকথা বলতে শুরু করে দেয়, ফেব্রুয়ারির আচমকা বৃষ্টির মতন; অবশ্যই বিড়বিড় করে, নিজের সাথে নিজে। আর এসব গালি-গালাজ-খিস্তি-খেউড়ের মূল লক্ষ্য কেন যেন ঘুরে-ফিরে একজনাইÑ ওর ইবলিশ প্রকৃতির বদমায়েশ সোয়ামি  মফিজ্যা!

‘কিরে  হুদা হুদা  বিড়বিড় করস ক্যা?’ সীমা হাইকোর্ট-কার্জনহলের  সামনে  বড় একটা গাছের  নিচে  দাঁড়িয়ে জানতে চায়।

‘ওই যে গোলামের ঘরের গোলাম  মফিজ্যা, ওই বেজন্মারে গাইল পাড়তাছি।’ ফোঁস করে ওঠে জাকিয়া।

‘তয় বিষ্টিরে কেরে?  বিষ্টি মদনা কি তর ভাতার লাগে?’ বলে সীমা খ্যাক-খ্যাক করে হাসে। ক্ষুরধার  দৃষ্টি রাস্তার প্রতিটি রিকশার ওপর। পরনে হলুদ-কালোয় মিশানো  ছাপা শাড়ি। চোখে-মুখে কাজল-স্নো-পাউডার-লিপস্টিকের ছিনালি জেল্লা। বৃষ্টির বিন্দু পেয়ে সেগুলো এখন গলে-চুঁইয়ে চিড়িয়াখানার জেব্রা। ডান হাতে ঘড়ি, খোঁপায় হাজা-মজা কালচে গোলাপ, গতরে সস্তা সুগন্ধিÑ  কাছে ঘেঁষলেই  নাকে ছুঁচ-বিঁধানো ঝটকা!

‘দেহছ না কামের সময় হালার পুত খালি মুইতা দেয়? বেকুবের লাহান খাড়াইয়া  রইছি, হাতে কাম নাই,  অহন আসমান থন হিসু ঝরে না। যেই ছৈর ভিতরে  হান্দামু, এমতেই  ছরছরানি ।’ জাকিয়ার গলায় বিষ।

‘কিছু না অইলে কিতা? কন্ডোমের হিসাবডা লইব এক্কেরে গুইন্যা- গুইন্যা। একটা ট্যাকা কম রাহে না বুইড়া খাটাশ। পোলাডার সামনে ওষ্ঠান শুরু করে। গু-র কিড়া হালা একটা। থুঃ । ’ গলায় অসহায় ক্ষোভ,  খাকারি দিয়ে  একদলা  কফ ফেলে রাস্তার ওপর।

‘আমারডারে পোছ দিছিলাম বেলেড দিয়া। ঢ্যামনার পো আর ফেরে নাই। অহন একলা একলা ভালা আছি আমি খুব। কোনো লাং-র দরকার নাই। গতর খাটামু, ট্যাকা কামামু। যা মন চায় করুম । কুন্ বানচোত কী কইব? পোতা ফাটাইয়া লামু না? তুইও আমার মতন হ। সুখ পাইবি।’ তেরছা করে তাকায় জাকিয়ার দিকে। দৃষ্টি ফেটে ঠিকরে পড়ে বাক্সবন্দি রাগ।

বাতাসে ভেজা ফাগুন। টিপটপ বৃষ্টির সঙ্গে উড়ছে শুকনো পাতা। হাইকোর্টের গাছগুলো বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা সোহাগ মাখছে গায়; আস্কারা পেয়ে থাপ্পড় মেরে  শীতের জমানো সব ফোর-টুয়েন্টি ধুলাবালি সব  মলিনতা  ঝেড়ে ফেলতে চাইছে, ফিরে পেতে চাইছে বাপের বাড়ির মায়াবী  সুখের পরশ।

নতুন  পাতার সংসারে  এখন যেন শাদির আনন্দ। পথবাতির আলোয় সেগুলো  চকমক-ঝকমক করছে।

আজ  রাস্তায় যানবাহন কম। মেঘলা রাতে লোকজনের চলাফেরাও সীমিত। শীতের শেষ কামড়টা দুর্বল হলেও  ছাড়তে চাইছে না। লেগে আছে সাঁচি পানের চুন-জর্দার মতন।

সীমা-জাকিয়া দুজনই কপালপোড়া;  এমন মেঘলা দিনে একজনারও খদ্দের মিলছে না। তাই নিজেদের ভেতর কথা বলে সময়কে ভেংচি কাটতে চাইছে!

জাকিয়ার মুখে পান। এই একটা নেশা যা ওকে  উজ্জীবিত করে রাখে সারাক্ষণ। মুখে ক্ষুধা-নিবারণী এই পান থাকলে কয়েকবেলা পেটে ভাত না পড়লেও  ওর চলে,  কিচ্ছু হয় না।

সীমা অবশ্য সিগারেট-গাঁজায় আসক্ত। ও যে কী খায় আর কী খায় না, জাকিয়ার জানা নেই। কোনো পিছুটান না থাকায় চরের গরুর মতন যেখানে রাইত সেখানেই সে কাইত। পুলিশ কয়েকবার ওকে ধরে নিয়ে গেছে হাজতে।  হাজতখানা থেকে বেরুবার পথটাও ওর মুখস্থ; লাইন-ঘাট করে কীভাবে য্যান পথ পেয়ে যায় সে। কীভাবে মজায় ওদের নিষ্ঠুর মন, জাকিয়া তা বলতে পারে না। ওর চিন্তা এখন একটাইÑ খালি হাতে বস্তিতে ফিরে গেলে মাঝরাতে মফিজ্যা ওকে ওর ছেলেটার সামনে বেদম পেটাতে  শুরু করবে না তো?  ভাবতেই বুকের ভেতরটা ধড়াস করে ওঠে জাকিয়ার!

সীমার দিকে তাকিয়ে জাকিয়া বলে ওঠে, ‘তর তো পোলা-মাইয়া নাই। তুই বুজদি না লো। আমার কষ্ট তোর দিলে লাগদ না।’ জাকিয়ার মুখের ওপর রাস্তার হলুদ আলো। এর সঙ্গে খেলা করে গাড়ির ভুতুড়ে হেডলাইট। সাদা-হলুদে জড়াজড়ি। কেমন যেন বিষণ্নতায় মাখা সবকিছু।

‘গুষ্টি কিলাই বাল-বাইচ্চার। কীয়ের চেট ছিঁড়ব পোলা-মাইয়া? তর ভাতার অহন কন্ডোম দিয়া তর রোজগারের হিসাব লয়। তর ফুত বড় অইয়া তরে ওষ্ঠাইবো, দেহিছ। তর মাইয়া থাকলে টাইন্যা আইন্যা রাস্তাত দাঁড়া করাইব। আমারে করছে না? আফন ফেডের ভাই-ই তো আছিল হেই বাইনচোত? আত্তরমারি ঝি-পুত-মার পেডের ভাই, খ্যাতা পুড়ি আমি হগ্গলের! ’ রাগের চোটে কথা বলতে গিয়ে কাশি এসে যায় সীমার। এমন কাশি যে কাশতে কাশতে পেট ধরে মাটিতে বসে পড়ে সে। কাশির নমুনা ভালো নয়। বুকচিরে যায় কষ্টে, ক্ষতর উপর মরিচের গুঁড়ো ছিটিয়ে দিচ্ছে যেন কেউ। গলার দুপাশের রগ কোলা ব্যাঙের পেট। কষ্টের  চোখ দুটো  লাল মেস্তা।  পুরো শীতটাই ওর বেনিয়া গতরের  ওপর দিয়ে যেমনে-তেমনে ফুঁ দিয়ে গেছে। সেই ভোগান্তি এখন বুকে ধীরে ধীরে বাসা বাঁধছে। সিরাপ কটা সাবাড় করেও শান্তি মিলছে না!

জাকিয়া ওর পিঠে থাপ্পড় কষায়। মাথায় হাত বুলায়। শরীরে ঝাঁকুনি লাগায়। তারপর এক সময় ওর কাশি থামে। রক্তচোখ করে ওকে প্রশ্ন করে, ‘তরডাও কি আমার কেইস?’

‘আরে না,  বাপের বাড়িত আমি তো আরামেই আছলাম লো। খাওন পিন্ধনের অভাব তো আছল না। আঁতকা যে কি অইল মগজে। আওলাইয়া গেল গা হগলতা। কুস্তা ভালা লাগে না। শান্তি নাই মগজে, গতরে। পলাইয়া গেলাম গা সিলেট। কসবা থেইক্যা সিলেট। মাজারে কদিন থাইক্যা-মাইক্যা আইলাম কমলাপুর। এক বেডি রাইতে জাগা দিল ঘরে। ওমা! নডির ঝি আমারে তাইর ভাতারের লগে হুতাইয়া দিল। হারারাইত ফাড়াফাড়ির পর হার মানলাম। হেরফরে হোটেলে হোটেলে যাই। ওই বুড়া নডির জামাই লইয়া যায়। হিগনই মফিজ্যা আয়ে। মিডা কতা কত। হায় খোদা, আবার ভাগলাম। সংসার ফাতলাম নারানগঞ্জে। ওমা ওই গোলামের ফুত কদিন যাইতেই আবার হোটেলে হোটেলে নেয় আমারে। এক কামই ঘুইরা-ফিইরা। হেরই ভিতরে ফুলাডা আইলো। হে তো আমারে ছাড়ে না। মফিজ্যার নেশানুশা, ফুতের পড়ার খরচ, খাওন খরচ সব আমার গতরের ট্যাকায়। হোটেল থেইক্যা পার্কে নামাইয়া আনছে। অহন আটকাইয়া গেছি। যতই কন্ডোমের হিসাব দিই, যতই গাইল পাড়ি, হেরেই মাইন্যা নিছি। অত মাইর খাই, গতরটাত অত কষ্ট, কত মাইরের দাগ । তবু ক্যান য্যান হেরেই মধু লাগে লো। বুঝি না, এই জগতের হিসাব কুস্তা বুঝি না! ’

‘বাপের বাড়ি না বলে তর বেহেশত, হিগন গেলি না?’

‘গেছিলাম থাকমু কইয়া। মফিজ্যা গিয়া হগলতের কাছে আমার গতর বেচনের কতা কইয়া দিল। থাকি ক্যামনে, ক? হের ট্যাকা রোজগারের মেশিন না আমি? আবার শিকলে বান্ধা পড়লাম। কুস্তা করনের নাইলো বইন। কুস্তা করনের নাই।’ গলা বুঁজে আসে জাকিয়ার এ সময়। অসহায় সমর্পণের যন্ত্রণা পরতে পরতে।

‘আসল জাগাত ফোছ দে একটা? আমার লাহান। পারবি নি, ক? তইলে আইজগাই একটা বেলেড দিমু তরে কিন্যা। পারবি নি?’

জাকিয়া নিশ্চুপ। সবাইকে দিয়ে সব হয় না। এটা সীমা বোঝে না। জাকিয়ার ধারণা সন্ত্রাসীদের মতন নয়। পুরুষ ছাড়া একা-একা বাঁচা নারীর জন্য বড়ই কঠিন, বড়ই বেমানান। সে যদি মদ্যপ রগচটা বাপের প্রতিদিনকার মারধর সহ্য করত, এখন যেমন মফিজ্যারে করে, তাইলে কি ওর কপালটা এভাবে পুড়ত? একথা স্মরণ করার সময় সে প্রতিবার কল্পনায় একটা সুখি সচ্ছল পরিবার নিজের মতন করে এঁকে নেয়।  পরিবারটি দূর থেকে হাতছানি দেয় ওকে। অন্তরে জমানো বিষ সব প্রশান্তির ছোঁয়া পায়। ছাতিম ফুলের গন্ধ  আসে নাকে। সুখ-সুখ কষ্ট মিশে থাকে সেই গন্ধে!

একটা রিকশা এগিয়ে আসে ওদের দিকে। রিকশার ধীর গতি লক্ষ করে ওরা কীভাবে যেন বুঝে ফেলে, রিকশারোহী ওদেরই খুঁজছে। হাসি ফোটে দুজনারই মুখে। বৃষ্টিটার কারণে আজ কোনোকিছু আর জুতসই বলে মনে হচ্ছে না। রাস্তায় রিকশা-গাড়ি আর মানুষের চলাচল না থাকলে কি আর ওদের পেট ভরে?

ওরা দুজন ল্যাম্পপোস্টের সামনে ফিটকিরির মতন বৃষ্টিভেজা ফ্যাকাশে আলোর নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। লোকদেখানো ঢং-ফং-এ ওরা একেবারে ছায়াছবির নায়িকা। খদ্দের আকর্ষণের দেহ-পুঁজি সব এক্ষুনি ভাঙিয়ে ফেলার জন্য দুজনই ব্যাকুল। দুজনই বুকের ন্যাতানো মাংসপিণ্ডের  নড়াচড়া আর  কাম-চাহনি হেনে খদ্দেরকে আপন  মুঠোয় পুরতে চায়।

ওদের সামনে এসে লোকটা মাথার ওপরকার হুডটা ফেলে দিল। শিলপাটার মতন খোদাই করা বসন্ত- রোগীর মুখ একখানা। আংড়ার মতন গায়ের রং। আঙুলের ফাঁকে সিগারেট। ধবধবে সাদা লুঙি আর পাঞ্জাবি গায়।

জাকিয়া দেখেই বুঝতে পারে, মফিজ্যা কিসিম।

লোকটা নেশা করেছে। শুকনা নাকি ভেজা তা জানে না ওরা। তবে চোখ লাল, আয়েসি ঘোরের ভেতর মজে রয়েছে এখন।  মাথার ওপর যে বৃষ্টির ফোঁটা ঝরছে সেদিকে কোনো  হুঁশজ্ঞান আছে বলে মনে হলো না।

 ঠ্যাং দুটো তার রিকশার দুদিকে ছড়ানো; রাজা-রাজড়ার মতো আধিপত্যের ভঙ্গিতে ওদের দুজনকে আগাপাশতলা পরখ করার পর গমগমে স্বরে বলে ওঠে, ‘জাগা  আছে?’

দুজন একসঙ্গে বলে ওঠে, ‘আছে, নাইমা আসো দুষ্টু। ’ মিঠা ঝরায় খদ্দেরের উদ্দেশে।

‘বিষ্টিত পুতাইয়া আছি, তাতাইয়া দিবার পারবা?’

সীমা চাপা গলায় জাকিয়ার কানেকানে মন্তব্য ছোড়ে, ‘হালা মাদারচোদ। বেলেড দরকার।’ দুচোখে নীরব আক্রোশ।

জাকিয়া ওর কথায় কান দেয় না। মুখে বলে, ‘নাইমা আসো  শাকিব খান। সব অইব।’

‘আগে ক মাগি, তাতাইতে পারবি নি?’ লোকটাকে হিংস্র লাগে এ সময়। মনে হচ্ছে পুরো শরীরটাই একটা শিশ্ন,  সারাক্ষণ বিষ-ব্যথায় জরজর!

জাকিয়ার  টাকা প্রয়োজন। এত বছর কেটেছে এ লাইনে; এসব কথার সরাসরি উত্তর দিতে এখনও ওর লজ্জা করে। কোথায় যেন বাধে। সে শুধু মাথা নাড়ে।

লোকটা রিকশা থেকে নেমে এলো। সীমার দিকে তাকিয়ে কুতকুতে একটা চোখ টিপে দিতেই সীমা উত্তর দেয়, ‘বিচি খুইলা লমু। যা, ভাগ ছালা।’ কথার ড্যাগার নিয়ে তেড়ে আসে সে।

উত্তরে লোকটা ফ্যাকফ্যাক করে হাসে ফুটপাথের ওপর দাঁড়িয়ে। মুখে বলে, ‘মাগিরে পছন্দ অইছে না বইলা ক্ষেপছে। চল, কই লাইয়া যাবি?’ বলে ইশারা করে জাকিয়াকে।

ওরা হেঁটে পার্কের দিকে এগোতে থাকে। সেখানে ছৈ-ওলা অস্থায়ী ঘর ওদের। রাতের জন্যে তৈরি হয়, ভোরেই নিশ্চিহ্ন!

এলোমেলো আলো-আঁধারি ঘেরা  রাস্তা ধরে ওরা দুজন পৌঁছে যায় সেখানে।  নিজেকে তাতানোর জন্য মরিয়া লোকাটা। একটু পরপরই খোঁচাচ্ছে, ‘আর কদ্দুর?’

‘তর আর সয় না নাগর? ট্যাকা দে।’ জাকিয়া আব্দার করে।

‘আগে হউক। তরারে বিশ্বাস আছে?’

রাগে রি-রি করে জাকিয়ার শরীর। লোকটাকে প্রথম থেকেই পছন্দ হয়নি ওর। আজ হাত একেবারে খালি থাকায় উপায় নেই, ব্যাটাকে আপন করে নিতেই হবে।

ছৈ-ঘরের সামনে এসে  জাকিয়া লোকটার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ‘ঢোক এইবার?’

লোকটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে এটুকুন ঘরের দিকে। ওর বিশাল বপু কীভাবে এর ভেতর ঢুকবে তা নিয়ে ওর কপালের ভুরুজোড়ায় গিঁট দেখা দেয়। একটুক্ষণ; পরক্ষণে  রেতপাতের তীব্র ইচ্ছা ওর মগজ থেকে সমস্ত  দুশ্চিন্তা পুলিশের কাঁদানে গ্যাস হয়ে দূর করে দেয়।  সে নিজের শরীরটাকে কোনোরকমে টেনে-হিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে যায়। ঘাসের ওপর পাতা চাদরে চিৎ হয়ে আছে মধ্যবয়স্ক ভুঁড়িওলা বিশাল এক কাতল মাছ। শরীরটাকে তাতানোর জন্যে হাত-পা ছড়িয়ে রেখেছে দুপাশে; তৃষ্ণায় কাতর দুচোখ নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে মোক্ষম সময়ের।

ঠিক এমনি সময় ঝরঝর করে আচমকা বৃষ্টিটা চলে এল। বৃষ্টি তো নয়, দলছাড়া এক বাঁদর-নাচ যেন,  নেচে-নেচে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো উদ্যানজুড়ে। 

লোকটা শুয়েছিল  চোখ বুঁজে। একটুক্ষণ বাদে শরীরের নিচে পাতলা চাদর ভেদ করে রসালো প্যাঁক-কাদা ফিনকি দিয়ে বের হয়ে এলো ওপরে; নিমেষে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি ভরে গেল। শীতল স্পর্শ গায়ে লাগতেই  সম্বিৎ ফিরে পায় সে, সঙ্গে সঙ্গে ওর কাম-ঘোর ভেঙে খানখান। গরিলার মতন দেখতে বিশাল লোকটা সহসা ছৈ-ঘর ভেঙেচুরে বেরিয়ে ঝড়জলের ভেতর ভূ-দৌড় দেয় একটা। জাকিয়া যত চিল্লায় ‘আমার ট্যাকা কই, খানকির পুলা’ তত লোকটা অন্ধকারে মিশে যেতে থাকে। এক সময় হারিয়ে যায়।

জাকিয়ার মনটা গভীর দুঃখে নিস্তেজ  হয়ে আসে। আজ সন্ধ্যা থেকে এ পর্যন্ত একটা কন্ডোমও বিক্রি হয়নি।  বৃষ্টিটা যে কি, আসলেই একটা বদমায়েশ। কিছুতেই ওকে আজ ধান্দায় নামতে দিচ্ছে না। শালা বেজন্মাÑ বারবার বকা লাগায় সে।

জাকিয়া গজরাতে গজরাতে গভীর রাতে কাঁটাবন বস্তির আপন ডেরায় ফিরে আসে। ওর ছেলে আসলাম তখন  অঘোরে ঘুমাচ্ছে। মফিজ্যা মশারি টাঙিয়ে দিয়েছে নিজ হাতে। এখন নেশায় ঢুলছে পাশের চৌকির ওপর। জাকিয়ার ভেজা শরীর আর এলোমেলো বিস্রস্ত সাজপোশাকের দিকে এক পলক তাকিয়ে সে খেঁকিয়ে ওঠে, ‘জিনিস বেচবার পারছ নাই? না। রাইতে আইছস কেরে? পার্কে জাগা আছিল না?’

এ প্রশ্নে জমাট বরফের মতন নিরুত্তর থাকে জাকিয়া। শরীর ভেঙে আসছে শ্রান্তিতে। দ্রুত ভেজা পোশাক পাল্টে সন্তানের পাশে শুয়ে পড়ে সে। পেটে বড় ক্ষুধা। মাথায় ঝিম ঝিম, পেটে চোঁ-চোঁ। তবু আসলামকে জড়িয়ে ধরতেই সব ভুলে গেল জাকিয়া। তেরো বছরের ছেলেকে সে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলার চেষ্টা করে অপত্যস্নেহে। চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে এ সময়।

তখনও প্রচণ্ড জোরে বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। ভেঙেচুরে সব একাকার। চোখজুড়ে গভীর ঘুম নেমে আসার আগে ওর মনে হলো, আজকের  বৃষ্টিটা আসলে বদমায়েশ নয়, ওর বাপের বাড়ির মতন, সুকুন আর ভালোবাসায় ভরা, হারানোর পর বোঝা যায়!

চৌকির ওপর মফিজ্যা কাশে। একটু পরপর বিড়বিড় করে বলে ওঠে, ‘মাগি খালি হাতে ফিরছে। ঘুম ভাঙলে  খাইবি কী? বিষ্টির ফানি?’

ছেলেকে জড়িয়ে গভীর ঘুমে ঢলে পড়বার আগে, বাবুই পাখির নীড়ের মতন অনাবিল এক প্রশান্তি বুকের গহিনে  চেপে রেখে জাকিয়া  মনে মনে উত্তর দেয়, ‘হ।’

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares