গল্প : কোড ব্লু কিংবা অপরাজিতার পরাজয় : সুফি বাংলার পান্থ

কার্তিক মাস শুরু হয়ে গেছে। বাতাস শীতল হতে শুরু করেছে। অপরাজিতা প্রতিদিন ভোর হতে দেখে। রাতের আঁধার সরিয়ে সকাল আসে। সে শিহরিত হয়।

আজ দখিনের টানা বারান্দায় সে হেলান দিয়ে বসেছে। বারান্দায় গাঢ় সবুজ পাতা ভেদ করে হিমের হাওয়া শরীর-মন জুড়িয়ে দিয়ে যায়। অপরাজিতা চোখ বন্ধ করে একা একা নির্জন শীত-ভোরের কথা কল্পনা করে! কুয়াশা ভেদ করে খালি পায়ে একদল মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। কীর্তনের শব্দ তার মাথায় বাজছে। আহারে কার্তিকের সে ভোর!

কোভিড পিরিয়ডে অপরাজিতার বাগান সবুজে সবুজে ভরে গেছে। বাতাসে সবুজ পাতা যখন কাঁপে তখন তার কি যে ভালো লাগে। গতকাল তার ভালোলাগা হঠাৎ করে বহুগুণে বেড়ে গেল। এখন বলতে গেলে প্রায় প্রতিদিনই সে দোতলার লম্বা টানা বারান্দায় কিছু সময় কাটায়। খুব জরুরি কাজে দিনের পুরো সময় বাইরে না থাকলে বাগানে আসা তার কখনও মিস হয় না।

গতকাল বাগানে গিয়ে সে একা অদ্ভুত ঘটনা দেখতে পেল। সেদিন সকালে অপরাজিতা অন্যদিনের চেয়ে বেশ কিছুক্ষণ সময় পরে  ব্যালকনিতে গিয়েছিল। চেয়ারে চুপচাপ বসে ছিল। তখনও বাইরে হিমেল হাওয়া দিচ্ছে। তার চোখ চলে গেল একগুচ্ছ নতুন সবুজ পাতার দিকে। সদ্য গজানো একগুচ্ছ শিশুজাম গাছ। হালকা সবুজ কালারের কী সুন্দর জাম গাছের পাতা! এত কোমল! এত নির্মল!

অপরাজিতার চোখের আড়ালে গাছগুলো জন্মেছে এবং হঠাৎ এত বড় হয়ে গেছে! কিছুদিন আগে একদিন দুপুরবেলা সে বাসায় রান্না হওয়া দুপুরের খাবার খেল না। খাবার না খেয়ে পুরো এক বাঁটি টসটসে পাকা জাম খেয়ে ফেলল। সেদিন সকালে বেছে বেছে সে জামগুলো কিনেছিল। এ বছর প্রথম জাম খাওয়া হবে।

 জামের বিচিগুলো ফেলে না দিয়ে বিকেলে সে বিচিগুলো মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল। তারপর ব্যাপারটা সে বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু আজ এতগুলো নতুন সবুজ গাছ একসাথে দেখে তার কী যে আনন্দ হচ্ছে!

সে কিছুতে বিশ্বাস করতে পারছে না এতগুলো নতুন গাছ জন্মেছে এবং চোখের পলকে তা বড় হয়ে গেছে। প্রতিটি গাছে জোড়ায় জোড়ায় পাতা বের হয়েছে। শিশুজাম গাছগুলো ক্লাস্টার হয়ে জন্মেছে বলে এত বুনো এত প্রাকৃতিক লাগছে!

বাতাসে গাছগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। দেখে মনে হয় বাচ্চা জাম গাছগুলো হাসছে! বাতাসে দোল খেতে খেতে বিশেষ কোনো এক খেলা খেলছে!

অপরাজিতার ভীষণ অবাক লেগেছে; কারণ এতদিন গাছগুলো তার একবারও চোখে পড়েনি। হুট করে একবারে সামনে চলে এসেছে। কি ভেবে যেন আজ অপরাজিতা শিশু গাছগুলো একটা একটা করে গুনে দেখছে। দেখি না কতগুলো জন্মেছে!

চুয়াত্তর। গাছগুলোর নিচে বামন সাইজের আরও একটা ব্ল্যাকবেরি গাছ দেখা যাচ্ছে। গুচ্ছ হিসেবে থাকার ফলে সম্ভবত ঠিক বেড়ে উঠতে পারেনি। সে হিসেবে শিশু জামগাছের সংখ্যা সাড়ে চুয়াত্তর বলা যায়!

সাড়ে চুয়াত্তরের নিশ্চয় বিশেষ কোনো মানে আছে। আগের দিনের চিঠিপত্রে লেখা থাকতো! অপরাজিতা তা জানে না। পৃথিবীর সবকিছু যে তার জানতে হতে হবে এমন তো নয়। কিন্তু সে প্রায় ভাবে তার পাশে যদি এমন একজন সবজান্তা থাকতো; যে সময়ে অসময়ে তার সব প্রশ্নের উত্তর দিবে!

হিমেল নিজে একজন কবি। হিমালয় সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স মাস্টার্স। এখন এক অনলাইন নিউজপেপারে সাংবাদিকতা করছে। সাথে ব্লু পাসপোর্ট পাওয়ার নিমগ্ন চেষ্টায় মত্ত আছে!

গভ: জবের জন্য পড়াশোনা সহজ ব্যাপার তো নয়। সময় নিয়ে গুছিয়ে পড়তে হয়। কিন্তু কবি হিমালয় সরকার পুরোপুরি ডুবে আছে কবিতায়। সাহিত্যে।

 সে অন্য কবিদের মতো দুপুরবেলা ঘুম থেকে ওঠে না। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়ে। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে জীবনানন্দের কবিতা সমগ্র হাতে নিবে। কোনোদিন মিস হবে না। এক মনে কিছুক্ষণ কবিতা পড়ে যাবে। জীবনবাবুর কবিতার পাশাপাশি সে আবুল হাসান ও বিনয় মজুমদারও পড়ে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো হিমালয় নতুন কবিদের কবিতা পড়ে অনেক বেশি। সে প্রতিবছর বইমেলায় যায়। নতুন কবিদের প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ সে রীতিমতো লিস্ট করে সংগ্রহ করে। লেখকদের প্রথম প্রকাশিত বইয়ের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। প্রায় সময় দেখা যায় নতুন লেখকের কাঁচা হাতের আবেগময় লেখা এবং ভয়ঙ্কর সব ভুলে ভরা বানান। দেখা গেল চার ফর্মার বইয়ের হয়তো ভালো করে বাইন্ডিং হয়নি! বইয়ের আঠা এখনও শুকোয়নি। প্রথম ফর্মার সুতো ছুটে গেছে! তবু হিমেলের লেখকের প্রথম বইগুলো এত ভালো লাগে! প্রতিটি বইয়ের সাথে লেখকের গভীর আবেগ মিলেমিশে একাকার।

প্রথম কবিতার বইয়ে একজন লেখকের আত্মপ্রকাশ হলো! দেখা গেল সারা জীবনে সে আর কখনও কোনো বই লিখল না। সবেধন নীলমণি হয়ে ৬৪ পৃষ্ঠার সেই কবিতার বইখানি রয়ে গেল। বুড়ো বয়সে সে প্রথম প্রকাশিত পুরনো একটা কপি হাতে নিয়ে হয়তো নেড়ে চেড়ে দেখবে। তার মৃত্যুর পর তার সন্তানেরা হয়তো কবি বাবার জন্য স্মরণসংখ্যা বের করবে। সেখানে তার কবিতাগুলো নতুন করে আবারও ছাপা হবে। প্রথম প্রকাশিত বইয়ের গভীর সমালোচনা লেখা হবে।

কবি হিমালয় সরকারের প্রতিদিন নতুন কবিতা, আগুন গরম চা, মুড়ি ও দুটো সিগারেট দিয়ে সকাল শুরু হয়। প্রথম সিগারেট টেনে সে অপেক্ষা করে।

অপরাজিতা ফোন দেয়। ফোন দেওয়ার কিছুক্ষণ পর সে দিনের দ্বিতীয় সিগারেটে আগুন দেয়। প্রতিদিন সকালবেলায় অপরাজিতার ফোন হলো কঠিন মাদকের মতো। কোনোদিন যদি সে সকালে ফোন না দিয়েছে; তো কবি উন্মাদের মতো সারাদিন ছটফট করেছে!

 কবি হিমালয় বেশির ভাগ সময় ফোনে অপরাজিতার কথাগুলো চুপচাপ শুনতে থাকে। খুব বেশি কিছু আগ বাড়িয়ে বলে না! শুনতেই তার  বেশি ভালো লাগে।

অপরাজিতা এত সুন্দর করে কথা বলে! ও এত অদ্ভুত বিষয় নিয়ে অনর্গল কথা বলতে পারে। হিমালয়ের অপরাজিতার বলা কথাগুলোকে প্রায় কবিতার মতো মনে হয়। সে মনে মনে বিশেষ একটা প্ল্যান ঠিক করে রেখেছে। ‘অপরাজিতার কথা’ নামে সে তার প্রথম কবিতা সমগ্র প্রকাশ করবে!

কবি ও কবিতা নিয়ে মাঝে মাঝে অপরাজিতা এমন সব কথা বলে যা সে কোনো ভাবেই মেলাতে পারে না।

সেক্সুয়ালি আনসেটিস্ফাইড পারসনরাই নাকি শুধু কবিতা লেখে! কবিতা হলো অসুখি মানুষদের মেকি পোশাক। নকল পরিচ্ছদ। তারা কবিতা লিখে সুখি সাজতে চায়! সুখি মানুষ ঘর-সংসার করবে। সুখি মানুষ সহজে কবিতা লিখবে না। তোমাদের মতো ক্ষুধার্ত কামুকেরা শুধু কবিতা নিয়ে নাড়াচাড়া করবে। কবিতায় সঙ্গম করবে!

অপরাজিতা ফোনে রেগে গেলে তাকে আরও রাগিয়ে দিতে ইচ্ছা হয়। বলি, তুই তাহলে হিমালয় নামক এক কামুক পারভার্টেট কবির সাথে প্রেম করবি কেন? কী দরকার অসুখি মাতাল যুবকের সাথে এত কথা বলার!

অপরাজিতা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। মনে হচ্ছে ও পাশে রাগে ফুঁসছে। হিমালয় দেখতে না পেলেও ঠিক কল্পনা করে নিতে পারছে।

শোন্ হিমেলের বাচ্চা! তুই হচ্ছিস ছ্যাচড়া কবি। কে বলল তোর সাথে আমি প্রেম করি! কথা বলা আর প্রেম কি এক জিনিস। তোর মতো লোফার, কামুক মাথা নষ্ট কবির কাছে আমি কেন যাবো?

দুপুর বেলাতে তোর খুপড়ি ঘরের সিঙ্গেল বেডের বিছানায় যাওয়ার শখ আমার নেই! শালা লুচ্ছা কবি!

রাজকন্যা অপরাজিতা রাগে ফোন কেটে দিয়েছে। আজ সন্ধ্যায় একগুচ্ছ সাদা গোলাপ হাতে নিয়ে তার বাসার গেটের সামনে লম্বা রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। একটা নতুন ম্যাচবক্স ও এক প্যাকেট বেনসন এন্ড হেজেস অবশ্যি সাথে রাখতে হবে।

কতক্ষণে তার মাথা ঠান্ডা হবে কে জানে!

কবি হিমালয় তার লেখার টেবিলে চলে গেল। তার মাথা ভারী হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মাঝে তন্দ্রা ভাব চলে আসবে। তারপর তার অতি পরিচিত বিখ্যাত সেই মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হবে। সে অপরাজিতাকে তার জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসে। ইউনিভার্সিটির হলে থাকা অবস্থায় প্রেম শুরু। কবির জীবনে সে ছিল প্রথম প্রেম। কবি তাকে ডাকত ব্লু বাটারফ্লাই নামে!

অপরাজিতা রাগ করলে তার মাথায় যন্ত্রণা বাড়ে। বাড়তেই থাকে। অপরাজিতা বিষয়টা জানে। তবু সে প্রতি সপ্তাহে মিনিমাম দু’বার বড় ধরনের ঝগড়া করবেই! কোনো সপ্তাহ মিস হলে পরের সপ্তাহে হিসেবে মিলিয়ে নিবে!

কবি টেবিলে বসে বুক সেলফ খুঁজে একটা বই হাতে নিল। জগন্নাথ বসুর লেখা বেতারের গ্রিনরুম! সে বিচিত্র ধরনের বই সংগ্রহ করে। এ বইটি কবে সে কিনেছিল মনে করতে পারছে না।

কবি হিমালয় সরকার ‘বেতারের গ্রিনরুম’ বইটির প্রথম পৃষ্ঠা থেকে উচ্চস্বরে পড়তে আরম্ভ করে! অতীতে দুঃখ ভোলার জন্য এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে কবিকে স্বস্তি দিয়েছিল বলে প্রমাণিত!

অপরাজিতা রুমের মাঝে পায়চারি করছে। অল্প সাউন্ডে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছে। শ্রীকান্ত আচার্য্য গাওয়া সিলেক্টটেড রবীন্দ্রসঙ্গীত কালেকশন। সে খালি পায়ে বারান্দায় বের হলো। বাসার লম্বা বারান্দায় এত সবুজ গাছের মাঝে ঘুরে বেড়াতে তার ভীষণ ভালো লাগে। গত কয়েক মাসে গাছগুলো এত সবুজ হয়েছে ভাবা যায় না! কোভিড লকডাউনে বাসার গাছগুলো যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নবজন্ম লাভ করেছে।

কিছুদিন হল বারান্দায় চৌবাচ্চা রাখা হয়েছে। চৌবাচ্চা ভর্তি পানি। জলপদ্ম লাগানো হয়েছে। দুটো পদ্মফুলও ফুটে আছে।

কিছুদিন হয় সে বেশ কিছু ঔষধি গাছ জোগাড় করেছে। তার বাগানে এখন দারুচিনি গাছ, পোলাওপাতা, পানবাহার ও এলাচ গাছ রয়েছে। এর মধ্যে আশ্চর্য এক গাছ সে সংগ্রহ করেছে। গাছের পাতা সাদা। মাঝে মঝে হঠাৎ করে গোলাপি কালারের ফুল ফোটে।

এ গাছের বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য তাকে অবাক করেছে। সব সময় এ গাছের ফুল ফোটে না। কিন্তু গাছে যখন ফুল ফোটে তখন খুব অল্প সময়ের মধ্যে সে এলাকায় বৃষ্টি হয়!

প্রথম প্রথম অপরাজিতা ঘটনাটি পাত্তা দেয়নি। বিশ্বাস করেনি। পৃথিবীতে এমন গাছ থাকতে পারে! অনেকে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলে। কিন্তু গাছটিতে প্রথম যেদিন ফুল ফুটল সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ বেশ বড়সড় ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো। একবার হলে মানা যেত। কিন্তু পর পর দুবার ঘটনা ঘটেছে। সে গাছটিতে মুগ্ধ হয়েছে। এ রকম কিছু পারসনাল গাছ বাগানে থাকা ভালো। আবহাওয়ার পূর্বাভাস সহজে পাওয়া যায়!

অপরাজিতা প্রায় সময় গাছটির সাথে একা একা কথা বলে। সে গাছটির নতুন একটি নামও ঠিক করেছে। বৃষ্টিগাছ!

সে খুব ভোরে অথবা সন্ধ্যায় গাছগুলোর সঙ্গে কথা বলে। তার বিশ্বাস গাছগুলো  তার কথা শুনতে পায়! হিমেলের সাথে ঝগড়ার পর পর গাছগুলোর সাথে অপরাজিতা বেশ সময় নিয়ে কথা বলে। অভিযোগ জানায়!

মানুষ দূরে থেকে দেখলে ভাববে তার বড় ধরনের গণ্ডগোল হয়েছে। অপরাজিতার প্রায়ই মনে হয় তার মাথাটা বোধহয় সত্যি সত্যিই গেছে!

কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে এখন তার সমস্ত আগ্রহের কেন্দ্র শিশু জামগাছগুলো। কি সুন্দর! কচি সবুজ পাতা হালকা বাতাসে নাড়াচাড়া করে। খুশিতে শিশুগাছগুলো  একে অপরের ওপর লুটিয়ে পড়ে। দেখতে কি যে ভালো লাগে!

 কবির সাথে বেশ কয়েকদিন হলো ঝগড়া হয়েছে। এখন খুব সকালে তার মুখে নতুন কবিতা শোনা হয় না। সকালবেলা আমাকে কবিতা শোনাবে বলে, সারারাত জেগে প্রতিদিন সে নতুন নতুন কবিতা লিখত। প্রচণ্ড উত্তেজনা নিয়ে সে কবিতা আবৃত্তি করত। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে সে কবিতা শুনতাম।

আমি এখনও প্রতিদিন ভোরে তার কবিতা শোনার জন্য উঠে বসে থাকি। এই মাথানষ্ট কবিকে আমি যে কি পরিমাণ পছন্দ করি, গাধাটা যদি একবার জানত! এখনও পুরোটা বুঝতে পারেনি সেই ভালো!

গতকাল সন্ধ্যায় বৃষ্টিগাছে গোলাপি সাদা ফুল ফুটেছে। গাধাটা একগুচ্ছ সাদা গোলাপ নিয়ে বাসার সামনের রাস্তায় পায়চারি করছে! এ সময় শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি।

বৃষ্টি হবে সে তো জানা কথাই। বৃষ্টি সময়ের সাথে সাথে ধরে এসেছে! মহামান্য কবি সাদা গোলাপগুলো বাসার গেটের দেয়ালের ওপর রেখে চুপচাপ বৃষ্টিতে ভিজছে। কিছুক্ষণ পর রাস্তা পুরোটা ফাঁকা হয়ে গেল। সে রাস্তার এক মাথা থেকে অপর মাথা পর্যন্ত চক্কর খাচ্ছে। মহাশয় শীতে কাঁপছে। পকেট থেকে সিগারেট ও ম্যাচবক্স বের করল। সে ঠিক মতো সিগারেট ধরাতে পাচ্ছে না। সম্ভব্যত ম্যাচবক্স ভিজে গেছে। কিংবা সিগারেটও ডেম্প হয়ে যেতে পারে।

সে একটার পর একটা সিগারেট টেনে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পর সে বসার বারান্দার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।

এখন তার সাথে পাড়ার একটি নেড়ি কুকুর এসে জুটেছে কুকুরটিও বৃষ্টিতে ভিজছে! কবির পিছু পিছু চক্কর খাচ্ছে! অপরাজিতা এত কিছু দেখছে কীভাবে কে জানে! ও তো বারান্দাতে দাঁড়িয়ে নেই!  জানালার পর্দা সরিয়ে একবারও বাইরে উঁকি দেয়নি। তাহলে এত কিছু সে নিখুঁতভাবে ভাবছে কীভাবে? তার মাথাটা শেষ পর্যন্ত পারমানেন্ট ডেমেজের দিকে চলে গেছে নাকি?

 গাছপালাগুলো এখনও মানুষের মতো করে কথার জবাব দেওয়া শুরু করেনি; বলে রক্ষা! তার বাগানের গাছগুলোর জবান খুলে গেলে অপরাজিতার অতি দ্রুত বিজনবাবুর মনভুবন চেম্বারে যেতে হবে!

পরদিন কবি আবারও এসেছে। অনেক বার ফোন দিয়েছে। ধরিনি। ধরার প্রশ্ন ওঠে না! কেটে দিয়েছি। কবির নাম্বার আজ ব্ল্যাক লিস্টে দিয়ে দিয়েছি!

একটার পর একটা মেসেজ করে যাচ্ছে। অপরাজিতা স্পষ্ট বুঝতে পারছে কবির চোখ টকটকে লাল। লাল রক্তজবা। কয়েকদিন রাতে একদম ঘুমায়নি। সারারাত সিগরেট ফুঁকেছে। বৃষ্টিতে ভিজেছে। খুঁক খুঁক করে কাশছে। শুকনা ঘ্যার ঘ্যার কাশি। কফ বের হয় না। এ কাশি সহজে সারবে না। বেশ ভোগাবে। কাছে গিয়ে কপালে হাত দিলে দেখা যাবে গা বেশ গরম। বৃষ্টিতে এভাবে ভিজে তারপর শরীরে ভেজা কাপড় শুকালে জ্বর না এসে পারেই না!

অপরাজিতা নিজের মতো করে কল্পনা করে। পথহারা কবির উচিত শিক্ষা হয়েছে। সোজা গোছানো জীবন বাদ দিয়ে রাতের পর রাত কবিতা লিখবে! কবি হবে! প্রেমিক হবে!

এত কিছু হবে, বিনিময়ে সর্দি জ্বর ও কয়েকটা নির্ঘুম রাত কাটাবে না তা কি করে হয়। কবি হওয়া কখনই সহজ নয় কিন্তু প্রেমিক হওয়া আরও বেশি কঠিন!

কার্তিকের প্রথম সপ্তাহ শেষ হয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহ শুরু হয়েছে। বাইরে ভোরবেলা এখন হু হু করে বাতাস দেয়। গা শিরশির করে। খালি গায়ে দাঁড়ালে লোমকূপ খাড়া হয়ে যায়।

অপরাজিতার সাথে অভিমান পর্ব চলছে। অভিমানী রাজকন্যার রাগ কবে ভাঙবে কেউ জানে নো। হয়তো একদিন খুব সকালে দেখা করতে চলে আসবে। কিছুই হয়নি এমন ভাব করে বলবে; ভালো করে দাঁত ব্রাশ করে বেরিয়ে আসেন কবি। আজ সারাদিন আমরা ঘুরবো!

 কবি হিমালয় সরকারের মাথা ঝিম ঝিম করে। মাথার পুরনো ভোঁতা ব্যথা আবারও ফিরে এসেছে।

কবিতা লেখা সহজ কাজ নয়। কবিতা সবার কাছে ধরা দেয় না। কবি হওয়াও সহজ বিষয় নয়! প্রকৃতি খুব কঠিন পরীক্ষা নিয়ে কবিদের সামনে হাজির হয়। মাঝে মাঝে কবিদের জন্যে মাতাল ট্রাম পাঠায়! তার নিজেরও মাঝে মাঝে সবকিছু ছেড়ে অনেক দূরে চলে যেতে ইচ্ছে করে।

মাথাটা ইদানীং খুব যন্ত্রণা দিচ্ছে। কিছুতেই রিলিভ হচ্ছে না। সে আজ বিনয় মজুমদারের আত্মজীবনী হাতে নিয়েছে। কবিরা সবসময় অভিমানী হয়!

জীবনের সমস্ত দুঃখগুলো বিভিন্ন রূপে প্রতিদিন কবিদের সাথে দেখা করতে আসে! আহারে কবি! আহারে কবি জনম! কবি হিমালয় সরকার বিনয়দার জীবনের পাতাগুলো নেড়ে চেড়ে দেখছে!

বিনয়দার কবিতা ভাবনা!

‘পনেরো হাজার কবিতা লিখেছি। কেন লিখেছি কেউ জানে না, আমিও জানি না। না লিখলে বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি হতো না, আমার ক্ষতি হতো। লিখতে লিখতে বুঝেছি আমি কবিতা লিখতে জানি না। লিখতে লিখতে বুঝেছি কবিতা লিখলে দুঃখ ভোলা সম্ভব। কিন্তু দুঃখ ভুলে গেলে আর কবিতা লেখা যায় না!

কবি হিমালয় সরকার নিজের দুঃখ ভুলতে চায় না। জীবনে কিছু পবিত্র দুঃখ থাকতে হয়। না পাওয়ার বেদনা থাকতে হয়। কবিরা তাদের নিজেদের প্রেমিকা সুরাইয়া, হেলেন কিংবা সবিতাদের কখনও কাছে পাবে না! তারা অধরা প্রেমিকার জন্যে বাকি জীবন কবিতা লিখে যাবে। সত্য কবি হয়ে আশে পাশে ঘুরে বেড়াবে কিংবা চুপচাপ ঘাপটি মেরে বসে থাকবে।

হিমালয়ের নিজেরও এক কবি বন্ধু ছিল! বিশেষ কবি সহচর। কত বিনিদ্র রজনী একসাথে কাটিয়েছি! অনিরুদ্ধ কর্মকার। সত্য কবি অনিরুদ্ধ। বড় আবেগপ্রবণ মানুষ ছিল!

অন্য কবিদের মতো সে যশ-খ্যাতির কাঙাল ছিল না। কবিতা লিখে চুপচাপ বসে থাকতো। কাউকে বলতো না। সংবাদপত্র কিংবা সাহিত্য সাময়িকীতে ছাপাতেও দিত না! কবিতা লিখে বড় বড় দুটো ডায়েরি ভরিয়ে ফেলেছিল। বাকি সব কবিদের মতো সামান্য সুযোগ পেলেই অন্যদের ধরে জোর করে নিজের কবিতা শুনিয়ে দেয় না!

হঠাৎ এক পত্রিকায় কবির ছোট্ট একটা কবিতা ছাপা হলো। তার নিজের কবিতা সামান্য পরির্তন করে অন্য নামে ছাপা হয়েছে! সে ছাপা কবিতা দেখল। ভালোভাবে দেখল। নিজের লেখা কবিতা প্রথম ছাপার অক্ষরে দেখা। কিন্তু কবিতার নিচে অন্য কবির নাম ছাপা হয়েছে! কবি সাথে সাথে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। নিশ্চুপ থাকল।

বিকেল বেলা তার লেখা দুটো কবিতার ডায়েরি সে পুড়িয়ে ফেলল। তার কিছুদিন পর কবি হঠাৎ মারা গেল!

 কবিরা অন্যদের মতো হবে না এটাই স্বাভাবিক। কবি অনিরুদ্ধ কর্মকারের কোনো কবিতার বই নেই। ছাপা কোনো কবিতাও নেই। মৃত্যুর পর অপ্রকাশিত কোনো কবিতার পাণ্ডুলিপিও অবশিষ্ট নেই। তার পরেও সে কবি। কবি হিমালয় সরকারের কাছে সে অবশ্যি বড় কবি। ইদানীং হিমেলের মাঝেও মৃত্যু চিন্তা ভর করেছে। বেশ ভালোভাবে ভর করেছে মনে হচ্ছে। এখন সবকিছু এলোমেলো লাগে।

আজ অপরাজিতার মন ভালো নেই। গত তিন সপ্তাহ কবির সাথে একটি কথাও হয়নি। ভীষণভাবে হয়। অপরাজিতা প্রতিদিন নিজে নিজেই কবির সাথে ঝগড়া করে। কবি তা জানতেও পারে না। কোনোদিন পারবে না।

তার লেখা পুরনো কবিতাগুলো সে আবারও পড়ে। বার বার পড়ে। আজ পড়ছে কবির লেখা ‘সরষে ফুলের ঘ্রাণ’ কবিতা। এ মাতাল কবি এত ভালো কবিতা কীভাবে লিখে কে জানে! তার সাথে সারা জীবন থাকতে ইচ্ছে হয়। তাতে কী? বিরহে বুঝি আমার জনম বয়েই গেছে! কবিতা লেখার আশ্চর্য প্রহরগুলোতে সে চুপচাপ বসে থাকবে। কবি আপন মনে কবিতা লিখবে। লেখা শেষ হলে সাথে সাথে অপরাজিতা কবিতাটি চুপ করে পড়ে নিবে।

তার মন খারাপ হলে সে কবিকে বলবে। কবি তার মন ভালো করার জন্য একটার পর একটা কবিতা লিখে যাবে। তার মন ভালো হবে না! তারপরও কবি চেষ্টা করে যাবে।

এক সময় উত্তেজিত হয়ে কবি পুরনো কবিতা ছিঁড়ে আবারও মন ভালো করার নতুন কবিতা লিখতে বসবে! অপরাজিতার এসব ভাবতে খুব ভালো লাগে।

কার্তিক মাসের মাঝামাঝি চলছে। সকালে বাইরে বের হলে ঠান্ডা হাওয়ায় শরীর মনে শিহরণ জাগে। কাঁপুনি ধরে যায়।

মাতাল কবির লেখা প্রায় সব কবিতাই আমার পড়া। কিন্তু তার অল্প কয়েকটি কবিতা অপরাজিতার পুরো মুখস্থ। আজ ২২ কার্তিক ১৪২৭। তার প্রিয় একটা কবিতার কথা আজ বার বার মনে পড়ছে। কবির লেখায় অনেকবার ঘুরে ফিরে এ কবিতা এসেছে। অপরাজিতার মনে এ কবিতারই বসবাস।

কবিতার নাম―বড়দের কবিতা!

তুমি যদি আমার হতে আমি হতাম তোমার! শিবসূত্র। আমি রাতমজুর। আমি পৃথিবীর অন্ধ মানুষ। আমার সব জাদু আমার এগারো আঙ্গুলে! আমি পিশাচ। আমি দুই পৃথিবী ধরে খেলি এক বিষম খেলা। আমি কামড়ে ধরি উপত্যকা। বালিজল শুষে আদিম তৃষ্ণা জুড়াই―গভীর সমুদ্রতীর! দু কাঁধে নূপুর তুলে হাতে রাখি হাত।  যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা আমার সেই কবে থেকে প্রিয়!

কবিতা শেষ না করেই অপরাজিতা বারান্দা থেকে ভিতরে চলে গেল। খুব সকালেই ভালো করে শাওয়ার নিল। সে আজ খুব করে সাজবে। সুন্দর করে চুল বাঁধবে। আজ মাতাল কবির সাথে দেখা করতে হবে। সরাসরি তার আখড়ায়। সকালে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে হবে। ফ্ল্যাস্কে কফি বানিয়ে নিয়ে যাবো। হিমালয় বাবু এত সকালে ভূত দেখার মতো আশ্চর্য হয়ে যাবে। আমি নিজে এতদিন কিছু হয়নি―এমন ভাব করে কাপে গরম কফি ঢেলে সামনে বাড়িয়ে দেব।

কবির পাশে বসে কফি খাব। কফি খেতে খেতে তার বিস্ময় ভরা চোখ দেখব। তার চোখের গভীরতায় আজ আমি আমার নারী সত্তা খুঁজে নেব।

সে সাজগোঁজ করে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে তখনও এত মানুষের ভিড় চোখে পড়ছে না। আকাশে আজ বেশ মেঘ করেছে। সকালটা কেমন যেন অন্ধকার অন্ধকার লাগছে। সে রিকশায় উঠে পড়েছে। মাঝপথে গিয়ে তার মনে হলো সে কবির জন্য বানানো ফ্লাস্কভর্তি কফি নিতে ভুলে গেছে! আহা রে আজ বেচারাকে কফি খাওয়ানো গেল না।

অপরাজিতাকে দেখে কবি যতটুকু অবাক হবে বলে ভাবা হয়েছিল;  ঘটনা ঘটল তার থেকেও অনেক বেশি। সে কোনো কথা না বলে অপরাজিতাকে জড়িয়ে ধরল। জড়িয়ে ধরে বড়দের কবি হিমালয় সরকার হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল!

আমাদের এতদিনের সম্পর্ক। অথচ কবি কিনা আজ প্রথম জড়িয়ে ধরেছে। এত শক্ত করে ধরেছে কেন? ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাব নাকি। এত কান্নাকাটিরই বা কি আছে! মাতাল কবি শিশুদের মতো আশ্রয় খুঁজছে। সে কেন বুঝতে পারে না তার কবিতা লেখার প্রতিটি প্রহরে আমি গরম কফির মগ হাতে নিয়ে এ মাতাল কবির জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে চাই!

আজ বাইরের অন্ধকার আরও বাড়ছে। এর মধ্যে দমকা বাতাস শুরু হয়েছে। অপরাজিতার সব কিছু ঘোরের মতো লাগছে! সে সত্যিই বুঝতে পারছে না সময়টা সকাল, সন্ধ্যা নাকি গভীর রাত!

তার একবার মনে হলো সময় থেমে আছে। পৃথিবীর সব মানুষ―কোলাহল থেমে গেছে। আজ সব কর্মচাঞ্চল্য বন্ধ! এখন এ পৃথিবী এক মাতাল কবি ও তার একান্ত প্রেমিকার। আজ তারা দুজনে মিলে সবচেয়ে সুন্দর পদ রচনা করবে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কবিতা।

বইরে প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়েছে। সাথে দমকা হাওয়া। কার্তিক মাসে এমন ঝড় হতে পারে ভাবাই যায় না। মাতাল কবির কান্না থেমে গেছে!

 সে অপরাজিতাকে অনেক্ষণ জড়িয়ে ধরে আছে। কবির এলোমেলো চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, বড় বড় লালচে চোখ সবকিছুতে কেমন যেন মায়া! অপার্থিব এক নেশা। কোনোভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

কতক্ষণ যে আমরা একে অপরকে জড়িয়ে থেকেছি জানি না। আমাদের নিঃশ্বাস ভারী হয়েছে। আমরা দুজন দুজনের মাঝে অচেনা জীবন খুঁজেছি। নতুন জীবনের আহ্বানে আমরা সাড়া দিয়েছি! কখন যে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে বুঝতে পারিনি।

 অপরাজিতা দ্রুত গুছিয়ে নেয়। বাসায় ফিরতে হবে। কবি অপরাজিতা নামক তার ব্লু বাটারফ্লাই ফুলের কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে। কি নিষ্পাপ চেহারা। কবির চোখ বন্ধ থাকলেও শরীরের প্রতিটি স্নায়ু জেগে রয়েছে। আজ তার সবকিছু ভাবতে এত ভালো লাগছে কেন?

দুপুরে আলুভাজি ডাল আর শুকনো মরিচে মিষ্টিকুমড়া ভর্তা করা হয়েছে। অপরাজিতা নিজে মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছে। বাসায় রান্না করার মতো আর কিছু ছিল না।

জীবনে তো আলুভাজি অনেক খেয়েছি। আজকের মতো ভালো তো কখনও লাগেনি! শুকনো মরিচের মিষ্টিকুমড়া ভর্তা জীবনে আগে কমতো খাইনি। এমন স্বাদের তো কখনও ছিল না!

 আজ নিজের রুমটাকে বড় অচেনা লাগে। অপরাজিতা কোন ফাঁকে সব গুছিয়ে ফেলেছে। এত তকতকে ঝকঝকে লাগছে। সবকিছু কেমন যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে!

এখন মাইকিং করে সবাইকে জানিয়ে দিতে ইচ্ছে করেছে, আজ ২২ কার্তিক ১৪২৭। সারাদিন শনিবার। আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম দিন। অপরাজিতা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী রাজকন্যা। সে আজ আমার হয়েছে। মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা সার্থক হয়েছে। ব্রাদার; জীবন অনেক সুন্দর!

রাতে অপরাজিতাকে বাসায় পৌঁছে দিলাম। ফেরার সময় অপরাজিতার বাসার সামনে পরিচিত পুরনো কুকুরের সাথে আবার দেখা হলো। আজ নেড়ি কুকুরকেও অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে সে আমাকে দেখে মিটিমিটি হাসছে। নেড়ি কুকুরের হাসি কি দেখা যায়? কেউ কোনদিন দেখেছে!

আজ অপরাজিতাকে পেয়ে মাথাটা আংশিক এলোমেলো হয়ে গেছে। আংশিক না, মনে হয় পুরোটাই! হলে হোক। এখন নেড়ি কুকুরের হাসি দেখছি কিছুক্ষণ পর সে কথা বলা শুরু করলেও আজ অবাক হব না! আজ জীবনের বিশেষ দিন। বিশেষ ঘটনাতো ঘটবেই! কোনোভাবেই বিস্মিত হওয়া চলবে না।

এরপর প্রায় নিয়মিত অপরাজিতা বাসায় আসতে শুরু করল। কবি-জীবনের ঘোর গভীর থেকে গভীরতর হলো। অনেকগুলো নতুন কবিতা লেখা হয়ে গেল। সবই অবশ্য প্রেমের কবিতা! যাকে উৎসর্গ করে লেখা সে তুমুল আগ্রহ নিয়ে কবিতাগুলো পড়ল। তার কবি-জীবন এ প্রজন্মে সার্থক হয়ে গেল!

আমি কি আপরাজিতা নামের রাজকন্যাকে পেয়ে জীবনের দুঃখ ভুলে গেছি। দুঃখ ভুলে গেলে তো আর কবিতা লেখা হবে না! এভাবে মাসখানেক চলে গেল। কীভাবে নিমেষেই এতগুলো সময় চলে যায়!

অপরাজিতার প্রিয় গুচ্ছ জামগাছগুলো আরও কচি সবুজপাতা দিয়েছে। বেশ বড়সড় হয়ে গেছে। এখন আমাদের ফোনে কথোপকথনের মূল অংশজুড়ে থাকে শিশু জামগাছ! মাঝখানে বৃষ্টির দমকা হাওয়ায় এক শিশু জামগাছ ভেঙে পড়েছিল। অপরাজিতার সে কি আহাজারি!

ভাবছি; অপরাজিতার জীবনের থেকে প্রিয় জামগাছগুলোকে একদিন দেখতে যাবো। কচি নরম পাতায় হাত বুলিয়ে দেব। ওদের নতুন একটি কবিতা শুনানোর পরিকল্পনা আছে!

অপরাজিতা তার ব্যক্তিগত ডায়েরির পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছে। সে ‘জামগাছ বিষয়াবলি’ শিরোনামে লেখা বিশেষ দিনের স্মৃতিকথা বের করল। এখানে সেদিনের ঝড়ে, কাণ্ড ভেঙে যাওয়া জামগাছটির কথা সংক্ষিপ্ত আকারে বলা আছে!

‘শিশুজাম বিষয়ক রচনা’

‘কিছুদিন হলো আমার বারান্দায় প্রায় ৭৪ (ছোট বড় মিলিয়ে) নতুন জামগছের জন্ম হয়েছে! বিচি লাগনোর পর ভুলে গিয়েছিলাম! কবে জন্মাল এবং এত বড় হলো বুঝতে পারিনি! হঠাৎ দেখে মন ভালো হয়ে গেল। কি যে খুশি হয়েছি!

আজ সকালে আমার এক শিশুজাম গাছ বৃষ্টি বাতাসে ভেঙে পড়ে। প্রায় দ্বিখণ্ডিত! তুলে ফেলা ছাড়া কিছু করার নেই! কি সুন্দর কচি সবুজ পাতা। ভীষণ মায়া হলো।

মন খারাপ হলো। রুমের ভিতরে চলে গেলোম। মাইক্রোপোর, স্কচটেপ নিয়ে এলাম! জামগাছের ভাঙা স্পাইনাল কর্ড নতুন করে জোড়া লাগালাম। গাছটি আশু মৃত্যু কিছুতে মানতে পারছি না!

দুপুরের পর আবারও দেখতে গেলাম। কি আশ্চর্য! এখনো বেঁচে আছে! সবুজ পাতা বাতাসে কাঁপছে! তারা হাসছে! দেখে কি যে ভালো লাগল আমার!

কাছে গেলে শিশু গাছ দুলে দুলে হেসে উঠছে। আমাকে ডেকে নিশ্চয় কিছু বলছে! ইশ্! প্রফেট সোলাইমান’র মতো যদি তাদের কথা শুনতে পেতাম!’

অপরাজিতার কপালে চিন্তার ভাঁজ। একমাস শেষ হয়ে আরো ৭ দিন! এখনও তার মাসিক হয়নি! অথচ কখনও অনিয়মিত ছিল না। সে বিষয়টি কয়েকদিন হলো কবিকে জানিয়েছে। সে নিজে কিছু বুঝতে পারছে না। ভয়ে হিম হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে নিজে একদিন ইউরিন স্টিপ টেস্ট করল। পজিটিভ। আল্ট্রা সাউন্ডেও! সে কনসিভ করেছে!

সে বিষণ্ন মনে শুধু ভাবে। কবির সাথে এখন ভালো করে কথাও বলে না! অল্পতে রেগে যায়! কথা বলতে ভালো লাগে না। সে দুর্বিষহ গ্রহণ লাগা এক সময়!

এখন পরিস্থিতি বেশ শান্ত। প্রবলেম সল্ভড হয়ে গেছে। কেউ জানতেও পারেনি! অ্যাবরশানের জন্য সে ড্রাগ নিয়েছে। সেখানেও এক সময়! সমস্যা হয়েছিল। ইনকমপ্লিট অ্যাবরশান। নতুন আল্ট্রাতে কিছু রিটেইন কনসেপশান প্রডাক্ট দেখাচ্ছে। শুরুতে এমআর করালে প্রব্লেম চুকে যেত! শেষ পর্যন্ত ডিএন্ডসি করাতে হলো! আসলে সে হাসপাতাল-ক্লিনিক করে জানাজানি করাতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে না গিয়ে পুরোপুরি উদ্ধার হওয়া গেল না! এখন সব থেকে মুক্তি। চাপ নেওয়ার আর কিছু নেই।

আজও খুব সকালে সে ঘুম থেকে উঠেছে। বারান্দায় বসে আছে। এক সময় ভেঙে পড়া জামগাছটায় নতুন পাতা এসেছে। নরম কচি সবুজ পাতা। নতুন জীবন পাওয়া জাম শিশুটি অপরাজিতাকে দেখে মিটিমিটি হাসছে! হিমেল আহত শিশুজামগাছটার জন্য আটচল্লিশ লাইনের কবিতা লিখে পাঠিয়েছিল!

আজ অপরাজিতা শিশু-কবিকে খুন না করলে তার কবি বাবা নিশ্চয়ই নতুন কবিতা লিখে পাঠাত। সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুপুত্রের জন্যে বাবার কবিতায় না জানি কত আবেগ জড়ানো থাকত!

অপরাজিতা আর ভাবতে পারছে না। তার চোখের জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। কিছুতে বন্ধ হচ্ছে না। খুন করা যে এত সহজ কাজ; খুন করার আগে অপরাজিতা তা কোনোভাবে জানতে পারেনি!

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares