বিশ্বসাহিত্য : নোবেলজয়ী লুইজ গ্লুকের কবিতা : সহজ কিন্তু গভীর : মোহীত উল আলম

[ উৎসর্গ : গত ৫ নভেম্বর ২০২০ রাত সাড়ে ন’টায় বন্ধু কবি ও কথাশিল্পী অধ্যাপক নুরুল করিম নাসিম আকস্মিকভাবে তাঁর ঢাকাস্থ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। একান্ত বন্ধু ছিলেন বিধায় তাঁর মৃত্যুটি আমার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। তাঁর বিদেশি সাহিত্যের প্রতি প্রচুর উৎসাহ ছিল। বর্তমান রচনাটি তাঁর স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করলাম―লেখক ]

‘May be just not being is simply enough’ (সম্ভবত শুধু সরল হওয়ায় যথেষ্ট নয়)। লুইজ গ্লুকের ‘The Night Migrations’ শীর্ষক কবিতা থেকে।

স্বীকার করে নিচ্ছি, ২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাবার আগে পর্যন্ত আমি লুইজ গ্লুকের নাম শুনিনি। পুরস্কার পাবার সংবাদের সঙ্গে তাঁর যে সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত গণমাধ্যমে দেখলাম, তাতে চমৎকৃত হয়ে আমার সংগ্রহে বিভিন্ন ইংরেজি কাব্য সংকলন ঘেঁটে দেখলাম, কোনো একটাতেই লুইজ গ্লুকের কবিতা সংকলিত নেই। নর্টন এডিশনের মোটা মোটা ভল্যুম কোনোটাতেই নেই। অথচ তিনি তাঁর দ্য ওয়াইল্ড আইরিস (১৯৯২) গ্রন্থের জন্য পুলিতজার পুরস্কার পেয়েছিলেন সেই ১৯৯৩ সালে। আরও বহু বিখ্যাত পুরস্কার তিনি শুধু কবিতার জন্য পেয়েছেন, যার পরিচিতি পাঠকমাত্রই যে কোনো ওয়েবসাইটে গেলে খুঁজে পাবেন। এর ওপর তিনি ২০০৩-০৪ সালে ছিলেন আমেরিকার পোয়েট লরিয়েট বা রাজকবি। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ডজনখানিক এবং উঁচু দরের কাব্য-প্রবন্ধ গ্রন্থও আছে একাধিক। মনে মনে খুব লজ্জা পেলাম, না তাঁর সম্পর্কে জানতাম না সে জন্য নয়, বরঞ্চ কারণটা হলো তাঁর গোটা দশেক কবিতা এদিক ওদিক ছিটানো যা পেলাম পড়ে দেখলাম যে অদ্ভুত এক মাদকতাপূর্ণ কবি―এবং এই কবিকেই যে এতদিন পড়িনি সে জন্য লজ্জা পেলাম। নোবেল পুরস্কার কমিটি তাঁদের প্রশংসাবচনে ঠিকই উল্লেখ করেছেন যে খুবই সাধারণ বস্তুকে পর্যবেক্ষণ করে কবি মহাজাগতিক একটি চেতনার সঙ্গে তাঁর বক্তব্যকে ধারণ করতে পারেন। তাঁরা তাঁর শব্দ বাছাইয়ে কৃচ্ছ্রতার কথা উচ্চকিতভাবে প্রশংসা করেছেন এবং সাথে সাথে কবিতার কাঠামোকে নতুনভাবে সৃজিত করার তাঁর অপার শক্তির উল্লেখ করেছেন। কবি নিজেই তাঁর একটি অতি পঠিত কবিতা, ২০০১ সালে প্রকাশিত The Seven Ages-অন্তর্ভুক্ত ‘Memoir’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন: ‘A few words were all I needed: / nourish, sustain, attack.’ (কেবল অল্প কয়েকটি শব্দ আমার প্রয়োজন ছিল/পুষ্টিবান, তাকৎওয়ালা এবং আক্রমণশীল)। গ্লূক সহজতম শব্দনিচয় ব্যবহার করেন, জটিল, অস্পষ্ট বা বারুক (অদ্ভুতুড়ে) টাইপের শব্দ তাঁর কবিতার কাঠামোয় প্রায় অনুপস্থিত, কিন্তু তাতেই তাঁর কাব্যভাষা চাঁছা বা ধারালো, কিছুটা অনুত্তাপিত কিন্তু মৌমাছির গুঞ্জরণের মতো একটা হামিং কিংবা এগারো হাজার তারের ভোল্টে যে টেনশন থাকে, সেরকম একটি প্রভা তাঁর ভাষার শক্তি। তদুপরি আছে ভাষার সঙ্গে বিষয়ের সামঞ্জস্য। অর্থাৎ যে কোনো বড় কবির বিষয়ে লুইজ গ্লুকদের গুরু কবি টি এস এলিয়ট অবজেক্টিভ কোরিল্যাটিভ নামে ফর্ম এবং কন্টেন্টের মধ্যে যে অপূর্ব সমন্বয়তার কথা বলেছেন গ্লুকের কবিতায় তা পুরোপুরি রক্ষিত হয়েছে। ভাষা এবং কাহিনির মধ্যে নিপাট জোড়।

টি এস এলিয়টকে গুরু কবি বলে সম্বোধন করে যে আলোচনায় আনলাম তাঁর একটি কারণ আছে। লুইজ গ্লুকের গোটা চল্লিশেক কবিতা পড়ে এবং আরও গোটা চল্লিশেক কবিতার কবির স্বকণ্ঠে অডিও আবৃত্তি শুনে আমি বুঝতে পারলাম তাঁকে যদি কোন ঘরানায় ফেলতে হয়, তা হলে ছায়া পাব এমিলি ডিকিন্সনের, আর টি এস এলিয়টের কথাতো বললাম, আরও পাব ডব্লিউ বি ইয়েটস এবং রবার্ট ফ্রস্ট এবং অ্যালেন টেইটের, আর তাঁর (লুইজের) একটু আগের প্রজন্মের কিছু কবির, যেমন জন অ্যাশবেরি, ফ্রাংক বিডার্ট, রবার্ট পিনস্কি। কনফেশন্যাল কবি রবার্ট লাওয়েল ও সিলভিয়া প্লাথ-এর প্রভাবও বেশ পাওয়া যায়। এলিয়টের প্রভাব সম্পর্কে বলতে হয়, এলিয়টের প্রবাদপ্রতিম খ্যাতি যখন অস্তপ্রায় তখন, ১৯৯০ সালে, গ্লুক এলিয়টকে গৌরবমণ্ডিত করে ‘অন টি এস এলিয়ট’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখেন যেটি পরে, ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত, তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ প্রুফস অ্যান্ড থিওরিজ-এ অর্ন্তভুক্ত হয়। এই ছোট্ট প্রারম্ভিক কথাটা বলার অর্থ হলো লুইজ গ্লুক মোটেও রোম্যান্টিক ঘরানার কবি নন, যদিও প্রকৃতি উপসর্গ হিসেবে তাঁর কবিতায় বারংবার উঠে এসেছে, যেমন দ্য ওয়াইল্ড আইরিস গ্রন্থে ফুল আর চারা হচ্ছে কবিতার কথক। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত দ্য বেস্ট এমেরিকান পোয়েট্রি নামক সম্পাদিত সংকলনের ভূমিকা-রচনায় গ্লুক বললেন, ‘আমি লিরিসিজমে বিশ^াস করি না। পাঠক হিসেবেও না, লেখক হিসেবেও না।’ (এই প্রবন্ধটিও প্রুফস অ্যান্ড থিওরিজ-এ অন্তর্ভুক্ত হয়।) কেন তিনি কবিতার কাব্যময়তায় বিশ^াস করেন না, তার কারণ হিসেবে বলছেন, ‘কবিতার বাহন যেহেতু ভাষা, তার অর্থ হচ্ছে এটি চিন্তা, ঐতিহাসিক এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যও পরিবেশন করে, শুধু আবেগ নয়।’ আবার বলছেন, ‘শুধু নিরাকার চিন্তা আর তথ্য দিয়ে ঠাসা থাকলে কবিতা হয় না, যেমন হয় না শুধু আবেগ দিয়ে।’১ তা হলে রাস্তাটা কী? তিনি লিখছেন, ‘যুগপৎ এই দুটি বিপরীতধর্মী স্রোত খানিকটা সমাধানও নিয়ে আসে। যেটি নন-লিরিক্যাল সেটিকে লিরিক্যাল করতে হবে, আর যেটি লিরিক্যাল সেটিকে নন-লিরিক্যাল একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারলে কবিতায় নতুন অন্তর্দৃষ্টি খুঁজে পাওয়া যাবে।’২ গ্লুক স্বতঃস্ফূর্ত ছান্দসিক কবি নন, কিন্তু তাঁর সহজ শব্দপ্রয়োগ হৃদয়ের গভীরে দাগ কাটে, অনেকটা অমিত্রাক্ষর ছন্দের মতো বা ফ্রি ভার্সের মতো তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিগুলো কখনও এক পঙ্ক্তির, কখনও গদ্য কবিতার ভঙ্গির মতো দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ পঙ্ক্তি পর্যন্ত সঞ্চরমান।

এলিয়টের কবিতার সম্পর্কে ধারণার সঙ্গে গ্লুকের কাব্যচর্চা মেলে। এলিয়ট তাঁর পূর্বে উল্লিখিত প্রবন্ধ অন পোয়েট্রি’-তে বলেছিলেন, কবিতা ‘সামথিং জার্মিনেট’ করে, অর্থাৎ কবিতায় কিছু একটা জন্ম নেয়, তাৎক্ষণিকভাবে। আর একটু টেনে যদি বাঙালি কবিদের সঙ্গে লুইজ গ্লুকের কবিতার মিল দেখাতে চাই, তা হলে আমার লুইজ গ্লুকের কবিতা পড়া ও শোনার অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন, যেমন ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই ঘাটে,’ বা ‘মনে রেখ, আমি যে গান গেয়েছিলেম,’―যেখানে জীবনের অনিত্যতার কথা তিনি বলেছেন, সেটি গ্লুকের কবিতায় প্রচ্ছন্নভাবে আছে, আর আছে জীবননান্দ দাশের মধ্যে যেমন মৃত্যুচেতনা নিয়ে আচ্ছন্নতা আছে, সেটি। গ্লুকের কবিতায় কবিতাগুলোর বিষয়-উৎস যা-ই হোক না কেন, মৃত্যুর অস্তিত্বের কথা  সেখানে আসবেই। ‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিস’ কবিতাটিই শুরু হচ্ছে এভাবে: ‘অ্যাট দ্য এন্ড অব মাই সাফারিং, দেয়ার ওয়াজ আ ডোর’ (আমার যন্ত্রণার শেষের প্রান্তে একটি দরজা ছিল), ‘হিয়ার মি আউট: দ্যাট হুউচ ইউ কল ডেথ/আই রিমেমবার’ (আমাকে শোন, যেটাকে তোমরা মৃত্যু বল,/আমি সেটাকে স্মরণ করি।) মৃত্যু এসে বিচ্ছেদ ঘটাবে দেহ আর আত্মার। A Village Life-এর ‘Crossroads’ শীর্ষক কবিতায় লিখছেন: ‘My body, now that we will not be travelling together much longer/I begin to feel a new tenderness toward you, very raw and unfamiliar,/like what I remember of love when I was young.’ (হে শরীর, আমরা আর বেশিদিন একত্রে থাকব না,/ তোমার জন্য আমি নতুন বেদনা অনুভব করছি, খুব তাজা এবং অপরিচিত/ ঠিক অল্প বয়সে প্রেমে পড়ার স্মৃতির মতো।)

আর তাঁর আরেকটি প্রকরণিক দিক হচ্ছে যে তিনি কবিতায় উত্তম পুরুষে না লিখে দ্বিতীয় পুরুষে লেখার প্রবণতা দেখিয়েছেন: ‘হিয়ার মি আউট,’ ‘আই টেল ইউ,’ ‘আই কুড স্পিক’ ইত্যাদি। তাই তাঁর কবিতায় ‘আই’ সর্বনামের বদলে ‘ইয়ু’ সর্বনামের ব্যবহার প্রচুর। আর শব্দের ঐন্দ্রজালিক প্রভা যেটি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার মূল শক্তি, সেই শব্দের ব্যবহার গ্লুকের মুনশিয়ানায় তাঁকে নোবেল পুরস্কার পাইয়ে দিয়েছে বলে আমার বিশ^াস, যেটি সামনে আলাপে আসছে। আরেকটি ব্যাপার লক্ষ করার মতো। আমরা এর মধ্যে বলেছি গ্লুক লিরিসিজমকে পরিত্যাগ করে আধুনিক ঘরানার কবিদের মতো শব্দে এবং শব্দে চিন্তাকে বিস্তারিত করেছেন। অর্থাৎ রোম্যান্টিক কবিদের মূল তেজটা যেখানে শব্দে নয় বাক্যের বিন্যাসে, যেখানে বাক্যের পর বাক্য সংযোজিত হয়ে একটি উত্তরণ বা ট্রান্সেডেন্স ঘটে যেটি পাঠকের মর্মে হানা দেয়, গ্লুকের ঘরানার কবিদের মধ্যে সেটি করা হয় অন্য উপায়ে, যে উপায়টি খানিকটা লিরিসিজমের বৈশিষ্ট্যও বটে। তার মধ্যে একটি হলো পুনরুক্তি। কিন্তু গ্লুক স্পষ্টতই পুনরুক্তি ভালোবাসেন না, সেই অর্থে তাঁর কবিতায় পুনরুক্তি নেইও, কিন্তু আছে কবি কিটসের মতো কিয়াসমাস বা বাক্যপরম্পরাকে উল্টো করে সাজিয়ে পরিবেশনা করা। কিটস যেমন বলছেন, ‘বিউটি ইজ ট্রুথ, ট্রুথ ইজ বিউটি,’ গ্লুক সেই রকমেরও একটি ভাব জানাচ্ছেন এভাবে: ‘Orange blossoms blowing over Castle / children begging for coins / I met my love under an orange tree.’ (কমলার পাপড়ি ওড়ে দুর্গের ওপরে / শিশুরা ভিক্ষা মাগে পয়সার / আর কমলা গাছের নিচে দেখা হলো আমার ভালোবাসার সঙ্গে।) পুনরুক্তির ব্যাপারে আরও সামান্য  আলোচনা সামনে আসছে। রোম্যান্টিক কবিদের মধ্যে বিশেষ করে কোলরিজ ও কিটসের কবিতার মধ্যে বিবমিষা বা পরিশ্রান্তি ব্যাপকভাবে উপস্থিত, উপস্থিত জীবননান্দ দাশের কবিতাতেও এবং এটি বহুল পরিমাণে আছে গ্লুকের কবিতাতেও। তা হলে এতক্ষণে যে কথাটা বলার সময় এলো, সেটা হলো গ্লুক লিরিসিজমকে পরিত্যাজ্য ভাবলেও, বড় কবিদের মধ্যে যা হয়, তাই হয়েছে যে উল্টোটাই ঘটেছে, অর্থাৎ তাঁর কবিতার মধ্যেও মোটা দাগের কাব্যময়তা খুঁজে পাওয়া যায়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ যেমন সাধারণ লোকজ বাচ্যে কবিতার ভাষা নির্ণিত করতে তত্ত্ব দিলেও সেটি রক্ষা করেননি, উল্টোদিকে গ্লুক দেখছি সাধারণ শব্দকে এমন একটি স্বর দিয়েছেন যাতে শব্দটার অর্থই অনেক গুরুত্ববাহী হয়ে ওঠে। আরেকটি প্রবণতা তাঁর মধ্যে প্রবল, সেটি বোঝাও সহজ। কারণ যখন বলেছি যে তাঁর কবিতায় মৃত্যুচিন্তাকেন্দ্রিক বিষয় আছে, তখনই বলতে হবে যে ‘সময়’ বা টাইম তাঁর কবিতার আরেকটি বিশেষ উন্মোচিত দিক। পেছনের সময় এগিয়ে আসছে, আবার সামনের সময় পেছনে গিয়ে মিলে যাচ্ছে, যেটা এলিয়ট Four Quartets-এ বলেছেন,

Time present and time past


Are both perhaps present in time future,


And time future contained in time past.

সে ধরনের সময়ের আগুপিছু প্রবাহ ও সংযোগ গ্লুকের কবিতায়ও উপস্থিত:

You who do not remember

Passage from the other world

I tell you I could speak again: whatever

returns from oblivion returns to find a voice.

(তোমরা যারা / পরপারের কথা মনে করতে পারছো না / আমি বলি, আমিই আবার বলতে পেরেছি, যা / কিছু বিস্মৃত জগৎ থেকে ফিরে আসে / ফেরে একটি স্বরকে খোঁজার জন্য।) এই ভয়েস বা স্বর হচ্ছে অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে যোগসূত্র।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার মতো―সেটি হলো পরিবার। লুইজ গ্লুক বিবাহিত জীবনে সুখী ছিলেন না। তাঁর প্রথম স্বামী চার্লস হার্টজ জুনিয়র, তাঁর সঙ্গে বিচ্ছেদ হবার পর, দ্বিতীয় স্বামী জন ড্রানো, তাঁর সঙ্গেও বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। The Wild Iris-এ অন্তর্ভুক্ত ‘Mock Orange শীর্ষক কবিতাটি এ ব্যাপারে বক্ষ্যমান।

It is not the moon, I tell you.

It is these flowers

lighting the yard.

I hate them.

I hate them as I hate sex,

the man’s mouth

sealing my mouth, the man’s

paralyzing body—

(এটা চাঁদের বিষয় নয়, তোমাকে বলছি। / এটা হচ্ছে এই ফুলগুলো / যারা উজ্জ্বল করছে উঠোনটা। / আমি তাদের ঘৃণা করি। / আমি তাদের ঘৃণা করি যেমন আমি সঙ্গম ঘৃণা করি, / পুরুষটির মুখ / আমার মুখকে করছে ছিপিবন্ধ, পুরুষটির / অবসাদগ্রস্ত শরীর।)

পুরুষের অসাড় মুখ নারীর মুখকে চুম্বিত করছে, রতিক্রিয়া পর্বের একটি বীভৎস চিত্রকল্প।

পরিবার সম্পর্কে Meadowlands-এর একটি কবিতায় বলছেন: ‘Why is it always family with you? / Can’t we ever be two adults?’ (কেন বারবার পরিবার নিয়ে কথা বল? / আমরা কি কোনোদিন দুইজন স্বাধীন মানুষ হতে পারব না?)

দাম্পত্য জীবন এবং পরিবার প্রসঙ্গে তাঁর কবিতায় যে ভাবনাগুলো আছে সেগুলো হয়তো আত্মজৈবনিক বলা যাবে না, কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের ব্যাপারে গ্লুক একবারেই শীতল এবং সে জন্য আরেকটি বিরাট ব্যাপার ঘটে গেছে তাঁর কবিতায় যেটি হচ্ছে শরীরের সঙ্গে তাঁর বিসংবাদ। এ বিষয়ে কোনো কোনো কবিতা বেশ উত্তরিত এবং আলোচনা সামনে আসছে।

২.

এ যাবৎ লুইজ  গ্লুকের কবিতার বিষয় ও প্রকরণ নিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা দেবার চেষ্টা করা হলো। এবার তাঁর বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে ওপরের কথাগুলোকে প্রণিধানযোগ্য করার চেষ্টা করব। যেহেতু লুইজ গ্লুকের সমগ্র কবিতা আমার পড়া হয়নি সে জন্য আলোচনা থিম ধরে না করে কাব্যগ্রন্থ ধরে করব।

১৯৬৮। কবি লুইজ গ্লুক ছাপলেন তাঁর প্রথম কবিতার বই। নাম: ফার্স্টবর্ন। ফ্রাংক বিডার্ট, যাঁর কথা আগেই বলেছি গ্লুকের সমসাময়িক কবি হিসেবে, মন্তব্য করেছেন যে গ্লুকের কবিতা পড়া উচিত ক্রমান্বয়ে বই থেকে বইয়ে ধারাবাহিকভাবে, কেননা গ্লুক আসলে একটি দীর্ঘ কবিতাই লিখে যাচ্ছেন বই থেকে বইয়ে। সে দীর্ঘ কবিতাটি কী? সেটি হচ্ছে তাঁর আন্তরজীবন, ইনার লাইফ। এই গ্রন্থে গ্লুকের কৌশলগত সমস্যাটা দেখা দিচ্ছে এ ভাবে যে কবিতার স্পিকার বা কথকের সঙ্গে বিষয়বস্তুর সম্পর্কটা কীভাবে নির্ধারিত হবে সেটি নিয়ে তাঁর মনোযোগ ব্যাপক। এই প্রথম গ্রন্থেই গ্লুকের পর্যবেক্ষণ পর্যায় লক্ষ করা যায় শরীরকেন্দ্রিক, পছন্দের অর্থে নয়, অপছন্দের অর্থে। একটি কবিতায় বলছেন শিকাগোগামী একটি ট্রেনে তিনি সহযাত্রী একটি পরিবারকে লক্ষ করছেন: কর্তার টাক মাথা (‘barren skull), বাচ্চাটা তার মায়ের উরুতে ঘুমিয়ে পড়া (‘the kid / Got his head between his mama’s legs and slept,’ মহিলার কম্পমান জংঘা (‘pulsing crotch), মেয়েটার মাথাভর্তি উকুন (‘the lice rooted in that baby’s hair’), এবং একটি চিত্রকল্প দুঃস্বপ্নের মতো উঠে আসছে―পুরো পরিবারটিকে দেখে তাঁর মনে হচ্ছে তারা যেন মৃত্যুর আগে পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত: ‘as though paralysis preceding death / Had nailed them there.’ 

সাত বছর চলে গেলে ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ The House on Marshland. মোট ৩৫টি ছোট কবিতা আছে এর মধ্যে। এই গ্রন্থের অত্যন্ত সুপঠিত কবিতা হলো ‘মেসেঞ্জারস’, যেটার আবেদন কোমল, শান্ত, কিন্তু পড়তে পড়তে পরিচিত হয়ে উঠি এক অনাবিল অনুভূতির বিরাট আলোড়নের সঙ্গে।

You have only to wait, they will find you.

The geese flying low over the marsh,

glittering in black water.

They find you.

যেন অর্থটা এ রকম যে যাঁর কাব্যপ্রতিভা আছে তাকে বিধিই খুঁজে নেবে সময়মতো। ঠিক যেমন হাঁসেরা জলাভূমি খুঁজে নেয়।

এবার কবিতাটার চূড়ান্ত পঙ্ক্তিগুলো লক্ষ করি:

You have only to let it happen:

that cry—release, release—like the moon

wrenched out of earth and rising

full in its circle of arrows

until they come before you

like dead things, saddled with flesh,

and you above them, wounded and dominant.

(তোমাকে কেবল এটা হতে দিতে হবে / সেই চিৎকারটা―মুক্তি দাও, মুক্তি দাও―ঠিক চাঁদটার মতো / যেন মাটি থেকে ফুঁড়ে ওঠা, আর উঠছে / পূর্ণ আলোর বর্তুলাকার ছটায় / ঠিক তোমার সামনে আসবে / তারা মৃত জীবের মতো, মাংসভর্তি / আর তাদের ওপর তুমি, আহত কিন্তু প্রভাবশালী।)

কীসের থেকে রিলিজ চাইছেন কবি? তাঁর শরীর কি সে পথে বাধা? অথচ হরিণগুলোর মধ্যে সে বাধার বোধটি নেই, তাই যেন কবি তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত: ‘And the deer― / how beautiful they are, / as though their bodies did not impede them.’

গ্লুকের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ Descending Figure (১৯৮০) বিধৃত করছে গ্লুকের এক বোনের মৃত্যু, যার মৃত্যু গ্লুকের জন্মের আগে হয়েছিল। বইয়ের নামশীর্ষক কবিতাটির তৃতীয় কবিতাটির নাম: ‘For My Sister.’ বলছেন: ‘Far away my sister is moving in her crib. / The dead ones are like that, / always the last to quiet.’ (বহু দূরে আমার বোন দোলনার মধ্যে নড়ছে / মৃতেরা ঐরকমেরই / সবসময় সবশেষে নিশ্চুপ হয়।)

তাঁর মৃতা বোনের কথাতো বললাম; এবং শুরুতে যে ‘মেমোয়ার’ কবিতা থেকে গ্লুকের ভাষা সম্পর্কে চিন্তা নিয়ে উদ্ধৃতি করেছিলাম যে তিনি বলেছিলেন যে ‘A few words were all I needed: / nourish, sustain, attack,’ সে কবিতাটিতে তাঁর নিজের জীবন ছায়া ফেলেছে বৈকি। ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন একটি ইহুদি পরিবারে কবির জন্ম (I was born cautious, under the sign of Taurus. Õ . . . ÔI had a philosophy of love, a philosophy / of religion, both based on / early experience within a family’), নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে বেড়ে ওঠা (‘I grew up on an island, prosperous, / in the second half of the twentieth century, ’ দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় নিরাপদ ছিল আমেরিকা পার্ল হারবারে জাপানের আঘাতের আগে পর্যন্ত (‘the shadow of the Holocaust / hardly touched us.’)

কিন্তু তাঁর মৃতা বোন নিশ্চুপ হয়ে গেলেও গ্লুকের অতীত নিশ্চুপ হয়ে থাকবে না। গ্লুকের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ Ararat (১৯৯০) কাব্যগ্রন্থে ফুটে উঠেছে গ্লুকের পরিবর্তনের জন্য আকাক্সক্ষা। এটি তাঁর পিতার মৃত্যুর ঠিক পরপর প্রকাশিত, সে জন্য অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলোতে একটি আন্তরিক মনোবেদনার ছাপ আছে। এই গ্রন্থের ‘The Untrustworthy SpeakerÕকবিতাটি অস্তিত্ব থেকে সৃষ্ট একটি দর্শনের কথা যেন বলে। মানুষ অনন্যোপায়, তাঁকে বাঁচতে হয় অবস্থাভেদে কাঠের টুকরোর মতো, একখণ্ড পাথরের মতো, কেননা যখন একটি জীবন্ত আত্মা আহত হয়, তার সবকিছু বদলে যায়: ‘when a living thing is hurt like that, / in its  deepest workings, / all function is altered.’ সে জন্য কবিকে আস্থায় আনা অসম্ভব, কারণ তাঁর অনুভূতি সৃজিত হচ্ছে শুধূ শরীরজাত কষ্ট নয়, মনোজগতের কষ্ট থেকেও : ‘That’s why I’m not to be trusted. / Because a wound to the heart / is also a wound to the mind.’

Ararat–এর ভাষাভঙ্গিমা কিছুটা কথকীয়, কিন্তু সে তুলনায় তাঁর ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ, The Wild Iris (১৯৯২),যেটার জন্য আগেই বলেছি তিনি পুলিটজার পুরস্কার পেয়েছিলেন, সে কাব্যগ্রন্থটি চূড়ান্তভাবে প্রতীকী। এই কাব্যগন্থের সঙ্গে ইয়েটসের ডরহফ অসড়হম ঃযব জববফং-এর তুলনা এ জন্য চলে যে এখানেও ছাড়া ছাড়া বাক্যে জোর উচ্চারিত হচ্ছে শোক এবং প্রার্থনা: যেমন বাগানের ফুলদল তাদের মালিকে লক্ষ করে কথা বলছে, কবি সৃষ্টিকর্তাকে উদ্দেশ করে কথা বলছেন, এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কবিতাগুলো একে অপরকে উদ্দেশ করে কথা বলছে―তার ফলে হলো কী, একটি নিজস্ব জগৎ তৈরি হয়ে গেল, যেটি একাধারে কাব্যিক উপাদানে ভরপুর হয়েও সিক্ত হয়েছে গভীর মানবিক আবেগে। এই গ্রন্থে মোট তিনটি স্বরের সংযোজন দেখতে পাই: ঈশ্বর, কবি নিজে, এবং বাগানের ফুলগুলো। আর কবিতাগুলিকে দু’টো অংশে ভাগ করা হয়েছে―‘মাটিনস’ (বা সকাল) অংশে সাতটি এবং ‘ভেসপারস’ বা সান্ধ্য অংশে দশটি কবিতা। অর্থাৎ দিন ও রাত্রির একটি সম্মিলনের আভাসে সিক্ত কবিতাগুলো। কবিতাগুলোতে আরাধনার ভাব প্রবল, প্রবল ইশ^রচেতনা, যে জন্য গ্লুককে আস্তিক কবি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। যেমন, আগেই উদ্ধৃত করেছি ‘The Doorway‘ কবিতা থেকে যেখানে কবি বলছেন, ‘At the end of my suffering / there was a door.’ এবং আরেকটি কবিতায় ঈশ্বরের সঙ্গে তাঁর বিবাদ নাটকীয় সংলাপের মধ্যে উপস্থিত হয়। ঈশ্বর কবিকে উদ্দেশ করে বলছেন, আমিতো তোমাকে বিশিষ্ট হবার জন্য বানাইনি, তা হলেতো আমিই সীমাবদ্ধ হয়ে যাব: ‘You were not intended to be unique . . . . Why would I make you if I meant / to limit myself?’

তারপর আসছে ঈশ^রের দিক থেকে কবিকে সান্ত্বনা দেবার প্রয়াস। ঈশ^র বলছেন, দেখছোনা ফুলগুলো কীভাবে দলিত হচ্ছে, মৃত্যু এর চেয়ে বেশি কিছু না, কাজেই মৃত্যুকে ভয় পেও না। এটা যে তোমার শাস্তি সেটা তোমাকে শেখাতে আমি কতবার আমার সৃষ্টি ধ্বংস করব? শুধু একটি ইঙ্গিতে আমি তোমাকে সময়ের মধ্যে এবং স্বর্গের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছি।

If what you fear in death

is punishment beyond this, you need not

fear death:

how many times must I destroy my own creation

to teach you

this is your punishment:

with one gesture I established you

in time and in paradise.

গ্লুকের কবিতার মেজাজের সঙ্গে সিলভিয়া প্লাথের কবিতার ভাবযোজনা আবিষ্কার করা খুব সহজ। দু’জনেই প্রায় রঞ্জনরশ্মিমণ্ডিত চোখ দিয়ে জীবনের নগ্ন দিকগুলো প্রত্যক্ষ করেছেন। কিন্তু যেখানে প্লাথের চিন্তার ঘূর্ণি হচ্ছে বিবমিষাময়, আত্মহত্যাধর্মী, গ্লুকের নিজের আত্মদর্শনে ফুটে ওঠে কিন্তু বাঁচার তাগিদ। কবি রবিনসন জেফার্সের মতোই তাঁর কবিতায় একটি আধ্যাত্মিক চেতনা অনুরণিত হয়। তাই তাঁর অস্তি¡তবাদিতা মনোবৈকল্যের পরিবর্তে মানবিক অঙ্গীকারের পরিচায়ক।  এই গ্রন্থেরই ‘Lamium’ শীর্ষক কবিতাটি ভালো একটি উদাহরণ। তিনি লিখছেন: ‘This is how you live when you have a cold heart.’ (এটা হলো তুমি কীভাবে জীবন যাপন কর, যখন তোমার হৃদয় থাকে শীতল।) আরেকটু এগিয়ে, ‘Harvest’ কবিতায় বলছেন: ‘The earth is like a mirror: / calm meeting calm, detachment meeting detachment,’ (পৃথিবীটা আয়নার মতো / প্রশান্তি প্রশান্তিকে আনে / সম্পর্কহীনতা সম্পর্কহীনতা আনে।) এবং তারপর বলছেন:

Long ago, I was wounded.

I learned

to exist, in reaction,

out of touch

with the world: I’ll tell you

what I meant to be—

a device that listened.

Not inert: still.

A piece of wood. A stone

(অনেক আগে, আমি আহত হয়েছিলাম / আমি শিখলাম / বেঁচে থাকতে, প্রতিক্রিয়াস্বরূপ / এই পৃথিবীর / সংস্পর্শ ছাড়া: আমি তোমাকে বলব / আমি কী হতে চেয়েছিলাম―/ একটি যন্ত্র যেটি শোনে। / স্থানু নয়: স্থির। / একটি কাঠের টুকরো। একটি পাথর।)

The Wild Iris-এর অস্তিত্ববাদের সঙ্গে এক ধরনের বিষাদমগ্নতা যেন ছড়িয়ে গেল পরবর্তী কাব্যগ্রন্থে, Meadowlands  (১৯৯৬), যে কাব্যগ্রন্থটিতে মিশেল সুরের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। একটি সুর হলো―শব্দগুলো নিজেরাই নিজেদের মধ্যে সংস্থিত থাকবে, অন্য কিছু নির্দেশ করবে না। লাল গোলাপটি কেবল লাল গোলাপই থাকবে, এটা অন্য কোন কিছু নির্দেশ করবে না: ‘resemble / nothing else.’ কবি আরও অনুধাবন করেন যে কোন কিছুর সঙ্গে তুল্য না হলে সেটিকে বারবার পুনরুক্তির মধ্যে রাখতে হবে। সেটি কীভাবে সম্ভব? তখন কিন্তু কবি চমৎকার একটি চিত্রকল্প তৈরি করলেন: ‘the shadowy heart.’ বলছেন, ‘the shadowy heart, at / earth level pulsing.’ গোলাপটি ভূমিলগ্ন হয়ে রহস্যমণ্ডিত হৃদয়ের মতো দুলছে। তুলনারহিত করতে গিয়ে তুলনা এসে গেল, এটিই গ্লুকের কবিতা পাঠ করার মজা।

Meadowlands-এ কবি তাঁর স্বামীর বিপরীত কণ্ঠের উপস্থিতি দেখাচ্ছেন: ‘রেইনি মর্নিং’ শীর্ষক কবিতায় বলছেন, ‘You don’t love the world,’ যার ‘tame spiritual themes, / autumn, loss, darkness, etc’ হচ্ছে বিড়ালের মৃত পাখি শিকারের দুঃখজনক পছন্দের মতো: the cat’s pathetic / preference for hunting dead birds.’ বন্ধুবিরহ উন্মোচিত হয়েছে ‘The Parable of the Gift’ কবিতায়। কবি ভুলবশত একটি চারাকে পা দিয়ে দলিত করেছিলেন, মনে করেছিলেন যে ঐটা প্রকৃতিরই অনাবশ্যক অংশ, কিন্তু যখন বুঝতে পারলেন, দেখলেন যে এটা বিদায়কালীন সময়ে এক বন্ধুর দেওয়া প্রীতি উপহার:

so much, so much to celebrate

tonight, as though she were saying

here is the world, that should be

enough to make you happy.

মানুষ কীসে সুখি হয়? যে বন্ধু চলে গেছে তার দেওয়া একটি বাগানের চারা স্মৃতিতে থাকলে? পুরো Meadowlands-এর সংশয় হলো এ জায়গায় যে চারাটি একান্তই কি প্রকৃতির অংশ বলে প্রশংসিত হবে, নাকি সেটির মূল্য তখনই নির্ধারিত হবে যখন সেটি বন্ধুবিরহের যোগাযোগের সেতুর প্রতীক হবে? ‘Nostos’ শীর্ষক অত্যন্ত চমৎকার কবিতায় এই সংশয়কে মূল থিমে পরিণত করে কবি বলছেন, শিশুকাল থেকে যে আপেল গাছটি তার প্রতি জন্মদিনে ফলবতী হয়েছিল, সেটি কালক্রমে প্রতীকে পরিণত হয়ে কবির দেখা সকল আপেল গাছকেই তার জন্মদিনের শুভাশীষ বহনকারী হয়ে গেল। বিকল্প আপেল গাছ নিয়ে বলছেন: ‘Substitution / of the immutable / for the shifting, the evolving.’ (বিকল্প / অপরিবর্তিত জিনিষটির জন্য / যেটা হচ্ছে তার স্থানান্তরের জন্য।) তারপর একটা চমৎকার পংক্তি আসছে: ‘As one expects of a lyric poet.’ কী আসলে চাওয়া আমাদের একজন লিরিক কবির কাছে? আগে বলেছি, ‘Rainy Morning’ কবিতায় কবি নিজেকে ভর্ৎসনা করেছিলেন অসাড় অধ্যাত্ম বিষয় নিয়ে কবিতা লেখার জন্য: ‘tame spiritual themes,’ কিন্তু এখানে কবি একটি প্রশ্নের শেষে পৌঁছাতে চান: ‘As one expects of a lyric poet.’ এই গ্রন্থে ‘Telemachus Dilemma’ কবিতাটি গ্রিক পুরাণের টেলিমেকাসের গল্প। কিন্তু এখানে গ্লুক দেখাচ্ছেন অডিসিউস এবং পেনিলোপির মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে যায়, আর তাদের সন্তান টেলিমেকাস আধুনিক একজন ইচড়েপাকা স্কুল ছাত্রের মতো খুব স্মার্টলি তার পিতামাতা সম্পর্কে বলে আমি তাদেরকে পিতামাতা হিসেবে দেখি, আবার পরস্পরের বিরোধী শক্তি হিসেবেও দেখি: ‘hey are my parents, consequently / I see them together, / sometimes inclining to / husband and wife, other times / to opposing forces’

২০০৯ সালে প্রকাশিত কাব্যগন্থ অ A Village Life শীর্ষক কবিতায় প্রকৃতি কাব্যপ্রাণ হয়ে ঢেউয়ের দোলা দিচ্ছে। গ্লুক কখনও রোম্যান্টিক কবিদের মতো প্রকৃতিকে ঐশ^রিক বন্দনায় আবৃত করেন না, কিন্তু প্রকৃতি তাঁর কাছে নিউ ক্রিটিসিজমের ধারণা মোতাবেক নিছক বিশেষ্যসর্বস্ব তালিকাও নয়, বরঞ্চ প্রকৃতি যেন প্রাচুর্যের একটি বিরাট সম্মোহন। কবির কণ্ঠে শুনি:

The moon is full. A strange sound

comes from the field—may be the wind.

But for the mice it’s a night like any summer night.

Fruit and grain: a time of abundance.

Nobody dies, nobody goes hungry.

No sound except the roar of the wheat.

(পূর্ণচন্দ্র। একটি অজানা শব্দ / ভেসে আসছে মাঠ থেকে―হয়তো বাতাস। / কিন্তু ইঁদুরদের জন্য এটি যে কোন গ্রীষ্মের রাত / ফলাদি এবং শষ্য: একটি সময় প্রাচুর্যের। / কেউ মরছে না, কেউ ক্ষুধায় নেই। / গমক্ষেতের গর্জন ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।)

এই কাব্যগ্রন্থে একটা সতেজ মিষ্টি ভাব কবিতাগুলোর প্রাণ, সঙ্গে সঙ্গে এও লক্ষ্যণীয় যে কবি যেন এক মহাসত্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন―সেটি কী? সেটি হলো মৃত্যুর মতো অবধারিত সত্যকে মেনে নেওয়া। তাঁর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ Averno-তে ‘October ‘ শীর্ষক কবিতায় বলছেন: ‘You will not be spared, nor will what you love be spared, ’ (তুমিও ছাড় পাবে না, তুমি যেটা ভালোবাসো সেটাও ছাড় পাবে না।) এই কবিতারই প্রথম দিকে লিখেছেন, ‘death cannot harm me / more than you have harmed me, / my beloved life.’ একটা আশ্চর্য পর্যবেক্ষণ, জীবন যে কষ্ট দেয়, মৃত্যুর কষ্ট যেন তার চেয়ে হালকা। আশ্চর্য বললেও কথাটা আসলে পুরনো, কিন্তু গ্লুকের অসাধারণত্ব এখানে যে সহজ কথাও তাঁর কবিতায় ঐন্দ্রজালিক প্রভা নেয়।

আ ভিলিজ লাইফ কাব্যগ্রন্থটি প্যাস্টোর‌্যাল হয়েও প্যাস্টোর‌্যাল নয়। প্যাস্টোর‌্যাল সাহিত্য পশ্চিমা সাহিত্যের বিরাট একটি অঙ্গন হলেও, তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘সহজতা একটি গুণ’―এই মর্মে একটি প্রশিক্ষণের সাহিত্যিক ফর্মুলা বের করা, যেমন শহুরেরা কিছুদিন গ্রামাঞ্চলে গিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে বা প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের ভালো মানুষ হিসেবে তৈরি করে আবার শহরে ফিরে যাবে। কিন্তু গ্লুকের প্রকৃতি বন্দনায় আছে সে চিরশোক যে সব কিছুকে ছেড়ে চলে যেতে হবে একদিন। রবীন্দ্রনাথের জীবনাদর্শের মূল সুরের সঙ্গে খানিকটা মেলে: যখন আমার পায়ের চিহ্ন এই ঘাটে পড়বে না, তখনও সব কিছু আগের মতোই চলবে: ‘চরবে গরু, খেলবে রাখাল’ ইত্যাদি। আর গ্লুক লিখছেন: ‘At dusk you sit by the window. Wherever you live, / you can see the fields, the river, realities, / on which you cannot impose yourself.’ অন হুইচ য়ু ক্যাননট ইমপোজ ইয়োরসেল্ফ―কোথাও তুমি নিজেকে গাঁথতে বা আরোপিত করতে পারবে না। চিরকালীন কথা, কিন্তু গ্লুকের কবিতার ফ্রেমের মধ্য দিয়ে পড়লে মনে হয় নতুন কথা, আর কখনও শুনিনি আগে। এই স্থানিক স্বল্পবাস আরও একটি চমৎকার চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি ফুটিয়ে তুলেছেন ‘Pastoral’ শীর্ষক কবিতায়:

you lay down in the grass.

When you get up again, you could see for a moment where you’d been,

The grass was sick there, flattened out

into the shape of a body. When you looked back later,

it was as though you’d never been there at all.

(তুমি ঘাসের ওপর শুয়েছিলে। / যখন উঠলে আবার, তুমি কিছুটা দেখলে এক মুহূর্তের জন্য কোথায় তুমি শুয়েছিলে, / সেখানে ঘাস মড়া, মাটিতে চেপ্টে থাকা / ঠিক তোমার শরীরের আকার নিয়ে। পরে তুমি যখন ফিরে তাকালে / দেখলে যেন তুমি কোনদিন ওই জায়গায় শোও নি।)

এই অত্যাশ্চর্য জীবন-বীক্ষণ সমসাময়িক অন্য কবিদের মধ্যে থাকলেও গ্লুকের বর্ণনার মধ্যে যেমন ঘাসপাতার মতো রোদন জড়িয়ে থাকে, তার তুলনা হয় না। যখন তুমি পেছনে ফিরে তাকালে দেখলে যে তোমার শরীরের চাপ আর ঘাসে লেগে নেই, যেন তুমি কোনোদিন সেখানে শোওনি।

এই কবিতার বইয়ে দ্য ওয়াইল্ড আইরিস-এর মতো কেঁচো এবং বাদুড় কথক হিসেবে উপস্থিত। কেঁচো যখন মানুষের জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে কথা বলে তার ইফেক্ট হয় অপূর্ব। ‘ঊধৎঃযড়িৎস’ শীর্ষক কবিতায় কেঁচোটি বলছে, মানুষ মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সে মাটির ভিতর ঢুকতে চাইছে না, বরঞ্চ সে বড়াই করে বলছে যে সে সব জটিল জিনিষের ভিতরে খনন করতে পারে, অথচ নিজের মৃত্যুর ব্যাপারে সে খননে আগ্রহী নয়:

Mortal standing on top of the earth, refusing

to enter the earth: you tell yourself

you are able to see deeply

the conflicts of which you are made but, facing death

you will not dig deeply. 

তাঁর পরের কাব্যগ্রন্থ Vita Nova-তে পাচ্ছি এক জোড়া পুরাণের গল্প। একটি হলো, দিদো এবং এনিয়াসের এবং আরেকটি হলো অর্ফিউস এবং ইউরিডিসের। তবে এই দু’টি প্রণয়োপাখ্যানের প্রতি কবির অভিব্যক্তি নির্দিষ্ট নয়। একবার মনে হয় গ্লুক কখনও দিদো, কখনো ইউরিডিস, কিন্তু অর্ফিউসের আত্মাসক্তি বা নার্সিসিজমকে কটাক্ষ করার সময় মনে হয় কবি নিজেকেই অভিসম্পাত দিচ্ছেন তাঁর প্রণয়ী তাঁকে ছেড়ে যাবার জন্য: ‘Tell them there is no music like this / without real grief.’ (তাদের বল এইমতো সংগীত / প্রকৃত দুঃখ ছাড়া সৃষ্টি হয় না।) প্রাথমিকভাবে মনে হবে যেন এই গ্রন্থটি কেবল কবির বিবাহবন্ধন ছিন্ন হবার বিষয় নিয়ে গল্প, কিন্তু প্রতিটা কবিতার অন্তর্লীন অর্থ হচ্ছে এই তিক্ত অভিজ্ঞতাকে কবিতার প্রকরণের মধ্যে প্রবিষ্ট করিয়ে প্রাপ্তব্য বিষয়াবলীর একটি স্পষ্ট প্রকাশ দেওয়া: ‘discernible form’ দেওয়া ‘available material’ -কে। ‘জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা’, রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন।

আর বিবাহ-ব্যর্থতা যদি অতীতকালের ঘটনা হয়, কবি কি সেটি ভুলে যাবেন? কী হচ্ছে তা হলে এখানে? যে বিবাহিত জীবনকে তিনি ভেবেছিলেন মহাকালীন সেটি অবসিত হলো সময়ের একটি সূচকে এসে, এবং কবির ব্যক্তিগত জীবনের আলোকে তাঁর ভবিষ্যত হয়ে গেল নেই, আবার বিচ্ছেদটা অতীতের ঘটনা, তাহলে সেটিও হয়ে গেল নেই। কবি তাই কিছুই বুঝতে পারছেন না: ‘And I made no sign of understanding. / For which I was never forgiven. ’ কবির ‘নেভার’টাই হয়ে রইলো ‘ভিটা নোভা’র মূল চারিত্র। ‘নেভার’টাই যেন অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের মধ্যে যোগসূত্র। কারণ, ‘নেভার’ মানে হচ্ছে, ‘নেভার বিয়ন্ড চেইঞ্জ’। তাই ‘Unwritten Law ’ কবিতায় দেখছি কবি তাঁর প্রাক্তন স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ করছেন, কেন না তিনি তাঁর ‘wisdom and cruelty ’ দিয়ে তাঁকে শিখিয়েছেন ভালোবাসার অর্থহীনতা: ‘the meaninglessness of the term.’ অর্থাৎ, বিয়ে শেষ, কিন্তু পরিবর্তনতো শেষ নয়।

অতীত নিয়ে কবি ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ধারণাটা লুইজ গ্লুকের ধারণার সঙ্গে মেলে। বেঞ্জামিন বলেছিলেন অতীতকে অবিকৃতভাবে স্মরণ করার দরকার নেই, দরকার হলো, অতীতের সেই ক্ষণটিকে ধরে আনা যেটার মধ্যে বিপদের একটা বিচ্ছুরণ ছিল। তাই ভিটা নোভা কাব্যগ্রন্থে দেখছি, ‘available material’থেকে কীভাবে কবি আবার নতুন করে বর্তমানের সঙ্গে লগ্নী করে অতীতকে সাজাচ্ছেন। ‘Nest’ শীর্ষক কবিতায় একটি পাখিকে চিত্রকল্প করলেন যে পাখিটি অন্য পাখিরা তাদের নিজ নিজ নীড় বাঁধার শেষে যেটুকু ‘available material’ প্রাঙ্গণে পড়েছিলো সেটুকু থেকে নীড় বাঁধা শুরু করল:

Early spring, late desolation.

The bird circled the bare yard making

efforts to survive

on what remained to it.

It had its task:

to imagine the future.

(আগাম বসন্ত, বিলম্বিত কাতরতা, / পাখিটি খালি উঠোনটি চক্কর দিল / বেঁচে থাকার তাগিদে / যা অবশিষ্ট ছিল তাই দিয়ে। / পাখিটার কাজ পাখিটা করল / ভবিষ্যৎকে কল্পনা করল।)

কবিতাটি বিষয় এবং প্রকরণে সিলভিয়া প্লাথের ‘A Bird came down the Walk ’-এর কাছাকাছি: ‘A Bird came down the Walk―/ He did not know I saw―/ He bit an Angleworm in halves / And ate the fellow raw. ’

বলার অপেক্ষা রাখে না যে পাখির কাজটিই গ্লুক কবি হিসেবে করছেন। আর চমৎকার একটা গতিশীলতা আসে কবিতাটির আরেকটি পংক্তিতে: ‘The place you begin doesn’t determine / the place you end. ’ যেখান থেকে মানুষ যাত্রা শুরু করে, শেষ করে ভিন্ন জায়গায়। ‘The Garment’ শীর্ষক পরের আরেকটি কবিতায় বলছেন, ‘when hope was returned to me / it was another hope entirely.’ কী চমৎকার অনুধাবন। একইভাবে নয়, অতীত সবসময় নতুনতর অবয়বে হাজির হয়।

তা হলে পূর্বে আলোচিত The Wild Iris গ্রন্থের ‘মেসেঞ্জারস’ শীর্ষক কবিতা এবং Meadowlands-এর ‘নোস্টস’-এর সঙ্গে Vita Nova-র পার্থক্য হলো আগের কবিতাগুলিতে কবি যেন একটা উপসংহারে পৌঁছাতে চেয়েছেন, বলতে চেয়েছেন কোন একটি চূড়ান্ত কথা, সেজন্যই তাঁর প্রথমদিক ও মধ্য পর্যায়ের কবিতাগুলির মধ্যে সামনের বা মধ্যম অংশের পঙ্ক্তিগুলোর চেয়ে শেষের পঙ্ক্তিগুলো বেশি আদৃত। কিন্তু Vita Nova থেকে শুরু করে পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোতে লুইজ গ্লুকের পরিণতিপর্বকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে এই কবিতাগুলিতে মাঝের অংশগুলো শেষের অংশগুলির চেয়ে অধিকতর কাব্যময়। এই ক্ষেত্রে অতীতকে নতুন আঙ্গিকে নিয়োজিত করার যে কৌশল তিনি রপ্ত করেছেন তারই প্রভাবে দেখি এই প্রবন্ধের সূচনাতে ‘পুনরুক্তি’ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছিলাম যে গ্লুক পুনরুক্তিকে আক্ষরিক অর্থে নয়, কিন্তু ভাবগত অর্থে প্রয়োগ করেছেন, তারই কিছু উদাহরণ এখন দেয়া যায়। ‘ভিটা নোভা’ শীর্ষক কবিতায় লিখছেন যে ‘Crucial / sounds or gestures’ আমাদেরকে শিশুকালে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেগুলিকে পুনরুক্তি করতে গিয়ে নতুন আঙ্গিকে সাজানোর ফল দাঁড়ায় এরকম: দেখুন ‘স্প্রিং’ শব্দটি নতুন ব্যঞ্জনায় কীরকম বাক্সময় হয়ে ওঠে:

Surely spring has been returned to me, this time

not as a lover but a messenger of death, yet

it is still spring, it is still meant tenderly.

(অবশ্যই আমার কাছে বসন্ত ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং এবার

প্রেমিক হিসেবে নয়, কিন্তু মৃত্যুদূত হিসেবে, তথাপি

এটিও বসন্ত, তাই অর্থটাই মায়াভরা।)

‘Mock Orange’ শীর্ষক কবিতায় পুনরুক্তি আসছে এভাবে:

It is not the moon, I tell you.

It is these flowers

. . .

I hate them

I hate them as I hate sex. (এটি আলোচনার অন্য অংশে অনূদিত।)

Vita Nova-র শেষের আগের কবিতাটি খুবই মনোহর পুনরুক্তিতে। এটির নাম “লেমেন্ট” এবং কবি বেদনাবিধুর স্বরে বলছেন:

My love is dying; parting has started again.

And through the veils of the willows

sunlight rising and glowing,

not the light we knew.

And the birds are singing again, even the mourning dove.

the willows are singing again.

(আমার প্রেম মরে যাচ্ছে; বিচ্ছেদ আবার শুরু হয়েছে। / উইলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে দেখছি / সূর্যালোক উজ্জ্বল বেড়ে উঠছে, / সে আলো নয় যেটা আমরা চিনি। / এবং পাখিরা আবার গান গাইছে, এমনকি শোকাতুর ঘুঘুও / উইলো গাছেরা আবার গান গাইছে।)

‘Ah, I have sung this song,’ স্পষ্টতই মৃত্যুর পৌনপুনিকতা নিয়ে বলছে, কিন্তু মৃত্যুর পরেও যে উত্তরণ আছে: ‘the willows are singing again..’

‘Baskets’ শীর্ষক কবিতাটি ৪টি অংশে বিধৃত, কিন্তু সম্ভবত সবচেয়ে বেশি উত্তীর্ণ কবিতা। এবং এই কবিতাটা পড়তে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতাটার কথা মনে না এসে উপায় নেই। গ্লুক যেন ছোট ছোট ছবি এঁকে এঁকে তাঁর জীবনের সোনার তরী যেন ‘রাশি রাশি ভারা ভারা’ ধানে ভরে ফেলেছেন। একজন বৃদ্ধা (হয়তো কবি নিজেই) বাজারের ঝুড়ি নিয়ে গেছেন কেনাকাটার জন্য। তিনি লেটুস পাতার গোড়া বেছে বেছে পছন্দেরগুলি ঝুড়িতে রাখলেন, যেগুলিতে এখনও মাটির দানা লেগে আছে। তারপরের ছবি: বাচ্চার গ্রামটির কেন্দ্রে খেলছে, একটি কুকুর তাদের সঙ্গ দিচ্ছে। তারপরের ছবি: ঈশ^রের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা। সূর্য উঠেছে, তার তাপে উষ্ণ হয়ে উঠেছে পৃথিবী, কিন্তু সূর্য ডুবে গেলেও তার রয়ে যাওয়া তাপে still heats the pavements. / That’s why, on earth / so much life’s sprung up.তাতেই জীবনের উদ্বোধন হয়ে যাচ্ছে পথে-ঘাটে। এবং সব শেষের অংশে কবি নিজেই বলছেন এই যে বৃদ্ধা সওদা করতে বাজারে এসেছেন, সেটাই চলমান জীবনের সৌন্দর্য।

I ask you, how much beauty / can a person bear? It is / heavier than ugliness even the burden / of emptiness is nothing beside it.

(আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করি, একটা লোক / কতটা সৌন্দর্য বহন করতে পারে? এটি / কুৎসিতের চেয়ে ভারী, এমন কি হতাশার বোঝাও এটার পাশে কিছুই না।)

কিন্তু জীবনের সৌন্দর্য উপচে পড়া, হয়তো বৃদ্ধা মহিলার ঝুড়িতে সব সদাইয়ে জায়গা হবে না, কিন্তু তা’তে কী, ’আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি’।

I am not a strong woman. It isn’t easy

to want so much, to walk

with such a heavy basket, either

bent reed, or willow.

(আমি শক্ত বুড়ি নই। এটা সহজ নয় / এত ভরতে চাওয়া, হেঁটে যাওয়া / এত ভারী ঝুড়ি নিয়ে, হোক না / বাঁকানে লতি, অথবা উইলো শাক।)

রবীন্দ্রনাথের সোনার তরীই হচ্ছে লুইজ গ্লুকের ‘বাসকেটস’।

৩.

এই উত্তরণের আশার ওপর জোর দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। কিন্তু তার আগে ২০০৫ সালে জোয়ান ফেইট দিয়েলকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ অনুবাদ করে দিচ্ছি, যাতে গ্লুকের চিন্তাধারার মৌলিক পরিবর্তন―নেতিবাচকতা থেকে ইতিবাচকতা―স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছে। সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম: ঙহ খড়ঁরংব এষঁপশ: ঈযধহমব ডযধঃ ণড়ঁ ঝবব.

‘আমি যত বড় হচ্ছি, ততই সাধারণ জীবনে আমি আনন্দ খুঁজে পাচ্ছি। অস্থির আনন্দ, কিন্তু প্রবল। আমার যে নিখুঁত হবার মনোবাঞ্ছা ছিল তার প্রকোপও খানিকটা হ্রাস পেয়েছে। তার জায়গায় এসেছে আরো পূর্ণতর সন্তুষ্টি আর কৃতজ্ঞতাবোধ। প্রাত্যহিক জীবন এখন আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়, এবং আমি যখন সেরকম বোধ করি না তখন সেই নিখুঁত হবার অপচেষ্টা আমাকে ঘায়েল করতে থাকে। সত্যি বলছি, আমি কোনদিন ভাবিনি যে আমি এত লম্বা সময় টিকে থাকব। এবং আরও অল্পবয়েসী যখন ছিলাম তখন আমার মনে হতো আমি আংশিক পেয়ে কখনও তৃপ্ত হব না, এবং মনে করতাম কোন কিছুতে তৃপ্ত হওয়া মানেই হচ্ছে আমার মৃত্যু হওয়া। মনে করেছিলাম, জীবনের সাধারণ ব্যাপারগুলো হচ্ছে এক মহাপ্রস্তুতির আয়োজন উপলক্ষে প্রদত্ত। কিন্তু আসলে এই সাধারণত্বে লুকিয়ে আছে জীবনযন্ত্রণা উপভোগ করার অমিত শক্তি। ’

গ্লুকের যে কোন কবিতা পড়লে মনে শান্তি আসে এ জন্য যে এত সংক্ষিপ্ত বলার মধ্যে এত অনুভূতি এবং এত চিত্তচাঞ্চল্য কীভাবে ধারণ করেন তিনি!

বিশেষ কথা :

গ্লুকের কাব্য থেকে উদ্ধৃত কবিতাংশগুলো আমি কখনও অসরাসরি এবং কখনও সরাসরি অনুবাদ করেছি। আর প্রবন্ধটি লিখেছি গ্লুককে বাংলা ভাষাভাষি পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য, তাঁর ওপর কোনো তাত্ত্বিক প্রবন্ধ লেখার জন্য নয়। আর লিখতে গিয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধের সাহায্য নিই। প্রবন্ধগুলি সংগ্রহ করি জে-স্টোর.কম থেকে। গ্লুকের ওপর প্রায় হাজার দেড়েক প্রবন্ধ সেখানে আছে। যদিও আমি তাঁর সম্পর্কে আগে শুনিইনি, অথচ তাঁর ওপর কতটা লেখাপড়া এর মধ্যে হয়ে গেছে! আমি যে প্রবন্ধগুলির সাহায্য নিয়েছি সেগুলি যথাক্রমে হচ্ছে:

1. Elizabeth Arnold, ‘Fact and Feeling: Strategies toward a Disciplined Lyric,’ The Kenyon Review, Summer 2013, New Series, Vol. 35. No. 3, pp. 129-144.

2. Reena Sastri, ‘Louise Gluck’s Twenty-First- Century Lyric, ‘ PMLA, March 2014, Vol. 129, No. 2, pp. 188-203.

3. Katie Piper Greulich, ‘Revising the Pastoral, Revising the I/Eye: The Pastoral Speaker in Louise Gluck’s ‘A Village Life,’ CEA Critic, November 2013, Vol. 75, No. 3, pp. 250-257.

4. James Longenbach, ‘Louise Gluck’s Nine Lives,’ Southwest Review, 1999, Vol. 84, No. 2, pp. 184-198.

5. Brian Glaser, ‘The Implied Reader and Depressive Experience in Louise Gluck’s ÔThe Wild Iris,’ Amerikastudien / American Studies, 2015, Vol. 60, No. 2/3, pp. 201-213.

6. Henri Cole, ‘Louise Gluck’s ‘Messengers’, ‘ Daedelus, Winter 2014, Vol. 143, No. 1, What Humanists Do, pp. 96-98.

7. William B. Davis, ‘The Apocalyptic Yearnings in Louise Gluck’s ‘The Wild Iris,’ Christianity and Literature, Autumn 2002, Vol. 52, No. 1, pp. 47-56.

8.           David Yezzi, ‘Cassandra at the Evening Window: Louise Gluck’s Dark Visions,’ The Sewanee Review, Winter 2012, Vol. 120, No. 1, pp. 103-117.

(Footnotes)

1 Elizabeth Arnold, “Fact and Feeling: Strategies toward a Disciplined Lyric,” The Kenyon Review, Summer 2013, New Series, Vol. 35, No. 3, p. 129.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares