ভ্রমণ : ওয়াটকিন্স গ্লেইন : কাজী জহিরুল ইসলাম

যাচ্ছি ফিঙ্গার লেইকে। এর আগে মুক্তি বলেছিল আমরা ইথাকায় যাচ্ছি। কোন চুলোয় যাচ্ছি আমার ভালো কোনো ধারণা নেই, এবারের পুরো আয়োজন মুক্তির। কোভিড ১৯-এর লকডাউনের কারণে গৃহবন্দি থাকতে থাকতে সে হাঁপিয়ে উঠেছে, জুন মাস থেকেই যাই যাই করছে, আমি পিছটান দিয়ে আছি বলে আগস্টের শেষ অব্দি গড়াল। মার্চের ১৪ তারিখে আমি জেনেভা থেকে ফিরে এসেছি, যদিও সেটা ছিল দাপ্তরিক ভ্রমণ এবং একা, এরপর আর কোথাও গিয়ে রাত্রিযাপন হয়নি। দীর্ঘদিন এক বিছানায় ঘুমিয়ে আমরা ক্লান্ত হয়ে গেছি। এর মধ্যে মুক্তি নিচতলার গেস্টরুমে বিছানা পেতেছিল, রুমটা সাজানো নিয়ে কিছুদিন সে খুব উত্তেজনার মধ্যে ছিল। নানান কিছু অনলাইনে অর্ডারও করেছে, নতুন একটি টেবিল ল্যাম্প কিনেছে, বিছানার চাদর, লেপ বদলেছে, বালিশে নতুন কভার লাগিয়েছে, পর্দা চেঞ্জ করেছে। প্রতিদিনই ঘরটা আরও অধিক আলোকিত ও আপন হয়ে উঠছিল অথচ গত ছ’বছরে এন-সুইট এ-ঘরটিতে আমরা কখনও ঘুমাইনি। কালে-ভদ্রে অতিথি এলে ঘরটি প্রাণ পায়। বেশ ক’দিন আমরা ওখানে অন্যরকম এক উত্তেজনায় থেকে আবার ওপরে উঠে এসেছি।

সাধারণত আমরা প্রতি দুমাসে একবার বেরিয়ে পড়ি, দুই/আড়াইশ মাইল ড্রাইভ করে কোথাও চলে যাই, এক/দু’রাত কোনো নির্জন প্রকৃতির ভেতর কাটিয়ে আসি। করোনা জীবনকে বেশ স্থবির করে দিয়েছে।

এবারের ট্রিপ নিয়ে মুক্তির ব্যাপক প্রস্তুতি। খুব ভেবেচিন্তে সে কটেজ ভাড়া করেছে। যাতে হোটেলের ভিড় এড়ানো যায়। ফায়ার পিট আছে, এ কথা শুনে নভো ছুটে গেছে ওয়ালমার্টে। স্মোর্স বানাবে। ক্রেকার, চকোলেট আর ম্যাশম্যালো লাগবে। সব জোগাড় করে ফেলেছে। দুই মা মেয়ে আমাকে বারবার তাগাদা দিচ্ছে আমি যেন ভ্রমণ পরিকল্পনায় পূর্ণ মনোযোগ দিই। কিন্তু আমার মন কিছুতেই সায় দিচ্ছে না এই দুঃসময়ে বাইরে কোথাও গিয়ে রাত্রিযাপন করি। কে না কে এর আগে থেকে গেছে, সেই বিছানায় গিয়ে ঘুমাতে হবে! শেষমেশ কাগজ কলম নিয়ে আমাকে বসতেই হলো। তিন দিনের পুরো ইভেন্ট প্লান করে ফেললাম, সেই অনুযায়ী ওরা গেল বাজার করতে।

কোভিড ১৯ সাবধানতার অংশ হিসেবে কটেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, নিজেদের বালিশ নিজেরা নিয়ে আসবে। বালিশ যেহেতু ধোয়া যায় না তাই এই বাড়তি সাবধানতা। চেক-ইনের সময় কারও সাথে দেখা হবে না। অফিসরুমের খোলা বারান্দায় নোটিশ বোর্ড আছে, ওখানে পিনআপ করা একটি খাম থাকবে, তার ভেতরে চাবি এবং অন্যান্য নির্দেশনা।

উইক-এন্ডে কটেজ পাওয়া যায়নি, আড়াই মাস আগে বুকিং দিয়েও পেয়েছে উইক এন্ডে। (বলে রাখি আমাকে না জানিয়েই মুক্তি গোপনে বুকিংটা দিয়ে রেখেছিল।) তার মানে যারাই সাহস করে বেরিয়ে পড়ছে, যাচ্ছে কটেজ, ভিলা টাইপের প্রোপার্টিতে, হোটেলে খুব একটা যাচ্ছে না লোকজন।

বেরুতে বেরুতে দুপুর বারোটা। রাজ্যের সব জিনিসপত্র গোছাতে হয়েছে, গাড়িতে তুলতে হয়েছে। আমরা যে জায়গাটিতে যাচ্ছি তার নাম মন্টুর ফলস, ফিঙ্গার লেইক রিজিয়নে। জিপিএস বলছে পৌনে পাঁচটায় পৌঁছুব কিন্তু আমি জানি ছটার আগে পৌঁছুতে পারব না। পথে থামব, লাঞ্চ করব। দেখতে দেখতে আস্তে আস্তে যাব। আস্তে আস্তে যাব বলে গাড়িতে উঠলেও স্পিডোমিটারের কাঁটা আশি পেরিয়ে যাচ্ছে। বারবার পাশ থেকে মুক্তি এবং পেছন থেকে নভো চিৎকার করে উঠছে। জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজ পেরুলেই নিউজার্সি অঙ্গরাজ্য, তখন আর গাড়ি কথা শোনে না, তরতর করে গতি বেড়ে যায়। নিউজার্সির হাইওয়েগুলো এমন সুপ্রশস্ত, মসৃণ আর ফাঁকা যে চালকের পা আপনাতেই এক্সেলারেটরে চেপে বসে।

হাডসন নদীর ওপর নির্মিত জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজ নিউইয়র্কের ম্যানহাটন এবং নিউজার্সির পোর্ট লি শহর দুটিকে যুক্ত করেছে। ব্রিজটি পেরুতে পেরুতে দুই পাড়ে গড়ে ওঠা পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক ও সভ্য নগরীগুলোর ওপর থেকে চোখ ফেরানোই মুশকিল হয়ে পড়ে। নিচে কেঁপে কেঁপে ওঠা হাডসনের বিশাল জলরাশির নীল সুন্দর তো আছেই। ১৯২১ সালে নিউজার্সি এবং নিউইয়র্ক পোর্ট অথরিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই একটি দানবীয় সেতু নির্মাণের চিন্তা শুরু। ১৯২৭ সালের সেপ্টেম্বরে কাজ শুরু হয় এবং ১৯৩১ সালের ২৪ অক্টোবর সেতুটি উদ্বোধন করা হয়। আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের নামে এর নাম রাখা হয় জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজ। সুইস-আমেরিকান সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ওথমার আম্মান সেতুটির প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই নির্মাণ করেন ভেরাজানো এবং বেয়োন ব্রিজ, সবগুলো সেতুই হাডসন নদীর ওপর নির্মিত।

৪,৭৬০ ফুট লম্বা, ১১৯ ফুট প্রশস্ত দ্বিতল সেতু জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজ। ওপরতলায় ৮টি এবং নিচতলায় ৬টি, মোট ১৪টি লেইন আছে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত মোটরযান পারাপার সেতু। জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজ বছরে সাড়ে দশ কোটি গাড়ি পারাপার করে।

সিদ্ধান্ত নিয়েছি দুই ঘণ্টার আগে থামব না। এরই মধ্যে দেলোয়ার নদীর ওপর নির্মিত সেতু পেরুনোর মধ্য দিয়ে নিউজার্সি পেরিয়ে আমরা পেন্সিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যে ঢুকে পড়েছি। পথে শুধু একবার গ্যাস স্টেশনে থেমেছি ফুয়েল ট্যাংক ভরার জন্য। আশপাশের অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে নিউজার্সিতে এলে ফুয়েল ট্যাংকটা ভরে নিতে কেউই ভুল করে না, কারণ এই রাজ্যে তেলের দাম কম। শুধু তেল না মোটামুটি সব কিছুর দামই এখানে কম, এর প্রধান কারণ এই রাজ্য থেকে কেনা কোনো পণ্যের ওপর রাজ্য সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয় না। নিউইয়র্কে যা পৌনে নয় শতাংশ।

পথে পেরিয়ে এসেছি পোকোনো। এই পথেই আমরা টরন্টো যাই। যতবারই পোকোনো পর্বতাঞ্চলটি পার হই ততবারই নস্টালজিক হয়ে পড়ি। ২০১৫ সালের গ্রীষ্মে ১৫/১৬টি পরিবার মিলে পোকোনোর এক নির্জন গ্রামে গিয়েছিলাম তিন দিনের সফরে। কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সঙ্গীতশিল্পী, পটুয়া, আবৃত্তিকার, শিল্প-সাহিত্যের সব মাধ্যমের মানুষই ছিলেন। খুব আনন্দময় এবং মানসম্মত তিনটি দিন কাটিয়েছিলাম। যে বাড়িটি আমরা ভাড়া নিয়েছি সেটি ছিল লেইকের পাড়ে। শিল্পভ্রমণের এই ভেন্যুটির নাম দিয়েছিলাম দিকশূন্যপুর। ফিরে এসে এই নামে একটি দীর্ঘ কবিতা লিখি। একপাশে অরণ্যের ভেতরে হেঁটে বেড়াচ্ছে নির্ভয় মায়া হরিণের দল, অন্যপাশে শান্ত, স্নিগ্ধ হরিণের চোখের মতো টলমলে আদুরে জল। ওখানে পৌঁছে মোটামুটি সকলেই ঠিক করে ফেলি, এখানেই একটি সামার হাউজ কিনে ফেলতে হবে। বাড়ি ফিরে সকলের আবেগ থিতিয়ে গেলেও আরশাদ মোস্তফা তারু ভাই আর তার স্ত্রী মনা ভাবি একটুও দমে যাননি। সে বছরই তারা পোকোনোতে, লেইকের পাড়ে, একটি বাড়ি কিনে ফেলেন এবং পরের বছর আমাদের দাওয়াত করেন। পুরো একটি দিন আমরা তারু ভাইয়ের সেই নয়নাভিরাম বাড়িটিতে কাটাই। তিনি একজন আর্টিস্ট, সেই বাড়িতে পৃথিবীর বড় বড় অনেক আর্টিস্ট এসেছেন, থেকেছেন এবং ছবি এঁকেছেন। অনেক অসমাপ্ত, অর্ধসমাপ্ত ছবি দেখেছি স্টুডিওতে যত্নে রাখা আছে। কালিদাস কর্মকারের বেশ কিছু অসমাপ্ত কাজও দেখেছি। তারু ভাই জানিয়েছিলেন এখানে বসেই দাদা এই ছবিগুলো এঁকেছেন। এ ছাড়া কামরুল হাসান, রফিকুন নবী, এস এম সুলতান, কাইয়ুম চৌধুরী ও অলক রায়ের মতো বিখ্যাত পটুয়াদের ছবিও রয়েছে। এইসব বিখ্যাত পটুয়াদের ছবি দেখে, জলাশয়ের পাড়ে পাড়ে হেঁটে বেরিয়ে একটি পুরো দিন কাটিয়েছিলাম।

খাওয়ার জন্য যুৎসই একটি রেস্টুরেন্ট খুঁজছি। কোভিডের কারণে এখন আমাদের মুখোশ পরে চলতে হয়। মুখোশ ছাড়া কোনো রেস্টুরেন্ট, দোকান-পাটে ঢোকা পুরোপুরি নিষেধ। জল খুব সহজে মুখোশ পরতে চায় না। কোথায় ঢুকতে গেলে আমাদের অনেকক্ষণ আগে থেকেই ওকে মুখোশ পরার জন্য প্রস্তুত করতে হয়। এই সময়ে বেড়াতে যাওয়ার একটি বড় অসুবিধা হলো, অনেক রেস্টুরেন্টই এখনও ডাইন-ইন অপশন চালু করেনি, টেক-অ্যাওয়ে, ড্রাইভ-থ্রু  অথবা অনলাইনে অর্ডার, এই তিন অপশনই ভরসা। ডাইন-ইন না থাকার মানে হচ্ছে বাথরুম ব্যবহার করার সুযোগ নেই।  

অনলাইনে গিয়ে মুক্তি অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট খুঁজলো, কোথাও ডাইন-ইন অপশন নেই। খাবার কিনে এনে গাড়িতে বসে খেয়ে নিতে পারি কিন্তু বাথরুম ব্যবহার তো করতেই হবে। বাংলাদেশে হলে জঙ্গলে যাওয়া যেত। এদেশে জঙ্গলে ওই কাজ করলে বেশ বড়সড় ফাইন দিতে হয়।

ম্যাকডোনাল্ডসগুলোতে ডাইন-ইন অপশন আছে কিন্তু আমাদের পছন্দের তালিকায় ম্যাক একেবারে নিচে। কিন্তু এই দুর্দিনে, যাকে আমরা নতুন নাম দিয়েছি নিউ নরমাল, অনেক পছন্দ-অপছন্দকেই আবার ঢেলে সাজাতে হচ্ছে।

বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে মুক্তি বাচ্চাদের নিয়ে কোনার একটি টেবিলে বসেছে। আমি লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার কিনে আনি। বাচ্চাদের জন্য চিকেন বার্গার, আমাদের জন্য ফিশ। মাছের বার্গার দেখে মুক্তির মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। কামড় দিয়েই মেজাজের ঝাঁঝ ফুটিয়ে তোলে মুখের মানচিত্রে।

তোমাকে না কতবার বলেছি, ম্যাক থেকে বিফ বার্গার ছাড়া আর অন্য কিছু নেবে না। এসব মুখে দেওয়া যায়?

আসলে যতটা না আমার ওপর তার চেয়ে বেশি রাগ ওর ম্যাকের ওপর। কেন যে এখানে আসতে হলো? নিউ নরমালে ম্যাকডোনাল্ডসও বদলে গেছে। সোডার ডিস্পেন্সার উন্মুক্ত নেই আর। ট্রান্সপারেন্ট পর্দা দিয়ে ঘেরা। ভেতরে একজন কর্মী, রিসিট দেখালে সোডা ঢেলে দিচ্ছে, হিসেব করে সস, স্ট্র, সল্ট, সুগারের প্যাকেট দিচ্ছে, আগে এসব মুক্ত ছিল, যার যত খুশি নিত। এই নিয়ন্ত্রণটা আমার পছন্দ হয়েছে। আগে দেখতাম লোকেরা প্রচুর সস, ন্যাপকিন নষ্ট করছে, এই অপচয়টা রোধ করা যাচ্ছে এখন। করোনা আমাদের আরও অনেক ধরনের অপচয়ের হাত থেকেই বাঁচিয়েছে।

পোকোনোর আশপাশে বেশ কিছু জায়গার নেইম প্লেট দেখে আমরা আলোচনা করছিলাম সব দেশেই এ টাইপের নাম আছে। এখানকার জায়গাগুলোর নাম হচ্ছে ফিশকিল, ক্যাটসকিল, প্লেটকিল, ওয়ালকিল আরও কত কত কিল। তখনই মনে পড়ল আমাদের চিলমারি, বোয়ালমারি, ভেড়ামারা, ঘোড়ামারা, মাথাভাঙ্গা, হাঁটুভাঙ্গা, ইত্যাদি জায়গার কথা।

জায়গার নামে এত কিল কেন? এ নিয়ে আমেরিকানদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এর জবাবও ওরা তৈরি করে রেখেছে।

creek. The word comes from the Middle Dutch kille, meaning ÔriverbedÕ or Ôwater channelÕ. The term is used in areas of Dutch influence in the Delaware and Hudson Valleys and other areas of the former New Netherland colony of Dutch America to describe a strait, river, or arm of the sea.

১৮২০ থেকে ১৯০০, এই আশি বছরে ৩ লাখ ৪০ হাজার ডাচ অধিবাসী নেদারল্যান্ডস থেকে আমেরিকায় মাইগ্রেট করে। ওরা মূলত ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যেই বসতি স্থাপন করে। নিউইয়র্ক এবং পেন্সিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের হাডসন ভ্যালি এবং দেলোয়ার নদীর অববাহিকায় বেশ কিছু জায়গার নামে ‘কিল’ আছে বলে, আমার ধারণা, এই ব্যাখ্যাটি দাঁড় করানো হয়েছে যে এই এলাকাগুলো ডাচ অধ্যুষিত ছিল এবং ডাচরাই ওদের ভাষায় এই নামগুলো রাখে। মধ্যযুগের ডাচ ভাষায় কিল, যার বানান ছিল Kille, অর্থ হচ্ছে জলাশয় বা জলের প্রবাহ। জায়গাগুলোর নাম এই অর্থটিই বহন করে, মোটেও তা ‘হত্যা’  অর্থে নয়, আমেরিকানদের এই ব্যাখ্যার চেয়ে আমার কাছে ‘হত্যা’ অর্থটিই বেশি সঠিক বলে মনে হয়। জায়গার নাম যখন প্লেটকিল, ওয়ালকিল, তখন অনায়াসেই বোঝা যায়, থালাভাঙা বা দেয়ালভাঙা অর্থ থেকেই শব্দ দুটি এসেছে, থালাপানি বা দেয়ালপানি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা খুব যুক্তিপূর্ণ মনে হয় না। মিথ্যা দিয়ে সাধু সাজা মন্দের চেয়েও মন্দ।

মানুষের প্রাথমিক চিন্তাগুলো ভৌগোলিক অবস্থান, ধর্ম, ভাষা বা সম্প্রদায় দিয়ে প্রভাবিত হয় না। সব মানুষের রক্ত যেমন লাল তেমনি সব মানুষের প্রাথমিক চিন্তাও প্রায় একই রকম। বলা যায় মানুষের চিন্তার স্কেলিটন একই। এর ওপর যখন মাংস লাগে, চর্বি যুক্ত হয়, চামড়ার আবরণ চড়ানো হয় তখন চিন্তার পার্থক্য তৈরি হতে থাকে। পোশাক ও অলঙ্কারের অঙ্গসজ্জা আরেক দফা পার্থক্য তৈরি করে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি হচ্ছে পোশাকের মতো। বিজ্ঞানের টেম্পুতে চড়ে মানুষ যতই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, মেধা তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, চিন্তার পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। যখন দেখি দূর প্রাচ্যের লোকালয়গুলোর নাম রৌমারি (সম্ভবত রুই মারি থেকে এসেছে), চিলমারি, ভেড়ামারা, ঘোড়ামারা, মাথাভাঙা, হাঁটুভাঙা প্রভৃতি তখন মানুষের প্রাথমিক চিন্তার প্রভেদ খুব কম বলেই মনে হয়।

আমার ফ্রোজেন শোল্ডার চলছে। হাত ধরে এলে মুক্তি টিপে দিচ্ছে কিন্তু ব্যাথাটা আর নিতে পারছি না দেখে মুক্তি স্টিয়ারিংয়ে বসল। কিছুক্ষণ পর দেখি গাড়ি ভুল পথে যাচ্ছে। মুক্তির দিকদিশা খুব প্রখর। সে কোথাও একবার গেলে পরের বার আর জিপিএস লাগে না, রাস্তার দিকে তাকিয়েই পৌঁছে যেতে পারে। লন্ডনে ড্রাইভ করে ও আমাকে এমন অনেক জটিল জায়গায় নিয়ে গেছে যেখানে জিপিএস ছাড়া আমি কিছুতেই যেতে পারব না। কিন্তু জিপিএসে চোখ রেখে সে প্রায়ই বিভ্রান্ত হয়, আজও তাই ঘটেছে। পেন্সিলভেনিয়ার একটি লোকালয়ে ঢুকে পড়ি আমরা। নিউইয়র্কের চেয়ে এই লোকালয়টি অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন এবং নির্জন। তবে বাড়িঘর আর কর্পোরেট দালানের ঘনত্ব দেখে বেশ জমজমাট শহর বলেই মনে হচ্ছে। পথে বেশ কিছু গাড়ি থাকলেও পথচারী নেই তেমন, যে দু’চারজন চোখে পড়ছে সকলেই মুখোশ পরে হাঁটছে। একটি বাড়ির সামনে ‘ব্লাক ‘লাইফ ম্যাটার্স’ লেখা প্ল্যাকার্ড দেখে কিছুটা মানসিক নিরাপত্তা অনুভব করছি।

স্টিয়ারিং বদল করে কিছুক্ষণের মধ্যেই হাইওয়েতে উঠে আসি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাব। মজার ব্যাপার হচ্ছে এত এত মাইল পথ পাড়ি দিয়ে, নিউজার্সি, পেন্সিলভেনিয়া পেরিয়ে আমরা আবার ফিরে এসেছি নিউইয়র্ক স্টেটে এবং যে জায়গাটিতে আমরা যাচ্ছি, ফিঙ্গার লেইক রিজিয়নের মন্টুর ফলস, সেটি নিউইয়র্ক স্টেটেই অবস্থিত।

আমাদের মূল পরিকল্পনায় ছিল আগামীকাল রাতে বারবিকিউ করব, সাথে করে মেরিনেটেড মাংস নিয়ে এসেছি। কিন্তু নভো এবং ওর মা বলছে, চলো আজই বারবিকিউ করে ফেলি।

অকস্মাৎ যেন লোকালয় পেরিয়ে একটি নির্জন পাহাড়ি রেঞ্জের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। পাহাড়ের মাঝখানে সরু একটি পিচ ঢালা পথ, দুপাশে ঘন সবুজ বনভূমি উঠে গেছে হাজার ফুট ওপরে, কালো প্রান্তরেখার মাথায় স্বচ্ছ নীল আকাশ, সেখানে শাদা শাদা মেঘ বলকান গ্রীষ্মে চড়ে বেড়ানো ভেড়ার পালের মতো ধীর লয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে।

এই নির্জন পাহাড়ের ভেলিতে একটি মার্কেটপ্লেস পেয়ে গেলাম। কিছুটা বিপজ্জনকভাবেই বাঁ দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে ঢুকে পড়ি। ইউ-সেইপ মার্কেটে নানান কিছুর দোকান। জুবিলি ফুড লেখা দোকানটিতেই আমরা সবাই একযোগে তাকাই। নিউইয়র্ক সিটির চেয়ে পণ্যসামগ্রীর দাম বেশ চড়া এখানে। একটি তরমুজ, ভুট্টা, মিষ্টি আলু, কিছু ড্রিংস, ফল, ব্রেড, দুধ, অ্যাপেল-সিনামন জেলি আর আইরিশ বাটার স্প্রেড কিনে নিলাম।

রুট ফোর্টিন সড়কটি আমাদের পৌঁছে দিল ক্যাথেরিন কটেজে। কটেজের লোকেশন দেখে আমি পুরোপুরি হতাশ। সদর রাস্তার পাশে? নো ওয়ে। পেছনের কুড়ি মাইল পথ যে ভয়ঙ্কর নির্জন পাহাড়ের ভেতর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে এসেছি তাতে প্রত্যাশা এতটাই বেড়ে গেছে যে অপেক্ষাকৃত অধিক নির্জন কোনো লেইকের পাড়েই হবে আমাদের কাক্সিক্ষত কটেজ। কিন্তু হায় এ-কী লোকেশন! আমার হতাশ মুখ দেখে মুক্তি বেশ বিব্রত। সে এতটাই বিব্রত যে কোথায় চাবি, আমাদের কটেজ নাম্বার কত কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না, আমি ঝাঁঝালো মেজাজে কিছু জানতে চাইলে সে অপমানে তোতলাতে শুরু করে।

মুক্তির অবস্থা বেগতিক দেখে আমি প্রসন্ন মুখ দেখাই। আমার ঝুলিতে অনেকগুলো অভিব্যক্তি আছে, সেখান থেকে ইচ্ছেমতো বের করে মানুষকে দেখাতে পারি।

ক্যাথেরিন কটেজের একটি অফিসঘর চোখে পড়ল। সবই কাঠের তৈরি। ফ্রন্ট ডোরের পাশে নোটিশ বোর্ড, ওখানে পিনআপ করা একটি খাম, খামের ওপরে নীল মার্কার দিয়ে বেশ শৈল্পিকভাবে লেখা, মুক্তি। আমি জানি এর ভেতরেই রয়েছে কটেজের চাবি। চাবিটি বের করে দোলাতে দোলাতে তিন নম্বর কটেজের দিকে এগিয়ে যাই। মুক্তি এদিক-সেদিক পাগলের মতো ছুটছিল, আমার হাতে চাবি দেখে ছুটে আসে। এরই মধ্যে সে ইমেইল খুলে পড়ে নিয়েছে, আমাদের কটেজ নাম্বার তিন।

চাবি পেলে কোথায়? তিন নাম্বার আমাদের।

মুক্তির মুখে কৃত্রিম হাসি।

ম্যাজিক।

ওর কানের কাছে গিয়ে বলি,

জায়গাটা কিন্তু খুব সুন্দর। পেছনে কুলকুল করে বয়ে চলেছে ছোট্ট ক্রিক। আহ, একেবারে ছবির মতো।

এবার ও হাসে, স্বাভাবিক হাসি। এই হাসিটা আমি ভালো করেই চিনি।

সত্যি তোমার পছন্দ হয়েছে?

অবশ্যই। খুব সুন্দর জায়গা। দেখো কত বড় একটি কাঠের দোলনা। ফায়ার পিট, বারবিকিউর সরঞ্জাম, থরে থরে সাজানো ফায়ার উড, পারফেক্ট ফর ক্যাম্পিং।

আমাদের গুমোট ভাবটা মুহূর্তেই কেটে যায়। আমরা হাসি হাসি মুখে কটেজের দরোজা খুলি।

ছোট্ট একটি কটেজ। পুরোটাই কাঠের তৈরি। ছোটো হলেও কোনো কিছুর কমতি নেই। যেখানে যা থাকা দরকার সবই আছে। বাঙ্ক বেড দেখে নভো আনন্দে চিৎকার করে ওঠে।

আমি ওপরে শোব।

নিশ্চয়ই তুমি ওপরে শোবে। ওর মা নিশ্চয়তা দেয়।

ও তখনই সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে শুরু করে। ওর কাণ্ড দেখে জল বাঙ্ক বেডের নিচ তলায় জুতো পরেই শুয়ে পড়ে। যেন সেও তার জায়গার দখল নিয়ে নিল।

খুব দ্রুত সবাই হাতে হাতে গাড়ি থেকে জিনিস-পত্র নামিয়ে ছলছল বয়ে চলা ক্রিকের পাড়ে নেমে আসি। বড় জোর পঁচিশ/ত্রিশ ফুট প্রশস্ত একটি খাল। অল্প পানি কিন্তু পানিতে পাহাড়ি ঢলের গতি। এই গতিটাই আমাদের মধ্যেও গতি সঞ্চার করে। ফায়ারপিটের সামনে, বারবিকিউর সামনে, সুদৃশ্য এবং শৈল্পিক বেতের এক সেট বসার আর্মড-চেয়ার, একটি দুই সিটের আর দুটি এক সিটের। কটেজের বারান্দায় দুটি কাঠের রকিং চেয়ার, বসে বসে দুলতে দুলতে বই পড়া যাবে। কথাটা বলতে না বলতেই মুক্তি আমাকে আঙুল তুলে চার নাম্বার কটেজের বারান্দা নির্দেশ করে। এক উর্বশী শ্বেতাঙ্গ তরুণী ঠিক এই কাজই করছে। চেয়ারে পা তুলে বই পড়ছে। ওর ডান হাতে বই আর বাঁ হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। এলোমেলো চুল, পরনে রাতের পোশাক। আমি মুক্তিকে বলি, ও নির্ঘাৎ রাইটার। অসমাপ্ত কোনো গল্পের শেষ অংশ লেখার জন্য এখানে এসেছে।

হুম, কাউকে দেখলেই স্বজাতি মনে হয়। আবার প্রেমে-টেমে পড়ে যেও না। যাও এখন বারবিকিউর আয়োজনটা সেরে ফেলো।

সুফি চর্চার মূল লক্ষ্য কি জানো? খোদার সান্নিধ্য লাভ করা। মানে খোদার দেখা পাওয়া। এ প্রসঙ্গে সুফি মাস্টার জালালুদ্দিন রুমি খুব সুন্দর একটি কথা বলেছেন : তোমার সাথে আমার একদিন দেখা হবে, এ এক ডাঁহা মিথ্যে, তুমি তো প্রথম থেকেই আমার সঙ্গে আছ।

হঠাৎ সুফি চিন্তা এলো কেন?

মেয়েটি যদি লেখক হয়েই থাকে তো ওর প্রেমে পড়ে যাব মানে কি? আমাদের প্রেম তো জন্ম জন্মান্তরের। তুমি কি জানো লেখকদের আলাদা কোনো ঠিকানা নেই, সব লেখকের বাড়ি একটি গ্রামে।

মুক্তি কটেজ থেকে কাঠের সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে আসতে আসতে ঘাড় কাত করে বাঁ দিকে তাকিয়ে আছে। পাশের কটেজের মেয়েটির চোখ কোলের ওপর, বইয়ের পাতায়, আমাদের খুনসুটির প্রতি ওর মোটেও কৌতূহল নেই।

কয়লায় কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছি। দাউ দাউ করে জ্বলছে চারকোল। অনেক বছর ধরেই বারবিকিউ করছি, সেই ২০০৯ সালে যখন ইংল্যান্ডে মাইগ্রেট করি, তখন থেকেই। কিন্তু খুব সম্প্রতি শিখেছি কীভাবে মাংস না পুড়িয়ে সুস্বাদু বারবিকিউ করা যায়। মাংসের মেরিনেট কীভাবে করছি সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তবে পোড়ানোর ব্যাপারটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাওরাতে পড়েছি ঈশ্বর পোড়ানো মাংসের সুস্বাদু গন্ধ পছন্দ করেন। তাই ঈশ্বরের কৃপা লাভের জন্য মুসা ও তার পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীরা কোরবানগাহ নির্মাণ করতেন এবং সেখানে পশুর মাংস পোড়াতেন। পোড়ানো মাংসের ঘ্রাণ আমারও খুব প্রিয়। তাই বারবিকিউ করতে গিয়ে আমি দাউ দাউ আগুনে মাংস পোড়াই। এতে মাংসের ওপরের অংশ দ্রুত পুড়ে যায় কিন্তু ভেতরে কাঁচা থেকে যায়। সেদিন বেলমন্ট লেইক স্টেট পার্কে বারবিকিউ করার সময় মুক্তি আমাকে বলল, কয়লাগুলো আগে ভালো মতো পুড়িয়ে শাদা করে ফেলো, তারপর মাংস চড়িয়ে ঢেকে দাও। গনগনে তাপেই ভালো বারবিকিউ হবে এবং হলোও তাই। এখন আর জ্বলন্ত আগুনে মাংস দিই না।

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা বসছে, রাত নামছে। যত অন্ধকার হচ্ছে বারবিকিউর লাল আগুন ততই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। দুই মেয়েকে নিয়ে মুক্তি দুপাশে দুটি বেঞ্চ আটকানো পিকনিক টেবিল সাজিয়ে ফেলেছে। মেরিনেটেড চিকেনের সাথে ভুট্টা, মিষ্টি আলু, বড় আকৃতির পেট মোটা কিছু মরিচ আর রসুন পুড়িয়ে নিয়েছি।

ফ্রেঞ্চ রেড ওয়াইনের বোতল খোলা হলো। মুক্তি দুই গ্লাসের বেশি পান করে না, বাকিটা আমিই শেষ করি এবং দেহে অ্যালকোহলের কিছুটা প্রতিক্রিয়া টের পেতে শুরু করি। এরই মধ্যে নভো কটেজের ভেতর থেকে চিৎকার শুরু করে,

ম্যামি, সামথিং ইজ রঙ ইন দ্য টয়লেট।

হোয়াট হ্যাপেন্ড?

প্রশ্নটা করেই মুক্তি এক লাফে ভেতরে ঢুকে যায় এবং ভীষণ মন খারাপ করে ফিরে আসে। নিউইয়র্ক থেকে আমরা দুটি কেরোসিনের প্রদীপ নিয়ে এসেছি। সেই আলোয় মুক্তির মুখে বিরক্তি দেখতে পাই। আমি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে ও বলে,

ইট’স অ্যা রিয়েল ডিজাস্টার। ফ্লাশ ইজ নট ওয়ার্কিং।

মা, মেয়ে দুজনই মহাবিরক্ত। আমার কাছে এটা খুব সিলি বিষয় মনে হলেও আমি জানি মেয়েরা এসব বিষয়ে খুব সেন্সেটিভ।

কি করব এখন?

ওদের ফোন দাও।

আমার কথা কি কিছুটা জড়িয়ে যাচ্ছিল? হয়তো। মুক্তির মুখে বিরক্তি মুছে গিয়ে একটি দুষ্টু হাসি।

ওদের বিরক্তি এবং হতাশা আমাকে ভেতরে নিয়ে যায়। ফ্লাশের ঢাকনা খুলি, ভেতরটা জলশূন্য খটখটে শুকনো এবং সেখানে মাকড়শার জাল। তার মানে বেশ অনেকদিন ধরেই এই ফ্লাশ ব্যবহার করা হয় না। মেঝেতে প্রায় শুয়ে পড়ে ফ্লাশের কল ঘোরাই, না, তবুও পানি আসছে না। এবার পিস্টনটিকে বার কয়েক নাড়াচাড়া করি। হঠাৎ ছড়ছড় করে পানি আসতে শুরু করে। যে আনন্দটা মাটি হতে বসেছিল তা আবার ফিরে আসে। কিছুক্ষণ পরে বাঁ হাতে ছোটো একটি লণ্ঠন আর ডান হাতে একটি স্ক্রু-ড্রাইভার নিয়ে মুখোশ পরা এক মধ্যবয়স্কা নারী আমাদের কটেজের দিকে এগিয়ে আসে।

আমি অ্যালেনা। অনুমতি দিলে ফ্লাশটা মেরামতের জন্য ভেতরে যেতে চাই।

আমি বলি, আপনি কি এই প্রোপার্টির ম্যানেজার?

হ্যাঁ।

মুক্তি কথা কেড়ে নিয়ে বলে, লাগবে না, আমার হাজব্যান্ড ফ্লাশ সারিয়ে ফেলেছে।

অ্যালেনা চোখ কপালে তোলে। হাতের লণ্ঠন আমার দিকে খানিকটা তুলে ধরে আমার মুখটা দেখে নেয়।

মুখে কিছু না বললেও বুঝতে পারি ওর বুকের ওপর থেকে একটি পাথর সরে গেল।

বারবিকিউর আগুন নেভাইনি। রাত ঘন হচ্ছে, আকাশের তারকারাজি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তারাদের ছায়া পড়েছে ক্রিকের জলধারায়, জলের প্রবহমানতার জন্য তা স্থির হতে পারছে না, ঝিকমিক ঝিকমিক করছে। একই সঙ্গে অন্ধকার এবং চারকোলের আগুন ঘন হচ্ছে। বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে, আমরা দুজন তখনও ক্রিকের গান শুনছি।

এই অগভীর ক্ষিপ্র জলধারাটি শেমাং এবং স্কাইলার কাউন্টির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সেনেকা লেইকে গিয়ে পড়েছে। শেমাং কাউন্টির এক পাহাড়ি টাউন ভেটেরানের চূড়ো থেকে নেমে এসেছে ক্যাথেরিন ক্রিক। প্রথমে কিছুটা দক্ষিণে হর্সহেডের হোল্ডিং পয়েন্ট অব্দি গিয়ে বাঁক নিয়েছে জলধারাটি, এরপর ঘুরে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে গেছে উত্তরে। যে রুট ফোর্টিন ধরে আমরা ড্রাইভ করে ওয়াটকিনস গ্লেইনের মন্টুর ফলসে এসে পৌঁছুলাম, মূলত এ-পথের সমান্তরাল বয়ে চলেছে ক্যাথেরিন ক্রিক। যেতে যেতে চুম্বন করেছে পাইন ভ্যালি, মিলপোর্ট, মন্টুর ফলস এবং ওয়াটকিনস গ্লেইন। ওয়াটকিনস গ্লেইনে গিয়ে জলধারাটি হাসতে হাসতে নেমে পড়েছে সুবৃহৎ সেনেকা লেইকে।

সেনেকা লেইক ফিঙ্গার লেইকগুচ্ছের সবচেয়ে বড় লেইক। যেটি কানাডার লেইক অন্টারিওতে গিয়ে মিশেছে, সেনেকা ও অসওয়েগো নদীর মাধ্যমে। শেষমেশ এই অঞ্চলের সব জলাশয়ের প্রতিটি ফোঁটাই পৌঁছে যায় আটলান্টিক মহাসাগরে।

আজ খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ি আমরা। একটু একটু করে ভোরের আলো বৃক্ষলতার পত্রপুষ্প চুইয়ে নেমে আসছে ক্যাথেরিন ক্রিকের বুকে। কোথাও কোথাও দু’পাড়ের বৃক্ষলতা এত ঘন এবং দীর্ঘ যে ঝুলে আছে জলের ওপর। এসব ঝোপঝাড়ের নিচে যে শান্ত, স্নিগ্ধ ছায়াময় জলধারা সেখানে তাকালেই আমার শৈশবের মাছ শিকারের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এ রকম জায়গায়ই লুকিয়ে থাকে কৈ, মেনি মাছ। কখনও পেলুন দিয়ে, কখনও হাত দিয়ে কত ধরেছি।

ক্রিকের পাড় ধরে ভোরের রক্তিম সূর্যকে সাক্ষী রেখে মুক্তি আর আমি পদচিহ্ন এঁকে দিচ্ছি এই দূর ভূগোলের এক পাহাড়ি জনপদ শেমাং কাউন্টিতে। এই নির্জনতা, এই স্নিগ্ধ প্রকৃতি, এই ছলছল বয়ে চলা জলধারা, এই যে ভোরের সূর্য ঢলে পড়ছে পত্রপুষ্পের গায়ে, পাখিরা গাইছে সবচেয়ে শুদ্ধ সঙ্গীত, আমাদের বোধে শুধু যে প্রশান্তি ঢেলে দিচ্ছে তা-ই নয়, আমাদের চিরচেনা এই পৃথিবীকে, আমাকে, আমাদেরকে নতুন করে চিনিয়ে দিচ্ছে, এই পৃথিবীর কোনো এক নতুন পরিচয় আমাদের সামনে তুলে ধরছে।

ইচ্ছে ছিল ১৫ মাইল ক্রিকের অনেকখানিই হেঁটে আসব কিন্তু ক্রিকের এপাড়ে সব প্রাইভেট প্রোপার্টি, প্রতিটি প্রোপার্টির লেজ গিয়ে ক্রিকে নেমেছে। যদিও দুই বাড়ির মাঝখানে কোনো সীমান্ত দেয়াল নেই, তা সত্ত্বেও আমরা বেশিদূর এগোলাম না। কটেজ-চৌহদ্দির মধ্যে একটি নোটিশ দেখেছি, অন্যের প্রোপার্টিতে যেন ভিজিটররা না যায়। প্রথম যখন আমেরিকায় আসি তখন আমার এক বন্ধু আসলাম মোর্তোজা আমাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন-আইনের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। কেউ যদি অন্যের বাড়িতে যায় এবং গৃহস্বামী আগন্তুককে গুলি করে মেরে ফেলে তাহলে মার্কিন আইনে তার কোনো অপরাধ হবে না। কারণ হত্যাকারী এই যুক্তি দেখাবে যে লোকটি আমাকে হত্যা করার জন্য এসেছিল, আমি আত্মরক্ষার্থে তাকে মেরেছি। আর এদেশে যার তার কাছেই যে আগ্নেয়াস্ত্র আছে এ কথা তো আমরা সবাই জানি। সম্ভবত এ কারণেই এ-দেশে হুটহাট কেউ কারও বাড়িতে যায় না। এমনকি দাওয়াত ছাড়া ভাই, বোন, মা-বাবা, ছেলেমেয়েও একটা বয়সের পরে আর একজন অন্যজনের বাসায় যায় না। দুই প্রতিবেশীকে দেখি বছরের পর বছর যার যার বাড়ির সীমানায় দাঁড়িয়ে একে-অন্যের সাথে কথা বলছে কিন্তু কেউ কারও বাসায় যাচ্ছে না।

অন্যদিনের মতো জগিং করার হাঁটা আজ হবে না এবং এক পর্যায়ে সেই ইচ্ছেও আমরা ছেড়ে দিয়েছি। হাঁটছি ধীরে ধীরে আর তারিয়ে তারিয়ে দেখছি, উপভোগ করছি বুনোসুন্দর। এক পর্যায়ে খুব ইচ্ছে হলো ক্রিকের স্বচ্ছ জলধারায় নেমে পড়ি। তাপমাত্রা বেশ উষ্ণ, আশি ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে। মার্কিনীরা তাপমাত্রার হিসেব ফারেনহাইটে রাখে, প্রথম প্রথম বুঝতে ধাক্কা লাগত, এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। ফারেনহাইটে আশি মানে সেলসিয়াসে ২৪। ফারেনহাইট থেকে বত্রিশ বাদ দিয়ে অর্ধেক করে ফেলতে হয়।

মুক্তি চিৎকার করে নিষেধ করছে কিন্তু আমার মধ্যে খাগাতুয়ার কৈশোর ভর করেছে, জলে আমি নামবোই, হয়তো মাছ ধরার জন্য ঝোপঝাড়ের নিচে হাত দিতেও পারি। এখানে পানির গভীরতা না থাকলেও ভাটির দিকে কোথাও কোথাও ক্রিকের ভেতরেই ছোটো ছোটো পুকুর তৈরি হয়েছে এবং সেসব জায়গায় সুস্বাদু ট্রাউট মাছ পাওয়া যায়। কাল বিকেলে অ্যালেনা আমাদের এই তথ্য দিয়েছে। আমার শিকারি চোখ ট্রাউট মাছ দেখার জন্য ক্রিকের স্রোতধারা থেকে কিছুতেই সরছে না।

না, শেষমেশ বড় একটি পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে নুয়ে পড়ে আঁজলা ভরে ক্রিকের কাচ-স্বচ্ছ জল তুলে নিলাম, চোখে মুখে দিলাম, কুলি করলাম। এই করোনার সময়ে এ-কাজটা করা তোমার একদম ঠিক হয়নি। মুক্তির এ রকম উষ্মার জবাবে আমি খুব দৃঢ়তার সাথেই বলে দিলাম,পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে নেমে আসা জলে কোনো জীবাণুু থাকে না। একটি কথা আমি গোপন করে গেলাম, ক্রিকের জল যতটা শুদ্ধ ভেবেছিলাম তা হয়তো নয়, কুলি করতে গিয়ে কিছু একটা গন্ধ পেয়েছি, জীবাশ্মের পচা গন্ধ বা হতে পারে জ্বালানি তেলের।

অল্প পথ হাঁটলেও পাখির কলকাকলি আর জলের গান শুনতে শুনতে অনেকখানি সময় কাটিয়ে দিয়েছি। গাছপালার আড়াল পেরিয়ে সূর্য বেশ দাপটের সাথেই বেরিয়ে এসেছে। সোনালি রোদ্দুর পত্রালীর ফাঁক দিয়ে টুকরো টুকরো হীরকখণ্ডের মতো ঝরে পড়ছে আমাদের উঠোনে।

আমরা ফিরে আসতে আসতে বাচ্চারা উঠে গেছে। মুক্তি যখন ওদের তৈরি করছিল, আমি ততক্ষণে গাছতলার টেবিলে সকালের নাশতা সাজাতে শুরু করি।

ছায়াঘেরা, বৃক্ষলতা-শোভিত প্রকৃতির ভেতরে, খোলা আকাশের নিচে বসে নাশতা করছি। পেছনে ক্যাথেরিন ক্রিক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মতো কুলকুল ধ্বনি তুলে বয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে নাম না জানা পাখির ঝাঁক এসে ক্রিকের ওপারে, ঝোপের ভেতরে দল বেঁধে বসছে এবং বিচিত্র সুরে ডেকে উঠছে। যতদূর শনাক্ত করতে পারছি ওরা ছোটো আকৃতির কাক। আকৃতিতে শালিকের চেয়ে একটু বড়, একেবারে তেলতেলে কালো। অন্য কোনো পাখি দেখছি না। ওরা দল বেঁধে এসে নামছে, কোরাস সঙ্গীতের মতো কিচিরমিচির করছে আবার উড়ে চলে যাচ্ছে। এরা কিন্তু কা কা করে কর্কশ স্বরে ডাকে না। ইউরোপ, আমেরিকায় কাক বেশ বিরল পাখি এবং খুব ভদ্রও। ওদের গা-ও খুব পরিচ্ছন্ন। আফ্রিকার কাক আকারে আমাদের দেশের কাকের চেয়ে বড়। বুঝতে পারছি এই পাখিরা দলগতভাবে থাকতে পছন্দ করে। আমাদের নিউইয়র্কের বাসার ফ্রন্ট গার্ডেনেও ওদের দেখেছি। যখন এসে বসে তখন সবুজ ঘাস দেখা যায় না। পুরো বাগান কালো হয়ে যায়। আলফ্রেড হিচককের ‘দ্য বার্ড’ সিনেমায় যে ঝাঁকে ঝাঁকে কালো কাক দেখানো হয়েছে সেগুলো এই কাক। আমি প্রথমে ব্লাক ফিঞ্চ ভেবে ভুল করেছিলাম। ফিঞ্চের ঠোঁট হয় মোটা, চড়ুইপাখির মতো। কাকের ঠোঁট লম্বাটে। আমাদের দেশের কাকের মতো এদের একা একা উড়তে বা বাড়িঘরের আশপাশে খাবারের অনুসন্ধান করতে দেখা যায় না। যে কোনো কুলিন পাখির মতোই ওরা দল বেঁধে ওড়ে এবং বনে-জঙ্গলে থাকে। কদাচিৎ লোকালয়ে আসে।

আমি চাইছিলাম নাশতা সেরে রকিং চেয়ারে বসে দুলতে দুলতে চায়ের কাপে চুমুক দেবো আর পাখিদের গান শুনব কিন্তু মুক্তি এই পরিকল্পনা নাকচ করে দিয়ে বলে, হবে না। শিগগির তৈরি হও।

কোথায় যাব?

কোথাও না কোথাও যাব। ঘরে বসে থাকা একদম চলবে না। এই অঞ্চলে দেখার মতো অনেক কিছু আছে।

কি দেখব, বলো।

আমি বলব কেন, তুমি খুঁজে বের করো, গুগল করো। ওদের অফিসে যাও, ম্যাপ দেখো। অনেক ট্যুরিস্ট এট্রাকশন আছে আশপাশে।

আমি কিছুটা খুশি হই। যেহেতু মুক্তি এখনও কিছু খুঁজে বের করেনি তাহলে ফাঁকি দেওয়া যাবে। আসলে আমি একটি অলস দিন কাটাতেই চাইছি।

মুক্তি টেবিল গুছিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে ঘরে গেল। পাঁচ মিনিট পর একজন আদর্শ স্ত্রীর মতো বেরিয়ে এসে স্বামীর হাতে ধূমায়িত চায়ের কাপ ধরিয়ে দিল।

ওরা তখন ভেতরে, বাঁ দিকে, চার নম্বর কটেজ থেকে সেই সুন্দরী বেরিয়ে এসে বারান্দায় বসল। মেয়েটি বসেই সিগারেট ধরালো। মুখ থেকে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আমার দিকে তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই হাসল। আমি ‘হাই’ বলার সুযোগটা ছাড়লাম না। মেয়েটিও হাই বলে খুব মিষ্টি করে হাসল।

এরপর আমি চায়ের কাপে আর মেয়েটি সিগারেটে, চুপচাপ। অনেকক্ষণ পর আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাই। মেয়েটিও ঠিক একই সময়ে তাকায়। আমাদের আবারও চোখাচোখি হয়। আমি কিছুটা বিব্রত বোধ করলেও শ্বেতাঙ্গিনীর মধ্যে এ রকম কোনো অভিব্যক্তি দেখা গেল না। বেশ ঘাগু মেয়ে মনে হচ্ছে। ক্রমাগত সিগারেট টানছে আর ছলছল বয়ে চলা জলধারায় কান পেতে তাকিয়ে আছে ওপারের বৃক্ষলতার দিকে। কথা বলার কিছুটা কৌতূহল অনুভব করছি বটে কিন্তু করোনার বিষয়টিও মাথায় আছে। এ সময়ে অপ্রয়োজনে কেউ কারও সাথে কথা বলে না, কাছে ঘেঁষে না। রাস্তায় যখন হাঁটি, সকলেরই মুখোশে মুখ ঢাকা, উল্টো দিক থেকে কেউ এলে খুব কাছে দিয়ে পাশ কেটে যায় না, দরকার হলে ফুটপাত থেকে নেমে খানিকটা দূর দিয়ে পাশ কাটে। প্রথম প্রথম খুব অস্বস্তি লাগত। মানুষ মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকছে, এ কেমন কথা কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আমার এই বিব্রতবোধ কেটে গেছে এবং মানুষের কাছ থেকে মানুষ দূরে থাকবে এটিই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। এটিই হচ্ছে আজকের পৃথিবীর নতুন স্বাভাবিকতা।

মুক্তির পায়ের আওয়াজ পেয়ে আমি কিছুটা সতর্ক হই। বিদেশিনীর দিকে আড়চোখে তাকানো বন্ধ করি। স্ত্রীরা এ রকম ক্ষেত্রে স্বামীদের অপাপদৃষ্টিতেও পাপ খুঁজে পায়।

মুক্তি পুরোপুরি তৈরি। আমি রানিং শুটা ঝটপট পরে নিলাম। মেয়েরা তখন বিশাল কাঠের দোলনায় বসে দুলছিল। দুটি ওক গাছে বাঁধা এই দোলনাটি বেশ রোমান্টিক। পাশাপাশি দুজন বসার ব্যবস্থা। জোৎস্না রাতে দুজন বসে দুলতে দুলতে সেই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি গাইতে পারলে মন্দ হতো না, সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে…

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলি, কোথায় যাবো?

মুক্তি আমার হাতে একটি ম্যাপ ধরিয়ে দেয়, ওতে লেখা ওয়াটকিনস গ্লেইন স্টেইট পার্ক। মুখে বলে, ওখানে অনেকগুলো ওয়াটার ফলস আছে। আজ সারাদিন আমরা ওখানেই কাটাব। তখনই বুঝতে পারি ম্যাডাম আমাকে সারাদিন দাবড়ানোর যাবতীয় হোমওয়ার্ক আগে থেকেই করে রেখেছেন।

দুই মিনিটের মধ্যেই রুট ১৪ থেকে আমরা একটি পাহাড়ি রাস্তায় উঠে আসি। রাস্তাটি পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ঘুরতে ঘুরতে ঘন গাছপালা পরিবেষ্টিত এক অন্ধকার অরণ্যে নিয়ে এলো আমাদের। আমেরিকার প্রায় সব বৃক্ষের পাতার আকৃতিই ওকপত্রের মতো কেয়ারিকাটা। একটি পাতা আলাদা করে হাতে নিয়ে দেখলে মনে হয় যেন একটি ফুল। শুধু বড় বড় গাছই না, ছোট্ট লেভেন্ডার ফুলের পাতাও ঝালরের মতো ফারা ফারা এবং মাথাগুলো শার্প। হয়তো আবহাওয়ার কারণেই পাতার আকৃতি এমন হয়। পার্থক্য শুধু আকারে, কোনোটা বড়, কোনোটা ছোটো, কোনোটার ফারাগুলো পাতলা, কোনোটার ঘন।

চারদিকে অন্ধকার অরণ্য হলেও বুঝতে পারি আমরা এখন পাহাড়ের বেশ অনেকখানি ওপরে উঠে এসেছি। সাধারণত বেশি ওপরে উঠলে কান বন্ধ হয়ে যায়, কানের ভেতরে পটপট করে আওয়াজ হয়, নভোর এখন সেই অবস্থা। ও চিৎকার করছে। আমি কিছুটা বিচলিত। বাচ্চাদের অস্বস্তি হলে আমি খুব বিচলিত হয়ে পড়ি। তখনই একটি মায়া হরিণ খুব ধীরে ধীরে গাড়িটির প্রায় সামনে, রাস্তার বাঁ দিকে এসে দাঁড়ায়। বেশ খানিকটা দূর থেকেই লক্ষ করেছি বলে গাড়ি থামাতে সক্ষম হই। আকৃতিতে একটি হালকা-পাতলা লাল রঙের ছাগলের মতো লাগছে। মাথায় শিং নেই, চোখ দুটি গভীর কালো। সে নড়ছে না, থেমে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। আমরাও গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করছি, যদি লাফ দিয়ে গাড়ির সামনে এসে পড়ে। ও জঙ্গলের ভেতরে, নিরাপদ দূরত্বে চলে না গেলে আমাদের পক্ষে গাড়ি স্টার্ট দেওয়া সম্ভব নয়। জল পেছনের সিট থেকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকলেও নভো কানের যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। মুক্তি একটি বিজয়ের হাসি দিয়ে বলে, প্রকৃতি কত সুন্দর। আমি জানি ও আসলে কি বলতে চাইছে। এই ট্যুরের পরিকল্পনাকারী এবং বাস্তবায়নকারী এককভাবে মুক্তি, আমি প্রথম থেকেই না, না, করছিলাম। এক রকম জোর করেই সে সবাইকে পথে নামিয়েছে। তাই প্রতিটি আনন্দের ঘটনাই সে আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে এবং বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে যে ট্যুর প্লানটা যথার্থ ছিল।

আমি বার্চ, ফার, পাইন, ওক, রেড ওক এসব গাছ চিনি কিন্তু এসবের বাইরেও এই পাহাড়ে আরও অনেক নাম না জানা গাছ আছে। আশ্চর্য রকমভাবে এই পাহাড়ে কোনো পাখি নেই। এ সময়ে পাহাড়ি জঙ্গলে সারি সারি সবুজ টিয়া দেখার কথা। যেহেতু খুব আস্তে আস্তে গাড়ি চালাচ্ছি, জানালার কাচ অনেক আগেই নামিয়ে দিয়েছি কিন্তু কোনো পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছি না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই জিপিএস তার পথ নির্দেশনা শেষ করে দেয়, যখন পিচঢালা পথটি পাহাড়ের চূড়োয় গিয়ে দুটি মেঠো রাস্তায় ভাগ হয়ে যায়। আমিও গাড়ি থামিয়ে মুক্তির দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বলি, এবার কোথায় যাবো ম্যাডাম? মনে হয় আমাদের পর্বতশৃঙ্গের এই মেঠোপথ দেখেই ফিরে যেতে হবে। মুক্তি হেরে যাবার মানুষ না। বলে, বাঁ দিকে যাও। আমি তখন রবার্ট ফ্রস্ট আওড়াই। Two roads diverged in a wood, and IÑ I took the one less traveled by, and that has made all the difference.. পঙক্তিগুলো উচ্চারণ করেই ডানদিকে, অপেক্ষাকৃত দুর্গম পথটিতে, গাড়ি নামিয়ে দিই। আর তখনই গাছপালার মাথার ওপর দিয়ে উদ্ভাসিত হয় বিশাল এক জলধি, সেনেকা লেইক।

পথটি এবার পাক খেয়ে খেয়ে অনেকটা নিচে নেমে আসে। এই জায়গাটির অনেকখানি সমতল এবং এখানে ছোটোখাটো একটি ভিলেইজ গড়ে উঠেছে। বেশ দূরে দূরে ছবির মতো সুন্দর বাড়ি। প্রতিটি বাড়ির সামনে বিশাল ফাঁকা জায়গা। শহুরে বাড়িগুলোর মতো সামনের ফাঁকা জায়গায় ঘাসের পরিপাটি লন নেই, বরং এলোমেলো বেড়ে ওঠা তৃণ-গুল্মে ভরা। মাঝে মাঝেই ফাঁকা, সবুজ ফসলের মাঠ, সেখানে ভুট্টা ও বার্লির বিশাল বিশাল একেকটি ক্ষেত। আমাদের সামনে সোজা একটি পথ ছুটে গেছে বহু দূরে। মাইল খানেক যাওয়ার পরে বাঁ দিকে একটি সিমেট্রি চোখে পড়ে। ডানদিকে পাহাড়ের ঢালে সারি সারি বৃক্ষরাজি নেমে গেছে নিচের দিকে।

মিনিট দুয়েক গাড়ি চালানোর পরে একটি সাইন দেখতে পাই, ওয়াটকিনস গ্লেইন স্টেইট পার্ক, আপার এন্ট্রান্স। পার্কিং লটের গেট খোলা, কিন্তু গেটের পাশে নির্দেশিকা আর পয়সা দিয়ে টিকিট কেনার একটি মেশিন। কোনো লোক নেই। কেউ চাইলে টিকিট না কেটেই ঢুকে যেতে পারে। আমরা গাড়ি থামিয়ে ৮ ডলারের টিকিট কিনি।

পার্কিং লট খাঁ খাঁ করছে। বড়জোর দশটি গাড়ি হবে, গোয়ালে বাঁধা সারিবদ্ধ গরুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের গরুটিও গোহালের সারিতে বেঁধে নেমে পড়ি। লোকজন নেই, তেমন আকর্ষণীয় কিছুও দেখছি না। তবে কেমন যেন একটা শান্তি শান্তি ভাব। তেমন জোরালো হাওয়া নেই কিন্তু একটা শীতল ভাপ উঠছে কোনো গভীর তলদেশ থেকে। গরমের দুপুরে তাতে প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে। দর্শনীয় তেমন কিছু চোখে না পড়ায় মনে মনে কিছুটা খুশিই হই, ফিরে গিয়ে মুক্তিকে দু’কথা শোনানো যাবে।

গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলি, ট্রিপটা তেমন জমলো না।

আগে ভেতরে যাই তো, এখানে অনেকগুলো ওয়াটার ফলস আছে। ওগুলো দেখলেই তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে, পয়সাও উসুল হবে।

ডানদিকে একটি বড়সড় দালানঘর, বেশ পরিচ্ছন্ন বাথরুম। প্রাকৃতিক কাজ-কর্ম সেরে অনেকগুলো সিঁড়ি ভেঙে পাহাড়-অরণ্যের গভীরে নেমে পড়ি।

সরু ইন্ডিয়ান ট্রেইল ধাঁ ধাঁ করে নিচের দিকে নেমে গেছে। ট্রেইলের ডানদিকে বেশ উঁচু লোহার তারের বেড়া। তারের ফাঁকে চোখ রেখে দেখি হাজার ফুট নিচে জলের স্রোত ছলাৎ ছলাৎ ছুটে চলেছে। এই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখে আমার চোখে-মুখে যে আনন্দের ঢেউ খেলা করছে তা মুক্তি ঠিকই লক্ষ করল এবং দৌড়ে কিছুদূর সামনে গিয়ে বলে, দাঁড়াও, ছবি তুলি।

ইন্ডিয়ান ট্রেইল কোয়ার্টার মাইল পরে গিয়ে মিশেছে গর্জ ট্রেইলে। গর্জ ট্রেইল ধরে আমরা যাচ্ছি তো যাচ্ছিই পথ আর শেষ হচ্ছে না। মাঝে মাঝে ডানদিকে পাহাড় কেটে বানানো রেলিং দেওয়া রোয়াকে লেখা সিনিক বিউটি। সেইসব রোয়াকে দাঁড়িয়ে আমরা নিচে তাকাই, জলপ্রপাত থেকে সৃষ্ট শিশু নদী দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে ছুটে চলেছে ক্ষিপ্র গতিতে, আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে জলের উচ্ছ্বাস দেখি, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে গজানো বৃক্ষলতার দোলা দেখি।

ওয়াটকিনস গ্লেইন স্টেইট পার্ক ফিঙ্গার লেইক রিজিয়নের সবচেয়ে আকর্ষণীয় একটি ট্যুরিস্ট স্পট। এখানে উনিশটি জলপ্রপাত আছে। দুই পাহাড়ের মাঝখানে দীর্ঘ ট্রেইল, সেই ট্রেইলের তলদেশ উনিশটি প্রপাতধারাকে ঠেলে দিচ্ছে ভাটির দিকে, যা ক্রমশ ছুটে গেছে সেনেকা লেইক হয়ে অন্টারিও লেইকে এবং শেষমেশ গিয়ে নেমেছে অতলান্তিক মহাসাগরে। ওয়াটকিনস গ্লেইন ফলস থেকে নেমে আসা প্রতিটি জলের ফোটাই মহাসাগরে গিয়ে আছড়ে পড়ে। এই দীর্ঘ ভ্রমণে ওদের সময় লাগে ২৫ বছর।

গর্জ ট্রেইল ধরে মাইল খানেক পাহাড়ি পথে হাঁটার পরে আমি থেমে পড়ি। কোনো আগামাথা পাচ্ছি না। আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি? চলো ফিরে যাই। মুক্তি বলে, ফলস না দেখে কিছুতেই ফিরে যাওয়া যাবে না।

তোমার কি মাথা খারাপ। নিচে তাকিয়ে দেখো, কমপক্ষে এক হাজার ফুট নিচে ফলস, ওখানে নামবো কি করে?

রাস্তা নিশ্চয়ই আছে। মানুষের কথার আওয়াজ পাচ্ছো না?

হ্যাঁ পাচ্ছি, উঁকি মেরে দেখেও নিয়েছি। নিচে ট্রেইল ধরে মানুষ হাঁটছে, কিন্তু ওখানে যদি নামি ফের উঠতে পারবো? বাচ্চারা অতদূর নেমে আবার উঠতে পারবে?

খুব পারবে।

না পারবে না, চলো ফিরে যাই।

ফিরে তো যাবই না। ফলস দেখে তারপর যাব।

এ কথা বলেই মুক্তি আগের চেয়ে আরও দ্রুতগতিতে হাঁটতে শুরু করে। তখন একটি বড়সড় সিমেট্রি পড়ে হাতের বাঁ দিকে, যেটি আমাদের অবস্থান থেকে বেশ ওপরে এবং এখানে এসে গর্জ ট্রেইল থেকে একটি সরু রাস্তা ওপরে, লোকালয়ের দিকে উঠে গেছে। মুক্তি কোনোদিকে তাকাবার সুযোগ না দিয়ে সোজা রাস্তায় নিচের দিকে নামতে থাকে। জলের দৃষ্টিতে অনীহা কিন্তু নভো মায়ের মতোই উৎসাহী।

আরও মিনিট দশেক হাঁটার পরে কাঠের লগ দিয়ে বাঁধানো পাথরের শৈল্পিক সিঁড়ি ঘুরতে ঘুরতে নেমে গেছে পার্কের মূল এন্ট্রান্সের দিকে। ৮৩২টি সিঁড়ি ভেঙে আমরা নিচে নেমে আসি, যেখানে পার্কের মূল এন্ট্রান্স এবং এখান থেকেই দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে দীর্ঘ ট্রেইল ছুটে গেছে এঁকেবেঁকে। হাইকিং-এর শুরু এখান থেকেই। কখনও এই পাহাড়ের খাঁজে আবার কখনও সরু একটি সেতু পার হয়ে ওপাশের পাহাড়ের খাঁজে। অসম্ভব সুন্দর কিন্তু সুন্দর দর্শনের এই হন্টন ট্রেইল অতিক্রম করা যথেষ্ট কষ্টসাপেক্ষ। ২০১৫ সালে আমেরিকার ৬ হাজার স্টেইট পার্কের মধ্যে এই পার্কটিই শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয় ইউএসএ টুডের পাঠক জরিপে।

১৮৬৩ সালে পার্কটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। তখন এটি ব্যক্তি মালিকানাধীন ছিল, ১৯০৬ সালে নিউইয়র্ক স্টেইট এটি কিনে নেয়। জনৈক স্যামুয়েল ওয়াটকিনস-র নামানুসারে এর নাম রাখা হয় ওয়াটকিনস গ্লেইন স্টেইট পার্ক। ৭৭৮ একর জমির ওপর বিস্তৃত পার্কের মূল আকর্ষণ হচ্ছে পাহাড়ের খাঁজ কেটে তৈরি উঁচুনিচু হাইকিং ট্রেইল এবং এই ট্রেইল ধরে ৮৩২টি সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠা, আবার ভিন্ন পথে নিচে নেমে আসা। এই ওঠানামা আর ট্রেইল ধরে হাইকিং করার মধ্য দিয়েই দেখা হয়ে যায় ১৯টি নান্দনিক জলপ্রপাত, যা কোথাও কোথাও তৈরি করেছে প্রাকৃতিক সুইমিং পুল।

যত কষ্টই হোক হাইকিংটা করতেই হবে। করোনার কারণে লোকজন কম বলে জানায় তথ্যকেন্দ্র কিন্তু তারপরও যথেষ্টই ভিড়। হাইকিংয়ে নেমে সেটা টের পাচ্ছি। যেখানে সিঁড়িপথ খুব সরু বা পাহাড়ের গা ঘেঁষে হাঁটতে হচ্ছে খুব সাবধানে, পা টিপে টিপে, সেসব জায়গায় বড়সড় লাইন। আবার যেখানে জলপ্রপাত থেকে তৈরি হয়েছে জলাধার, প্রপাতের ওপর দিয়ে, দুই পাহাড়ের ফাঁকে ঝুলে পড়া আকাশের নীল দেখা যাচ্ছে, সেখানে পর্যটকের জটলা, সবাই দাঁড়িয়ে পড়ছে ছবি তোলার জন্য। এসব জটলা এড়ানোর জন্য সবাই যথেষ্ট দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে পড়ছে ফলে লাইন কখনও কখনও আধামাইল লম্বা হয়ে যাচ্ছে। জলকে এতসব বোঝানো মুশকিল, বেচারি হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। তার চেয়েও বড় কথা, অন্যদের মতো আমাদের হাতে কোনো ম্যাপ নেই, আমাদের গন্তব্যও সকলের চেয়ে ভিন্ন, প্রতি পদক্ষেপেই অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ঠিক পথে যাচ্ছি তো, যদি পথ ভুল করি পুনরায় এই পুরো পথ ঘুরে গাড়ির কাছে যাওয়া আমাদের কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না। পাহাড়ের চৌহদ্দিটা আন্দাজ করে নিয়ে আর ট্রেইলের দিক নির্দেশনা পড়ে অনুমান করছি এই ট্রেইলই উঠতে উঠতে গিয়ে মিশবে ইন্ডিয়ান ট্রেইলে এবং ওখান থেকে আমরা আপার এন্ট্রান্সে, যেখানে আমাদের গাড়ি, পৌঁছে যেতে পারব।

পুরো সোয়া তিন কিলোমিটার ট্রেইলের প্রতি পদক্ষেপেই নয়নাভিরাম সুন্দরের হাতছানি কিন্তু ঠিক পথে এগোচ্ছি কিনা এই টেনশনে আমাদের সৌন্দর্য-তৃষ্ণা ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে। অনিশ্চয়তার আশঙ্কা আমাদের কাঁধের ওপর ভারী একটি বোঝার মতো চেপে বসে আছে।

শেষমেশ আমরা ইন্ডিয়ান ট্রেইল পেয়ে গেছি এবং প্রায় তিন ঘণ্টা পরে ফিরে এসেছি পার্কিং লটে। প্রত্যেকে যারপরনাই ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্ত। জলের মুখে রাজ্যের বিরক্তি। যেহেতু বেচারি কথা বলতে পারে না (আসলে বলে না) তাই ওর সব কথা চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে ভাসতে থাকে। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে আমার এখন কষ্টে কান্না পাচ্ছে। ওকে খুব পরিষ্কার করেই বললাম, মা আমরা এখন একটি খুব ভালো রেস্টুরেন্টে গিয়ে লাঞ্চ করব। আমার কন্যাটি সেই কথা বুঝল এবং ক্ষুধায় কান্না শুরু না করে চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসল। আমি নিকটস্থ কোনো রেস্টুরেন্টের খোঁজে পাগলের মতো গাড়ি চালাচ্ছি।

রাস্তাটি যখন নিচের দিকে নামতে শুরু করে তখনই পুরো উইন্ডস্ক্রিন জুড়ে উদ্ভা- সিত হয় সুবিশাল সেনেকা লেইকের বিপুল জলরাশি। হেলে পড়া দুপুরের আলোয় ঝলমল করছে। মনে হচ্ছে রাস্তাটি এখান থেকে গড়াতে গড়াতে সোজা নেমে গেছে লেইকের ভেতর। পাহাড়ি রাস্তার যা হয়, পাহাড়কে প্রদক্ষিণ করে নামতে থাকে বা উঠতে থাকে। এই পথটিও ডানে বাঁক নিল, ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে নামলো একটি প্রশস্ত বুলেভার্ডে, যেটি আমাদের নিয়ে গেল বেশ গোছানো, পরিচ্ছন্ন একটি শহরে। এটিই ওয়াটকিন্স গ্লেইনের সিটি সেন্টার বা শহরের কেন্দ্র। একটি শহরে যা থাকে, ব্যাংক, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, পোস্ট অফিস, রেস্টুরেন্ট, বার, শপিং মল, ফুয়েল স্টেশন সব পথের দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং ধীরে ধীরে সিনেমার দৃশ্যের মতো পেছনে সরে যাচ্ছে। এই পথেই আমরা ক্যাথেরিন কটেজে ফিরে যেতে পারব। গুগলে খুঁজে মুক্তি বের করেছে কার্লিস ফ্যামিলি রেস্টুরেন্ট, ওরাই ভেতরে বসে খাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। গুগল ম্যাপ আমাদের সেখানেই নিয়ে যাচ্ছে। তিন/চার মিনিট ড্রাইভ করার পরেই শহরের কোলাহল পেরিয়ে আবার নির্জনতা। খুব ছোট্ট শহর। ডানদিকে দানবের মতো উঁচু পাহাড়, ওয়াটকিনস গ্লেইন, বাঁ দিকে কিছুটা সমতল, যার পেছনে অন্ধকার অরণ্য। পাহাড়ের পাদদেশে, মূল রাস্তার ওপরে ওয়াটকিনস গ্লেইন স্টেইট পার্কের মূল প্রবেশ পথ, যেখানে আমরা ৮৩২টি সিঁড়ি ভেঙে আপার এন্ট্রান্স থেকে নেমে এসেছিলাম। হঠাৎ বাঁ দিকে খোলা চত্বরে বিশাল একটি আলবেনিয়ান পতাকা এবং এর নিচে চেয়ার-টেবিল পাতা উন্মুক্ত রেস্টুরেন্ট দেখে মুক্তি এবং আমি দুজনই আগ্রহী হয়ে উঠি। কসোভোর স্মৃতিগুলো যেন মুহূর্তের মধ্যেই বুকের ভেতর নড়ে-চড়ে উঠল। বুরেক, বিফ-গুলাশ, আঙুরের পাতার দোলমা, পোড়ানো ফাফারোনি ইত্যাদি খাবারের প্রতি নস্টালজিক হয়ে পড়ি। অপেক্ষাকৃত অনেকটা নির্জন এলাকায় কার্লিস ফ্যামিলি রেস্টুরেন্ট, পার্কিং লটে গাড়ি থামানোর পরেও মুক্তি নামছে না। আমি ওর মুখের দিকে তাকাতেই বলে,

বিফ গুলাশ আর বুক।

যাব?

হ্যাঁ, কিন্তু তুমি কি শিওর ওটা আলবেনিয়ান রেস্টুরেন্ট?

লাল জমিনের ওপর কালো শিপনঈয়া, এই পতাকাই তো ইস্কান্দার বে জিয়র্জি কাস্ত্রিয়তি নিয়ে এসেছিল তুর্কি শিবির থেকে।

মুক্তি আরও বেশি নস্টালজিক হয়ে পড়ে।

তাহলে চলো।

জলের মুখ কালো। সে ক্ষুধায় অস্থির। এ সময়ে এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে না। তবুও গাড়ি ঘোরালাম। গুলাশের লাল ঝোলটা খুব টানছে। বহুদিন শক্ত চারার মতো রুটি ‘বুক’ খাই না। ভেড়ার দুধের পনির আর পালং শাকের স্টাফড পরোটা ‘বুরেক’ তেমন স্বাস্থ্যকর খাবার না হলেও এর স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে।

কিন্তু অকুস্থলে গিয়ে আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হলো, ওটা আসলে একটি আমেরিকান বার, কিছু ফ্রাইড কালামারি আর বাফেলো চিকেন ছাড়া খাবার বলতে আর কিছুই নেই। যেটিকে আলবেনিয়ান পতাকা ভেবেছিলাম ওটা কোনো পতাকা নয়, লাল কাপড়ের ওপর একটি কালো ঈগল আঁকা। দুই মাথাওয়ালা শিপনঈয়া আলবেনিয়ানদের জাতীয় পাখি, দেখতে অনেকটা ঈগলের মতোই। কাল্পনিক এই পাখিটিই ওদের পতাকায় আঁকা থাকে।

আমরা আবার ফিরে এলাম কার্লিস ফ্যামিলি রেস্টুরেন্টে। মাস্ক পরে সবাই ভেতরে ঢুকলাম। দরোজায় বড় করে লেখা নো মাস্ক নো সার্ভিস। বেশ কোজি, চারজনের একটি টেবিল, দেখিয়ে দিল শ্বেতাঙ্গ সুন্দরী তরুণী ক্যালি। আঁটোসাঁটো পোশাক পরা স্লিম ফিগারের মেয়েটিকে মোটেও পেশাগত রেস্টুরেন্ট-কর্মী মনে হচ্ছে না। সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ওর মুখে হাসি লেগেই আছে, মনে হচ্ছে সদ্য কাস্টমার সার্ভিস প্রশিক্ষণ শেষ করেছে।

আমেরিকান রেস্টুরেন্ট, তবে বেশ কিছু ইটালিয়ান খাবার দেখা যাচ্ছে মেন্যুতে। জলের জন্য ইটালিয়ান চিকেন সরেন্টো, যাতে আছে রুটির প্রলেপ দিয়ে ভাজা চিকেন, সাথে মোজারেলা চিজ এবং বেগুন, মুক্তি পছন্দ করল হ্যাডক ফিশ, আমি নিলাম সিফুড আলফ্রেডো, নভো নিল ইটালিয়ান লাজানিয়া। সব আইটেমের সাথেই ফ্রি সাইড ডিশ আছে। স্যুপ, সালাদ, স্প্যাগেটি, ম্যাশ পটেটোর সাইড নিলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই টেবিল ভরে গেল। আমরা বুঝতে পারিনি ওদের খাবারের পোর্শন এত বড়ো। একেকটি ফ্রি সাইডই একজনের জন্য যথেষ্ট। আমেরিকায় স্যুপ খেয়ে আমি একদম মজা পাই না। ওদের স্যুপগুলো কারির চেয়েও ড্রাই। ক্যালি যে স্যুপ এনে টেবিলে রাখলো তা দেখে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এক বাটি ঝুরো মাংসে দুফোঁটা পানি। কিন্তু মুখে দিয়ে টের পাই দারুণ স্বাদের একটি আইটেম।

আমি সাধারণত ট্যাক্সের দ্বিগুণ টিপস দিই। তাতে ১৭ শতাংশের মতো হয়, আমি মনে করি এটিই যথেষ্ট কিন্তু মুক্তি সব সময়ই আরও বেশি দিতে চায়। এ-নিয়ে প্রায়ই আমাদের খুনসুটি হয়। আমি ভাউচার সাইন করে দেবার পর মুক্তি ওয়ালেটের ওপর আরও কিছু ক্যাশ রেখে এবারও আমার মেজাজ খারাপ করল। আমি কিছুটা অপমানিত বোধ করলাম।

কটেজে ফিরতে ফিরতে আর একটি কথাও বলিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares