বইকথা : তরুণদের ৭১ গল্প- বাংলাদেশ ও ভারত : ভারতবর্ষীয় বাংলাভাষীর বিশ্বকোষ : মোস্তফা মোহাম্মদ

‘পা আমার অনড় পাথর’― বই মেলা ২০২০-এ সংগৃহীত মোহিত কামাল সম্পাদিত তরুণদের ’৭১ গল্প : বাংলাদেশ ও ভারত গ্রন্থটি যখন পড়ছি তখন জীবন স্থবির, পা অনড়। প্রথম গল্প ‘পা’ আমাকে সে-কথাই স্মরণ করিয়ে দিলো―এ স্থবিরতা, এ অনড়তা স্বেচ্ছায় নয়, অনিচ্ছায় এক অলক্ষ্য রোগ ‘করোনা ভাইরাস’-এর জন্য। যার নাম ‘কোভিড-১৯’। চীনের উহান থেকে উৎপন্ন হয়ে গোটা পৃথিবীর মানুষকে হুমকিতে ফেলেছে―যুদ্ধ চলছে―প্রাণ ঝরছে―চলছে যুদ্ধজয়ের প্রচেষ্টা।

এরই মধ্যে অনেক গুণিজনই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ছাত্র-শিক্ষক- ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-কৃষক-কর্মজীবীসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ। এই গল্পগ্রন্থ যখন পড়া শুরু করলাম―মার্চ মাসের মাধ্যবর্তী সময়ে তখনও গ্রন্থের শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদানকারী, শব্দঘর-এর অন্যতম উপদেষ্টা জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আমাদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন। আর আজ জুনে যখন লিখছি তখন এই ঋষিতুল্য শিক্ষক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন করোনা ভাইরাসের আক্রমণে। এরই মধ্যে চলে গেলেন জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী এবং সংগীতজ্ঞ আজাদ রহমান―যাঁরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে ছিলেন উজ্জ্বল এবং প্রবাদপ্রতিম।

গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘পা’। গল্পকার অনিফ রুবেদ। চিকিৎসক সমাজের অচিকিৎসাসুলভ অমানবিকতার ছবি এঁকেছেন। এই ছবির মধ্য দিয়ে গল্পকার চিকিৎসা সমাজের কর্মদক্ষতাহীনতাকে তুলে ধরেছেন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীদাম তার পায়ের ঘা নিয়ে চলৎশক্তিহীন। ডাক্তারের দৃষ্টি এবং মনোযোগ শ্রীদামের পায়ের চিকিৎসা নয়, তার সুন্দরী বউ―ডাক্তার শ্রীদামের বউকে নিয়ে পালায়। পড়ে থাকে শ্রীদাম ও তার কন্যা। গ্রাম্য ডাক্তারের পরামর্শে শ্রীদামের পা কেটে ফেলা হয়। শ্রীদামের শুরু হয় কষ্ট। ক্ষুধার জ্বালা নিবারণের জন্য রান্না করা হয় কাটা পা। বাস্তবতাতিরিক্ত কিংবা অতিবাস্তব চেতনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় গল্প। চিহ্নিত হয় চিকিৎসা ব্যবস্থার চেহারা ও সামাজিক ক্ষোভ। গ্রন্থটি পাঠে অন্তত অনড় ও স্থবির জীবনে প্রাথমিকভাবে শান্তি ও স্বস্তি পাওয়া গেল।

অবিভক্ত ভারতবর্ষের কথা যদি বলি―অর্থাৎ ১৯৪৭ পূর্ব ভারতবর্ষের কথা; তবে বলতেই হয় পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মিজোরাম এবং আজকের বাংলাদেশ তথা ১৯৭১ পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা-ব্যবধান বাদ দিলে পূর্ব-পাকিস্তানের কথা―বাংলা ভাষাভাষী বৃত্তের জনগোষ্ঠীর কথা। এই জনপদের মানুষের ভাষাশৈলী, জীবনযাত্রা-প্রণালি, পোশাক- আশাক, খাদ্যরুচি ও খাদ্যাভাস, সামাজিকতা, প্রেমপ্রণালি, বৈবাহিক- জীবনযাত্রা ইত্যাদিতে কিঞ্চিৎ পার্থক্য থাকলেও বৃহত্তর ক্ষেত্রে এক এবং অভিন্ন। এই বৃহত্তর বাংলাভাষাী জনগোষ্ঠীর জীবনকথা নিয়ে মোহিত কামাল সম্পাদিত তরুণদের ’৭১ গল্প: বাংলাদেশ ও ভারত গ্রন্থটি আমার দৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য বলে মনে হয়েছে। উল্লেখযোগ্য এ জন্য যে, গ্রন্থটিতে বাংলাদেশ ও ভারতের গল্পকারদের ৭১টি গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। বাংলাদেশ পর্বের ৩৬টি এবং ভারতীয় পর্বের ৩৫টি গল্প নিয়ে সম্পাদিত গ্রন্থে বিষয়বৈচিত্র্য, চরিত্রচিত্রণের মাধ্যমে এক নতুন বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর ঠিকানা খুঁজে পাই মলাটবন্দি ৬৮৭ পৃষ্ঠার মধ্যে। ভারতীয় পর্বে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম উপ-বিভাগে বিন্যস্ত। আর বাংলাদেশ পর্বে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের জীবনকথা পরিবেশিত হয়েছে।

‘এক রাতের বিনিময়ে’ গল্পটিতে গল্পকার কাজী রাফি প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন―আজকের মহাস্থান―বর্তমান বগুড়া জেলার এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে ঘিরে গল্পের জাল বুনেছেন। মরিয়ম নামের এক বিধবা নারীর সংগ্রামমুখর জীবনের টানাপোড়েন আমাদের কখনও নিয়ে যায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো প্রত্নসম্পদে ভরপুর জীবনে―নাগরিক জীবনে―খনন কাজের মাধ্যমে। এ যেন মাটি খুঁড়ে জীবন বের করে আনা অথবা মরিয়মের জীবন ও যৌবন খুঁজে প্রত্নসম্পদ আহরণের কথা। এমনি জীবন ও যৌবন-ঘেঁষা গল্পকথায় ঐতিহাসিক পুণ্ড্রবর্ধনখ্যাত রাজকন্যা ‘শীলাদেবীর সাথে আজকের মরিয়মের যৌবনগাথা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ইতিহাস ও পুরাণ ঘাঁটলে দেখা যায় ‘শ্রীলাদেবীর শাটখ্যাত অপূর্ব রাজকন্যা শীলাদেবীর জীবন ও যৌবন বাঁচাতে করতোয়ার জলে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন আর আজকের মরিয়ম―সংগ্রামী মরিয়ম প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন নারীলোভী-অর্থলোভী আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতা-গুণ্ডা-বদমাশদের বিরুদ্ধে:

‘এক ভোররাতে কেবা কারা তার জানালায় এসে কড়া নাড়ল। মরিয়ম ভিতর থেকে প্রশ্ন করল―

কে?

তারপর এক পুরুষ কণ্ঠ সরাসরি তাকে এক প্রস্তাব দিয়ে বসল―স্বামী নাই, শরীলডা তো আছে। ওই দিকে দরজা খোলো। কেউ জানতে পারবে না। মরিয়মের ঠোঁট কাঁপল। কিন্তু হৃদয় শক্ত হয়ে উঠল। বাবা তাকে ভয় পেতে নিষেধ করতেন―’ (কাজী রাফি; এক রাতের বিনিময়ে; পৃষ্ঠা ৭৭)।

গল্পটাতে প্রাচীন এবং নবীন, বর্তমান এবং অতীত, ইতিহাস-ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে অপরূপ শিল্পপ্রতিমা চিত্রিত হয়েছে। আঞ্চলিক শব্দ প্রয়োগের মুন্সিয়ানা লক্ষ্যযোগ্য।

সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনায় খালিদ মারুফ রচিত ‘সময়, স্তব্ধ হও!’ গল্পে ঝঃৎবধস ড়ভ ঈড়হংপরড়ঁংহবংং-এর বুননে গল্পের বিন্যাস লক্ষ করা যায়, ‘নুসরাত। আমাকে ভালোবেসেছিল, বেসেছিল কি? আমাকে নিয়ে সুখী হতে চেয়েছিল? না। সুখী হতে চায়নি। আমাকে বিয়ে করবে, করতে চায়, এমনটা বলেনি কখনও। এই শহরে ভালোবেসে সুখী হওয়ার একমাত্র উপায় বিয়ে করা, নুসরাত আমাকে বিয়ে করতে চায়নি।’ (খালিদ মারুফ; সময় স্তব্ধ হও; পৃষ্ঠা ৯৬)।

নুসরাত চরিত্রের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি তার ব্যক্তিজীবন ও বহিরাঙ্গিক জীবন- বাস্তবতায় ঘুরপাক খায়। বৃত্তাবদ্ধ জীবন ও বৃত্তাবদ্ধ জীবনের বাইরের অনুষঙ্গকে তুলে ধরেছেন আধুনিক শিল্পকুশলতায়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিল্পমাধ্যমের মেলবন্ধনে গল্পটি অতুলনীয়। বৃত্তের বাইরেও বৃত্ত ভাঙার আকুতি নিয়ে অনন্য গল্প সংযোজিত হয়েছে গ্রন্থে।

চন্দন আনোয়ার রচিত ‘ত্রিপাদ ঈশ্বরের জিভ’ গল্পে বিষ্ণু কামার একজন নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষ―বিষ্ণু শোষিত শ্রেণির প্রতিনিধি। আর কলেজ শিক্ষক ড. ফেরদৌস একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। সম্পত্তিলোভী একদল মানুষের মানসিক বিভ্রমের প্রতিফলন ঘটেছে গল্পে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দেশচিত্র সংবলিত গল্পটিতে মানুষের আহাজারি ফুটে উঠেছে :

‘মাতৃভূমি, পৈতৃক ভিটা-বাড়ি- সম্পত্তিতে এরা নিজেরাই শত্রু! ওদের সম্পত্তি শত্রুর সম্পত্তি! ওদের ভিটে-সম্পত্তি দখলের মহোৎসবের প্রত্যক্ষদর্শী আমি। এ শহরের অর্ধেক সম্পত্তির দলিল আছে আমার কাছে। তাই ওরা আমার জিভ কেটে ফেলতে মরিয়া, দলিলগুলো ভস্ম করে ফেলতে মরিয়া। মুক্তিযুদ্ধে যারা হিন্দুর সম্পত্তি-লুট করে ভিটে-বাড়ি দখলে নিয়েছে, তারাই আমার মৃত্যুর অপেক্ষায়, আমার জিভ কেটে নিয়ে আপাত নিরাপদ হতে একাট্টা।’ (চন্দন আনোয়ার; ত্রিপাদ ঈশ্বরের জিভ; পৃষ্ঠা ১২৬)

কলেজ শিক্ষক ড. ফেরদৌস-এর জবানিতে গল্পকার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দেশচিত্র তুলে ধরেছেন।

‘সাক্ষী ছিল পক্ষী সকল’ গল্পে বাদল সৈয়দ এক মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী জীবনকাহিনীর নিটোল বয়ান করেছেন। ৭১-এর প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈনিক আনোয়ারের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ দেখে তার বাড়ির ঠিকানা খুঁজে বের করার মুন্সিয়ানায় গল্পকার সার্থকতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একাধিক গল্প এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে। ‘শিথানে শেখ সাব’ নামক গল্পে মনি হায়দার স্বপ্ন-বাস্তবতার মিশেলে এক বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা রফিকউদ্দিনের মনোবাঞ্ছা পূরণের কথা বর্ণনা করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা রফিকউদ্দিনের যুদ্ধকালীন স্মৃতি এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকাশিত হয়েছে গল্পে। এই গল্পে বঙ্গবন্ধু হত্যার কাহিনি সম্পর্কে জানা যায়।

বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতা লাভ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অনেক রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে এদেশের মানুষ স্বাধীনতা লাভ করেছে। সেদিক বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জীবনকে ও জীবনের অনুষঙ্গগুলোকে বৈচিত্র্য দান করেছে। সেই মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সাহিত্যাঙ্গনকেও করেছে সমৃদ্ধ। সেই সমৃদ্ধিমানতা আমরা লক্ষ করি এই সংকলনে। অনেক লেখকের হাত হয়ে বিচ্ছিন্ন চিন্তাধারাগুলো, বহু মানুষের রক্তস্রোতে মিশেছে একই গঙ্গাধারায় যা একটি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ অন্যতম বিষয় হলেও সংকলিত গ্রন্থে জীবন ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সবগুলো দিকই উঠে এসেছে লেখকদের তুলির আঁচড়ে।

‘যুদ্ধ পুরাণ’ বিস্তারিত বিবরণ গল্পে মাহফুজ রিপন মিরপুরের ‘জল্লাদখানা’ খ্যাত বধ্যভূমির বর্ণনা দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকবাহিনীর দোসর রাজাকার-আলবদর ও বিহারিদের নির্মম নির্যাতনে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নিহত মানুষের হত্যাকাণ্ড সংবলিত গল্পটিতে গল্পকার ইতিহাস চেতনা, গল্পরচনা ও মুন্সিয়ানায় পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। মানুষ কতটুকু নির্মম হতে পারে তার উল্লেখযোগ্য নিদর্শন গল্পটি। আর মানুষ কতটুকু অমানবিক হতে পারে সে বিষয় নিয়ে লিখিত মাহবুব ময়ূখ রিশাদ-এর ‘মৌরিতানিয়ার বাবা’, গল্পটি প্রাসঙ্গিকতা বিচারে উল্লেখের দাবি রাখে। মানুষ আর মানবিক গুণাবলি বিবর্জিত ধর্মধ্বজী আবদেল চরিত্রটির মধ্য দিয়ে সমাজ-সত্যকে তুলে ধরেছেন গল্পকার। পুরনো মূল্যবোধ ও ধর্মধ্বজী অহংয়ের কাছে অনড় আবদেল―মৌরি ও তানিয়া গল্পে উজ্জ্বল আশাবাদ জুগিয়েছেন।

তরুণদের ৭১ গল্প: বাংলাদেশ ও ভারত গ্রন্থে বাংলাদেশ পর্বের ৩৬টি গল্পে এত বিচিত্র বিষয় পরিবেশিত হয়েছে যে, বলতে গেলে ৩৬ জন লেখকের লৈখিক-চিন্তনের আলাদা-আলাদা অনুষঙ্গ হলেও সার্বিক বিচারে মুক্তিযুদ্ধ, মানবিকতা, সামাজিকতা, সামাজিক রুচিবোধ, কল্যাণাকাক্সক্ষা, দেশিচিন্তা, প্রেমাকাক্সক্ষা, বিরহকাতরতা, নারীবাদী মনোভঙ্গি, চেতনাপ্রবাহরীতিসহ সাহিত্য- বিষয়ক অনুভাবনাগুলো লক্ষ করা যায়।

গ্রন্থটি পাঠে পাঠক আনন্দরস অনুধাবন করতে পারেন নিঃসন্দেহে। আফসানা বেগমের ‘যেতে যেতে’, আশান উজ জামান-এর ‘ছিন্ন ছায়া ভিন্ন ছবি’, নাহিদা আশরাফীর ‘প্রুফ রিডার’―কখনও আনন্দ কখনও বা বাস্তুবনিষ্ঠ সত্যের কষাঘাতে সজাগ করে তোলে পাঠককে।

বাংলাদেশ পর্বের স্বনামখ্যাত গল্পকার প্রশান্ত মৃধার ‘অসুখের পটভূমি’ গল্পে নিনা, নাজনিন ও রুবাইয়াৎ চরিত্রের নানাবিধ আচরণের মধ্য দিয়ে নিনার অসুস্থ বাবার আদ্যোপান্ত বর্ণনা পাওয়া যায়। দু-একটি বাক্যিক অসঙ্গতি ছাড়া মোটামুটি নিটোল গল্প বলা যায়। অসঙ্গতিগুলোর মধ্যে:

‘তারপর বিছানায় বসেছে, বাবাকে ভেবেছে কি ওড়নায় চাবি বেঁধে রান্না করতে মাঝখানে ফাঁকা চৌকো এই গেস্ট হাউসের বিপরীত কোনায় রান্নার রুমের দিকে গেছে।’ (প্রশান্ত মৃধা; অসুখের পটভূমি; পৃষ্ঠা ১৬৩)

‘সেই সন্ধ্যায় নিনা রুবাইয়াত নিয়ে চলে আসে। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৬৭)

বাক্য দুটির অসঙ্গতি থাকায় অর্থ দাঁড়ায়নি। গল্পকার মনোযোগ দেবেন বলেই আমার বিশ্বাস। আর ‘মুখোশবিহীন’ গল্পে হামীম কামরুল হক এক নিঃশ্বাসে একটি গল্প বলেছেন। যতিচিহ্নের মধ্যে শুধু ‘কমা’ এবং ‘ড্যাস’ ব্যবহার করেছেন। শেষ করেছেন একটি ‘দাড়ি’ ব্যবহার করে। নতুন এক্সপেরিয়েন্ট। পাঠক হিসেবে পড়ার সময় মস্তিষ্কে চাপ পড়ে এবং শ্বাসকষ্ট হয়। গল্পকারকে ধন্যবাদ।

২.

তরুণদের ৭১ গল্প: বাংলাদেশ ও ভারত গল্পগ্রন্থে ভারতীয় পর্বে ৩৫টি গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। এই পর্বের তিনটি উপশিরোনাম পর্বে আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ― গল্পগুলোকে ভাগ করা হয়েছে। আসাম পর্বে ৫টি, ত্রিপুরা পর্বে ৪টি আর পশ্চিমবঙ্গ পর্বে ২৬টি গল্প স্থান পেয়েছে।

ভারতীয় পর্বের শুরুতেই স্থান পেয়েছে ‘গড়গড়ির উইঙ্কল থেরাপি ও মেলভিল ডিউই সাহেব।’ এই গল্পে মানুষের একটা সহজাত ধর্ম প্রকাশিত হয়েছে―আর তা হলো যে মানুষ―মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ। দেশ-গোত্র-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা তাকে যতই আলাদা করুক-না-কেন তার আঙুল কাটলে একই লাল রক্ত বের হয়―যেমন নদী যে-দেশ থেকেই প্রবাহিত হয়ে আসুক-না-কেন তা নদীই থাকে। এই অমোঘ সত্য কথাটিই এই গল্পের শিক্ষণীয় বাণী। আর ‘অলৌকিক কাঁঠালিচাঁপা ও একটি প্রেমের গল্প’ শিরোনামাঙ্কিত কথকতার মাধ্যমে কান্তারভূষণ নন্দী অমর ও সর্বজনীন প্রেমের বাণী শুনিয়েছেন পাঠককে। তুহিন ও মায়াদি’র নিটোল প্রেমের কাহিনি নিয়ে গল্পটি টানটান উত্তেজনায় পূর্ণ। খুব আনন্দদায়ক এবং শিক্ষণীয়ও বটে। প্রেম আর সংসারধর্ম এক নয়―প্রেম দিয়ে জগৎ ও জীবনের সবকিছু জয় করে নিতে হয়। মানব জীবনে পরাজয়, গ্লানি, দুঃখকষ্ট নিত্যসঙ্গী। সুখ স্বল্পায়ু এ রকমই দুঃখ নিয়ে রচিত ‘অন্তর্গত রক্তের ভিতর’ গল্পটি। মেঘমালা দে মহন্ত রচিত গল্পে প্রাকৃত জনপদের নারীজীবনের―নারী জীবনেরই নয় শুধু―সঠিক মানবজীবনের কষ্টকাহিনি পরিলক্ষিত হয়। অন্ত্যজ- অশিক্ষিত গ্রাম-গল্পটি জীবনকাহিনিনির্ভর এই গল্পে সভ্যতার অগ্রসরমানতা ও গ্রামজীবনের দুস্তর ফারাক লক্ষ করা যায়। এক মা ও তার মেয়ের নিত্যনৈমিত্তিক বয়ে চলা দিন থেকে।

ভারতীয় পর্বের ত্রিপুরা উপ-পর্বের ‘আইজলের বিষপাখি ও একটি বদলির আদেশ’ গল্পে কিশোরঞ্জন দে পাঠককে নিয়ে যায় পাহাড়ি জনপদ ‘আইজল’ ও ‘খজলের’ সৌন্দর্যমণ্ডিত জীবন কথায়। দুই শহরের তুলনামূলক সৌন্দর্য বর্ণনার মাধ্যমে গল্পকারের তুলিতে চিত্রিত হয় এক নিটোল পারিবারিক-সামাজিক ও রাষ্ট্রিক জীবনের স্কেচ―যার মধ্যে ভূ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রেম-বিরহ, কামনা-কাতরতাসহ জীবনের প্রায় সবগুলো অনুষঙ্গই উপস্থিত হয়―ধরা দেয় এক অনাবিল জীবনবোধ। আর এই বিচিত্র জীবনের বিস্তৃত অভিজ্ঞতায় পূর্ণতা পায় শ্যামল বৈদ্য রচিত ‘পাপপিপাসা’ গল্পে। এই গল্পে মানবজীবনের পাপ- অপাপ, পূর্ণতা-অপূর্ণতা, প্রেম-পবিত্রতা বিষয়ক কথকতা পরিবেশিত হয়েছে। মানবজীবনে পাপ আসলে মনে―শরীরে নয়―এ কথার তুলনামূলক বয়ান এসেছে এই গল্পে। প্রাচ্যদেশীয় পৌত্তলিক ধর্মবিশ্বাসের এবং পাশ্চাত্য যুক্তিবাদী দর্শনের আলোকে দেখলে―আলোচনা করলে জ্ঞান লাভ করা যায়। এক্ষেত্রে বলা যায় যে, মানবজীবন সরলরৈখিকভাবে চলে না সারাক্ষণ―মানবজীবনে বক্রতা, ক্রুরতা থাকবেই তার নিদর্শন দেখা যায় শ্যামল ভট্টাচার্য রচিত ‘জ্যামিছলঙ’ গল্পে। এই গল্পে অনুগল্পের মধ্য দিয়ে বৃহৎ জীবনের অনুসন্ধানের অভিলাষ। গল্পকার অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে মানুষের জীবনের অন্তর্নিহিত বিষয়াদির সন্ধান করেছেন―গতি-প্রকৃতি ও বিভিন্ন বাঁককে তুলে ধরেছেন।

তরুণদের ৭১ গল্প: বাংলাদেশ ও ভারত গল্প গ্রন্থের ভারতীয় পর্বের ৩৫টি গল্পের মধ্যে ২৬টি নেওয়া হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এই পর্বের গল্পগুলো তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ। বিষয়বৈচিত্র্যে, শব্দচয়নে, চিন্তনে এবং অনুভূতিতে অগ্রসরমানও বটে। রাখ-ঢাক, ভয়-ভীতি এবং আড়ষ্টতাহীন পরিণত জীবনের কাহিনি বলায় কিংবা বিজ্ঞানমনস্ক প্রগতিবাদী, রাজনীতি সচেতনতায় এঁরা অগ্রগামী। বাস্তবানুগ অথবা চেতনানির্ভরতায় কিংবা প্রেম ও যৌনতার বর্ণনায় এই পর্বের গল্পকারগণ সাহসীও বটে। এই পর্বের গল্পে মানুষের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় আমরা সমৃদ্ধ হই। অনির্বাণ বসুর ‘অস্ত্রের গৌরবহীন একা’ গল্পে রূপকাশ্রয়ের মাধ্যমে জীবন-জগৎ-সমাজ-রাজনীতি সম্পর্কে চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন গল্পকার। একাধারে আনন্দদায়ক এবং শিক্ষণীয়ও বটে। আর ভারতীয় সুন্দরবন সীমান্ত কিংবা বঙ্গোপসাগরে মাছধরা―বিশেষত জেলেজীবনের কষ্টকরুণ জীবনকাহিনি নিয়ে রচিত অভিজিৎ চৌধুরীর ‘সাত মৃতদেহের সন্ধানে’ গল্পটি। জাল-জলা ও জেলেজীবনের সংগ্রামমুখর এই গল্প থেকে আমরা শ্রেণীবৈষম্যের কথায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। নিম্নবিত্ত এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন নিয়ে এই পর্বে আরও একাধিক গল্প সংযোজিত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তনুশ্রী পাল রচিত ‘টিপ’ গল্পটি। এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিস্তর জীবনের অর্থকষ্টের বর্ণনায় পাঠক নিজেকে সমৃদ্ধ করবেন―মানবিক হয়ে ওঠার প্রণোদনা পাবেন। জীবনের নানা বাঁক ও অভিঘাত তুলে আনার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ পর্বের গল্পকারগণ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। সমাজ-শৃঙ্খলা কিংবা শাসকশ্রেণির অপশাসন অথবা বৈষম্যপীড়িত জীবনের কথা এঁরা অবলীলায় বর্ণনা করেছেন কিংবা দার্শনিক মতবাদের আলোকে চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন। ‘প্রকৃতি’ গল্পে তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনা থেকে তার প্রমাণ মেলে। এই পর্বের গল্পকারগণ ভারত-বাংলাদেশের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঘটনাবলির অনুপুঙ্খ বর্ণনায় উঠে এসেছে নানা কথা। ‘বিভাজন’ গল্পে তন্বী হালদার মৎস্যজীবী অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের জীবনকথা বর্ণনাসাপেক্ষে দেশভাগের কথা তুলে ধরেছেন। দেশভাগের কষ্ট, দেশভাগের ক্ষতি ও ক্ষত, দেশভাগের অন্তর্নিহিত যন্ত্রণার কথায় আমরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। আর দেবতোষ দাশ রচিত ‘চামরমনি চালের ভাত ও বোয়ালের ঝাল’ গল্প থেকে উমাদা চরিত্রের দেশভাগজনিত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ের আকুতিতে আমরা ফিরে যাই অবিভক্ত ভারতবর্ষের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের কাছে।

ধর্মীয় অনুভূতিতে সৃষ্ট দেশভাগ ভারতবর্ষের মানুষকে রক্তাক্ত করছে, ক্ষতবিক্ষত করেছে―গল্পকার বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক নানা অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে সেই অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করেছেন। এই পর্বের গল্পে কখনও ব্যক্তি থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র, রাষ্ট্র থেকে বিশ্ববীক্ষায় গতায়াত। শিল্প-সমাজ গড়ে ওঠে ব্যক্তির ঘামে, শ্রম ও নিষ্ঠায়। সেখানে ব্যক্তি কখনও দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্য অবস্থায় থেকে যায়। এক্ষেত্রে পরিবর্তমান পৃথিবীতে বদলায় মানুষ―কল্পনাশক্তি, চিন্তাশক্তি, শিল্পসমাজ-সংস্কৃতি― সিনেমার মতো জীবনেও কিংবা জীবন থেকেই সিনেমায়। ব্যক্তি টের পায় না―টের পায় যখন তখন সে বেরিয়ে আসে নিজের গণ্ডি থেকে―এই গণ্ডিবদ্ধ জীবন থেকে বেরিয়ে আসার গল্প মানস সরকার-এর ‘সিনেমার ভিতরে আমি’।

প্রেম শাশ্বত ও চিরন্তন। প্রেম মানুষকে মানবিক ও কল্যাণকামী করে তোলে। ব্যক্তিপ্রেম, মানবপ্রেম, দেশপ্রেম―নানা অভিধায় প্রেম হাজির হয়। প্রেম মানুষকে আশাবাদী করে তোলে। এ রকমই একটি আশাবাদী নিটোল প্রেমের গল্প ‘কেরা’। মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য এই গল্পে স্বাগতম, সঞ্চারী, পাসিরা ও স্কুলশিক্ষকের নিটোল প্রেমকাহিনির মাধ্যমে সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়টি পাঠককে আকর্ষণ করবে নিশ্চয়। প্রেম-প্রকৃতিচিন্তা- ক্ষুধা-দারিদ্র্য-দেশভাগ নিয়ে এই পর্বের গল্প যেমন ভাবায় তেমনি চেতনার জগৎ থেকে অবচেতন কিংবা অচেতন জগতে নিয়ে যায় গল্পকার। যশোধরা রায়চৌধুরীর ‘লেডিস কম্পার্টমেন্ট’ গল্পে আমরা মানবজীবনের মানবসমাজের অজন্তরস্য ক্রোধ, ঘৃণা, দাহ, ষড়যন্ত্রসহ সমাজের পঁচা-বাসি-দুর্গন্ধময় দিকগুলোর দিকে গল্পকারের ইঙ্গিতবাহী বর্ণনায় ঋদ্ধ হই। সমাজের স্থিতি ও কল্যাণের জন্য তা খুবই জরুরি।

মোহিত কামাল সম্পাদিত, বিদ্যাপ্রকাশ কর্তৃক প্রকাশিত ৬৮৭ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি একটি নিটোল-সুন্দর প্রকাশনা। তরুণদের ৭১ গল্প: বাংলাদেশ ও ভারত―এই নামকরণের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এবং এর অন্তর্নিহিত সত্তার আলোকে প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। ধন্যবাদ শিল্পীকে। সম্পাদক এবং সম্পাদনা-পর্ষদকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এ রকম একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ উপহার দেবার জন্য। তবে একটি কথা না বললে আমার নিজের প্রতি অবিচার করা হবে বলেই মনে করি। গ্রন্থের অসংখ্য গল্পে ব্যবহৃত ‘―’, ‘ড্যাশ’কে ‘হাইফেন’, ‘-’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কম্পোজিটর একটু খেয়াল করে ইংরেজি টাইম ফন্ট থেকে ‘ড্যাশ’ কপি করে আনলেই এই সমস্যা মিটে যাবে। পরবর্তী সংস্করণে সমস্যাটি মিটে যাবে আশা রাখি। ধন্যবাদ প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট সকলকে। উপরন্তু, এই গ্রন্থে টিকা-টিপ্পনী এবং লেখকপঞ্জি সংযোজিত হলে গ্রন্থটির মাহাত্ম্য বেড়ে যাবে এবং পরবর্তী গবেষকগণ উপকৃত হবে বলে মনে করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares