বইকথা : ধ্রুপদী কবিতার ঐশ্বর্য ও মহত্তম মহিমা : জোবায়ের মিলন

কবি নওশাদ জামিল-এর নতুন (অমর একুশে গ্রন্থমেলা- ২০২০) ও চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ প্রার্থনার মতো একা। গ্রন্থটিতে গ্রন্থিত হয়েছে নতুন আটচল্লিশটি কবিতা। প্রতিটি কবিতায় সময়ের উপস্থিতি সরব। মনের অন্তঃস্তলের বিরাজমান ভাব-আবেগ, বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, দক্ষতা, বিচক্ষণতা, প্রেম, শাশ্বত সম্পর্কের সূত্রাবলি উজ্জ্বল। ছবি, ছক, কল্পনা, ভাবনা, নির্মাণ, রঙ, মসৃণতা আলাদা ও অনন্য। কবি অভয়কে মননে স্থান দিয়ে বলেছেন সত্য, সাহসী কথা। এঁকেছেন বোধের ভেতর দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনের কথা যে আগুন মানুষের কাম্য নয়, যে আগুন পুড়িয়ে ছারখার করে নন্দিত কানন; যে আগুন ছাই করে ছাড়ে বৃক্ষের ছায়াঘন ছায়া। এসব কথা প্রার্থনার মতো একা গ্রন্থের কোনো কবিতায় বলা হয়েছে সরাসরি, কোনো কবিতায়  উচ্চারণ করা হয়েছে নাম নিয়ে―চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে সমাজ, সংসার, দেশ, রাষ্ট্র, আর বিবেকের চ্যুতি-বিচ্যুতির আকাশ। ‘এ কেমন ঢেউ? ভালোবাসা ভেসে যায়/ ঘৃণার সাগরে ডুবে যায় আবরার/ ক্ষোভের তুফানে চুরমার সবকিছু/ মানবদরদি কোথাও কি নেই আর?/ ঘৃণার সাগরে উঠেছে মরণঢেউ/ তুমুল আঘাতে মানবতা বরবাদ/ মানুষ মরছে, পৃথিবী কাঁদছে আজ/ এ ঢেউ রুখবে, আছে কি প্রেমের বাঁধ?/ দানব পেতেছে কাঁটার করুণ ফাঁদ/ মানব তুমি কি গুটিয়ে থাকবে বসে?/ পশুরা হাসছে, শিশুরা কাঁদছে আজ/ বন্ধু, দাঁড়াও- মানুষকে ভালোবেসে।/ মানুষ বাঁচাও, বাঁচাও সবুজ গ্রহ/ বন্ধু, প্রেমের পথে নিশিদিন রহো।’ (আবরার)। সভ্যতার সভ্য বসুন্ধরায়ও অসভ্যতা যখন মাথা তুলে দাঁড়ায়, শ্রীহীনতা যখন সুশ্রী মুখে এঁটে কুশ্রী কাজে মত্ত হয়ে থাবা বসায় প্রাণের পালকে, এলোমেলো করে দিতে চায় যাপিত জীবনের নাকছাবি তখন কবি নওশাদ জামিল চুপ করে থাকেন না। তার মনুষ্যত্বের জায়গা থেকে প্রতিবাদ করেন, কবিতায় তুলে ধরেন নিকৃষ্টতার কথা। যেমন : ‘আগুন-নদীতে ডুবিয়ে দিলাম তোকে/ বোন, তোর দেহে ফুটেছে রক্তজবা/ পুড়তে পুড়তে হয়েছিস খাঁটি হীরে/ অধমের শিরে, তুই তো মুকুটশোভা!/ কিশোরী শরীর গলতে গলতে তোর/ হয়েছে ভস্ম, হয়েছে নিকষ ছাই/ বোন, তোর দেহ মোমের পুতুল নয়/ জ্বেলে দিলি এ কী অম্লান রোশনাই!/ অঙ্গার বুকে তরঙ্গ ছিল তোর/ জ্বলতে জ্বলতে তাই দিয়ে গেলি নাড়া/ তুমুল দুলুনি আছড়ে পড়েছে আজ/ আয় ভাইবোন, শান দিই শিরদাঁড়া!/ মরার আগেও ছাইমাখা মুখে তোর/ ফুটেছে ফুলকি, দারুণ অনলপ্রভা/ দাউদাউ পুড়ে জ্বেলেছিস দীপশিখা/ আধমরা দেশে, তুই তো মুকুটশোভা!’ (নুসরাত)। আমাদের ভরাট চারপাশ দিন দিন শূন্য হয়ে যাচ্ছে। আপন সম্পর্কের সুতা ছিঁড়ে আমরা দিন দিন হয়ে পড়ছি একা। পারস্পরিক আপন-আত্মা থেকে আমরা নিজেরাই নিজেদের করে দিচ্ছি পর। বড় ঘর ভাঙতে ভাঙতে ছোট একঘরে আজকে নিপতিত নিজেরই অজান্তে! এ চিত্র কি মঙ্গল? দিন দিন দলছুট হয়ে কতটুকু ভালো আছি, ভালো থাকতে পারছি? কবিকে প্রশ্নগুলো তাড়া দিয়েছে, তাড়িত করেছে, ভাবনায় ফেলেছে; কবি অতিদূর চেয়ে দেখেছেন কেবল শূন্যতা―যে শূন্যতার পূর্ণতা নেই, তাই কবি তার কবিতায় উল্লেখ করেছেন সহস্র বেদনার ব্যথী হয়ে― ‘নদীর কিনার ঘেঁষে ওড়ে কিছু পাখি/ উড়তে উড়তে কেউ দেয় পিছুটান/ মেদুর আকাশে একাকী সাঁতার কেটে/ দলছুট পাখি রাখে কি প্রেমের মান?/ পাখির ডানায় দারুণ তুফানমেল/ উড়িয়ে দিয়েছে ব্যথাতুর সব মায়া/ মানুষ জানে না তারা বহুদূরগামী/ মানুষের মনে আছে কি পাখির ছায়া?/ দলকানা সব মানুষের ভিড় ছেড়ে/ নির্জন নদীতীরে আমি থাকি একা/ চারদিকে আর মানববসতি নেই/ শূন্যতা যার ―তার কিছু নয় ফাঁকা।/ সব কিছু ছেড়ে উড়াল দিয়ো না আর/ ঘরহারা পাখি ফেরে না তো বারবার।’ (দলছুট পাখি)। কবিতাগুলোতে নেই মেদ, নেই অকারণ বহুল শব্দের ব্যবহার, বাক্যের অকারণ বৃদ্ধি। কবি যাপিত জীবনের ব্যঞ্জনাকে সময়ের প্রবাহমানতা থেকে পেশাজীবী জেলের মতো জাল দিয়ে ছেঁকে তুলে এনে সময়োত্তীর্ণ করে সময়ে প্রক্ষেপণ করবেন, এটাই কবির ধর্ম। এটাই কবির কবিত্ব। কবি নওশাদ জামিল সে কাজটি করেছেন নীরবে, নিপুণভাবে। তিনি আরও ব্যক্ত করতে চেয়েছেন সেই মানুষদের কথা যে মানুষরা পাথর চাপার নিচ থেকে বলতে পারেন না, যা তারা বলতে চান। শুধু কি বিদ্রোহ! না; কবি নওশাদ জামিল শাশ্বত প্রেমকেও উজিয়েছেন শুদ্ধতার  কাব্য-রঙ আর রঙের ব্যবহারে; এই রঙ কবির একান্ত নিজের। ‘তোমার ইশারালিপি পাঠ করি ধীরে/ মনে হয়―আমরা ছিলাম মুখোমুখি/ গুহার ভেতরে, অগ্নিপরিখার ঘরে/ একদিন-নিজেরই গলার স্বর শুনে/ বুঝি যে চিৎকারে কেঁপে ওঠে শিলাখণ্ড/ দুলে ওঠে প্রত্নত্রস্ত পূর্ণাঙ্গ শরীর/ এতদিন কী দেখেছি―একে একে বলি/ গুমোট, দুঃসহ―ভারী সেই নীরবতা।/ অগ্নিপরিখার ঘরে দাঁড়াই আবার/ দেখি আজ হাওয়ায় দুলছে বনলতা/ কাঁপছে উদ্ভিন্ন স্তন তীব্র শিহরণে/ একদিন নিজেরই গলার স্বর শুনে/ বুঝি যে বিস্ফারে কেউ চলে যায় দূরে/ কেউ থেকে যায়― মুখোমুখি গুহাঘরে।’ (ইশারালিপি)। উগ্র আর ঘোড়দৌড়ে মত্ত এই মাতাল কালে গদ্যকবিতার নামে যে যা-ইচ্ছা-তাই কবিতার চর্চা চলছে এখানে―প্রার্থনার মতো একা গ্রন্থের কবিতা তা থেকে একেবারেই ভিন্ন। উপস্থাপিত কবিতাগুলো খেয়াল করলে দেখা যায়, ছবি ও চিত্রের সাথে ছন্দময়তার এক দারুণ দোল-খেল রয়েছে; যা নির্মল পাঠানন্দ দেয়। দুই ভাগে বিন্যস্ত এই কাব্যগ্রন্থটিতে পাঠক দুটি স্বাদ পাবেন―প্রথমটিতে কবি স্থান দিয়েছেন তার আটত্রিশটি সাধারণ কবিতা। দ্বিতীয় ভাগে কবি রেখেছেন তার নতুন প্রয়াস ‘দশপদী’ দশটি কবিতা। ‘চেতনার দ্বারে কড়া নেড়ে/ কোনোদিন মেলে না প্রণয়/ অন্ধ হও, অন্ধজন জানে/ সত্যিকার প্রেম দূরে নয়।/ স্মৃতিগন্ধা জেগে ওঠে আজ/ অন্ধ হৃদয়ের এক কোণে/ অচেতনে ফুটে ওঠে ফুল/ তার গন্ধ মেলে সবখানে।/ সচেতনে পাবে না প্রণয়/ অন্ধ হও―প্রেম দূরে নয়।’ (স্মৃতিগন্ধা)। এই কাব্যগ্রন্থটির পাঠোপলব্ধির শেষাংশে এক-কথায় বলা যায়, নিরীক্ষাধর্মী ও ভিন্নমাত্রিক এই কবিতার বইটিতে যেকোনো পাঠক পাবেন ধ্রুপদী কবিতার অলৌকিক ঐশ্বর্য ও মহত্তম মহিমা।

পাঠালোচনার জন্য এই পাঠালোচনা নয়, একটি ভালো বই, কিছু ভালো কবিতার তথ্য ছড়িয়ে দেওয়াই এ পাঠালোচনার গভীর কথা। প্রার্থনার মতো একা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত ‘অন্যপ্রকাশ’ থেকে। প্রচ্ছদ : রাজীব দত্ত। মূল্য ১৫০টাকা। সর্বমঙ্গল হোক কবিতার, মঙ্গল হোক কবি নওশাদ জামিল ও তার গ্রন্থ প্রার্থনার মতো একা কাব্যগ্রন্থের।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares