সম্পাদকীয় : শব্দস্রোতে বঙ্গবন্ধু

সপ্তম বর্ষ   ষষ্ঠ সংখ্যা   ডিসেম্বর ২০২০

উনপঞ্চাশতম বিজয়বার্ষিকী পেরিয়ে ৫০তম বিজয় দিবসে আমরা বঙ্গবন্ধুর সাহিত্যসত্তা নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করছি! কেন?

ইতোমধ্যেই রাজনীতির কবি―‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ উপাধি পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এটি কেবল অতি আবেগের প্লাবনে উৎসারিত কোনো বিশেষণ নয়। বিশ্বজিৎ ঘোষের মতে, ‘মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য মধ্যবিত্তের শাহরিক ভাষার পরিবর্তে তিনি ব্যবহার করেছেন লোকভাষা। তাঁর লেখা ও বক্তৃতায় লোকভাষা-আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের বিস্ময়কর সার্থকতা লক্ষ করা যায়।’ আর আমরা জানি জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্য যাপিতজীবনের কথা বলে। কথাসাহিত্যে সৃষ্ট চরিত্ররা নিজেদের মুখের ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করে আপন আলোয় ফুটে ওঠে। সমাজ সচেতনতা ও সামাজিক উপযোগিতার ভেতর থেকে মানুষকে জাগিয়ে তোলে কথ্যভাষার স্বতঃস্ফূর্ত শব্দজোয়ার।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণে আমরা যে লোকভাষা-আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার দেখেছি তা প্রত্যক্ষ করি লেখক শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা তিনটি বইয়েও: অসমাপ্ত আত্মজীবনী (২০১২), কারাগারের রোজনামচা (২০১৭) ও আমার দেখা নয়াচীন (২০২০)। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ‘বই দু’খানি বাংলাদেশের প্রকাশনা ও বই বিক্রির ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ইতোমধ্যে অসমাপ্ত আত্মজীবনীর লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়েছে এবং কারাগারের রোজনামচা বইটিও এক বছরের কম সময়ের মধ্যে ৭০ হাজার কপি নিঃশেষিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রকাশনার ইতিহাসে আর কোনো রচনা এমন বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি।’ শামসুজ্জামান খানের এ কথায় প্রমাণ পাওয়া যায় আমার দেখা নয়াচীন বইটির ঈর্ষণীয় বিক্রি দেখেও।

কেবল বিক্রি এবং জনপ্রিয়তার বিচারে নয়, তিনটি বই পাঠ করলে অনুসন্ধিৎসু পাঠক চমকে উঠবেন। গ্রন্থগুলোতে জীবনঘনিষ্ঠ, জীবনছোঁয়া জীবনখোঁড়া যে-ভাষা, পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তা সৃজনশীল সাহিত্যেরই বড় অনুষদ। সহজ-সরল বর্ণনার মাধ্যমে লেখক শেখ মুজিবুর রহমান একদিকে যেমন জেলের পরিবেশ-প্রকৃতি, পরিবেশের নিয়মকানুন প্রাজ্ঞতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন অন্যদিকে আবেগ-দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনার খবর দিয়েছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। সাহিত্যের এসব ‘কনটেন্ট’ তাঁর বইয়ের লেখার ‘কাঠামো’র মধ্য দিয়ে যেভাবে ঢেলে দিয়েছেন তা একজন সাহিত্যিকের মানসচিত্র আর তাঁর কলমের শক্তিমত্তা এবং তীক্ষè পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা পাঠকের সামনে তুলে ধরে। লেখক শেখ মুজিবুর রহমানের এসব সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক গুণাবলি নিয়ে এ সংখ্যার ক্রোড়পত্রে লিখেছেন শামসুজ্জামান খান, রামেন্দু মজুমদার, সেলিনা হোসেন, মফিদুল হক, বিশ্বজিৎ ঘোষ ও মিল্টন বিশ্বাস। এ ছাড়াও ৫০তম বিজয় দিবস সংখ্যার প্রচ্ছদ রচনায় লিখেছেন মুনতাসীর মামুন, চৌধুরী শহীদ কাদের, আশফাকউজ্জামান ও রেহানা পারভীন। প্রবন্ধ বিভাগে পবিত্র সরকার, খান মাহবুব, সরকার মাসুদ ও ফারুক সুমন।

একের পর এক গুণিজনকে আমরা হারাচ্ছি। করোনার অভিঘাতে বিপর্যস্ত বিশ্ববাসী। আমরা লড়ছি। শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে অদৃশ্য শত্রু করোনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছি। আর তাই এ-সংখ্যায় শোকাঞ্জলি বিভাগে রশীদ হায়দারকে নিয়ে লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ফরিদুর রহমান ও জগলুল আজিম রানা। থাকছে শব্দঘর-এ প্রকাশিত রশীদ হায়দার এর একটি গল্পও। অপরদিকে আবুল হাসনাতকে নিয়ে লিখেছেন সুব্রত বড়ুয়া, মফিদুল হক ও মোহিত কামাল। শব্দঘর-এ প্রকাশিত আবুল হাসনাতের একটি প্রবন্ধ এবং দুটি কবিতাও উপস্থাপন করা হলো।

এ ছাড়াও থাকছে ইমদাদুল হক মিলনের ধারাবাহিক জীবনকথা ‘যে জীবন আমার ছিল’। শুরু হলো মঈন শেখের ধারাবাহিক উপন্যাস ‘ফসলের ডাক’-এর সূচনাপর্ব। বিশ্বসাহিত্য বিভাগে থাকছে ‘নোবেলজয়ী গ্লুকের কবিতা : সহজ কিন্তু গভীর’―মোহীত উল আলমের অসাধারণ এক বিশ্লেষণধর্মী  রচনা। সাহিত্যপ্রেমিক সবাইকে এ রচনাটি পড়া উচিত বলে মনে করছি। থাকছে অন্যান্য নিয়মিত বিভাগও। বরাবরের মতো এ সংখ্যার প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। অংশগ্রহণকারী সবার জন্য বিজয় দিবসের ভালোবাসা। পাশে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই বিজ্ঞাপনদাতাদেরও।

আনন্দ সংবাদ হলো শব্দঘর উপদেষ্টা পর্ষদে থাকার সদয় সম্মতি জানিয়েছেন কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ও কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।  সবার জন্য শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares