অপদেবতার জন্ম : হামিম কামাল

অনেক দিন পর আমার পুরনো এলাকায় ফিরে দেখি, অনেক কিছু বদলে গেছে।

টিনের চালা রেখে গিয়েছিলাম। দেখি, টিনবাসীরা ক্ষেপে উঠেছে, ইটের ছাদ তুলেছে সবাই। সেই ছাদ কেবল একটা নয়। ছাদের ওপর ছাদ। অর্থাৎ দালান উঠে গেছে। তারপর, দেখি গাছপালার ওপর ওরা মহাক্ষ্যাপা। সব কেটে নিয়েছে। যেমন-

গলিতে ঢুকতেই রবিদের একটা জাম গাছ চোখে পড়ত। নেই। এত রসটসে জাম ধরত যে রাতে পাহারা বসাতে হতো। শিমুদের একটা আমড়া গাছ ছিল বেশ বয়েসি। এলাকার একমাত্র আমড়া গাছ। নেই। আসিফদের বাসার সামনের কাঁঠাল গাছ ছিল। গাছটা আসিফরা এ বাসায় আসার আগে থেকেই বুড়ো। আমরা বলতাম, বানের পানি ছাড়া ও মরবে না। জীবনবৃক্ষ। তার গোড়ার মাটির নিচ থেকে একটা চমৎকার হলুদ কাঁঠাল বের করেছিল রবিদের কুকুর। কাটা পড়েছে। একটা বেল গাছ ছিল সালেহ ভাইয়ের বাসার সামনে। বাকপ্রতিবন্ধী সালেহ ভাই কেবল সেই গাছটার সঙ্গেই নিশ্চিত ভাব-বিনিময় করতে পারতেন, কোনো মানুষের সঙ্গে নয়। নেই। হিমুদের বাড়ির পেছনে বখাটেদের প্রিয় আম গাছটাও হাওয়া। নেই সালমাদের জ্বিন নামানো বরই গাছটাও।

আছে অসংখ্য মানুষ। আছে বিচিত্র এক সুখ। মানুষ হয়ে মানুষের সমাজে কেবলই মানুষ দেখার সুখ। আকাশের আরও খানিকটা কাছে উঠে যাওয়ার সুখ।

নাহ, স্বরূপনগরের মানুষকে কেউ আর অবহেলা করতে পারবে না, কারণ ওরাও এখন দালানে থাকে। একচালা টিনের ঘরে থাকে না। জায়গাটা উপশহর মতোন ছিল, সেটা এখন শহর হয়েছে। একটা সমৃদ্ধ সমাজের শর্ত পূরণ করতে মানুষগুলোও অত্যন্ত উৎপাদনমুখী। মানুষ থেকে মানুষ উৎপন্ন হচ্ছে প্রচুর।

আমি চেনা মানুষ খুঁজছিলাম। যখন পেলাম, একে একে এমন সব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে থাকলাম যে মাথার ভেতর ছোট ছোট বজ্রপাত ঘটতে থাকল। ইচ্ছে হলো ফিরে যাই। বাবার স্মৃতির মুখোমুখি হতে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম তাঁর অসমাপ্ত দালানটা একবার দেখব, সেখানে কারা থাকে তাদের একাধটু খোঁজখবর নেব। ভেবেছিলাম তার গড়ে দেওয়া মসজিদে খানিকটা সময় কাটাব। আনুষ্ঠানিক ধর্মের ব্যাপারে একসময় বেজায় আগ্রহ থাকার কারণেই হয়তো এখন অনাগ্রহ দেখিয়ে ব্যালেন্স করতে হচ্ছে। তবে প্রকৃতির সামনে নত হতে আমার আপত্তি নেই, আমি নিজেই যখন প্রাকৃত, প্রকৃতির সন্তান। মসজিদে সময় কাটাতে আমার নদীপাড়ে সময় কাটানোর মতোই হয়তো ভালো লাগে।

চেয়েছিলাম বাবা যেসব পরিবারের ভার বহন করতেন, তাদের জানালা দিয়ে উঁকি দিব। যদি ওরা এরই মাঝে ওপরতলার বাসিন্দা হয়ে না পড়ে। এগোতে এগোতে ক্রমশ নিজের স্মৃতিরও মুখোমুখি পড়ে যাচ্ছিলাম ঘনঘন। উচ্চমূল্য গুনতে হচ্ছিল বারবার।

দেখা হলে সবার প্রথম প্রশ্নÑ তুমি এখন কী করো?

অন্য কোনো উত্তর দেওয়ার সুযোগ নেই। পরিষ্কার বোঝা যায় ওরা কি জানতে চায়। বলি, লেখালিখি করি কথাটাকে যত ব্যাখ্যা করেই বলি না কেন, ওদের বুঝে আসে না। দৃষ্টি বদলে যায়। হয়ত সেখানে একটু আগেও প্রশংসা ছিল কিন্তু মুহূর্তে তাতে ভাটা পড়ে। হয়তো সেখানে প্রশ্ন ছিল, কিন্তু চট করে তাতে তাচ্ছিল্য এসে পড়ে। হয়তো সেখানে প্রশ্রয় ছিল। অকস্মাৎ সেখানে সংশয় এসে পড়ে। কণ্ঠস্বর বদলে যায়। বদলে যাওয়া কণ্ঠস্বরে তারা নানা প্রকারে আমাকে বাণীবিদ্ধ করে। বাণীর বাণ কিন্তু প্রাণঘাতী। যেন অক্ষয় তুণীর পেয়েছে অর্জুনের মতো। তির ছুড়ছে তো ছুড়ছেই। ফুরোয় না।

কেউ কেউ অবশ্য একটু আশাবাদী হতে চায়। আমাকে প্রশ্ন করে, ইয়ে, টাকা পয়সা কিছু আসে? চলে?

আমি এবারও দুদিকে মাথা নেড়ে না-বোধক উত্তর দিয়ে তাদের আশার শেষ দীপটাও যেন ফুৎকারে নিভিয়ে দিই।

টাকা পয়সা আসে না।

অতঃপর আবার সেই পুরনো গোলচত্বর। সেখানে তাদের অনিঃশেষ বৃত্তাকার যাত্রা। তারা কেবল ঘুরছে তো ঘুরছেই। এবং অবশ্যই আমাকে নিয়ে। কতক্ষণ ঘোরা যায়? এক পর্যায়ে আমার বমি পায়। আমি ছিটকে বেরিয়ে আসি। পিছিয়ে আসি। সটকে পড়ি, দমে যাই। উধাও হয়ে যেতে চাই। ওরা আমাকে ধরে আবার বৃত্তে নিয়ে আসে।

ওরা আমাকে ঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে থাকে। কেউ আমার পরিবারের অসহায়ত্ব কল্পনা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কেউ কেউ ওঠে ক্ষেপে। আমি যে আমার জীবনটাকে নষ্ট করছি, আমার ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছি এ নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ না থাকায় আমার প্রতি একটা গোপন অথবা চোখঠারা ভালোবাসা থাকায়, তারা আমার পেছনে রীতিমতো উঠে পড়ে লাগে। আদা আর জল মিশিয়ে চোখ লাল করে গিলে ফেলে। ওই খাড়া দাঁড়ানো অবস্থায় তারা আমাকে এক দায়িত্বশীল পুত্রে পরিণত করতে চায়। বাবার মৃত্যুর কথা বলে আমাকে বিচিত্র সব পথে ভেঙে ফেলতে চায়। আমাকে করে নিতে চায় তাদের মতো। যেমনটা দেখতে পেলে ওরা সুখী হবে। ওরা সবাই সুখী হতে চায়।

ক্লান্ত হয়ে পড়লাম।

তাদের আলাপ কেবল আমার ভবিষ্যতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আমার অতীতেও গিয়ে হামাগুড়ি দেয়। আমার আর কোনো ভাই নেই, তা নিয়ে ওরা আক্ষেপ করে। আমার দুটি বোন, তা নিয়ে ওরা আক্ষেপ করে। ওদের দুঃসহ ভবিষ্যতের দায়ও ওরা আমারই ওপর চাপাতে চায়। ফিসফাস করে। আমি এ সমস্ত পরিবেশের ভার খুব বেশি সময় সামলাতে পারি না। বিশেষ করে আমার সঙ্গে যদি রিয়া না থাকে, আমি একদম ন্যুব্জ হয়ে পড়ি। তাই ঘটছিল। ভাবলাম পালিয়ে যাই। কিন্তু মন স্থির। তপু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা না করে যাব না।

এই মানুষটি আমাকে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়তে শিখিয়েছিলেন। এর জন্যে শুধু আমার বাবা মায়েরই নয়, আরও অসংখ্য বাবা মায়ের গঞ্জনা শাপশাপান্ত সয়েছেন। পিতামাতাশ্রেণির মানুষ যারা আছেন তারা তার নামটাকে বিকৃত করা ছাড়া উচ্চারণ করতেন না। মনে আছে আমি আর আমার বন্ধু ভৈরব, দুজন খুশিমনে তার ‘চামচা’ হয়েছিলাম। দুষ্টু তপু ভাই আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতেন, অরা আমার দুই চামচা! শুনে আমাদের একটু গর্ব হতো। কেননা তপু ভাই আমাদের কাছে মহানায়ক। আমরা এলাকার যে কোনো ঘটনা তাকে রিপোর্ট করি, যে কারও মন্তব্য তার কানে তুলি, এবং মাঝেমধ্যে কোথাও কোনো টাকা কুড়িয়ে পেলে তাকে ভালোবেসে তা গিয়ে দিয়ে আসি। বিনিময়ে তিনি আমাদের নিয়ে বেমানান সময়ে ভয়ানক সব জায়গায় নিয়ে যেতেন। সেখানে ছয় হাত উঁচু দেয়াল থেকে শক্ত রাস্তায় লাফ দিতে হতো, দশ হাত মাটির ঢাল বেয়ে হাঁচড়েপাচড়ে উঠতে হতো। নখের ভেতর ঢুকে যেত মাটি। কাঁটাঝোপে লেগেটেগে শার্ট যেত ছিঁড়ে, নিষিদ্ধ সব অ্যারেনা, আখড়ায় ঢুকে পড়ে দৌড়ে পালাতে গিয়ে আছাড় খেয়ে কনুই-হাঁটুর চামড়া উঠে যেত। তেমন একেকদিন বাসায় ফিরতে হতো রাত। রাত বলতে সন্ধ্যা ফুরিয়েছে যখন, তখন। আমাদের সেই বয়েসে সন্ধ্যার আজান পড়লে পড়তে বসার সময়। আলোটা নিভে গেলেই সেটা চরম ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত। তবু আমাদের মনে সুখ, তপু ভাইয়ের প্রশংসা পেয়েছি, ভালো সময় কেটেছে। আবার কবে অমন অভিযানে যাব অপেক্ষায় থাকতাম।

মানুষের দিন চিরকাল একরকম যায় না। প্রাকৃতিক তরঙ্গরেখা একবার ওঠে, আরেকবার নামে, এভাবে এগিয়ে যায়। ছোটবেলার আর সব মহানায়কের মতো তিনিও একদিন মন থেকে ঝরে গেলেন। এর জন্য দায়ী ছিল তার কিছু ব্যক্তিগত বিপজ্জনক অভিযান। সেসব অভিযানে তিনি আমাদের জড়াতে চাননি। ঢাকার তীব্র অপরাধপ্রবণ এক প্রান্তিক এলাকার বিচিত্র সব ফাঁদফোকরে পা পড়ার শেষমুহূর্তে আমাদের ঠেলে সরিয়ে দিয়েছেন, নিজের পতন ঠেকাতে পারেননি।

আমি না গেলেও বন্ধু ভৈরব মাঝে মাঝে তাকে দেখতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যেত।

কারাগারে দেখতে তাকে না যেতে পারলেও, আজ স্বরূপনগরে আসার পেছনে তাকে দেখার ইচ্ছের একটা ভূমিকা আছে। তার ছাড়া পাওয়ার খবর ভৈরবের কাছ থেকে পেয়েছি। শুনেছি বাড়িতেই আছেন। দেখলাম দূরে তাদের বাড়িটা একই রকম আছে। ইটের দেয়াল, টিনের চালা। সেই বাঁকবদলের রাতের কথা মনে এলো। তপু ভাইয়ের এক অভিযাত্রী বন্ধু দরজায় কড়া নাড়ছে। সে রাতে তাকে আশ্রয় না দিলেই নয়, খুব বিপদে পড়েছে। বন্ধু যেহেতু পুরনো, আশ্রয় না দেওয়ার কোনো কথা আসে না। আমরাও তাকে চিনি। জাহিন ভাই। জাহিন ভাইকে তপু ভাই জানি না কেন এমন বিশ্বাস করত যে এমনকি বিপদটা পর্যন্ত জানতে চায়নি। বন্ধু রাতে থাকল, পোড়া মরিচ আর বেগুন ভর্তা দিয়ে গরম ভাত খেল। রাতভর পুরনো দিনের গল্প করল, পুরনো ক্লাসের সহপাঠিনীদের যা-কিছু তুরীয় সুন্দর, তার স্মৃতিচারণ করল। ভোরে, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ঘুমন্ত তপুভাইয়ের বইয়ের ঠাসা তাকে তার বয়ে আনা মারণাস্ত্রটা লুকিয়ে রেখে, আলো ফুটতেই জাহিন ভাই পা রাখল থানায়। পুলিশে খবর দিল।

জাহিন সত্যিই বিপদে পড়েছিল। যে মারণাস্ত্রটা সে বহন করছিল ওটা কালোতালিকাভুক্ত অস্ত্র ছিল, ওতে রক্ত লেগে ছিল, ওই নিয়ে কাউকে ধরা পড়তেই হতো। নিজের পরিণতি বন্ধুর সঙ্গে বদলে নিল জাহিন। অস্ত্রমামলায় ফেঁসে গেলেন তপু ভাই। বরণ করলেন নয় বছরের কারাবাস। বিশেষ নিরাপত্তা আইনের উত্তাপে সমস্ত আবেদন উদ্বায়ী হলো। আমরাও স্বরূপনগর ছেড়ে নতুন জায়গায় চলে গেলাম। তপু ভাইয়ের বাবা মায়ের সঙ্গে বা তার বড় ভাইয়ের সঙ্গে আমার বা আমাদের পরিবারের কারও আর যোগাযোগ থাকল না।

দূর থেকে দেখছি, কে একজন মানুষ তপু ভাইদের বাসাটা থেকে বের হয়ে বাইরে দাঁড়িয়েছে। বোধহয় রোদ পোহাতে চায়। একটা সিগারেট ধরাল। দূর থেকে সেও আমাকে দেখছে।

কাছে এগিয়ে গেলাম। বুকের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর পর কয়েক মুহূর্তের কেবল বিরতি। এরপর জড়িয়ে ধরলাম তাকে।

তপু ভাই স্বয়ং। ভাবা যায়?

বুকে জড়িয়ে একটা ধাক্কা খেলাম। তার শরীরের ভেতর হাড়ের একটা কাঠামো ছাড়া কিছু অবশিষ্ট আছে মনে হলো না। আরেকটু জোর নিয়ে জড়িয়ে ধরলেই শেষ। বোধয় একটা মটমটাশ হাড়ফাটা শব্দ পাওয়া যেত। আমাকে তিনি জড়িয়ে নিয়ে ধরেই থাকলেন। তার নিঃশ্বাসের সাথে সিগারেটের তামাককুটে গন্ধ আসছিল, আমার মন্দ লাগল না। তার কয়েকদিনের না কামানো গালের খসখস আমার গালে, ঘাড়ে এসে লাগছিল। তার পরনের কাপড়ের ন্যাপথালিনীয় ঘ্রাণ আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল কৈশোরের কথা। কারও শরীরের সংসর্গে এলে সেই শরীর দুটো যবে থেকে বেড়েছে সেই সমস্ত দিনের একটা ফিল্মি চিত্রায়ন মনের পর্দায় চলতে থাকে। সেই পর্দায় আমি, ভৈরব, আর তপু ভাই অতীতের ঝিলমিলে দুপুরে গাছছায়ার ফাঁকে দৌড়ুচ্ছি, হাসছি, দৌড়ুচ্ছি আর হাসছি; অবিরাম। আমার চোখে অশ্রু চলে এলো। সমস্ত স্মৃতি তখন শতটুকরো আয়নায় ফেরানো আলোকতরঙ্গ। আমার ভেজা চোখ আলোকবিক্ষেপী। কিছু দেখতে পারছিলাম না। খোলা রাখতে পারছিলাম না। তপু ভাই। অকারণে জীবন থেকে একটি দশক হারানো তপু ভাই।

কাকাটা চলে গেল।

তপু ভাই আমার মৃত বাবার কথা বলছেন।

কাকারে শেষ আমি কালো চুলে দেখছিলাম।

তার চোখে কষ্টের ছাপ। আমি সেই চোখ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম।

বাবা আর তপু ভাইকে নিয়ে একটা স্মৃতি মনে এলো।

একবার অসময়ে আমি খেলার মাঠে। হঠাৎ দূরে দেখি, বাবা আসছেন। ক্ষীণদৃষ্টির বাবা অতদূর থেকে আমাকে চিনতে পারেননি জানতাম। কাছেই একটা নির্মাণাধীন বাড়ি। দৌড়ে সেখানে গিয়ে লুকালাম। আশপাশে ইট-সুড়কির বিচিত্র জঞ্জাল। মেঝে লাল হয়ে আছে। ঠান্ডা ছড়াচ্ছে নতুন দেয়াল। আমাকে সাহায্য করতে তপু ভাই নির্মাণাধীন সেই দালানের কাছে এসে দাঁড়ালেন। আমি ইটের ফাঁক দিয়ে বাহিরটা দেখতে থাকলাম। আমার বুক ঢিপঢিপ করতে থাকল। বাবা এলেন। কঠিন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন- মনা কোথায়? তপু ভাই বললেন, ওকে তো এদিকে দেখি নাই কাকা। তুই তো চিরকালের মিথ্যুক! বাবা বলে উঠলেন। শুনে আমার মাথা কাটা গেল। এরপর আমার নাম ধরে চিৎকার। একবার দুবার সাড়া দিলাম না। তৃতীয়বার সুড়সুড় করে বেরিয়ে এলাম। বাবা আমার হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে নিয়ে চললেন। তপু ভাইয়ের দিকে লজ্জায় তাকাতে পারছিলাম না।

তা, তুই কী করিস এখন? তপু ভাইয়ের প্রশ্ন। সেই প্রশ্ন। আজকের দিনের সবচেয়ে ভীতিকর। বললাম, লেখালেখি করি, তপু ভাই।

কী লিখস।

উপন্যাস।

সঙ্গে সঙ্গে তার সব কটা দাঁত বেরিয়ে পড়ল। হাতের সিগারেট টোকা দিয়ে একশ মাইল দূরে উড়িয়ে দিলেন। এপাশ ওপাশ তাকিয়ে তারপর কানফাটা শব্দে তালি বাজিয়ে ঠা ঠা করে হেসে উঠলেন।

যাক, একটারে অন্তত নষ্ট করতে পারছি!

নষ্ট হওয়ার আনন্দে আমি হাসছি। তপু ভাই হাসছেন।

তোর বই কয়টা? নাম বল। আমি সংগ্রহ করব। ওরে আমার চামচাটা! একসময় আমি তোরে বই পড়তে শিখাইলাম, এখন তুই আমার চাইতে জ্ঞানী।

তপু ভাই। আপনি খুশি হয়েছেন?

বোকা ছেলে, কেন খুশি হবো না! তুই এমন একটা জায়গায় রক্ত দিতেছশ, যেইখানে তুই যত বড়লোক হবি, সবাইরে তত বড়লোক করবি। এইখানে একজন বড়লোক হইলে আরেকজন গরিব হওয়ার সুযোগ নাই। এই জগৎ আরেক রকম সাম্যবাদী। তোরে নানা জনে নানান বিষ দেবে। ওইখানে সাবধান। তুই শুধু কারও বিষে তোর মন পর্যন্ত নীল হইতে দিবি না।

আমি তপু ভাইয়ের কাছে যেন আজীবনের কেনা হয়ে থাকলাম। টের পেলাম আমার কৈশোরের আনুগত্য তার লুপ্ত শরীর জড়ো করতে শুরু করেছে।

ভৈরব কই?

ভৈরবের বাসায় গিয়েছিলাম। নেই। কোথায় গেছে বাসায় জানে না। তবে এলাকাতেই আছে বলল। ফোন দিয়েছিলাম ওকে। বন্ধ পেয়েছি।

ও।

আপনার বইপত্র সব কোথায় তপু ভাই?

তপু ভাই দ্বিতীয় আরেকটা সিগারেট ধরালেন।

সব তো বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে দিয়ে দিলাম। এখানে পোকায় কাটতেছিল। ভাবলাম, অরা রাখুক। ওইখানে যত্নে থাকবে। বললাম। অরা নিল। তারপর আমারে আজীবন সদস্যপদ দিল।

এমন সময় লক্ষ করলাম আশপাশে শেষ কৈশোরের দুটো ছেলে ঘুরঘুর করছে। তপু ভাই হাসিমুখে তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, দ্যাখ, আমার পুরান সাগরেদ। কী বুঝলি!

ছেলে দুটো আমার দিকে তাকিয়ে হাসার মতো ভঙ্গি করল। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লাম।

ভাড়াটেদের খোঁজখবর করে, বাবার কিছু দেনা শোধ করে, আর তাঁর বিশেষ কজন বন্ধুর সাথে দেখা করে, বেলা গড়ালে আমি কৈশোরের এলাকা ছেড়ে শহরের আরেক প্রান্তে আমার নিবাসের দিকে পথ দিলাম। আমার মনটা নানান কারণে আনন্দে ভরে আছে। তপু ভাইয়ের দেওয়া স্মৃতিটুকু তার ভেতর উজ্জ্বলতর।

পা ফেলতেই ভৈরবের মুখোমুখি। তেড়ে গিয়ে বললাম, তোকে কতবার ফোন দিলাম! ফোন কেন বন্ধ, উল্লুক?  ভৈরব আমাকে জড়িয়ে ধরল। আর তো ছাড়ে না।

কাজে ছিলাম বন্ধু। দুই নম্বর রোডে এক বাসায় ছাত্র পড়াই। চল, চা খাই দুই বন্ধু।

চলÑ বলে রাস্তা পেরোতে যাচ্ছিলাম। ভৈরব বলল, এদিকে না। এখানে সব এলাকার মুরব্বি।

দুই রোড পরে, পশ্চিমের শেষমাথায় একটা টঙে বসলাম আমরা। এ জায়গাটা থেকে একসময় বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখা যেত, একটা সবুজ পাচিল, দৃষ্টিনন্দন বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। তার ওপারে তুরাগ নদ, বাতানের ময়দান। এখন সারসার অট্টালিকায় অন্য কিছুই আর চোখে পড়ে না।

চায়ে চুমুক দিতে ভৈরবকে একে একে বলতে থাকলাম আসার পর যা দেখেছি, যা শুনেছি। যথাক্রমে তপু ভাইয়ের কথা এলো। ভেবেছিলাম ভৈরব আনন্দিত হয়ে উঠবে। কিন্তু ওর মুখে একটা বিমর্ষতার ছায়া পড়ল। কী ব্যাপার?

ভৈরবের কণ্ঠে শ্লেষ।

তপু ভাই তো এখন সেইরকম বাবাখোর মাস্তান। এলাকায় থাকে না। এলেও লোকে দূর দূর করে। এলাকার কোনো ছেলে তার সাথে চলে না। যারা চলে তারা কিসের লোভে চলে বুঝতেই পারিস। ইয়াবার চালান, টেকা পয়সার নাড়াচাড়া। তপু ভাই বহু ছেলেরে খারাপ করতেছে। বিরাট গ্রুপ তার অন্য এলাকায়। এই এলাকায় আমরা তারে কঠিন নজরদারিতে রাখি।

ভৈরব অনেক কীর্তিকথা বলে যাচ্ছিল। আমি শুনছিলাম না কিছুই। কানে ঢুকছিল না। আমার মাথায় মাদকের জমাট চটুল নাম। আমার চোখে শেষ কৈশোরের ছেলে দুটোর মুখ ভেসে উঠল। তপু ভাইয়ের গর্বিত চিবুকের সামনে কারা যেন অন্য দাবি নিয়ে দাঁড়িয়ে। এই দাবি আমার আর ভৈরবের কৈশোরের সেই দাবি নয়। ভিন্নতর ডাক শুনে তাদের আগমন, অন্য বাহনের তারা যাত্রী। আমার নিঃশ্বাস আটকে আসছিল। আমার আনন্দের জ্বলজ্বলে রত্নটা কেউ ঢেকে দিল। শীতল আচ্ছাদনের নিচে মরে গেল আলোটা, কোনোদিন জাগবে না আর। বুকে তপু ভাইয়ের ছোট্ট নিঃশেষিত বুকের খাঁচাটা বাঁধতে থাকল। ভৈরবের সঙ্গে না হলেই ভালো হতো দেখাটা?

জাপানি চলচ্চিত্রকার হায়াও মিয়াজাকিকে উৎসর্গিত

সচিত্রকরণ : হামিম কামাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares