5_liton-mohonto

গল্প

পোলিও

শেখ লুৎফর

 

ক্রিং…ক্রিং…বেল শুনেও লোক দুটি পথ ছাড়ে না; বরঞ্চ গাভিন গাইয়ের মতো একটু দুলে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখে। ব্রেক ধরব না ধরব না করেও টানতে হয়। চাকার রিঙে ব্রেক সোলের হিস…হিস…শব্দে আমার চোখ দুটো জ্বলে ওঠে, পারি তো সিটের উপর থেকেই পাছায় লাথ কষি। সাইকেলটা বিচিত্র শব্দ তুলে প্রায় থেমে যায়। একটু ফোক্কর পেয়েই ফের প্যাডেলে চাপ বাড়াই। পাঁজরের তলে গ্যাস্টিকের আজাব, ফুটন্ত ম্যাগমা। খাদ্যনালীতে টকঢেঁকুর। অন্ত্রের প্যাঁচ-মোচড় হতে অ্যাসিডের অদৃশ্য দাঁত কুট কুট করে কামড়ে সারাটা পাকস্থলীতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

টিলার উপর বাড়ি। কপাটের মসৃণ পালিশে আমার কিম্ভুত ছায়া। একপাশে কলিং বেলের লাল চোখ। আঙুল চেপে ইলেকট্রিক কেকার বদলে নিজের দুর্বল হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি শুনি।

আলগোছে দরজাটা খুলে যায়। মাথা তুলে চাইতেই মেদহীন সুঠাম শরীরে কামড়ে বসা ধবধবে স্যান্ডো গেঞ্জি, দামি লুঙ্গির ফুলেল কুচি, হাতে বেনসন অ্যান্ড হেজেস-এর সোনালি ঝিলিক। মিষ্টি গন্ধের একমুখ ধোঁয়ায় স্বাগত জানিয়ে একপাশে সরে দাঁড়ালেন আমার ছাত্রীর সুদর্শন পিতা। অস্বস্তিতে আমার মুখটা ‘দ’-এর মতো ঝুলে পড়ে। কিছু রাগ, ঘেন্না, আর অপমানের উছিলায় বুকটা তড়পায়। নীরব অভিমানে আলগোছে চেয়ার টানি, ছোট্ট করে সালাম দেই, যা আমারই পাওনা ছিল।

হিন্দি সিরিয়ালের মাড়োয়ারি কাউমাউ আর ঢিসুম ঢিসুম শব্দের সাথে আমার ছাত্রী একহাতে বইয়ের ব্যাগ, অন্য হাতে অবাধ্য ছোট ভাইকে টানতে টানতে ঘরে ঢুকে। টেবিলে ব্যাগটা রেখে, সে সিলিং ফ্যান দেখে, আমাকে দেখে; যেন ফ্যানের সুইচটা আমারই টেপা উচিত ছিল। সে হাত উঁচু করে সুচটার দিকে যায়। তার হলুদ ঘাড় ঘিরে কালো কুচকুচে চুল; সিল্কের মতো নরম আর ঝরঝরে। স্কার্টের উপর কালো টি-শার্ট।

আমার চিমসে গতর। ত্যাড়াবেকা দাঁতের ফাঁকে বাসি পাটশাক। মুখ বন্ধ করে জিভ উলটিয়ে উলটিয়ে খুলতে চেষ্টা করছি সেই দুপুর থেকে। শরীরের কোণা-কাঞ্চিতে ঘামাচির চোরা কুটকুটানি। কপালের দু’পাশে সাইনেপসিয়ার করাত টানা বেদনাটা বলতে গেলে আজন্ম সঙ্গী।

ঘুষখোর আমলার মতো ফ্যানটা ঘোঁৎ করে ওঠে। আমি চোখ তুলে তাকাই। এখন নিঃশব্দ রোষে ডানায় বাজপাখির তুফান। আমার পেটে ঘনীভূত অ্যাসিড যেন ইসরায়েলি সৈন্যদের দাঁতাল ট্যাংক। আমি মুখ তুলে প্রাণভিক্ষার মতো একগেলাস ঠান্ডা পানি চাই।

সে ঘুরে দাঁড়ায়। বিকেলের একমুঠো কোমল রোদ তার মুখাবয়বে, তরুণ ত্বকে লাফিয়ে পড়ে। গলার মোটা চেনটা ঝলকায়। অনবদ্য কবিতার একঝলক ফুরুঙ্গির মতো লকেটটা দোল দেয়।

আমার চুপসানো গালে তিনদিনের বাসি দাড়ির কামড়। খস খস করে লম্বা নখে তার ঝাল মিটাই। নখের ডগায় ময়লার কাঁই, বাইরে বিকালের মরা রোদ। আমি বীজগণিতের ফর্মুলার ওপর জোর দিই, তিক্ত গলায় বলিÑ ফর্মুলা না শিখলে, তোমার গণিতের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। সে হাসে। তার দাঁতের পাটিতে ধাতব তারের স্ফুলিঙ্গ। একটিমাত্র গ্যাঁজা দাঁতকে সায়েস্তা করতে বিখ্যাত দন্ত বিশারদের নানান হেকমত চলছে।

আমি ফ্রিজের ঠান্ডাজলে চুমুক দিই। ঝাঁক করে সবকটা দাঁত টাটায়। তাড়াতাড়ি মুখের পানিটুকু গিলে ফেলি। গলা থেকে অন্ননালি হয়ে পাকস্থলী পর্যন্ত আগুনের লহর শীতল হয়ে আসে। আমি যেন দিব্যি অ্যাসিডের ভেতর পানির ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ শুনতে পাই।

ফেরার পথে, একপা মাটিতে রেখে সিটের উপর বসি। কোমড় মোচড়ে একটু বাড়তি আরাম খুঁজি। ছেঁড়া সিট কভারের ফাঁক দিয়ে স্প্রিং পাছার ছোবড়া পেশীতে চিমটি মারে। মাথার উপর আষাঢ়ের গোমরা আকাশ। দানবীয় বিজলী ঘন ঘন ভেঙচি-কাটছে। জামার নিচে ঘামে ভেজা ত্বক, পাকা পুটপুটা ঘামাচি বিষম কুটকুটায়।

ডান হাতের নখ ঢুকিয়ে চুলকাই। সুখের শিহরন শরীরজুড়ে আফুডাফু করে। নাগালের বাইরে, পিঠের দূর প্রান্তগুলো কার্তিকের কুত্তির মতো খেঁকিয়ে ওঠে।

ঘোর কেটে গেলে বাজারের গলিতে নামি। অষুধের দোকানের সামনে সাইকেলটা রেখে, একটা অ্যান্টাসিড কিনে মুখে ফেলি। প্রায় খরিদ্দার-শূন্য মাছবাজার। গরিব-দুক্কি গুঁটিকয় গাহক মলামলি করছে। প্যাচপ্যাচে কাদার মধ্য দিয়ে আমিও ভিড়ে যাই। ইলিশ, বাউশ, রুই-কাতলের দেমাগি-মহালটা ফাঁকা। আফ্রিকান মাগুর, পাঙ্গাশ আর ছোট মাছের কদরও এখন পরতির দিকে।

দক্ষিণের গোঁয়ার বাতাস বাজারের রেনট্রিতে আচকা লাফিয়ে পড়ে। আকাশটা চড়াৎ করে ঝলসে ওঠে। দোকানের ঝাপগুলো হিয়ালেধরা মুরগির মতো ডানা ঝাঁপটায়। মেলা গাণিতিক বিশ্লেষণের পর একশ টাকায় একভাগা ছোট মাছ রফা করে খুশি হই। পাতলা কিন্তু মোটা মোটা বৃষ্টির ফোঁটা গলির কাদায় পাছা উলটে পড়তে শুরু করলে দোকানের কোণায় দাঁড়িয়ে, প্রায় সিজিল হয়ে আসা কবিতাটা মনে মনে ঝাড়া-মোছা করি।

ক্ষণে ক্ষণে পচা কাদার বিটলা গন্ধ আর মশার গুঞ্জন। ঘাড়ের পাশটায় চুরচুরে জ্বালা। হাত বুলাতেই আঙুলে আঠালো লাল। আমার মাথায় ছোট মাছের ক্যালসিয়াম এবং প্রোটিনের যুক্তি বেহায়ার মতো হৃদয়ের কবিতায় ঢুকে যেতে চায়।

রাতটা বড় দুর্যোগের। সব্জিওয়ালা রণে-ভঙ্গ দেয়। আমার মুখে টুকটুক হাসি উতরায়। বিশ টাকায় এক কেজি কাঁচা পেঁপে, পাঁচশ গ্রাম নধর ঢেঁড়স। আহা ঝড়-বৃষ্টির লণ্ড-ভণ্ড রাত তুমি কেন প্রতিদিন আস না?

বাইরে ধরে-আসা বৃষ্টির রুগ্ণ ফোঁটা। সড়কের পিচে ঘুঁটঘুঁটে আন্ধার। সিটের উপর শরীরটা বেদিশায় দোলে। দু’পাশ থেকে চেপে ধরা টিলা আর খাদ। মধ্যে রাস্তার তরল কালো ফুঁড়ে যমের মতো একটা ট্রাক হুস করে চলে যায়। কানের পর্দায় বিশাল, ভয়ঙ্কর শরীরের হুঁঙ্কার লেগে থাকে। আমি ব্রেক ধরে মাটিতে পা ঠেকিয়ে পেছনে চোখ পাকাই। ট্রাকের পাছার লাল বাত্তি যেন টিটকারি দিয়ে বলে, ‘খোদা হাফেজ’।

পাকা সড়ক ছেড়ে আঁকি-বুঁকি বেলেপথ। নির্জন অন্ধকারে আমার গাঢ় নিশ্বাস। ভেতরের কাতরানিতে নিজেই চমকাই। হা-মুখ চোরাবালিতে কাত হয়ে ছিটকে পড়ি। হাঁটুর মালাইচাকিতে পাথরের কুচি। মগজটা কে যেন মুগুর দিয়ে থেঁতলে দিছে। পাগলের মতো সব্জির ব্যাগটা খুঁজি। হাতের মুঠোয় ধরা পড়ে ভটকা সাইজ সোনা ব্যাঙের রান। সাপের ডরে বুকটা ধক করে ওঠে। ব্যাগটা পেলেও একটা পেঁপে দলছুট। হয়ত কাছেই কোথাও ঘাসে মুখ লুকিয়ে, বেওফা কমিনের মতো হাসছে। বেফানা আমি মরিয়া হয়ে ঘাসের ভেতর ফের হাত বাড়াই। আমার ঘরে একলা বসে বউ। উদরে সাত মাসের খোকা, এট্টু-আট্টু নাড়া পেলেই সে আনাড়ি-ডাহুকির মতো চমকে ওঠে।

সাইকেলটা কাঁধে নিয়ে টিলার সিঁড়ি ভাঙি। জলের ভারে নুয়ে-পড়া আকাশে সাপের ছোবলের মতো বিজলি ফোঁস করে ওঠে। তার আলোয় বারান্দায় বউয়ের ডরুক মুখ। চোখে বোবা জন্তুর চকচকে মায়া। বাজারের ব্যাগটা বাড়িয়ে দিই। মত্ত আকাশ চরম ক্রোধে বাজ ফেলে। বউ এট্টুও না-নড়ে দূর থেকেই আতঙ্কে হাতটা বাড়িয়ে দেয়, যেন আমাকে এক খাবলায় নিরাপদে তুলে নেবে। আমি হাসতে হাসতে বলি,-ভয় নেই, মাস্টাররা ঠাটায় মরে না।

হাত খালি করে দ্রুত খাতা টেনে নিই। কাঁপছে শরীর, আর ক’দিন পর পেটের ধন নামাতে গিয়ে আমার বউ যেমনটা কাঁপবে। পরানের সব দরজা-কপাট খুলে যাচ্ছে ঠাস ঠাস। দুপুর থেকেই তোরজোর ছিল, ছিল চোরা রক্তক্ষরণ। ত্যাড়াবেঁকা দাঁতের ফাঁকের পাটশাক তাকে সাথে নিয়ে হুরমুর করে নেমে আসে :

দুঃখগুলো-

কাঁকড়ভরা মরা নদীর ভালোবাসা

নিচ্চুপ বিলপারে

দিনমান বসে থাকা পিচ্ছি মাছরাঙা

দুঃখগুলো-

পৌষের রাতে হঠাৎ কঁকিয়ে ওঠা নিরল পাখি

বিরান হাওরে থোকা থোকা কলকাসিন্দুরের ফুল

বন্ধু, বন্ধুরে…আমার সব দুঃখগুলো…

চেয়ারের পেছন থেকে বউ ফুঁপিয়ে ওঠে-

-তোমার অত কষ্ট?

আমি হা হা করে হেসে উঠি। অতৃপ্ত আমোদে লম্বা করে সিগারেটে দম দিই।

-তুমি কবিতা বোঝ?

-না, কষ্ট বুঝি।

আমি মাথা ঝাঁকাই। মন বলে, আর যাই হোক; মেয়ে জাতটার পরাণ আছে। হিসাবের মিলমালে দুধের চাপে তাম্বুর মতো চাগিয়ে ওঠা বউয়ের বুক দুটো ঠেসে ধরতে হাত দুটো নিশ-পিশ করে। তৃপ্তির চেয়ে তিয়াসের সুখ অনেক বেশি বলে নিজেকে দাবিয়ে রাখি।

খেতে বসে বউকে বুঝাই সবজি আর ছোট মাছের ফুড-ভ্যালু। বাড়তি শর্করার বাজে সব নমুনা। তিন গেলাস পানি খাই তবু পেট্টা কুনকুনায়, যেন শক্ত আর দানাদার কিচ্ছু পড়েনি। ঠোঁটের কোণায় স্টার সিগারেট গুঁজে লম্বা করে দম দিয়ে নীল ধোঁয়ার রিং বানাই।

দড়িতে ছোট ছোট খেতা দিনান্তে বাড়ছে। টেবিলের কোণায় অষুধের শিশির পাশে পোড়ামাটির ঢেলার বুকে বড় বড় কামড়ের দাগ। দু-একটা তাজা নেবুপাতার কচলানো শরীর। ছেঁড়া পাঞ্জাবি, ফাটা লুঙ্গি উধাও, তার বদলে আনাড়ি হাতে লম্বা লম্বা ফোঁড় দিয়ে বানানো একখাবলা খেতা, আমার চোখের সামনে দুলিয়ে বউ হাসে। কী এক অমৃতের আস্বাদে তার চোখ  ঢোলে, গালের রং ঘন ঘন পাল্টায়। আমিও কিঞ্চিৎ সংক্রমিত হয়ে, মাসে মাসে মূল বেতন থেকে আপৎকালের জন্য কিছু সরিয়ে রাখি।

বউ কাছে বসে পাকা ঘামাচির পেট ফোটায়। আমার ঘরে নিশ্বাসের গরমে তার ভেতরটা দেখতে পাই। বাইরে ঝড়-জলের দাপুটে মেজাজ। উগ্র-অন্ধ জানোয়ারের মতো একটা ডাল বারবার টিনের চালে মাথা ঠুকছে। দেওয়ালে আইনস্টাইনের উজ্জ্বল চোখ। ঘন কোঁকড়া চুলে ওৎ পাতা টিকটিকি। সারা দিনের নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে বউটাও কি তাই?

কাছেই কোথাও ভীষণ শব্দে বাজ পড়ে। ভয়ে টিকটিকিটা অন্ধের মতো টেবিলে লাফ দেয়। পাতিহীন হতভম্ব চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি পুটুস করে তুড়ি দেই। দেওয়ালে আরেকটা কিট কিট করে লেজ নাড়ায়। টেবিলেরটা চঞ্চল হয়ে ওঠে। অস্থির, অসহিষ্ণু ঘাড় তুললে ফের আমাদের চোখাচোখি হয়। আমি বলি, শালা মর্দ। বউ বলে দেওয়ালেরটা মাদি। টেবিলেরটা দেওয়ালের দিকে সাবধানে আগায়। দেওয়ালেরটা এক কোণায় আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে জড়সড়। বউয়ের চোখ-মুখে তড়িৎ ঝলসায়। তার সামনের পোকায় কাটা দাঁত দুটোতে রাতের থিকথিকে রহস্য।

পুবের কোণার দিকে চেয়ে থাকি। একটা তক্তার উপর কবিতার বইগুলো। কতদিন ছুঁয়ে দেখি না! দিনমান ইন্দুরের মতো কিসের তালাশে যে ছুটছি! মনে কার যেন কান্দনের প্যানপ্যানানি। চামড়ার নিচে চর্বির পাতলা স্তর, মুখে সুখী মানুষের চিলিক নিয়ে একলা তো খুব ছিলাম। একটু ফাঁক পেলেই ছোট্ট আয়না হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিজেকে দেখতাম। মাঝে-মধ্যে মনের গহিনে দু-একটা মুখ ঘাই দিত। ছোটখাট নিঃশ্বাসে না-বলা দুঃখগুলো জট পাকিয়ে বেরোতে চাইলে বিচ্ছেদের সুরে গুনগুনাতাম।

কখনও লাফিয়ে উঠে সস্তা পর্নো খুলতাম। একটুখানি শেভিং ক্রিম আর লালা নিয়ে কেমন সুখের ঝড় বইত। তুফানের দাপটে যেন বুড়ো দালানটাতে কাঁপ উঠত।

এক বিকালে খাতার সবগুলো লাইন কেটে দিয়ে, বিলপারে এসে দাঁড়ালাম। ছেঁড়া ছেঁড়া আবছায়ায় ওপারের গেরামটা প্রায় মিলিয়ে যাচ্ছে। রজবদের বাঁশবনের মাথায় লাল ডোরা, নিচে থকথকে অন্ধকার। মন বলল, ওইতো এই সময়ের কবিতা। ঘরের মানুষের আড়ালে বসলে তুমিও সত্যিকারের কবিতা পাবে।

এখন খুব ভোরে লাফিয়ে উঠি। উঠানে লাউয়ের মাচা, পুঁদিনাপাতার দঙ্গল, বারান্দার টবে নয়নতারা, টিউশানির ছাত্র…। কবিতা এখন কোণঠাসা দুষ্ট ছেলে। আরেকটু শুয়ে থাকতে বউ জড়িয়ে ধরে। নিশ্বাস আটকে আসার মতো আমি ছটফট করি। কয়েকটা বুনোবজ্জাত নিয়ে সকালে একটা ব্যাচ। লাভ-ক্ষতি আর সুদকষা বোঝাতে বোঝাতে মুখে ফেনা উঠাই। বউ কাঠবিড়ালির মতো লোম ফুলিয়ে জানলায় দাঁড়িয়ে থাকে। আমি না দেখার ভান করি। ভাবখানা যেন-এখন কোত্থে এত রস পাই!

থমথমে আকাশ। পুরুষ্ট মেঘের টুকুস ফাঁটা দিয়ে ক্ষীণ আলোর লাল রেখা দৌড়ে আসে। একজন ঘামে ভেজা মুঠি খোলে-একশ টাকার কোঁকড়া-মোকড়া কয়টা নোট। আমার বুকটা শিরশিরায়।

ছেলেটার নখের তলায় রক্তহীন নীলচে পেশী। পাঙসা মুখ। ঘোলা চোখের ভোতা দৃষ্টি। ওর দিকে চাইতে ভয় লাগে। একবার জানালা দেখি, একবার আকাশ। নোট কয়টা ফাঁক পেয়ে গা ঝাড়া দিচ্ছে। আমার আঙুলগুলো ঈগলের ছোঁ পাকায়।

আমি নোটগুলো আলগোছে তুলে নিই। জীর্ণ, মলিন, ঘামে-ভেজা কাগজ কয়টা টেনেটুনে ঠিক করি। দু’পাট্টা ভাঁজ করে তরতজা নোটের মতো দাঁড় করাতে চাই। ওরা নুয়ে পড়ে, আবার টেনে সোজা করি। কিন্তু পোলিও আক্রান্ত বাচ্চাদের মতো ফের কাত হয়ে ঢলে পড়ে। আমি আবার উঠাই, আবার ঢলে পড়ে…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares