সাদা বেড়াল, কালো বেড়াল : হাসনাত আবদুল হাই

এমন দৃশ্য আগে কখনও আমার চোখে পড়েনি, অন্তত এমন আর নয়, এত কোলাহলের মধ্যে তো ভাবাই যায় না। বাড়ির সামনে রাস্তায় অনেক দিন থেকেই ডাস্টবিন রাখা আছে, সেটা আজকাল কমই ব্যবহৃত হয়, কেননা কর্পোরেশনের ক্লিনাররা এসে বাড়িতে ব্যাগে রাখা ময়লা নিয়ে দূরে তাদের ডাম্পস্টার ট্রাকে তুলে দেয়। জাপান সরকার জঞ্জালবাহী ঐ সবুজ ট্রাকগুলো উপহার দিয়েছে। এর মধ্যে তাদের কোনো ব্যবসায়িক বুদ্ধি আছে কি না কে জানে! একটা হতে পারে, অভ্যাস করিয়ে দিচ্ছে, এরপর কর্পোরেশন নিজেরাই কিনবে। এর মধ্যে কমিশন থাকবে, ফরেন ট্রিপও হতে পারে। এখন ব্যবসা-বাণিজ্য খুব সফিসটিকেটেড হয়ে গিয়েছে, অনেক সুগার কোটিং লাগানো হয়।

যে দৃশ্যটা নিয়ে এই লেখা শুরু তা অভূতপূর্ব এই কারণে যে, ওয়েস্ট ডিসপোজাল মডার্নাইজ হওয়ার পর যে ডাস্টবিনের ব্যবহার কমে গিয়েছে, হঠাৎ দেখলাম তার চারপাশে সকাল থেকে সন্ধ্যা অনেকগুলো কুকুর জড়ো হয়, তারা ভেতরের খাবার খোঁজে এবং এই নিয়ে নিজেদের মধ্যে দারুণ ঝগড়া হয়। ঝগড়ার এক মাথায় চিৎকার আর হাঁকডাক শুরু হলে তা থামতে চায় না। সমস্ত পাড়া কেঁপে ওঠে সেই কোলাহলে। কয়েকদিন দেখার পর মনে হলো, তাই তো কুকুরগুলো এখন ডাস্টবিনে খাবার খুঁজতে আসে কেন? আগে তারা কোথায় খাবার পেত? একটু গবেষণা করে বুঝলাম রাস্তার পার্শ্বে যে সব রেস্তোরাঁর খাবারের উচ্ছিষ্ট তাদের দেওয়া হতো তারা এখন লকডাউনের জন্য সেই খাবার পাচ্ছে না। ফ্রি লাঞ্চ এবং ডিনার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা এখন বাধ্য হয়ে ডাস্টবিনের কাছে এসে খাবার খুঁজছে। খাবার না পেলে কিংবা কম হলে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে। অনেকদিন থেকেই এমন চলছে, সেই ২৬ মার্চের পর থেকে যখন লকডাউন শুরু হলো। তারপর অন্যান্য দোকানপাটের মতো সব রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেল, তাদের শাটার টেনে নামাল কর্মচারীরা, একটু কম দামের রেস্তোরাঁয় শাটারের বদলে ঝাঁপি টেনে দেওয়া হলো। কুকুরগুলো অভ্যাসমতো তবু সকাল-বিকাল সে সব রেস্তোরাঁর কাছে যায়। পেছনে ফেলে দেওয়া খাবার না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে এসে রাস্তায় রাস্তায় রাখা পুরোনো ডাস্টবিনে খাবার খোঁজে দল বেঁধে।

কয়েকদিন পর দেখা গেল শুধু কুকুর নয়, বেড়ালদেরও সেই অবস্থা। তারাও রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে, সবাই খাবারের সন্ধানে। ঘুরতে ঘুরতে তারাও ডাস্টবিনের কাছে হাজির হচ্ছে। কিন্তু অত বড় বড়, হোক না এখন খাবার না পেয়ে কিছুটা শুকনো, কুকুরের ভিড়ে কাছে যেতে সাহস পায় না। কুকুরগুলো ঝগড়াঝাটি করে ক্লান্ত হয়ে চলে গেলে বেড়ালগুলো ইতি-উতি তাকিয়ে ডাস্টবিনের ভেতর লাফিয়ে পড়ে। কিছু পর খালি হাতে এবং খালি মুখে উঠে আসে বাইরে। কয়েকটা বেড়াল এতই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, এক লাফে বের হয়ে আসতে পারে না, বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে সফল হয়। তখন তাদের মিউ মিউ ডাক বেশ করুণ শোনায়। খারাপ লাগলেও এদের জন্য কিছু করার নেই। রাস্তায় ইতিমধ্যে ভিক্ষার জন্য বস্তি থেকে লোক আসতে শুরু করেছে। তাদের সাহায্য দিয়েই পেরে ওঠা যাচ্ছে না। আর একটা-দুটো কুকুর কিংবা বেড়াল হলে কিছু করা যেত। কিন্তু এদের যে সংখ্যা তা দেখে খাবার দেওয়ার কথা ভাবাই যায় না। তাছাড়া আরও একটা ঝুঁকি আছে, এদের কুড়িয়ে-বাড়িয়ে বিভিন্ন বাসা থেকে খাবার দেওয়া হলে সেই খবর পেয়ে অন্য পাড়া থেকে কুকুর এবং বেড়াল এসে হাজির হবে। সবচেয়ে করুণ হবে যখন কুকুরগুলো বেড়ালদের ধমকিয়ে পেছনে ফেলে সব খাবার খেয়ে ফেলবে। আমরা যারা বেড়ালদের খাবার খাওয়ানোর কথা ভাবছিলাম, এই সম্ভাবনার কথা ভেবে চেপে যাই। যুক্তি দেখাই, এই সঙ্কটে গরিব মানুষই দু’বেলা খেতে পারছে না, এই পরিস্থতিতে কুকুর-বেড়াল নিয়ে চিন্তা করাটা বেশ বাড়াবাড়ি।

॥ দুই ॥

আমার ফ্ল্যাট তিন তলায়। বাড়িটায় মোট পাঁচটা ফ্ল্যাট আছে। লিফট নেই, সবাইকে হেঁটে উঠতে হয়। এখন পর্যন্ত সিঁড়ি ভেঙে উঠতে আমার বুকে কোনো শ্বাসকষ্ট হয় না। তবু সতর্ক হয়ে ল্যান্ডিং-এ বেতের চেয়ার রাখা হয়েছে, যদি প্রয়োজন হয় সেখানে কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেওয়া যাবে। এই সুবিধা শুধু আমার জন্য না, এই বাড়ির সবাই ভোগ করতে পারে। একদিন ঐভাবে বসে আছি, হঠাৎ মনে হলো, পায়ের দিকে কি যেন নড়ছে, কিংবা কামড়াবার চেষ্টা করছে। তাকিয়ে দেখি মস্ত বড় দুই ইঁদুর পায়ের গোড়ালির কাছে। সভয়ে পা জোরে নাড়তেই ইঁদুর দুটো সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম ইঁদুর এলো কোথা থেকে? আগে কোনো দিন দেখেছি বলে মনে পড়ল না। আর ওরা নিচে থেকে তিন তলা পাঁচ তলা উঠছে কীভাবে? বেড়াল হলে না হয় একটা কথা ছিল, তারা লাফিয়ে ওপরে উঠতে পারে। ইঁদুরকে কিছু একটা ধরে বেয়ে বেয়ে উঠতে হয়। কিন্তু এই দুটো ইঁদুর কেমন দক্ষ অ্যাথলেটের মতন লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে চলে গেল। আমাকে মোটেও পাত্তা না দিয়ে।

বাড়ির কাজের বুয়া বলল, ইঁদুর এসেছে। রাতের বেলা বেশ দৌড়াদৌড়ি করে। সকালে তাদের কালো কালো ছোট নাদি পড়ে থাকে ঘরের এখানে সেখানে। শুনে আমি বললাম, থু। বলো না, বলো না। আমি তার গ্রাফিক ডেসক্রিপশন বন্ধ করতে বলি।

সেই দিনই আগোরার দোকানে গিয়ে সেলসম্যানকে বলার পর সে তিনটা প্যাকেট এনে বলল, এগুলো খুলে ঘরের  বিভিন্ন জায়গায় রাতের বেলা ছড়িয়ে দেবেন। খাবার মনে করে ইঁদুর এসে খাবে। সকালে দেখবেন মরে পড়ে আছে। এই ওষুধের ভেতর বিষ আছে।

শুনে মন একটু খারাপ হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে হবে! হোক না ইঁদুর, প্রাণী তো। তাদের হত্যাকারী হতে হবে? আগোরার সেলসম্যান বলল, খুব সিম্পল স্যার। শুধু প্যাকেট খুলে ছড়িয়ে দেবেন। আর কিছু করতে হবে না। ওমনিতেই কাজ হবে। শুনে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মনে হলো সে এভাবে অনেক ইঁদুর মেরে হাত পাকিয়েছে। বেশ অভিজ্ঞ।

কাজের বুয়াকে সব বুঝিয়ে বলবার পর সতর্ক করে দিলাম, দেখো আমাদের খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দিও না আবার। সে লজ্জা পেয়ে বলল, কি যে বলেন খালু। আমি তার কোনো আত্মীয় নই, সে নিজে থেকেই আমাকে খালু বলে ডাকে প্রথম থেকেই।

ভোর বেলা উঠে যে সব জায়গায় ওষুধ ছেটানো হয়েছে সেগুলো সার্ভে করে দেখা গেল একটা ইঁদুরও মরেনি। নো ডেডবডি। খাবারগুলো যেভাবে ছড়ানো হয়েছিল সেভাবেই পড়ে আছে। আমি বেশ স্বস্তিবোধ করলাম।

শুনে চারতলার প্রতিবেশী বললেন, শুধু ওষুধে হবে না। ইঁদুর মারার কল আছে। মোহাম্মদপুর বাজার থেকে কিনে আনুন। রাতের বেলা তার মধ্যে কিছু খাবার রেখে দরজাটা খুলে রাখবেন। সকালে উঠে দেখবেন ব্যাটারা কয়েকজন না হলে অন্তত একজন ভেতরে ঢুকে আর বের হতে পারেনি। হয় মরে পড়ে থাকবে, নয়তো নড়াচড়া করবে দুর্বল শরীর নিয়ে। তখন সেগুলো মেরে রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসতে বলবেন।

বুঝলাম প্রতিবেশী এ বিষয়ে অভিজ্ঞ। এভাবে কলের ভেতর আটকে ইঁদুর মেরেছেন এবং এখনও মারছেন। ফাস্ট হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স। প্রতিবেশী আমার দোনোমনা ভাব দেখে বললেন, উপেক্ষা করবেন না। শুনেছি চীনে এখন বুবনিক প্লেগ দেখা দিয়েছে। করোনাভাইরাসের পর তারা পৃথিবীকে এখন প্লেগ উপহার দিচ্ছে। জানেন তো, ইঁদুরই ঐ রোগের বাহক। মধ্য যুগে ইঁদুরবাহী প্লেগে ইউরোপের বহু শহর জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। তারা সেই মড়কের নাম দিয়েছিল ব্লাক ডেথ। সেই জন্য ব্যাপারটা হালকাভাবে নেওয়ার উপায় নেই। একে তো করোনা নিয়ে কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছি না। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকছি। এমন হয়েছে যে, হঠাৎ দেখলে বাড়ির লোককেই চিনতে পারি না। সেদিন আমার ওয়াইফকে কাজের বুয়া মনে করে বললাম, এক কাপ চা দিও তো।

আমি শুনে হাসলাম। তিনি চা পেয়েছিলেন কি না তা আর জিজ্ঞাসা করলাম না। বললাম, তাহলে ইঁদুর থেকেই প্লেগ ছড়ায়।

প্রতিবেশী বললেন, জ্বি। তবে একটা ভালো দিক আছে। প্লেগের ভ্যাকসিন বেরিয়েছে অনেক দিন হলো। ভ্যাকসিন দেওয়া থাকলে প্রতিরোধ করা যায়। আগের মতো আক্রান্ত হলেই মরার সম্ভাবনা থাকে না। তারপর খুব চিন্তিত স্বরে বললেন, সমস্যা হয়েছে এই করোনাভাইরাস নিয়ে। কি সাংঘাতিক অসুখ, কোনো চিকিৎসাই নেই। হাসপাতালে সব ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দিনকে দিন পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। সব ওলট-পালট করে দিয়েছে। এই যে দিনের পর দিন ঘরের ভেতর আটকে থাকা, এ আর কত সহ্য করা যায়। সর্বক্ষণ সাবান দিয়ে হাত ধুতে ধুতে ফোসকা পড়ে গেল। ভদ্রলোক আমার সামনে থেকে ছয় ফুট দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। হঠাৎ সতর্ক হয়ে বললেন, এতক্ষণ সামনা-সামনি কথা বলা ঠিক হলো না আমাদের। টেলিভিশনে শোনেন না ডক্টর আবদুল্লাহ কী বলেন? সোস্যাল ডিসটেনসিং-ই এখন ভরসা, আর মুখে মাস্ক পরা। তারপর বললেন, আসুন আপনার ইঁদুর মারার কি হলো বলবেন। নিচে আসার দরকার নেই, ফোনে বললেই হলো, কেন কষ্ট করতে যাবেন। হেঁটে হেঁটে নিচে নেমে এসে।

দরজা বন্ধ করার আগে তিনি বললেন, পাঁচ তলার ফ্ল্যাটটা খালিই রয়ে গেল দেখছি। নতুন ভাড়াটিয়া এলো না কেও।

আমি বললাম, এখন নতুন ভাড়াটিয়া আসবে কোত্থেকে। অনেকে তো ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে বাইরে। বাড়ির সামনে খালি টু-লেট সাহেবের নেইম প্লেট ঝুলছে। টু-লেটে সয়লাব হয়ে গিয়েছে শহর।

প্রতিবেশী দরজা বন্ধ করতে করতে বললেন, আগের ভাড়াটিয়া বেশ ভালো লোক ছিলেন। মিশুক। অবশ্য এখন মেলামেশা করতে পারতেন না। সবাই ভয়ে ভয়ে আছে। তারপর বললেন, তার তো কয়েকটা বেড়াল ছিল। তাদের কী হলো?

আমি বললাম, ছিল নাকি! খেয়াল করি নাই তো। নিশ্চয়ই সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন। পোষা বেড়াল কি কেউ ফেলে রেখে যায়? প্রতিবেশী এবার দরজা প্রায় বন্ধ করে দিলেন। একটু ফাঁক ছিল, তার ভেতর দিয়ে একটা চোখ রেখে বললেন, বেড়াল থাকলে ভালো হতো। ইঁদুরের গোষ্ঠী ওরাই খেয়ে শেষ করে দিত।

শুনে আমার গা গুলিয়ে উঠল।

॥ তিন ॥

দরজায় বেল বাঁজতে শুনে আমি কাজের বুয়াকে বললাম, দ্যাখো তো কে এলো? আজকাল তো কারও আসার কথা না।

কিছুক্ষণ পর সে এসে বলল, পাঁচতলার চাচি আর তার দুই মাইয়া।

আমি বললাম, আমাদের এখানে এসেছেন? না ভুল করে বেল টিপেছেন?

কাজের বুয়া বলল, আমাদের বাড়িতেই আইছেন।

আমি মুখে মাস্কটা ঠিক মতন পড়ে বললাম, ভেতরে আসতে বল। তুমি মুখে মাস্ক লাগিয়ে রেখ। তারা চলে গেলে সব জায়গায় সাবান পানি দিয়ে মুছে ফেলবা। খুব সাবধান। অসুখটা ছড়িয়ে পড়েছে। সাবধানের মার নেই।

একটু পর ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া দুই মেয়ে নিয়ে পাঁচ তলার আগের ভাড়াটিয়ার স্ত্রী ঘরে ঢুকলেন। দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকলেন। বললেন, ভেতরে ঢুকব না ভাই। বাধ্য হয়ে এলাম। আমার মেয়েদের বেড়াল দুটো পালিয়েছে, দু’দিন ধরে তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দু’জনের দারুণ মন খারাপ। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। চোখ ছলছল করে একটু পর পর বলে, মা দ্যাখো না আমাদের কিটি আর মিনি কোথায় গেল? আচ্ছা বলেন ভাই, আমি কি জানি ওরা কোথায় গিয়েছে? আমাকে কি বলে গিয়েছে যাবার আগে?

ভদ্র মহিলার বড় মেয়েটা বলল, আগে কোনো দিন আমাদের ছেড়ে কোথাও যায়নি। এখন হঠাৎ চলে যাবে কেন? মা তুমি কি ওদের বকেছিলে কিংবা…। সে কথা শেষ করে না।

তার মা মাথা নেড়ে বলেন, না রে মা কিছু বলিনি। বলতে যাব কেন? কোনোদিন কি ওদের কিছু বলেছি আমি? আর বললে শুনতে পেতি না তোরা?

ছোট মেয়েটা বলল, তাহলে চলে গেল কেন? তাদের মা বলল, ওরা খুব অভিমানী হয়, জানিস তো। তোদের পক্ষ থেকে কোনো অযত্ন-অবহেলা হয়েছে কি না কে জানে?

দুই বোন প্রায় এক সঙ্গে বলে উঠল, হয়নি। ওদেরকে আমরা কখনও অবহেলা করি না।

শুনে ওদের মা চিন্তিত হয়ে বললেন, তাহলে চলে গেল কেন?

আমি বললাম, আজকাল পাড়ায় অনেক বেড়াল দেখি রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে। খাবার খুঁজে বেড়ায় ফুটপাতে। ডাস্টবিনের কথা আর বললাম না।

শুনে ভদ্রমহিলা বললেন, না না । খাবারের জন্য ওরা বাড়ি ছেড়ে যাবে না। ওদের জন্য কত খাবার কিনে রাখা হয়েছে। মেয়েরা বলল, করোনার জন্য যদি দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় তাহলে বেড়ালের খাবার নাও পাওয়া যেতে পারে। শুনে তাদের দু’জনের জন্য অনেক টিনের খাবার কিনে বাড়িতে স্টক করে রাখা হয়েছে। খাবারের অভাবে তারা বাড়ি ছেড়ে যায়নি। অন্য কিছু হবে।

আমি বললাম, তাহলে? বলতে চেয়েছিলাম হয়তো পাড়ার অন্য বেড়ালের সঙ্গে হৃদয়ঘটিত ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ে চলে গিয়েছে। খুব ভালো শুনাবে না ভেবে চুপ করে থাকলাম। বড় মেয়েটাকে বললাম, দু’টো বেড়াল তোমাদের?

সে বলল, জ্বি।

সাদা না কালো?

একটা সাদা, একটা কালো।

আমি বললাম, কোনটা কার?

বড় মেয়েটা বলল, কালো বেড়ালটা আমার। ওর নাম কিটি। আর সাদাটার নাম মিনি। ওটা আমার ছোট বোনের।

আমি বললাম, কত দিন থেকে আছে তোমাদের কাছে?

বড় মেয়েটি বলল, তিন বছর।

আমি বললাম, অনেক দিন। মায়া জন্মে যাবার কথা। শুনেছি বেড়ালের বড় মায়া হয়। যারা পোষে তাদের ছেড়ে যায় না। তা ওরা দু’জন, মানে কিটি আর মিনি এমন মায়া-মমতাহীন হয়ে গেল কেন হঠাৎ? আর এই করোনার দুঃসময়ে? এত যত্ন-আত্তি করে রেখেছ তোমরা। বিদেশি তৈরি টিনে রাখা খাবার খাওয়াচ্ছ। এই সব ফেলে তারা চলে যাবে কেন?

বড় মেয়েটা বলল, আমরা এই বাড়ির পাঁচ তলা ছেড়ে নতুন ফ্ল্যাটে ওঠার পর থেকেই দেখছি তারা যেন একটু কেমন হয়ে গিয়েছে। আগের মতো ব্যবহার করে না। গম্ভীর হয়ে থাকে।

আমি বললাম, তা করতে যাবে কেন? নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছ তোমরা। সবকিছু ঝকঝকে-তকতকে। তাছাড়া লিফট রয়েছে। ওপরে হেঁটে উঠতে হয় না। তারপর ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনারা দু’জন এই ক’বছর হেঁটে হেঁটে পাঁচ তলায় উঠে হাঁটুর ব্যথাই করে ফেলেছেন। খুব ভুগলেন এখানে থেকে।

ভদ্র মহিলা বললেন, হ্যাঁ ভাই। খুব কষ্ট পেয়েছি। শেষ দিকে আর উঠতেই পারতাম না। লিফট থাকলে কি আপনাদের ছেড়ে অন্য কোথাও যাই।

কাজের বুয়া আমাকে যেন কি বলতে চায় বলে মনে হলো। সে হাতের ইশারা করছে। আমি তার কাছে যেতে সে স্বর নামিয়ে বলল, তাদের বেড়াল আমি দেখছি মনে হয়।

আমি বললাম, কোথায় দেখলে?

সে বলল, ইঁদুর ধরার লাগি হ্যারা আমাদের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে ছিল। আমি তাড়াইয়া দিছি।

আমি বললাম, সে দু’টো যে এদেরই বেড়াল কি করে চিনলে, তারপর জিজ্ঞাসা করলাম, সাদা না কালো?

কাজের বুয়া বলল, একটা সাদা, আর একটা কালা।

আমি বললাম, তুমি তাড়িয়ে দেওয়ার পর কোথায় গেল দেখেছিলে?

কাজের বুয়া বলল, নিচে দৌড়াইয়া পালাইছে।

আমি ভদ্র মহিলার কাছে গিয়ে বললাম, রাস্তায় অনেক বেড়াল ঘোরাঘুরি করে। এই করোনাকালে তাদের খাবার অভাব হওয়াতে রাস্তায় বের হয়ে পড়েছে। সেখানে গিয়ে দেখবেন নাকি?

ভদ্র মহিলা বললেন, ভাই শুনলেন না? আমাদের মিনি আর কিটির খাবার অভাব নেই। বাড়িতে তাদের খাবার স্টক করা আছে। তারা কেন রাস্তায় বের হবে খাবারের খোঁজে। আমি বললাম, অনেক বেড়াল দেখে মনে হয় তারা খুব ফুর্তি বোধ করেছে। একটা খেলার মতো ব্যাপার মনে হয়েছে তাদের কাছে। এই আমরা যেমন পিকনিকে যাই, সেই রকম আর কী। তাই হয়তো বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়। যাবেন নাকি খুঁজতে?

ভদ্র মহিলা বললেন, কোথায় ভাই?

আমি বললাম, রাস্তায়। তারপর মেয়ে দুটির দিকে তাকিয়ে বললাম, যাবে নাকি? তারপর জিজ্ঞাসা করলাম, কি যেন বললে তোমাদের বেড়ালের নাম?

কিটি আর মিনি।

আমি বললাম, কোনটা সাদা আর কোনটা কালো?

বড় মেয়েটা বলল, কিটি কালো। মিনি সাদা রঙের।

রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে দেখা গেল বেশ বেড়াল রয়েছে। সাদা, কালো, খয়েরি সব রঙেরই রয়েছে। তাদের মধ্যে কে কিটি আর কে মিনি আমার পক্ষে জানার উপায় নেই। আমি দুই বোনের দিকে তাকিয়ে বললাম, চিনতে পারছ?

দুই বোন এক সাথে নাক সিঁটকে বলল, সব নোংরা। আমাদের কিটি আর মিনি এমন অপরিষ্কার থাকে না। আর এই বেড়ালগুলো সব কেমন শুকনা দেখাচ্ছে, হাড্ডিসার। আমাদের কিটি আর মিনি এমন না। আমি তখন বেশ দুঃখের সঙ্গে বললাম, এত খোঁজাখুঁজির  পর যদি না পাও তাহলে আরেক জোড়া কিনে ফেল। একটা সাদা আর একটা কালো রঙের। একই নাম রাখবে ওদের। মিনি আর কিটি। সব বেড়ালই তো দেখতে এক রকম।

সঙ্গে সঙ্গে দুই বোন বলে উঠল, নো। আমাদের পুরোনো বেড়ালই চাই।

আমি বললাম, পেলে তো ভালোই। না পেলে একটা কিছু করতে হবে তো। সেই জন্য বললাম। তারপর বললাম, তোমাদের কি শুধু সাদা আর কালো রংই পছন্দের? খয়েরি কিংবা ছাই রং-এরও বেড়াল আছে। দুই বোন এক সঙ্গে বলল, আমাদের সাদা আর কালো রংই পছন্দ।

বেড়ালের রং নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। ইট ডাজ নট ম্যাটার।

দুই বোন ভ্রু কুঁচকে বলল, হোয়াট ডু ইউ মিন?

আমি বললাম, চীনের ডেং হিসিয়াং পিং বলে এক নেতা ছিলেন। খুব বিখ্যাত। মাও সেতুং এর পরেই তার নাম করা হয়। তিনি বলেছিলেন, ইট ডাজ নট ম্যাটার হোয়েদার এ ক্যাট ইজ ব্ল্যাক অর হোয়াইট, অ্যাজ লং অ্যাজ দে ক্যান ক্যাচ মাউস।

মেয়ে দু’টো আমার দিকে তাকিয়ে যা বললাম তার মর্ম বোঝার চেষ্টা করল। তাদের মাও আমার হেয়ালির মতো কথা শুনে একটু অবাক হলেন। তারপর বললেন, সরি ভাই, আপনাকে কষ্ট দিলাম। অনেকক্ষণ আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। রাস্তাতেও নেমে এলেন। অনেক ধন্যবাদ।

আমি বললাম, ইউ আর ওয়েলকাম।

॥ চার ॥

আমি সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠছি। দেখি পাঁচ তলার ভদ্র মহিলা ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে আমার আগে আস্তে আস্তে পা ফেলে ওপরে উঠছেন।

আমি বললাম, কোথায় যাচ্ছেন ভাবি?

ভদ্রমহিলা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, পাঁচ তলায় ভাই। ঐ ফ্ল্যাট আবার ভাড়া নিলাম। নিজেদের কেনা ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে দিলাম।

আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন? অত সুন্দর নতুন ফ্ল্যাট উঠতে না উঠতেই ছেড়ে দিলেন কেন? কত বড় আর রাস্তার পাশে। লিফট রয়েছে। হাঁটতে হয় না। এত সব সুবিধা থাকতে সেই ফ্ল্যাট ছেড়ে আবার এই পাঁচ তলার ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে গেলেন কেন?

ভদ্র মহিলা বললেন, কিটি আর মিনি পালিয়ে এসে ঐ পাঁচ তলাতেই থাকছে। একা একা। আমাদের ফেলে চলে এসেছিল। আমরা টের পাইনি।

শুনে আমি বললাম, স্ট্রেঞ্জ! তারা এখানে আসতে যাবে কেন? ভদ্রমহিলা কিছু বলার আগে তার বড় মেয়ে বলল, তারা এই পাঁচ তলার ফ্ল্যাটে থেকে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। নতুন ফ্ল্যাট পছন্দ হয়নি। তাই চলে এসেছে।

ছোট মেয়েটা বলল, ওরা তো লিফট চালাতে জানে না। তাই নতুন ফ্ল্যাটে ইচ্ছেমতো উঠতে-নামতে পারত না। এটা ওদের পছন্দ হয়নি। এই বাড়িতে ওরা ইচ্ছামতো উঠা-নামা করতে পারে।

আমি বললাম, পাঁচ তলার ফ্ল্যাট কোনটা বেশি পছন্দ করে? সাদাটা না কালোটা?

বড় মেয়েটা হেসে ফেলল শুনে। তারপর বলল, উফ্ আংকেল, আপনার সেই একই প্রশ্ন! ডাজ ইট ম্যাটার?

আমি বললাম নো।

বাসায় ঢোকার পর কাজের বুয়া কাছে এসে হাসি মুখে বলল, বাসায় একটাও ইঁদুর নেই।

আমি অবাক হয়ে বললাম, কোথায় গেল? বিষাক্ত খাবার খেয়ে মরে গিয়েছে? না, কলের ভেতর আটকা পড়ে আছে? কাজের বুয়া বলল, মনে হয় হেদের বিড়াল দুইটা ধইরা ধইরা খাইছে।

শুনে আমি তাড়াতাড়ি বাথরুমে গেলাম। আমার মুখ দিয়ে বের হলো ওয়াঘ ওয়াঘ শব্দ। মুখ ধুয়ে এসে কাজের বুয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম, কোনটা এসেছিল? সাদাটা না কালোটা? মিনি না কিটি?

কাজের বুয়া ঘাড় ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, কি জানি কোনটা আইছে। আমার মনে নাই।

কিছুক্ষণ ভেবে আমি বললাম তাতে কিছু আসে যায় না।

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares