আমি উপেন্দ্রনাথ দত্ত : আনোয়ারা সৈয়দ হক

আমি রাজারহাট গ্রাম ও পিরোজপুর থানা, বরিশালের শ্রী উপেন্দ্রনাথ দত্ত।

আপনাদের একান্ত অনুরোধে আমি আজ আবার মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন আমার অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করতে বসেছি।

পিরোজপুরে আমাকে চিনত না সেরকম মানুষ একাত্তরের পিরোজপুরে খুঁজে পাবেন না। কারণ আমি ছিলাম পিরোজপুরের একজন সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী। নিজে শুধু ব্যবসা করে টাকা আয় করতাম তাই নয়, স্থানীয় যারা আমার কাছে সাহায্যের জন্য আসতো সকলকেই আমি সাহায্য করবার চেষ্টা করতাম।

পিরোজপুরের সকলে আমাকে পছন্দ করত, ভালোবাসত।

সব মিলিয়ে আমার সংসার সুখের ছিল।

কিন্তু ভগবানের ইচ্ছা ছিল অন্য রকম।

১৯৭০ এ পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার পর থেকে দেশের পারিস্থিতি ক্রমশ জটিল ও ঘোলাটে হয়ে উঠল।

ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার টালবাহানা সমগ্র দেশের মানুষকে উদ্বিগ্ন ও ক্রমশ ক্ষিপ্ত করে তুলল।

দেশের যে কোনো ক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে আমরা যারা দেশের মাইনোরিটি কম্যুউনিটি বলে পরিচিত, আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। কারণ কখন যে কার দায় এসে কার ঘাড়ে পড়ে এটা বোঝা মাঝে মাঝে খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

তারপর তো চলে এল ২৫ মার্চ, ১৯৭১।

মানুষের আশঙ্কা সত্য করে ইয়াহিয়া সাহেব সমগ্র পূর্বপাকিস্তানের মানুষের জন্য যেন মৃত্যুর পরোয়ানা জারি করলেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেকে মনে করি সাহসী একজন মানুষ। আমার বিরাট পরিবার। মা ছাড়াও নিজের পরিবার পরিজন কাকাতো ফুপাতো মাসতুতো মিলে সংসারের মানুষজনের কমতি ছিল না।

সুতরাং এদের নিরাপত্তা নিয়ে আমি মনে মনে খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম।

কিন্তু ৪ মে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যেদিন পিরোজপুর শহরে প্রবেশ করল, তাদের সঙ্গে ছিল বিরাট এক দালাল বাহিনী।

নিজেরই দেশের মানুষ এভাবে মুহূর্তের ভেতরে কীভাবে বিদেশিদের দালাল হয়ে যায়, সেকথা ভাববার সময় আলাদাভাবে তুলে রেখে,  আমি বুঝলাম, এখন আর সাহসী হয়ে লাভ নেই। কারণ আমার সঙ্গে আমার ওপরে নির্ভরশীল বিরাট পরিবার আছে।

পাকিস্তান হানাদার বাহনী পিরোজপুরে ঢুকেই গুলি চালাতে শুরু করল। যাকে সামনে পেল তাকেই গুলি করল। হিন্দু বা মুসলমান বলে কোনো বাছবিচার করল না। মানুষ মারা শেষ হলে তারা দয়া করে রাজাকারদের দিকে তাকিয়ে বলল, এইবার তোরা লুট কর। কিন্তু সাবধান বাড়িঘর নষ্ট করিস নে।

আমি এই সময় বাঙালি একজন রাজাকারের কাছে গিয়ে অনুরোধ করলাম, ভাই, আমি চললাম। আমার দোকানে প্রায় লাখ টাকার মাল আছে, তুমি এগুলো রক্ষা করার ব্যবস্থা করো। যদি প্রয়োজন মনে করো তাহালে তোমার হেফাজতে সব মাল নিয়ে যাও।

আমি এরপর সমস্ত কিছু তাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিয়ে পরিবার পরিজনসহ বলেশ্বর নদীর ওপার চলে গেলাম।

অবশ্য আমি দোকান ছেড়ে চলে আসার সময় রাজাকার বলল, দাদা, আপনার কোনো চিন্তা নাই। আপনার কোনো ক্ষতি আমরা করব না।

আমি তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে বিশ^াস করে তার দায়িত্বে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে দিলাম।

কিন্তু নদীর ওপার গিয়ে আমার মন টিকলো না। মন পড়ে থাকত নদীর এই পারে। অস্থির হয়ে আমি নদীর ওপারে শুধু এদিক ওদিক করে ঘুরে বেড়াতাম। আর তক্কে তক্কে থাকতাম কখন খান সেনারা বিকালে তাদের ব্যারাকে ফিরে যাবে।

বিকেল পাঁচটার আগে আগে পাকহানাদার তাদের ক্যাম্পে ফিরে যেত।

আর আমিও ঠিক তার পর পরই নদী পার হয়ে চলে আসতাম।

তারপর গা ঢাকা দিয়ে শহরে তাদের কীর্তিকলাপ লক্ষ করে বেড়াতাম।

বলতে আফসোস লাগে, তবু বলতে হবে যে, পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য যে সহযোগী শান্তিবাহিনী এবং রাজাকারের দলের সৃষ্টি হয়, তারাই আমাদের পিরোজপুরের বেশি ক্ষতি সাধন করে।  তারাই পাক বাহিনীকে ধ্বংসযজ্ঞে উৎসাহ দিয়েছে, তাদের পরিচালনা করেছে, তাদের মাথায় শয়তানি বুদ্ধির জোগান দিয়েছে, মানুষের বাড়িঘর ভেঙে দিয়েছে, মানুষের বাড়িঘরে আগুন জ¦ালিয়ে দিয়েছে। 

এইসব কথা যখন এখন এই বয়সে ঠান্ডা মাথায় ভাবি, তখন মনে হয়, তাহলে বাঙালি হিসেবে আমাদের সম্পর্কে পাকিস্তানিরা যে খারাপ ধারণা করত, তার পেছনে নিশ্চয় এইসব মানুষের পূর্ণমাত্রায় অবদান ছিল। এরাই বাঙালিদের সম্পর্কে বিদেশি শত্রুর মাথায় এই ধারণা ঢুকিয়েছে যে আমরা আদতেই লোভী, অধার্মিক, বাটপাড়, মিথ্যাবাদী, জোচ্চোর, ঠগ। দুটো পয়সার জন্য আমরা ঘরের মা বোনকেও বিক্রি করে দিতে পারি। আরব দেশের ধর্ম আমাদের মুসলিম ভাইদের বিন্দুমাত্রই অনুশাসন করতে পারে নাই।  স্বভাব পাল্টাতে পারে নাই।

 আমি আমার এক মুসলমান বন্ধুর মুখে শুনেছি আরবের মানুষ নাকি বাংলাদেশের মানুষদের মিসকিন বলে সম্বোধন করে।

যদি তার কথা সত্য হয়, তাহলে আমি বলব, এই মিসকিন অর্থনৈতিকভাবে মিসকিন নয়, এই মিসকিন হলো নৈতিক, মানসিক ও আত্মিকভাবে মিসকিন।

আমি বয়স্ক মানুষ, ভুল বললে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।

২.

যাহোক আমি মাঝে মাঝেই নদীর ওপার থেকে এপারে এসে এইসব ধ্বংসযজ্ঞ চোখে দেখতাম। এতে আমার জীবনের ওপরে অনেক ঝুঁকি ছিল মানি, তবু নিজের  ছেলেবেলা ও যৌবনের স্বপ্ন আমার এই জন্মস্থানের দুর্দশা আমাকে বড়ই ব্যাকুল করে রাখত।

মে মাস যত শেষ হতে লাগল, হানাদার বাহিনী ও তাদের সাগরেদদের অত্যাচার ততই বেড়ে উঠতে লাগল। তারা তখন বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ ধরে এনে পিরোজপুরের জেটিঘাটে জড়ো করতো, এরকম প্রায় প্রতিদিন ৫০-৬০ করে বাঙালি ধরে আনত। তারপরও এদিক ওদিক থেকে মানুষ ধরে আনত। আমি তখন হিসাব করে দেখেছি, প্রতিদিন অন্তত একশত করে মানুষ এইসব শান্তিবাহিনী ও রাজাকারের দল জোগাড় করে আনত এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তুলে দিত। তারা তাদের গুলি করে মেরে ফেলত।

প্রথম দিকে পাকবাহিনী যখনই মানুষদের হাতে পেত, দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলত। দিন বা রাত বিচার করত না। পরে কি ভেবে তারা শুধু সন্ধ্যার পরে মানুষ হত্যা করত। সারারাত ধরে মানুষ ধরা চলত। রাত দুটোর পর যে সকল মানুষ ধরে আনত, দেরি না করে তাদের সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলত। কারণ সকাল হয়ে গেলে তখন মারতে অসুবিধে হবে ভেবে।

আমি এটাও লক্ষ করতাম যে, প্রথম দিকে যখন তারা মানুষ ধরে আনত, বন্দুকের গুলি খরচ করে মেরে ফেলতো। পরের দিকে হয়তো গুলি অযথা খরচ হয়ে যাচ্ছে বলে তাদের মনে ভাবনা হলো। তখন তারা আর গুলি খরচ করত না। প্রথমে মারধর করত প্রচণ্ডভাবে, তাতে যারা মারা গেল তো গেল, না গেল তো বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাদের মেরে ফেলত।

পাকিস্তানিরা তো বিকেল হলে তাদের ডেরায় চলে যেত, বাঙালি বশংবদদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে যেত। আর বাঙালি বশংবদেরা নিষ্ঠার সঙ্গে সেই ‘পবিত্র’ দায়িত্ব পালন করত।

তাদের হাত থেকে কেউ আর বাঁচতে পারেনি।

অনেক দিন আমি লুকিয়ে নিজের চোখে দেখেছি, কখনও তারা একজন বাঙালিকে চেপে ধরে দুজন রাজাকার বাঙালি দুদিক থেকে ঠ্যাং টেনে ধরত আর একজন বিহারি বা রাজাকার বাঙালি কুড়াল বা দা দিয়ে কুপিয়ে বাঙালির শরীর দুভাগ করে ফেলত। বিদেশি পাকিস্তানি সৈন্যরা ছাড়া আর সকলেই ছিল বাঙলার অধিবাসী। বিশ^সঘাতক বিহারিরা  তো  ’৪৭ এর দেশভাগের পরপরই বাঙলার বুকে এসে আস্তানা গেড়ে বসেছিল। অথচ বাঙালিদের জীবনেও ভালোবাসতে শেখেনি।

এদিকে বাঙালি যখন লোভে পড়ে রাজাকার হলো তখন তারা নিজেরাই অতি উৎসাহী হয়ে গ্রামে গ্রামে অভিযান চালিয়ে বহু মানুষ ধরে আনত এবং তাদের মেরে ফেলত।

এদিকে আমার অবস্থা দিন দিন করুণ হতে লাগল।

আমি একজন হিন্দু। আমি ইচ্ছে করে হিন্দু হইনি, ঈশ^র আমাকে হিন্দু করে তৈরি করেছেন।

আমি আমার সেই বিরাট ফ্যামিলি নিয়ে বলেশ^র নদীর অপর পারে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে কাফেলা সফর করে বেড়াচ্ছি। অধিকাংশ দিন গ্রামের জঙ্গল থেকে কচু ঘেচু, শাক, ফল এইসব খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। এমনকি চুলো জ¦ালাতেও মনে ভয় হতো। মনে হতো যদি আগুনের নিশানা দেখে কোনো রাজাকার আমাদের আশ্রয়ে এসে উপস্থিত হয়।

কোনো গ্রামের কোনো আশ্রয়ই যেন আমার কাছে নিরাপদ মনে হতো না। এদিকে আমার দোকান, আমার ব্যবসা, আমার ঘরবাড়ি সবকিছুর জন্য মনের ভেতরে অসহ্য এক যন্ত্রণা হতো।

বারবার করে মনে হতো কোনো দিন কি আবার আমি আমার দোকানের গদিতে বসতে পারব?

যৌবনে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ পার হয়ে আসা মানুষ আমি, তবু আমার মনে হতো দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধও যেন ছিল এর চেয়ে ভালো। অন্তত তখন তো নিজের দেশবাসী নিজের গ্রামের মানুষের গায়ে হাত দিত না।

কিন্তু এরকমভাবে আর কতদিন। পিরোজপুর শহরের আমি একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ। আমাকে চেনে না, এমন লোক শহরে নেই। আমি কোনো দিন কারও ক্ষতি করিনি। যারা এখন শহরের রাজাকার তাদের সকলকেই আমি ছেলেবেলা থেকে চিনি।

এক মাস দশ দিন পর্যন্ত আমি নদীর ওপারে পরিবার নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। তারপর আর না থাকতে পেরে একদিন নদী পার হয়ে একজন লোকের সঙ্গে দেখা করলাম। তাকে বললাম, ভাই আমাকে শান্তি কমিটির অফিসে নিয়ে চলো।

সে আমার কথা শুনে অবাক হয়ে বলল, দাদা, শান্তি কমিটির অফিসে যেতে আপনার সাহস হয়?

আমি বললাম, সাহস না করে উপায় কি ভাই বলো? এভাবে নিজের দেশে কুকুরের মতো আর ঘুরতে পারিনা। যা কপালে থাকে, হবে।

আমাকে দেখে শান্তি কমিটির সেক্রেটারি আব্দুস সাত্তার মোক্তার মিয়া অবাক। তাড়াতাড়ি করে আমাকে সে তার ঘরের পেছনে একটা জায়গায় যত্ন করে বসতে দিল। মানুষের চোখের আড়ালে বসতে দিল।

ঐ দিন আবার শান্তি কমিটির মেম্বারদের একটা অধিবেশন ছিল। আমি সেটা আগে জানতাম না। জানলে ঐ দিন আসতাম না।

আমি গোপনে উঁকি মেরে দেখলাম বহু বাঙালি দালাল এসে সেই অধিবেশনে যোগ দিল। ওদের প্রায় সকলকেই আমি চিনতে পারলাম। রাজাকার মোসলেম খাঁ কেও চিনলাম। আমি এই লোকটিকে আগে নানাভাবে বহু সাহায্য করেছি। কিন্তু এখন সাড়া না দিয়ে চুপ করে থাকলাম।

শান্তি কমিটির মিটিং শুরু হলো।

কিছুক্ষণ একথা সেকথার পর শান্তি কমিটির মেম্বার  মোসলেম খাঁ বলল, আমরা এখন পর্যন্ত পিরোজপুরের হিন্দুদের প্রশ্রয় দিচ্ছি।

তার কথা শুনে সাত্তার মোক্তার সাহেব বললেন, কী রকম?

মোসলেম খাঁ বলল, এই যেমন উপেন্দ্রনাথ বাবুকে। আমি লক্ষ করে দেখছি তাকে সকলেই কী রকম করে যেন আড়লে আবডালে রাখতে চায়! এখনও আমি জানি তাকে পাশের ঘরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে!

তার কথায় ঘরের মধ্যে হঠাৎ যেন নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

সকলে যেন হতবাক। যেন বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা!

মরণ ভয়ে আমার বুক দুরু দুরু করে উঠল। নাকি ওর হাতের লাঠিই আমার মাথায় ভাঙে।

কেন যে মরতে এখানে এলাম, আমি ভাবতে লাগলাম।

কমিটির সেক্রেটারি আবদুস সাত্তার মোক্তার হতভম্ব।

শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান তখন মোসলেম খাঁর কথা শুনে খুব শান্তভাবে তার দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলে উঠলেন, ও, আজ এ লোকের গায়ে  খুব গন্ধ হয়েছে তাই না? বেশ, বেশ। তাহলে আপনারা এই যে এতগুলো লোক আজ এখানে বসে আছেন, আপনাদের ভেতরে কে বুক ফুলিয়ে বলতে পারবেন যে, আপনারা কেউ উপেন্দ্রনাথ বাবুর কাছ থেকে টাকা ধার করেন নি? প্রায় সকলেই তার কাছ থেকে নানা কারণে টাকা ধার নিয়েছেন। আর তিনিও উদার মনে ধার দিয়েছেন। এবং এখন পর্যন্ত, আমি যতদূর জানি, কেউ একজনও তার দেনা শোধ দেননি! কেউ কি বলতে পারবেন যে তার দেনা শোধ দিয়েছেন?

বিপদে যে মানুষটা আপনাদের সাহায্য করেছে এখন সুযোগ বুঝে তাকেই হেনস্থা?

চেয়ারম্যানের কথা শুনে ঘরভর্তি মানুষ একেবারে চুপ। কেউ কোনো টু শব্দ পর্যন্ত করল না।

এদিকে চেয়ারম্যানের কথা শুনে আমার চোখে জল চলে এলো।

ভাবলাম যাক, তাহলে ইনি চেয়ারম্যান হলেও এখন পর্যন্ত মানবতাবোধ হারাননি।

সভা শেষে চেয়ারম্যান সাহেব গোপনে আব্দুস সাত্তার মোক্তারকে বললেন, দাদাকে যত্ন করে লুকিয়ে রাখো। রাতে খেতে দিও। আর ভোর হতে না হতেই তাকে নদী পার করে দিয়ে আসবে।

তো পরদিন খুব ভোরে সাত্তার মোক্তার আমাকে নদী পার করে দিলেন।

ফিরে যাওয়ার আগে বললেন, দাদা, আপনাকে তো আমরা চিনি। আপনি খুব আবেগপ্রবণ মানুষ। এভাবে হুটহাট করে এদিকে চলে আসবেন না। তাহলে কিন্তু এক সময় বিপদ হয়ে যাবে। এখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই আমি আপনাকে জানাব। তখন আপনি আমার বাসায় চলে আসবেন।

আমি মাথা নেড়ে বললাম, আচ্ছা।

৩.

প্রায় ৬ দিন বাদে শান্তি কমিটির সাত্তার মোক্তার আমাকে একটা হাত চিঠি দিয়ে শহরে ডেকে পাঠালেন।

বাড়ির মানুষজন আমাকে তো কিছুতেই এ পারে আসতে দেবে না। কিন্তু আমি তাদের কথা শুনলাম না। আমি সাত্তার মোক্তারের ভরসায় নদী পার হয়ে শহরে চলে এলাম। তারপর সাত্তার সাহেবের তত্ত্বাবধানে নিজের বাড়িতেই থাকতে লাগলাম। শুধু বাইরে যেতাম খাবার খেতে। তা ছাড়া বাড়িতেই বেশিরভাগ সময় শুয়ে বসে সময় কাটাতাম। এদিকে আর্থিক সংকটও দেখা দিল।

এই সময় আমার বন্ধুস্থানীয় কিছু  লোক পরামর্শ দিল যে যার কাছে আমি দোকান রেখে চলে গিয়েছিলাম তার কাছে কিছু আর্থিক সাহায্য চাইতে। কারণ আমার দোকানে বসে আমার দোকানের মালামাল বিক্রি করেই তার এখন দিন দিব্যি চলছে।

তো লোকের কথা শুনে একদিন সাহস করে আমি আমার দোকানে গেলাম।

দেখি সে আমার দোকানের গদির ওপরে বসে দোকানদারি করছে।

আমাকে দেখে সে অবাক। এবং যেন একটু বিরক্তও। ভাবতে পারেনি যে আমি পালিয়ে না গিয়ে আমার দোকানের সামনে এসে একদিন হাজির হবো।

আমি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে মিনতি করে বললাম, ভালো আছো ভাই?

সে কোনো রকমে গোঁজামিল দিয়ে বলল, হ্যাঁ, ভালো। তা এদিকে যে?

আমি বললাম, ভাই, আমার দুরবস্থা তো তুমি জানো। এখন যদি কিছু সাহায্য করো তাহলে আমার পরিবারের বড়ই উপকার হয়।

তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার দোকানের চারদিকে সতৃষ্ণ চোখে তাকাতে লাগলাম। দোকানের অবস্থা হতচ্ছিরি। মাল সামান সব এখানে ওখানে ছড়ানো ছিটানো। দেখেই বোঝা যায় যে বিনে পয়সার সম্পত্তি পেয়ে তার কোনোই বিকার নেই। মনে হয় এই সম্পত্তি যে তার নয় এটা সে ভালো করে জানে। তবু যতদিন পারে এটাকে ব্যবহার করে যাচ্ছে। আগে আমার দোকানের চারপাশে আলো ঝলমল করত।

এখন দোকানের ভেতরেই অন্ধকার। চারপাশের কথা বাদই দিলাম।

আমার কথা শেষ হতে না হতেই লোকটি চোখ গরম করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ইয়ার্কি পেয়েছেন না? আমি আপনাকে কেন টাকা দেবো? আপনার কাছ থেকে কি আমি কোনো দিন টাকা ধার নিয়েছিলাম? বেশি বাড়বাড়ি করবেন তো আপনাকে আমি পাক বাহিনী দিয়ে গুলি করে মারব।

আমি তার কথা শুনে একেবারে অবাক হয়ে গেলাম।

এভাবে দিন কে রাত করে ফেলতে পারল লোকটা?

বুঝলাম বন্ধুদের পরামর্শ শুনতে গিয়ে আমি একটা বিরাট ভুল করে ফেলেছি।

 কিন্তু এখন আর উপায় নেই। মন খারাপ করে আমি দ্রুত পায়ে বাড়ি ফিরে এলাম।

কোথায় লুকোবো বুঝতে না পেরে চুপ করে খাটের ওপরে বসে থাকলাম।

এর মাত্র কয়েকদিন বাদেই আমি রাত আটটার দিকে একটা হোটেল থেকে ভাত খেয়ে ফিরছিলাম, কারণ আমার পরিবারের সকলে তখনও নদীর ওপারে, আমাকে কেউ এপারে আসতে দিতে চায় নি, কিন্তু আমার একগুঁয়ে স্বভাবের কাছে তারা হার মানতে বাধ্য হয়েছে, বিশেষ করে আমার স্ত্রী,  তো আমি হোটেল থেকে ভাত খেয়ে ফিরছিলাম, বাড়ি আমার কাছেই, মসজিদ পার হলেই আমার বাড়ি, এমন সময় মসজিদের কাছে আসতে না আসতেই স্থানীয় রাজাকাররা আমাকে ধরে ফেলল।

আমি সাত্তার মোক্তারের কথা বললেও তারা আমাকে ছাড়ল না। একেবারে সোজা আমাকে পাক বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে ফেলল।

নিয়ে যাবার সময় তারা রাইফেলের বাট দিয়ে মারতে থাকল এবং সেই পুরাতনের পুরাতন গালি, আদি ও অকৃত্রিম, মালাউনের বাচ্চা, বলে সম্বোধন করতে লাগল।

আমি একটা কথা ভেবে অবাক হলাম, এইসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র লোক যারা এই কিছুদিন আগেই আমার দোকানের সামনে আমার অনুগ্রহের আশায় বসে দিন গুনত, তারা এখন লাঠি উঁচিয়ে আমাকে মারছে!

তাহলে কি মানুষের ধর্ম বলতে এ পৃথিবীতে কিছু নেই?

শুধু সুযোগের অপেক্ষা?

আমি নীরবে তাদের মার খেলাম। মনে মনে আমার ভুল স্বীকার করলাম। প্রকৃতপক্ষে যে লোকটির হাতে আমি দোকান ছেড়ে এসেছি, সেই লোকটিরই এসব কারসাজি বলে আমার মনে বিশ^াস হলো।

কিন্তু তখন করার আর কিছু নেই।

এরপর তারা আমাকে মারতে মারতে টেনে এনে ফেলল সেনা ক্যাম্পে।

সেই ক্যাম্পে ভীষণ বড় মোচঅলা একজন পাক মিলিটারি আমার দিকে চোখ গোল্লা করে তাকিয়ে বলল, তুম মুক্তি হ্যায়?

আমি বললাম, না।

মিলিটারি বলল, জরুর তুম মুক্তি হ্যায়। তুম দুশমন হ্যায়।

আমি আর এর উত্তরে কী বলব। তারা তো আর আমার কথা বিশ^াস করবে না বলে আগে থেকেই মনস্থির করে বসে আছে।

সুতরাং আর বাক্য ব্যয় না করে চুপ থাকলাম।

তারা এরপর একটা মোটা লাঠি দিয়ে আমাকে মারতে শুরু করল। মারতে মারতে যখন ওদের হাত ব্যথা হয়ে গেল তখন তারা তাদের পায়ের বুটজুতো দিয়ে আমাকে মারতে শুরু করল। মারতে মারতে আমার শরীর রক্তাক্ত হয়ে গেল। আর দুই ঘণ্টা ধরে মারতে মারতে তারাও কাহিল হয়ে গেল। আর আমারও এমন শক্ত প্রাণ আমি তখনও বেঁচে থাকলাম!

এরপর নিরুপায় হয়ে তারা আমাকে একজন মিলিটারি অফিসারের বাসায় একটা রুমে আটকে রেখে দিল। আটকে রাখার আগে আমার পকেটে যে টাকা ছিল, মাত্রই চব্বিশ টাকা, সে টাকাটার লোভও সামলাতে পারল না, নিজেদের পকেটে রেখে দিল।

যে ঘরে আমাকে আটকে রাখল, তাকিয়ে দেখি সেই ঘরে আরও ১৮ জন বাঙালিকে আটকে রাখা হয়েছে।

বাইরে তাদের পাহারায় রাখা হয়েছে সেপাইদের। আমাকে ঘরে ঢুকবার আগে আবার সেপাইদের হাতে কিছু মার খেতে হলো। তারপর ঘরে ঢুকলাম। দুই ঘণ্টা পরপর সেপাইদের ডিউটি পাল্টে যেত। তখন আবার নতুন সেপাইদের হাতে আরেক দফা মার খেতে হতো।

প্রতিবার মারবার সময় একই বুলি তারা উচ্চারণ করত,

 বাতাও, মুক্তি বাহিনী কিধার হ্যায়?

এনায়েত মিয়া কিধার হ্যা?

ডাকদার আব্দুল হাই কিধার হ্যায়?

ডাকদার ক্ষিতিশ মণ্ডল কিধার হ্যায়?

ইয়ে সব আওয়ামী লীগ লিডার কিধার হ্যায়?

রাইফেল কিধার হ্যায়? তো আমি এসবের উত্তর কীভাবে দেব?

আমি কি জানি তারা কোথায় আছে? তারা কি আমার কাছে সব বলে তারপর লুকিয়েছে?

আমি তো নিজের সংকটেই অস্থির।

কিন্তু এই দুষ্ট পাগলদের সে কথা কে বোঝাবে?

৪.

তো এই ভাবে তিন দিন আমার ওপরে অত্যাচার চলল।

এরপর আমাকে সেখান থেকে সরিয়ে স্থানীয় এস.ডি,ও সাহেবের বাসায় নিয়ে গিয়ে তার বাসার পায়খানার ভেতরে আটকে রাখল। তবে সান্ত্বনা যে আমি সেই ঘরে আমি একা ছিলাম না। আমার সঙ্গে আরও ১৪ জন বাঙালিকে আটকে রেখেছিল।

এই ১৪ জনের ভেতরে ফুটফুটে চেহারার একটা ছেলে ছিল। তার নাম আলী আশরাফ। ছেলেটির দুর্ভাগ্য যে ঢাকা থেকে সে বাড়ি ফিরে আসছিল। হয়তো ভেবেছিল বাড়ি তার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ । কিন্তু ‘হুলার হাট’ লঞ্চ থেকে ছেলেটিকে পাক সেনারা আটক করে। তারপর পাক ক্যাপ্টেন লঞ্চের কিচেন থেকে আধাপোড়া কাঠ এনে ছেলেটির শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চেপে ধরে। ফলে শরীরের বিভিন্ন জায়গা তার পুড়ে যায়। আর তা এমনভাবে যে সেই জায়গাগুলোর চামড়া ও মাংস পুড়ে গিয়ে পরে পচে যায়। পচে গিয়ে সেখান থেকে দুর্গন্ধ বেরোতে থাকে।

এরপরও তার ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে।

আমি নিজেও দফায় দফায় অত্যাচারিত হলেও এই ছেলেটির প্রতি মায়া ও ভালোবাসায় আমার হৃদয় পূর্ণ হয়ে গেল। আমার ছোট ভাইয়ের মতো তার চেহারা, যে ভাইটি আমার ছেলেবেলায় ডায়রিয়া হয়ে মারা গেছে। আমার বুড়ো মা এখনও যার জন্য বসে মাঝে মাঝে কাঁদেন।

আমি মনে মনে তাকে বললাম, বাছা, কেন তুমি এই দুর্যোগের সময় ঢাকা ছাড়লে? বাড়িতে ফিরে আসার এমন কি জরুরি দরকার ছিল?

কিন্তু আমি তাকে সেকথা বলতে পারলাম না। বলবার মতো সুযোগও ছিল না।

এরপর পায়খানা থেকে আমাদের জেলখানার হাজতে নিয়ে আসা হলো।

পাক ক্যাপ্টেন এজাজ ছিল সেখানকার হেড।

একসময় আমাকে পাক ক্যাপ্টেন এজাজের সামনে বিচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো।

তাকিয়ে দেখি ক্যাপ্টেনের বয়স খুবই কম। মনে হয় বিয়ে থাওয়াও হয়নি।

আমাকে দেখে ক্যাপ্টেন এজাজ গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল, শোন, তুমি একজন মুক্তি বাহিনীর লোক আমরা জানি। আর এটাও জানি যে তোমার কাছে রাইফেল আছে। এখন আমার কাছে বল তোমাদের বাহিনী এখন কোথায় আছে।

ক্যাপ্টেন এজাজের প্রশ্নে আমি এবার গম্ভীর স্বরে খাস উর্দুতে বলতে শুরু করলাম, দেখুন, আমি একজন সাধারণ ব্যবসায়ী মানুষ। ব্যবসা করে আমি জীবিকা নির্বাহ করি। বালবাচ্চা পালি। কাজেই আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হলে ব্যবসা সম্পর্কে করুন। আমি তার উত্তর দিতে পারব।

আমার কথায় ক্যাপ্টেন এজাজ বোধ করি মনে মনে অবাক হলো।

এরপর আমাদের দুজনের মধ্যে অনেক কিছু আলোচনা হলো। অনেক বচসাও হলো। হাজার হোক আমি তার চেয়ে বয়সেও অনেক বড়।

শেষে ক্যাপ্টেন এজাজ আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি এত উর্দু কথা কেমন করে শিখেছ?

তার এ প্রশ্নে আমি এবার ভয় পেয়ে যাই। কারণ ব্রিটিশ আমলে আমি পুরো সাত সাতটা বছর ব্রিটিশ আর্মিতে চাকরি করেছিলাম। এ কথা যদি ক্যাপ্টেন জানতে পারে তো আমাকে তখনই হত্যা করবে।

আমি তখন বুদ্ধি খাটিয়ে বললাম, আমি একজন ব্যবসায়ী লোক। আমি খুলনা শহরে পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসা করি। তারা আমাকে পেয়ার করে। এবং প্রতি সাত দিন অন্তর আমি তাদের সঙ্গে একদিন থাকি। এরপর এক ধারসে আমি খুলনার কতকগুলো পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীদের নাম বলতে থাকলাম। দুই একটা নাম বানিয়েও বললাম যাদের পৃথিবীতে অস্তিত্ব নেই!

আমার কথা ক্যাপ্টেন এজাজ বিশ^াস করল। শুধু তাই না আবেগ প্রবণ হয়ে আমাকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি আমার বন্ধু। তুমি ঘরে ফিরে যাও। আজ শহরে কারফিউ। কাজেই সকাল পর্যন্ত তুমি এখানে অপেক্ষা করো। এখন বিশ্রাম করো।

এই বলে সে আমাকে হাজতখানায় ফিরিয়ে নিয়ে এলো। তারপর চলে গেল।

আমি হাজতখানায় ফিরে আসার পর সে এক দৃশ্য হলো!

সকলেই আমার দিকে এমনভাবে তাকাতে লাগল যেন আমি হিমালয় জয় করে এসেছি!

এরপর শুরু হলো তদবির।

যে ১৮ জন সেই হাজত ঘরে ছিল সকলেই আমার কাছে এসে আমার হাত ধরে বলতে লাগল, ভাই, তুমি তো সকালে বাড়ি ফিরে যাবে। আমাদের অবস্থা কি হবে? তাই তুমি আমাদের প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে খবর দেবে। তাদের বলবে, টাকা পয়সা যা-ই লাগে, তাই দিয়ে তারা যেন আমাদের এখান থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে যায়।

আমি তাদের কথা দিয়ে বললাম, চিন্তা করো না। আমি খবর দিব।

এইভাবে মনের ভেতরে নানা রকমের চিন্তা দুশ্চিন্তা নিয়ে বদ্ধ ঘরের মধ্যে সময় কাটাচ্ছি, এমন সময় রাত প্রায় এগারোটার দিকে দেখি একজন সেপাই একটা প্লেটে করে চারটে রুটি ও একটু খানি মাংস নিয়ে হাজতে হাজির।

আমার হাতে প্লেট দিয়ে বলল, ইয়ে তুমহারে লিয়ে ক্যাপ্টেন সাব নে ভেজা!

শুনে তো আমি অবাক। এ রকম কাণ্ড কেউ কখনও কল্পনা করতে পারে?

আমার ঘরের সমস্ত মানুষও অবাক।

কিন্তু আমি মাথা ঠান্ডা রাখলাম। ক্ষুধার্ত হয়ে প্লেটের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লাম না।

গম্ভীর স্বরে সকলকে শুনিয়ে জোরে জোরে বললাম, এই প্লেট ফিরিয়ে নিয়ে যাও। এই রুটি আমি খাবো না। কারণ আজ ১১ দিন আমি শুধু পানি খেয়ে আছি। আমার সঙ্গের এই ১৪ জনও আজ ১১ দিন শুধু পানি খেয়ে আছে। আর এখন তুমি আমার জন্য শুধু চারটে রুটি এনেছো। কাজেই আমি খাব না। সবাই যেভাবে না খেয়ে আছে আমিও সেভাবেই থাকব।

আমার কথা শুনে সেপাই অবাক। মনে মনে হয়তো তার রাগও হলো। কিন্তু বেচারা কি করবে। তাকে তো ক্যাপ্টেনের হুকুম মেনে চলতে হয়।

সে নিশ্চয় ফিরে গিয়ে ক্যাপ্টেন এজাজকে সব কথা বলবে।

আমিও মনে মনে চিন্তায় থাকি। এখন না আবার আমাকে ঘর থেকে বের করে টরচার করা শুরু করে! হয়তো সারারাত চাবকাতে থাকবে। ক্যাপ্টেনের আদেশ অমান্য? হায় , হায়।

মনে মনে এইসব ভাবলাম।

কিন্তু বাইরে স্থির থাকলাম। যদিও বুকের ভেতরে ঢিবঢিব করতে লাগল।

এখন দেখা যাক কি হয়।

এইভাবে রাত বারোটা বেজে গেল।

এমন সময় দরজার বাইরে থেকে একটা শব্দ কানে এলো। আর দরজা চোখের সামনে হাট করে খুলে গেল।

তাকিয়ে দেখে আমার চোখ ছানাবড়া।

দেখি একটা বড় ঝুড়িতে করে এক ঝুড়ি রুটি আর একটা বালতিতে করে এক বালতি মাংস নিয়ে এসেছে সেপাই।

আমাদের সকল বন্দিদের জন্য!

সেপাই আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক হাসি দিয়ে বলল, উপেন সাব, আব্ সব লোগোকে সাথ খানা খা লেও। ক্যাপ্টেন সাব্ নে ভেজা।

ভয়ে, বিস্ময়ে ঘরের সমস্ত মানুষ হতবাক।

তারা হয়তো ভাবল, আমি কি ম্যাজিসিয়ান নাকি।

তো সে চলে যাওয়ার পর আমরা সবাই খানা খেতে বসেছি, গরম রুটিতে হাত দিয়েছি মাত্র, ওমনি কালনেমির মতো সেপাই আবার দরজার গোড়ায় এসে হাজির হলো।

মনে মনে ভাবলাম, আবার কি। এখন কি এইগুলো থাবা মেরে কেড়ে নিয়ে যাবে?

এদের পক্ষে তো কিছুই অসম্ভব নয়।

সেপাই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে বলল, ক্যাপ্টেন সাব্ নে আপকো বোলায়া!

ব্যস, মনে মনে বললাম, আমার হয়ে গেল!

মনে হলো আমি প্রথমে রুটি খেতে চাইনি বলে ক্যাপ্টেন আমাকে জবাবদিহি দেওয়ার জন্যে ডেকে পাঠিয়েছে। এবার ঠিক আমাকে মেরে ফেলবে!

হায় রে আমার কপাল! তাও যদি মরার আগে দুখানা রুটি মাংস গালে দিয়ে মরতে পারতাম!

আমি করুণ চোখে একবার ঘরের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে পায়ে পায়ে হেঁটে ক্যাপ্টেনের ঘরে উপিস্থিত হলাম।

ক্যাপ্টেন ইশারায় আমাকে একটা হাতাঅলা চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলল।

আমি বসলাম।

ক্যাপ্টেন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কি খেয়েছ?

আমি মিথ্যে করে বললাম, হ্যাঁ, আমি এই মাত্র রুটি মাংস খেয়েছি।

ক্যাপ্টেন এজাজ এ কথা শুনে হেঁকে উঠে বলে, না, এ কথা বললে হবে না। আবার তোমাকে আমার সামনে বসে খেতে হবে!

কথা শেষ করেই সে সেপাইকে হাঁক দিল।

তারপর তাকে পরোটা ও মুরগির রোস্ট আনতে বলল।

আমি তার কথা শুনে তাজ্জব হয়ে গেলাম।

আরে এ বলে কি?

মনে মনে জপ করতে করতে বললাম, হে মা দুর্গা, এ কার হাতে তুমি আমাকে এনে ফেললে এখন?

মা দুর্গা আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না! দেবেন না যে তা জানতাম। কারণ বিপদে কেউ সহায় হতে চায় না!

তখন মনে হলো ছেলেবেলায় আমার মা বলতেন, পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে!

তো তাই সই।

তবে মনে মনে যাই বলি না কেন, সেই মধ্য রাতে ক্যাপ্টেন এজাজ সাহেবের হুকুমে তার সামনে বসে দুইটা পরাটা আর একটা আস্ত মুরগির রোস্ট খেয়ে শেষ করলাম। খেতে যে খুব খারাপ লাগল একথা বলবো না।

খাওয়ার পর আমাকে সে আবার হাজত রুমে পাঠিয়ে দিল।

মৃত্যুর আগের শেষ খাওয়া কী না এটা একবার তাও ভাবলাম।

৫.

পরদিন ভোর বেলা আমি ঘুম থেকে উঠলে আমাকে আবার ক্যাপ্টেন এজাজ ডেকে পাঠালো।

আমাকে জিজ্ঞেস করল, রাতে তোমার ঘুম হয়েছিল?

শুনে আমি মিথ্যে করে বললাম, খুউব!

কথা শুনে খুশি হয়ে সে বলল, আচ্ছা, এবার নাস্তা খাও।

এই কথা বলে সে একজন সেপাইকে বেল বাজিয়ে ডাকল। তারপর তাকে বলল, সাব কে লিয়ে নাস্তা লে আও!

আর সেপাই মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, জরুর!

একটু পরে সেপাই নাস্তা নিয়ে এলে আমাকে তার সামনে বসে খেতে বলল।

আমি সব খেলাম।

সে তাকিয়ে থেকে আমার খাওয়া দেখল।

তখন আমার কেন জানি মনে হলো ক্যাপ্টেন এজাজের মনে নিশ্চয় তার ছেলেবেলার কোনো প্রিয় মানুষের সাথে আমার চেহারার মিল খুঁজে পেয়েছে। তা না হলে আমার এত খাতির কেন?

 দৈত্যেরও তো মন বলে কিছু একটা থাকে!

এরপর ক্যাপ্টেন এজাজ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি এবার সোজা বাড়ি চলে যাও। একেবারে এ দিক ওদিক করবে না। কারও সঙ্গে মিশবে না। ঠিকঠাক মতো চলাফেরা করবে। মনে থাকবে?

আমি তার কথা শুনে মস্তবড় মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম।

এবং হাজত ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।

 কিন্তু আমাকে ক্যাপ্টেনের কথায় হ্যাঁ বললে তো চলবে না।

আমরা বাঙালিরা কখনও তো একা বাঁচি না, আমরা বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদের নিয়ে বাঁচি। এই হলো আমাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য। সুতরাং আমি প্রথমেই সোজা বাড়ি না গিয়ে রাতের বেলা বন্দিরা আমাকে যেসব কথা বলে দিয়েছে, প্রত্যেকের কথা আমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলে এলাম।

তাদের অনুরোধ করে বললাম যার যা কিছু আছে সব বিক্রি করে যেন ওদের জেলখানা থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসে।

সবশেষে আমি আশরাফের বাড়িতে গেলাম। সেই আশরাফ, যাকে ‘হুলার হাট’ লঞ্চ থেকে পাক সেনারা ধরে নিয়ে এসে জ্বলন্ত কাঠ দিয়ে তার শরীর পুড়িয়ে দিয়ে শরীরে ঘা করে দিয়েছিল।

আশরাফের বাড়ি গিয়ে ওর খালুর সঙ্গে দেখা করলাম। খালুকে বললাম, আশরাফ আমার কাছে কাকুতি মিনতি করে বলেছে যে, যদি তাকে মিলিটারির হাত থেকে উদ্ধার করা না যায়, যদি তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়, তাহলে যেন তার পরিবার তার আত্মার সদগতি করে।

আমার কথা শুনে আশরাফের খালু গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়লেন। মনে হলো, আমার এভাবে যেচে তাদের বাড়িতে যাওয়া উচিত হয়নি। কে কখন দেখে ফেলবে তার ঠিক কি।

কিন্তু আমি বন্দিদের কথা দিয়েছিলাম তাদের আত্মীয়দের কাছে গিয়ে খবর দেবো, আমি আমার কর্তব্য কাজ করলাম।

৬.

কিন্তু বাড়িতে ফেরার পরও আমার ঘুম আসছিল না। নানা প্রকারের চিন্তায় মাথা গরম লাগছিল। বারবার বিছানা ছেড়ে উঠে জল খাচ্ছিলাম।

এমন সময় জেটি ঘাটে দশ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনলাম।

শব্দ শুনে আমার চোখের ঘুম একেবারে চলে গেল। ভাবলাম, হায়, হায়, আবার কাদের সর্বনাশ হলো।

পরের দিন খুব ভোরে উঠেই বাইরে বেরিয়ে জানতে পারলাম, এতদিন যাদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল তাদের অনেককে গত রাতে পাক হানাদার গুলি করে হত্যা করেছে।

তখন আশরাফের কথা ভেবে আমার বুক ধড়াস করে উঠল। মনে হলো, আশরাফকেও কি গত রাতে মেরে ফেলেছে?

আমি আর কোনো কথা চিন্তা না করে দৌড়ে নদীর জেটিঘাটে চলে এলাম।

সেখানে পৌঁছে দেখি জেটিঘাট সুনসান।

সোঁ সোঁ করে বাতাস বইছে। পাড়ে বেঁধে রাখা নৌকোগুলো খালি। বাতাসে জলের ঢেউয়ে তারা আপন মনে দুলছে। মানুষ তো দূরে থাক, এমন কি কাকপক্ষীও নেই।

শুধু কয়েকটা লাশ সিঁড়ির ওপরে এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়ে আছে।

হে ভগবান, মনে মনে বলে, আমি বড় বড় করে কয়েকটা শ^াস নিলাম।

 বুঝলাম গত রাতের এদেরই জীবন নাশ করেছে পাক হানাদার।

তারা প্রায় প্রত্যেকেই এই এলাকা বা আশপাশের এলাকার মানুষ।

হায়, হায়, কোন বাড়ির এমন সর্বনাশ হলো।

কোন মায়ের কোল খালি হলো।

এইসব ভাবতে ভাবতে আশপাশে একবার চোরা চোখে তাকিয়ে নিয়ে হামাগুঁড়ি দিয়ে লাশগুলোর কাছে গিয়ে পৌঁছোলাম। তারপর হাত দিয়ে তাদের উল্টে পাল্টে  দেখতে লাগলাম। আমার উদ্দেশ্য আশরাফকে খুঁজে বের করা। কারণ সে আমাকে একটা অনুরোধ করে গেছে। যদি মারা যায়, তাহলে তার বাবা মার কাছে গিয়ে বলা। তারা যেন তার আত্মার সদগতি করেন।

কিন্তু আশরাফকে দেখতে পেলাম না।

তাহলে কি আশরাফ বেঁচে আছে?

কথাটা ভেবে আমার মনে আশা হলো বটে তবু মন থেকে সন্দেহ গেল না।

কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারলে ভালো হতো।

কিন্তু গত রাতে এখানে গুলি করা হয়েছে বলে জেটির ঘাট সুনসান।

চোখ তুলে চারদিকে আবারও তাকিয়ে দেখলাম কিন্তু জীবন্ত মানুষ চোখে দেখলাম না।

হঠাৎ নদীর দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি দূরে একটা নৌকায় একজন মাঝি ঝিম ধরে বসে আছে! যেন সে জীবন্ত না মৃত বোঝা মুশকিল। অবশ্যই জীবন্ত। নইলে ওভাবে বসে থাকবে কী করে।

তাকে দেখে বুঝলাম সে ভাড়ার আশায় বসে আছে। গত রাতে যে এতগুলো মানুষকে এখানে হত্যা করা হয়েছে তাতেও যেন তার কোনো সাড় সেই!

তার ভাড়ার জন্যে খদ্দের পেলেই হলো।

আরে আশ্চর্য! এ মানুষ নাকি? মনে মনে আমি ভাবলাম।

তারপর আমার মনে হলো হয়তো তার জীবনের দর্শন হচ্ছে যতক্ষণ শ^াস, ততক্ষণ আশ!

আমি সেই মাঝির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই, গত রাতে কি শুধু এই ক’জন?

মাঝি একজন দার্শনিকের মতো আঙুল তুলে একটু দূরে দেখিয়ে বলল,  ঐহানে নদীর ভাটিতে আর দুইটা ভাইসা আছে!

তাই? কোথায় ভাই?

ঐ যে। মাঝি নির্লিপ্ত মুখে আমাকে আবার দেখালো।

আমি তার কথা শুনে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।

আস্তে আস্তে সাঁতার কেটে লাশ দুটোর কাছে চলে এলাম।

দেখি সেই দুজনের ভেতরে একজন হচ্ছে আশরাফ!

দেখে যেন আমার বুক ভেঙে গেল।

চোখের জল রোধ করতে পারলাম না। জানি, সকল মৃতের জন্যই আমার শোক করা উচিত, তবু আশরাফের জন্যে আমার মনের ভেতরে যেন শোকের ফল্গুধারা বয়ে যেতে লাগল।

মনে মনে বললাম, ভাই, তোমাকে আমি এভাবে নদীতে ভাসতে দেবো না। আমি তোমাকে তোমার মা বাবার কাছে নিয়ে যাব। তারা ধর্মের নিয়ম মেনে তোমাকে সুন্দরভাবে দাফন করবেন।

তোমার মনের শেষ বাসনা তারা পূরণ করবেন।

একথা মনে মনে বলে, আমি আশরাফের লাশ কাঁধে তুলে নিয়ে জেটি ঘাটে উঠে আসলাম। চারপাশে তখন রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। কে কোত্থেকে দেখে ফেলে সেসবের তোয়াক্কা না করে আমি তার লাশ কাঁধে নিয়ে  হেঁটে হেঁটে তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম।

তখনও আশরাফের শরীর দিয়ে পানি আর রক্ত ঝর ঝর করে আমার শরীর বেয়ে মাটিতে পড়ছিল।

সেই ভোরের বেলা আমি আশরাফের বাবা মায়ের কাছে গিয়ে হাজির হলাম। দরজা ধাক্কা দিয়ে তাদের ডাকলাম। এবং আশরাফের শেষ ইচ্ছার কথা জানালাম।

 কিন্তু ফল হলো উল্টো।

আশরাফের লাশ আমার কাঁধে ঝুলতে দেখে তার বাবা মা যেন আতঙ্কে শিউরে উঠলেন।

হাউমাউ করে বললেন,  ও উপেন, তুমি শিগগির এখান থেকে চলে যাও! মিলিটারি দেখতে পেলে আমাদের সকলকে যে এখুনি মেরে ফেলবে।

আমি তাদের কথা শুনে হতবাক।

মনে মনে ভাবলাম, আরে, বলে কি! নিজেদের সন্তানের লাশ দাফন করবে না?

তো তখন আর কি করি। সেই লাশ কাঁধে আমি ফিরে এলাম নিজের বাড়িতে। এসে আশরাফকে অনেক কায়দা করে বাড়ির মধ্যে লুকিয়ে রাখলাম।

 তারপর রাত যখন গভীর হলো কয়েকজন লোক ডেকে তাদের সাহায্যে আমি আশরাফকে কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে কবর দিয়ে দিলাম।

 কবর দেবার সময় চুপি চুপি আশরাফকে বললাম, ভাই, মন খারাপ করিস নে, তোর মা বাবা ভয় পেয়ে তোর লাশ দাফন করতে পারেন নি। কারণ তাদের আরও ছেলেমেয়ে আছে তো। তাই আমিই তোর লাশ সুন্দর করে দাফন করলাম। যেখানেই থাকিস তোর আত্মা এবার শান্তিতে থাকবে।

এরপর থেকে কেন যেন আমার মনে অনেক সাহস এসে জমা হলো। যা থাকে কপালে এই ভেবে নিজের প্রাণের তোয়াক্কা না করে আমি এবার মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করলাম।

এবং আমি পিরোজপুর শহরেই বাস করতে লাগলাম।

আমাদের মুক্তি বাহিনীর কখন কি দরকার পড়ে কে জানে।

এই রকম এক সময় ক্যাপ্টেন এজাজ ছুটি নিয়ে পাকিস্তানে চলে গেল বিয়ে করতে।

পাকিস্তানি সুবেদার সেলিমের ওপরে দায়িত্ব দিয়ে গেল।

তারপর আর দেখে কে। এই লোক খুব খারাপ জাতের ছিল। সে স্থানীয় দালালদের ধরে একভাবে বাঙালি মেয়েদের ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে আসত এবং তাদের ওপরে অত্যাচার করে মেরে ফেলত। তার হিন্দু মুসলমান বলে কোনো বাছ বিচার ছিল না।

কোনো ধর্মেরই সে তোয়াক্কা করত না।

তার অত্যাচারের ফলে আমাদের পিরোজপুর শহর প্রায় জনশূন্য হয়ে গেল।

৭.

এর মধ্যে আমি একদিন আমার বাসার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম, এমন সময় দুজন সেপাই আমাকে ডেকে বলল, তুমকো সুবেদার সাব নে বোলাতা হ্যায়।

তাদের কথা শুনে আমি তো বিপদে পড়ে গেলাম।

এখন আবার এ কীসের আলামত।

তবু আমি আর কি করি। গেলাম।

যদিও আমার পরিবার এবং বন্ধুবান্ধব বারবার আমাকে মানা করত রাস্তায় প্রকাশ্যে না বেরোতে, তবু আমি বেরোতাম। আমার মনে জেদ হতো এই ভেবে যে আমার শহরে আমি বেরোবো, এ আমার জন্মশহর, কার বাবার সাধ্য আমাকে বেরোতে মানা করবে?

তখন আমার এটুকু মনে হতো না যে এখন সময় খারাপ। দেশ বিদেশিদের দ¦ারা আক্রান্ত। আমার এইসব ছেঁদো যুক্তির কোনো দাম নেই।

তো তাদের মানা না শোনার জন্য আমাকে বারবারই গুনোগার দিতে হয়েছে!

এবারও তাই হলো।

আমাকে রাস্তা থেকে সেপাই দুজন সুবেদার সাহেবের কাছে নিয়ে গেল। আর সুবেদার সাহেব চোখ গরম করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তোমার জীবন নেবো। তুমি আমাদের সঙ্গে বহুত দুশমনি করছ।

এরপর আমার উত্তরের কোনো অপেক্ষা না করেই আমাকে মারতে শুরু করল।

মারতে মারতে আমার শরীর রক্তাক্ত করে ফেলল।

এজাজের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে একটু খাওয়া দাওয়া করে শরীর ভালো করেছিলাম, এখন আবার মার খেয়ে আগের যে কে সেই।

মারের পর আবার সেই এসডিও সাহেবের বাড়ির পায়খানায় আটকে রাখল।

আগেও আমি এই পায়খানায় বেশ কদিন থেকে গিয়েছিলাম, সুতরাং পায়খানাটাকে বেশ পরিচিত মনে হলো।

এই সময় আমি গোপনে লক্ষ করতে লাগলাম যে খান সেনারা প্রত্যেক দিন বাঙালিদের একসঙ্গে ধরে নিয়ে একটা একটা করে রাস্তায় আছড়িয়ে ফেলত। তারপর আধা মরা হয়ে গেলে তাদের বস্তায় ভরে বাইরে থেকে বেয়োনেট চার্জ করে নদীর ভেতরে ফেলে দিত।

অনেক মানুষকে আবার তাদের জিপগাড়ির পেছনে বেঁধে নিয়ে সারা শহর ঘুরে বেড়াত, যতক্ষণ না রাস্তার ইট খোয়ার ঘষটানিতে সেই মানুষটির হাড় মাংস বেরিয়ে পড়ত। তারপরও কেউ তৎক্ষণাৎ মারা না গেলে বেয়নেট খুঁচিয়ে মেরে ফেলত।

আমার চোখের সামনে ভাগীরথী বলে একজন গরিব মহিলাকেও তারা এ রকম জিপের পেছনে বেঁধে সারা শহর ইটের রাস্তায় ঘষটাতে ঘষটাতে মেরে ফেলেছিল।

সেই মহিলা নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন।

আর এভাবে মেরেছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা এ বি এম মীজানুর রহমান, ওরফে সাঈফ মিজানকেও। তিনি ছিলেন পিরোজপুরের ট্রেজারি অফিসার। ট্রেজারি খুলে মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি অস্ত্র বিলি করেছিলেন।

আর কাছে নদী থাকার জন্যে যেন হানাদার বাহিনীর আরও সুবিধা হয়েছিল। মৃত মানুষদের গায়েব করে ফেলতে তাদের বিন্দুমাত্র যেন কষ্ট করতে হতো না।

তবে এইবার ধরার পর আমার কি শাস্তি হয়েছিল?

ক্যাপ্টেন এজাজের শুভ দৃষ্টির জন্যে হয়তো আমাকে প্রাণে মারতে সাহস পায়নি, তার জন্য আমাকে ক্যান্টনমেন্টের সামনে যে বড় বাদাম গাছটা ছিল সে গাছের সঙ্গে কপিকল লাগিয়ে আমার পা দুটো উল্টো করে বেঁধে ঝুলিয়ে দিতো। সেই সঙ্গে ভীষণভাবে মার দিতো।

এতসব ঝকমারির ভেতরেও আমি আমার চোখ কান খোলা রেখেছিলাম। হয়তো প্রথম জীবনের মিলিটারি ট্রেনিং আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করে থাকবে। ফলে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমি প্রায় প্রত্যেক দিন খুব ভোরবেলা জেটি ঘাটে গিয়ে আগের রাতে যাদের মেরে রেখে গেছে সেইসব লাশ উল্টেপাল্টে দেখতাম। চেনা শোনা লাশ হলে তাদের বাড়িতে গিয়ে খবর দিয়ে আসতাম।

এইভাবে আমি প্রায় ২০০০ লাশ গুনে তুলেছিলাম।

তারপর আরও বলি, আমি আমার এই দুচোখে প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষকে কুপিয়ে মারতে দেখেছি।

এখন এই জীবন সায়াহ্নে এইসব স্মৃতি যখন মাঝে মাঝে মনে পড়ে আমার ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতার জন্ম হয়।

তারপরও সত্য রক্ষা করতে বলব, পাক হানাদার বাহিনী আমাদের ওপরে যত না অত্যাচার করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি অত্যাচার করেছে বাংলাদেশের বাঙালি রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকেরা।

পাকিস্তানি হানাদার নিষ্ঠুর অত্যাচার করে যাদের মুক্তি দিত, এই সব বর্বর বাঙালি দালালরা তাদের ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করত। এরা নিজেরাই পিরোজপুর জেটি ঘাটে প্রায় তিন চার হাজার লোককে হত্যা করেছে।

এবং স্বাধীনতার এত বছর পরেও, রজতজয়ন্তীর পরেও, আমার মনে দৃঢ় বিশ^াস এরা এখনও বাংলাদেশে আছে, ঘাপটি মেরে আছে, বাঙালির দুঃসময়ের অপেক্ষায় আছে এবং যথাসময়ে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে!

আমি তাই সকল অকৃত্রিম বাঙালিকে সারাটা জীবন সতর্ক থাকতে অনুরোধ করি।

রক্তে স্নান করে আসা এই দেশটিকে যেন আমরা সকলে প্রাণ দিয়ে আগলে রাখি।

আর  মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি যদি বলেন, তাহলে বলব, আমি আমার মুসলমান ভাই আশরাফকে শত বিপদ তুচ্ছ করে নিজের হাতে কবর দিতে পেরেছি।

আশরাফের মৃত্যুকালীন মনোবাসনা পূরণ করতে পেরেছি, যা তার পরিবারের লোকেরা  প্রাণ ভয়ে করতে পারেনি। এতেই আমার জীবন সার্থক।

আমার নামটা আপনারা অনুগ্রহ করে মনে রাখবেন, আমি উপেন্দ্রনাথ দত্ত। গ্রাম রাজার হাট। ডাকঘর ও থানা পিরোজপুর। জেলা বরিশাল।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares