যে লাশ নিখোঁজ হয়ে যায় : হরিপদ দত্ত

উনপঞ্চাশ বছর পর আর একটি লাশ নিখোঁজ হয়ে গেল। সেবার একাত্তরের যুদ্ধকালে বাংলাদেশে। এবার পশ্চিমবঙ্গের কাঁকুড়গাছি। করোনা ভাইরাস ডিজিস বা কোভিডকালে। যুবক ব্রজগোপাল গাঁয়ে পাঞ্জাবিরা হামলে পড়লে কোনোক্রমে মা আর ভাই-বোনদের নিয়ে বাড়ির উত্তরের বাঁশবনে পালাতে পারলেও, বাতের রোগে আক্রান্ত পিতা মথুরাচন্দ্র তরফদার পালাতে পারেনি। হয়তো কোমর বাঁকা মানুষটা শেষে রক্ষা পেত যদি ঘরে জয়বাংলার পতাকা পেয়ে না যেত হারামজাদারা। গাঁয়ের সাতজন লোককে ধরে রশি বেঁধে আনা হয় শীতলক্ষ্যা নদীতীরে। ইংরেজ জামানার পরিত্যক্ত চরসিন্দুর কটন মিল। কাঠামোটা সেই জামানার স্মৃতি ধরে আছে। ভরা বর্ষায় শীতলক্ষ্যা। কলকল স্রোত টানে দক্ষিণে। ভাটিতে। নদীটা কাপাসিয়া মনোহরদি ছেড়ে চরসিন্দুর বাঁক নিয়ে গভীর দহ তৈরি করেছে কটন মিল বরাবর এসে। গভীর রহস্যঘেরা দহ। নানা কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে দহ ঘিরে। নীল জলের এই দহের কাছে এলে গা ছমছম করে। কে জানে অন্তহীন এই অতল-বিতল জলের গভীর অন্ধকার তলায় কি লুকিয়ে আছে। জলদৈত্য! জিন!

বর্ষার ঘোলা স্রোত পাক খায়। পাকে যে জলের সুড়ঙ্গ তৈরি হয় তার কোথায় শেষ জলেরাও জানে না। ভয়াল দৃশ্য তৈরি হয় দিন গত হয়ে রাতের আঁধার নামলে। মনে হয় কালো দৈত্য পাতালে চুষে নিচ্ছে অন্ধকার জলের পর্বত। বর্ষার মাঝিরা পারতপক্ষে এই পাক-দেশে নৌকা ঘষতে দেয় না। এক টানে নৌকা খাড়া হয়ে ঢুকে যাবে জলের গভীরে। আর পাকসেপাইরা সাতজন গ্রামবাসীকে কটন মিল ঘেঁষা দহ ঘেরা খাড়া গাঙের পাড়ে দাঁড় করিয়ে ব্রাসফায়ার করে দেয়। সমস্বর আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে বর্ষাভেজা আসমানে। ভাদ্র মাসের দিঘির পাড়ের গাছ থেকে পাকা তাল ঝপাং শব্দে জলে পড়ার মতো গুলিবিদ্ধ সাতটি মানুষ বর্ষার দহের প্রবল স্রোতের টানে পাকের গহ্বরে মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যায়।

পরদিন জনশ্রুতি ওঠে, শীতলক্ষ্যার দহ থেকে খানিক দূরে একটি লাশ সন্ধ্যা নামা কালে ভেসে উঠে স্রোতের টানে দক্ষিণে চলে গেছে। আঁধার নামলে টর্চ হাতে পিতা মথুরাচন্দ্রকে খুঁজতে আসে ব্রজগোপাল পড়শি জালালউদ্দিনকে সঙ্গে করে! কেননা ওই সাতজনের একজন ছিল জালালউদ্দিনের ছোট চাচা জয়নাল ভূঁইয়া। তখন ঝমঝম বৃষ্টি নামে। বৃষ্টিমাথায় অন্ধকার নদীতীরে দু’জন জীবন্ত মানুষ সাতটি লাশের খোঁজে টর্চের আলো ফেলে দহের জালে দৃষ্টি ভাসিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জলের পাক মৃত্যুর মতো ভয়ংকর স্রোত গিলে খায় সঙ্গে টর্চের ঘোলা আলোর মরা রঙ। টর্চ নিভে গেলে দু’টো মানুষ বর্ষার অন্ধকারে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে থাকে। শীতলক্ষ্যার মৃত্যুস্রোতের কলকল ছলছল কালোজলে ডুবে দক্ষিণে বয়ে যায় নিরুদ্দেশের পানে দুটো মানুষের বিলাপ।

রাত পোহালে গাঁয়ের লোক লাশ খোঁজার জন্য ছুটে বেড়ায় শীতলক্ষ্যার পাড় ধরে। চরসিন্দুর থেকে পলাশ, পলাশ থেকে ঘোড়াশাল পর্যন্ত ছয়সাত মাইল নদীপাড় ছুটে বেড়ায়। জনশ্রুতি এই, একটি মেয়ে মানুষের লাশ উত্তর থেকে দক্ষিণে ভাসতে গিয়ে কিছুক্ষণ আটকে ছিল ঘোড়াশাল রেলব্রিজের পিলারে। তারপর ভেসে গেল কি তলিয়ে গেল তা কেউ জানে না।

পিতা মথুরাচন্দ্রের নিখোঁজ লাশের স্মৃতি কাঁধে চাপিয়ে ব্রজগোপাল বিধবা মা আর ভাই-বোনদের নিয়ে কুষ্টিয়া বর্ডারে পাকবাহিনী আর মুক্তিবাহিনীর গোলাগুলির ভেতর দেশ ছেড়ে পালায়। মৃত পিতার শ্রাদ্ধশান্তি করার ফুরসতও পায়নি। তার বিশ্বাস মৃত পিতার প্রেতাত্মা বড় কষ্টে আছে। শাস্ত্রমতে পারলৌকিক ক্রিয়া হয়নি। পিতার আত্মার মুক্তি হবে না। প্রেতলোকে অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করবে অনন্তকাল। ভেবে নেয় হিন্দুস্তান গিয়ে গয়া-কাশীতে পিতার আত্মার নামে পিণ্ডদান করবে। তবেই না পিতা স্বর্গে গিয়ে আপনার শান্তিলাভ করবে। হাজার দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও এই বিশ্বাসে এতই সুখ যে, নিজে একজন অতি ক্ষুদ্র তুচ্ছ মানুষ হয়েও কেবল পুত্র হবার অধিকারে জন্মদাতাকে অনন্ত সুখের স্বর্গলোকে পাঠাবার অধিকার একমাত্র তার। অথচ ধর্মশাস্ত্রের এতবড় মিথ্যা ছলনাটুকু বুঝবার ক্ষমতা নাই ব্রজগোপালের।

পিতার আত্মার মুক্তির জন্য পিণ্ডদান তো দূরের গল্প, দেশ স্বাধীন হবার পূর্বেই শরণার্থী শিবিরে কলেরায় একের পর এক বিধবা মা আর ভাই-বোনেরা মরে সাফ। দেশ স্বাধীন হলে বড় একাকী হয়ে যায় ব্রজগোপাল। শরণার্থীরা একে একে সবাই দেশে ফিরে গেছে। একাকী ব্রজগোপালকে শরণাথী শিবির বন্ধ করতে আসা সরকারি আফিসার আর পুলিশের লোক সীমান্তের দিকে তাড়িয়ে দেয়। সীমান্ত রেখার কাছাকাছি এসে একাকী ব্রজগোপাল থমকে দাঁড়ায়। এতক্ষণ প্রিয়জন হারাবার শোকের যে বোঝা বুকের ভেতর ঘাপটি মেরে ছিল তা তার বাম কাঁধে ভর করে বসে। অপলক দৃষ্টিতে স্বাধীন বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে সে। পায়ের তলায় ভারত ভূমি। হঠাৎ স্বাধীনতার পর্বতপ্রমাণ অতিকায় আতঙ্কতার ডান কাঁধ চেপে বসে। এক কাঁধে প্রিয়জনদের মৃত্যুশোক, অন্য কাঁধে স্বাধীনতার ভয় অনাহার অর্ধাহারে শোকে-দুঃখে কঙ্কাল ধারণ করা যুবক ব্রজগোপাল আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। শরীর ঠকঠক কাঁপছে তার। মৃত্যুশোক আর স্বাধীনতার আতঙ্ক-ভাবে উবু হয়ে মাটিতে পড়ে যায় ব্রজগোপাল। আর্তনাদে ফালাফালা হয় সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা অখণ্ড আসমান।

স্বাধীনতার কাছে ফেরা হয় না ব্রজগোপালের। স্বাধীনতা তার কাছে ভয়ংকর প্রেতাত্মার মতো মনে হয়। চোখ বুজলেই মৃত পিতার প্রেতাত্মা আর যুদ্ধ-স্বাধীনতার প্রেতাত্মাকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। সে ভয় পায়। কেবল তারাই নয়, ক্ষুধা আর আশ্রয়হীনতা তাকে উচ্চানাদে চিৎকার করে ভয় দেখায়। এটাই বিস্ময় যে, একদিন নিশিগত ভোরে ব্রজগোপাল নিজেকে আবিষ্কার করে কলকাতাগামী রেল লাইনের বস্তিতে পরিত্যক্ত এক ঝুপড়িঘরে। জীবন তাকে নিয়ে দাবা খেলে। রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া নোংরা কদাকার এক শরণার্থী যুবতীকে ঘরে তুলে আনে ব্রজগোপাল।

‘তুই কি শরণার্থী?’ নিশ্চয়ই তুই; আচমকাই কথাটা জানতে চায় ব্রজগোপাল।

‘হু, হু, সত্য কইছি, মিথ্যা কওয়ার সাহস কি আছে মায়াবতীর?’

‘তোর নাম বুঝি মায়াবতী?’

‘হ, আরেকটা সত্য হইল, তিন মাস আগে আমার গর্ভপাত হয়েছে, শরীরটা দুর্বল।

‘কে করছিল গয়া-কাশী তীর্থের পুণ্যের কামখান?’

‘চিনি না, নামও জানি না, জাত-ধর্মও না, টাকা তো দিছিল।’

‘তবে যে আমার সঙ্গে আইলি?’

‘সঙ্গে আনলা তাই, ভালো না লাগলে খেদিয়ে দিও, কোনো কষ্ট নাই।’

‘কষ্ট চিনিস মায়াবতী?’

‘আগে চিনতাম, যখন দেশে ছিলাম, শরণার্থী হবার পর আর চিনি না।’

‘সন্তান জন্ম দিতে পারবি মায়াবতী?’

‘তুমি পেটে দিলেই পারমু। আর আছে ভগবান। ঠিক কথানি?’

‘ঠাকুর, দেবতা, ভাগবান, ঈশ্বররে ডরাস না?’

‘না, যারে চোখে দেখি না তার আবার ডর কী?’

‘আমার খুব ডর, আমার বাপ-মা-ভাই-বোন বেবাক নিল ভগবান, না ডরাইয়া করব কী?’

‘চল আমরা ঈশ্বর-ভগবানরে ভুলে যাই, পারবা নি? হায়রে শরণার্থী!’

ব্রজগোপাল চমকে ওঠে। খানিক নিশ্চুপ থাকে। তার মনে হয় মায়াবতী উচিত কথাটাই বলেছে। ভুলতে হবে বেবাক। ঈশ্বর, ভগবান, বাংলাদেশ, জয়বাংলার যুদ্ধ, স্বাধীনতা, শীতলক্ষ্যা পাড়ে পিতাকে গুলি করে খুন, পিতার লাশ বর্ষার স্রোতে নিরুদ্দেশ, এসবই ভুলে যেতে হবে। না হলে মায়াবতী নামের খুলনা, বাগেরহর্টের কালো-কুৎসিত, শরণার্থী দল থেকে হারিয়ে যাওয়া, রাস্তার মাদি কুকুরের মতো পেট থেকে জারজ বাচ্চা ঝাড়া মাগিটাকে নিয়ে বাঁচবে কেমন করে ব্রজগোপাল? সে তো দেবতা গোপাল নয়, বাঙালি রিফিউজি গোপাইল্যা।

আশ্চর্য এই, ব্রজ মরেনি। বেঁচে আছে। মায়াবতী কালো কি কুৎসিত, অতীতে সে পেটে জারজ ভ্রুণ বানিয়ে খুন করেছে, এসব নিয়ে ভাববার সুযোগই পায়নি কোনো দিন। মায়াবতীর পেটে সে দুটো সন্তান জন্ম দিয়েছে। তাও সেই কবেকার কথা। বড়টি মেয়ে। ষোলো বছর বয়সে পা দিয়ে কোন ছেলের হাত ধরে কোথায় পালিয়ে গেছে একদিনের তরেও খোঁজ করেনি। তার বিশ্বাস রেললাইনের বস্তির জীবজন্তুর জীবন থেকে পালিয়ে গিয়েও পিতার কাছে কোনো অন্যায় করেনি মেয়েটা। মেয়ে পালালে পিতার সম্মানহানি ঘটে কি না একবারও ভাবেনি ব্রজ।

একাত্তরে যুদ্ধের ভিতর জয়বাংলা নামের দেশটা থেকে পালিয়ে যে দেশে আশ্রয় নিয়েছে, হয়তো তার কাছে নিজের কিছু পাওনা ছিল। চেষ্টা করেছিল। পায় নি। চেয়েছিল একটি নাগরিকত্বের কার্ড, রেশন কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড। কিন্তু পায়নি। কোনো প্রমাণ পত্রই দাখিল করতে পারেনি। নাগরিকত্বহীন অবস্থায় জীবনটা কাটছে। কিন্তু তার ছেলে? বোকা নয় বাপের মতো। জবর টেটন, চতুর। তাই ছল চাতুরি করে, বয়ান বানিয়ে ভোটার আইডি, রেশনকার্ডসহ সবই বানিয়ে নিয়েছে। যে বয়সে বস্তির ছেলেরা একটা মেয়ে জোগাড় করে সরকারি আইনের তোয়াক্কা না-করে মন্দিরে গিয়ে সামান্য খরচা করে বিয়ে করে বিয়ের নামে মেয়ের কপালে সিঁদুর, হাতে শাঁখা-পলা পরিয়ে বিয়ে করে ফেলে, ব্রজার ছেলে তা করেনি। বাপ যে তার নাম রেখেছে মহারাজ, মহারাজ তরফদার। সত্যি সে নিজের ভেতর রাজা-মাহারাজার স্বপ্ন জাগিয়ে তুলতে চায়। মাহারাজের মনে হয় রাত-দিন কলকাতা শিয়ালদাগামী আপ আর ডাউন ট্রেন যখন বস্তি কাঁপিয়ে স্টেশনের দিকে ছুটতে থাকে, তখন বাবা-মায়ের ডাকার লম্বা সুর ট্রেনের শব্দের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়ে।

মহারাজ বুঝতে পারে তার মতো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষা বঞ্চিত অদক্ষ শ্রমিকের কোনো ভবিষ্যৎ নেই পশ্চিমবঙ্গে। না খেয়ে মরতে হবে। তাই সে আপরাপর শ্রমিকদের মতো পরবাসে পা বাড়ায়। হয়ে যায় পরিযায়ী শ্রমিক। পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে মুম্বাই। পশ্চিবঙ্গে দৈনিক মজুরি যেখানে তিনশত টাকা, মুম্বাইয়ে আটশ থেকে হাজার।

নভি মুম্বাই অর্থাৎ  মুম্বাই বাণিজ্য মহানগরীর নতুন সম্প্রসারিত অংশের পাথর ফেলা আরব সাগর ঘেঁষা তীরে নির্মাণ কোম্পানির অস্থায়ী তাঁবুতে শুয়ে স্বপ্নদেখে একাত্তরের রক্তবাহী বাঙাল যুবক। সমুদ্রের গর্জনে ঘুম আসে না। তীরের পাথরের চাঁইয়ে প্রবল আক্রোশে আছড়ে পড়া ঢেউয়ে পিতার মুখে শোনা বাংলাদেশে যুদ্ধের সময়ে পাকবাহিনীর মর্টার শেলের বিস্ফোরণের শব্দের কল্পনা করে। রাত পোহালে ভাটা পড়া ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে বদলি নিয়ে দৌড়াতে হয়। সমুদ্রের নোলাজলে তো শৌচক্রিয়া করা যায় না। গুহ্যদ্বারে চুলকোনিতে ঘা হয়ে যায়। অসহ্য জ্বলুনি। হায়রে কুষ্টিয়ার বাঙাল পোলা, কোথায় ছিল তোর বাপ, কোথায় বা জন্ম দিল তোরে! পেটের দায়ে এলি বা কোথায়।

পাশেই তাঁবু ফেলেছে নির্মাণ কোম্পানির আদিবাসী যাযাবর শ্রমিকরা। ওরা একা থাকে না। সঙ্গে নেয় বউ-ছেলে-পিলে-আন্ডা-বাচ্চা লটবহর। মাগি-মরদ শ্রম দেয় প্রায় বেগার। রেশন ফ্রি। কোম্পানির দায়। কোম্পানির নির্মাণ সামগ্রীর গাড়িতে ঘুরে বেড়ায় এ রাজ্য থেকে ও রাজ্য। তাঁবুতে জন্মে শিশু, মরেও। বংশ পরম্পরায় কোম্পানির ক্রীতদাস। মহারাজ তা নয়, স্বাধীন ক্রীতদাস। বছর-দু’বছরে ঘরে ফেরার ছুটি মেলে।

স্বপ্ন দেখে মহারাজ। টাকা জমিয়ে দূরে কোথাও বাড়ি করার এক-আধ কাঠা মাটি কিনবে। ঘর করবে। বুড়িয়ে যাওয়া বাবা-মাকে সুখ দেবে। সরকারি রেল লাইনে বাস করার অভিশাপ থেকে মুক্তি দেবে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের আত্মপরিচয়ের ঠিকানা দেবে। হবে তাদের ভোটার কার্ড। রেশন কার্ড। হিন্দুস্তানের নাগরিকত্বের প্রমাণ! মরার আগে অন্তত একবার দাঁড়িয়ে ভোট দেবে। ভোটে জিতিয়ে সংসদ সদস্য, বিধায়ক পঞ্চায়েত বানাবে। মন্ত্রী বানাবে। এ বড় পুন্যির কাজ। মরার পর স্বর্গলাভ! একটা শারণার্থী বাঙালির আর কী চাই?

ওই যে লোকে কয় না রিফিউজি বাঙাল মরার সময় নাকি পবিত্র গঙ্গার জল শেষ নিঃশ্বাসের ভেতরও পায় না। হতেও পারে। দেশহারা রিফিউজিরা কি আর মানুষ! তাড়া খাওয়া জীব-জন্তু! তাই তো করোনা রোগ মুম্বাই শহরে আচমকা হামলে পড়লে মহাবিপদে পড়ে যায় মহারাজ। নির্মাণ কোম্পানি কাজ বন্ধ করে দেয়। দিন কয়েকের মজুরি হাতে। জমানো টাকা আগেই পিতার নামে পাঠিয়ে দিয়েছিল। শহরের এখানে  ওখানে লকডাইন। আতঙ্কিত মানুষ শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। পাশের আদিবাসী শ্রমিক তাঁবুতে হানা দিয়েছে করোনা। একদিনেইে প্রাণ গেছে তিনজনের।

এ বড় খতরনাক রোগ। মানুষ তো ছার, দেবতা-ঈশ্বর-ভগবানকেও ছেড়ে কথা বলে না। তাই তো মন্দির, আখড়া, মণ্ডপের দুয়ার বন্ধ হয়ে গেছে। দেবালয়ে অন্ধকার থই থই করে। মৃত্যুর শীতল নিঃশ্বাস সেই ইস্পাত-কঠিন বিভীষিকাময় কালো অন্ধকারে দেব-দেবীর শরীরে পতিত হলে জমাট বাঁধে ঐশ্বরিক রক্ত। কেউ পাশে না থাকলেও একদিন দেবতারা ছিলেন অন্তিম ভরসায়। আজ কেউ নেই। নগর পলাতক হাজার-লাখো জনস্রোতের দিকে আতঙ্কিত মহারাজ দৌড়াতে থাকে। ওদের পিছু নেয়। এ যেন জীবিত নরলোকে মৃত্যুস্রোত। জনতা বুঝতে পারে না প্রত্যেকের শরীরে নিরাকার হয়ে মৃত্যু লেপটে আছে। ধনীরাজ্য দিল্লি, মুম্বাই, নাশিক, কেরালা-অনন্তপুরম ছেড়ে ছুটছে তারা আপন রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, উড়িশা, আসাম, ঝাড়খণ্ড ও বিহার। গন্তব্য ওদের রেলস্টেশন। মহারাজও ছুটছে মুম্বাইয়ের অতিকায় বহুতল জাতীয় ছত্রপতি শিবাজি গোলকধাঁধায় পড়া রেল স্টেশনে। আতঙ্কিত মন ভুল করে। কত নাম্বার প্লাটফর্মে কত নাম্বার লাইনের ট্রেন কোন রাজ্যে যাচ্ছে, খেই হারিয়ে ফেলে সে। ভিড়ের যাত্রীরা বাংলা ভাষায় চেঁচামেচি করছে যেদিকে, সেদিকেই দৌড়াচ্ছে সে। হাওড়া স্টেশন যাত্রী সে। তিন দিনের যাত্রা। চারদিকে যে কোলাহল, মহারাজের মনে হয় করোনা ভাইরাসরা প্রচণ্ড আট্টহাসি আর কাষ্ঠহাসিতে স্রোতের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। বুকের ভেতর সাহস জাগাতে চায় সে। প্রচণ্ড ভিড়ে শরীরটা কম্পার্টমেন্টে গলিয়ে দিলেই হয়। তারপর যা আছে কপালে।

সারাদেশ একসঙ্গে লকডাউন ঘোষণার পূর্বে এই হচ্ছে মুম্বাই-হাওড়া শেষ ট্রেন। জীবনের কাছে ফেরার, জন্মমাটিতে ফেরার এ যেন অন্তিম যাত্রা। এই ভাবনায় ট্রেনের ভিড়ে আচ্ছন্নতা নামে মহারাজের। সে যখন হাওড়া স্টেশনে নামে তখন শরীরে জ্বর অনুভব করে। খুককুক কাশি ওঠে। ভয় পেয়ে যায় মহারাজ। তার আতঙ্কিত চোখ ছুটে বেড়ায় যাত্রীদের থার্মাল পরীক্ষা বা শরীরের উত্তাপ পরীক্ষার লাইন দেখে। সত্যি কি সে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে? সন্দেহ হলে রেল পুলিশ তাকে ঘরে ফিরতে দেবে না। জোর করে নিয়ে যাবে মুখের লালা রস পরীক্ষা কেন্দ্রে, তারপর হাসপাতালে। হাসপাতাল মানেই মরণ!

হাওড়া স্টেশন থেকে পালাতে চায় মহারাজ। প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী এবং তাদের সহায়ক রাজ্য পুলিশের  করোনা রোগাক্রান্ত পরিযায়ী শ্রমিক সন্ধানীদের চোখে চোখে সে ঘাতকের ছায়া দেখে। শেষটায় পালাতে সক্ষম হয় সে। ক্ষুধা আর দীর্ঘ ট্রেন যাত্রার ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ে তার। তবু সে হাওড়া সেতু পার হয়ে শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক উত্তর এবং দক্ষিণ শহরতলির লোকাল প্যাসেঞ্জার ট্রেনের ওপর হামলে পড়েছে। টিকিটের বালাই নেই। এমনিভাবেই ট্রেনে চিড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে কাঁকুড়গাছি স্টেশনে নেমে পড়ে সে। মাথাটা ভনভন করছে। জ্বর বাড়েছে। ঘন ঘন কাশিতে দম বন্ধ হয়ে যেতে চায়। এখানেও একই বিপদ সামনে দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের দল। পরীক্ষা হচ্ছে যাত্রীদের শরীরের তাপ। উত্তাপ পরীক্ষায় সন্দেহ হচ্ছে যাদের, ওদের তুলে দেওয়া হচ্ছে মাস্ক পরা পুলিশের হাতে।

এবারও পালায় মহারাজ। বস্তিবাড়ির পাশে পাকুড় গাছতলায় এসেই উবু হয়ে পড়ে যায়। পড়শিরা দূরত্ব বজায় রেখে তাকে ঘিরে ধরে। ওরা আতঙ্কিত। কেউ তাকে স্পর্শ করে না। সবাই বুঝতে পারে করোনা রোগ নিয়ে ফিরে এসেছে মহারাজ মুম্বাই থেকে। সংবাদ পেয়ে পিতা ব্রজগোপাল তরফদার দৌড়ে আসে। জনতা তাকে পুত্রের কাছে যেতে বাধা দেয়। মহারাজ হতবুদ্ধি। এমন ঘটনাও যে পৃথিবীতে ঘটতে পারে তা তার জ্ঞানের অতীত। নিজের বস্তি, নিজের ঘর, আপন পড়শি, তবে কি এরা সবই তার দুশমন? কেন এত বৈরী? নিষিদ্ধ জন্মভিটা, নিষিদ্ধ প্রিয় ঘর, নিষিদ্ধ প্রিয় মানুষ? হঠাৎ সে মায়ের আর্তনাদ শুনতে পায়। এবার মহারাজ দিগি¦দিক জ্ঞনশূন্য হয়ে যায়। চিৎকার করে ছুটতে থাকে সে। ‘সাবধান আমাকে ছুঁবি না, করোনা…করোনা।’

করোনার স্পর্শ-ভয়ে ঘেরাও ভেঙে লণ্ডভণ্ড। এক দৌড়ে বাড়ি ঢুকে উঠুনে পড়ে যায় মহারাজ। সঙ্গে করে আনা টাকাগুলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিক। প্রতিটি কাগুজে মুদ্রায় খিল খিল হাসতে থাকে প্রাণসংহারী কোটি কোটি করোনা ভাইরাস।

গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মীরা বাড়ি এসে মহারাজের মুখ এবং নাসারন্ধ্র থেকে লালা রস নিয়ে যায়। দু’দিন পর জানিয়ে যায় মহারাজ পজিটিভ। এই সংবাদই তার প্রথম মৃত্যু। মৃত্যুর সঙ্গে কথা হয় মহারাজের। ফিসফিস। কানে কানে। পাশে বসার কেউ নেই বলে তা শুনতেও পায় না। মহারাজ গৃহবন্দি। পিতা মাতাও আপন মৃত্যু ভয়ে থরথর কম্পমান। পৃথিবীকে নতুন মনে হয় তার। যেন এটাই গল্পলোকের আর কল্পলোকের পরকাল। অন্য দুনিয়া। এখানেই ঈশ্বরের নিবাস, দেবদেবীর দেশ। কিন্তু ওরা অদৃশ্য। কখনও দুনিয়ার জন্য ভীষণ মায়া জাগে তার। কখনও বা বিদ্বেষ-ঘেন্না।

যে দিন বেলা ডুবে যাওয়া লগ্নে মহারাজকে পুলিশ এসে অ্যাম্বুলেসে তুলে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়, সেদিনই বস্তিতে প্রবেশ আর বহির্গমন নিষিদ্ধ হয়ে যায়। পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন, মানব সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় একটি বস্তি। মানুষ বস্তিখানিকে পরিত্যাগ করেছে, ভগবানও। রাত গভীর হলে দূর গ্রাম থেকে আচমকা ভেসে আসে হরিনাম কীর্তন। আচমকাই আবার সব স্তব্ধ হয়ে যায়। দূরে শেয়াল ডাকে। চাঁদের আলো পড়ে মাঠে। জোনাক ভেজা মাঠ থেকে, হয়তো তেপান্তর থেকে প্রেতাত্মার কান্না শোনা যায়।

রোগমুক্তির পর ছেলে ফিরে আসবে বলে গ্রামীণ বিদ্যুতের আবছা আলোয় মাটির মেঝেতে মা মায়াবতী নখের আঁচড়ে দেব-দেবীর ছবি আঁকে। পিতা ব্রজ চোখ বুজে বিড়ি টানে। বস্তির করোনা আক্রান্ত আরও দুটো ঘর থেকে যে তিনজনকে জেলা সদর হাসপাতালে না নিয়ে অজানা কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের কথা ভাবে ব্রজ, কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের? কোন ঠিকানায়?

সপ্তম দিবস ঘনায়মান সন্ধ্যায় ব্রজর কাছে সংবাদ আসে তার পরিযায়ী শ্রমিক সন্তান মহারাজ আর ইহ জগতে নেই। পরদুনিয়ায় চলে গেছে। রাতভর ব্রজ আর মায়াবতী বিলাপ তুলে কাঁদল। জ্ঞান হারাল। জ্ঞান ফিরে পেয়ে পুনরায় কাঁদল। করোনা আতঙ্কে বস্তিবাসী কেউ এলো না। এত বড় নিষ্ঠুর দুনিয়ার কথা মাত্র একবারই মনে পড়েছিল ব্রজর। রাত পোহালে পড়শি কারও কথা শুনল না ওরা। মৃত সন্তানের লাশ যে ফিরে পাবে না তা জেনেও একপলক দেখতে দু’জন জেলা সদর হাসপাতালে ছুটে যায়। কিন্তু সেখানে মহারাজের লাশ পাওয়া গেল না। মর্গেও সে লাশ নেই। হাসপাতাল থেকে বলা হলো লাশ দাহ করার অপেক্ষায় সরকারি শ্মশানের লাশঘরে জমা হয়েছে। অসংখ্য লাশ দাহ হতে দু’দিনও লাগতে পারে।

শ্মশানভূমি। করোনায় মৃত লাশের স্তূপ। লাশ দেখার অধিকার কারও নেই। পুত্রহারা পিতা-মাতা আর্তচিৎকারে আসমান ফালা ফালা করতে পারে, কিন্তু এক নজর লাশ দেখার অধিকার নেই। ঈশ্বরের নয়, এ যে মানুষের বিধান। কিন্তু আদৌ পুত্রের লাশ শ্মশানে এসেছে কি না তা জানার আকুল প্রার্থনা করে ব্রজ। শ্মশান আধিকারিকের হৃদয় গলে। তার নির্দেশে শ্মশান ডোমরা লাশঘরে তন্ন তন্ন করে তালাশ করেও মহারাজ নামে কোনো লাশের সন্ধান পেল না। এমনকি লাশ জমা পড়ার খাতায়ও এ নামের কোনো লাশের হদিশ মিলল না।

 বেলা শেষের দিকে পুলিশের তাড়া খেয়ে ব্রজ আর মায়াবতী জেলা শহর ছেড়ে দূরবস্তির পথে নামে। দূর, বহুদূর। লকডাউন। যানবাহন নেই। হেঁটে চলেছে দু’জন মানুষ। তাদের সারা শরীরে মৃত পুত্রের লাশের ঘ্রাণ। রাত নেমে গেছে। আকাশভরা জোনাক। হঠাৎ ওরা দেখতে পায় তাদের সামনে হাঁটছে দুটো মানুষ। শ্বেতবর্ণ পোশাক। ওরা তাদের চিনতে পারে। সামনের জন একাত্তরের যুদ্ধের লাশ। পেছনের জন ২০২০ সালের করোনার লাশ। জীবন্ত লাশ। যুদ্ধ আর ব্যাধির প্রথম এবং শেষ লাশ। প্রাণময় মৃতদেহ। পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া লাশ।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares