করোনার জলছবি : সেলিনা হোসেন

যেদিন করোনা মহামারির কারণে বাড়িতে বন্দি হতে হলো সেদিন থেকে বিশাখার মনে হয় ওর দৃষ্টিশক্তিতে মহামারির নতুন আভা লেগেছে। তা মৃত্যুর অন্ধকার নয়। চারদিকে তাকালে ওর মনে হয় প্রকৃতির নতুন বার্তা পাচ্ছে ও। সাহসী হয়ে ওঠার মাত্রা ছড়িয়ে আছে চারদিকে। অদৃশ্য কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। বলছে, নতুন সময় দেখ। এ সময় তোমার জীবনে আগে আসেনি। সময়ের অনুভবে তোমার চেতনা বাড়াও। বলো, ‘নির্মল করো, সুন্দর করো মলিন মর্ম ঘুচায়ে।’ বিশাখা বুঝতে পারে প্রকৃতির সবুজ আভা ওর দৃষ্টিশক্তিতে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। নিজের সঙ্গে হাসতে হাসতে নিজেকে বলে, তোকে আমি চ্যালেঞ্জ করছি করোনা। তুই আমার জীবনে কবিতার শিল্প। তোকে আমি পায়ের নিচে দাবড়াবোনা। করোনা তুই আমার বন্ধু।

বিশাখার চোখের সামনে নতুন হয়ে গেছে পুরো বাড়ি। পাঁচটা ঘর পাঁচরকম রঙে উদ্ভাসিত। রান্নাঘরটি লাল-হলুদ-সবুজ রঙে আঁকা ছবির মতো দেখায়। চুলোর আগুনের শিখা আগুন নয়, যেন রঙের বিচ্ছুরিত বিন্যাস। ছড়িয়ে যাচ্ছে হৃদয়ের সবটুকু অঙ্গনে। মোহমুগ্ধকর নির্যাসে স্নিগ্ধ হয়ে যায় করোনার জলছবি।

ও বাথরুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। নতুনরূপে বিন্যস্ত বাথরুম পানির উৎস। কল খুলে দিলে গরগরিয়ে ঝরে। ঝর্ণাধারা যেন। পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া স্রোত। অপরূপ দৃশ্য নিয়ে হাজির হয় বিশাখার সামনে। বলে, দেখ পাহাড়ের সবুজের বুকে আমার ভালোবাসা। ভালোবাসার উৎস এমন। এই উৎস থেকে নিজেকে বঞ্চিত কোরো না। ভালোবাসার স্রোতকে নির্ঝর হতে দিও জীবনের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত। ভয় পেয়োনা করোনা মহামারিকে। কান পেতে শোন সেই স্রোতের মধ্যে সঙ্গীতের ধ্বনি আছে। বুকে নিয়ে রাখ এই ধ্বনির রেশ।

বিশাখা বারান্দায় আসে। বারান্দা এক বিপুল আকাশ। পূর্ণিমা-অমাবস্যাসহ নীলিমার দ্যুতি ছড়ায়। বিশাখা দুচোখ ভরে আকাশ দেখে। বলে, তুমি আমার কবিতা। বেঁচে থাকার সাধ পূর্ণ করে দাও আমাকে। তুমি করোনা মহামারিকে তোমার ঠিকানায় নিয়ে যাও আকাশ। শূন্যে উড়িয়ে দিয়ে তাড়িয়ে দাও ওকে।

শোবার ঘর আর ড্রইংরুমে বসে থাকলে ওর মনে হয় উৎসবের মুখর আনন্দ ওর চারপাশে ধ্বনিত হচ্ছে। বেজে যাচ্ছে খোল-করতাল-ঢোলÑ ভেসে আসছে মানুষের কণ্ঠ থেকে গানের ধ্বনি। দেশজুড়ে মহামারিকে ঘায়েল করে দিচ্ছে সঙ্গীতপ্রবাহ। বিশাখা দুহাতে তালি বাজায়। ওর মা আনজুম খাতুন এসে ওর পাশে দাঁড়ায়। ও মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, মাগো তুমি এমন মন খারাপ করে থাক কেন?

ভয় লাগে রে। দেখিস না কত মানুষ মরে গেছে। এই অসুখের কোনো চিকিৎসা নাই।

বিশাখা উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে আবার তালি বাজায়। শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ওর বাবা। ধমক দিয়ে মেয়েকে বলে, কি হয়েছে তোর?

বাবা আমার মাথায় কবিতার লাইন ঝিলিক দিচ্ছে।

খবরদার, কবিতার কথা বলবি না। আমি যেন তোকে আর কবিতা লিখতে না দেখি। কবিতা লিখে মাথা বিগড়েছিস।

না, বাবা, না। তুমি কেন এভাবে বলছ আমাকে?

চোপ! ক্রুদ্ধ স্বরে হাত উঁচিয়ে মেয়েকে শাসন করে মোতাহার।

বিশাখার মনে হয় আর কথা বললে বাবা হয়তো ওকে থাপ্পড় দেবে। সেজন্য মুখে হাসি ছড়িয়ে রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। 

ওর মা ভুরু কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে ওর দিকে তাকায়।

এত হাসির কি হলো? তোর হাসি শুনে আমার মেজাজ গরম হয়ে গেছে। আমার মাথাও এলোমেলো লাগছে।

মায়ের ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর শুনে ওর মনে হয় এটা করোনার ডান্ডাবাড়ি। মা কখনও ওর সঙ্গে এভাবে কথা বলে না। মায়ের কথায় সবসময় আদরের ভাব থাকে। আজকে ও মায়ের অন্য মূর্তি দেখতে পায়। তারপরও ওর মুখ থেকে হাসি ফুরিয়ে যায় না। আনজুম খাতুন চিৎকার করে বলে, কথা বলছিস না যে?

ও হাসতে হাসতে বলে, মহামারির সময় মৃত্যু আমার কাছে উৎসব।

কি বললি? উৎসব?

ওর বাবা-মা দুজনে একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে। মুহূর্তে থমকে যায় বিশাখা। বাবার দিকে তাকায় না। ভয় পায়। মোতাহার কর্কশ কণ্ঠে বলে, তুই এত উচ্ছন্নে গেছিস যে আমি ভাবতে পারি না। খবরদার আর এ রকম কথা যেন না শুনি।

বাবা, মহামারির সময় মৃত্যুতো উৎসবই। একসঙ্গে এত মৃত্যু মানে মৃত্যুর বৈশাখী মেলা।

মেয়ের কথা শুনে মোতাহার থ হয়ে যায়। কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। মেয়ের কাছ থেকে কিছু শোনার চেষ্টা করে না। নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবে, মেয়েটার মাথায় হয়তো অন্যকিছু চিন্তা আছে। ও কনোরার কাছে হার মানতে চায় না। বিড়বিড়িয়ে বলে, আমার বিশাখা-বিশাখারে−। তোকে বুকে জড়িয়ে আমি বাবা হওয়ার আনন্দ পেয়েছিলাম। আমার ভেতরে আনন্দের সৌরভ ছড়িয়ে দিয়েছিলি তুই। আমি জানি করোনা মহামারি তোকে হারাবে না মা রে। 

আনজুম খাতুন স্বামীর চলে যাওয়া দেখে মেয়েকে কড়া গলায় বলে, তুই কি পাগল হয়ে গেলি? এসব কি বলছিস? অন্য ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তিন ভাইবোন একসঙ্গে বলে, হ্যাঁ পাগল। পাগল হয়ে গেছে। আমাদের পাগলি আপু। আপুর কথা শুনে আমরাও পাগল হয়ে যাব।

বিশাখা চেঁচিয়ে বলে, এই তোরা থাম। আমি পাগল হইনি। করোনাকে চ্যালেঞ্জ করছি। করোনার সঙ্গে খেলব। করোনার ভাইরাস আমাদেরকে মেরে ফেলবে। আর আমরা করোনাকে ছেড়ে দেব নাকি?

কীভাবে খেলবি?  পাগলের মতো আবোলতাবোল কথা বলছিস।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাগো। করোনা ভাইরাসের সঙ্গে খেলা মানে স্বাস্থ্যবিধি মানা। তুমিও তো কত সুন্দরভাবে ঘরে স্বাস্থ্যবিধি মান। সুস্থ থাকার জন্য মানতে তো হবেই। আমি যে এনজিওতে কাজ করি তাদের প্রোগ্রাম চলে বেড়িবাঁধের ওপরে বাস করা মানুষদের নিয়ে। কাল ওখানে যাব।

এখন ওইসব জায়গায় যাবি না। স্বাস্থ্যবিধি মানবি আবার মানুষজনের কাছে যাবি তা হবে না। দুই কাজ একসঙ্গে করতে পারবি না। 

আমাকে যেতেই হবে মাগো। ওদের কাজ বন্ধ। ওদের পেটে ভাত নাই। ওদের সঙ্গে খেলা আরও মজার।

মজার কি বলিস তুই? তোর হয়েছেটা কি? তুই আমার মাথা খারাপ করে দিবি দেখছি। 

মাগো, নতুন সময়ের ব্যাখ্যা নতুন হওয়া দরকার। আমি করোনা জীবাণুুর কাছে হারব না। মানুষের কাছে গিয়ে বলব, মনে শক্তি রাখ। করোনা ভাইরাসের দিন ফুরিয়ে যাবে। ওরা বেশি দিন টিকে থাকতে পারবে না। বেঁচে থাকব আমরা। মানুষকে শেষ করতে পারবে না মহামারি।

তিন ভাইবোন তালি দিতে দিতে বলে, জয় করোনা জয়। পাগলি বুবুর জয়।

বিশাখা সবাইকে জড়িয়ে ধরে। আদর করে। মায়ের পায়ে সালাম করে।

ভাইবোনদের নিয়ে ড্রইংরুমে বসে। বলে, আয় আমরা গল্প করি। মা তো রান্নাঘরে গেলেন।

গল্প, গল্প − তিনজনে চেঁচিয়ে বলে। হাততালি দেয়। ওদের মনে হয় বিশাখা আপু আজ ওদের সামনে নতুন আপু। আপুকে এভাবে তো কোনোদিন দেখা হয়নি। 

থাম, থামরে। তোদের হাততালি শুনলে বাবা রাগ করবে।

 তুমি তো বাবাকে রাগিয়ে দিয়েছ আপু। বাবার সামনে এমন কথা আর বলবে না। বাবা রাগ করলে আমাদেরও মন খারাপ হয়। আমাদের সঙ্গে রাগারাগি করলে বাবারও মন খারাপ হয়। আমরা চাই না বাবা রাগ করুক।

তোরাও আমাকে শাসন করছিস।

না, না শাসন না। এ কথা আমাদের ভালোবাসা।

আমরা তোমাকে খুব ভালোবাসি আপু। তোমার দিকে তাকালে আমাদের পরান জুড়িয়ে যায়। 

বাব্বা, তুই তো বেশ পেকে উঠেছিস দীপু। সুন্দর করে কথা বলতে শিখেছিস। 

কীভাবে পেকেছি? আম না কাঁঠাল হয়ে?

নিশা আর টিপু হাসিতে ভেসে ওঠে। হাততালি বাজায়।

সাবাস দীপু, সাবাস। তুই আমাদের মনের কথাও বলেছিস।

বিশাখা তিন ভাইবোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে, দেখতে পাচ্ছি আমার সামনে একটি সুন্দর দিন এসেছে। তোরা আমার সামনে আনন্দের নূপুর বাজালি।

আপুর কবিতা− আপুর কবিতা।

তিন ভাইবোন আবার তালি বাজায়। ওদের সঙ্গে বিশাখাও তালি বাজিয়ে হাসতে থাকে। জমে ওঠে ঘরের ভেতর। দরজায় এসে দাঁড়ায় মোতাহার। দরজায় দাঁড়িয়ে সেও তালি দেয়। হাসতে হাসতে বলে, মহামারির ভয় কাটালাম তোদের দিকে তাকিয়ে।

বাবা ঘরে আস। তোমার গল্প শুনব।

নিশা সোফা থেকে লাফ দিয়ে উঠে বাবার কাছে যায়। হাত ধরে টেনে এনে সোফায় বসায়। বিশাখা বাবার পায়ের কাছে বসে পড়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরে কোলে মাথা রাখে। কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, বাবা তুমি আমার কথায় দুঃখ পেয়ো না।

না রে মা, দুঃখ পাইনি। তোর কথা আমার চেতনার বাগানে ফুল ফুটিয়েছে। রাগ করেছি তোকে সামলানোর জন্য। আর কারও সামনে এসব কথা বলবি না।

না বাবা, বাইরে বলব না।

ঠিক বলেছিস। কেউ এমন কথা শুনতে চাইবে না। মারতে উঠতে পারে তোকে।

বাবা, বাবা গো−

বিশাখা পিতার স্নেহে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। বাবার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বলে, তোমাকে একটি ঘটনার কথা বলব বাবা। তুমি তো জানো আমি যে এনজিও-তে কাজ করি তারা দুস্থ মানুষের মাঝে কাজ করে।

হ্যাঁ, জানি তো।

কোভিড-নাইনটিন সূচনার দশ-বার দিন পরে অফিস থেকে আমাকে একদিন পাঠানো হয়েছিল ওদেরকে মাস্ক দেওয়ার জন্য। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথাও ওদের বোঝাতে বলেছিল। আমি তো বেড়িবাঁধে বাস করা সবার জন্য মাস্ক নিয়ে গেলাম। বাচ্চারা মাস্ক পেয়ে খুশিতে লাফালাফি করল। মাস্ক বেঁধে রাখল, কিছুক্ষণ পর দুহাত মাথার ওপর ঘোরাতে লাগল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এটা আমাদের খেলা। আমিও ওদের সঙ্গে মজা করলাম। তারপর বোঝালাম কেন মাস্ক পরতে হবে এইসব। এমন সময় একজন বয়সি মানুষ জলিল মিয়া আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল, মাগো তোমার কথা শুনলাম। তোমরা আমাদের জন্য ভাবো এজন্য দোয়া করি। আজকে মাস্ক পেয়ে পরলাম। এতদিন আমরা করোনাকে জড়ো করে পান্তাভাত দিয়ে খেয়ে ফেলেছি। আমাদের কাছে করোনা আসতে পারেনি। আমরা কেউ মরে যাইনি।

হা-হা করে হেসে উঠেছিল আশপাশে সবাই। আমি হেসেছিলাম। তারপর বলেছিলাম, সাবধান থাকতে হবে চাচা। করোনাকে অবহেলা করবেন না।

অন্যরা চেঁচিয়ে বলেছিল, জানি, জানি। একটা শয়তান অসুখ। মানুষের গলা টিপে ধরে। মেরে শেষ করে ফেলে।

জলিল মিয়া আবারও চিৎকার করে বলেছিল, আমরা করোনাকে পান্তাভাতে গিলে খাই। ওইটা আমাদের মারতে পারবে না। আমরা ওইটাকে মারব।

তার সাহসী কথা শুনে আমি হাঁ করে তাকিয়েছিলাম। আমাদের সাহসী মানুষেরা আমাদের অনুপ্রেরণা।

মাগো, এখনই এই কথা বলার সময় আসেনি যে পান্তাভাতে গিলে খাই।

আমি জানি বাবা। বিশ^জুড়ে মানুষের এখনও চিকিৎসার জন্য অনেক পথ হেঁটে যেতে হবে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাহসী থাকা উচিত।

হ্যাঁ, মানসিক শক্তি বেঁচে থাকার বড় দিক।

এ কথা শুনে নিশা, দীপু, নীপু তালি দিতে দিতে বলে, পান্তাভাত, পান্তাভাত− আমরা খাই পান্তাভাত। সঙ্গে খাই করোনার বীজ ভাজা।

ছেলেমেয়েদের আনন্দ দেখে মোতাহার নিজেও তালি বাজায়। মাথা দোলায়। নিজেকে মনে মনে বলে, করোনার সময় এক অন্যরকম সময় পেয়েছি।

তালি দিতে দিতে উঠে দাঁড়ায় মোতাহার। তাঁর মুখভরা হাসি দেখে প্রাণ জুড়িয়ে যায় বিশাখার। নিজেকে বলে, বাবার হাসিমুখ, আমার করোনা জয়। এভাবে সবার কাজ থেকে করোনাকে জয় করা দেখে আমি নিজেকে বলব, কোভিড তুই মৃত্যুর উৎসব বানিয়ে পার পাবি না। তোকে ঘায়েল করার অস্ত্র বানাবে মানুষ। তুই ক্ষুদ্র জীবাণু কতটুকুই বা আর পারবি?

কি ভাবছিস রে মা?

বাবা, তোমার হাতের তালি আর হাসিমুখে আমি করোনা জয় দেখছি।

ঠিক আছে মা, তোরা নিজেদের ঘরে যা। পড়ালেখা কর।

তিন ভাইবোন বাবার কথা শুনে নিজেদের ঘরে চলে যায়। বিশাখা ঘরে এসে আলমারি খুলে নিজের জমানো টাকা বের করে গুনতে বসে। হাজার দশেক টাকা থাকলে বিকেলে বেড়িবাঁধের ওপর বাস করা মানুষগুলোর কাছে যাবে। ওদেরকে ওর পছন্দ হয়। ওকে ওরাও পছন্দ করে। টাকা গুণে যখন দেখল তেরো হাজার টাকা আছে তখন ভীষণ খুশি হয়ে গেল। টাকা নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে রেখে বাথরুমে ঢুকে সাওয়ার ছাড়ল। ঝর্ণাধারার মতো জল গড়াল শরীরজুড়ে। বেশ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গুনগুন করে গান গাইল। ভেজা চুল দুহাতে ছড়াতে ছড়াতে বলল, আকাশের নীলিমায় ভেসে যাই। খুঁজে ফিরি ভালোবাসার ছোঁয়া। পাই না তোমাকে, বন্ধু হাত বাড়াও।

এক সময় জলের ঝর্নাধারা বন্ধ করে তোয়ালে নিয়ে মুছে ফেলে গড়ানো স্রোত। নিজের সঙ্গে দিনযাপন অনেক কঠিন। ভালোবাসার মানুষ পাওয়া হলো না এখনও। দেখা হলে যাকে বলব, ভালোবাসার ছন্দে-বর্ণে ঝরুক প্রাণের সুর−

নিজেকে কবিতার লাইন শুনিয়ে শব্দ করে হাসে বিশাখা। দিশা দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলে, তোমার কি হয়েছে আপু? এত হাসছ কেন?

প্রেমে পড়েছি রে।

বাথরুমে বসে প্রেমে পড়া যায়? তুমি আসলেই আমাদের পাগলি আপু। করোনার সময় তোমাকে পাগল করে দিয়েছে।

ঠিক বলেছিস দিশা।

বের হও, আমি তোমাকে দেখব।

চলে যা, পাগলি আপুকে দেখতে হবে না।

আমি যাব না। তোমার জন্য বসে থাকলাম।

কিছুক্ষণ পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দিশাকে হাত ধরে টেনে তোলে বিশাখা।

ময়ের কাছে যা। ভাত খাব আমরা।

আমাদের দুলাভাই কবে আসবে?

জানিনা। এত কথা বলবি না।

বিশাখা ওকে টেনে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। নিজে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে। বিকেলের দিকে বেড়িবাঁধে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। ব্যাগের বেশ ভেতরে টাকাগুলো গুছিয়ে রাখে। ওদেরকে টাকা দেবে এই কথা বাবা-মাকে বলবে না। কিছু সিদ্ধান্ত ওর নিজের হওয়া দরকার। নিজেকে ঢালাওভাবে প্রকাশ করা যুক্তিহীন কাজ। ও এভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। বোঝা না বোঝার ডামাডোলে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া উচিত না। বিশাখা ব্যাগ গুছিয়ে আলমারিতে রেখে খাবার টেবিলে আসে। বাবা-মা দুজনেই খেতে বসেছে। ও নিঃশব্দে খেয়ে উঠে পড়ে। কারও সঙ্গে তেমন কোনো কথা হয় না। এক সময় মোতাহার জিজ্ঞেস করে, তুই যেখানে কাজ করছিস ওইসব লোকেরা ভালো আছে তো?

ওদের তো কাজ নেই বাবা। খেয়ে না খেয়ে থাকতে হচ্ছে।

তা ঠিক। এটা আর এক ধরনের যন্ত্রণা।

মোতাহার বিড়বিড়িয়ে বলে, করোনাকাল, হায় করোনাকাল। কতভাবে যে মানুষকে মারছে।

বিশাখা বাবার দিকে তাকায় না। রান্নাঘরে ঢুকে বেসিনে হাত ধুয়ে নেয়। 

বিকালে বেড়িবাঁধের ওপরে যায়। ওখানে বাস করা সবাই ছেলেমেয়েদের নিয়ে বসে আছে। বেড়িবাঁধের নিচ দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর স্রোত বয়ে যাচ্ছে। শান্ত স্থির জল। কোনো কলকল ধ্বনি নেই। সবার মুখে মাস্ক বাঁধা। ওকে দেখে সবাই উঠে দাঁড়ায়। ও কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে বলে, আপনারা সবাই ভালো আছেন?

ভালো থাকার কি উপায় আছে? কাজ নাই, পেটে ভাত নাই।

 আমি আপনাদের ভাত খাওয়াতে এসেছি।

ভাত খাওয়াবেন? ওহ আল্লাহ, আমাদের কত ভাগ্য।

আপনারা সবাই লাইন করে দাঁড়ান।

লোকেরা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। ও প্রত্যেকের হাতে টাকা দিয়ে বলে, ভাত খেতে হবে। আলু ভর্তা আর ডিম দিয়ে।

হ্যাঁ, হ্যাঁ আমাদের ভাত খেতে হবে।

 তালি বাজাও সবাই। বল, আমরা খাব ভাত। পেট ভরানো, মন ভরানো ভাত।

সবাই তালি বাজিয়ে ওর শেখানো কথা বলে। বেড়িবাঁধের ছোট এলাকা মুখর করে তোলে। ওদের হাসিমুখ মাথায় নিয়ে ফিরে আসে বিশাখা। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তালি বাজায়। রাস্তায় লোক চলাচল কম। চারদিকে তাকিয়ে ভাবে, এটা এখন শহরের ছবি না। শহরের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে হবে। নিজে নিজে বলে, আমার কবিতার শিল্প মানুষের ভাত খাওয়া।

আমরা করব জয় জীবনযুদ্ধ।

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares