কালা কান্দুর ভোর : বুলবুল চৌধুরী

রাত আন্ধাইর। আকাশের বুকে ভর নিয়েছে ঢের ঢের কালো মেঘ। হঠাৎ হঠাৎ যেমন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, মেঘেরও চলছে তেমন গর্জন। বইছে কে জানে কোথাকার না কোথাকার বৃষ্টি পেরিয়ে আসা বাতাস। তারই শীতল পরশ পেয়ে অন্যান্য দিনের তুলনায় মানুষজন তলিয়েছে অধিকতর গভীর ঘুমে। তাও বড়ই আলতো পদক্ষেপে লোকালয় ডিঙিয়ে কালা কান্দু এবং জয়নাল উঠে এলো হরেক আগাছা আর গাছগাছালিতে ছাওয়া ইশানের টেকে। লোকালয় ছাড়িয়ে ইশানের টেকে উঠে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তারা! এবারে সুযোগ বুঝে জয়নাল ডেকে উঠল, ওই কাকা।

কি রে বাহে?

দেখছনি আসমানডার ফাই চাইয়া মেঘে কেমুন লডঘড লাগাইছে?

এইতে তর কি রে, তর কি?

এইডা কি কয় কাকায়? একখান ঢল নাইমা আইলে ভিজ্জা যাওনের ঠেলায় চলতে গিয়া কি দিশ না হারামু?

দুর বেক্কল।

ক্যান, হেমুনের কি কইলাম যে তুমি আমারে বেক্কল ঠাওরাইলা?

আরে, এমুনের রাইত থাকলেই গিরস্থে ঘুমে ডুব খায়। ওইতে চুরির তুকতাক আওয়াজ তাগো কানে যাওনের না।

সেই কথায় জয়নাল চুপটি মেরে গিয়ে টর্চের আলো ফেলে এগুতে থাকা ওস্তাদের পিছু ধরে চলে। তার ডান কাঁধে রাখা সিঁদকাঠির কী আর অমন ভার! তাও কেন জানি এটা বয়ে চলার সময়গুলোতে অস্বস্তি তাকে কাঁটাখোঁচা করে। তার সঙ্গে চলাফেরা দিয়ে সে জেনেছে এই মানুষটা তার বাবার পেছন পেছন চুরির কাজে যখন বেরুত তখন সিঁদকাঠিখানা ছেলের কাঁধে থাকত। বর্তমানে সেই দায়িত্ব পালন করে জয়নাল। এ নিয়ে ওস্তাদের সঙ্গে সিঁদকাটায় তার ষষ্ঠবারের যাত্রা। মাঝেমধ্যে মনে হয়, এই সঙ্গ দিয়ে ভবিষ্যতে সেও পাক্কা সিঁদেল হয়ে উঠবে। এক্ষনে অমন ভাবনার দোলাচলে জয়নাল সিগারেডের তৃষ্ণা অনুভব করতেই ডেকে উঠল, ওই কাকা।

হুনতাছি।

একখান সিগারেড পাইলে যেমুন গলা হুগানিটা থামাইতাম পারি।

সেই আবদার কানে যেতেই কালা কান্দু দাঁড়ায়। তারপর বলে, হঁ, আমিও ভাবতাছিলাম সিগারেড জ্বালাইয়া কয়ডা সুখটান মাইরা কামে আগ্গাই। হইলো, তুইও যখনে কইলি তখনে জ্বালাই সিগারেড।

আলো নিভিয়ে টর্চখানা বোগলের নিচে চেপে ধরে কালা কান্দু লুঙ্গির কোঁচর থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে এক শলাকা নিল নিজের ঠোঁটে আর এক শলাকা দিল সাগরেদকে। চারদিকের নিবিড় অন্ধকারে ইশান টেকের গাছগাছালি এবং আগাছা আলাদা করতে পারার নয়। সেগুলোর ঘন ডালপালা আর পাতা ভেদ করে ঊর্ধ্বের আকাশ নজর করা দায়। তারই মাঝে ম্যাচের কাঠি ঠুকে আগুন জ্বালবার সময়ে সেই আলোয় কালা কান্দুর মুখখানা কয়েক পলক দেখে নেয় জয়নাল। তারপর সে ভাবে, ওস্তাদের খুবই খাটো প্রকৃতির গড়ন। সবল স্বাস্থ্য। দেহের বরন ঘোর কালো হওয়ায় অন্ধকার থেকে তাকে আলাদা করা যায় না। অমন রং পাওয়ায় মা আদর করেই নাকি ছেলেকে ডেকেছিল কালা নামে। পরে বাপ দিল কান্দু নাম। আর বড় হওয়ার পর কালা কান্দু পরিচয় হলো তার।

অন্যদিকে জয়নাল হচ্ছে সিঁদকাটিয়ের একমাত্র সাগরেদ। যুবক সে। দিনের বেলায় ঘুরে-ফিরে জবাই দেওয়া গরু-ছাগলের চামড়া কেনা পেশা তার। পরে সেগুলো একটু বেশি দামে বেচে দেয় শীতলক্ষ্যা নদের পাড়ের বুড়ো বসন্ত মুচির কাছে। বাড়ি থেকে পালিয়ে যাত্রাদলেও নাম লিখিয়েছিল সে। তবে অভিনয় করার সুযোগ পেলেও অবসরে বাঁশুরিয়া সুখেন দাসের ছোঁয়া পেয়ে বাঁশি বাজানোর কলাকৌশল শিখে নিয়েছিল সে। এক রাতে সেই যুবকের বাঁশির সুরে বিভোর হয় কালা কান্দু। ওই ঘটনায় তাকে কাছে ডাকে সে। পরে তো সিঁদকাটায় নাম লেখাল ওই যুবক। আলাপে আলাপে জানা হয়েছে, একটা মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে সাগরেদ। আসলে প্রেমিকাকে পাওয়ার আকুতিতে সে গভীর রাতে বাঁশিতে সুর ওঠায়। তা স্মরণে আসতেই কালা কান্দু ডাকে, বাহে রে।

কও কাকা।

তরে আমি আপনা ভাতিজাই জানি।

হাছাই কাকা।

হের লাগিই একখানা কথা জিগাই।

জিগাও, যা জিগানের জিগাইয়া ফালাও।

ওই, মাইয়াডারে কী তুই হাছা হাছাই বিয়া করবি, না খালি বাঁশিতে ফুঁয়াইয়াই ওরে মারতাছস?

দুর কাকা!

ক্যান?

কিন্তু সেই জিজ্ঞাসায় কোনো উত্তর দেওয়ার আগে জয়নাল  কিসে যেন হোঁচট খেয়ে ব্যথা পাওয়ায় কঁকিয়ে ওঠে, মা¹ো!

কী হইছে রে?

টর্চ জ্বালাইয়া হুমুখ দেখন গেলেও পায়ের তলার আন্ধাইর কী সরান যায়! আহ্, হেইতে উষ্ঠা খাইয়া পায়ের বুইড়া আঙুলে কী যে দুখ পাইলাম।

আমি কই কী, আন্ধাইরে বাদুড়ের লাহান চক্ষু না হইলে তুই কেমুন সিঁধ্ধাল হইলি রে বাহে?

জয়নাল সেই আহ্বানে উদ্বেলিত হওয়ার বদলে রুখু স্বরে জবাব ফেরায়, তুমি এমুন উষ্ঠা খাইলে বুঝতা কেমুনতরো বিষ!

শোন, বাবার পিছে পিছে খন্তা কান্ধে যখনে আমি চুরির কামে যাইতাম তখনে হেয় কী কইত জানস?

কী?

কইত, বাপজান, আন্ধাইরে খালি চক্ষু না, অনুমান দিয়াও চিনন লাগে জগৎ। আয়, আয়, আমার পিছ ধইরা আনা রাওয়ে খালি আ¹া।

চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ার ভয় জয়নালের আছে। সেই ভাবনা তাকে প্রতিবারের যাত্রাতেই অবশ্য পেয়ে বসে। লোভের বশেই সে সিঁদ কাটায় জড়িয়ে যায়। আসলে টাকা চাই। অনেক চেষ্টা দিয়ে বোবা ছোট বোন টিয়ালীর জন্য পাত্র জোটানো গেছে। এই মাসের শেষ সপ্তাহে তার বিয়ের তারিখ পড়েছে। আবার এও কইতে হয়, গত দফায় ওস্তাদের কাছ থেকে সে ভাগে পেয়েছিল সোনার এক জোড়া দুল আর নগদ সাতশো টাকা। আগের চার দফায়ও ভাগে মিলেছে বেশ কিছু সোনা-দানা আর টাকা। এবারে সিঁদকাটার কামে সফল হলে ভাগ্যে আরও কিছু পাওনা হতে পারে। তাহলে সব মিলিয়ে এই বিয়ের আয়োজন বড় করতেই রাজি ভাই। ভাবনার এইসব মিশেলে জয়নাল সত্য স্বীকার করার মতো করে বলে, কাকা গো, বইনডারে ভালা রাখনের চিন্তাতেই আমি তোমার পিছ লইছি। এও কওন লাগে, চুরির কামে যে যাই,   মোডে জুইতের ঠেকে না আমার।

আরে, কামে গিয়া যখনে কিছু পাইবি, তখনে তর মেজাজ ফুরফুইরা হইবই হইব।

তুমি কইলেই কী, আমি আছি ডরে!

ডর ক্যান?

চুরির কামে যাইতাছি গাজিবাড়িতে। ধরো সিঁদ দিয়া তাগো ঘরে ঢুকলাম। হেরপরে যদি কোনোমতে কেউ হজাগ পাইয়া চিহুর দিয়া উডলÑ বাঁচননি আছে হেমুনের বিপদে?

ওই, তর ওস্তাদে কামে গিয়া ধরা পড়ছে, হইছেনি এমুন কোনোকালে?  চুরির কামে থাইক্কা তুইও হেমুনের হইয়া উঠবি। চল,  টারেটুরে আমার পিছে পিছে চল রে বাহে।

ইশানের টেক পেরিয়ে পশ্চিমের শেষ সীমানার ঢালায় নেমে যাওয়ার আগে কালা কান্দু পচা গন্ধ পেতেই নাকে ডান হাতের তালু চেপে ধরে ডেকে উঠল, বাহে রে।

কী?

উহ্, কেমুন জানি পচা বয়!

মুহূর্তেই গন্ধটা জয়নালের নাসারন্ধ্র ছুঁয়ে যায়। তাই সে জবাব দেয়, ঠিক ধরছ গো কাকা। তয় আবার কইতে কী, বসন্ত মুচি চামড়ায় নুন দিয়া রইদে দিলে যেমুন বয় উডে, হেমুনডাই ঠেকতাছে এই বয়।

কী যে কস!

ক্যান?

তুই আছস চামড়া বেচা-বিহির কামে। ওইতেই বেবাক কিছুর লগে চামড়ার বয় মিলাইয়া ফালাস। যেয় যেইডা করে হেইডাই বুঝে ধরে আর কী! তয় আমি কি অনুমান লইছি জানস?

কি?

জোঙ্গলে কত্ত কি চলাচল করে। হইব হেইগুলানের কোনো একডার মড়ায় পচন ধরছে।

হঁ, কী মরছে আন্ধাগুন্ধি হেইডা দেখনের উপায়নি আছে! তয়ও আন্দাজ কইরা কও তো কাকা, কি মরতে পারে?

তুই পড়ছস আপ্যাচালে। যেইডাই পঁচুক হেই খোঁজে আমগো কাম কী রে?

সেই কথা বোধে নিয়ে জয়নাল জবাব ফেরায়, হাছা কইছ। অখন বুঝতাছিম কামে গিয়া কপালে হেমুনের কিছু পাইলে বইনের বিয়াডা ইচ্ছামতোন আগগাইয়া নিতাম পারি।

শুরু থেকেই কালা কান্দু খেয়াল করে আসছে, প্রতিবারেই সিঁদকাটার কাজে নেমে সাগরেদ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগে। তবে আবার মানতেই হয়, আশপাশের কোন বাড়ির কেমন অবস্থান সেই রেকিতে তার বিশেষ নৈপুণ্য আছে। গৃহস্থি চালাবার ফাঁকে সে চামড়া কিনতে এগ্রাম-ওগ্রাম দৌড়য়। মূলত বিয়ে-শাদি, খাতনা কিংবা মৃত ব্যক্তির চল্লিশা উপলক্ষে জবাই দেওয়া গরু-ছাগলের চামড়া কেনে জয়নাল। পরে সেগুলো কিছু লাভ রেখে বেচে দেয় বসন্ত মুচির কাছে। ইশান টেকের ঢালা পেরিয়ে আমন জমির আলপথ ধরে চলতে থাকা কালা কান্দু ডাকে, বাহে রে।

কও।

লাগলে তর বইনের বিয়ার খরচ আমি জোগান দিমুনে।

এইতক আমার ঠেকায় তুমি দিছ কম না। হেইতে আমি খুশি। এইবারে কামে ভালা কিছু পাইলে তোমার টেকা না হইলেও চলব আমার।

বাহে রে।

কী?

যাইতাছি গাজি বাড়িতে। হেইহানকার কেমন আও-বাঁও কইবি তো খোলাসা কইরা।

জয়নাল চাপা স্বরে জবাব ফেরায়, আগের তরফে তোমারে হগলডাই খোলাসা করছি। তয়ও নয়া কইরা জিগানেই কই, হেই বাড়িতে তিনডা গরু আর চাইরডা ছাগলের চামড়া কিনতে গিয়া বেবাক খবর লইয়া সারছি। আইজ গাজির ছোড নাতির বিয়া পড়ছে। হেইতে বৈহালে হগল বেডাইনতে গেছে জামাইয়ের লগে বরাতে। তারা বউ লইয়া ফিরব রাইত পার কইরা আইয়ে কাইল বিয়ানে। অখন ওই ভিডায় গেলে পাইবা খালি কত্তডি মাইয়ামানু আর কত্তডি কাউমাউ পোলাপান্তি। বুঝলানি কেমুন সুযোগ?

বাহে রে।

কী?

বুড়ি কোন ঘরে ঘুমায়, টেরনি লইছস?

হেইকালে তুমি যে তোমার বাবার লগে গাজিবাড়িতে ঢুকছিলা, কোন ঘরে সিঁদ দিছিলা?

হেইকালে বড় গাজি তার বউ লইয়া ঘুমাইত ভিডির পুব ঘরে।

হঁ, অখনো ওইখানেই ঘুমায় বুড়ি। এও খেয়াল করছি, বুড়িরে  বেকতেই মাইনা চলে। তার আঁচলে এক ঝোপ্পা চাবিও ঝুলান পাইছি।

লগে থাকেনি কেউ?

ওই কাকা।

কী?

অত্ত তলের খবর কইত্থে জানমু আমি। যেইডাই কও, এফি আমি আছি বড় একখান চিন্তা লইয়া।

কী চিন্তা?

যাইতাছি যে, কপালে মিলবনি হেমুনের কিছু।

কপালে কী পামু, না-পামু কওন দায়। ধর কামে গিয়া না পাইলাম কোনোডা। কইছি তো, হেইতে তর বইনের বিয়া আটকানের না।

বৃষ্টিতে ভিজে একসা হয়ে উঠেছে তারা। তাতে জয়নাল বলে, ভিজ্জা এক্কেরে যেমুন থুবাইয়া গেছি।

আরে, এমুনে ভিজলেও আমগো কাম থামনের না।

কও যে, কয়দিন আগে মেঘে ভিজ্জা তিন রাইত জ্বর বাইয়া উডলাম। আবারও ভিজনের কও তুমি?

জবাব নেই কালা কান্দুর মুখে। কিন্তু যে ডুবে মরে সে হয়তো জানে পানির তলানিতে কেমন অন্ধকার। আর কীভাবেই-বা দম ফুরিয়ে আসে! আবার তো বিপদে পড়লে মানুষ দিশ হারাতেই পারে। আবার এও ভাবনা যে, স্বামীর সিঁদকাটার স্বভাব বদলাতে না পারায় কালা কান্দুর বউ বাপের বাড়িতে চলে গেছে। এও ঠিক যে, তার প্রেমিকা আনেছা প্রেমিকের অপকর্মের খবর পেলে তাকে এ জীবনে মুখ দেখাবে না। এমন চিন্তাতেই সে বলে ওঠে, নিয়ত করছি এইবারের পরে আমি তোমার লগে চুরির কামে যামু না।

শোন, খুব অভাব আছিলো আমগো। মায়, আমি, বাবায়, দাদিÑ চাইর জনে কত্তদিন ভাত না পাওনে আডার জাউ রাইন্ধা খাইছি। ভুখের ঠেলায় জোয়াইরা মাস ভইরা হালুক তুইলা হিজাইছি টোপাইন্না পাতার আগুনে। ধান টোকাইছি। এক বছর কী হইলো জানস?

কইলে না-বুঝমু।

আমার লগে ধান টোকাইত ডাঙ্গর-ডোঙ্গর মাইয়া মুলুনি। ওর দুইখান চক্ষু দেখলে পরান জুড়াইয়া যাইত।

ওই আলাপে মুলুনির সঙ্গে কালা কান্দুর লেনাদেনার আভাসই তো পাওয়া যায়। প্রেমে পড়েছে জয়নালও। কিন্তু আজ তার বাঁশি বাজবে না। আনেছা কি সেই সুর শুনতে প্রতিরাতের মতো আজও জেগে আছে! হায়! প্রেমিকা জানতেও পারবে না যে, তার মনের মানুষ গেছে পরের ঘরের সিঁদ দিতে। আমার যে তার মস্ত কৌতূহল জেগেছে ওস্তাদকে ঘিরেও। তাই সে জিজ্ঞেস করে, কাকা গো, তোমার মুলুনিরে যেমুন কোনোদিন দেখলাম না।

বাতাস থির মেনেছে। বৃষ্টিও হঠাৎ উধাও হলো। তবে আকাশের গায়ে মেঘের খেলা আছে। সেদিকে দৃষ্টি ফেলে কালা কান্দু বলে, আইজে কী হেই নাগাল পাওনের আছে তর আর আমার!

ক্যান?

হইছিলো কী, হেই বৈহালে আমরা দুইজনে গেছিলাম ধান টোকাইতে। আমন ধান পাকনের মৌসুমে জানস তো ইন্দুরে কেমুন কুটকুট দাঁতে ধানের ছড়া কাইড্ডা লইয়া হেইগুলান মাডির তলে থুবায়। হেইবারে নিড়কাচি দিয়া ইন্দুইরা মাডি সরাইতে গেলে ইন্দুরগোমা হাপ ফণা তুইল্লা মুলুনির হাতে মারল কইষা একখান ছোবল।

হেরপর?

মুলুনি তো শেষ। বাঁচে নাই। বিষে কেমুন নীলা হইয়া মরল। কইতে পারস কোন দোষে মাইয়া জামাইঘর না কইরাই মিলাইয়া গেল কব্বরে?

সেই কথায় জবাব না দিয়ে জয়নাল জিজ্ঞেস করে, কাকা গো, মাইয়াডা বাঁইচ্চা থাকলে কি তুমি ওরে বিয়া করতা?

হেমুনডাই ইচ্ছা লইছিলাম আমি। আইজও মুলুনিরে যেমুন মোনে ভাসে, দাদির একখান কথাও হেমুনের কানে বাজে।

কী কথা?

দাদি কইত, তুই যেমুন কালা সুন্দর, মাইয়াডাও হইছে হেমুন কালা আর ডগের-ডাগের।

তারপর গাজিদের পুকুর পাড়ে উঠে কালা কান্দু বলে, এইবারে রাও থুবান লাগে। আয়, চুপেচাপে গাজিবুড়ি যেই ঘরে ঘুমায় আমরা হেই ঘরের ফাই আগ্গাই।

পুকুরের দক্ষিণ পাড় হয়ে তারা পুব ঘরে পেছন দিককার দরজায় গিয়ে থামে। কালা কান্দু বলে, আয়, গতরে ইচ্ছামতোন হউরার তেল মাখাইয়া আমরা কামে হান্দাই।

গায়ে সরষের তেল মাখানো শেষে কালা কান্দু খোন্তা দিয়ে দুয়ারের নিচের দিকে মাটি খোঁড়ার কাজে লেগে যায়। তবে এ যে মাটি খোঁড়া নয়, কোনো আওয়াজ ছাড়াই মাটি ছেনে ছেনে তুলে আনা। সিঁদকাটা হয়ে যেতেই কালা কান্দু বলে, এইবারে খোড়লে মাথাডা ঢুকা তো বাহে।

ওস্তাদের আদেশ পেয়ে চিকনচাকন গড়নের সাগরেদ দুয়ারে দেওয়া সিঁদে মাথা ঢোকায়। পাশে পাশে দেহে সাপের মতো মোচড় তুলে সে ঢুকে যায় ঘরের ভেতরে। মুহূর্তের দৃষ্টিতে তার দেখে নিতেও দেরি হয় না সেখানকার তাবৎ অবস্থান। ঘরে হারিকেন জ্বলছে। সেই আলোয় সে  দেখে, খাটে শুয়ে আছে গাজিবুড়ি। পাশে চৌকিতে ঘুমুচ্ছে এক প্রৌঢ়া। ঘরে ঢুকে জয়নাল দুয়ারের খিল খুলে দিতেই ওস্তাদের গৃহপ্রবেশ ঘটে। কিন্তু বুড়ির শিয়রের কাছে পৌঁছে কালা কান্দু আঁচলের চাবি খুঁজবে কী, বরঞ্চ থমকে দাঁড়ায় হঠাৎ আওয়াজে। কেননা, মুদিত চোখের বুড়ি বিড়বিড় স্বরে প্রশ্ন তুলল, দাদা রে, আমারে কী জ্বরে ধর-ছে?

এই জিজ্ঞাসায় কালা কান্দু চমকে ভাবে, ঘুম কোথায়! এ যে সজাগ বুড়ি! কিন্তু তাতে সাবধান হওয়ার বদলে নিজের অজান্তে যেনবা তার নাতি হয়ে সে জানতে চায়, কী গো দাদি, অসুখনি তোমার?

উত্তর নেই তাতে। আর চোর হয়ে গৃহস্থের সঙ্গে অমন আলাপ জমাবার দৃশ্যে জয়নাল বড়ই চমকায়। ওস্তাদের কানের কাছে মুখ নিয়ে সাগরেদ ফিসফিস স্বরে বলে, করতাছো কি তুমি? ধরা তো খাইবা কাকা!

নীরব কালা কান্দু। মনে পড়ে, তার নিজের দাদিও জ্বরের আধিক্যে ভুগে ভুগে মারা গেল। সেই স্মৃতি জেগে ওঠায় রোগীর কপালে হাত রাখে সে। এতে তার আন্দাজ হয়, জ্বরে বুড়ির গা বেজায় তেতে আছে। তাই সে বিছানায় চোখ বুজে পড়ে থাকা বৃদ্ধার চুলে অতিশয় নরোম বিলি কাটতে কাটতে জানতে চায়, দাদি গো, জ্বর যে, অষুদনি খাওয়াইছে কেউ তোমারে?

জ্বরের ঘোরে বেহুঁশপ্রায় বুড়ির কর্ণকুহরে সেই জিজ্ঞাসা পশলে তো! পাশে দাঁড়ানো সাগরেদ প্রথমটায় ওস্তাদের হাবভাবে অথৈ মানলেও দ্রুতই টানটান করে নিজের দেহখান। আর দু’চোখের তীব্র দৃষ্টি হেনে সে বুঝে নেয়, ঘরে শায়িত দুজনের একজন থুত্থুড়ে বুড়িই তো আসলে। অন্যজন প্রৌঢ়া। তারা জেগে উঠলেও চোর আটকাবার শক্তি নেই। ফলে সুযোগ বুঝে বুড়ির আঁচল থেকে চাবির গোছা খসিয়ে নিয়ে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়ায় জয়নাল। তা নজরে নিয়ে কালা কান্দু বলে, তুই কামডা চালাইয়া যা রে বাহে। আমি দাদির জ্বরডা বুঝি। মাথায় পানি ঢালতে পারলে যেমুন তাইনে আছান পাইত।

আলমারির তালা খুলবার লক্ষ্যে চাবি ঘুরাতে থাকা জয়নাল ভাবে, বুড়ি তো রক্তের কেউ নয়, চিনজান হলেও ছিল আলাপ। অথচ কি কারণে যে বুড়ির অমন তত্ত্বতালাশে মশগুল হলো ওস্তাদ। তাই চাপা স্বরে সে বলে, থোও দেখি, কার না কার অসুখ! অখনে আমার লগে খাড়াইয়া কামডা তড়তড়ি গুডাও।

সেই আহ্বান কানে গেলেও কালা কান্দুর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে চলে বিছানায় শায়িত বুড়িকে। নড়বার সামর্থ্য নেই। কণ্ঠ আরও ঘুমকাতুরে। ওই অবস্থায় বুড়ি বিড়বিড় স্বরে ডাকে, বা-আতেন দা-আ দারে…!

কালা কান্দু এতে নাতি হয়েই সাড়া দেয়, কও দাদি!

ত-র বউ-য়েরে পিন-দানের জেওর থুই-ইছি। কই-ই ব-অউ …?

তা শুনে কালা কান্দুর মনে প্রশ্ন জাগে, তা হলে কি সোনার ওই গয়না এ ঘরেই রাখা আছে! নাকি বুড়ি জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছে। কিন্তু কেন জানি সেসবে লোভ করার চাইতে রোগীর সেবা দিতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে সে। জ্বরে মাথায় পানি ঢালবার নিয়ম। অথচ চোর হওয়ায় এ ক্ষেত্রে তার থই পাওয়ার কীবা উপায়! ওদিককার চৌকিতে শায়িত প্রৌঢ়াও যে ঘুমের ভারে নাক ডাকাচ্ছে। তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বুড়ির মাথায় দেওয়ার জন্য পানি চাইলেও তার ধরা পড়ার ভয় আছে।

অন্যদিকে থাকা জয়নাল আলমারির তালা খুলে ফেলেছে। তবে বড়ই অবাক ব্যাপার যে, নিজেকে ভুলে বুড়ির শিয়রে ওস্তাদ সেঁটে গেছে। তবে এসবে তাড়িত না হয়ে সে নিজের কাজটুকু সেরে নিতে আলমারি খুলে ভেতরে হাত চালায়। হ্যাঁ, ভাগ্য এরেই কয়। বুড়ি যেমন বলল, নাত-বউয়ের জন্য জেওর রেখেছেÑ এ যে সেই সোনার গহনা। শুধু তাই-নয়, আলমারির একদিকে গুছিয়ে রাখা অনেকগুলো টাকাও সে হস্তগত করে। তারপর সেগুলোর একখানা শাড়িতে জড়িয়ে নিয়ে সাগরেদ তাগাদা লাগায়, উডো তো কাকা, উডো। যা পাইছি, বহুত পাইছি। অখনে আমরা ফিরতি রাস্তা ধরলেই বিপদ যায়।

কালা কান্দুর মাঝে উঠবার কোনো লক্ষণ নেই। এতে ভড়কে গিয়ে জয়নাল জিজ্ঞেস করে, তোমারে কি নিশিয়ে পাইছে?

সেই জিজ্ঞাসায় রাগতস্বরে কালা কান্দু জবাব দেয়, ওই পোলা, তুই এত্ত হামদাম লাগাইছস ক্যান? এফি যে দাদির গতরডায় ঘাম দিছে! হেইতে জ্বরডা নামব লাগে।

ওস্তাদের এহেন কথনে জয়নালা অসহিষ্ণু জবাব ফেরায়, কাকা গো, বাঁচনের চাইলে অক্ষনে অক্ষনে পলাও।

সাগরেদের আবেদনে কোনো উত্তর টানবার বদলে বুড়ির গায়ে দেখা দেওয়া ঘাম মুছে চলে কালা কান্দু। সেই ভাব বুঝে জয়নাল বিস্ময় প্রকাশ করে, যেমুন লাগে তুমি আর আগের তুমি নাই। ওই, কী হইছে তোমার?

বুড়ির গায়ে জমে ওঠা ঘাম মোছায় ব্যস্ত কালা কান্দু। কিন্তু একী! বুড়ির মুখখানা ডান দিকে কেমন যেন ঢলে পড়ল। ফলে সন্দেহ নিয়ে তার নাকে হাত রাখতেই সে টের পায়, আরে, আরে, বৃদ্ধার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস যে ফুরিয়েছে। এতে ওস্তাদ আর্দ্র গলায় বলে ওঠে, বাহে রে, দাদি তো বাঁইচ্চা নাই।

জয়নাল রাগ দেখায়, কেডা না কেডা বুড়ি মরল, হেইতে তোমার কী গো, তোমার কী? আইও আমরা পলাই।

ওই, মড়া ফালাইয়া গেলে পাপে পাইব আমারে। খবরডা যে অখন অখনই বেকতেরে জানান দেওন লাগে।

তারপর ঘরের সামনের দরজা খুলে নিশি পাওয়া মানুষের মতো নেমে গিয়ে কালা কান্দু দাঁড়ায় গাজিদের উঠানে। আর চিৎকার করে ডাকে, তোমরা কেডা কই আছো গো, দেইখা যাও বুড়ি তো আর এই দুনিয়াতে নাই।

তার ডাক শুনে এক শিশু স্তন্যপিপাসু  হয়ে নয়, ভয় পেয়েই বুঝি ঘুম থেকে জেগে উঠল! তবে আসল কথা হলো, তার হাঁক শুনে জেগে উঠল বাড়ির অন্যান্য মহিলারা। সেই দলের কেউ একজন ভয়ে আর্তচিৎকার ছাড়ল। ভাবি গো, এত্ত রাইতে কেডা ঢুকল আমগো উডানে? পাগলনি হেয়, না চোর?

মেয়েমানুষের অমন জিজ্ঞাসা কানে যেতেই কালা কান্দুর হুঁশ ফিরে পায়। পর মুহূর্তে অথৈ অন্ধকারের ভেতরে দিয়ে পড়িমড়ি দৌড় লাগায় সে। আসলেই, কালা কান্দু যে চোর। তাই ধরা পড়লে তাকে লোকজনের পিটুনি খেয়ে নির্ঘাৎ মরতে হবে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares