ক্রীড়নক : মোহীত উল আলম

পিঠের ব্যথা, তাই রেহাল খান শুয়েছিলেন। বসার চেয়ে শোয়াটা আরামদায়ক। ডাক্তার এক্সরে করে বলেছেন, মেরুদণ্ডের হাড়ের কিছু হয়নি, পেলভিসও ঠিক আছে, তবে ডিস্ক প্রলেপসের আভাস আছে, যা এক্সরেতে বোঝা যাচ্ছে না। এম আর আই করালে বোঝা যাবে, তবে এখন আমরা ওদিকে যাবো না, দেখি ব্যায়াম-ট্যায়াম করে ঠিক করা যায় কি-না। কারণ হিসেবে তিনি ধারণা করলেন, করোনাবাসের সময় দীর্ঘ ছয় মাস ঘরে বসে আছেন রেহাল, পড়াশোনা করেছেন টেবিল-চেয়ারে বসে দীর্ঘ সময়, সেজন্যই ব্যথাটা উঠেছে। অবস্থা খুব খারাপ নয়।

তবে রেহাল শুয়ে শুয়ে অনলাইনে দাবা খেলছিলেন। তিনি খেয়াল করে দেখেছেন দাবায় নিমগ্ন থাকলে ব্যথা টের পান না। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতে চাননি যে সাইটিকার ব্যথা কি মানসিক কারণেও হতে পারে কিনা। তাঁর স্ত্রী হীরণ খান নামাজ পড়ার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন বিছানার পাশেই। তাঁরও বাম পায়ের হাঁটুতে ভীষণ ব্যথা। চেয়ারে বসে তাই হীরণ খান নামাজ পড়েন। নিয়ত বাঁধার আগে রেহাল খানকে কী যেন তিনি বলছিলেন। অনলাইন দাবা টাইম সেট করে খেলতে হয়। তিনি স্ত্রীর কথা না শুনেই হুঁ হাঁ করছিলেন, আর মনোযোগ দাবায় ধরে রাখছিলেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন, স্ত্রী যেন অভিমান করে কী একটা বললেন, তুমিতো আমার কথা শুনছইনা, আরেক আজগুবি খেলা পেয়েছ, সেটাতেই মজে থাকো। ব্যথা শুরু হবার পর থেকে রেহাল খান অজানা ভবিষ্যতের আশংকায় তাঁর অভ্যাস বহুগুণে বদলে ফেলার চেষ্টা করছেন। করোনার ভয়ও তো মনের কোনায় সবসময় জাগরুক, যদি ধরা খান।

তাই সচেষ্ট হয়ে বললেন, কী বলছ?

হীরণ খান মাত্র তোবা করে নিয়ত বাঁধবেন, স্বামীর প্রশ্ন শুনে বললেন, জিকু টেলিফোন করেছিল। বলল, জাফির জন্য ভালো একটি মেয়ের সন্ধান পেয়েছে।

রেহাল খান বললেন, ফটো পাঠিয়েছে?

‘পাঠাবে’ বলেই হীরণ নামাজ শুরু করলেন।

রেহাল আগের গেইমটা হেরে গেলে নতুন আরেকটা শুরু করলেন। খেললেও, খেলায় ঠিক চাল দেখতে পাচ্ছিলেন না। জাফির বিয়ের ব্যাপারটা মাথায় ঘুরতে লাগল। ছেলেটার অনেক বয়স হয়ে গেল, ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। তার আগের দুই ছেলে এক মেয়ে। তিনজনই নিজ নিজ পছন্দমতো বিয়ে করেছে। এই ছোটোটা কেমন যেন, বিয়ের ব্যাপারে কোনো উৎসাহ দেখায় না। বন্ধু-বান্ধবও তেমন একটা নেই। ঢাকায় একটা মেয়ের সাথে কথাবার্তা বলে। ছোটবেলায় তারা একসাথে একটা স্কুলে পড়েছিল। অনেক বছর পরে ফেসবুকের মাধ্যমে পুনঃযোগাযোগ হলে তারা ভালো বন্ধু হয়ে যায়। ছেলে মাকে মেয়েটার ব্যাপারে বলেছে যে তারা শুধুই বন্ধু, অন্য কিছু নয়।

হীরণের নামাজ শেষ হলে রেহাল জিজ্ঞেস করলেন, জয়নালের মেয়েটার কী হলো।

কী আর হবে, ভাবি কতবার আমাকে বললেন, আপনার ছেলেতো টেলিফোন করবে বলে করে না। এখন আমরা কী করব ভাবি। আপনার ছেলের মনে হয় বিয়ে করার ইচ্ছে নেই। তোমার ছেলে, বুঝেছো, নিজেও পছন্দ করবে না, আমরা একটা জোগাড় করে দিলে সেটাও নেবে না।

রেহাল বললেন, তা হলে তো এক্সপেরিমেন্টটা ফেল করল। আমি জয়নালকে বলেছি, দোস্ত, এখনকার যুগ, ছেলেমেয়েদের নিজেদের পছন্দ করার যুগ। তবুও ছেলে যখন পছন্দ করছে না, দেখি না, তোর মেয়েটার সঙ্গে একটা যোগাযোগ করিয়ে দে, ওরা ওরা পছন্দ হয়ে গেলে তারপর আমরা এগুব। জয়নাল বলেছিল, দেখি, তোর ভাবির সঙ্গে আলাপ করে। মেয়েকে এ রকম কথা বলতে দেবে কিনা, বুঝতে পারছি না। তারপর আমরা দুই বন্ধু মিলে খুব হেসেছিলাম। আগে ছেলেমেয়েরা প্রেম করলে গার্জিয়ানরা ক্ষেপে যেত। এখন গার্জিয়ানরা ছেলের জন্য মেয়ে, মেয়ের জন্য ছেলের প্রেম করিয়ে দিতে চাইছে।

জয়নালের সঙ্গে রেহালের একথাগুলো হয়েছিল করোনা ঢোকার আগে। সবকিছু বন্ধ থাকলেও তাঁদের এ ছোট ছেলের বিয়ের ব্যাপারে রেহালেরÑ হ্যাঁ, হীরণের চেয়েও রেহালের বেশি উৎসাহ থেকেছে, কারণ আগের ছেলেমেয়ের বিয়েগুলো তিনি মেনে নিলেও মন থেকে মোটেও সন্তুষ্টি পাননি। মেয়েটা প্রায় বিয়ে করেছে ভবঘুরে একটা ছেলেকে। তার সহপাঠী ছিল। তবে বিয়ের পর কী জানি কী হলো, ছেলেটা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে বিসিএস দিয়ে তথ্য দপ্তরে চাকরিও পেয়ে গেল। এর পরের বছর মেয়েও বিসিএস পাস করল এবং প্রশাসনে যোগ দিল। কিছুদিন বান্দরবানে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করে এখন ঢাকার কমিশনারের অফিসে ন্যস্ত হয়েছে। রেহাল খুব চেষ্টা করেছেন তাঁর আমলা বন্ধুদের ধরে ঢাকায় না হলেও গাজিপুরের দিকে পোস্টিং দেওয়াতে। মেয়ের জামাইয়ের বাড়ি গাজিপুর, যদিও তার পোস্টিং চট্টগ্রামে।

কিন্তু, রেহাল কোন অভাবটা বোধ করেন ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে সেটা তিনি কখনও হীরণের সঙ্গে শেয়ার করেননি। শেয়ার করেননি, কেন না তিনি নিজেও পরিষ্কার নন, যে কারণটা ভাবছেন, সেটি আসল কারণ কি-না।

হীরণ বাতি নিভিয়ে দিয়ে শুতে এলে, রেহাল বললেন, জয়নালের মেয়ের সঙ্গে তোমার ছেলে ক’বার কথা বলেছে।

ঐ একবারই। এর চেয়ে বরঞ্চ আমার সঙ্গেই ভাবির কথা হয়েছে কয়েকবার। তাদের একমাত্র মেয়ে, খুব আদরের। ভাবির কথায় আমি বুঝতে পারি, জাফিকে খুব পছন্দ ভাবির। তনিমারও নাকি পছন্দ। অথচ তোমার ছেলে কী রকম বিগড়ে আছে। বলে কি, সিংগেল জীবন চালালে অসুবিধা কী। তিনটাকে তো বিয়ে দিছ, কী পাইছ।

রেহাল অদ্ভুত ভঙ্গিতে বললেন, আসলেই কী পাইছি!

হীরণ স্বামীর গোপন মনোবেদনার কথা জানেন, তাই কথাটাকে গা না করে বললেন, কেন, কত সুন্দর সুন্দর নাতি-নাতনি পেয়েছি। বীণা কী বলে জানো, বলে, দাদু, তোমাদের বেডরুমটা রেড কালার কেন? মেয়েটা রেড কালার, পিংক কালার, গ্রিন কালার নিয়েই আছে। কী যে মজার মজার কথা বলে, আর বিমানের শুধু নিমকি হলেই হলো, নিমকি খাবে আর কার্টুন দেখবে।

ওদের কানাডা যাবার কতটুকু হলো? বড়টা তো গেছে, এখন মেজোটাও যাচ্ছে। জাফি মিঞাটা বিয়ে করে সঙ্গে থাকলেই হয়।

হীরণের শব্দ করে নাক ডাকার আওয়াজে রেহাল বিপরীত দিকে পাশ ফিরে শুলেন। করোনার অন্তর্বাস জীবনে তাঁর ঘুমের প্যাটার্ন বদলে গেছে। রাত্রে খুব দেরিতে ঘুম আসে, আবার ঘুম ভাঙে দেরিতে। শ্রাবণ মাসের শেষের দিক। বৃষ্টি এখনও ছেড়ে যায়নি। তিনি কান পাতলেন, জানলার শার্সিতে বৃষ্টির ফোঁটার এলোমেলো শব্দ বাজছে। মেরুদণ্ডের নিচে হাত দিয়ে দেখলেন, ব্যথাটা এখন নেই। ভাবতে লাগলেন, জয়নালের মেয়ের সঙ্গে ছেলের যোগাযোগটা না জমাতে ভালোই হলো। জয়নাল তাঁর স্কুল জীবন থেকে বন্ধু। কিন্তু  কেমন যেন গা করল না কোনো কিছু। তার নিকটতম বন্ধু হয়েও রেহাল যখন জীবন সংগ্রামে অসম্ভব পরিশ্রম করে একটার পর একটা সিঁড়ি পেরিয়ে তাঁর ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে ডি জি এম হয়ে অবসরে গেছেন, জয়নাল চৌদ্দ রকমের চাকরি করেছে আর ছেড়েছে এবং একটা বেকার বেকার ভাব নিয়ে শেষ পর্যন্ত তিন তিনটে মেয়ের বাবা হয়ে এখন প্রায় উচ্চ রক্তচাপের ঝোঁকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তার মেয়েকে বিয়ে করলে তাদেরই লাভ হতো, কিন্তু রেহালরা আসলে মেয়েটা ছাড়া আর কিছুই পেতো না। এ প্রসঙ্গে না হলেও জয়নাল তাকে মাঝে মাঝে বলেছে, ব্যাংকের চাকরিটা আসলে খুব খারাপ চাকরি, মানুষকে লোভীতে পরিণত করে।

রেহাল হেসে বলেছিলেন, আমি কি লোভী?

তুই তো এক নম্বরের লোভী। বোঝা যায় না, তবে কাছাকাছি মিশলে বোঝা যায়। অবশ্য টাকা-পয়সার লেনদেন যেখানে, সেখানে মানুষ লোভী হতে বাধ্য।

রেহাল মনে মনে বন্ধুর কথায় তৃপ্তি পায়। বুঝতে পারে বন্ধুর শ্লেষ মেশানো আক্রমণের পেছনে একটা ব্যর্থ জীবনের দীর্ঘশ^াস চাপা পড়ে আছে। বন্ধুকে তার বরঞ্চ করুণাই হলো। সফল লোকদের ব্যর্থ লোকদের প্রতি মমতার মতো। আশ্চর্য, তিনি যে জয়নালকে চিরদিন চিনতেন, সেদিন জয়নালের ক্ষুদে বসন্তের দাগওয়ালা মুখে যেন হায়নার প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলেন। তার ক্রুকাট করা চুলের গোছা যেটাতে তাকে মনে হতো একজন বিচক্ষণ লোক, সে ক্রুকাটকে মনে হলো যেন নিছক একটা কৃত্রিম ভাব।

মনে মনে খুব তিতা ভাব নিয়ে সেদিন তিনি বন্ধুর বাসা থেকে ফিরেছিলেন। অথচ এই বন্ধুকে তিনি কতবার বিপদের সময় টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছেন। তাঁর ঘুম আসছিল না। পিঠের ব্যথার জন্য খুব সহজে পাশ ফিরতেও পারছিলেন না। তারপরেও পাশ ফিরলেন, এবার বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে হীরণের নাক-ডাকার শব্দ মিলে তাঁকে কেমন যেন অস্থির করে তুলছিল। করোনার ভয় মনের কোনা থেকে যেন বেরিয়ে এসে তাঁর জাগ্রত চোখের সামনে দাঁড়ালো। সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত যেন।

রেহাল তাঁর চাকরিজীবনে যে কয়টা বড় ধকল সামলেছিলেন তার মধ্যে একটি হলো তাঁর চাকরির শেষের দিকে চট্টগ্রামের হেড অফিসে অনাকাক্সিক্ষত একটা ঘটনা ঘটে যায়। তাঁদের ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের একজন পরিচালক ব্যাংকের  ভেতরেই খুন হয়ে যায়। ঢাকার কেন্দ্রীয় অফিস থেকে সাথে সাথে তাঁকে চট্টগ্রাম পাঠানো হলো। তিনি সরেজমিন প্রাথমিক তদন্ত করে বুঝলেন ব্যাংকের পরিচালকদের মধ্যে ঘাপলা থেকে এই হত্যাকাণ্ডটি হয়েছে। পুলিশ, র‌্যাব, দুদক সব সংস্থার গোয়েন্দারা হামলে পড়ল ঘটনাটার জন্য দায়ী কে বা কারা সেটা বের করতে। ব্যাংকের তরফ থেকে বিভাগীয় তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে রেহালের মূল জায়গায় হাত দেবার অবকাশ হলো।

কিন্তু এখানে ভয় এবং সততাবোধের মধ্যে এক প্রচণ্ড সংগ্রামের মধ্যে পড়লেন তিনি। চিরজীবন ব্যাংকের দায়িত্বপালনে সততার সঙ্গে কাজ করেছেন, কিন্তু তখন তো মৃত্যুভয়টা ছিল না। এখন সকাল বিকাল অজানা নম্বর থেকে থ্রেট কল পেতে পেতে তিনি মানসিকভাবে মুষড়ে পড়লেন।

মুয়াজ্জিন নামক তাঁর এক বন্ধু তখন অন্য একটা ব্যাংকের এম ডি হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আলাপ করলে মুয়াজ্জিন পুরো ব্যাপারটা মুচকি হেসে উড়িয়ে দিলেন। বিজ্ঞের মতো বললেন, ওরা যে মানুষ মারতে পারে ওটা তো তুই বুঝেছিস। তোর দেখতে হবে, কীভাবে এগোলে তোর নিজের কোনো ক্ষতি হবে না। তখন রেহাল বললেন, তা হলে তো সত্যকে চাপা দেওয়া হয়, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। মুয়াজ্জিন বললেন, কেন, পার্টিকে লোন দেবার সময় সবসময় কি ন্যায়ের মধ্য দিয়ে কাজ করেছিস? এদিক-সেদিক তো করতে হয়েছে, তাই না। রেহাল বললেন, সেটা না হয়  করেছি, তাও খুব কম। কিন্তু সেটা তো টাকা, আর এটা তো খুন।

মুয়াজ্জিন কফির কাপে ঠোঁট লাগিয়ে একটু কোনা হেসে বললেন, ব্রাদার, কর্পোরেট ইন্ডাস্ট্রিতে টাকা আর প্রাণের মধ্যে কোনো বেশকম নাই। তুই তো আর খুনটা করিসনি, তুই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যাঁরা শক্তিমান তাঁদের লাইন ধরেই তো কাজ করবি। মনে রাখিস, এঁরা তোকে আজকে ডিজিএম বানিয়েছে, কালকে হয়তো এমডি বানাবে, কিন্তু এঁদের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে না মিললে তোর চাকরির ক্ষতিও হয়ে যেতে পারে। নটও করে দিতে পারে। তুই একটা কাজ কর, বল যে, এটা তো মামলার অধীন, তাই তদন্ত করা হবে সাবজুডিসড।

রেহাল বললেন, সেটা এমডি সাহেবকে বলেছিলাম। উনি বললেন, সাবজুডিসড হবে না, কেন না বিভাগীয় তদন্ত করার দায়িত্ব ব্যাংকের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। আমি রিজাইন করতে চাইলাম তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে। তিনি এডভাইস করলেন, তোর মতোই যে তা হলে দু’টো সিদ্ধান্ত ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিতে পারে। এক, কোনো একটা গোপন কারণে আপনি রিজাইন দিতে চাইছেন, অথবা আপনি যেহেতু দায়িত্ব পালনে অপারগ আপনি গোল্ডেন হ্যান্ডশেক নিয়ে চাকরি থেকে অবসর নিতে পারেন।

খুব দমে গিয়ে রেহাল সেদিন বাসায় ফিরেছিলেন। দমে গিয়ে যখন চুপচাপ টিভির সামনে বসে টিভি না দেখে অনলাইন দাবা খেলছিলেন, কী একটা চাল দিলেন এবং প্রতিপক্ষের মন্ত্রী সড়াৎ করে মারা গেল তাঁর হাতির কাছে। ভাবলেন, জীবনটা যদি দাবার মতো হতো! ঠিকমতো চাল দিলে মন্ত্রীও ধরা খায়। কিন্তু তাঁদের বিশাল বড় ব্যাংক, চারদিক থেকে শুধু তাঁর কাছে বিভিন্ন রকমের তথ্য আসতে লাগল। তাঁর সঙ্গে যে দু’জন সহকর্মী ছিলেন তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে তাঁরা মুখে কিছু না বললেও তিনি বুঝতে পারলেন তাঁরা কী বলতে চান। শেষ পর্যন্ত তিনি অনেক পরিশ্রম করে একটি তদন্ত প্রতিবেদন দিলেন, যাতে দেখা গেল খুনটা ব্যাংকের পরিচালকদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল থেকে হয়নি, বরঞ্চ হয়েছে ঐ পরিচালকের সঙ্গে কোনো একটা পার্টির টাকা-পয়সাজনিত লেনদেন থেকে।

প্রতিবেদন দেবার পর তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে গেলেন। সেদিন বৃহস্পতিবার ছিল। তারপর দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটি কাটিয়ে তিনি যখন অফিসে গেলেন, দেখলেন কিছুক্ষণের মধ্যে যেন সাধারণ কর্মচারী থেকে শুরু করে অফিসারদের মধ্যে কীসের একটা গুঞ্জরণ শুরু হয়েছে। প্রতিবেদনটি নাকি বানানো। তাঁদের তিনজনকে দুদক হেড অফিসে ডাকা হলো। অবশ্য কাগজপত্র দিয়ে তাঁদের প্রতিবেদনের যাথার্থ প্রমাণ করা অসুবিধা হলো না। মজার ব্যাপার হলো, কিছুদিনের মধ্যে পুলিশ থেকে যে চার্জশিট তৈরি হলো, তাতেও হুবহু রেহালের প্রতিবেদনের মতোই সিদ্ধান্ত এলো যে পরিচালনা পর্ষদের কেউ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল না।

এক সপ্তাহ যেতে না যেতে তিনি নানারকমের অনেক কানাঘুষো শুনতে লাগলেন। এর মধ্যে তদন্ত কমিটির তিনজনে মিলে যখন লাঞ্চ সারছিলেন, তখন এমডি-র রুমে তাঁর ডাক পড়ল। তিনি ঢুকতে না ঢুকতেই দেখলেন এমডির রুম থেকে চেয়্যারম্যান সাহেব বের হয়ে যাচ্ছেন। সুবেশী ভদ্রলোক, সত্তরোর্ধ্ব বয়স, তাঁকে দেখে মৃদু হাসলেন, এবং সালাম গ্রহণ করে সামনের পোর্চে লিফটের সামনে দাঁড়ালেন। রেহালকে এমডি সাহেব খুব চতুর চিনি-মাখানো স্বরে বললেন, এই মাত্র চেয়ারম্যান স্যার বেরিয়ে গেলেন দেখলেন তো।

রেহাল বললেন, হ্যাঁ, সালাম দিলাম তো, সুন্দর হেসে সালামটা নিলেন।

এমডি সাহেব তাঁর সামনে ডেস্ক কালেন্ডারে কী একটা যেন দাগালেন, তারপর বললেন, ‘সুন্দর হেসে’Ñ এইটাই কথা।  চেয়ারম্যান স্যার শুধু সুন্দর হাসেন না, খুব ডাইনামিক লোক তাই না? কী বলেন? এত সুন্দর তাঁর সিদ্ধান্ত, আসলে পুরোনো আমলের চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট তো তাই অনেক ঘড়েল লোক। দেখলেন না, পুরো মার্ডারের ব্যাপারটা কেমন করে অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট হয়ে গেল না। এমডি সাহেব এরপর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। অর্ডালি এসে এক কাপ চা দিয়ে গেলে তিনি মুখ খুললেন। বললেন, আপনি তো গ্রিন টি পছন্দ করেন। খেতে পারেন। রবিবারে মদনের মেজাজ খুব ভালো থাকে, সেদিন চা’টাও ভালো হয়। দু’দিন ছুটি পেয়েই বাড়ি ঘুরে আসে সেজন্য বোধহয়। তারপর বললেন, আচ্ছা আপনিও তো কোথাও ঘুরে আসতে পারেন ভাবিকে নিয়ে। যান না, মালয়েশিয়া, কিংবা সিংগাপুর, কিংবা থাইল্যান্ড। কাছাকাছি চার ঘণ্টা ফ্লাইটের মধ্যে যে কোনো দেশ ঘুরে আসতে পারেন। এটা বলতে পারেন ব্যাংকের সবকিছু অক্ষত রাখার জন্য আপনার জন্য গিফট। তা ছাড়া বিদায় নেবার আগে এটা আপনার জন্য ভালোই হবে।

রেহাল কেঁপে উঠলেন, ভিতরে এই ঠান্ডা এসির মধ্যে বসেও জবজব করে ঘামতে লাগলেন। কিন্তু এমডি সাহেব একটুও কণ্ঠস্বর বদলালেন না, তাঁর ‘বুঝতে পারছি না স্যার কী বলতে চাইছেন’Ñ এ প্রশ্নের উত্তরে বললেন, বুঝতে না পারারই কথা। আমিও প্রথমে বুঝিনি। চেয়ারম্যান স্যার বুঝিয়ে না দিলে তো আমি বুঝতেই পারতাম না। যা হোক, আমি সংক্ষেপে বলি: চেয়ারম্যান স্যার মনে করছেন যে আপনি এখন অবসর নিলে আপনিও স্বস্তিতে থাকবেন, ব্যাংক ম্যানেজমেন্টও আপনাকে নিয়ে কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে না। ‘আফটার অল ইউ হ্যাভ বিকাম অ্যান ইনসাইডার উইদাউট বিইং অ্যান ইনসাইডার। দেখেন নিয়তি, আপনি সবার, আই মিন ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের ভালো করলেন, অথচ আপনাকেই মাশুলটা দিতে হচ্ছে। ঠিক মাশুল তাও বলা যাবে না। আই মিন, আপনার চাকরির বয়সও তো শেষ হয়ে আসছে। তার চেয়ে এই ভালো, ঝুট ঝামেলা থাকল না, অ্যংজাইটি থাকল না। আর অনেকগুলো টাকাও একসঙ্গে পেলেন। ও হ্যাঁ, সাথে একটা ভালো হেলথ-সিকিং ট্যুর।

রেহাল একটু নড়েচড়ে বসে বলতে গিয়েও বললেন না যে ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মন রক্ষা করার উপদেশ তো এমডি সাহেব নিজেই দিয়েছিলেন। তিনি কিছু না বলে আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগুতে থাকলে, এমডি সাহেবের গলা শুনতে পেলেন। শুনুন, রেহাল সাহেব, জাস্ট ওয়েট আ মিনিট। একটু এদিকে আসেন।

রেহাল দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেলে, এমডি সাহেব তাঁকে বসতে বললেন। এরপর বেল টিপলেন। সুন্দরী সেক্রেটারি ফিনফিনে কালো শাড়ি পরা তমসা রায় খুট খুট করে হিল পায়ে ভিতরে এলেন। এমডি সাহেব বললেন, ও তুমি রেহাল সাহেবের ফাইলটা সাথে করে নিয়ে এসেছ। গুড। ও কে গো নাউ।

ফাইলটা খুলে এক নজর কয়েকটা কাগজ দেখলেন। তারপর বললেন, এই হলো আপনার চেক। একাউন্টস হিসাব করে দিয়েছে। পেনশন, গ্র্যাচুইটি মিলে অনেক টাকা হলো, সাথে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মোটা দাগের একটা বোনাসও দিয়েছে। আর এ হলো ভ্রমণের কুপন। সব ডলারে ভাঙাতে পারবেন। আই উইশ,  আই হ্যাড আ লাক লাইক ইয়ু। তারপর ফাইল থেকে দু’টো কাগজ বের করে বললেন, এই দু’টো কাগজে একটু সই করেন। একটি হলো এসবের অ্যাকনলেজমেন্ট। আরেকটা হলো আপনার পদত্যাগ করার চিঠি স্বাস্থ্যগত কারণে। সাইটিকার ব্যথা বলেছিলেন না। সেটা লেখা হয় নাই অবশ্য। জেনারেল স্টেটমেন্ট। আর ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট চায় না আপনার মতো সুদক্ষ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ছাঁটাই হোক, বরঞ্চ অন গুড ফেইথ আপনি রিজাইন দিলেন, এই আর কি! নট আ বিগ ডিল। জীবনে তো আপনি অনেক দেখেছেন, অনেক অভিজ্ঞতা আপনার, এইসব জিনিস আপনার বুঝতে না পারার কথা নয়। অনেক ধন্যবাদ, আপনার সময়ের জন্য। গাড়ি কি এনেছেন? না আনলে আমার ড্রাইভার পৌঁছে দেবে আপনাকে।  

না, তার দরকার হবে না, গাড়ি আমি নিজেই ড্রাইভ করে নিয়ে এসেছি। সালেমালেকুম স্যার, ভালো থাকবেন।

জি¦, ওয়ালেকুম সালাম, আপনিও ভালো থাকবেন। ভাবিকে আমার সালাম দিবেন। আর, এনি টাইম এনি প্রব্লেম, জাস্ট গিভ মি আ কল। এমডি সাহেব তাঁকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।

গাড়ি চালাতে চালাতে তাঁর মনের মধ্যে যে ঝড় বয়ে গেছিল সেটিকে তুলনা করা যায় জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে মানুষ যেরকম উ™£ান্ত হয়ে থাকে সেরকম। প্রথমে তাঁর ভিতরে প্রবল কান্না এলো। মনে হলো, নিজের জীবনটা যেন ইঁদুরের মতো ক্ষুদ্র জীবন। মনে মনে ভাবলেন, এ জন্যই কি আমি জন্মেছিলাম। যে অপরাধকাণ্ডের সঙ্গে আমি কোনোভাবে জড়িত নই তার মাশুল দিতে হলো আমাকে? যে চাকরি হারানোর ভয়ে আমি কর্তৃপক্ষের ইচ্ছার বাইরে গেলাম না, সে চাকরিটাই তো আমি হারালাম। সেদিন ছিল আরেকটা বৃহস্পতিবার। ঢাকা শহরে জ্যামের মেলা। তাঁর গাড়ির মধ্যে বসে থাকতে ভালোই লাগছিল। চিন্তার জট মেঘের পর মেঘ জমার মতো জটিল হচ্ছিল, আবার মেঘ হালকা হবার মতো কিছুটা খুলছিল। তিনি ব্যাংকে লোন দেবার সময় পার্টির কাগজপত্র দেখার সময় সবসময় অধস্তনদের বলতেন, শুধু মাত্র একটা বিষয়কে ফিংগার পয়েন্ট করবেনÑ যেটার ওপর ভিত্তি করে আপনি বলতে পারবেন যে এটা কি ব্যাড লোন না গুড লোন। অনেকগুলো বিষয় একত্রে আনার দরকার নেই। এখন তিনি সেভাবে ধীরে ধীরে তাঁর নিজের বর্তমান অবস্থানকে ফিংগার পয়েন্ট করতে লাগলেন। যদি তিনি সাহসী ভূমিকা রাখতেন, চাপের মুখে ভয় না পেয়ে সত্যিকারের তদন্ত প্রতিবেদন দিতেন, তা হলেও তিনি চাকরি হারাতেন। যে অবসরভাতা এখন পেলেন, তা তো পেতেনই, হয়তো বোনাস আর ট্যুরটা পেতেন না। কিন্তু মৃত্যুভয়? সেটা নিয়ে কী করতেন? বন্ধু মুয়াজ্জিন তো বলেছেই, এরা একজনকে অলরেডি খুন করেছে। রেহালের মনে সাথে সাথে তাঁর ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, নাতি-নাতনিদের মুখ ভেসে উঠলো। হায় রে, জীবনে নিজের জীবনের মায়ার চেয়েও আপনজনদের নিয়ে মায়াটাই আসলে বড়। সেটাই মানুষকে মরতে দিতে চায় না। তারপর তাঁর মন আস্তে আস্তে শান্ত হতে থাকে। তিনি তো জীবনযোদ্ধা, যুদ্ধক্ষেত্রের যোদ্ধা নন। কামানের মুখে দাঁড়িয়ে বীরত্ব দেখাতে হবে, সে ধরনের প্রয়োজন তো তাঁর জীবনে নেই। তিনি প্রথমে সরকারি ব্যাংকে ছিলেন, তারপর প্রাইভেট ব্যাংকে জয়েন করেছেন। কর্পোরেট ব্যাংকিং-এর ভয়ংকর গ্রোগাসি দানবীয় টাকার জগতে একান্ত লোভেরই নানা ভদ্র (প্রায়শই আড়ালে আড়ালে অভদ্র) সংস্করণ দেখেছেন। তাঁর এমডির চমৎকার টাই-স্যুট পরা ক্লিন শেভেন চকচকে চেহারাটা ভেসে উঠল। তিনি আজকে যে স্বরে কথা বলেছেন, ঠিক তাঁর বাসার বুয়া দিনের কাজ ফুরোবার আগে আগে ছুটি চাইতে গেলে হীরণের সঙ্গে যেভাবে কথা বলে, সেভাবে যেন তোষামোদী গলায় কথা বলছিলেন।

গাড়ির সিটের কুশনটা তিনি পিঠের মাঝখান বরাবর রাখলেন, ব্যথাটা একটু কমুক। জ্যাম ছুটে গেলে তিনি আবার গাড়ি চালাতে শুরু করলেন। কিন্তু লিফট বেয়ে বাসায় পৌঁছে দরজায় কলিং বেল দিতে না দিতেই তাঁর মনে কেটে যাওয়া মেঘ আবার জমতে শুরু করল। তাঁর বহুদিনের স্ত্রী তাঁর চেহারা দেখে বললেন, কী ব্যাপার লাঞ্চ কি বাসায় করবে নাকি?

হ্যাঁ, বাসায় করব। আর অফিসে যাব না। ‘কোনো দিন যাব না’ বলতে  না বলতে তিনি যেই বেডরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে যাবেন, হীরণ সাথে সাথে ঢুকলেন, কী হয়েছে, অফিসে যাবে না কেন?

কী একটা বলতে গিয়ে রেহাল হঠাৎ প্রচণ্ড আবেগে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শব্দ নেই, কিন্তু প্রবলভাবে ফুঁসতে লাগলেন তিনি। অঝোর ধারায় চোখের পানি বয়ে যেতে লাগল, হীরণের কামিজের বুকের দিকটা ভিজে উঠতে লাগল।

হীরণ তাঁকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় বসালেন। তাঁকে ছাড়লেন না। কাঁদতে বাধাও দিলেন না। আস্তে আস্তে সব শুনে বললেন, সব কিছু মেনে নাও। আল্লাহ্ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। সবর কর।

সকাল বেলায় ঘুম তাঁর তাড়াতাড়ি ভাঙল। হঠাৎ বললেন, দেখ, চাকরিছাড়া হলাম, এর পরপরই করোনা ঢুকল। এক রকম ভালোই হলো। অফিসের ঝামেলা নেই। সবই একটা বিধান।

হীরণ বললেন, বল, আল্লাহ্র বিধান।

রেহাল বললেন, হুঁ, তাই। তারপর একটা গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে বললেন, আচ্ছা, জাফিকে বিয়ে করানোর চিন্তা আমরা করছি কেন? ওর জীবন তো ওর! ও ওর মতো করে চলুক না, অসুবিধা কী?

হীরণ শুয়ে থেকে বললেন,  তারপর যদি ছেলেটা বিয়ে না করে থাকে। তা হলে মরে গিয়েও কি শান্তি পাব?

রেহাল বললেন, মরে গিয়ে কী হবে না হবে সেটা বুঝতে পারছি না, কিন্তু এটা বুঝতে পারছি যে ছেলের জীবনের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ রাখা ঠিক হবে না। ও কাউকে পছন্দ করে বিয়ে করলে করবে, না করলে নেই। আমরা এ ব্যাপারে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। বাপ-মা’র হাতের ক্রীড়নক কেন হবে ছেলে?

হীরণ হতাশার সুরে বললেন, আমি কিছু বলতে পারব না।

ট্র্যাক স্যুট পরে জুতো পরে রেহাল যখন আবাসিক এলাকার পার্কে ঢুকলেন হাঁটার জন্য, তিনি হঠাৎ আবিষ্কার করলেন মাস্ক না পরেই তিনি বের হয়েছেন। মনে মনে বললেন, ধুর আনি নাই, আনি নাই, সো হোয়াট!

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares