মুক্তিযোদ্ধা আকবরের সেই গল্পটা : মঞ্জু সরকার

স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে একটি মশাল প্রজ্বলন করা হয়েছে। মশালটির অনির্বাণ শিখা স্বাধীনতা স্কয়ারে জ¦লতে থাকবে। তার আগে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী মশালটি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে হাতে সারাদেশ পরিভ্রমণ করবে।

খবরটা মুক্তহাটে ক দলের স্থানীয় নেতা মোবারক শাহ মুক্তহাটের পানের দোকানদার আকবরকে সবিস্তারে শুনিয়ে বলে, ‘আগামী কাইল তোরেও আমাগো লগে টাউনে যাওন লাগব আকবর। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের বড় গেদারিং। অনুষ্ঠানে মাইকে তুই তোর সেই গল্পটা হোনাইবি।’

পানে খয়ের-জর্দা মেশানোর সময় পরিচিত খদ্দেরদের সাথে গল্পগুজব চলে। হাসিঠাট্টাও হয়। হেসেই জবাব দেয় আকবর, ‘আদার ব্যাপারিরে হোনাইলেন ভাই জাহাজের খবর! মুক্তিবাহিনীর বড় বড় কমান্ডার রইছে, আপনাগো দলের নেতা-মন্ত্রী রইছে, তেনাগো মাঝে খাড়াইয়া পানের দোকানদার আকবরে দিব ভাষণ!‘

মাইকে নিজের কল্পিত ভাষণ শুনে আকবরের হাসিটা প্রসারিত হলে মোবারক শাহ বিরক্ত হয়ে জানায়, ‘আহা, ভাষণ দিবি ক্যা! তুই খালি তোর জয় বাংলা গল্পটা কইবি। হোন, গলা নামিয়ে মোবারক শাহ আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর শোনায়। আকবরকে নিয়ে শহরে নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তার। আকবরের গল্পটাও বলেছে। রাজি হয়েছে নেতারা। এখন আকবর অনুষ্ঠানে গেলে বিশেষ সম্মান পাবে। টেলিভিশনেও দেখাবে সেই অনুষ্ঠানের খবর। তাছাড়া টিভিতে মুক্তিযোদ্ধা আকবরের একটা সাক্ষাৎকার প্রচারেরও ব্যবস্থা হবে।

আশাতীত প্রাপ্তির সুখবর শুনিয়ে আকবরের বিহ্বল অবস্থা উপভোগ করতে চেয়েছিল মোবারক শাহ। কিন্তু আকবরকে গম্ভীর হয়ে যেতে দেখে সে কিছুটা হতাশা বোধ করে এবং জানায়, ‘আমাদের দল যদি তোর মতো মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান না দেয়, তয় আর কে দিব? খ দল ক্ষমতায় থাকার সময় মুক্তিযুদ্ধের আসল ইতিহাস চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তোর মতো মুক্তিযোদ্ধার খবর লয় নাই, সম্মান দেয়  নাই কখনও। নাকি দিছে?’

স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে আকবরের মাথা নড়ে। কিন্তু মন দোলে উভয়-সংকটে। প্রথমত, প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ করার সাহস বা যুক্তি খুঁজে পায় না সে। অন্যদিকে ক দলের দেওয়া বিশেষ সম্মান গ্রহণ করতেও মনে জাগে দ্বিধা ভয়। সে তাই মোবারক শাহকে নীরবে এক খিলি পান এগিয়ে দেয়। গোল্ডলিফ সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে বলে, ‘লন ভাই, আমার একটা সিগ্রেট খান আইজ।’

খুশি হয় মোবারক শাহ। পানের পিক ফেলে বলে, ‘তাইলে প্রোগ্রাম ফাইনাল হইল। কাইল সকালে আমাগো লগে বাসে যাবি মিটিঙে। রেডি থাকিস।’

আকবরের মুখের কথা ও হাসি যেন মোবারকের পা জড়িয়ে ধরে ‘ও ভাই, আপনি নিজে আইসা কইলেন, দাওয়াত দিলেন, এটাই আমার জন্য বেশি। পথ খরচা দিয়া আমারে নেওন লাগব না। আমি নিজে কাইল টাউনে যামু। দোকানের কিছু মালপত্র কেনার কামও আছে।’

‘ঠিক আছে, তয় রাইতে একবার পার্টি অফিসে, না হয় বাড়িতে আমার লগে দেখা করিস, অনুষ্ঠানের আগে গল্পটা তোরে একবার রিহার্সেল দিতে হইব।’

সামান্য পান-দোকানি আকবরের কাছে মোবারক শাহের আসার মধ্যে অবশ্য গোপনীয়তা কিংবা অস্বাভাবিকতা কিছু ছিল না। কেননা মুক্তহাটের বহু মান্যগণ্য লোক পান-সিগ্রেট খেতে তার দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়। ক, খ, এমনকি গ দলের নেতা-মস্তান-সমর্থক, মুক্তহাট-বাজারের লাখপতি মহাজন, শহর থেকে আসা অচেনা ভদ্রলোক সবাই তার দোকানের নগদ কিংবা বাকির কাস্টমার। এ রকম নামিদামি খদ্দেরের জন্য একমাত্র আকবরের দোকানে গোল্ডলিফ থেকে বিদেশি বেনসন সিগারেট পর্যন্ত মজুদ থাকে। কাজেই দোকানে বসে মোবারক শাহের দেখা পাওয়াটা আকবরের জন্য তেমন সৌভাগ্যের বিষয় নয়। কিন্তু মোবারকের আমন্ত্রণ হাটে হাঁড়ি ভাঙার আগেই তার মধ্যে বিষম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

দেহ-মনের বিশেষ অবস্থায় মানুষ যেমন দিনের বেলাতেও চোখে জোনাকি পোকা জ¦লতে দেখে, আকবরও তেমনি একটি জ¦লন্ত মশাল দেখতে পায়। মশালটি যেন যেন তার দিকে ছুটে আসে। মাইকে বজ্রকণ্ঠে শেখ মুজিবের ভাষণ বাজে, গুলির শব্দ হয়। এবং জয় বাংলা চিৎকারে নিজেই নিজের মৃত্যু-ঘোষণার দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় অবাক হয়ে দেখে আকবর। এসব স্মৃতি কল্পনার বিভ্রম মনে শুধু অদ্ভুত পুলক জাগায় না, দোকান থেকে ছিটকে পড়ার ভয়ও জাগে। মোবারকের প্রস্তাব শুনে মনে ভয়টা উঁকি দিয়েছিল বলে তার আমন্ত্রণ গ্রহণের ব্যাপারে খুব সতর্ক ছিল আকবর। নিজের সিদ্ধান্ত জানানোর সময় কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। কৌশলটি হলো, কাল সে শহরে যাবে ঠিক, কিন্তু লাভের বদলে ক্ষতির আশঙ্কা দেখলে ক দলের পরিচিত কাউকে, এমনকি অনুষ্ঠানের জায়গাটাও কিছুতে খুঁজে পাবে না। ফলে ক দলের টেলিভিশনে দেখানো অনুষ্ঠানে আকবর  যাক আর নাই যাক, মোবারক শাহ ও তার দলবলের সাথে সুসম্পর্ক বজায় থাকবে ষোলো আনা। এ রকম চিন্তাভাবনা থেকে সে তাকে পান এবং দু’টাকা দামের একটা সিগারেট মাগনা খেতে দিয়েছে। মোবারক শাহের মতো পলিটিশিয়ান আকবরের গোপন কৌশল বুঝতে পারেনি বলে সে আশ্বস্ত বোধ করে।

দোকানের সামনে রিকশা দাঁড় করিয়ে বিড়ি কিনতে এসে এক রিকশাওয়ালা মন্তব্য করে, ‘একা একা হাসতাছ মনে হয়। আছ আরামে আকবর ভাই।  রিকশা ছাইড়া অহন মহাজনের মতো দিনরাইত গদিতে বইসা থাক।’

মুক্তহাটে মানুষের প্রশংসার আড়ালেও মতলব থাকে। আগাম প্রতিরোধ সৃষ্টি করে আকবর, ‘বাকি-বকেয়া দিয়া হোগা মারা দিছি। অহন আরাম কইরা না বইয়া হোগার জ¦লনি থামাই কেমনে কও।’

রিকশাওয়ালাটি যে বাকি নিতে আসেনি, সেটা বোঝাতে আধুলি ছুড়ে দিয়ে বিড়ি চায়। দোকানে নজর বুলিয়ে পরামর্শ দেয়, ‘দোকানটা এবার বাড়াও। আরও মনোহারি মালছামানা ভরো। এমুন সোন্দর জায়গায় দোকান না চললে  মুক্তহাটে আর কোন হালায় ব্যবসা করব?’

এক কালের সহকর্মীর সম্ভাব্য শুভকামনা নয়, প্রচ্ছন্ন ঈর্ষাটাও টের পায় আকবর। শুরু করেছিল রাস্তায়, ছোট্ট এক বাক্স-দোকান দিয়ে। মুক্তহাটে জায়গার দাম গাঁয়ের ফসলি জমির চেয়ে দশগুণ বেশি। সকল বিষয়সম্পত্তি বেচেও হাটে দোকান দেওয়ার মতো এক শতাংশ জায়গা কেনার মুরোদ নেই আকবরের। আর সেই কিনা বাজারের একদম কেন্দ্রস্থলে, সবচেয়ে ভিড়মুখর চায়ের দোকান পলাশ রেস্টুরেন্টের মুখে  নিজস্ব দোকানে বসে দিনমান নগদ-বাকির পয়সা গোনে। মানুষের চোখ তো টাটাবেই। মুক্তহাটে লাখপতি মহাজনদের নানারকম ব্যবসায় এবং স্থায়ী দোকানপাটের পাশে আকবরের পানের দোকান বেশ ছোট, তুচ্ছই বলা যায়। ৪ ফুট বাই ৫ ফুট আয়তনের ছোট টিনের খোপ। নিচে নিজস্ব মাটি নেই। কাঠের পাটাতনের নিচে চারটি পায়া, পেছনের পা দুটিসহ দোকানের বেশি অর্ধেক শরীর পলাশ রেস্টুরেন্টের জায়গায়, আর সামনের পায়া এবং দোকানের মুখ পড়েছে বাজারে চলাচলের রাস্তায়।

নামে পানের দোকান হলেও, পান-বিড়ি-সিগ্রেট ছাড়াও, পেছনের তাকে আকবর কিছু মনোহারি মালপত্র উঠিয়েছে। সাবান, স্নো,পাউডার, আয়না, চিরুনি, চান্দা ব্যাটারি, সেলাই সুতো, ইন্ডিয়ান জবা কুসুম তেল, সুপার ব্লেড ইত্যাদি। অল্প পুঁজির সামান্য টুকিটাকি মালপত্র। তুচ্ছ পানদোকানির এইটুকু উন্নতি দেখে বাজারের ছোটখাটো ব্যবসায়ীর যেন সহ্য হয় না। বড়রাও মাঝে মাঝে শ্যেন দৃষ্টিতে আকবরের পানের দোকানে তাকায়। তাদের তাকানো এবং চোরাগোপ্তা কথা এমন, যেন তাদের ঘরের মেয়ের সাথে প্রকাশ্যে অবৈধ কাজে লিপ্ত হয়েছে আকবর। পারলে  এক্ষুনি তাকে উচ্ছেদ করে। বেচাবিক্রি বেশি দেখেও হিংসুটেদের এমন মনোবাঞ্ছা যদি নাও জাগে, দোকানের পায়ের নিচে মাটি না থাকায় উচ্ছেদের ভয়টা আপনা থেকে আসে আকবরের মনে। ভয়টা আছে বলেই মুক্তহাটের সব দল, মোড়ল ও মস্তানকে আকবর খাতির করে চলে। সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চায়। ঘরের মানুষটির মতো পান বানিয়ে দেয় সযত্নে। ফাও হাসি ও কথা দিয়ে খদ্দেরের মনোরঞ্জনের চেষ্টাও করে। এমন কৌশল করে চলতে শিখেছে বলে সাইনবোর্ড ছাড়াই আকবরের পানের দোকান এখন মুক্তহাটের অবিচ্ছেদ্য উপাদান।

তবে ক দলের কাছে পুরোপুরি ধরা না দেওয়ার কৌশলটি যে তেমন লাগসই হয়নি, বুঝতে দেরি হয় না আকবরের। বিকেলে দলের দুই মস্তান তার দোকানে আসে। একজন স্থানীয় কলেজের ছাত্রনেতা মাখন, অন্যজন মোবারক শাহের বেশ ঘনিষ্ঠ, নাম শাহজাহান। দুজনই আজ হাসিমুখে বিশেষ খাতির দেখিয়ে আকবরের সঙ্গে কথা বলে।

‘তুমি যে এতবড় মুক্তিযোদ্ধা, তা তো জানতাম না আকবর ভাই। যাউক, আমরা যখন জাইনা গেছি, অহন মুক্তহাটের বেবাক মানুষ জানব।’

‘বাজারের বেবাক টিভিতে, কারেন্টওলা বাড়ির সব টিভিতে মানুষ ভিড় কইরা দেখব তোমারে। এই যে, এরপর এই দোকানেও মানুষ তোমারে লাইন ধইরা দেখতে আইব, কইয়া রাখলাম কথাটা।’

্বয়সে ছোট হলেও হাটের সব মস্তানকে ভাই, চাচা কিংবা ওস্তাদ ডাকে আকবর। যুবক দুটির একজনকে ভাই ও অন্যজনকে ভাতিজা ডাকত। এখন দুজনকে ওস্তাদ সম্বোধন করে বলে, ‘ঠাট্টা কইরেন না তো ওস্তাদ। সারাদিন বাজারে পানের খিলি বাঁইধাও সংসার চলে না। ঐ সব টিভি-সিনেমার হিরু হওনের হাউস নাই, টাইমও নাই আমার।’

‘তার মানে! মোবারক ভাইয়ের লগে কথা ফাইনাল হয় নাই তোমার? টাউনে যাইবা না কাইলকা আমাগো অনুষ্ঠানে?’

‘যামু না Ñ তা তো কই নাই। হাজার হউক, ঐ মশাল আমাগো মুক্তিযুদ্ধের। সব মুক্তিযোদ্ধারই যাওয়া উচিত।’

‘এই তো খাঁটি মুক্তিযোদ্ধার মতো কথা কইছো। শোনো আকবর ভাই, একাত্তরে আমরা তোমার সেই ত্যাজ দেহি নাই। এইবার দেখতে চাই। অনুষ্ঠানে তোমার জয় বাংলা হুইনা ওই হালাগো ধানের শীষের বেবাক ধান যেন পাতান হইয়া ঝইরা পড়ে, লাঙলের ফাল খুইলা যায়। ঠিক আছে?’

ভেতরের ভয় আড়াল করার জন্য ওদের হাসিতে যোগ না দিয়ে উপায় থাকে না আকবরের। পান খেয়ে মাখন বাকিতে আবারও পাঁচটা বেনসন নেয়। রাতে আবার দেখা হবে বলে চায়ের দোকানে গিয়ে ঢোকে।

ক দলের অনুষ্ঠানে যাওয়া কিংবা না-যাওয়ার বিষয়টি গোপন রাখার কৌশল ব্যর্থ হওয়ার কারণে আকবরের উদ্বেগ-ভয় নিজের কাছে পষ্ট হয়ে ওঠে। টেলিভিশনের পর্দায় নিজেকে আবিষ্কারের আগ্রহ কিংবা আনন্দ সে নিজের ভিতরে খুঁজে পায় না। বরং নিঃশব্দে স্বগতোক্তি করে, কী যে গ্যাঁড়াকলে পড়লাম! জিভে টকাস টঙ্কার তুলে বিরক্তিও প্রকাশ করে সে। তার এ রকম খারাপ লাগার দ্বিতীয় কারণটি অবশ্য পুরনো।

মুক্তহাটের যে কোনো দলের ছাত্র-মস্তানরা দোকানে এলে মন খারাপ হয়ে যায় আকবরের। এরা বাকি সিগ্রেট চাইলে না করা যায় না। এদের বাকির উৎপাত ঠেকাতে দোকানের ভিতরে বাঁধানো দোয়ার মতো ছোট সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে আকবরÑ বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন না। লিখিত অনুরোধ ছাড়া মুখেও নানারকম কৈফিয়ত অজুহাত দেখায়। কিন্তু বাকি চাইতে এবং বাকির পয়সা সময়মতো শোধ না করার জন্য ওদের তবু লজ্জা হয় না। উল্টা ধমক দেয়। তখন বাকি দিতে দ্বিধা করার কারণে নিজেই লজ্জা পায় আকবর। এখন নতুন কৌশল শিখেছে সে। বাকির খদ্দের দেখলে দামি সিগারেটের প্যাকেটগুলো ভেতরে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু মাখনকে দেখে সিগারেটের প্যাকেট লুকাতে ভুলে গিয়েছিল আকবর। মন খারাপ করে দিয়ে ওরা চলে যাওয়ার পর সে তাই বাকির হিসাব মেলাতে থাকে।

আকবর হিসাবের মূল খাতাটি লুকিয়ে রাখে একদম মাথার ভিতরে। নিজে সে বকলম। কাগজ-কলমের ব্যবহার জানে না বলে স্মৃতিকে কাগজ করে মগজকে কলম বানিয়ে নিজের মতো করে হিসাব লিখে রাখে। লিখে রাখে না বলে, খোদাই করে রাখে বলাই ভালো। কারণ কাগজের লেখা মুছে যেতে পারে, কিন্তু স্মৃতির পাতায় লেখা পাওনা টাকা হিসাব আমরণ মনে থাকবে বলে আকবরের বিশ^াস।

গোপন হিসাবের খাতা মেলে আকবর দেখল, মাখন ছাড়া ক দলের বিভিন্ন নেতা-মস্তানের কাছে বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২৯ টাকা পঞ্চাশ পয়সা। অনেক কৌশল খাটিয়ে বাকির অঙ্কটা তেমন কমাতে পারেনি আকবর। কিন্তু মোবারক শাহ বলে দিলে তার দলের ছেলেরা অন্তত বিদেশি সিগারেটের নেশা না ছাড়ুক, গরিব আকবরের ওপর জুলুম করতে  সাহস পাবে না। বকেয়া পাওনা আদায় সহজ হবে। থানার দারোগা ও সরকারি অফিসাররা পর্যন্ত মোবারক  শাহকে এখন সমঝে চলে। লোকটা পক্ষে থাকলে মুক্তহাট-বাজার  থেকে উচ্ছেদ হওয়ার ভয়টাও কমে যাবে, মুক্তিযোদ্ধা আকবরকে মুক্তহাটের লোকজন নতুন করে চিনবে আবার।

লাভের দিকটা ভেবে আকবর বেশ চাঙ্গা বোধ করে। মন-খারাপ-বোধ কেটে যায় অনেকখানি। সেই মশালটা আবার দেখতে পায় সে। তার সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে দিতে মশালটা যেন তার ভিতরে দপদপ করে জ¦লে। মশালের উত্তাপ সাহস বাড়ায়। একাত্তরের মৃত্যুঞ্জয়ী মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টা বড় হয়ে উঠতে চায়। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় আকবর, যা থাকে কপালে, যাবে সে। কিন্তু …

আকবরের মনে কিন্তু জাগানিয়া কারণটি সন্ধ্যাবেলা মূর্র্তিমান রূপ পায় পলাশ রেস্টুরেন্টে। এ সময় বাজার জমে ওঠে। আকবরের দোকানেও খদ্দেরের চাপ বাড়ে। চায়ের দোকান থেকে নেওয়া কানেকশনের বাল্বটা জে¦লে দিয়ে আকবর একজন খদ্দেরকে দুই রঙের লাক্স সাবান দেখিয়ে গুণাগুণ ব্যাখ্যাা করছিল। এ সময় রেস্টুরেন্টের মেচিয়ার জাফর এসে অর্ডার দেয়, ‘পাঁচটা পান, দুই সাদা, তিন জর্দা, দশটা লিফ। জলদি বানা, কুইক।’

টি-স্টলের এ বয়টির ওপর আকবর এমনিতে মহা খাপ্পা, টেবিলে টেবিলে ঘুরে খদ্দেরদের অর্ডার সে  অহেতুক চেঁচিয়ে, গলা বিকৃত করে বাবুর্চিকে জানিয়ে দেয়Ñ ছে কাপ, দো রঙ, লেকার কড়া, কুইক ইত্যাদি।  দোকানে বসেও তার গলা শুনতে পায় আকবর। এছাড়া টেবিলে পানির গেলাশ আছড়ে রাখার আওয়াজ। আড্ডাবাজ খদ্দেরদের পান-সিগারেটের অর্ডার নিয়ে জাফর যখন পানের দোকানে আসে, আকবর যেন তার ভৃত্য, এমন ব্যবহার করে।

আকবর পাল্টা ধমক দেয়, ‘পয়সা আন হারামজাদা।’

‘আগে পান বানাও, সিগারেট লও, জলদি, কুইক।’

‘যা ভাগ হালার পো। সাঁঝবেলা আমি বাকি দেই না, জানস না?।’

জাফর নিঃশব্দে ভিতরে যায় এবং তৎক্ষণাৎ ফিরে আসে। কণ্ঠ দ্বিগুণ বিকৃত করে হুকুম শোনায়, ‘ডাক পাড়ে। জলদি আও।’

কে ডাকে কেন ডাকে ভাবার আগেই বুকে ভূমিকম্প শুরু হয় আকবরের। দোকান খোলা রেখে টি-স্টলের ভিতরে উঁকি দেয় সে। চেয়ার খালি নেই একটাও। টিভি চলছে। তবে রেস্টুরেন্টের আড্ডাবাজ লোকদের অনেকেরই মনোযোগ এখন কোণের টেবিলটার দিকে। সেখানে খ দলের দুজন মস্তান কর্মী নিয়ে বসে আছে স্বয়ং জামান ভূঁইয়া। কখন তারা চায়ের দোকানে এসেছে, আকবর টেরও পায়নি। যার ডাক শুনে আকবরের বুকে ভূমিকম্প শুরু হয়েছিল, তাকে দেখে আনুগত্য প্রকাশের বিনীত হাসিতে গলে যায় সে। এটা শুধু কৌশল নয়, জামান ভূঁইয়ার সাথে তার সম্পর্কজাত অভ্যাস।

‘কী রে আকবোর। জাফর তোরে পান-সিগ্রেটের কথা কয় নাই?’

‘ঐ নফরের বাচ্চা তো আপনার কথা কয় নাই। আমি পান-সিগারেট লইয়া আইতাছি অহনই।’

মিনিটখানেক পর, আকবরের বানানো পান মুখে নেওয়ার আগে সরাসরি জিজ্ঞেস করে জামান ভূঁইয়া, ‘হুনলাম ক দলের মশাল অনুষ্ঠানে তুইও যাবি। আবার নাকি টিভিতেও তোরে দেখানোর ব্যবস্থা  করছে হ্যারা।’

মোবারক শাহের আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্তটি নিতে না নিতেই খোদ জামান ভূঁইয়ার কাছে এভাবে ধরা খাবে, ভাবতে পারেনি আকবর। ধরা পড়েও সিদ্ধান্তটি সে বজায় রাখার চেষ্টা করে।

‘মোবারক শাহকে হ্যার লাইগা তো জিগাইলাম, আপনাগো দলে বড় বড় মুক্তিযোদ্ধা, নেতা-মন্ত্রী থাকতে আমারে ডাকেন ক্যান? তা হ্যায় কইল যে এটা সব মুক্তিযোদ্ধাদের অনুষ্ঠান।’

‘মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধারা কি হ্যার দলের বাবার পাট্টা করা সম্পত্তি? আমাগো দলের নেতা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আছিল না? স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় নাই? আমাগো দলেও মুক্তিযোদ্ধার অভাব নাই। তাদের কারও ডাকল না, কিন্তু তোরে দিয়া জয়বাংলা কওয়াইতে চায়। ব্যাপারটা কী রে আকবোর?’

‘কী জানি তাগো কী মতলব? তয় আমি যাওয়ার কথা পষ্ট কইরা কিছু কই নাই।’

জামান ভূঁইয়া আশপাশ টেবিলের দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করে, ‘যাবি না ক্যান, জয়বাংলা কইয়া তোর লাভ হইলে নিশ্চয় যাবি। তয় টাউনে গেলে আমার লগে দেখা কইরা যাস।’

মাথা নেড়ে স্টলের খদ্দেরদের ওপর নজর বুলিয়ে আকবর তার দোকানে ফিরে আসে এবং দীর্ঘশ^াস ছাড়ে একটা। পলাশ রেস্টুরেন্টসহ আশপাশের বেশ কয়েকটা দোকান-বাসা জামান ভূঁইয়ার মাটিতে দাঁড়ানো।  মুক্তহাটে তার দাপট বেশি। তার দয়াতে আকবর এখানে দোকান দিতে পেরেছে। কাজেই লাভ-ক্ষতির হিসাবে ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে যাওয়ার বিপদ অনেক। মুখে সে যাই বলুক, মোবারকের অনুষ্ঠানে গেলে আকবরকে বরাবর সন্দেহের চোখে দেখবে তার খ দল। আবার কথা দিয়েও শেষ পর্যন্ত যদি সে ঐ অনুষ্ঠানে না যায়, মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টা প্রতিষ্ঠা পাবে না আর। মুক্তহাটের সবাই তাকে ভূঁইয়ার চামচা কিংবা খ দলের দালাল হিসেবে চিনবে। টেলিভিশনে নিজের পুরনো পরিচয়টা সকলকে দেখানো দূরের কথা, নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাবতে পারবে না কখনও। সবচেয়ে বড় কথা, সুযোগ পেলেই মোবারক শাহের দলবল তার বিরুদ্ধে যাবে। এই অবস্থায় আকবর এখন কোন দিকে যায়? কী করে? 

কোনো সিদ্ধান্তে আসতে না পেরে অন্যদিনের চেয়ে আজ তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে আকবর। বাড়িতে ফিরে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবে।

বাজারের বিজলি আলো, ভিড়, হৈ-হুল্লোড় পেরিয়ে গাঁয়ে ফেরার নিরিবিলি পথে নামতেই, আদিগন্ত অন্ধকারে আবার মশালটাকে জ¦লতে দেখে আকবর। ছোটবেলা চড়কের বিলে ভূতের আগুন দেখে গা ছমছম করা ভয়ে আচ্ছন্ন হতো। মশালটা জ¦লতে দেখেও শরীরে অদ্ভুত এক শিহরণ জাগে তার। লাভ-ক্ষতির প্রশ্ন তুলে জামান ভূঁইয়া মশাল-জ¦লা অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও মশালটা ভিতরে দপদপিয়ে জ¦লে কেন? লাভ-ক্ষতির হিসাব তুচ্ছ করে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টাকে বড় করে তোলার জন্য? মশালটার কথা শুনলে, কল্পনায় দেখতে পেলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মনে ভাস্বর হয়ে উঠতে চায়। তখন অস্তিত্ব মন্থন করে কী এক অপ্রতিরোধ্য আবেগ বুকে তোলপাড় করে।

এই তপ্ত আবেগটাকে চেনে আকবর। ষোলো বছর বয়সী এক কিশোরকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এই আবেগ। চারদিকে মৃত্যুর ফাঁদ বসানো অন্ধকার পেরিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল সে একাত্তরে। গন্তব্য শুধু জানত স্বাধীনতা। পাওয়া না-পাওয়া এবং লাভ-ক্ষতির হিসাব  মেলায়নি। তার লেখাপড়া না-জানা অজ্ঞতা, তার অল্প বয়স, তার পারিবারিক দারিদ্র্যÑ কোনো বাধাই সে মানেনি। আবেগটাকে পুঁজি করে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছিল আকবর। এ্ আবেগের ওপর ভর করে অস্ত্র হাতে একের পর এক অপারেশনে শরিক হয়েছে। নভেম্বর মাসে ভুরুঙ্গামারি অপারেশনে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে নিশ্চিত মরণের মুখে এই আবেগের উন্মাদনায় চেঁচিয়ে বলেছিল Ñ জয় বাংলা।

দেশ স্বাধীন করে গ্রামে ফিরে এলে কম বয়সী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তহাটে আকবরের খ্যাতি এবং খাতির দুটাই বেড়ে গিয়েছিল। সদ্যসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের গল্পগাথার মধ্যে পাকবাহিনীর হাতে আকবরের ধরা পড়া এবং বেঁচে যাওয়ার আশ্চর্য গল্পটাই ছিল বেশি আলোচিত, সবার মুখে মুখে ঘুরেছে। গল্পটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আকবরকে দেখলেই হেসে বলত সবাই, জয় বাংলা।

এখন মুক্তহাটের বয়স্ক লোকজনও আকবরের সেই পরিচয়টা যেন ভুলে গেছে। বাঙালি ভুলোজাত, আকবরও যেন ভুলে গেছে অতীত একাত্তর। অল্পবয়সী যুবক মস্তানরা জানে না। জানবার কথাও নয়। আকবর দীর্ঘশ^াস ফেলে।

হাটবাজার ভেঙে যাওয়ার পর আকবর যখন ঘরে ফেরে, স্ত্রী-কন্যা জেগে থাকে তখনও। বড় মেয়ে কোহিনুর হাই স্কুলের ছাত্রী। আকবর ফিরে না আসা পর্যন্ত বিছানায় হারিকেন নিয়ে লেখাপড়া করে। রাতে ঘরে ফিরে আকবর সারা দিনে বেচা বিক্রি ও বাকির হিসাব মেয়েকে দেয়। যেন মেয়েই তার মহাজন। কোহিনুর একটি খাতায় লিখে রাখে। ইচ্ছে করলে দোকানে বসেও বাজারের শিক্ষিত কাস্টমার কিংবা বেকার কাউকে দিয়ে খাতায় হিসাব টুকে রাখার কাজটি সারতে পারে আকবর। কিন্তু ব্যবসায়ের গোপন হিসাবকে দলিলি রূপ দেওয়ার ব্যাপারে ক্লাস সেভেনে পড়া মেয়েকে যতটা বিশ^াস করে সে, মুক্তহাটের সেরা শিক্ষিত এমএ পাস লোককেও ততটা বিশ^াস করে না। অনাত্মীয় শিক্ষিতরা ছয়কে নয় করবে না, তার গ্যারান্টি কী? মেয়ে কোহিনুরও লেখাপড়ার একঘেয়েমির মাঝে বাবার খাতা লেখার কাজটিতে অন্য রকম মজা পায়। খাতার মধ্যে ভেসে ওঠে চেনা-অচেনা অনেক পুরুষ কাস্টমারের মুখ। এর মধ্যে স্কুলে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে যেতে হিরুকে প্রায়ই দেখতে পায় কোহিনূর। হিরু মস্তানকে দেখলে বুক কাঁপে। কিন্তু হিরু জানে না যে সে প্রতিদিন কোহিনুরের খাতায় ধরা পড়ে। প্রতিদিন কয়টা সিগারেট খায় সে, কোহিনুর জানে। খাতা খুলে মাঝে মধ্যে হিরুর মুখের সিগারেটের গন্ধ পর্যন্ত পায় কোহিনুর।

হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসে আকবর আজ অন্য দিনের মতো স্ত্রী-কন্যাকে বাজার কিংবা ব্যবসায়ের গল্প শোনায় না। মশালের আলোয় তখনও উদ্দীপ্ত সে। মেয়েকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোর বাপ যে একজন জবর মুক্তিযোদ্ধা, এই কথাটা কি তুই জানস মা?’

‘হ জানি। মায়ে কইছে। মুক্তিযোদ্ধা হইয়া দ্যাশ স্বাধীন কইরা লাভ কী হইছে তোমার? মাইনষে আমারে অহনো কয় রিকশাওয়ালার মাইয়া। পানের দোকানদারের মাইয়া কইয়াও অপমান করে।’

মেয়ের কণ্ঠেও লাভ-ক্ষতির প্রশ্ন শুনে আকবরের রাতের খাওয়া থমকে যায়। মৃত্যুর আগে দরিদ্র কৃষক পিতাও একদিন তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টিকে তাচ্ছিল্য করে বলেছিল, ‘যুদ্ধ কইরা আমার বাল ঝকঝকা করছস। শেখ মুজিব তো মুক্তিবাহিনীরে কিছু না দিয়াই গুলি খাইয়া মরল, তার চাইতে তুই গুলি খাইয়া মরলেও আমার সংসারের একটা আপদ কমত।’ আপদ কমাতে বিয়ের পরই আকবরকে পৃথক করে দিয়েছিল বাবা। তখন পরের ক্ষেতে কামলা খাটার অনিশ্চিত আয়ের ওপর নির্ভর করে আকবর নিজের সংসার চালাতে পারত না বলে রিকশা চালাতে শুরু করেছিল। পানের দোকানদার হয়েও রিকশাওয়ালা পরিচয়টা মুছে যায়নি এখনও। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে টিভিতে নিজেকে দেখাতে পারলে কি পানের দোকানদার পরিচয় মুছে যাবে?

খাওয়ার পর স্ত্রী পান এগিয়ে দেয়। সারাদিন দোকানে খিলি পান বাঁধার যে ক্লান্তি, স্ত্রীর হাতে বানানো পানটি খেয়ে তার অনেকটা যেন কমে যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিবারের মতামত নেওয়ার জন্য আকবর হেসে সুখবরটি জানায়, ‘মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমার নাম-ধাম তো তোরা জানস না, এবার জানবি। সরকার আমারে কীরকম দাম দেয়, এবার টেলিভিশনে আমারেও দেখাইব।’

আকবরের স্ত্রী খোঁচা দেয়, ‘ভূতে ধরলনি আপনারে? কীয়ের প্যাঁচাল পারেন?’

মুক্তিযুদ্ধের জিনিসটি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে হাতে দেশময় জ¦লে ওঠার খবর, মোবারক শাহের আমন্ত্রণ, বাজারের আগাম প্রতিক্রিয়া, জামান ভূঁইয়ার হুমকি সব কিছুই  স্ত্রী-কন্যার কাছে ব্যক্ত করে আকবর।

কোহিনূর টিভি দেখার শখ মেটাতে পড়শি মাস্টারের বাড়িতে যায় প্রায়ই। গাঁয়ের লোকদের ভিড়ে যোগ দিয়ে সিনেমা ছায়াছন্দ দেখে। সেই প্রথম উচ্ছ্বসিত হয়ে জানতে চায়, ‘হাচাই তোমারে টিভিতে দেখাইব বাবা!’

‘অনুষ্ঠানে গিয়া সেই গল্পটা কইলে দেখাইতে পারে।’

‘কোন গল্প কইবা? কীভাবে কইবা? একটু কও না হুনি।’

মোবারক শাহের কাছে গিয়ে এখন যে রিহার্সেল  দেওয়ার কথা, তা মেয়ের কাছে শুরু করে আকবর।

মুক্তিযুদ্ধের টাইমে আমার বয়স ছিল বড় জোর ১৪/১৫। গালে তখনও জগাই নাইপতার খুর-ব্লেড পড়ে নাই। লেখাপড়া শিখি নাই। কিন্তু একাত্তরে দেশে গণ্ডগোল শুরু হইলে, আমিও গ্রামের কয়জনের সাথে পলায় গেলাম ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়া যাইয়া ট্রেনিং লাইলাম। ট্রেনিং দিয়া  হাতে রাইফেল পাইলাম। পিন্দনে এক হাফ প্যান্ট, গায়ে লাল জামাÑ ক্যাম্প থাইকা পাইছিলাম। কাটাখালি অপারেশনে এই পোশাক আছিল আমার। কোমরে বাঁধা দুইটা গ্রেনেড, আর হাতে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল। রাইতের আঁধারে মিইশা আমরা পাকবাহিনীর ক্যাম্পের বগলে গিয়া, ডোবা এক ধানক্ষেতে পজিশন নিলাম। তারপর ফায়ারিং যখন শুরু হইল, ভিমরুলের চাকে বুঝি ঢিল পড়ল। তারপর কী আর কমু তোরে…

কোহিনূর যেন টিভি পর্দায় পিতার মুখ দেখে। তার পরিচিত কণ্ঠ শুনতে শুনতে ছবিও পষ্ট দেখতে পায়। রাইফেল নিয়ে একটা ডোবা খালের মধ্যে উবু হয়ে শুয়ে আছে মুক্তিবাহিনী। গুলি ছুড়ছে। উল্টাদিক থেকে পাকবাহিনীর গোলাগুলি ঝাঁক ঝাঁক বোলতা মৌমাছির মতো মুক্তিবাহিনীর মাথার ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। মাথা তুললেই মরণ। এভাবে, অনেকক্ষণ গুলি বিনিময়ের পর, মুক্তিযোদ্ধারা সবাই ডোবায় গড়িয়ে গড়িয়ে পিছু হটে যেতে থাকে। কিন্তু আকবর কমান্ডারের ইশারা বোঝেনি। সমানে সে রাইফেল থেকে গুলি ছুড়ে যাচ্ছে। তারপর আকবরের যখন গুলি শেষ হয়ে এলো, তখন রাত কেটে ভোরের আলো ফুটেছে। মাথা তুলে সহযোদ্ধাদের খুঁজতে গিয়ে দেখে, ডোবার ধারে, মাত্র দশ গজ দূরে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে পাকবাহিনী। হাতের মেশিনগান আকবরের দিকে তাক করানো। শত্রুর হাতে ধরা পড়ার বদলে, শত্রুর গুলি খেয়ে তাড়াতাড়ি মরার জন্যই বুঝি বা, রাইফেল ফেলে দিয়ে আকবর হাত ওপরে তোলে। তারপর চোখ বুজে আকবর থরথরিয়ে কাঁপে আর মরার আগে আল্লাহ-খোদাকে স্মরণ করে।

ধরা পড়ার পর বাবার প্রাণ বাঁচানোর গল্পটাও জানে কোহিনূর। তাই বাকিটা শোনার আগে পরামর্শ দেয়, ‘এই গল্প হুইনা কেউই তোমারে জবর মুক্তিযোদ্ধা কইব না বাবা। মানষে ভাবব, তুমি একখান ভ্যাদাইমা পোলা আছিলা। কোমরের গ্রেনেডও তো ছুইড়া মারতে পারো নাই। তার চাইতে টিভিতে কইও, ধরা পইড়াও জবর ফাইট দিছ। লাথি দিয়া এক মিলিটারির অস্ত্র কাইড়া নিছ, সেই অস্ত্র দিয়া সাতটা মিলিটারিকে খতম কইরা পলায় গেছ।’

মেয়ের দিকে তাকিয়ে গল্প বলার উৎসাহ কমে আসে আকবরের। মিথ্যে কথা বলে বীর সে হতে চায় না। তবে সব সত্য বললেও একটি ছোট সত্য সে গোপন রাখবে। ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর মিলিটারির হাতের চড় খেয়ে প্যান্ট ভিজে গিয়েছিল তার। এ লজ্জা গোপন করলে ক্ষতি কি?

আকবরের স্ত্রী স্বামীর বর্তমান সংকটটি যেন এতক্ষণে বুঝতে পারে। জিজ্ঞেস করে, ‘মোবারক শাহের দলে গিয়া জয় বাংলা কইলে জামান ভূঁইয়া চেতব না?’

দীর্ঘশ^াস ছেড়ে সিদ্ধান্ত জানায়, ‘শাহ-আর ভূঁইয়া কোনো হালার দলে যাওয়ার দরকার নাই আমার। ক-খ দলের পলিটিক্স দিয়া লাভ কী আমার?’

তার চেয়ে এক কাজ করবে আকবর। তার ছোট বোনজামাই আর্মিতে চাকরি করে। আছে ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্টে। ব্যবসা করার জন্য আকবরকে কিছু পুঁজি জোগান দেওয়ার আশ^াস দিয়েছিল। অনেক দিন ধরে তার কাছে যাব যাব করেও যাওয়া হচ্ছে না। কাল ভোরে টাঙ্গাইলে যাওয়ার বাস ধরবে আকবর। বোনজামাই টাকা দিলে দোকানটা বড় করবে আকবর। নানারকম মালপত্র কিনে দোকানের নাম দেবে আকবর ভ্যারাইটি স্টোর।

মাত্র একটা দিন এবং রাত দোকান থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর, আকবর যথারীতি সকালে বাজারে যখন উপস্থিত হয়, মুক্তিযুদ্ধের জিনিসটা তখন তাদের জেলা অতিক্রম করে দেশের আরও দক্ষিণে চলে গেছে। এদিকে মুক্তহাটের চেহারা যে দিনে দিনে একটু করে বদল হয়, তার জ¦লজ্যান্ত প্রমাণ দেখে আকবর আজ স্তম্ভিত। দোকান খোলার চাবি হাতে নিয়ে সে দেখতে পায়, তার দোকানটি দোকানের জায়গায় নেই। পলাশ রেস্টুরেন্টের পেছন দিকে কাত হয়ে পড়ে আছে। দোকানের একটা পা নেই। জোড়া তালার মধ্যে একটি তালা উধাও । ভাঙা দোকানের ঝাঁপ ফাঁক করে আকবর সর্বনাশের আরও গভীর পর্যন্ত দেখতে পায়। ভিতরের দামি মালপত্র, সিগারেটের প্যাকেটগুলো উধাও। সিগারেটের খালি প্যাকেট, পান, টুকিটাকি কিছু মালপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অথচ আকবরের এত বড় একটা সর্বনাশ ঘটে যাওয়ার পরও বাজারের অবস্থা স্বাভাবিক। সকালে যারা দোকান খোলে, যথারীতি দোকান খুলে বসেছে তারা। যে যার কেনাবেচা নিয়ে ব্যস্ত। পলাশ রেস্টুরেন্টের ভিতরে চা-নাস্তা খাচ্ছে মানুষ। মেচিয়ার জাফর আগের মতো চেঁচিয়ে অর্ডার পাস করে দিচ্ছে, ‘এক ভাজি, দো পরোটা, কুইক।’

ভাঙা লুণ্ঠিত দোকানের পাশে আকবরকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একজন দুজন করে বাজারের পরিচিত লোকজন তার পেছনে এসে দাঁড়ায়। তাদের কণ্ঠে নানারকম কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা, ‘কী ও আকবর ভাই! কেমনে হইল এই দশা? চুরি হইছে, না কেউ দোকান লুট কইরা সরায় দিছে? কাইলকা কই আছিলা তুমি? টাউনের ঐ অনুষ্ঠানে যাও নাই? টিভিতে না দেখানোর কথা তোমারে?

আকবরের কানে কারও কোনো কথাই ঢোকে না। একাত্তরে শত্রুদের হাতে ধরা পরার পর, নিজের মরণাপন্ন অসহায় দশার কথা মনে পড়ে।

হাত-পা বাঁধা আবস্থায় আকবর পড়ে আছে মিলিটারি ক্যাম্পে। ওরা যে তাকে মেরে ফেলবে, ধরা পড়ার আগে থেকেই আকবর জানত। কিন্তু গুলি করে মারার আগে পাকবাহিনী তাকে নানারকম শারীরিক যন্ত্রণা দিয়েছে। উর্দুতে জিজ্ঞেস করেছে নানা কথা। আকবর উর্দু বোঝে না। তিলে তিলে যন্ত্রণা পেয়ে মরার চেয়ে বুকে শত্রুর বুলেট খেয়ে মরার জন্য প্রস্তুত সে। মৃত্যুর আগে নিজের আত্মপরিচয়টি তাই জয় বাংলা চিৎকারে জানিয়ে দেয় আকবর। ওরা উর্দুতে জিজ্ঞেস করে, নাম কি, আকবর বলে জয় বাংলা। জানতে চায়, হিন্দু না মুসলমান? আকবর চেঁচিয়ে বলে জয় বাংলা? মুক্তিফৌজ কাঁহা? আকবর চেঁচিয়ে বলে, জয় বাংলা। ওরা তার গালে চড় দিয়ে উর্দুতে খিস্তি করে, হয়তো জানতে চায়, পাকিস্তান ভাঙছ কেন, ঘর কাঁহা? যন্ত্রণায় কান্না চেপে আকবর চেঁচিয়ে বলে জয় বাংলা। ওরা মেশিন গান তাক করে ভয় দেখায়, আকবর গুলি খেয়ে এক্ষুনি  মরে যাবে জেনেও শেষবারের মতো গলা ফাটিয়ে স্লোগান দেয়Ñ জয় বাংলা। তারপর আশ্চর্য যে, ওরা তাকে গুলি করেনি। প্রচণ্ড অত্যাচার সয়েও আকবরের শরীরে প্রাণ ধুঁকপুক করে জেগে থাকে। 

পরদিন সকালে ক্যাম্প গুটিয়ে চলে যাওয়ার সময় একজন পাকসেনা আকবরের হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেয়। মাথায় স্নেহের স্পর্শ দিয়ে বলে, ‘তোমহারা জয় বাংলা জরুর মিলেগা। যাও বেটা, জলদি নিকাল যাও হিয়া সে।’ ছাড়া পেয়ে আকবর দলে ফিরে যাওয়ার জন্য দিগি¦দিক ছুটতে থাকে।

কিন্তু এখন কোথা কার কাছে পালিয়ে যাবে আকবর? লণ্ডভণ্ড দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে সে চুপচাপ। দর্শকদের নানামুখি জিজ্ঞাসা, মন্তব্য, খুশি কিংবা সহানুভূতি তাকে স্পর্শ করে না। সে তার অদৃশ্য শত্রুকে খুঁজে পেতে পেছনের ভিড়ের দিকে তাকায়, ডানে-বামে তাকায়, তারপর হঠাৎ নিজের দোকানের টিনে প্রচণ্ড বাড়ি দেয় আকবর। ঝনঝন শব্দে নিজের দোকানের অস্তিত্ব কিংবা রণডঙ্কা বাজিয়ে, উন্মত্ত চিৎকারে ফেটে পড়ে সে, ‘কোন শুয়ারের বাচ্চা আমার দোকান লুট করছে? কোন হালার পো আমারে মুক্তহাট থাইকা উচ্ছেদ কইবার চায়? সাহস থাকলে আয়, খাড়া মুক্তিযোদ্ধা আকবরের সামনে, আয় হারামজাদা….

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares