জিন ও জিনগিরি সমাচার : ওয়াসি আহমেদ

রহমত যখন এ নিয়ে প্রথম-প্রথম কথা বলত, শোনার মানুষের অভাব হতো না। হতে পারে তার বলার ধরনে রহস্যের গিঁট খোলার ভেলকি থাকত; যদিও সে জানত আর যারা শুনত তারাও বুঝত বিষয়টা নিয়ে ভেলকি দেখানো মানায় না। তবু বাজারে চায়ের দোকানে, জোড়দিঘির কোণে কদমতলায় তাসের আড্ডায় বা সন্ধ্যায় হরি সাহার আশালতা হোমিও-র সার-সার আলমারির ময়লা কাচে ঘাড়-মাথার ঘোর ঘোর নকশা ফুটিয়ে যারা কান খুলে বসত, তারা না শুনে পারত না। শুনে শুনে তাদের যেই খেয়াল হতো ঘটনাটা বানোয়াট না, তারা নিজেরা না দেখলেও রহমত প্রামাণিক যে দেখেছে এর প্রমাণ দিন দিন বাড়ছে, তখন বাধ্য হয়ে ভাবত রগরগে এই জিনের কাহিনি শুনে কী লাভ!

এমন না যে রহমত নিত্যনতুন গল্প বলত। সেই একই ঘটনা যা সে ছাড়া আর কেউ দেখেনি সেটাকেই টানাহ্যাঁচড়া করতে গিয়ে মূল ঘটনাটা সে যেভাবে প্র্রথম-প্রথম বলত তা দিনে দিনে বদলে গিয়েছিল। ডালপালা গজিয়ে কাহিনিটা নানা দিকে মোচড় তুলতে রহমত নিজেই ধরতে পারত না কোনটা তার, কোনটা অন্যের। আবার এও ভাবত মানুষের কানে-মুখে ঘুরে ঘুরে তার কথার সাথে না-বলা অনেক কিছু যোগ হয়ে ঘটনাটা চওড়া-চ্যাপ্টা হয়ে পুরোদস্তুর কাহিনিতে রূপ নিয়েছে। যদিও সে-কাহিনিতে এখন আর কারও মন নাই।

নিজের চোখে দেখা রহমতের ঘটনাটা ছোট। মানুষের মুখে মুখে চরে-ফিরে লম্বা হলেও মোদ্দা ঘটনাটা এইÑ বছর কয়েক আগে সে তার উঠানের পেয়ারা গাছ থেকে বাদুড় খেদাতে গাছের মাথায় তেলের (কেরোসিনেরই হবে) খালি টিন খাটিয়েছিল, লম্বা দড়িবাঁধা টিনে টান খেয়ে ভিতরে আঁটকানো এক টুকরা কাঠের ঢং ঢং হাতুড়ি পেটানোর আওয়াজে বাদুড়ের পাল টিকতে পারত না। তারা বুঝত খালি খালি ভয় দেখানো, তবু কান-ঝালাপালা আওয়াজে গাছ ছেড়ে চলে গেলেও ফিরতে দেরি করত না। রহমতকে তাই কিছু সময় পর পর দড়ি টানাটানিতেই রাত পার করতে হতো। অভ্যাস হয়ে যাওয়ায় ঘুমের মধ্যেও তার দড়ি বাঁধা হাতটা কাজ করত। যে-রাতের ঘটনা, চোখে তার ঘুম ছিল না, চৌকিতে এপাশ ওপাশ করে চুপেচাপে বউকে ডিঙিয়ে ঘর ছেড়ে দাওয়ায় দাঁড়াতে আচমকা একটা হিম বাতাস তাকে ঘিরে ধরেছিল। ঘিরে ধরার কথাই তার মনে হয়েছিল। আঘ্রানের শেষ, শীত তেমন না থাকলেও চৌকি থেকে নামার সময় গায়ে চাদর ছিল, তারপরও মনে হচ্ছিল হু হু একটা ঠান্ডা বাতাস তাকে নিশানা করে ছুটে এসে, ওই যে মনে হয়েছিল, ঘিরে ধরেছিল। সামনে ঘন কুয়াশা, উঠানকে উঠান বলে মনে হচ্ছিল না, আর এক কোণে ঝাকড়ামাকড়া পেয়ারা গাছটাকে গাছ কে বলবে, ছোটখাটো ঘুটঘুটে টিলার মতো লাগছিল। ওই অবস্থায় গাছটাকে নজর করে দেখতে গিয়ে অন্ধকারেরই এক চিলতে ঝিরিঝিরি কালচে আলোয় যা দেখেছিল তাতে ঘিরে ধরা হিম হাড়-হাড্ডির গাঁটে-গাঁটে ঢুকে পড়েছিল। প্রথমে ভেবেছিল গাছভরতি বাদুড়, পরপরই ভুল ভেঙেছিল, বড়সড়ো গাছ, কিন্তু সেটা একবার একদিকে আরেকবার অন্যদিকে কাত হয়ে মাটি ছুঁয়ে সোজা হতে গিয়েও পারছে না। গাছটা যদি টিলার মতো হয়, তার মাথায় যেন একটা পর্বত, ভার সামলায় কী করে! তার পর যা দেখেছিল, না দেখলেই ভালো করত। বাদুড়ের মতো, তবে বাদুড় তো হতেই পারে না, কুচকুচে মস্তো ডানা মেলে গাছের মাথা ছেড়ে পর্বতটা হেলেদুলে অন্ধকার তাড়াতে তাড়াতে পুব দিকে উড়ে গিয়েছিল। সেরাতে গ্রামে প্রথম একজন নাই হয়ে গিয়েছিল। কত বছর হলো?

জিনে নিলে জ্যান্ত ফেরত পাওয়া ভাগ্যের কথা। পুরনো যারা গ্রামের, এক কালে জিনের কাণ্ডকীর্তি কিছু কিছু নিজেরা দেখেছে বা শুনে থাকবে, তারা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে গোড়াতেই বলেছিল ফেরত দেবে না, বড়জোর লাশ যদি মেলে দেখা যাবে সেটা আশপাশে কোনা মজা পুকুরে উপুড় করে আধাআধি পুঁতে রাখা। মজা পুকুরে থাকার মধ্যে থাকে কিছু পাকাল মাছ, জোঁক, ঢোড়া সাপ, ঠাসাঠাসি কচুরিপানা আর থকথকে আলকাতরা-কালো কাদা। যাদের খোঁজ মিলত, তাদের বুক-পেট পর্যন্ত ঘাড়-মাথা কাদায় পুঁতে রাখায় জিনদের কী সুবিধা এ নিয়ে পুরনোরা যুক্তি দেখাতে যেত না। তারা বলত ছোটবেলায় বড়দের কাছে শুনেছে। আবার কেউ কেউ নিজেদের অভিজ্ঞতার কথাও বলত।

এদের একজন বশিরুল্লা, এক সময় গ্রামের একমাত্র জুনিয়র ইশকুলের দপ্তরি। ক্লাস শুরুর, শেষের বা ছুটির ঘণ্টা পেটানো তার কাজ হলেও লোকটাকে অনেকে মান্যগণ্য করত, এখনও করে। বয়স হয়েছে, নানা রোগ-ব্যাধিতে প্রায় অচল, তবে মাথাটা বিলকুল পরিষ্কার। সে তার আপন ছোট চাচাকে জিনে নেওয়ার কাহিনি সংক্ষেপে বলতে গিয়ে বলেছিল ঘটনাটা তার ছোটবেলার, খুব একটা মনে নাই, তবে এটুকু মনে আছে চার দিন বাদে চাচাকে জ্যান্ত ফেরত দিয়েছিল, তখন তার হুঁশ ছিল না। তার মতিচাচার তখন জোয়ান বয়স, কিছুটা রাত করে বাজার থেকে ফিরছিল, বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে, হঠাৎ একটা বদগন্ধ পেল নাকে, আর কিছু মনে নাই। চার দিন কম হলেও একবারে কম না, কোথায় রাখল, মারধর করেছিল কি না কিছুই বলতে পারেনি। তাকে পাওয়া গিয়েছিল বাড়ির পেছনে গাছ-গাছালি ছাওয়া একটা এঁদো ডোবায়, যা এক সময় ছোট পুকুর ছিল, বাড়ির মেয়েরা নিরিবিলিতে গোসল করত, কাপড়-চোপড়, হাঁড়িকুড়ি ধোয়াপাকলার কাজও করত। ঘটনার পর নাকি তার চাচার বেশ কিছু দিন জবান বন্ধ ছিল, ইচ্ছা করে যে মুখ বন্ধ রাখত তা-না, সত্যি সত্যি বোবা হয়ে জবান হারিয়ে ফেলেছিল। পরে, বেশ পরে জবান ফিরলেও মুখে কথা আটকাত, খুব তোতলাতো। চাচা বেঁচেছিল অনেক বছর, তবে তোতলামির জন্য নাকি বেচারার কপালে বউ জোটেনি। আসল কারণ হয়তো অন্যÑ একবার জিনে নিয়েছে, আবার নেবে না কী নিশ্চয়তা!      

 দেখার চেয়ে শোনার কথাই লোকে বলাবলি করত। অনেক কাল না-বলা, চাপা পড়ে প্রায় হারিয়ে যাওয়া অনেক ঘটনা সুযোগ বুঝে এর মুখ ওর কান হয়ে চরতে-ফিরতে থাকলে সে এক সময় গেছে ছেলে-বুড়ো-জোয়ান কে না তখন জিনের কাণ্ডকারখানা নিয়ে মেতে থেকেছে! একাদুল্লা নামে একজনের কাহিনি যা পুরনোরা মনে করতে পারত বা আম্বিয়া হাজারির ঘটনা, এত বছর বাদে মুখে মুখে ফিরতে থাকলে মনে হতো পুরনোরা যেমন নতুন করে অতীতকে ঝালাই করার সুযোগ পাচ্ছে, নতুনরাও বর্তমানকে অদেখা অতীতে বসিয়ে সেই ঘোর ঘোর অতীতেই বসত করছে।

একাদুল্লা নামে যে কে ছিল, এ গ্রামের না অন্য গ্রামের এ নিয়ে পুরনোদের মধ্যে তর্কাতর্কি হলেও মূল ঘটনা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদের কারণ ছিল না। একাদুল্লাকে জিনে নেয়নি, নিয়েছিল সিরাতুন্নিসা নামের পরি। একাদুল্লার তখন নাকি যুবক হওয়া সবে শুরু, পুরোপুরি হয়ে উঠতে তখনও বাকি, মানে পিপড়ার পাতলা এলোমেলো সারির মতো ঠোঁটে লাজুক গোঁফের রেখা দ্বিধাদ্বন্দ্বে কেবল গজাচ্ছে, ভাঙা গলায় কিছু দিন আগে হাঁসের ডাকের মতো ফাটা, ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ বসেছে। যার মানে যুবক সে মোটেও ছিল না, তবু সিরাতুন্নিসার কী খেয়াল, সে ওই অল্পবয়সি একাদুল্লাকে ঘুমের মধ্যে উড়িয়ে নিয়ে হাওয়া হয়ে গেল। তবে একে পরি, তারওপর ভরা যৌবনবতী, সে আদর-সোহাগে একাদুল্লাকে মাতিয়ে রেখেছিল, আর মাস পার হওয়ার আগেই ঠিক যেমন গাঢ় ঘুমের মধ্যে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তেমনি ঘুমের মধ্যেই তাকে তার বিছানায় ফেরত দিয়েছিল। অবশ্য নেওয়ার আর দেওয়ার মধ্যে ফারাক ছিলÑ একাদুল্লা ফিরে এসেছিল পূর্ণ যুবক হয়ে।

সিরাতুন্নিসা তাকে নিয়ে কোথায় রেখেছিল, জায়গাটা কি দুনিয়ায় না আসমানে, খেতে কী দিত, রাতে ঘুমাত কি তাকে বুকে জড়িয়ে, বিছানাটা কি ছিল বেহেশতি হুদহুদ পাখির পালকের, আর আসল কথা যা না জানলেই নয়Ñ সোনার শরীর উদোম করে যখন তাকে টানত, টেনে তার গভীরে নিয়ে নিত তখন কেমন লাগতÑ এসব জেরার মুখে সে একেক সময় একেক কথা বলত। কখনও নাকি বিরক্তও হতো, বলত, রাখেন তো, আপনেরা আমারে কী পাইছেন! একাদুল্লাকে একটা পেতলের বাঁশি দিয়েছিল সিরাতুন্নিসা, বাঁশিতে ফুঁ দেওয়ার জায়গায় ফণা তোলা সাপের মুখ। বাঁশিটা সে সারাক্ষণ কোমরের কষিতে বেঁধে রাখত, গভীর রাতে যখন এক মনে বাজাত, লোকজন টের পেত নিচু আকাশে তাদের ঘর-বাড়ির ওপরে কিসের অশান্ত ওড়াওড়ি। একাদুল্লার এত খবর জানা থাকলেও তাকে দেখেছেÑ হোক সেই ছোটবেলায়Ñ এমন কাউকে পাওয়া যায়নি। বাউল শমসের বয়াতি তাকে নিয়ে কবিতা, মানে গান বেঁধেছিল, সে-কথা কারও কারও মনে আছে। আশপাশের বাজারে হাটের দিন সে তার কবিতার বই ফেরি করত, একতারায় টেনে টেনে তাকে গাইতে দেখেছে এমন দুই একজনকে এখনও পাওয়া যাবে। ফিরে আসার পর একাদুল্লার ভালো যায়নি, না যাওয়ারই কথা, দুনিয়ার মানুষ হয়ে সঙ্গ করেছে আসমানের পরির সাথে, এটাই কাল হয়েছিল, পাগল হয়ে মারা গিয়েছিল বছর কয়েক বাদে। আম্বিয়া হাজারির ঘটনা অনেক পরের, তাকে জিনেই ধরেছিল, নিয়ে যায়নি বলে রক্ষা, ঘাড়ে সওয়ার হয়ে থেকেছিল পাক্কা তিন দিন। মমতাজ ওঝার কেরামতিতে ছেড়ে গিয়েছিল, যাওয়ার আগে প্রমাণ হিসেবে বাড়ির কুকুরটাকে আছড়ে মেরে রেখে গিয়েছিল। শাসিয়েছিল আবার আসবে, আসেনি।           

সেসব অতীত কালের কথা। জিন-পরি আসত, মানুষকে জ্বালাতন করতেই আসত, ওঝার হাতে খড়মের, ঝাড়ুর বাড়ি খেয়ে কেটে পড়ত। আর নিয়ে যে যেত, তেমন ঘটনা সবই শোনা, নিয়ে গেলে ফেরত পাওয়া যেত কদাচিৎ, যেমন একাদুল্লার ঘটনা। শমসের বয়াতি গান বেঁধেছিল বলে এ নিয়ে সন্দেহের প্রশ্ন ওঠে না। তবে মজা পুকুরে ঘাড়-মাথা গেড়ে রাখার কাহিনি নিয়ে পুরনোরা যারা কথা বলে, তারা শোনা কথাই বলে। শোনা হলেও বিশ্বাস করেই বলে।   

রহমত প্রামাণিক যে রাতে তার উঠানের পেয়ারা গাছ থেকে বিশাল ডানা ছড়িয়ে জিনকে পুব দিকে উড়ে যেতে দেখার পর গ্রামের প্রথম মানুষটা লাপাত্তা হলো, তার পরের বছর গুনে গুনে আরও পাঁচজন। সে-সময় রহমতের পেয়ারা গাছের গল্প মানুষের মুখে মুখে নানা রঙবাহারে ছড়ালেও দিন যত গেল, লোকজন গল্পে আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। রহমত নিজেও এ নিয়ে আর মুখ খোলে না, মনে করতে চায় না সে-ই ঘটনার আদি প্রত্যক্ষদর্শী। তার মনে ভয়। সে যে ঘটনাটা দেখেছে, দেখে একে ওকে বলেছে, আর তার কথার লেজ ধরে ঘটনাটা নানা মুখে নানা দিকে মোচড় তুলেছে, এ নিয়েই ভয়। জিনের এটা না জানার কথা না, তাকে রেয়াত করবে এ ভরসা কে দেবে! আর দিলেই-বা কী! গত বৈশাখে গেল একজন, তার পর অনেক দিন ফাঁকা, আশ্বিন গেল, কার্তিক-অঘ্রান গেল, কোনো ঘটনা ঘটল না, পৌষ আসতে না আসতে এক দিনে দুইজন। রাতে না, দিনে, ভর দুপরে।

শুরুতে লোকজন অবশ্য হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেনি। তারা খোঁজখবর করে দূর-দূরান্ত থেকে ওঝা আনিয়েছে, কামেল পিরের কুদরতি তাবিজ গ্রামের চার মাথায় পৌনে তিন হাত মাটির নিচে পুঁতে লাল শালুর নিশান উড়িয়েছে, অনেকে নিজেদের বাড়ির উত্তর-দক্ষিণে, কেউ কেউ আবার উত্তর-দক্ষিণ-পুব-পশ্চিম ছাড়াও ঈষাণ কোণেও তাবিজ গেড়ে  বাড়ি-বন্ধ করেছে। গ্রামে যত বরুণ ও বাবলা গাছ, খুঁজে খুঁজে সেসবের ডালেও আজমির শরীফের রঙিন তাগায় কবচমোড়া তাবিজ ঝুলিয়েছে। এছাড়া গা-গতরে কে কতটা বয়ে বেড়িয়েছে কে বলবে!

জিনের কিছু যায় আসেনি। গত বছরের আগের বছরটা গেছে খুব খারাপ। মোট ছয়, তার আগের বছর কিছুটা কমÑ তিন, কিন্তু তার আগেরটায় চার। শুরুতে নানা কানাঘুঁষা হয়েছে। বদরুল নামে ইশকুলের বিএ, বিএড মাস্টার গেল বছর চারেক আগে, সে নাকি জিনে বিশ্বাস করত না, নাইন-টেনের ছেলেমেয়েদের ভূগোল পড়াতে গিয়ে কোনো কারণ নাই তবু নিজে যে জিন মানে না এমন কথা বলে কী জাহির করত সে-ই জানত। এদিকে সুনীল পাল, বাপ মরার পর বাজারে বড় কাপড়ের দোকান একা একাই চালাত, কারও সাতপাঁচে ছিল নাÑ সে যখন হাওয়া হলো, জানা গেল ঘরে-দোকানে দেদার তাবিজ রাখত। হিন্দু মানুষÑ জিনে না, ভূতে বিশ্বাস ছিল, কিন্তু জিনকে মেনে তাবিজ-মাদুলি জোগানোয় কারও থেকে কম ছিল না। বদরুলকে নেওয়ার একটা কারণ পাওয়া গেলেও আলেকজানকে যে নিয়ে গেল তার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? দোষের মধ্যে কথা বেশি বলত। অনেকে তার কাজ-কারবারে হাসাহাসি করত, বলত, তুই ব্যাটা লেখা-পড়া জানস না, জমি-জিরাতও নাই যে চাষ-বাস করবি, খামাখা মানুষের দোষ ধরতে যাস আর অতো কথার কী দরকার, তুই কি মেম্বারের ইলেকশন করবি!

 সে এক সময় গেছে লোকজন কারণ খুঁজতে চাইত। উত্তর পাড়ার তাওয়াক্কুল মসজিদের ঈমাম হুজুর বছর তিনেক আগে জুমার নামাজে ফতোয়া দিলেন দীনি মানুষের অভাবেই ঘটনা যা ঘটার ঘটছেÑ কেয়ামতের আলামত, নামাজ-কালাম নাই, খোদার নেয়ামতের শোকরগুজার নাই, নাফরমানি আর বেইনসাফি খোদাতালা কাহাতক বরদাস্ত করেন! কী কারবার, দুই দিন না যেতে বেচারা লাপাত্তা, আশপাশে কেউ টেরও পায়নি। সে-ঘটনার পর কারণ-টারন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি মানুষ বাদ দিয়েছে।

গ্রামের পুরনোরা যে বলেছিল জ্যান্ত ফেরত দেবে না সেটা পুরোপুরি ঠিক না। আবার তারা তাদের ছোটবেলায় বড়দের কাছে শুনে যে বলেছিল মজা পুকুরে ঘাড়-মাথা পোঁতা লাশের কথা, সেরকম না হলেও কিছু কিছু আলামত পাওয়া গেছে যাতে কাদার ব্যাপারটা টেকে। পুকুরের বদলে গ্রামের দক্ষিণে বারিঞ্চির খালে বিভিন্ন সময় কয়েকজনকে পাওয়া গেছে বটে, তবে উপুড় করে পোঁতা অবস্থায় না। খালে বর্ষার মৌসুমে পানি থাকলেও শুকনার সময় কাদা আর কাদা, পা রাখামাত্র ভুড়ভুড় করে হাঁটু-উরু পর্যন্ত দেবে যায়, আর কাদা বলতে সেই পুরনোরা যেমন বলেছিল, আলকাতরা-কালো। তার মানে পুকুরের বদলে খাল হলেও, সেটাকে হাজা-মজা হতে হবে আর মূল বিষয়টা যা পুরনো আমলের সাথে মিলে যায় তা কাদা।

মিল পেয়েও পুরনোরা জিনে ধরার আগের কায়দাকানুনের সাথে ঠিক মেলাতে পারে না। জিন তো বটেই, আগেও জিনদের কাজ-কর্মে যুক্তি খোঁজার মানে হতো না, এখনও না, তবে একটা বিষয় তো ঠিক, সে-আমলে বাড়ি-বন্ধ, পথ-বন্ধ তাবিজে কাজ দিত। তাবিজের সে-কুদরত এখন নাই।

অন্য ঘটনা হলো নিয়ে যাওয়ার পর কাউকে কাউকে ফেরত দেয়। হঠাৎ হঠাৎ গ্রামের লোকজন চোখ কপালে তুলে দেখে কেউ একজন ফিরে এসেছে। কিছু দিন পর আরও এক-দুইজন। তবে যে বা যারা ফেরে তাদের ভাবসাবে মনে হয় না জিনের খপ্পরে পড়ে মাস-বছর লাপাত্তা ছিল। কোথায় ছিল, কী করে উড়িয়ে নিলÑ দাঁতে কামড়ে, না হাতের মুঠোয়  চেপে, কী খেয়ে বাঁচল এসবের জবাব কে দেবে যদি না তারা গায়েব হওয়ার কথা স্বীকার করে! দফতরি বশিরুল্লার মতি চাচাও ফিরে এসে কিছু বলত না। জবান হারিয়ে ফেলেছিল, বলবে কী! সে কত আগের কথা! আর একাদুল্লা জবান না খোয়ালেও ফিরে এসে ওলট পালট কথা বলত, তবে যে তাকে নিয়ে গিয়েছিল সে সিরাতুন্নিসা, তার মুখেই শোনা। প্রমাণও হাতেনাতে পাওয়া গিয়েছিলÑ সাপের মুখ বসানো পেতলের বাঁশি।

রহমত প্রামাণিক মুখে কিছু বলে না, তবে ভাবে। কেন যে তার চোখেই ধরা পড়ল এর কূলকিনারা করতে পারে না। কয়েক বছরে এত এত ঘটনা ঘটল, আর কেউ কিছু দেখল না! সে-ই একমাত্র সাক্ষী কথাটা মনে হলে গায়ে কাঁপুনি ধরে। তবে হয়ে যে গেল বেশ কয়েক বছর, এ কি কোনো ভরসার কারণ হতে পারে? সে আর যা ভাবে তা খানিকটা অন্য রকম। জিন চোখে দেখার জিনিস না, যদি না নিজে দেখা দেয়। তাহলে সে যে দেখেছে এর কারণ তাকে দেখা দিয়েছে, যার মানে দেখা দেবে বলে তাকে বেছে নিয়েছিল। কেন? দেখে ভয়ে হোক বা উত্তেজনায় হোক, লোকজনকে বলবে, যেমন সে প্রথম-প্রথম বলেছে। তাতে জিনের লাভ? লোকজন জানবে কে নেয় এটা জানানো বা প্রচারের জন্য তাকে সাক্ষী মানার দরকার ছিল? না-কি উদ্দেশ্য একটা ছিলÑ লোকজনের মনে কোনো সন্দেহ থাকবে না, তারা পরিষ্কার জানবে বুঝবে, আর জিন যে নেয়, সে জিন যে কত বড়Ñ পর্বতের মতো বলশালী, চাইলে আসমানকে হাঁড়ির তলার মতো মিশমিশে কালো করে ফেলতে পারে, আবার কুচকুচে ডানা ঝাপটে ঘুরঘুট্টি অন্ধকারকে ঝেঁটিয়ে দূর করার ক্ষমতাও রাখে, ওঝা বা তাবিজের কাজ না তাকে ঠেকায়Ñ এও জানানোর মতো ব্যাপার!   

এত দূর  এসে সে যেন একটা ঝাপসা কূলের হদিস পায়। ব্যাপার কি এরকমÑ খোয়া যাওয়া কারও আত্মীয়-স্বজন যখন জানবে মানুষটা পথে-ঘাটে গাড়িচাপায় বা সাঁতার জানা সত্ত্বেও লঞ্চডুবিতে মরেনি, শত্রুতা করেও কেউ উঠিয়ে নিয়ে হাওয়া করে দেয়নি, তখন তারা অযথা থানায়, হাসপাতালে, মর্গে দৌড়ঝাঁপ বাদ দিয়ে নিশ্চিত হয়ে যাবে ফেরার সম্ভাবনা নাই, থাকলেও খুব ক্ষীণ। কাজ যখন দোর্দণ্ডপ্রতাপ জিনের, হা হুতাশে কিছু হবে না, উপায়ান্তর না দেখে তারা ঘটনাটাকে চুপেচাপে মেনে নেবে। তা-ই তো হচ্ছে।

রহমতের মনে হয় সে এত দিনে একটা জায়গায় মানে কূলে ভিড়তে পারছে। খতিয়ে দেখে এও ভাবে, আরও আগেই তার এভাবে চিন্তা করা উচিত ছিল। ফায়দা তেমন কিছু না হলেও সে নিজে একটা গ্যাঁড়াকল থেকে বেরোতে পারত। গ্যাঁড়াকল ছাড়া কী! গ্রামে এত মানুষ থাকতে তার চোখেই কেন ধরা পড়বে। আসলে সে না জেনেই জিনের হয়ে কাজটা করেছে, জনে জনে বলে বেড়িয়েছে, যে-কারণে কেউ হঠাৎ নাই হয়ে গেলে লোকজন উচ্চবাচ্য করে না, এমনকি কদাচিৎ ফিরে এলেও না।

তারপরও একটা খটকা তো থেকেই যায়। ফিরে যারা আসে তারা হাতের মুঠোয় জিনের দেওয়া একটা কালো পাথর নিয়ে আনমনে ঘোরে ফেরে, ফাঁক পেলে নিরিবিলিতে মুঠো খুলে পায়রার ডিমের আকারের পাথরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় না তারা তখন কিছু দেখে। একাদুল্লাকে সিরাতুন্নিসা বাঁশি দিয়েছিলÑ পেতলের, মুখটা সাপের।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares