পঞ্চমুখ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার : মঈনুস সুলতান

নুরপাশা গ্রামের লাগোয়া বাজারটিতে বিজলিবাতি এসেছে বছর কয়েক হলো। দুটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা খুলেছে, মুদি-মনিহারি দোকানের সংখ্যাও বেড়েছে আগের চেয়ে অনেক। তবে এ বাজারে আয়েশ করে বসে চা-পানের ভদ্রগোছের ঠেক একটাই, তা হচ্ছে পঞ্চমুখ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। মিষ্টির দোকানটির পেছন দিকে আছে পর্দা দেওয়া দুটি কেবিন। চেয়ার টেবিলের মানও খারাপ না, কারেন্ট থাকলে ফরফরিয়ে ঘোরে সিলিং ফ্যান।

এ মুহূর্তে ফ্যানের তলায় বুন্দিয়ার প্লেট সামনে নিয়ে বসে আছেন সুরেশ দেব। ক্যাসেট প্লেয়ারে উদাত্ত বিবাগি স্বরে বাজছে রামপ্রসাদী। বাজারের একমাত্র ঘড়ি-মেকার সুরেশ বাবু। আলাভোলা প্রকৃতির মানুষ ইনি, সংসারে তার মন নেই। বিকালের দিকে হামেশা গুলি সেবন করে ভাণ্ডারে বসে বুন্দিয়ার সাথে কড়া এক পেয়ালা চা খেয়ে চুপচাপ শোনেন রামপ্রসাদী। তারপর আস্তে-ধীরে উঠে গিয়ে ঘড়ি মেরামতিতে হাত লাগান। আজ তার মন দারুণভাবে খারাপ হয়ে আছে। তিনি বুন্দিয়ার দানাটুকুও মুখে  তোলেননি। পকেট থেকে ধুতির কোঁচা খুলে, তা দিয়ে চশমার কাচ মুছতে মুছতে ক্যাসেটে গীত গানটি শোনেন, ‘অভয় পদে প্রাণ সঁপেছি আমি/আর কী যমের ভয় রেখেছি..।’

ভোরবিহানে সুরুয কেবলমাত্র উঠি-উঠি করছিল, তখন স্প্যাশিয়েল ব্রাঞ্চের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা স্থানীয় থানা-পুলিশের সহায়তায় গ্রেপ্তার করেছেন সৈয়দ গোলাম নবী সাহেবকে। আইনরক্ষী বাহিনীর হেফাজতে তাঁকে সিলেট সদরের দিকে নিয়ে যাওয়ার খবরটি বাজারে চাউর হয় আরও ঘণ্টা দেড়েক পর। তরুণ বয়সে গোলাম নবী যখন দেশান্তরী হয়েছিলেন, তখন সুরেশ বাবু ঘড়ি সারাই এর কাজ-বাজ কিছুই জানতেন না। তার চরিত্রে গুলি খাওয়ার নেশাও দানা বাঁধেনি। ছাত্র জীবনে সুরেশ ছিলেন নুরপাশা ফুটবল টিমের ভরসা করার মতো গোলকিপার। নবীও দুর্দান্ত খেলতেন, সেন্টার ফরওয়ার্ডে খেলে টিমের পক্ষে অনেকগুলো সফল গোল করার কৃতিত্ব তাঁর। দুজনের খানিক সখ্যও হয়েছিল সে যুগে। একবার ফুটবল টিম থানা শহরের ফাইনালে জিতে শিল্ড পেলে, দুই বন্ধু মিলে স্থানীয় পাট্টায় আস্ত এক বোতল ফর্টি সাবাড় করে ভারি গোল বাঁধিয়েছিলেন। বোধ করি আটষট্টি সালের প্রথম দিকে গোলাম নবী নুরপাশা ছাড়েন। তিনি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর শহরে যান, ওখানে চাকরিরত তাঁর চাচা অকস্মাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে। তারপর কী কারণে জানি তিনি লাহোরের একটি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের তুলতবিলের সময় তিনি আর স্বদেশে ফিরতে পারেননি, আটকা পড়েছিলেন পাকিস্তানে। ওখান থেকে কীভাবে যেন ইউরোপ পাড়ি দেন। তারপর স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন বিলাতে। সুরেশ বাবু চশমা মুছে ধুতির খুট পকেটে পুরে, ঠিক কত বছর নবী সাহেব দেশান্তরে ছিলেন, তা আঙ্গুলের আঁকে হিসাব করেন। প্রায় উনিশ বছর পর তিনি শীতকালের এক সন্ধ্যায় বেশ কতগুলো স্যুটকেস নিয়ে স্থানীয় স্টেশনে ট্রেন থেকে নামেন। তিন প্রস্থ স্যুট পরা, মুখে ঢাউস সিগারওয়ালা এ আগন্তুককে চিনে উঠতে নুরপাশা গ্রামের মানুষজনের প্রথমত একটু সমস্যাই হচ্ছিল। ততদিনে তাঁর চুল পেকে হয়েছে ধূসর, গালপাট্টা জুলফি থেকেও ছড়াচ্ছিল রূপালি জেল্লা।

বোধ করি সন্ন্যাস রোগে সুরেশ বাবুর বাবার শরীরের বাম দিকটা অবশ হয়ে গিয়েছিল। হ্যামিওপ্যাথি ও বনাজী চিকিৎসায় কোনো ফায়দা পাওয়া যাচ্ছিল না। ঘরে ফেরা নবী জিপ ভাড়া করে তাঁকে নিয়ে গেলেন সদরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সপ্তা কয়েক চিকিৎসার পর বাবা বেশ খানিকটা সুস্থ হয়ে ফিরে আসলেন বাড়িতে। বর্তমানে তিনি লাঠি ভর দিয়ে ঠিরঠিরিয়ে হাট-বাজার করে বেড়ান। কীর্তন থাকলে একা একা কালীবাড়িতেও হাজিরা দেন।

সুরেশ বাবুর চা এর পেয়ালাটি ফ্যানের বাতাসে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। তা বদলে দেওয়ার হাঁক পেড়ে মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী প্রহল্লাদ আলাই (হালুইকর) সামনের চেয়ারটি টেনে বসেন। তিনি কৌটা থেকে এক শলা কাঁচি সিগ্রেট বের করে বলাকা ব্লেড দিয়ে সাবধানে কেটে আধা-আধি দু-টুকরা করেন। তারপর অর্ধাংশে আগুন দিয়ে খুক-খুকিয়ে কেশে মুণিপুরি গামছা দিয়ে চোখের ঝুপসি ভুরু মুছেন। দু’জনে চাপা গলায় শলাপরামর্শ করেন কিছুক্ষণ, কিন্তু নবী সাহেবের গ্রেপ্তার হওয়ার রহস্য ভেদ করতে পারেন না। প্রহল্লাদ আলাই দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। তার বড় পুত্রটি জগন্নাথ কলেজে পড়াশোনার অছিলায় হোস্টেলে বসবাস করছে। স্বভাব-চরিত্রে সে খইদা কিসিমের, অর্থাৎ কারণে অকারণে পয়সা ওড়াতে পছন্দ করে। আলাই সম্প্রতি সঙ্গোপনে আরেকটি ছোট সংসারের বউনি করেছেন। বধূটি সদগুণসম্পন্না, তবে স্নো-পাউডার-আলতা-চুড়ি নিয়ে তার খাই-খর্চা প্রচুর। এদিকে ভাণ্ডারের বাজাইলের বেড়াতে পচন ধরেছে, বদলে পাকা দেয়াল তোলা, চালের জং-ধরা ঢেউটিনেও রঙের পোচ লাগানো দরকারি। প্রহল্লাদ হামেশা টাকা-পয়সার বেহদ তঙ্গিতে থাকেন। বাজারে আসলে নবী সাহেব তার দোকানে বসে গরম গরম আমৃত্তির অর্ডার করতেন। চিনি ছাড়া এক পেয়ালা আদা-চা এর সাথে তা মুখে দিয়ে অতঃপর ফুঁকতেন সিগার। সারা ভাণ্ডার ভরে যেত খুশবুদার  টোব্যাকোর ভুর ভুরে সুগন্ধে। নবী সাহেব প্রহল্লাদ আলাই এর সমস্যাটা জেনেছিলেন। তাকে ডেকে নিয়ে আগ্রণী ব্যাংকের ম্যানেজারের সাথে পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু কী তাইÑ পরিষ্কার ভরসা দিয়েছিলেন, ব্যাংক লোন জোগাড় করে দেওয়ার।

বাজারের যে পাঁকুড় গাছের তলায় রিকশাওয়ালারা সিটে বসে ঝিমায়, ওখানে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ অশ্রাব্য গালিগালাজ করে, পিরানটি খুলে তা কোমরে পেঁচিয়ে, বুক ধারালো নখে খামচাতে খামচাতে মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে এসে ঢোকে আমির আলি। প্রহল্লাদ আলাই প্রমাদ গোনেন। শিশু বয়সে গুটি বসন্তের কারণে আমির আলির মুখে গাতা-গর্ত প্রচুর। তার পাগলামির ধাতটি সিজোন্যাল, অর্থাৎ কোনো কোনো সময়ে তা চাগিয়ে ওঠে, তখন সে যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে সামাজিকভাবে অশোভন বস্তাপচা গালিগালাজে পথচারীদের বেজায় অস্বস্তিতে ফেলে। কখনও-বা খেপে উঠে ছরছরিয়ে শরীর থেকে নিষ্ক্রান্ত করে অপ্রয়োজনীয় জল। তারপর চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে যেন নিজস্ব দুর্দশার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। উৎপাতটি বহাল থাকে দিন কতক, বাজারের দোকানি বা খরিদদাররা বিশেষ একটা গা করেন না। তারপর ঋতু পরিবর্তনে গাছে কুসুমটি ফোটার মতো, অস্বাভাবিক আচরণের খোলস থেকে আপনা আপনি বেরিয়ে এসেÑ আমির আলি ফের প্রফুল্ল বদনে হে হে হেসে দোকানে দোকানে আওয়ারা ঘুরে বেড়ায়। আধ-পাগলা ছেলেটির পিতা এক জামানায় এ বাজারে রিকশা চালাতো। সত্তরের নির্বাচনের সময় সে রিকশার পেছনে গঁদ দিয়ে আটকে ছিল  নৌকা প্রতীকের প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের বিশাল একটি ছবিওয়ালা পোস্টার। অকস্মাৎ নুরপাশা গ্রাম খানসেনাদের করতলগত হয়। আমির আলির বাবা হয়তো ভুলে গিয়েছিল পোস্টারটির কথা। তো রাজাকাররা খানসেনাদের টুঁইয়ে দিলে, তারা তাকে পাঁকুড় গাছের ডালে ঝুলিয়ে বেওনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। বিষয়টি পাঁচ বছরের শিশু আমির আলির মনে হয়তো অভিঘাত ফেলে থাকবে। স্বদেশ মুক্ত হওয়ার বছর কয়েক পর আমির আলির বিধবা জননী দ্বিতীয়বার বিবাহ করে। তখন থেকেই কালে-ভদ্রে মান্দার গাছে ফুটে ওঠা কাঁটার মতো, বালক আমির আলির মধ্যে উল্টা-সিধা আচরণের প্রকোপ চাগিয়ে ওঠে।

গেল মাস কয়েক ধরে নবী সাহেবের ভারি ন্যাওটা হয়ে পড়েছিল আমির আলি। তিনিও ছেলেটিকে ভালোবেসে তাঁর ছোটা কাজের চাকরিতে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আমির আলি প্রতিদিন আদর্শ ইস্টুডেন্টস্ বুক স্টোর থেকে দৈনিক ইত্তেফাকটি তুলে নিয়ে পৌঁছে দিত নবী সাহেবের বসতবাড়িতে। তিনি বাতাবিলেবু গাছের তলায় বেতের আরাম কেদারায় আধশোয়া হয়েÑ ক্যাসেট প্লেয়ারে ভাগনারের ধ্রুপদী কনসার্ট শুনতে শুনতে পত্রিকার হেডলাইনে চোখ বোলাতেন। নবী সাহেব এয়ারমেইল এনভেলপে হামেশা চিঠি-চাপাটি লিখতেন। আমির আলি তা ক্যারি করে পৌঁছে দিত পোস্ট অফিসে। এ কাজের জন্য দিনওয়ারি তার বেতন নির্ধারিত ছিল তিন টাকা। এ ছাড়া দুপুরের ভরপেট খাবারও জুটত নবী সাহেবের বাড়িতে। এমন কী তাঁর সঙ্গে মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে এলে তিনি তাকে গজা, জিলাপি বা নিমকি কিনে দিতেন।

আমির আলি ফ্যানের তলায় দাঁড়িয়ে হাহাকার করে কেঁদে ওঠে। নখের খামচিতে তার বুক রক্তাক্ত হয়ে আছে। প্রহল্লাদ আলাই ক্যাসেট প্লেয়ারের ভলিউম কমিয়ে দেন। ছেলেটির চাপা কান্নার সাথে রামপ্রসাদের ‘নয়ন তুলে দেখ মা শ্যামা’র সুরধ্বনি মিশে যায়। তিনি ভাণ্ডারের মেসিয়ারকে হুকুম করেন আমির আলিকে এক প্লেট গজা দেওয়ার জন্য। উঠে কাঁধে হাত বুলিয়ে ছেলেটিকে তিনি একটি চেয়ারে বসিয়ে দেন। ক্যাসেটে ক্রমাগত বাজে ‘দেখি না মা এ তোর মায়ার খেলা..।’ আমির আলি এক মুঠো গজা তালুর চাপে পিষে চূর্ণ করে ছড়িয়ে দেয় মেঝেতে। প্রহল্লাদ হাত জোড় করে যেন অদৃশ্য শ্যামা মা এর কাছে ফরিয়াদ করেন, ‘এ রকম একজন ভালো মানুষকে তুমি কারাগারে পাঠালেÑ জননী।’ কান্নার তোড়ে আমির আলির নাসারন্ধ্র দিয়ে শিসের আওয়াজ বেরোয়। তাতে ফের মেশে রামপ্রসাদের ‘মেঘে মেঘে জড়িয়ে আমায় কাটিয়ে দিলি সারাবেলা..।’

একপর্যায়ে আমির আলি চোখমুখ খিঁচিয়ে ভাণ্ডার থেকে বেরিয়ে গেলে, কাচে ফুলের রঙিন নকশা আঁকা বাটওয়ালা ছাতাটি গোটাতে গোটাতে এসে ঢোকেন করম উদ্দিন মোল্লা। ইউনিয়ন পরিষদের এ প্রতিপত্তিশালী চেয়ারম্যান নুরপাশায় করই মিয়া নামে পরিচিত। টেবিলে পাঁচ ব্যাটারির টর্চটি রেখে চুপচাপ তিনি রামপ্রসাদী শুনেন। এনার ঘাড়ে শার্টের কলারের নিচে ভাঁজ করে রাখা পাউডার মাখা রুমাল। করই মিয়ার স্ত্রীর সংখ্যা তিন। পঞ্চমুখ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে বিকালের ভিড়ভাট্টা জমে ওঠার আগে, ইনি প্রতিদিন চাপলিশে এসে পেয়ালা থেকে চামচ দিয়ে তুলে খান দুধের ঘন সড়। আজ বোধ করি মালাই খেতে উৎসাহ পাচ্ছেন না। একটু আগে বেবি টেক্সিতে করে থানা থেকে ফিরেছেন। তাঁকে বেজায় অবসন্ন দেখায়। মেসিয়ার তাঁর সামনে মালাই এর পেয়ালা রাখলে, তা সরিয়ে দিয়ে ইশারায় প্রহল্লাদ আলাইকে কাছে ডাকেন।

চাপা স্বরে তাদের বাতচিত চলে কিছুক্ষণ। না, সংবাদ খারাপ। থানায় করই মিয়ার জানাশোনা দারোগা মুখ খুলেননি। ঢাকা থেকে বিশেষ পরোয়ানা নিয়ে স্প্যাশিয়েল ব্রাঞ্চের সাদা পোশাকের অফিসাররা নবী সাহেবকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছেন। এ সব কেসে জামানতের কোনো সম্ভাবনাই নেই। আসার পথে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে পারভেজের। বছর কয়েক আগে পারভেজ ছিল সর্বহারা পার্টির ক্যাডার। তার ধারণা, নবী সাহেব আন্তর্জাতিক পরিসরে রাজনীতির আন্ডারগ্রাউন্ড কোনো চক্রের সাথে সংযুক্ত। সে যেন কোথা থেকে শুনেছে, স্প্যাশিয়েল ব্রাঞ্চের লোকজন ইন্টারপোলের হয়ে কাজ করছে!

করই মিয়া ফের ব্যাখ্যা করে বলেন, ইন্টারপোল হচ্ছে আন্তর্জাতিক পুলিশের গুপ্ত গোয়েন্দা সংস্থা। পারভেজ তাঁকে জানিয়েছে, ইন্টারপোলের একজন ফিরিঙ্গি সাহেব নাকি ওয়ারলেস নিয়ে বসেছিলেন ডাকবাংলোয়। অই যন্ত্র দিয়ে তিনি গ্রেপ্তারের কলকাঠি নেড়েছেন। বিস্তারিত শুনে প্রহল্লাদ আলাই রীতিমতো হিচকিচিয়ে যান, তার কপালে চিকন ঘাম দেখা দেয়। করই মিয়া ‘সিচুয়েশন ডেঞ্জারাস’ বলে ফোঁস করে উঠলে, প্রহল্লাদ কাঁপা হাতে কাঁচি সিগ্রেটের  ব্লেডে কাটা অর্ধাংশে আগুন দেন।

বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু করই মিয়ার উঠতে ইচ্ছা হয় না। তাঁর কাহিল লাগে। নবী সাহেবের বাবা-সুদ্ধ তাঁর পরিবারের সবাইকে তিনি চেনেন। অত্যন্ত বনেদি বংশের লোক এঁনারা। দেশান্তরে থাকাবস্থায় নবী সাহেবের পিতামাতার ইন্তেকাল হয়। তাঁর বয়সে বড় দুই বোনের সংসারাদি ঢাকা শহরে। এঁনারা নুরপাশায় তেমন একটা আসেন-টাসেন না। তবে বাড়িতে এখনও তাঁর চাচি-আম্মা বেঁচে আছেন। মহিলা বেজায় বৃদ্ধা। ঠিক বুঝতে পারেন না, এ পরিবারের কে এখন স্প্যাশিয়েল ব্রাঞ্চে গিয়ে উকিল মোক্তার ধরে দেখ-খোঁজ করবে। করই মিয়ার কোনো ধারণা নেই, নবী সাহেব বিলাতে ঠিক কী ধরনের কাজ করতেন, তবে মানুষটি যে দিলদরাজ প্রকৃতির, এ ব্যাপারে তিনি হানড্রেড পার্সেন্ট শিওর।

তাঁর সাথে নানা কারণে নবী সাহেবের দহরম মহরম গড়ে উঠছিল। চেয়ারম্যান হিসেবে এলাকার বাজার কমিটিও পরিচালনা করেন করই মিয়া। সরকার থেকে বাজার উন্নয়নের খাতে কোন টাকা-পয়সা আসছে না। এদিকে গরুহাটা থেকে সোনার পট্টিতে যাওয়ার পথ বর্ষাকালে প্যাচপ্যাচে কাদা-প্যাঁকে এমন হালত হয় যে, হাঁটাচলার কোনো কুদরত থাকে না। বিষয়টা নবী সাহেবকে গোচরীভূত করলে তিনি ইট দেয়োর ওয়াদা করেন। তাঁর বসতবাড়ির পুরোনো আমলের কাচারি ঘরটি সংস্কারের অভাবে ধসে পড়ে জংলা হালতে সাপখোপের আড়ত হয়ে উঠেছিল। নবী সাহেব ভাঙা কাচারির দেয়ালের ইটগুলো খুলে নিয়ে গরুহাটার সড়কে ব্যবহারের জন্য দিয়ে দেন। করই মিয়া তাঁকে স্থানীয় স্কুল কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিতে বললে, তিনি বিনীতভাবে প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়ে তাঁকে সঙ্গী করে স্কুল পরিদর্শনে যান। মেয়েদের জন্য একটি আলাদা কমনরুম করা দরকার বুঝতে পেরেÑ নিজে থেকে বলেন, কাচারি ঘরের জং ধরা ঢেউটিন ও ইট ব্যবহার করে এক্সটেনশন হিসেবে একটি কামরা তৈরি করতে। কিন্তু ইট ও টিন পেলেই ঘর তৈরি করা যায় না, প্রয়োজন পড়ে রাজমিস্ত্রি ও যোগালির খরচের। করই মিয়া প্রস্তাব দিয়েছিলেনÑ চাঁদা তোলার, কিন্তু নবী সাহেব তাঁকে থামিয়ে দিয়ে, ব্রিফকেস থেকে চেকবুক বের করে, তাতে পনেরো হাজার টাকার অঙ্ক বসিয়ে খসখসিয়ে ইংরেজিতে সই করে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

করই মিয়া মালাই এর পেয়ালাটি সরিয়ে দিয়ে, এক টিপ নস্যি নিয়ে বার তিনেক জোরালো আওয়াজে হেঁচে রুমাল দিয়ে নাক মোছেন। প্রতিপত্তিশালী লোক তিনি, থানা থেকে নানা ধরনের কয়েদিকে অনেক বার জামানতে ছাড়িয়ে এনেছেন। কিন্তু এই বার চেনা দরোগা তাঁকে আবডালে নিয়ে গিয়ে নবী সাহেবের মামলায় না জড়ানোর জন্য হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। বিষয়টা তাঁর পছন্দ হয়নি, তবে অন্য কোনো উপায় নেই দেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড় বিড়িয়ে তিনি বলেন, ‘ইজ্জত হুরমতের মালিক খোদাওন্দ করিম।’ বাহারে বাটের ছাতা হাতে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে ছুটে এসে ভাণ্ডারের মেসিয়ার ছোকরা তাঁর হাতে তুলে দেয় পাঁচ ব্যাটারির টর্চটি।

রঙিন কাগজের পতাকা ও জিঞ্জির দিয়ে সাজানো বিয়ের একটি সেভেন-সিটার গাড়ি এসে থামে পঞ্চমুখ মিষ্টান্ন ভান্ডারের সামনে। মেসিয়াররা মাটির হাঁড়িতে হাঁড়িতে রসগোল্লা, নিমকি ও জিলাপি ইত্যাদি সাজানোতে হাত লাগিয়েছে। নুড়িপাথর ছিটকিয়ে কাওয়াসাকি বাইকখানা পার্ক করে হেলমেট মাথায় নেমে আসে পারভেজ হাসান। সে ভাণ্ডারে ঢুকে ঢুলু ঢুলু চোখে শুনে ক্যাসেট রেকর্ডারে বাজানো কারি আমির উদ্দিনের গানÑ ‘এত সুন্দর করে এই যে বসুন্ধরা রেখেছ তুমি সাজাইয়া/যেখানে যা সাজে তাই দিয়া..।’ কারি সাহেবের গলায় দরদ আছে, তাঁর বাজানো বেহালার বাদনও অপূর্ব। কিন্তু পারভেজ স্পষ্টত বিরক্ত হয়। সে কাউন্টারে গিয়ে ক্যাশবক্সের পাশে রাখা  প্লেয়ারটি খুট করে বন্ধ করে দিয়েÑ জ্যাকেটের পকেট থেকে বের করে আজম খানের একটি ক্যাসেট। তা ঢুকিয়ে প্লেয়ার অন করতেই ভান্ডার ভরে ওঠে ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা/এই ফুলবন পারলে না বাঁচাতে..।’

পারভেজের মুখ থেকে ছড়াচ্ছে কেরু কোম্পানির ব্র্যান্ডির মৃদু গন্ধ। সচরাচর এ সময় পারভেজ দুর্বারানির দিঘির নিরিবিলি ঘাটলায় বসে স্মোক করে চরস। তারপর ভাণ্ডারে এসে কালো জামের অর্ডার করে কেবিনে একাকী বসে ওয়াকম্যানে শুনে টিনা চার্লস বা বনিওমের ক্যাসেট। আজ সে ড্রিংক করে এসেছে বুঝতে পেরে প্রহল্লাদ আলাই সাবধান হন।

সে খানিক টলে টলে কেবিনে ঢুকে ধপাস করে বসে পড়ে চেয়ারে। পারভেজের মাঝে ঝামেলা সৃষ্টি করার প্রবণতা আছে, এ ব্যাপারে প্রহল্লাদ আলাই অবগত। তার বাবা আব্দুল হান্নান মুহকমা শহরে আর এন্ড এইচ এর ফার্স্টক্লাস কনট্রাক্টর। নুরপাশা গ্রামের বাজারে হান্নান মার্কেট নামে তিনি সম্প্রতি একটি দোতালা দালান তুলেছেন। তার মালিকানায় আছে দুটি ট্রাক। মুহকমা শহরে তার ভিন্ন একটি সংসারও আছে। শোনা যায় যে, তার দ্বিতীয় পত্নী ইডেন কলেজ থেকে হোম ইকোনমিক্সে মাস্টার্স করা মেয়ে। হান্নান কনট্রাক্টর প্রতি শনিবারে টয়োটা করোনা কারটি ড্রাইভ করে নুরপাশায় আসেন। গ্রামের বাড়িতে এক রাত্রি কাটিয়ে মুহকমা শহরে ফেরার পথে পঞ্চমুখ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সামনে তার গাড়িটি দাঁড় করান। মেসিয়ারকে এক হাঁড়ি কাঁচাগোল্লা গাড়িতে তোলার কথা বলে কাউন্টারে গিয়ে পুত্র পারভেজের বাকি-সিকি শোধ করেন। হান্নান কন্ট্রাক্টর সঙ্গোপনে বিবাহ সম্পন্ন করে ছোট-সংসারের সূত্রপাত করলেÑ পুত্র পারভেজ নাকি পিস্তল নিয়ে তাঁকে তাড়া করেছিল। বর্তমানে তার মস্তিষ্ক শীতল হয়েছে। তবে এ আত্রাফের কেউ তার সঙ্গে তেড়ি-বেড়ি করতে হিম্মত পায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের বায়ো-কেমেস্ট্রি বিভাগ থেকে ড্রপাউট হয়ে নুরপাশায় ফিরলে, পিতা পারভেজকে হান্নান মার্কেটের দোকানগুলোর ভাড়া আদায়ের দায়িত্ব দেন। কাজটিকে পেটি বুর্জোয়া আচরণ বিবেচনা করে সে দায়িত্ব সরাসরি রিজেক্ট করে। বাজারের টং দোকান থেকে বাকিতে গোল্ডফ্লেক সিগারেট কেনা, এবং চরস সেবনের পর ভাণ্ডারে বসে কালোজাম খেয়ে ওয়াকম্যানে ইংরেজি গান শোনা ছাড়া সে আজকাল আর তেমন কিছু করছে না। এ আত্রাফে তার বন্ধুবান্ধবও কেউ নেই। তবে কীভাবে যেন নবী সাহেবের সঙ্গে বয়সের বিস্তর ব্যবধান উপেক্ষা করে গড়ে উঠেছিল তার জান-পহচান অন্তরঙ্গতা।

সর্বহারা পার্টির আদর্শে বছর তিনেক কেটলির বলকানো জলের মতো ফুটছিল পারভেজ। স্বদেশটি বর্তমানে চলছে সামরিক শাসনের ছত্রছায়ায়। পার্টির মাওবাদী রণকৌশল কেটলি থেকে উবে যাওয়ায় বাষ্পের মতো মিলিয়ে গেছে হাওয়ায়। রাজনৈতিকভাবে দাগা খেয়ে সে ভর্তি হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ঠিক মতো খাপ খাওয়াতে পারেনি। দেশত্যাগের বাসনা তখন বেজায়গায় বিষফোঁড়ার মতো চাগিয়ে উঠেছিল। তার বাবা হান্নান কনট্রাক্টরও চাচ্ছিলেন, সে যেন পাশ্চাত্যের কোনো দেশে গিয়ে থিতু হয়। আদম ব্যাপারি পাকড়ানোর জন্য তিনিই টাকা-পয়সার জোগান দেন। এক বছরের ব্যবধানে সে দুইবার ফরেন ট্রিপের জন্য ট্রাই করে। কিন্তু জার্মানি বা ইতালিতে অভিবাসী হওয়ার পরিবর্তে, তাঁকে খাজুল হালতে ভিন্ন দেশের দুটি আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে আসতে হয় স্বদেশে। এ ব্যর্থতাবোধ বেমক্কা বিখাউজের মতো পীড়া দিচ্ছিল তাকে অহরহ। জগৎ-সংসারে সম্পূর্ণ নির্বান্ধব পারভেজ। কিন্তু কী এক সম্মোহনী আকর্ষণে বিলাত থেকে দেশে ফেরা নবী সাহেব তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন খুব কাছে।

গ্রামের বাড়িতে নবী সাহেবও ছিলেন আদতে নিঃসঙ্গ। মাঝে-মধ্যে সন্ধ্যার পর আমির আলিকে বাজারে পাঠিয়ে ডেকে নিতেন পারভেজকে। তপ্ত কফির পেয়ালা হাতে তাকে নিয়ে নবী বসতেন, তাঁদের দিঘির শান বাঁধানো ঘাটলায়। না, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ইউরোপ পৌঁছা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। পর পর তিন বার তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। তারপর কীভাবে যেন আজারবাইজানের ভিসা নিয়ে তিনি গিয়ে হাজির হয়েছিলেন বিচিত্র একটি দেশে। তারপর ওখান থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পৌঁছান ইরানে। আনাতোলিয়ার দিকে যাওয়া সুফি তরিকার একদল তীর্থযাত্রীদের সাথে মিলেঝুলে বাসযোগে তুরষ্ক পৌঁছাতে তাঁর বিশেষ কোনো অসুবিধা হয়নি। ইস্তাম্বুলে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল ইউরোপীয় কয়েকজন পর্যটকের। তারা তাদের মাইক্রোবাসে লিফ্ট দিয়ে তাঁকে সহায়তা করেÑ বসফরাস অতিক্রম করে ইউরোপের ভূমিতে পা রাখতে।

একবার ঘাটলায় বসে ছোট্ট একটি চার্জার লণ্ঠনের আলোয় নবী সাহেব পারভেজকে দেখিয়ে ছিলেন, তাঁর ইউরোপের নানা দেশে ঘুরে বেড়ানোর ছবি সংবলিত অ্যালবাম। এতে মিউনিক, প্যারিস ও বার্সিলোনায় আয়োজিত বামধারার প্রতিবাদী মিছিলে তাঁর ছবি দেখে পারভেজ নবী সাহেবের রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। তিনি তাকে ইউরোপের বামপন্থি ছাত্রনেতা পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত তারিক আলির সাথে মিছিলে অংশ নেওয়ার ছবি দেখিয়ে বলেছিলেন, আমরা যারা শ্রমজীবী মানুষদের অধিকারের বিষয়টা ভাবি, তাদের কাছে একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান কোনো বিষয় না। যে কোনো দেশে বসবাস করেই শরিক হওয়া যায় বিপ্লবের বিশ্বপ্লাবী ধারাপ্রবাহে। তখনই অবচেতনের অন্তরাল থেকে কে যেন তাকে বলেছিল, নবী ইজ অ্যা রিভোলিউশোনারি! খুব চমৎকার ভঙ্গিতে গল্প করতেন নবী। জার্মানিতে যে বাদের ম্যানহফ বলে বামধারার একটি সংগঠন বিপ্লবে যুক্ত আছে, আইরিশ বিপ্লবীরা যে সশস্ত্র সংগ্রাম চালু রেখেছে, এসব খুঁটিনাটি তথ্য জানতে জানতে তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে, নবী সাহেব ইউরোপের কোনো বিপ্লবী সংস্থার সঙ্গে সঙ্গোপনে যুক্ত আছেন।

এক পর্যায়ে নবী চার্জার লণ্ঠনটি নিভিয়ে দিয়ে, কচুরিপানার চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া জ্যোৎস্নার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘জাস্ট লেট মি নো পারভেজ, হোয়েন ইউ আর রেডি ফর অ্যানাদার অভারসিজ অ্যাডভেঞ্চার এগেইন। কোনো ইউনিভারসিটিতে ভর্তি হয়ে তো তুমি বৈধভাবে বিদেশে পাড়ি দিতে পারো। স্পন্সরশিপ নিয়ে ভেবো না, তুমি উদ্যোগ নিয়ে যদি অ্যাডমিশনের প্রাথমিক কাজগুলো সারতে পারো, প্লিজ কাম টু মি, আমি জানাশোনা কাউকে ধরে স্পনসরশিপের ব্যবস্থা করে দেবো।’

মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ক্যাসেট প্লেয়ারে এখন বাজছে আজম খানের, ‘আলাল ও দুলাল..চান খাঁর পুলে প্যাডেল মেরে..।’ আজানা এক ক্রোধ পারভেজের ভেতর ফুঁসে ওঠে। ইচ্ছা হয়, উঠে গিয়ে ক্যাসেটটি মেঝেতে ছুড়ে আছড়ে আছড়ে ভেঙে ফেলে। নিজেকে সংবরণ করে সে। মনে হয়, বেনো জলে সাঁতরে ডাঙ্গার কাছে এসে সে একটি গাছের শিকড় আঁকড়ে ধরেছিল, তা যেন ফসকে গেল হাত থেকে।

বাজারের মসজিদে মাগরিবের পাঞ্জেগানা নামাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে জমে ওঠে পঞ্চমুখ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। কড়াইতে গনগনে আঁচে ভাজা হয় জিলাপি। প্রচুর লোকজন বসেছে টেবিলে টেবিলে। সবাই কথা বলছে, ক্যাসেট প্লেয়ারে ঠিক কী বাজছে ভালো করে বোঝা যায় না। ফিফটি সিসি হোন্ডাটি দাঁড় করিয়ে ভাণ্ডারে এসে ঢোকে শাহেদ। খদ্দরের গুরু-পাঞ্জাবি গায়ে, বাবরি চুলের মধ্যিখানে সিঁথি কাটা শীর্ণকায় এ ছেলেটি অত্র এলাকায় সপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি। তার কবিতা লেখার ধাত আছে। শাহেদের বাবা আহাদ মিয়ার পেশা ফটোগ্রাফি। নুরপাশা বাজারের সাতভাই চম্পা ফটো স্টুডিওতে তিনি হিমালয় পর্বতের হরিণ চরা পাদদেশ অঙ্কিত সিনের সামনে সদ্য বিবাহিতদের ছবি তুলে দেন। তাঁর পুত্র শাহেদ সাংবাদিকতার সাথে সাথে উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার কাছ থেকে পেয়েছে ফটোগ্রাফি করার আগ্রহ। তার কাঁধ ঝোলাতে আছে সোভিয়েত ইউনিয়নে নির্মিত স্ট্র্যাপ ছেড়া একটি জেনিথ ম্যানুয়েল ক্যামেরা।

নবী সাহেবের গ্রেপ্তারের বিশদ বিবরণ সংগ্রহের প্রত্যাশায় শাহেদ আজ হোন্ডা চালিয়ে জেলা সদর অব্দি গিয়েছিল। স্প্যাশিয়েল ব্রাঞ্চের অফিসাররা তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে সাড়ে তিনটার ফ্লাইটে নিয়ে গেছেন ঢাকায়। প্নেনের দিকে চার-পাঁচ জন ফিরিঙ্গি সাহেব-সুবোকেও সে হেঁটে যেতে দেখেছে। এদের কেউ একজন ইন্টারপোলের সাথে যুক্ত থাকলেও থাকতে পারে, সে ঠিক নিশ্চিত হতে পারেনি। এয়ারপোর্ট থেকে ফেরার পথে সে প্রেসক্লাবে একটু থেমেছিল। তখন দেখা হয়, দৈনিক ইত্তেফাকের জেলা প্রতিনিধি আশুতোষ রায়ের সঙ্গে। রায় বাবু শাহেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে নবী সাহেবের ভোরবিহানে গ্রেপ্তারের খুঁটিনাটি জেনে নেন। দুপুরের দিকে তিনি সদর থানায় গিয়েছিলেন খোঁজ নিতে। তখন স্প্যাশিয়েল ব্রাঞ্চের সাদা পোশাকধারী একজন কর্মকর্তার সাথে তাঁর কথাও হয়। গোয়েন্দা অফিসারটি ব্যবহারে অমায়িক, কিন্তু তথ্য কিছু খোলাসা করেন না। তবে তাবৎ বিষয়-আশয় পর্যবেক্ষণ করে রায় বাবু আন্দাজ করছেন যে, নবী সাহেব হয়তো ইউরোপের গুপ্ত কোনো রাজনৈতিক চক্রের আন্ডারগ্রাউন্ড তৎপরতায় যুক্ত ছিলেন। সম্ভবত হুলিয়া এড়িয়ে নুরপাশায় ফিরে এত দিন গ্রামের বাড়িতে ঘাপটি মেরে বসেছিলেন।

কেবিনের পর্দার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে ওখানে পারভেজকে বসে থাকতে দেখে শাহেদ তাকে এড়িয়ে পাশের খালি কেবিনটিতে ঢুকে চুপচাপ বসে। সারা দিন রোদে হোন্ডা চালানোর ফলে তাকে ক্লান্ত দেখায়। মেসিয়ার তার সামনে পিরিচে গরম জিলাপি রেখে যায়। সপ্তাহিক যুগভেরীতে পাঠানোর জন্য নিউজটি এখনই লিখে ফেলতে হয়। সে কাঁধ-ঝোলা থেকে নিউজপ্রিন্টের নোটপ্যাড বের করে টিপকলমটি হাতে নেয়। কিন্তু কী লিখবে কোনো আইডিয়া তার মাথায় আসে না। একটি নীল ডুমো মাছি এসে বসে জিলাপির পিরিচে।

নবী সাহেবের সাথে তার দেখা হয়েছে বার কয়েক। স্বভাবে রাশভারী প্রকৃতির মানুষ হলেও আচরণে তিনি ছিলেন ভারী অতিথিপরায়ণ। শাহেদ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে, তিনি বিলাত থেকে টিনে করে আনা মুচমুচে ক্রিম ক্রেকার বিস্কিটের সাথে অভেলটিন বা কফি দিয়ে আপ্যায়িত করতেন। সে ‘দুর্বারানির দিঘি’ নামে একটি সংকলন বের করতে যাচ্ছে শুনে, নবী সাহেব উৎসাহের সাথে প্রশ্নাদি করে বিস্তারিত জেনে নিয়েছিলেন। সংকলনটিতে অত্র এলাকায় প্রচলিত লোককথা ও কিংবদন্তির ওপর কয়েকটি নিবন্ধ থাকছে। এ রচনাগুলো সে স্থানীয় বয়োবৃদ্ধদের দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে। যারা লিখতে পারেননি, তাঁদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সে তৈরি করেছে অনুলিখন ভিত্তিক নিবন্ধ। সব শুনে তিনি ‘সিপাইর টুক’ নামে নুরপাশা গ্রামের কাছাকাছি আধ-জংলা একটি টিলার কাহিনি বলে তাকে চমৎকৃত করেন। সিপাহি যুদ্ধের সময় ঢাকা থেকে বিদ্রোহী হয়ে এক দল দিশি সিপাহি এ টিলায় এসে গোপনে গড়ে তুলেছিল তাঁদের আস্তানা। পরে রাতের অন্ধকারে তাঁরা ত্রিপুরা রাজ্যের ঊনকোটির দিকে চলে যায়। লোকমুখে শ্রুত পুঁথির চরণে তাঁদের বীরত্বের উল্লেখ আছে। শাহেদের অনুরোধে সিপাই টুকের ওপর নবী সাহেব ঝরঝরে বাংলায় একটি নিবন্ধও লিখে দিয়েছিলেন। লেখাটি সংগ্রহের জন্য তাঁর বাড়িতে গেলে, তিনি বৈঠকখানায় তাকে অভেলটিন পানে আপ্যায়িত করতে করতে জানতে চেয়েছিলেন, সংকলনটি মুদ্রণের জন্য তার টাকা-পয়সার প্রয়োজন আছে কি না? সুযোগ পেয়ে এ সময় শাহেদ মিন-মিন করে সামান্য চাঁদার জন্য আরজি জানিয়েছিল। পাঁচ শত টাকা পেলে সে বর্তে যেত, কিন্তু নবী সাহেব দুই হাজার টাকার একটি চেক তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে স্নেহের সুরে বলেছিলেন, ‘তুমি একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছ, ডোন্ট ফিল শাই, তোমার আরও কিছু টাকার দরকার হলেও আমাকে বলবে। আই উড বি হ্যাপি টু হেল্প ইউ।’ তখন অনুমতি নিয়ে শাহেদ তাঁর একটি ছবি তোলে।

নিউজটির সাথে নবী সাহেবের একটি ছবি দিতে পারলে ভালো হয়। বিষয়টা খেয়াল করে সে জেলা সদরের একটি স্টুডিও থেকে তাঁর ফটোগ্রাফটি প্রিন্ট করে এনেছে। ঝোলা থেকে বের করে সে ছবিটিতে চোখ বোলায়। নবী সাহেব তাঁর বৈঠকখানায় পুরোনো ধাঁচের একটি গদিওয়ালা আর্মচেয়ারে বসে আছেন। মাথার ওপরে দেয়াল থেকে ঝুলছে শিংগাল হরিণের ডালপালায় ছড়ানো কাঠের মস্তক। ঘুলঘুলি দিয়ে এক চিলতে আলো এসে পড়েছেÑ শিংটিতে জড়িয়ে বুনট করা মাকড়সার জালে। রাশভারী নবী সাহেবের অভিব্যক্তিতে খেলছে এক ধরনের চাপা কৌতূহল। আলোকচিত্রে নিরিখ করে শাহেদ তাঁর মুখখানা ফের স্টাডি করে। কিন্তু কোথাও সে অপরাধের কোনো ছায়া দেখতে পায় না। তো ছবিখানা নোটপ্যাডের পাশে সরিয়ে রেখে সে দ্রুত হাতে নিউজ আইটেমের শিরোনাম লিখে।

কেবিনের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায় পারভেজ। বছর তিনেক আগে পঞ্চমুখ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের এক আড্ডায় পারভেজ চে গুয়েভারার ‘ডাক দিয়ে যাই’ গ্রন্থটি এ যুগে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করলেÑ শাহেদ তাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। পরিণামে তাদের মধ্যে মারাত্মক রকমের হাতাহাতি হয়। এ ঘটনার পর থেকে এ তরুণ দুটির মধ্যে কথা বলাবলি বন্ধ হয়ে আছে। আজ দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতায় ব্যতিক্রম ঘটিয়ে পারভেজ জানতে চায়, জেলা সদরে গ্রেপ্তারজনিত ঘটনার বিস্তারিত বয়ান। শাহেদের মুখ থেকে সব শুনে পারভেজ তাকে বিনীতভাবে বলে, ‘নিউজটি লেখার সময় তুমি নেগেটিভ কিছু লিখবে না তো?’ শাহেদ প্রতিক্রিয়ায় কোনো জবাব না দিয়ে ইশারায় নোটপ্যাডে লেখা সংবাদের শিরোনামটি দেখায়। পারভেজ ঝুঁকে এসে পড়ে ‘সমাজহিতৈষী ব্যক্তির রহস্যজনকভাবে গ্রেপ্তার।’ অতঃপর সে মৃদুস্বরে শাহেদকে  ‘থ্যাংক ইউ’ বলে কেবিনের দোরগোড়া থেকে ফিরে চলে আসে কাউন্টারের সামনে। আজম খানের ক্যাসেটটি তুলে নিয়ে হেলমেট হাতে ভাণ্ডার থেকে বেরিয়ে কাওয়াসাকি বাইকটির কাছে যায়। ক্যাসেট প্লেয়ারে ফের বেজে ওঠে রামপ্রসাদীÑ‘দেহের মধ্যে সুজন যে জন/তার ঘরেতে ঘর করেছি/ এবার সমন এলে হৃদয় খুলে দেখাবো ভেবে রেখেছি।’

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares