কুকুর-কাব্য : দিলওয়ার হাসান

ঘুম থেকে উঠে দেখলাম ঘরে কোনো খাবার নেই। প্লাস্টিকের কৌটায় অল্পক’টা মুড়ি পড়ে আছে। গোসল করে এসে পানিতে জিভিয়ে চিনি দিয়ে খেলাম। মা শিখিয়েছিল- পানি দিয়ে মুড়ি আর পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ দিয়ে পান্তা ভাত খেলে পেট ঠান্ডা থাকে। খিদে লাগে না অনেকক্ষণ।

মতিঝিলে গিয়ে তিনটে অ্যাপ্লিকেশন ড্রপ করতে হবে। মাত্র দশটি টাকা আছে পকেটে। যাওয়া-আসার বাসভাড়া হয়ে গেলেও দুপুরের খাবারের জন্য পয়সা থাকবে না।

খুব পছন্দের একটা শার্ট গায়ে দিলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার এই শার্টটা গায়ে দিলে অন্যরকম একটা ভালোলাগার অনুভূতি আসে। নিজের ভিতর অদ্ভুত এক শক্তির সঞ্চার হয়, শার্টটাকে বন্ধুর মতো মনে হয়। সাদার ওপর নীল স্ট্রাইপ। হানড্রেট পারসেন্ট কটন। গায়ে দিতে বেশ আরাম। বড় একটা বুকপকেট আছে। মানিব্যাগ, নোটবুক, কাগজপত্র, কলম সবই রাখা যায় অনায়াসে। নামকরা একটা ব্রান্ডের হলেও মাত্র একশ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে, ডেকে ডেকে বিক্রি করছিলÑ একশ, একশ, একশ। দুজন ধুয়া তুলছিল আর একজন বিক্রি করছিল। হাতে ধরতেই পছন্দ হয়ে যায়।

জু্েতা পরতে গিয়ে দেখলাম ডান পায়েরটা সামনের দিকে ছিড়ে গেছে। জুতো পরে বেশি হাঁটলে টেকে না। আমার তো এক জোড়াই সম্বল। যেখানেই যাই, পরে যাই, সুকতলাতে ভাঙন ধরেছে, ফলে আরাম চলে গেছে। জু্েতা বেশ দামি একটা জিনিস। কবে আর এক জোড়া কিনতে পারব জানি না।

দুটো অ্যাপ্লিকেশন জমা দিতেই বারোটা বেজে গেল। কিছু কাগজ জমা নিয়ে একটা রিসিভ্ড্ সিল দিয়ে দেবে সেকেন্ডে কপিতে তাতেই এদের এত গড়িমসি।

আজ গরমও পড়েছে বেজায়। একটুখানি হাঁটলেই হাঁফিয়ে উঠছি। পানির তেষ্টাও পেয়েছিল খুব। ফুটপাতের দোকান থেকে খেলাম। দু’গ্লাস দু’টাকা নিল। একটা সিগ্রেট খেলাম। একটু দূরেই সেনাকল্যাণ ভবন। ওখানে রেখে আসতে হবে আমার ব্যাগে থাকা শেষ সিভিটা।

বিদেশি অফিস। এনট্রেন্সে নানান জিজ্ঞাসার মুখে পড়তে হলো। ঢুকতেই শান্তি। গা জুড়িয়ে গেলÑ সেন্ট্রাল এসি চলছে। রোদে জ্বলে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে মুখের ত্বক। খিদে এমন প্রবল হয়ে উঠেছে যে, মাথা ঘুরছে রীতিমতো। রিসেপশনে সুন্দরী একটা মেয়ে ফোন ধরতে-ধরতে গলদঘর্ম। একটা ফাঁক যেই পেল, তাকাল আমার দিকে। বললাম, অ্যাপ্লিকেশন জমা দিতে এসেছি। কিছু না-বলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ আর সরায় না। এ রকম অবস্থায় অস্বস্তিই হলো খানিকটা। শেষে বলল, ওই সোফাটায় গিয়ে বসুন। বসতে বসতে ভাবছিলাম, ইনিও কি আমাকে ঘোরাবেন?

ঠান্ডা ঘরটাতে একা বসে আছি। স্তব্ধতার সঙ্গে কথা বলছি যেন। মেয়েটা ক্রমাগত কথা বলে চলেছে ফোনে। তবে ধীরে। ফলে নীরবতাই বইছে চারদিকে। এর মাধ্যমেই মিষ্টি সুরে কলিংবেল বাজল। একটু পরে উর্দিপরা এক বেয়ারা এসে হাজির। হাতে খাবারের ট্রে। আমি  প্রায় হতভম্ব হয়ে বললাম, ‘আমার জন্যে?’ লোকটা বলল, ‘ম্যাডাম পাঠিয়েছেন।’ একটা ফ্রুটকেক, একটা সমুচা, একটা সাগর কলা। বেয়ারা বলল, ‘কফিতে ক চামিচ চিনি দেব?’ এ রকম প্রশ্ন উঠলে আমি সাধারণত বলিÑ দিন ইচ্ছেমতো, আজ কেন জানি বললাম ‘তিন চামিচ।’ বেয়ারা হাসল। আজকাল এত চিনি কেউ খায় না। মেয়েটা কি আমার মুখ দেখে বুঝতে পেরেছে আমি ক্ষুধার্ত? খেতে সংকোচ হচ্ছিল। জানা নেই, শোনা নেই এত আপ্যায়ন? এখন তো পরিচিত কারও অফিসে গেলে এক কাপ চা বা কফি ছাড়া আর কিছুই অফার করে না।

মেয়েটা দূর থেকে লক্ষ করছিল। বলল, ‘কী ব্যাপার খাচ্ছেন না কেন? খান’। খাদ্য মানুষের দেহ ও মনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এ জন্য খাদ্যকে বলা হয় জ্বালানি। এসপ্রেসো কফিতে চুমুক দিয়ে বুঝলাম পরিমিত চিনি দেওয়া হয়েছেÑ বেয়ারা আমার কথা শোনেনি। কফি বা চায়ে চিনি বেশি হলে আমার কাছে অখাদ্য বলে মনে হয়।

কফি শেষ হলো; কিন্তু চোখ প্রায় জল ছলছল। একজন মানুষ কী করে এতটা বোঝে? এ বোঝার ক্ষমতা ক’জন মানুষের থাকে? মেয়েটা তার ডেস্ক থেকে উঠে আমার কাছে এল। বলল, ‘অ্যাপ্লিকেশনটা দিন’।

একটা কার্ড দিয়ে বলল, ‘যখনই এদিকে আসবেন, দেখা করবেন আমার সঙ্গে। আমার নাম রিটা’। কার্ডে লেখা রিটা ডি. রোজারিও, আমি ততক্ষণে নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছি। রিটার পরনে মিনি-স্কার্ট।

হাসবার চেষ্টা করে বললাম, ‘কিন্তু ডি?’

‘ডি ফর ডায়না।’

‘দ্য গ্রেট বিউটিফুল লেডি অব দ্য ওয়ার্ল্ড।’

‘নামটা বাবা রেখেছেন।’

রিটার ডেস্কে ফোন বাজছিল টুং টুং করে। দ্রুত চলে গেল। রিটা খুব ব্যস্ত।

রিটার অফিসে জমা দেওয়া আমার সিভিটা কোয়ালিফাই করতে পারেনি। রিটাই জানিয়েছিল। খুব ভালো ভালো সিভি নাকি জমা পড়েছিল।

মতিঝিলে প্রায়ই যাওয়া হয়; কিন্তু রিটার অফিসে যাই খুব কম। গেলে না-খেয়ে আসতে দেয় না। একদিন বলল, ‘এ কিন্তু আপনার ভারি অন্যায়। মতিঝিলে এসে আমার সঙ্গে দেখা না করে চলে যান। এরপর যখনই আসবেন এদিকে, আমার সঙ্গে দেখা করে যাবেন, না হলে রাগ করব’।

রিটা আমাকে দাদা বলে ডাকে। আমি নাকি দেখতে ঠিক ওর দাদার মতো। রিটাদের বাড়ি কলাকুপা-বান্দুরা। আমার চেনা গ্রাম। কিশোরোত্তীর্ণ বয়সে ও গ্রামে আমি অনেকবার গেছি সাইকেল চালিয়ে। আমাদের শহর থেকে ঘণ্টা দুয়েক লাগত। ও গ্রামে আমার বন্ধু আছেÑ অনিমেষ বন্দ্যোপাধ্যায়। ওদের একটা গ্রামোফোন ছিল। ওর বড়দি কলকাতায় থাকত। ওখানে নতুন কোনো রেকর্ড বেরুলে পাঠিয়ে দিত, গান শোনায় আমার আগ্রহ দেখে অনি আমার নামে একটা পোস্টকার্ড ছেড়ে দিত। তাতে হয়তো লেখা থাকতÑ হেমন্ত ও শ্যামল মিত্রের পূজোর রেকর্ড পাঠিয়েছে দিদিÑ চলে আসিস। অনিমেষের মা আমাকে নানা পদের মাছ, বড়ির তরকারি, শুক্তো, অম্বল, ঘন ডাল, পায়েস রান্না করে খাওয়াতেন।

রিটাকে একদিন বললাম। ও তো অবাক। বলল, ‘অনিমেষদাদের পাশের বাড়িটাই আমাদের। নানান রকমের গাছপালা আছে দেখবেন। বাড়ির সামনে বাগান। বাবা বলতে গেলে সারাদিনই বাগানে থাকেন। গাছ লাগান, জল দেন কিংবা আগাছা সাফ করেন। বাকি সময় কাটে বাইবেল আর বই পড়ে। শেলি আর টি.এস. এলিয়ট তার প্রিয়। বাবার নাম পবিত্র গোমেজ। বান্দুরা হাইস্কুলের ইংরেজির টিচার ছিলেন।  সবাই চেনে তাকে’।

আমি চাকরি বাকরির ধান্দায় এত ব্যস্ত থাকি যে, মাকেও দেখতে যেতে পারিনে। আমাদের বাড়ি স্বর্ণকমলপুরে। ঢাকা থেকে বাসে দু’ঘণ্টার পথ। বাড়িতে বাবা-মা আর ছোট বোন থাকে।

দুটো টিউশনি করি সকাল-বিকেল। কোথাও গেলে ছাত্র-ছাত্রীদের লেখা পড়ার ক্ষতি হয়। ক’দিন পরেই স্কুল ছুটি হবে। তখন পড়ার চাপ থাকবে না। সেই সময় যাব। কতদিন যাই না। বান্দুরা থেকেও ঘুরে আসব। অনিমেষদেরও কোনো খোঁজখবর জানি না, তখন রিটাদের বাড়িতে যাব। ওদের বাড়ি ঘুরে এসে রিটাকে অবাক করে দেব।

কিন্তু আমার যাওয়া হয়ে উঠছিল না। সে সময় মায়ের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে বাধ্য হয়ে বাড়ি যেতে হলো। মায়ের অসুখটা হয়েছে উৎকণ্ঠা থেকে। ছোট বোনের বিয়ে আর আমার চাকরিটা হলে তার এই উদ্বেগ অনেকটাই কেটে যাবে, সে আমি জানি। কিন্তু দুটোর কোনোটাই সহজে হবার নয়। মাকে এসব বোঝানো কঠিন, তাকে শুধু সান্ত¦নাই দিয়ে যাই। বন্ধুদের অনেকে নানান্ জায়গায় ঢুকে পড়েছে।

বাড়িতে এলে তেমন কোথাও একটা যাই না। রান্নাঘরে বসে মায়ের সঙ্গে গল্প করি। ছোটবোনের সঙ্গে আড্ডা দিই। ওকে রিটার কথা বলেছি।

‘রিটা দেখতে অনেকটা তোর মতো। এ কথা না-জেনেই ও আমাকে দাদা বলে ডাকে। আমি নাকি ওর ভাইয়ের মতো দেখতে। তুই যে রিটার মতো একদিন বলব ওকে’।

এসব আলাপ করতে গিয়ে রিটাদের বাড়িতে যাওয়ার কথা মনে পড়ল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল ও পথে এখন বাস চলে। ঘণ্টা দেড়েক লাগে। ওখান থেকে ডাইরেক্ট বাসে ঢাকা যেতে আরও দেড় ঘণ্টা।

আমি এক সকালে বান্দুরা পৌঁছে গেলাম। ওখান থেকে ঢাকা চলে যাব। এই ছোট্ট গ্রামটাতে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। চারদিকে ঢাকার মতো দালানকোঠা। সুপার মার্কেট, ব্যাংক, স্কুল-কলেজের সুরম্য অট্টালিকা। পিচঢালা রাস্তা। শহরের মতো ঝলমলে। এ গ্রামের অনেক লোক বিদেশে থাকে। তারা মোটা অঙ্কের রেমিট্যান্স পাঠায়।

অনিমেষদের বাড়িও ওদিকটায়  গাছপালা কমে এসেছে। চিনতে পারছিলাম না। জিজ্ঞেস করতে হলে। অনিমেষ বাড়িতে নেই। এখন খুলনায় চাকরি করে। তার ছেলেপুলেরা বড় হয়ে গেছে। মাসিমা চোখে ভালো দেখতে পান না। আমার গলার আওয়াজ পেয়ে বললেন, ‘মহিবুর তুমি এতদিন পরে আইলা? তুমার মাইসা দেহ রাখচে তা-ও ধর দশ বছর। অনির লগে বোধকরি তুমার যোগাযোগ নাই অহন’!

‘ঠিকই কইচেন মাসিমা। লেখাপড়া শেষ, চাকরির লিগা ঢাকায় থাকি এখন। আপনের শরিল কেমুন’?

‘ভালো না বাবা। নানান ব্যারাম। বুইড়া অইলে যা হয় আরকি! তুমি কি বিবাহ করছ মহিবুর’?

‘না মাসিমা। চাকরিই পাই নাই অহনতুরি’।

অনিমেষের পিচ্চি বোনটা এখন যুবতী। আমাকে দেখে লজ্জা পাচ্ছিল। ছোটবেলায় খুব গল্প করত আমার সঙ্গে। মাসিমা বললেন, ‘অমিতারে দেখলা তো? সেয়ানা হইছে। ওর লিগা একটা পাত্র দেইখো চাকরিওয়ালা। ব্রাক্ষণ হইতে হইব এমুন না, কায়স্থ হইলেও চলব। বেশি কিছু দেওনের অবস্থা নাই। অনিমেষ তেমুন একটা ভালো চাকরি করে না। সবদিক সামাল দিবার পারে না’।

অনিমেষের বউ দুপুরের খাবারে বেশ কপদ হাজির করল আমি বললাম, ‘এতকিছু করনের দরকার আছিল না বউদি। ম্যালা কষ্ট হইল আপনের’।

‘কী আর করতে পারলাম দাদা। এই প্রথম দেকলাম আপনাকে। এরপর সংবাদ দিয়ে আইসেন’।

অমিতাকে নিয়ে রিটাদের বাড়ি গেলাম। রাস্তায় অমিতা বলল, ‘রিটা দিদিরে আপনে কেমনে চিনলেন? সে কিন্তু খুব সুন্দর’।

‘তুমিও তো সুন্দর’।

‘ইস্ কী যে কন দাদা’।

‘রিটা কিন্তু সব সময় সেজেগুঁজে থাকে। মিনি-স্কার্ট পরে অফিসে যায়, বিদেশি একটা ফার্মে চাকরি করে। ওখানেই পরিচয়। আমাকে দাদা ডাকে। খুব ভালো মেয়ে’।

‘এইখানে আসলে শাড়ি পরে’।

রিটাদের বাড়িতে গিয়ে বললাম, ‘আমি রিটার দাদা’। ওখানে রিটার বাবা ছিলেন। বললেন, ‘তাই নাকি? কাছে এসে বসো। রিটার ভাই যখন ভালো করে চিনে নিই। হা হা হা’।

তার হাসি অনেকটা দূর অবধি ছড়াল। রিটার মা রান্নাঘরে ছিলেন। ছুটে এলেন।

‘কে, কে এসেছে’?

‘দেখ এসে রিটার ভাই। তোমার আর এক পুত্র’।

স্বামীর মতো প্রগল্ভ নন। একটুখাানি গম্ভীরও হয়তো।

‘কী বল এসব’?

‘দেখ, ওইতো বসে আছে। তরতাজা জোয়ান’।

বললাম, ‘আমি রিটার অফিসে যাই। ও আমাকে দাদা ডাকে। আমি নাকি ওর ভাইয়ের মতো দেখতে’।

রিটার বাবা বললেন, ‘সে ঠিকই বলেছে। হেনরি বাড়িতে নেই। থাকলে নিজেই দেখতে’।

বললাম, ‘আপনাদের পাশের বাড়ির অনিমেষ বন্দ্যোপাধ্যায় আমার বন্ধু। রিটা আমাকে বলেছিল, ওদের পাশের বাড়িটাই আমাদের। তাই দেখা করতে এলাম। একটু পরেই ঢাকার দিকে রওনা দেব’।

হরেক রকমের খাবার পরিবেশন করার সময় রিটার মা বললেন, ‘তোমার সঙ্গে কি রিটার দেখা হবে এর মধ্যে’?

‘হ্যাঁ, তাতো হবেই’।

‘আমি যদি কিছু দিই ওকে দিতে পারবে’?

‘অবশ্যই’।

রিটার মা আচার থেকে শুরু করে নাড়ু-মুড়ি, গাছের কতবেল, পেপে-জাম্বুরার একটা বড় পোটলা আমার হাতে তুলে দিলেন।

পরের দিন সেই পোটলা পেয়ে রিটা ভারি খুশি। মনে হলো এখনই চোখ থেকে টপটপ জল ঝরবে।

বলল, ‘আমাকে একবার বলে গেলে পারতেন’।

‘তা পারতাম কিন্তু আকস্মিক প্রাপ্তির আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে তুমি। তোমার বাবা-মা আমাকে তোমারই মতোন স্নেহাদর করেছেন। হেনরি বাইরে ছিল বলে ওর সঙ্গে দেখা হয়নি। আমাকে তোমাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল অমিতা।

‘ওহ্ অমিতা। অ্যা বিউটিফুল গার্ল অ্যান্ড নাইস গাই’।

‘ওর মা ওর জন্যে একটা পাত্র দেখতে বলেছেন। আমি সেই দায়িত্বের খানিকটা নিতে তোমাকে অনুরোধ করছি’।

‘অফকোর্স আই উড। আমাদের সৎ প্রতিবেশী’।

‘তোমাকে একদিন আমাদের বাড়ি নিয়ে যাব রিটা। বেশি দূরে না, সকালে গিয়ে সন্ধ্যার আগেই ফিরতে পারবে যদি না থাকতে চাও। আমার বোনটা তোমারই মতো। আমার মায়ের হাতের খিচুড়ি আর মাংস খেলে ভুলতে পারবে না’।

‘অবশ্যই যাব কোনো এক শুক্রবার। খিচুড়ির লোভে নয়। আমাদের বাড়ির পাশের নতুন একটা জায়গা দেখতে। আপনাদের ওদিকটায় কখনও যাইনি’।

‘দেখার মতো অনেক কিছুই পাবে ওখানে’।

টেলিফোন বাজল। ও উঠে গেল। আমি চলে এলাম।

অনেক দিন পরে আজ গিয়েছিলাম রিটার অফিসে, প্রচুর খিদে লেগেছিল। পকেটে পয়সা ছিল না; রিটা একদিনের ক্যাজুয়াল লিভে। ওর সহকর্মী আমাকে কফি অফার করল। ভদ্রতা রক্ষা করে খেলাম, কিন্তু পেটের ভেতর আগুন ধরে গেল। এমটি স্টমাকে চা-কফি কিংবা মদ খেতে নেই।

উঠে এলাম। নির্ঘাৎ উপোষ দিতে হবে আজ। স্নান করে লম্বা একটা ঘুম দিতে পারলে বিকেল পর্যন্ত নিশ্চিন্ত।

শাপলার মোড়ে এসে দেখি বাসটাস কিছু নেই। শাহবাগে কী একটা গোলমাল হয়েছে বলে পল্টন মোড় থেকে সব গাড়ি ডাইভার্ট করে দিচ্ছে। হেঁটে পল্টন মোড়ে এলাম। তীব্র রোদ আর প্রচণ্ড ক্ষুধায় মাথা ঘুরছিল। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আর একটু এগুলেই পল্টন মোড়।

উল্টো দিকের রাস্তার মাঝখানে একটা কুকুর পড়ে আছে। মরে গেছে মনে হয়। কেউ দেখছে না। ও পাশে থেকে একটা মেয়ে কুকুরটার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছে। গাড়ি আর রিকশার জন্য বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে বারবার। ওর সঙ্গে আর একটা মেয়ে। নিজের ব্যাগটা অন্য একটা মেয়ের হাতে দিয়ে কুকুরটার কাছে পৌঁছে গেল। পরখ করল বেঁচে আছে কিনা। কুকুরটাকে  বুকের সঙ্গে চেপে ধরে হাঁটতে লাগল। বিস্ফারিত চোখে মেয়েটার মুখের দিকে তাকালামÑ রিটা।

ততক্ষণ খুব জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করেছে। সঙ্গে থাকা মেয়েটা তাকে অনুসরণ করছে। আমি চিৎকার করে উঠলামÑ রিটা রিটা রিটা। কোনো দিকে খেয়াল নেই।

তখনই আমার তলপেটে তীব্র একটা মোচড় অনুভব করলাম। সারা শরীর গুলিয়ে উঠল। পেট্রল পাম্পটার পাশের ডাস্টবিনে গল গল করে বমি করে দিলাম। সেই সকালে খাওয়া একটা রুটি টক-তিতে পানির সঙ্গে বেরিয়ে এল। তীব্র মাথাব্যথায় মনে হলো এখনই পড়ে যাব।

কোনো মানুষ আমার দিকে ফিরেও তাকাল না। একটা নেড়ি কুত্তা আমার পাশে ঘুরঘুর করছিল। আমাকে বমি করতে দেখে কাছে এল। জিন্সের প্যান্টে নাক ঘষল, তারপর চাটতে লাগল। মনে হলো কেউ যেন আদর করছে আমাকে। হয় তো মা-ই, আমি কুকুরটার মাথায় হাত রাখলাম। আদর করে দিলাম একটুখানি।

একটা মানুষ যাচ্ছিল আমার পাশ দিয়ে। সে ঝাড়িমারা কণ্ঠে বলল, ‘ওই মিয়া, দ্যাখেন না একটা কুত্তা আপনেরে নাপাক করে দিচ্ছে।’ আমি লোকটার দিকে তাকালাম না। কুকুরটা তখন আমার পায়ের কাছে বসে পড়েছে। জুতোর ওপর মাথা ঘষছে।

একটার পর একটা বাস চলে যাচ্ছে। প্রচণ্ড ভিড়। বানরের মতো মানুষ ঝুলছে বাসের গেটে। উঠতে পারছিলাম না। মরিয়া হয়ে একটা ভরা বাসের গেটের ভেতর প্রাণপণে নিজেকে সেঁধিয়ে দিলাম। ত্যক্ত বিরক্ত যাত্রীদের প্রচণ্ড ধাক্কায় মুহূর্তের মধ্যে বাসের ভেতরে রড ধরে বাদুড়ঝোলা হলাম।

বাস থেকে নেমে মাতালের মতো এঁকেবেঁকে পা ফেলে বাসায় পৌঁছলাম। চোখে সর্ষেফুল দেখছিলাম বিছানায় শুয়ে। স্নান করতে ইচ্ছে হলোÑ উঠতে পারলাম না। কে যেন নক করছে দরজায়। খুলে দেখলাম বাইরে অন্ধকার। রাত হয়ে গেছে। ক’টা বাজে এখন! ঘড়ি নেই। পাশের বাড়ির ছেলে মন্টু। বলল, ‘মা পাঠিয়েছে। আজ রাতে আমাদের বাসায় খাবেন। মা বিরিয়ানি আর কী সব রান্না করেছে’।

‘আমি তো যেতে পারব না রে। শরীর খুব খারাপ। তোদের বাসায় আজ কি কোনো উৎসব’?

‘না তো, কেন মামা’?

‘না, ওই যে বললি বিরিয়ানি টিরিয়ানি…’

‘এমনি। মা মাঝেমধ্যে করে। আচ্ছা তুমি শুয়ে থাকো। আমি খাবার নিয়ে আসি’।

‘আমি বাথরুমে ঢুকি। ঠান্ডা পানি মুহূর্তের মধ্যে আমাকে চনমনে করে তোলে, মাথার ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে আছে।…’

মন্টুর রেখে যাওয়া খাবার খেয়ে প্রাণ ফিরে পাই। বেশ ক’গ্লাস পানি খেয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকি। সিগারেট ধরাই। তখন রিটার কথা মনে পড়ে। কুকুরটা নিয়ে কোথায় গেল সে? রিটা শুধু মানুষই ভালোবাসে না, কুকুরের মতো তুচ্ছ প্রাণীও ভালবাসে। একটা মৃত কুকুরকে বুকে তুলে নিল অবলীলায়! আমার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। কান্না পেল।

টেবিলে গিয়ে বসলাম। কুকুর বুকে নিয়ে দ্রুত হেঁটে চলেছে রিটা, তার পেছনে একটা মেয়ে। চোখের সামনে ভাসছে। আমি একটা সাদা কাগজের ওপর লিখলাম:

কুকুরের প্রভুভক্তি নিয়ে কারও সংশয় না থাকলেও তাদের নিয়ে যে ভক্তিরসাত্মক পালাগান রচিত হয়েছে জানে তা ক’জন?

আর ওই যে এখন শীতের মিহি রোদে রাস্তার মাঝখানে একটা কুকুরকে নিশ্চল পড়ে থাকতে দেখে দাঁড়াল না কেউ, একটা মেয়েই শুধু দেখল তাকিয়ে তখন।

কী করে যায় সে ছুটে অকুস্থলে, চলছে গাড়িঘোড়া হরেক রকম।

সঙ্গীর হাতে ব্যাগটা গছিয়ে পৌঁছুল যখন কুকুর তখনও পড়ে আছে আগের মতোন, বেঁচে নেই এই অনুমান।

তবুও ওঠাল বুকে, না কোনো সম্ভাবনা নেই আর, রক্ত-মগজে একাকার, নামল রাস্তার কিনারে আবার।

কুকুরের শোকার্ত সঙ্গী পিছু নেয়, কাঁদে কুঁঁকুঁ করে,কে রাখে খবর? এখন মেয়েটা চলে যাবে তাকে একা ফেলে পথচারীদের এই অনুমান- কুকুরের লাশের দাফন হয় এই কথা শুনেছে ক’জন?

মেয়েটার বুকে তখনও কুকুরের লাশ, সোজা হেঁটে যায়, অন্য কোনো দিকে নাইকো নজর। এখন সে কোথায় যাবে!

কথাটা জানা আছে কার? এত প্রেম কোথা থেকে এল মেয়েটার মনে?

এই জিজ্ঞাসা এখন সবার? প্রেম নারীর ভেতর সর্বদাই থাকে প্রেমিক যা অহর্নিশ মাগে, তবে কি সে সেখান থেকেই কুকুরটাকে একটুখানি দিল, সব দ্বিধা ভুলে?…

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares