রহিমচাচার ডেরা : বীথি চট্টোপাধ্যায়

কলেজে পড়বার সময় থেকেই শুনেছি যে কলকাতার অনেক জায়গায় নাকি ভূত আছে। রাইটার্স বিল্ডিং তো একসময় নাকি ভূতেদের একচ্ছত্র আস্তানা ছিল। আমি যখন কম বয়েসে পায়ে হেঁটে কলকাতাকে দেখেছি অথবা এখন যখন গাড়ি থেকে কলকাতাকে দেখি তখন এই ভূতের বিষয়টি প্রায়ই মনে আসে। একদিন বিকেলে পুরোনো নিউ মার্কেটের ভিতর ঘুরছিলাম। বেশ কয়েক বছর পর নিউ মার্কেটে গিয়েছিলাম সেবার। কলকাতায় ইতোমধ্যে বহু শপিংমল তৈরি হয়েছে। সাউথ সিটি মল, কোয়েস্ট মল, আক্রোপেলিস মল আরও কত কী। এইসব মলে যা যা পাওয়া যায় নিউ মার্কেটে সেই সবই পাওয়া যায়,  আবার নতুন নতুন মলে যা কিছু পাওয়া যায় না তাও পাওয়া যায় নিউ মার্কেটে। দশ টাকার জিনিস পাওয়া যায়, দশ লক্ষ টাকার জিনিস পাওয়া যায়। এইসব ভাবতে ভাবতে নিউ মার্কেটে ঘুরছিলাম। সস্তায় শ্বেত পাথরের টেবিল, শোপিস পাওয়া যেত এখানকার একটা দোকানে। সেই দোকানটা খুঁজছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম দোকানটা গেল কোথায়?

আমি তো দোকানটা স্পষ্ট চিনি। নাহুমস বলে এখানে যে বিখ্যাত কেকের দোকান তার বিপরীতেই তো ছিল সেই দোকান। বছর খানেক হবে এদিকে আসা হয়নি তারমধ্যে দোকানটা উঠে গেল নাকি? নাহুমসের সামনে দাঁড়িয়ে এধার ওধার দেখছি। পা-দুখানি ভারী ভারী লাগছে,  ক্লান্ত লাগছে। এমন সময় আমার পিছন থেকে বেরিয়ে এলেন রহিম চাচা। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, মাথায় টুপি, ছোটখাটো চেহারা। বেশ অবাক হলাম। প্রায় কুড়ি বছর রহিম চাচাকে দেখিনি। আমি ভেবেছিলাম উনি বুঝি আর নেই। উনি নিউ মার্কেটে কুলি ছিলেন প্রথমে তারপর ধীরে ধীরে নিউ মার্কেটের অনেক কিছু উনি শাসন করতে শুরু করেন। হকারের থেকে কমিশন, জিনিসের বিক্রি  থেকে বখরা, কোন ভিখিরি কোথায় বসবেন এসব বিষয়ে ওঁর অধিকার জন্মায়। মার্কেটে অনেকগুলো দোকানের মালিক হয়ে যান রহিম মিয়া। বহুযুগ আগে তখন আমি কলেজে পড়ি নিউ মার্কেটের আনাচে কানাচে রহিম মিয়ার দাপট দেখেছি। তবে সাধারণ খদ্দেরদের সবসময় সাহায্য করতেন রহিম মিয়া আর তাঁর লোকজন।  আমি যখন কলেজের গণ্ডি পেরোইনি তখন থেকে রহিম মিয়াকে চিনি, উনিও আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করতেন যেন আমি ওর খুব কোনো আপনজন। কলেজের ছাত্রদের হাতে তখন পয়সা থাকত না একেবারে। পুজোর বাজার করতে বা বড়দিনে নিউ মার্কেটে বেড়াতে এলে প্রায়ই রহিম মিয়া বলে দিতেন কোথায় পাবো শাড়ির পাড়, জামায় বসানোর লেস। নিজের লোক দিয়ে দোকান চিনিয়ে দিয়ে আসতেন। তখন তো তাঁর লোকজনের হাতে সেভাবে বকশিস দিতে পারতাম না কিন্তু রহিম চাচা প্রতিবারই সাহায্য করতেন। বিশাল আকারের চারটি কুকুর ছিল তাঁর। তারা রহিম চাচার দুপাশে সার বেঁধে শুয়ে থাকত। একটা বেড়াল থাকত রহিম চাচার কোলে। তার নাম নুরি। যখন রহিম চাচার সঙ্গে আমার একটা পাকাপাকি স্নেহ-ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল তখন নুরিকে কত কোলে নিয়েছি। নুরি ছিল যেন ঠিক রহিম চাচার মেয়ে, তার মানে সে আমার বোন হতো সম্পর্কে। তবে নুরি বোধহয় আগন্তুকদের এত আদিখ্যেতা পছন্দ করত না। কোলে নিলে ঝটপট করে নেমে যেত, ঢুকে যেত টেবিলের তলায়। কিছু কিছু ব্যক্তিগত কথা হতো রহিম চাচার সঙ্গে। বছরের পর বছর ধরে বলা টুকরো টুকরো কথা সেসব। জেনেছিলাম ছেচল্লিশের দাঙ্গায় রহিম চাচার পুরো পরিবারটি ধ্বংস হয়। রহিম চাচার বয়স তখন আট বছর। আল্লাহর মর্জিতে তিনি বেঁচে যান। মসজিদের সামনে বসে ভিক্ষে করতেন ছোটবেলায়। তারপর কুলি,  তারপর রীতিমতো মস্তান হয়ে ওঠেন। তাঁর নামে নাকি মানুষ খুনের মামলাও হয়েছিল। প্রমাণ করা যায়নি। রহিম চাচা মাথা নেড়ে নেড়ে এসব বলতেন। নিউ মার্কেটে আমার তেষ্টা পেলে, দোকানে দোকানে ঘুরে পা ব্যথা করলে রহিম চাচার দোকানে বসে বিশ্রাম নিতাম। তারপর একদিন দেখলাম রহিম চাচার কোলশূন্য। সেখানে নুরি নেই। নুরি না ফেরার দেশে চলে গেছে। শূন্য কোলে রহিম চাচাকে কী উদাস দেখাচ্ছিল। নুরি যেভাবে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল সেভাবে আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে গেল রহিম চাচার দোকানের বুড়ো কর্মচারী, সময়ের নিয়মে উবে গেল ওঁর কুকুর। চারপাশের কত দোকান বদলে গেল। হয়তো ছিল কাপড়ের দোকান হয়ে গেল বাসনের। রহিম চাচার বয়েস বেড়ে চলল। নতুন মস্তান উঠে এলো মহল্লায়। রহিম চাচা পুরাদস্তুর দোকানদার হয়ে গেলেন। আমিও বাউন্ডুলে ছাত্র থেকে হলাম হিসাবি নাগরিক। কিন্তু আমাদের পুরোনো সম্পর্ক বজায় ছিল। এরপর একদিন নিউ মার্কেটে গিয়ে আর রহিম চাচাকে দেখলাম না। তাঁর কাপড়ের দোকানে তাঁর চেয়ারটি দেখলাম শূন্য। তারপর একদিন দেখলাম তাঁর কাপড়ের দোকানে অন্য এক মাড়োয়ারি ভদ্রোলোক। তিনি খুব ভক্তিভরে মা লক্ষ্মী আর গনেশের ছবিতে মালা পরাচ্ছেন। বছর দুই পরে সেই মাড়োয়ারি ভদ্রলোকটিকেও আর দেখা গেল না। ওই কাপড়ের দোকানে গড়ে উঠল একটি ছোট বিউটি পারলার। এক আংলো ইন্ডিয়ান মহিলাকে সেখানে বসে থাকতে দেখলাম একবার। ক্রমে কেটে গিয়েছে প্রায় কুড়ি বছর। আমার নিজের নিউ মার্কেট যাওয়া এখন প্রায় হয়েই ওঠে না। হঠাৎ কিছুদিন আগে আমার বাড়ির একটা খুব পুরোনো শ্বেত পাথরের টেবিল ভেঙে গেল। ওই রকম আর একটা টেবিল কোথাও পাই না। আবার অনেকদিন পরে গেলাম নিউ মার্কেটে। কিন্তু শ্বেত পাথরের জিনিস বিক্রি হতো যে দোকানে সেটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হাঁপিয়ে উঠছিলাম। সেই সময় আকস্মিক সামনে এসে পড়ল রহিম চাচা! এতদিন পরে! চেহারা তো বিশেষ কিছুই বদলায়নি! আমাকে বললেন ‘আর আসেন না তো এদিকে? আমাদের ভুলে গিয়েছেন?’ আমি কিছুটা বিহ্বল হয়ে বললাম ‘এদিকে আসা হয় না এখন খুব একটা কিন্তু আপনাদের কী ভুলতে পারি, রহিম চাচা? আমি তো আপনাকে খুঁজেছিলাম। আপনি কোথায় ছিলেন এতদিন।’ রহিম চাচা হাসলেন ‘রিস্তেদারের কাছে।’ বলে আমাকে হাত নেড়ে ডেকে নিজে হাঁটতে শুরু করলেন। এই ভঙ্গি আমি খুব চিনি। রহিম চাচা এবার আমাকে দোকানটা চিনিয়ে দেবেন। আমি হাঁটলাম ওঁর পেছন পেছন। নিউ মার্কেটের পেছনে একটা দোকান দেখিয়ে দিলেন আঙুল তুলে। সেটা শ্বেত পাথরের আসবাবের দোকান। এই দোকানটা আমি চিনতাম না। যে দোকানটা চিনতাম তার মানে সেটা আর নেই। দোকানে ঢুকবার আগে রহিম চাচাকে বললাম ‘আসুন আপনিও’। উনি বললেন ‘আপনি যান, কিনুন জিনিস। আমি এখানেই আছি। এখানেই থাকব।’

পছন্দ মতো টেবিল কেনা হল। দোকান থেকে ওরা টেবিল বাড়িতে দিয়ে যাবে টেম্পো করে সেই ব্যবস্থা করলাম। দোকান থেকে বেরিয়ে রহিম চাচাকে খুঁজছি। ওঁর কাছে বিদায় নেব বলে, কথা বলব বলে। কিন্তু কোথায় গেলেন রহিম চাচা? আমাকে যে বললেন ‘এখানেই আছি, এখানেই থাকব।’ এতদিন পরে উনি কোথা থেকে এলেন? কুড়ি বছর পার হয়ে যাওয়ার কোনো ছাপ নেই কেন ওঁর চেহারায়? আমার বয়স বেড়েছে কিন্তু রহিম চাচার বয়স বাড়েনি কেন? আমি যে শ্বেত পাথরের টেবিল খুঁজছি তা উনি জানলেন কীভাবে? অদ্ভুত! আমি দোকানটা চিনতাম বলে আশপাশে কাউকে তো জিজ্ঞাসাও করিনি কিছু। রহিম চাচা বুঝি এখন না-বলা কথা বুঝতে পারেন?

পুরোনো নিউ মার্কেটের ওপর অন্ধকার নেমে আসছে। জায়গাটা ফাঁকা। চারপাশের পুরোনো শ্যাওলা ধরা দেওয়ালগুলো গম্ভীর। ফিরব বলে পা বাড়ালাম। কোনো পুরোনো দেওয়ালের পাশে হয়তো রহিম চাচা দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares