কানা ব্যাওড়া : মঈন আহমেদ

চুতমারানির মাগি! তুই আমারে চেনস্?

কথাটা শেষ না হতেই সাড়ে তিন হাত উঁচু কুসুমের ঝাঁকড়া চুলের কানড় ধরে ঘরের মাঝখানে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশের খুঁটির সাথে মাথাটা ঠুকে দিলো মাতাল শরফু। মাটির উপর থেকে বাঁশের পঞ্চম গিঁটের ফুটে থাকা কাটা অংশে কুসুমের কপালটা ঠোকর খেয়ে একটু কেটে গেল। কুসুম সেদিকে ভ্রুক্ষেপই করল না। সে শরফুর চিকন থোড়ের মতো শিশ্নটার নিচে ঝুলে থাকা অণ্ডকোষে গায়ের সমস্ত জোর খাটিয়ে একটা চাপ দিলো। শরফু ‘ও মা!’ চিৎকার ছুড়ে খোঁপা ছেড়ে অদূরে মেঝে পাতানো সবুজরঙা চাদরে ঢাকা পাতলা তোশকের উপর ছিটকে পড়ল।

কুসুম খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠলÑ তুই মোরে চেনো? মুই গাঙ পারের মাইয়া। তোর মতো ব্যাওড়ারে থ্যাতলাতে এক মিনিট লাগবে। দাও দিয়া এক কোপে গর্দান দিয়া কল্লা নামাইয়া হালামু।

বলতে বলতে অগ্নিকোণে শিলের উপরে রাখা মোটা নোড়া হাতে তুলে ঘুরে দাঁড়ালো। কুসুম জেদের ঝোঁকে নোড়াটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অনুভব করল যে পুতাটা অতিরিক্ত ভারী। ওটা দিয়ে ব্যাওড়ার মাথায় একটা আঘাত করলে পাটার উপরে শক্ত হলুদ যেভাবে নেতিয়ে যায় কানা ব্যাওড়াও এক মুহূর্তে থেতলে যাবে। কিন্তু পুতা তুলে আঘাত করা তো দূরে থাক সেটা এখন হাত পিছলে পড়ে যেতে চাচ্ছে। পাটাটা পাকা মেঝে পড়লে ভেঙে যেতে পারে কিংবা কার্বাইড রাঙা মেঝেটা ভেঙে ফাটল ধরতে পারে। উভয়তেই শংকট উপস্থিত হবে। নোড়াটা ভেঙে গেলে তার আয়ের পথ বন্ধ হবে আর গৃহতল যদি ভাঙে তো বাড়িঅলা ঝাঁটাবে। সে তাড়াতাড়ি পুতাটা যথাস্থানে রেখে সেখানেই বিলাপ করতে বসল।

শরফুর কোনো সাড়া শব্দ নাই। সে কেন্নোর মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে অণ্ডকোষ ধরে শুয়ে শুয়ে বড় বড় প্রশ্বাস নিতে থাকল। মাগিটা আজকে একটু বেশি জোরেই চাপ দিয়ে দিয়েছে। খানকি মাগি।

কাল সকালে তোরে দেখাবো। তোর দিন না আমার দিন। আমারে তুই চেনস না। আমি হচ্ছি গিয়ে কানা ব্যাওড়া। শরফু গুলিয়ে ওঠা অণ্ডকোষের বিষম যন্ত্রণার উপশম করতে মনে মনে এমনভাবে আওড়াল যেন সে একটা বিরল কেউকেটা।

এরকম প্রত্যেকবারই আওড়ায়। অন্ধকার ঘুচিয়ে পরের সকালের জ্যোতি তার মন থেকেও সকল আঁধার দূর করে দেয়। বেলা করে ঘুম থেকে জেগে উঠে কত তাড়াতাড়ি ঘর থেকে ছিটকে বের হবে তার তখন সেই প্রস্তুতি চলে। বেমালুম ভুলে যায় গতরাতে ঘটে যাওয়া ঘটনার বৃত্তান্ত। এই ভালো।

বিলাপ শুনে বেড়ার ওপাশ থেকে মর্জিনা খালা কুসুমের উদ্দেশে চেঁচিয়ে বলল, এবার থাম। একটু ঘুমাতে দে।

কুসুম মর্জিনা খালার শাসানি খেয়ে গলার স্বর একটু নামিয়ে নিল। কিছুক্ষণ মিন মিন করে কানা ব্যাওড়াকে ডিঙিয়ে বিছানায় গিয়ে তারই পাশে পাছা উল্টে শুয়ে পড়ল।

কানা ব্যাওড়া ঘরে ফিরে আজ হঠাৎই ভাত চেয়েছিল। কুসুম ভাত দেবে কী! ঘরে চাল থাকতে হবে তো! চাল না হয় মর্জিনা খালার কাছ থেকে ছোট এক কুনকে নেওয়া যেত কিন্তু চাল ফুটত কিসে? কেরোসিনের স্টোভে একটুও তেল নেই। ঘরে কোনো সালন করার সবজিও ছিল না। আর এমনিতে কানা ব্যাওড়া ঘরে ফিরে কিছু খায় না। টলতে টলতে ভাগ্যিস অন্য কারও দরজা না ঠেলে ঠিকমতো হাট-খোলা দরজা গলে নিজের ঘরে ঢুকে সটান বিছানায় গিয়ে কুঁকড়িমুকড়ি মেরে ঘুমিয়ে পড়ে। শরফুর অপেক্ষায় কুসুম দরজা খুলে রেখে ঝিমুতে ঝিমুতে চুল থেকে উকুন টেনে দু আঙুলের ফাঁকে নিয়ে পুটুস শব্দে এক একটা নিধন করে। বড় জ্বালাতন করে ডাঁসা ডাঁসা উকুনগুলো।

শরফুর নেশায় চিড় থাকলে কোনো-কোনোদিন কুসুমের বোতাম ছেঁড়া ব্লাউজের ভেতর হাত ঢুকিয়ে হাতড়াতে থাকে। কুসুমের তখন দম বন্ধ হয়ে আসে। প্রশ্বাস নিতে পারে না। ব্যাওড়ার শরীরের সাথে নিবিড় হয়ে থাকতে না পারার কারণ ব্যাওড়ার মুখ থেকে বাংলা মদের ভক ভক দুর্গন্ধ বের হয়। যন্ত্রণা বেশিক্ষণ সহ্য করতে হয় না কুসুমকে, দু-চার পল কিম্বা দু-চার মিনিট। তারপর আপনা-আপনি ঘুমে তলিয়ে যায় ব্যাওড়া। কুসুম তখন নিজেকে ছাড়িয়ে হাঁফ ছাড়ে, মুখ ফিরিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে। যাক বাবা আজকের মতো বাঁচা গেল!

কানা ব্যাওড়ার জীবনটা বৈচিত্র্যময়। কানা ব্যাওড়া হওয়ার আগে তাকে সবাই শরফু নামেই ডাকত। পিতৃ প্রদত্ত শরফুদ্দিন নামটি ক্রমে ব্যাওড়া থেকে কানা ব্যাওড়া নামে পরিচিতি পেয়েছে।

শরফুদ্দিন ঢাকা শহরে এসেছে মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি নতুন দেশের অভ্যুদয়ের মাত্র চার বছর পরে। তখন বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষের মুখে আহার জোগাতে কী হিমসিমই না খাচ্ছেন!

ঠিক সেই সময় গলাধাক্কা খেয়ে পাঁচশ টাকা সম্বল নিয়ে বেনাপুল এলাকার সীমানা বেড়া ডিঙিয়ে বাংলাদেশে শরফুদ্দিন প্রবেশ করে। তারপর যশোহর এসে সোহাগ কোম্পানির একটা সুপিরিয়ার কোচে চড়ে চলে আসে ঢাকায়Ñ রথখোলায় ১ নম্বর লালচান মুকিম লেনে অবস্থিত ইটের দাঁত বেরিয়ে পড়া দোতলা ফুপুর বাসায়। নিজের দেশ, মা-বাপ আর ছোট বোনকে ছেড়ে আসতে চায়নি শরফু।

শরফু ঢ্যাঙ ঢ্যাঙ করে কলকাতার ফুটপাতে ফুটপাতে অকারণে ঘুরে বেড়াতো, সময় কাটাতো। পেন্সিলের মতো ছ ফুটের ভাতিজাকে সন্তানহারা ফুফু নিজের কাছে বেশ আশা করেই ডেকে নিয়েছিলেন।

পঞ্চাশ সালের গোড়ার দিকে দুজাহাজ বোঝাই করে হিন্দুর দেশ পশ্চিম বাংলা ছেড়ে মুসলমানের নতুন দেশ পূর্বপাকিস্তানে শরফুদ্দিনের ফুফু আর ফুপা আরও অনেক পরিবারের সাথে এসে ডেরা গাঁথেন। বুড়িগঙ্গার পাড়ে নেমে রিফ্যুজি ক্যাম্পে না উঠে ভাড়ার ঘর খোঁজ করতে থাকেন। তার সন্ধানরত চোখ একজন কুট্টি দালালের ওপর গিয়ে পড়ে। দালাল পান চিবুতে চিবুতে লুঙ্গির খুঁট হাতে ধরে তার কাছে এসে দাঁড়ায়।

গর্দানবিহীন জোয়ান শক্ত শরীরের আবু হেনা কুট্টির কথায় মজে যান। সেই কুট্টি তাকে চার’শ রুপির বিনিময়ে এই লালচান মুকিম লেনের বুনিয়াদি কোনো হিন্দু পরিবারের দখলকৃত দোতলা বাড়িটির দখলদারিত্ব দিয়ে দেয়। অল্প টাকার বিনিময়ে এরকম একটা বাড়ি পেয়ে তিনি মহা খুশি। কিন্তু কুট্টি তাকে জ্বালাতন করতে থাকে। সময় অসময় পান চিবুতে চিবুতে কদর্য পুরু ঠোঁট নিয়ে মাঝে মাঝেই এসে কড়া নাড়ে। দখলদারিত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার অজুহাতে দুই বছরে সে আরও হাজারখানেক রুপি হাতিয়ে নেয়।

আবু হেনা উপায় খুঁজতে থাকেন। কোট কাছারির সামনে টুলের ওপর ঠ্যাঙ তুলে বসে চা খেতে খেতে অজ পাড়াগাঁ থেকে আসা অশিক্ষিত অসহায় মানুষদের উপায় বাতলে দিয়ে এক রুপি দু রুপি আদায় করেন। উকিলকে মক্কেল ধরিয়ে দেন। সেখান থেকেও আসে দুচার টাকা। এইভাবে কয়েকজন উকিল মোক্তারের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। তাদেরই পরামর্শে তিনি বাড়ির একটা দলিল তৈরি করে কুট্টিকে আরও পাঁচ’শ টাকা দিয়ে নাজাত পান। সেই থেকে ক্রয়সূত্রে বাড়ির মালিক হয়ে যান আবু হেনা।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দোআঁশলা বনে ঢাকাতেই থেকে যান। বয়স তখন পঁয়তাল্লিশ পেরিয়েছে। তিনি পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে কোনো মাতামাতি করেননি কিংবা বাংলাদেশের বিপক্ষেও কোনো কার্যকলাপ করেননি। তবে রাত্রিবেলায় গোপনে এম আর আখতার মকুলের ‘চরমপত্র’ শুনতেন। মশারির ভিতরে স্বামী স্ত্রী হাসতে হাসতে আত্মতৃপ্তি বা আহ্লাদে নয় তবে মুকুলের বাচন শরীরের কোষমণ্ডলীতে ক্রিয়া করা উত্তেজনায় একটু বেশি জড়াজড়ি করে ফেলতেন, এই যা।

দেশ শত্রু মুক্ত হওয়ার পরে আবু হেনার কাছে দ্বিতীয় সুযোগ আসে। হায়দ্রাবাদি বিহারি নিরপরাধ এক কাঁচা দম্পতিকে নিজের ঘরে আশ্রয় দিয়ে তাদের জীবন রক্ষা করেন। এটা তার জীবনের একটা পুণ্যের কাজ। ফলও পেয়ে যান হাতেনাতে। এক বছর তাদের আশ্রয় দিয়ে নিজের ঘরেই রাখেন। কোনো বিভ্রাট সৃষ্টি হতে দেননি। পাঁচিলে বসা কাককেও উঁকিঝুকি দিতে দেননি। ছেই ছেই করে তাড়িয়ে দিয়েছেন। বিনিময়ে পেয়ে যান তাদের নওয়াবপুরে অবস্থিত রিকশায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, স্পোক আর টায়ারটিউবের দোকান। তাদের ঘরে রেখেই মালিক হয়ে যান দিন বদলের দিনে। প্রাণের মায়ায় রেজা খান-শাহনাজ পারভিন দম্পতি মুখে কুলুপ ঠুসে রাখে।

নতুন দেশের সংগ্রামী মানুষরা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ মেটাতে গিয়ে হামলিয়ে পড়েছিল অসহায় মানুষদের সম্পদ লুণ্ঠনে। আখের গোছাতে আবু হেনা সেটা করেননি। রেজা আর শাহনাজকে সুযোগ বুঝে একদিন স্বয়ং তাদের নিয়ে কোলকাতা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসেন। হাওড়া স্টেশনে ট্রেনের কামরায় তাদের তুলে দিয়ে অল্প কিছু ইন্ডিয়ান রুপিও মাথায় প্যাঁচানো হলুদ ওড়নার ভেতর থেকে উঁকি দেওয়া চন্দ্রমুখ শাহনাজ পারভিনের হাতে গুঁজে দেন, রাহা খরচের জন্য। এমন মহানুভবতার পরিচয় দিতে সেই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কেউ প্রস্তুত ছিল না কিন্তু সন্তানহারা আবু হেনা সেটা করেছেন। সব কিছু হারিয়ে প্রাণে বেঁচে যাওয়া হায়দ্রাবাদি দম্পতির চোখে তখন বিস্ময় আর বিস্ময় আর বিস্ময়! আবু হেনা সেই বিস্মিত দৃষ্টির কাছে নিজের অসহিষ্ণু দৃষ্টিকে নত করে রেখেছিলেন ট্রেন চলার প্রস্তুতি বাঁশির আওয়াজ কানে না আসা পর্যন্ত।

এরপরে কিছু সময়ের ব্যবধান নিয়ে কয়েকবার নিজের মাতৃভূমিতে বেড়াতে গিয়ে শরফুদ্দিনের একটা গতি করতে নাকি নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলেন।

শরফু এসেই ফুফার হাত গোটাতে দোকানের কাজে লেগে যায়। একদিনও দেরি করেনি। কিন্তু ফুফা তাকে পেটেভাতে রেখে দিলেন। কোনো বেতন-ভাতার বালাই নেই। তার ট্যাঁকের পাঁচশ টাকা দেড় মাসেই খতম। অগত্যা ফুফুর কাছে আবেদন করল শরফু। আবেদন নাকচ হলো না। মাস শেষ হতেই তিনশ টাকা ফুফু হাতে তুলে দিলেন। সামনে কান্দুপট্টি থাকতে এতে কি আর কুলায়?

শরফুর বয়স তখন বাইশ কি তেইশ। কোলকাতায় থাকতে ছবির টিকিট ব্ল্যাক করে লাভের টাকা দিয়ে নিজে ছবি দেখত। এই ছিল তার নেশা। বিড়ি বা খাইনির নেশা ছিল না। হিন্দি ছবির নায়িকা মিনা কুমারী-ওয়াহিদা-হেলেন-হেমা-রেখাদের দেখে কিংবা কোলকাতার রাস্তায় ফরসা ঠ্যাং বের করা উঁচু বুক যুবতিদের দেখেও নারীর প্রতি আসক্তি কোনোদিন বুক ঠেলে মাথায় ওঠেনি। যদিও একবার বাসা থেকে বের হলে রাত বারটার আগে আর ফিরত না। টালিখোলার বিশ রুপি ভাড়ার আট হাত চৌকো বাসায় ফিরে ছোটবোনের সুবাদে কোনো রাতে ডালরুটি কপালে জুটত তো কোনো রাতে ঠনঠন। প্রায়দিনই মাটির ভাঁড়-ভরা চায়ের মধ্যে গরম গরম দুটা ডালপুরি চুবিয়ে খেয়ে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতো সে। রথখোলার কান্দুপট্টিন নারীরা মাল তার মাথায় তুলে দিল। তারপর এক অভিজ্ঞ সঙ্গীর হাত চেপে পট্টির ভেতরে ঘুপচি ঘরের নড়বড়ে চৌকিতে থইথই ক্রীড়া করে ফিরে এলো।

শাল মাঠে কেন ঘোরো পোদে এসে লাগো। সেই থেকে শরফুর পেটের খিদের সাথে দেহের ক্ষুধাও বেড়ে গেল। প্রথমে মাঝে মধ্যে পরে সপ্তাহান্তে আরও পরে অভ্যাসটা নিত্য হয়ে গেল। যেকোনো চাহিদা পূরণ করতে অর্থের যোগান লাগে যেটা শরফুর ছিল না। একদিন ঘুপচি ঘরের বিছানায় সুখভোগ করতে করতে এক দেহপসারিণী মন্ত্র দিলো তার দালাল নিযুক্তির। বিনিময়ে কমিশন এবং অবাধ দুয়ার। প্রস্তাবটা শরফুর কাছে স্বর্গীয় মনে হলো। কাজে নেমে প্রথম প্রথম একটু ঝুটঝামেলা হয়েছিল কিন্তু অল্প কয়েকদিনে তার খ্যাতি ঘুপচিঘরের আঙিনা ডিঙিয়ে নওয়াবপুরের সদর রাস্তায় গিয়ে উঠল। একজন মেয়েমানুষ থেকে ক্রমে পাঁচজনের কর্তা হয়ে গেল সে। সাথে বাঙলা সুধা গেলাও বাড়ল। তার আগে পিছে কেউ নেই, তাই, যা আয় তাই ব্যয়।

ফুফুর দরজা একসময় চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। রাত হলে মুন সিনেমা হলের থার্ডক্লাসে নাইট শো দেখে ছারপোকার কামড় খেয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা আর কোনোদিন ঘুপচিঘরে খদ্দের না থাকলে বেশ আরামসে কালোরাতটা কাটানো যায়।

নির্বিবাদ মায়ের সন্তান ঘরছাড়া হয়ে বিগড়ে গেল।

কোনো কোনো দিন পকেট গরম থাকলে একটু ব্যতিক্রম আনন্দ নিতে চলে আসে নীলক্ষেতের মেথর পট্টিতে ভাবির কাছে। পাঁচ টাকা গ্লাস খাঁটি বাংলা মদ খেতে। সবাই পঁচিশ কি ত্রিশ বছরের দোহারা চেহারার এই শঙ্খিনী মেয়েটাকে ভাবি বলে ডাকে। কেন যে মেয়েটাকে ভাবি বলে, শরফু বোঝে না। ব্যাওড়ার বোঝারও কোনো ইচ্ছা নেই। বাংলা মদ ঠ্যাটারিবাজারের কোনায়ও পাওয়া যায় কিন্তু নীলক্ষেতের ভাবির কাছে অন্যরকম আনন্দ পায় সে। মেয়েমানুষের নেশা আর ভাবির আদর একদম আলাদা। ভাবি তাকে পাঁচ টাকার বিনিময়ে কাঁচুলির ওপর থেকে বুকটা ধরতে দেয় আর দশ টাকা দিলে একদম উন্মুক্ত করে দেয়। অন্য কোথাও এরকম ভাবির সন্ধান পায়নি শরফু। তাই ভাবির টানে হাতে কটা টাকা বেশি থাকলেই চলে আসে।

এই প্রিয় ভাবিটাই শরফুর সর্বনাশ করে দিল। শরফু সেদিন একটু বেশি খেয়ে ফেলেছিল। সে এমনিতেই মাত্রাতিরিক্তই খায় কিন্তু সেদিন সেই মাত্রারও মাত্রা সম্ভবত ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তার খুব ইচ্ছা হলো ভাবির বুকটা একটু হাতড়ানোর কিন্তু পকেটের টাকা সব ফুরিয়ে গেছে। কখন? টের পায়নি। ভাবি রাজি হলো না বরং বিরক্ত হলো। বাংলা মদ আর ভূঁড়ি ভাজা তখন দেদার চলছে। হাজার হলেও ভাবির তো দেহ বিলানো কোনো সুখের বিষয় নয় বরং পেটপূর্তির জন্য একটা উপায়, বাকিতে ব্যবসা চলে না। ঘরে তার আরও চারটা পেট আছে।

শরফু কিছুতেই নিজের ইচ্ছাকে দমন করতে পারছিল না। কারণও আছে। বাংলা গিলতে গিলতে ততক্ষণে বাংলা তাকে গিলে ফেলেছে। সে ভাবির সাথে কমজোর শরীর নিয়ে হাতাপাই করতে শুরু করল। গরুর ভূঁড়ি ভাজতে ভাজতে ভাবিও একসময় মহাবিরক্ত হয়ে ঝটকা মেরে তাকে সরিয়ে দিতে চাইল। ব্যস এতেই ঘটল বিভ্রাট। ভূঁড়ি ভাজার হাতায় থাকা মসলা মাখানো এক ফোঁটা গরম তেল শরফুর ডান চোখে পড়ে টলটলে মণিটি ভেজে দিল। মেথর পট্টির হাতায় টিমটিমে আলোর বুঁদ হয়ে থাকা মক্কেলরা ধরাধরি করে চক্ষু হাসপাতালে না নিয়ে ঢাকা মেডিক্যালের ইমারজেন্সির একটা খালি ট্রলিতে বেহুঁশ শরফুকে শুইয়ে রেখে পালিয়ে বাঁচল। এরপর শরফুর কী ঘটেছিল সে নিজেও জানে না। শুধু মনে পড়ে সে-রাতে ভাবির সাথে সে একটু জোরাজুরি করেছিল। আহ হা রে শরফু!

নিখুঁত শরফু একচোখ কানা হয়ে গেল। শরফু চোখ হারালো ঠিকই কিন্তু সে মেডেলবিহীন একটি উপাধি অর্জন করল। শরফু থেকে কানা শরফু। সেটাও আবার কিছুদিন গড়িয়ে কানা শরফু থেকে কানা ব্যাওড়া হয়ে ছ ফুটি দেহের মূলিবাঁশ সদৃশ চিকন চিকন লম্বা দুখানি ঠ্যাং চালিয়ে ডিংডিঙিয়ে নওয়াবপুর রোডের এ-মাথা থেকে ও-মাথা হেঁটে বেড়াতে লাগল। এই যাওয়া-আসার মাঝে বরিশালের এক খচ্চরের হাত গলে কুসুমকে শরফু পেয়েছিল। প্রথম দিনেই সপ্তদশী আনকোরা কুসুমের শরীরের ঘামের ঘ্রাণ আর স্তনিত তার ভালো লেগে যায়Ñ এ এক অন্যরকম ভালোলাগা। বর্ণনা করার ক্ষমতা শরফুর নেই।

কুসুম এসেছিল রাজধানী ঢাকায় গতর খাটিয়ে নিজের এবং বৃদ্ধ কচু-ঘেঁচু খাওয়া বাপ-মায়ের পেটের সংস্থান করতে। শরীর বিলিয়ে অর্জন করতে আসেনি। তাই শরফুর বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। অন্তত সম্মান নিয়ে বাঁচা তো যাবে। এঁড়ে মাগির তেড়ে কথা!

শরফুর কীর্তিকলাপ আচার-ব্যবহার বুঝতে নির্মল কুসুমের মাত্র সাতরাত সময় লেগেছিল। কুসুম মর্জিনা খালার কাছে মন উন্মুক্ত করে কেঁদে দু-গাল অশ্রুতে ভিজিয়ে সবিস্তার বলেছিল কিন্তু মাঝবয়সি অভিজ্ঞ শহুরে মর্জিনা কোনো উপায় বার করতে পারেনি। মেয়েমানুষ আদতে কোনো উপায়ই খুঁজে পায় না। তাদের উপায় পেতেও নাই।

দিন আসে রাত আসে আবার দিন আসে। ক্রমাগত রাত পেরিয়ে পৃথিবী আলোয় আলোয় হয়ে দিন আসতেই থাকে আবার চলেও যায়। কিন্তু কুসুমের দিন সহজে ফুরাতে চায় না। দিনের বেলায় ঝামা মাঝা শরীর রাতে ঘিনঘিন করে। খেয়ে না-খেয়ে তবু দিন কাটে। তবে মর্জিনা খালা না থাকলে তার দিন গুজরান বড়ই কঠিন হতো। স্বামী পরিত্যক্ত মর্জিনা খালা দুটি মেয়ের মতো তাকেও না খেয়ে থাকতে দিতে চায় না। কুড়িয়ে-কাড়িয়ে আনা এক মুঠোই তো ভাত!

এই দয়াবতী মর্জিনা খালা একদিন প্রস্তাব পেশ করল কুসুমের কাছেÑ এক মাঝবয়সি দম্পতির সংসারের হাল ধরার জন্য। তারা উভয়ই কর্মজীবী। ছেলেমেয়ে নেই। রান্নাবান্নার কাজ ঝাড়ু-পোঁছার কাজ। মর্জিনার পরিচিত। সে যে বাড়িতে কাজ করে তারই একতলা উপরে। একসাথেই যাওয়া আসা করা যাবে। কুসুমের আবার বুঝ-অবুঝ কিসের? সে এককথায় রাজি হয়ে গেল। ব্যাওড়ার অনুমতির কোনো তোয়াক্কা করল না।

ব্যাওড়ার সংসারে পাঁচ বছর তো কাটল। কী দিল ব্যাওড়া তাকে। পেট পুরে ভাত তো দিলই না। পেটে একটা বীজও দিতে পারল না যে সেটা লালন করতে পারে! হায়রে কপাল! ব্যাওড়া কি তাকে ভালোবেসেছে? নাকি সে ব্যাওড়াকে ভালোবাসতে পেরেছে। নাহ! এর কোনো উত্তর নেই?

রাজধানীতে কুসুম এসেছিল রোজগার করতে। এতোদিনে একটা উপায় হয়েছে। তার ধৈর্য স্খলিত হতে চায়।

কে আছে সংসারে?

নাকফুল পরা টলটলে কুসুমকে দেখে বিবিসাবের প্রথম প্রশ্ন। শরফু তাকে এই নাকফুলটা মৌলভির কাছে বিয়ের কলেমা পড়ার রাতে কুসুমের কাপড় খোলার আগমুহূর্তে ভালোবেসে পরিয়েছিল।

স্বামী আছে খালা, একটা উটকো ব্যাওড়া। খাওয়া দিতে পারে না।

চটজলদি উত্তর দিয়ে দিলো মর্জিনা খালা।

ব্যাওড়া কীরে?

ওইই মাতাল। সবাই ব্যাওড়া বলে ডাকে তো তাই মুখ খসে বেরিয়ে গেল। অসুবিধা হবে না খালা। কুসুম ভালো মেয়ে। আপনি নিশ্চিন্তে ওর হাতে ঘর ছাড়তে পারবেন। আর, আমি তো আছিই।

তোমার নাম কুসুম?

শিক্ষিকা আপা কুসুমের নামটা উদ্ধার করে ফেললেন।

কুসুম দ্রুত দুবার মাথা উপরনিচ করে সম্মতি জ্ঞাপন করলÑ হ্যাঁ, তার নাম কুসুম। কুসুম মানে ফুল।

পুকুর পাড়ে পড়ে থাকা কোনো ডেগি হাঁসের পাড়া ডিমের মতো সদ্য প্রসূত মেয়ের মুখ দেখে আদর করে অক্ষরজ্ঞানহীন পিতা প্রথম এই নামে নাকি তাকে ডেকেছিলেন। সেই থেকে তার নাম কুসুম।

তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তার নাম শুনে সাহাব নামের এক ছোকরা বয়সি শিক্ষক কৌতূহল ভরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কুসুম মানে কী, জানিস?

প্রশ্ন শুনে কুসুম হাসি লুকানোর চেষ্টা করছিল। শিক্ষকের ধমক খেয়ে থরে থরে সাজানো ইঁদুরের মতো ছোট ছোট দাঁতের দুপাটি পরস্পর চেপে মুখের কপাট জোর করে বন্ধ রেখেছিল। কুসুমের আবার নতুন কী অর্র্থ হতে পারে! কুসুম মানে তো ডিম, ডিমের ভেতরে গোল টলটলে হলুদ অংশটার নাম। ছেলেরা প্রতিদিন তাকে পচা ডিম বলে ভ্যাঙায়। কখনও কখনও মেয়েরাও তাদের সাথে তাল দেয়। সবাই না, কেউ কেউ।

স্যার অর্থ না বলে চলে যাচ্ছিলেন। এই সব নদী পাড়ের অশিক্ষিত গ্রাম্য ছেলে মেয়েদের পড়াতে তার ভীষণ বিরক্ত লাগে। শহরে থেকে এমএ পাস দিয়ে এই চাকরিতে মন বসে না। সরকারি চাকরি তাই মানিয়ে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

কুসুম মনে সাহস সঞ্চার করে নিজের কৌতূহল মেটানোর জন্য স্যারকে পিছন থেকে ডাকার স্পর্ধা করল। স্যার মোর নামের অর্থ কী, কইবেন না!

মেয়েটির জানার আগ্রহ দেখে স্যারের ভেতর একটি ধ্বনি যেন তরঙ্গের উষ্ণিষে নৃত্য করতে করতে সৈকতে আছড়ে পড়ল। তিনি পিছন ফিরে বললেনÑ ফুল।

শব্দটা শুনে কুসুম স্তম্ভিত হলো। সে নিথর দাঁড়িয়ে রইল। ধ্যাৎ! স্যার এ কী বলে! তার নামের অর্থ ফুল! ক্লাসের হইচই করা সব ছেলেমেয়েরা কি শুনেছে! পচা ডিম থেকে ফুলÑ লাল জবা ফুল, লাল গোলাপ ফুল, সাদা বেলি ফুল। ফুলগুলোর কী সুন্দর গন্ধ! কী নরম শরীর! হাতে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছা করে। কতরকম যে ফুল আছে ঝুমকো ফুল আছে বক ফুল আছে, পলাশ-শিমুল-জবা আরও যে কত রকম ফুল আছে দুনিয়ায়, কে জানে! আর ডিম, ছি!

কুসুম, সুন্দর নাম। রবীন্দ্রনাথের গল্পের নায়িকার নাম কুসুম।

শিক্ষিকা আপা বললেন।

এ আবার কী শুনছে কুসুম। তার নামে আবার নায়িকাও আছে! কুসুম কয়েকটা ছবি দেখেছে, ‘রংবাজ’, ‘বেঈমান’ আরও কয়েকটা কিন্তু কুসুমকে দেখেনি। প্রথম দিন, তাই আগ্রহ প্রকাশ করার সাহস হলো না। কাজ করতে করতে কোনো এক দিন সুযোগ করে জেনে নেবে।

কাজ জুটে গেল কুসুমের। সকালের নাস্তা, দুপুরের খাওয়া আর মাস গেলে পাঁচ’শ টাকা। কুসুমের চোখে বিজলি ঝলক দিল। দেশের বাড়িতে ফেলে আসা বাবা-মা সেই ঝলকে উদ্ভাসিত হয়ে নিমেষে মিলিয়ে গেলেন।

সারা মাসে এর-ওর মরিচ-হলুদ বেটে বড়জোর পঞ্চাশ টাকা আয় হয়। এখন মাস গেলে পাঁচ’শ টাকা হাতে আসবে। রোজগারের পথ পেয়ে কুসুমের মুখে শব্দগুলো আটকে গেছে। মর্জিনা খালা একটু ঘাঁতঘোত করতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু কুসুম বেগতিক দেখে তাড়াতাড়ি তার হাত চেপে বিবিসাবকে জানিয়ে দেয় যে সে রাজি।

সকালে আটটার মধ্যে আসতে হবে। পৌনে দশটায় কর্তা বেরিয়ে যান। তার অফিস ধারে কাছে। দশ পনেরো মিনিটের পথ। আর আপা স্কুলে থাকেন দুপুর এগারটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত। ফিরতে ফিরতে সাড়ে চারটা কোনো দিন পাঁচটা কি সোনালি বিকেল। সেই পর্যন্ত কুসুমকে ঘরে থাকতে হবে। আপা তাকে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে চলে যাবেন। ফিরে এসে রেহাই দিয়ে দেবেন। এটাই শর্ত।

কুসুম রাজি।

কুসুম পরের দিন থেকেই পরিচারিকার কাজে কোমর কষে নেমে পড়ল। গতরাতে শরফুর বুক ঘেঁষে তার অনুমতি নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মাতাল তো মাতালই। কুসুমকে কাছে টেনে নিয়েও অন্তরঙ্গ হতে পারল না। ঘুমে তলিয়ে গেল। সারাটাদিন কোথায় থাকে, কী যে করে তার কিছুই জানে না কুসুম। কুসুম অনেকদিনই ব্যাওড়ার পকেট হাতড়ে দুএক টাকা সরানোর চেষ্টা করেছে। প্রায়দিনই চেষ্টা বিফলে গেছে। পকেটে টাকা থাকেই না। কুসুম ভেবে কুলাতে পারে না। তার জীবনটা কোন চক্রের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, কতদিনই বা খাবে। কপালের ভাঁজ থেকে নিয়তিকে পরিবর্তন করা কী কোনোভাবেই সম্ভব নয়?

দিন যায় দিন আসে। মাস গেল মাস এলো। কুসুমের চেহারায়ও পরিবর্তন এলো। ঝামা ঘষা শরীরের ত্বক সাবান শ্যাম্পু পেয়ে চকচক করে। সেই ত্বকের নিচে জমা মেদ থেকে বেরিয়ে আসা স্বেদের সোঁদা ঘ্রাণ বদ্ধ ঘরের বাতাসে মদিরতা ছড়ায়। কুসুমের কর্ত্রী আপা সেটা টের পান। পরিপাটি হয়ে থাকতে তিনি নিজে পছন্দ করেন কুসুমকেও পরিপাটি থাকতে বলেন। কুসুমের ভালো লাগে। উড়ু উড়ু যুবক-মনকে স্থির রাখার চেষ্টা করে। ঘর আছে, সংসার আছে কিন্তু কোনো আকর্ষণ নেই সেখানটায়। ঘরে ফেরার তাড়া নেই। ব্যাওড়া অনেক রাত করে ঘরে ফেরে। তাকে নিয়ন্ত্রণ করে কে? সে নিজের মনের নিজে রাজা।

কুসুমের নতুন আশ্রয় শিক্ষিকা আপার ঘরে সেঁটে থাকতে ভালই লাগে। আপাও কথা বলার একজন সঙ্গী পেয়ে কুসুমের প্রতি দিনেদিনে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। কুসুম একজন অন্তরঙ্গ সঙ্গী হয়ে উঠেছে। আপার কর্তা নিপাট নিরীহ লোক। আপার স্বামী সম্পর্কে হন দুলাভাই কিন্তু কুসুম ভাইয়া বলে ডাকে। আপার কঠিন নির্দেশ, দুলাভাই বলা চলবে না। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই ভদ্রলোক প্রচুর সিগারেট টানেন। রাতে বোধ হয় মদ্য পানও করেন। কুসুম প্রায়দিনই স্বচ্ছ কাচের খালি বোতল পায়। সেগুলো সাবান-সোডা দিয়ে ধুয়ে র‌্যাকে সাজিয়ে রাখে।

সপ্তাহের শেষ দিনে কিংবা কোনো ছুটির দিনে বোধহয় একটু বেশি খাওয়া হয়ে যায়। ঘুম ভাঙলে লাল চোখজোড়া দেখে বোঝা যায়। নাস্তা সেরে ঘরের ঈশান কোণে রাখা ক্যাম্পচেয়ারে বসে মোটা মোটা বইয়ের পাতা ওল্টান আর কিছুক্ষণ পরপর সিগারেটে আগুন ধরিয়ে নাক-মুখ থেকে ধোঁয়া উদ্গীরণ করেন। প্রতি ঘণ্টায় ফুল-পাতা আঁকা ছড়ানো-কাপের এক কাপ চা খান। চায়ের ধোঁয়া বাতাসে লকলক করতে করতে হয়রান হয়ে যখন স্থির হয়ে যায় তখন তিনি কাপটা হাতে নিয়ে মনের আনন্দে গুন গুন করতে করতে চায়ে চুমুক দেন। উনি কী যে গুন গুন করে গান করেন কুসুম তার বিন্দুবিসর্গ বোঝে না। এ-পর্যন্ত একটা শব্দও উদ্ধার করতে পারেনি।

কুসুম আপাকে কৌতূহল নিবারণের জন্য জিজ্ঞেস করেছিল, আফা ভাইয়া হাঙ্গাক্ষণ গুনগুন কইরা কী গান গায়? Ñআপার সাথে কুসুমের পটে ভালো। খুব কাছের মানুষ মনে হয়।

রবীন্দ্রসংগীত গায়।

কী সংগীত আফা?

রবীন্দ্রসংগীত।

কোনোদিন হুনি নাই।

শুনিসনি? রবীন্দ্রনাথকে চিনিস?

ওই চুল-দাড়িঅলা বুড়া ব্যাটা?

হ্যাঁ। তুই চিনিস?

আমাদের স্কুলে হেড স্যারের রুমে দুজনের ছবি দেখেছি। এই বুড়া ব্যাটার পাশে আর একজনের ছবি ছিল। ইয়া বড় বড় চোখ, ঝাকড়া চুল, মাথায় ফির টুপিও ছিল।

ও। উনি কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আর ওই যে ঋষির মতো যিনি উনি হচ্ছেন আমাদের কবিগুরু। তুই তাঁকে ব্যাটা বলে ডাকবি না, বুঝলি। কবিগুরু বলবি।

উনি কী খুব বড় কবি?

তাঁকে সবাই কবিগুরু বলে। গুরু মানে বুঝিস?

হ বুঝি তো।

ঠিক আছে এখন থেকে তাঁকে সম্মান করে ডাকবি। আর কোনোদিন ব্যাটা যেন না শুনি, বুঝলি। যা এখান থেকে, সর। কাজ কর গিয়ে।

কুসুম মেদ জমা শরীর তুলে জমিন থেকে খাটের আশ্রয় নিয়ে দাঁড়াবার সময় কাঁধের উপর থেকে সিল্কের আঁচলটা সরসর মৃদু শব্দে খসে পড়ল। আঁচলটা সামলে তোলার আগে উথলে ওঠা চকচকে বুকের পিণ্ড শিক্ষিকা আপার দৃষ্টি এড়ালো না। কিন্তু আপা কিছু বললেন না।

ভাগ্যিস আফা ধমক দেননি। একটু সামলে থাকতে হবেÑ কুসুম মনে মনে আওড়াল।

সন্তানহারা আপার মনে অপার ভালবাসা। তার স্কুলের মেয়েরা ছুটির দিন ঘরে এসে পড়ালেখা করে। কী সুন্দরভাবে আপা তাদের পড়া বুঝিয়ে দেন। কখনও বকাঝকা করেন না। আপা হঠাৎ একদিন কুসুমকে বললেন, শোন কুসুম আমি পরশুদিন মেয়েদের নিয়ে বনভোজনে যাব। তুই কাল রাতে আমাদের বাসায় থাকবি। খুব সকালে আমি বেরিয়ে যাব তো।

রাইতে থাকুম?

কুসুম পাল্টা জানতে চাইল।

হ্যাঁ। তোর কি আপত্তি আছে?

আপিত্তি নাই আফা। তয় মাতালডা মোরে ঘরে না পাইয়া হইহল্লা করতে পারে। পরে আবার ঝামেলা অইবে। ভাইয়াও যাইবে আফা?

তোর ভাইয়া মেয়েদের বনভোজনে গিয়ে কি করবে।

তইলে ভাইয়া জাওনের আগে মুই চইল্লা আমু আনে।

মানুষটা ছুটির দিন একটু আয়েশ করে ঘুমায়, দেখিস না? তুই কড়া নেড়ে তার ঘুম নষ্ট করবি।

ও। তইলে মুই ফরসা হইলেই চইল্লা আমু আফা। আম্মে কোনো ভাবনা কইরেন না।

ঠিক ঠিক আসতে পারবি তো?

মুই গাঙ পাড়ের মাইয়া আফা। কথার নড়চড় নাই।

আচ্ছ, দেখব।

রবিবার সকালে কুসুম সত্যি সত্যি খুব ভোরে দরজার কড়া নাড়ল।

আপা সবে গোসল সেরে বেরিয়েছেন। পেটিকোটে তখনও গিঁট দেওয়া হয়নি। সেটা বুকের উপর আলতো ধরে দরজা খুলে কুসুমকে ঘরের ভিতরে নিলেন। কুসুম দেখল পড়ন্ত যৌবনের নারীর ভেজা চুল থেকে টপটপ পানি পিঠ গড়িয়ে পেটিকোটের অর্ধেকটা ভিজিয়ে দিয়েছে। গ্রামের ধার ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ছলছল নদীর পাড়ে কিংবা কোনো পুকুরের শান বাঁধানো সোপানের উপর যূথবদ্ধ নারীদের এভাবে সকাল দুপুর বিকেল প্রত্যহ দেখা যায়।

লাল পাড়ের সুন্দর একটা জামদানি, লাল টিপ আর দুঠোঁটে লাল লিপস্টিক মেখে আপা শোয়ার ঘর থেকে ড্রেসিং টেবিল ছেড়ে বেরিয়ে আসলেন। কুসুমকে ডেকে বললেন, নিচের দিকে শাড়ির পাড়টা টেনে ঠিক করে দে তো।

কুসুম আপার সাজগোজ দেখে চমকে উঠেছিল। আপাকে এভাবে সাজতে দেখেনি।

আপা তার ঢাউস ব্যাগটা কাঁধে ঝোলানোর আগে ভেতর থেকে মুনড্রপের ছোট্ট শিশি বার করে পাট করা শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে পারফিউমের স্প্রে ছড়িয়ে ভিজিয়ে দিলেন। পুরো ঘরটা মৌ মৌ করে উঠল। হাঁ করে চেয়ে থাকা হতবাক কুসুমকে আরও বিহ্বল করে তার শাড়ির আস্তরণের ফাঁকে হাত গলিয়ে দুবার স্প্রে বুকের ওপর ছড়িয়ে দিলেন। তারপর কুসুমের হতবাক দৃষ্টির ওপর দৃষ্টি রেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলেন। কুসুম লজ্জা পেয়ে দৃষ্টি অবনত করে নিল।

কুসুম প্রতিদিনের মতো ঘরের আনুসঙ্গিক কাজে মনোযোগ দিলো। কুসুম শোয়ার ঘরের দরজা ফাঁক করে দেখল ঘরের কর্তা জামাল উদ্দিন খান তখনও হাঁটুর ওপর লুঙ্গি তুলে ঘুমাচ্ছেন। কুসুম সাহস করে আর একটু দরজা ফাঁক করল। লুঙ্গিটা কি একটু বেশি উপরে উঠেছে? নাহ. ঠিকঠাকই তো আছে। এক মিনিটে দুটা ঝাড়ু মেরে মেঝেটা পরিষ্কার করে নেওয়া যাবে। ভাইয়া ঘুমাচ্ছে ঘুমাক।

কুসুম সন্তর্পণে খ্যাংরা হাতে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ল। তার শরীর থেকে মুনড্রপের ঘ্রাণ বদ্ধ ঘরটাকে মাতিয়ে দিল। জামাল উদ্দিন খানের নিদ্রার ঘোর ছুটে গেল। তিনি চোখ খুলে দেখলেন কুসুম পেছন ফিরে মেঝে থেকে ঝেটিয়ে ধুলাবালি পরিষ্কারে তৎপর রয়েছে। কুসুমের উপুড় হওয়া বিস্তৃত নিতম্ব তার শরীরের রক্তে আলোড়ন সৃষ্টি করল। স্রেফ এক পলের ব্যবধান। তার সম্ভ্রান্ত সত্তা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল।

কুসুমের বোধ উদয় হওয়ার আগে সে এমনভাবে পিষ্ট হলো যে কঁকিয়ে উঠল। কুসুম জামাল সাহেবের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টায় বিফল হয়ে অনুনয় করল। কুঞ্চিত কুসুমের কুচকলসদ্বয় ক্রমাগত বিনিবেশিত হওয়ায় আবেশে তার শরীরের বাঁধন শিথিল হয়ে পড়ল। আবেশিত কুসুম বেশিক্ষণ নিজেকে সামলাতে পারল না। কুসুম মেলে দিলো নিজেকে।

দুঘণ্টা পর জামাল সাহেব শেষবারের মতো বিবস্ত্র কুসুমকে জড়িয়ে চুলে বিলি করতে করতে গভীর কণ্ঠে তিনটি শব্দ উচ্চারণ করলেনÑ মুখ বন্ধ রাখবি।

কুসুম কোনো প্রকার ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেনি। তার কী খানের সাথে রতিক্রীড়া করতে ভালো লেগেছিল? কে বলবে। কুসুমের টগবগে যৌবনের দিকে বছর যাবৎ ব্যাওড়ার কোনো গ্রাহ্যকরণই নেই।

জামাল সাহেব আর কোনোদিন কুসুমকে চোখ তুলে দেখেননি পর্যন্ত। কুসুম কিছু বলতে চেয়েছে কিন্তু সেটা শোনার সুযোগ বা সময় তার হয়নি। অগত্যা কুসুম কয়েকবার চেষ্টা করে বিরত হয়েছে।

কুসুম আর শরফু সুরে সুরে সুর মেলাতে পারে নাই তাদের ছয় বছরের দাম্পত্য জীবনে।

কুসুমের পেট যখন কানাভাঙা হাঁড়ির মতো ফেঁপে উঠল তখনও শরফুর ভ্রুক্ষেপ না হওয়াতে সে নিজেই এক শুভ্র-সকালে ব্যাওড়াকে জানালÑ মুই ‘মা’ হতে যাচ্ছি।

হাড়গিলে ব্যাওড়া অর্বাচীনের দৃষ্টি নিয়ে কিছু সময় কুসুমের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবল, তারপর হঠাৎ ফাটা বাঁশির সুরে স্বগতোক্তি করলÑ আমি বাপ হবো!

সচিত্রকরণ :  ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares