উত্তম কুমার : ওমর কায়সার

অরিন্দম চ্যাটার্জি সম্পর্কে তোমার মনের অনুভূতি কী?

চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসে এ রকম অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি এর আগে হয়নি মোহাইমেন কোনো দিন। অরিন্দম নামটিই তো আগে কখনও শোনেনি। ইনি কি বিখ্যাত কোনো মানুষ? কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব? রাজনীতিবিদ? সাহিত্যিক? কবি? কিছুই তো আঁচ করতে পারছিল না। তার সম্পর্কে অনুভূতি জানাবে সে? সেটাই তো ভাবতে পারছিল না।

কিন্তু প্রশ্নকর্তা সময় দিতে রাজি ননÑ তোমার যা মনে আসে বল। নিঃসংকোচে। এতে ভাবার কিছু নেই।

কী বলবে মোহাইমেন? প্রশ্নকর্তার চাপাচাপিতে নিজের অজান্তে আসল কথাটাই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলোÑ নামটা আমি আগে কখনও শুনিনি।

টেবিলের অপর প্রান্ত থেকে ইন্টারভিউ গ্রহণকারী একমাত্র ব্যক্তিটি অবাক হয়ে বললেনÑ তার মানে?

একজন মানুষকে না চেনা কী অপরাধ? ভদ্রলোকের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে মোহাইমেন অপরাধ করেছে। একটু ভড়কে গিয়ে বললÑ মানে স্যার, আমি ভদ্রলোককে চিনি না।

প্রশ্নকর্তা আহমেদ সাহেব, শহরের একমাত্র সিনেপ্লেক্সের মালিক, এবার হতাশ হয়ে বললেন, তুমি অরিন্দম চ্যাটার্জিকে জানো না, আর উত্তম কুমারের চেহারা একটা মুখে নিয়ে বসে আছ? তোমাকে আমি চাকরি দেব কী করে? এখানে চাকরি করতে হলে তোমাকে তো শুধু অরিন্দম নয়, হারানো সুরের অলোক মুখার্জি, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির কবি হেনসেন অ্যান্থনি, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তনের রাইচরণ, রাজলক্ষ্মী- শ্রীকান্তের শ্রীকান্ত এ রকম আরও বহু চরিত্রকে চিনতে হবে, জানতে হবে।

আহমেদ সাহেব বলে যাচ্ছিলেন আর মোহাইমেনের মাথার ওপর দিয়ে সব চলে যাচ্ছিল সাঁই সাঁই করে অদৃশ্য বাতাসের মতো। বুঝতে পারছিল চাকরিটা তার হবে না। ধারাবাহিক ব্যর্থ ইন্টারভিউ সিরিজের এটাও একটা পর্ব। আহমেদ সাহেব একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছিলেন, আর কোনোটারও সন্তোষজনক জবাব না পেয়ে তিনি নিজেই চাকরি প্রার্থীর চেয়ে বেশি হতাশ হচ্ছিলেন। নগরের একটি অন্যতম প্রধান বিপণিকেন্দ্রের সবচেয়ে ওপর তলায় তার সিনেপ্লেক্সটি। ওখানে তিনি মোহাইমেনকে চাকরি দিতে চেয়েছিলেন বন্ধু শাহেদের অনুরোধে।

শাহেদ খুব নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন মোহাইমেনের কথা। বলেছিলÑ সিনেপ্লেক্সে নগরবাসীর জন্য একটা চমক দিতে পারবে আহমেদ। ছেলেটাকে দেখলেই তুমি চমকে উঠবে। মানুষে মানুষে চেহারায় এমন মিল, ভাবাই যায় না। ছেলেটি উত্তম কুমারের ক্লোন হয়ে জন্মেছে। পথ দিয়ে যখন হেঁটে যায়, কথা বলে, তখন মনে হয় যেন অতীতের রুপালি পর্দা থেকে বাস্তবে নেমে এসেছেন মহানায়ক উত্তম কুমার।

আহমেদ সাহেব চমৎকৃত হয়েছিলেন শাহেদের কথা শুনে। কিন্তু পরক্ষণে বলে ওঠেনÑ সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখানো হয়, সিনেমা বানানো হয় না। উত্তম কুমারকে দিয়ে আমি সিনেমা বানাব? তুমি বরং ছেলেটিকে সিনেমা-নাটকের কোনো প্রযোজক, পরিচালকের কাছে নিয়ে যাও।

আহমেদের কথাটা অযৌক্তিক নয়, কিন্তু উত্তম কুমারের আদল নিয়ে পৃথিবীতে আসা ছেলেটির চালচুলো তো কিছুই নেই। রূপের জৌলুশ আছে তার, কিন্তু গুণের বাহার নেই। কোনো রকমে ডিগ্রি পাস করেছে। এই পৃথিবীর যাবতীয় জটিল, কুটিল অঙ্ক সে বোঝে না। তার উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম ছিল টিউশনি। আর এই টিউশনির একমাত্র শিক্ষার্থী শাহেদের ভাগনি রিয়া। পড়তে পড়তে কিংবা পড়াতে পড়াতে বাংলা নাটকের অতি সাধারণ পরিণতির মতো দুজনের মধ্যে কিছু হয়েছে কিনা শাহেদ জানে না। তবে রিয়া বহুবার অনুরোধ করেছে তার স্যারের জন্য একটা চাকরি খুঁজে দিতে। ব্যাপারটা প্রথম প্রথম খুব একটা গায়ে না নিলেও শেষমেস ভাগনির ঘন ঘন অনুরোধ, অনুনয় আর উপেক্ষা করতে পারেননি শাহেদ। স্যারের প্রতি যাতে একটু করুণার উদ্রেক হয় তার জন্য কয়েক দিন পর পর একটা করে দুঃখের ঘটনা এসে বয়ান করে মামার কাছে। পিতৃহীন স্যারের মায়ের অসুখ, ঈদের বাজার করতে পারছে না ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত আহমেদ সাহেবের কাছেই আসলেন শাহেদ। কিন্তু আহমেদ এভাবে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, পাল্টা অনুরোধ করার কোনো যুক্তি খুঁজে পাননি তিনি। হতাশ হয়ে ঘরে ফিরেছিলেন। যাওয়ার সময় আহমেদের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, চাকরি না দাও, কিন্তু মহানায়কের পুনর্জন্মের সাক্ষী হবে না তুমি?

আহমেদ বোকার মতো হেসেছিল, কিন্তু কিছু বলেনি।

ব্যাপারটা সেখানেই চুকে গিয়েছিল। আহমেদের সিনেপ্লেক্সে ছেলেটির চাকরি হবে না, এটা ভেবেই নিয়েছিল শাহেদ। তার জন্য অন্য একটা ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু পরদিন আহমেদ ফোন করলেন শাহেদের কাছে। একেবারে ভিন্ন মেজাজে। উচ্ছ্বসিত ও উচ্চকণ্ঠÑ দোস্ত, তোমার উত্তম কুমারকে নিয়ে এসো। একটা মজার প্ল্যান মাথায় এসেছে। আমাদের সিনেপ্লেক্সে সিনেমা প্রদর্শনীর পাশাপাশি দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য বাড়তি অভিনব আয়োজন থাকবে। মহানায়ক উত্তম যত বিচিত্র চরিত্রে অভিনয় করেছে, তোমার উত্তম কুমার সেই সব চরিত্রের বেশ ধরে প্রেক্ষাগৃহে, বাইরের আঙিনায়, লাউঞ্জে ঘুরে বেড়াবে। দর্শক দেখে অবাক হবে। যেদিন যে চরিত্রের বেশ ধরবে, সেদিন সেই সিনেমার নানা স্থিরচিত্র আমরা প্রদর্শন করব বাইরের মনিটরে। অভিনব আইডিয়া শুনে যতটা চমকিত হয়েছে শাহেদ তার চেয়ে দ্বিগুণ খুশি ছেলেটার চাকরির একটা ব্যবস্থা হলো বলে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত চাকরিটা হবে কিনা নিশ্চিত হতে পারছিল না মোহাইমেন। সে নিজেও বুঝতে পারছে, ইন্টারভিউতে সে ফেল করেছে। তার সঙ্গে কথা বলে হতাশই হয়েছেন আহমেদ। শুধু তার মূর্খতার জন্য নয়, চেহারা দেখেও হতাশ হয়েছিলেন। গভীর দৃষ্টিতে বারবার তাকাচ্ছিলেন চাকরি প্রত্যাশী বেকার, বোকামতো ছেলেটির দিকে। বিয়ের বর কিংবা কনেকে দেখতে এসে মানুষ যেভাবে তাকায়, তার দৃষ্টিও সেরকম। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মন্তব্য করেছিলেনÑ না, শাহেদ যেভাবে বলেছে, তুমি সেরকম নও। ডিটেইলসে এসে দেখলে তুমি পারফেক্ট উত্তম কুমার নও। অনেক তফাৎ, তোমার গায়ের রং উত্তম কুমারের চেয়ে অনেক ফিকে। চুলও তো ব্যাক ব্রাশ করা নয়। চাঁদের মতো কপাল, গোল মুখ নাক আর চোখ দুটো অবশ্য প্রায় মিলে যায়। আর তোমার হাসি তো দেখতেই পেলাম না।

এসব কথা শুনে মোহাইমেনের ভেতর থেকে বিদ্রুপের হাসি বেরিয়ে আসছিল। প্রতিদিন চার কিলোমিটার পথ হেঁটে টিউশনিতে গেলে তিনিও বুঝতেন গায়ের রং ফিকে হয় নাকি জ্বলে যায়। আর হাসি? দশ-বারো বার বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারভিউ ফেল করার অভিজ্ঞতা লাভ করেছে যে মানুষ তার মুখ থেকে হাসি বিলীন হবে না তো কী হবে। তাই আহমেদ সাহেবের কথাগুলো শুনতে শুনতে তার মুখের হাসি আরও নিভে যাচ্ছিল। তার মনে প্রশ্ন আসেÑ একজন মানুষের সঙ্গে অন্যজনের চেহারা সত্যিই কি মিলে যায়, না মেলাই তো স্বাভাবিক। আর এই স্বাভাবিকতাই কী অপরাধ। তা ছাড়া তার চেহারার সঙ্গে কারও চেহারার মিল অমিলের মধ্যে চাকরির সম্পর্ক কোথায়? সেটাও সে বুঝতে পারছিল না।

সেদিন বুঝতে পারেনি। আজ পারছে উত্তম কুমারের সঙ্গে তার চেহারার মিল থাকাটা কতটা জরুরি। কেননা তার চাকরিই তো উত্তম কুমার সেজে ঘুরে বেড়ানো। নিজের সত্তাকে ভুলে গিয়ে অন্য একটা চরিত্রকে নিজের ভেতর ধারণ করার নামই অভিনয়Ñ এই শিক্ষাটা পরে পেয়েছিল মোহাইমেন। একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে যখন হতাশার চূড়ান্তে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, চোখ দিয়ে অজান্তে জল গড়িয়ে পড়ছিল, তখন আহমেদ সাহেব তাকে গভীর দৃষ্টি দিয়ে দেখছিলÑ দাঁড়াও, দাঁড়াও। এ রকম কান্নার দৃশ্যে মনে হচ্ছে উত্তম কুমারকে দেখেছি। আমার অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির কথা মনে পড়ছে। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পেয়েছিল ছবিটা। পরিচালক ছিলেন সুনীল ব্যানার্জি। আহমেদ আবেগপ্রবণ হয়ে স্মৃতিচারণ করতে থাকেন। অনেকক্ষণ একা একা নিজে নিজে এক কবির জীবনকাহিনি নিয়ে নির্মিত ছবির বর্ণনা দিয়ে শেষ পর্যন্ত বললেন, তোমার চাকরিটা হবে। তবে তোমায় পরিশ্রম করতে হবে। কঠোর পরিশ্রম। এর জন্য বিশেষ গ্রুমিংয়ের প্রয়োজন হবে। আমি তোমাকে একজন মানুষের কাছে পাঠাব। চলচ্চিত্র বোঝেন। সিনেমার মানুষ তিনি। তাঁর নাম আনোয়ার হোসেন পিন্টু। তিনি যদি রাজি হন, তোমাকে একজন অভিনেতা হিসেবে দাঁড় করাবেন, তবেই তুমি চাকরি করতে পারবে।

সেই নাটকীয় সুখকর দৃশ্যটি সব সময় মনে পড়ে মোহাইমেনের। আহমেদ সাহেবের সেদিনের আফসোস, রাগ, উচ্ছ্বাস যা দেখেছিল, তা আগে কোনো মানুষের মধ্যে দেখেনি। মাত্র কয়েক মাস আগের ঘটনা। অথচ মনে হচ্ছে বহু যুগ আগে ঘটে গিয়েছিল এই সব। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল। মাত্র পাঁচ মাস। অথচ কত কিছু পাল্টে গেল মোহাইমেনের পৃথিবীর। এখন সে বুঝতে পারে, কেন আহমেদ সাহেব হতাশ হয়েছিলেন, কেন জিজ্ঞেস করেছিলেন অরিন্দম চ্যাটার্জির কথা। মোহাইমেন এখন জানে উত্তম কুমার অভিনয় করেছিলেন অরিন্দম চ্যাটার্জির ভূমিকায়। ছবিটির নাম ছিল নায়ক। পৃথিবীখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় এই ছবি বানিয়েছেন। অরিন্দম এক বিখ্যাত নায়ক। সারা দেশে জনপ্রিয় এক তারকা। সারা বাংলাজুড়ে তার কোটি কোটি ভক্ত। জৌলুশে ভরা উৎসবমুখর জীবন তার। সেই উজ্জ্বল মানুষের অন্তর্গত বেদনা ঘটনাচক্রে বেরিয়ে আসে এই ছবিতে।

আনোয়ার হোসেন পিন্টু তাকে এই ছবি দেখিয়েছে। শুধু সিনেমা দেখানো নয়, তার জীবনটাকে ওলট-পালট করে দিয়েছে মানুষটা। তার ভাবনার জগতে তোলপাড় করে দিল। মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছে মন্ত্র। পিন্টু তাকে কীভাবে কীভাবে যেন বুঝিয়ে দিয়েছে শুধু একটা চাকরির মধ্যেই জীবনের আনন্দ লুকিয়ে নেই। বরং একটা সুন্দর সিনেমা জীবনটাকে অনেক অর্থবহ করে তুলতে পারে। মানুষ শুধু খেয়ে পরে বাঁচে না, কখনও কখনও দূর দিগন্তে আকাশ আর মাটির কানাকানির দিকে তাকিয়ে থাকবে অকারণ। কাশবনের ভেতর থেকে অপু ও দুর্গার মতো দূরগামী রেল দেখে মন পুলকিত হবে। এমনি কত কথা, কত গান তার হৃদয়ে অলিন্দে ঢুকিয়ে দিয়েছে পিন্টু।

আহমেদ সাহেবের অনুরোধে পিন্টু প্রতিদিন মোহাইমেনকে গ্রুমিং করতে গিয়ে চলচ্চিত্র সম্পর্কে তার সারা জীবনের লব্ধ জ্ঞান মোহাইমেনকে উজাড় করে দিয়েছে। নিজে চলচ্চিত্রকার, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। তার সান্নিধ্যে এসে মোহাইমেন ছবি দেখার মজাটা যেমন পেয়েছে, তেমনি তার মধ্যে শিল্পী হওয়ার স্বপ্নও তৈরি হয়েছে। তারা একসঙ্গে সিনেমা দেখেছে। বুঝেছে। সিনেমা দেখার পর সেটি নিয়ে আলাপ করেছে। কোন সিনেমায় উত্তম কুমার কীভাবে অভিনয় করেছে, কী কৌশল নিয়েছে, সেগুলোও বোঝাত। 

রিয়াকে পড়ানো শেষ করে অনেকটা তাড়াহুড়ো করে তাই সে চলে আসত পিন্টুর এনায়েত বাজারের বাসায়। প্রায় প্রতিদিন। একটা ঘোরের মতো সে শুনত পিন্টুর কথাগুলো। তাকে দেখে চলচ্চিত্রপ্রেমী বোদ্ধা মানুষটিও খুশি হতো। মোহাইমেন হৃদয় দিয়ে অনুভব করত মানুষের স্নেহ।

পিন্টু বলে, তুমি একটা সাধারণ মানুষ ছিলে, ধীরে ধীরে শিল্পী হয়ে উঠছ। তোমার ত্যাগ যত বেশি থাকবে, প্রচেষ্টা আর সাধনা যত বেশি থাকবে, ততই সার্থক শিল্পী হতে পারবে।

এ রকম কত কথা বলে যায় পিন্টু। তাতে তার স্বপ্নের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। পিন্টু বলে, তোমাকে নিয়ে আমি একটা সিনেমা বানাব। তুমি প্রস্তুত হও। সেই সিনেমায় নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটা সংযোগ তৈরি হবে। ওখানে দেখানো হবে কলেজে পড়ুয়া একটা মেয়ে কীভাবে পুরোনো দিনের ছবি দেখতে দেখতে উত্তম কুমারের ভক্ত হয়ে যায়। প্রতিদিন রাতে মেয়েটি যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন তার স্বপ্নের মধ্যে আসে উত্তম কুমার। অনির্মিত সেই অনাগত ছবিটি মোহাইমেন দেখতে পায় মনের পর্দায়। সে হারিয়ে যায় অলীক রুপালি জগতে। যে মেয়েটির স্বপ্নে উত্তম কুমার আসে সেই মেয়ের আদলে রিয়ার চেহারা খুব স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে। 

পিন্টু বিরতিহীন কথা বলেন। বলতে বলতে থামেন। নিজেই আবার বলেনÑ এত কথা বলে লাভ নেই, প্রতিদিন ছবি দেখবে উত্তম কুমারের। আর ছবির গল্পটা এসে আমাকে বলবে। বলতে বলতে যখন ছবির দৃশ্যগুলো মাথায় আনবে, চরিত্রটাকে বুঝবে। নিজেকে সেই চরিত্র বলে ভাববে। তোমার নিজের অস্তিত্ব ভুলে সেই চরিত্রের ভেতর ডুব দেবে। দেখ উত্তম কুমারের আসল নাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু অরুণের কথা ভুলে গিয়ে তিনি জগৎ বিখ্যাত হয়েছেন উত্তম কুমার নামে। তুমিও ভুলে যাও মোহাইমেনকে।

কত কথা, কত উপদেশ, কত কৌশল শিখিয়েছে পিন্টু। বলেছেÑ তুমি আজ থেকে সাধারণ মানুষ নও, একজন শিল্পী, যে শিল্পী নিজের ভেতর অন্য একটা চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলে।

মোহাইমেন উত্তম অভিনীত এক একটা ছবি দেখে। আর আয়নার সামনে দাঁড়ায়, তারপর নিজেকে সেই চরিত্র হিসেবে কল্পনা করে। কখনও অলক মুখার্জি হয়ে দুর্ঘটনায় স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। কখনও হয়ে পড়ে গৃহভৃত্য রাইচরন। এসব চরিত্রের ভেতর সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। একটা ঘোরের ভেতর নিজের পুরো পৃথিবীটাকে অতিকায় একটা রুপালি পর্দা ভাবতে থাকে সে। চাকরির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা একটি বেকার ছেলে মোহাইমেন মাত্র কয়েক দিনে উত্তম কুমারের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। সে হয়ে উঠল অন্য একটা মানুষ। নিজের যাপনকে, দিনের প্রতিটি ঘটনাকে সে ভাবতে থাকে কোনো একটা সিনেমার দৃশ্য। ভোরের জাগরণ থেকে রাতের নিদ্রা পর্যন্ত সবকিছু যেন বাস্তবে নয়, সিনেমায় ঘটছে।

এভাবে নিজের দিনগুলোকে সিনেমায় প্রতিস্থাপন করতে শিখছিল মোহাইমেন। জীবনটা ঠিক অন্য একটা জীবনের দিকে মোড় নিচ্ছিল তার। ঠিক সেই সময়, হ্যাঁ মোহাইমেনের উত্তম কুমারে পরিণত হওয়ার দিনগুলোতে পৃথিবীও পাল্টে যাচ্ছিল। তার রূপের পরিবর্তন হচ্ছিল। হঠাৎ অদৃশ্য করোনার কবলে পড়ে স্তব্ধ হয়ে পড়ছিল পৃথিবীর কোলাহল। সমস্ত কিছুর মতো রুপালি পর্দায়েও যেন যবনিকা পড়ল। ঝলমলে আলোর ওপর হঠাৎ কোথা থেকে এসে ভারী একটা পর্দা ঝুলতে থাকল। সেই পর্দায় ঢাকা পড়েছে মোহাইমেনের উত্তম কুমার।

যেরকম নাটকীয়ভাবে দীর্ঘ সময় নিয়ে চাকরিটা শুরু হয়েছিল, সেরকম কিছু নয়, খুব সহজভাবে সংক্ষিপ্ত একটা বৈঠকে চাকরিটা চলে গেল। আহমেদ সাহেব তার হাতে কিছু টাকার একটা খাম গুঁজে দিয়ে বললেনÑ করোনার কাল শেষ হলে দেখা করো।

চাকরি পাওয়া আর সেটি হারিয়ে ফেলা সবকিছু যেন একটা সিনেমার ঘটনার মতো ঘটে গেল। একটা কাহিনি শুরু হতে হতেই শেষ। যার প্রতিটি দৃশ্যে সে অভিনয় করেছে।

এই যে চাকরিটা চলে গেল, কিংবা আপাতত বন্ধ হয়ে গেল তাতে মোহাইমেনের কোনো প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিক বোঝা গেল না। কেবল তার মনে হচ্ছে সে আসলে একটা ছবি দেখছে, যাতে উত্তম কুমার অভিনয় করেছে।  শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত অত্যাধুনিক এক বিপণিকেন্দ্র থেকে চাকরি হারিয়ে যখন সে নামছিল তখন শহরটার আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা। চারদিকে অন্ধকার ছড়িয়ে কী যেন গুম করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল প্রকৃতি। তখন বরং সেটাকেই অনেক বড় বিপদ বলে মনে হচ্ছিল তার। কয়েক পলক পর সত্যি সত্যি মূর্তিমান বিপদ হয়ে নামল বৃষ্টি। নগর ভাসানো আষাঢ়ের ধারা। কয়েক মিনিটের মধ্যে সে দেখল ডুবে যাচ্ছে সামনের পথ, যানবাহনগুলো পানির স্রোতের ভেতর উজানে যাচ্ছে ঢেউ তুলে তুলে। তার মনে প্রশ্ন জাগেÑ চাকরি হারানোর ঠিক কয়েক মুহূর্ত পর বৃষ্টি-বন্দি হয়ে পথে আটকে থাকা কোনো মানুষের চরিত্রে কী উত্তম কুমার অভিনয় করেছিল?

বহুদূর বিস্তৃত কোনো পথ যদি একটা বাঁকে এসে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায় তখন পথিক কোথায় যায়? কী করে? উত্তম কুমারের কোনো সিনেমায় তার জবাব পাওয়া যাবে? এ রকম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটি নগরের ডুবে যাওয়া দেখেছিল পৃথিবী আঁধার করা বর্ষণে?  নাকি তীব্র বর্ষণকে উপেক্ষা করে হেঁটে গিয়েছিল জলের ভেতর।

নিশ্চয় হেঁটে গিয়েছিল। কেননা একটা দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য কোনো সিনেমায়  বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। প্রকৃত নায়ক কী কখনও এভাবে থেমে থাকে?

একটু পর মোহাইমেন দেখে ঘোর বরষায়, অবিরাম বজ্রবিদ্যুতের ভেতর হাঁটুজল ভেঙে ভেঙে সড়ক তোলপাড় করে হেঁটে যাচ্ছে মহানায়ক উত্তম কুমার।

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares