বন্ধুর বন্ধু : মোহিত কামাল

পাতাঝরা গাছের শুকনো ডালে জড়াজড়ি করে মিশে থাকা বেগুনি রঙের মহাউল্লাস চমকে দিল আমাকে। চোখের জ্যোতি বেড়ে গেল কয়েক শ গুণ বেশি। বিবর্ণ শাখা-প্রশাখার ফাঁকফোকর দিয়ে নিজের পাপড়ি-খোলা স্থির চোখ ছুটে গেল আকাশপানে। মহাশূন্যে আকাশি রঙ আর সাদা মেঘের সোহাগি মিলন দেখেও চোখ জুড়িয়ে গেল।

‘ঠিকঠাক দেখছ তো সব? না-কি ভুল দেখাচ্ছ আমাকে?’

ভেতরের প্রশ্ন শুনে নিজের চোখেরই জবান খুলে গেল। হেসে হেসে জবাব দিল, ‘তোমার বিস্ময় আমাকে তো এখন তোমার কপালে তুলে দিয়েছে! তাই দ্বিধা কাজ করছে তোমার মনে। এ আবেগ ঝেড়ে ফেলো, সংশয় কেটে যাবে। মনের আলো দিয়েও দেখো, দেখার মতো দেখতে পাবে সব।’

ঝাড়ি খেয়ে ঝাঁকি খেল মন। নিজেকে খুঁজে পেয়ে আবার তাকালাম প্রায় শুকনো শাখা-প্রশাখার বুকে থরে থরে সাজানো বেগুনি রঙের ফুলের দিকে।

‘আমাকে শুকনো ভাবলে কেন? শুকিয়ে যাওয়া বুকে কি এমন মায়াবি রঙ খেলা করতে পারে?’

গাছের ডালের প্রশ্ন শুনে বোকা হয়ে গেলাম। আমার মনের কথা ও বুঝতে পেরেছে দেখে বোকা বনে গেলাম। আবার নির্বাক হয়ে তাকালাম ওপরে।

‘শোনো, বোকা তুমি, শোনো। আমিও পানি পান করি। আমার ভূমিদাদা, মূল কাণ্ড অসংখ্য শেকড়-বাকড়ের সুচালো মুখ দিয়ে মাটি থেকে শুষে নেয় পানি, খনিজ-খোরাকি। ওতে আমাদের প্রাণ বাঁচে। আমার ভেতরটা তখন থাকে স্রোতসিনী নদীর মতো, খলবল করি আমি। আমার প্রশাখারাও তখন হাসতে থাকে। সেই হাসির উপহার হচ্ছে এই রঙের খেলা।’

আমাকে নিশানা করে বলা শুকনো ডালের কথায় আমার মস্তিষ্কের গহিন থেকে অহংকার গর্জে উঠল। মাথা উঁচিয়ে বললাম, ‘তোমার এ অহমিকা তো স্বল্পকাল স্থায়ী। ঝরে যায় তোমার বাহারি ফুল। মাটিতে গড়াগড়ি খায়।’

পুরো গাছ এবার হাসতে লাগল। ওর হাসির দাপটে কানে তালা লেগে যেতে লাগল। দুহাত দিয়ে কান চেপে ধরলাম। ওপর থেকে আমার চোখ নেমে গেল নিচের দিকে।

‘হ্যাঁ। নিচের দিকে তাকাও। দেখো, মাটিতে বিছানো আমার ঝরাফুলের তৈরি বেগুনি কার্পেট ভালো করে দেখো। দেখো ওখানে কারা শুয়ে আছে, কারা বিশ্রাম নিচ্ছে, চোখ বড় বড় করে দেখো।’

গাছের কৌতূহল জাগানিয়া নির্দেশ আমার চোখজোড়া টেনে নিয়ে গেল বিবর্ণ ঘাসের বুকে পাতিয়ে রাখা কার্পেটের দিকে। আর হাঁটু গেড়ে বসে কাছ থেকে দেখতে লাগলাম সুচালো দাঁতওয়ালা অতি ক্ষুদ্র সাদা সাদা রঙিন কণিকার আয়েশি শয্যাযাপন। বিস্ময় আর ভয়ের চাপে আমার গলার স্বর বসে গেল। তবু বেরোলো কাঁপা কাঁপা স্বর, ‘ওরা কারা?’

‘ভয় পেলে তো! শাস্তি পেতেই হবে তোমাদের। দেখো ওদের ভয়ে তোমরা সবাই ঘরে পলাতক। আর এ সুযোগে জেগে উঠেছি আমরা, ছড়িয়ে দিচ্ছি আমাদের আসল রঙ। ওই যে আমার পাশ দিয়ে বহতা প্রশাখা নদীটির দিকে তাকাও। তাকাও।’

ধমক খেয়ে তাকালাম সরু নদীর বুক বেয়ে চলা জলের দিকে। ওপারের সবুজ গাছ-গাছালির ছায়া টলমল করছে, নদীর স্রোতকে আদর দিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে সে-ছায়া। দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

‘কী বুঝলে, রোদ্দুর? কী অত্যাচার তোমরা চালিয়েছ আমাদের ওপর, কার কল্যাণে আমরা জেগে উঠতে পেরেছি, বুঝতে পেরেছ?’

আমার এন্টেনার তরঙ্গ রিপোর্ট থেকে জেগে উঠল অশনিসংকেত। লাফ দিয়ে ছ’ফুট পেছনে গিয়ে বললাম, ‘তাই বলে কি আমাদের শজারু শত্রুকে এমন আয়েশি শয্যা পেতে বরণ করবে?’

‘আমরা তো আমাদের বন্ধুদের বরণ করছি। তোমাদের শত্রু কীভাবে যে আমাদের বন্ধু হয়ে গেল, বুঝতে পারছ? আমরা তোমাদেরও বন্ধু ছিলাম। রেখেছো বন্ধুত্বের মর্যাদা?’

‘তোমাদের এ ক্ষণস্থায়ী বন্ধুরা দলে দলে মরবে। আমাদের দেহে ভর করতে না পারলে ওরা বাঁচার রসদ পাবে না। মরে ভূত হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হবে।’

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই আকাশ কাঁপানো অট্টহাসি ছড়িয়ে যেতে লাগল। নদীর টলমলে পানির স্রোতও হেসে হেসে বয়ে যেতে লাগল দূর সাগরের দিকে। ওপারের সবুজ গাছ-গাছালির ভেতর থেকেও উড়াল দিল একঝাঁক নাম না জানা পাখি। আর আকাশের সাদা মেঘের ভেতর থেকে উঁকি দিতে লাগল কালো মেঘ। আমার রোদ্দুর নামের রোদ ঢেকে যেতে লাগল মেঘের আড়ালে। আলোহীন চোখে অসহায়ের মতো দেখতে লাগলাম ‘শজারুমুকুট’ মাথায় পরে করোনাসম্রাট কোটি কোটি সৈন্যবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পুরো মানব জাতির ওপর। আর এ সুযোগে প্রকৃতি বন্ধু হিসেবে বরণ করে নিচ্ছে ওদের।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares