প্রায় আত্মজীবনীরই মতো : আকিমুন রহমান

এখন আমি যে-কথাটা বলতে যাচ্ছি, আমি জানি সেটা একদম গল্পের মতো শোনাবে। তেমনই যে শোনাবেÑ সেই বিষয়ে আমি নিশ্চিত! কথাটা শুনতে শুনতে মনে হতে থাকবে, এটা একটা বেশ অন্যরকম গল্প!

অথচ এটা গল্প না! এটা সত্য এটা বাস্তব! গত তিন দিন ধরে আমার শরীর বা আমার জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে থাকা-একটা বাস্তব স্রোত এটা! কী যে ঘটছে! কী যে ঘটছে এটা-আমার শরীরে! কেন এমন হচ্ছে! কেন এমন? এই কথা ভেবে ভেবে প্রথম দুদিন গেছে আমার! উৎকণ্ঠ, বেদিশা, ত্রস্ত, বিবশ! নিদ্রালু অথচ ঘুমহীন!

আজ, তৃতীয় দিনের এই বিকেল থেকে যেন মস্ত ভালো লাগছে সেই অবোধগম্য গোলমালকে! অনেক ভালো! উফ! আমি বুঝে উঠতে পারছি না, কেন ভালো লাগছে ! এত কেন আহ্লাদকর, এত কেন আরাধ্য লাগছেÑ ওই আগামাথাছাড়া বিষয়গুলোকে!

আহ! আমার ভয় লাগছে খুব! আবার যেনো পলকেই আমার হৃৎপিণ্ডটা আলোর কণা হয়ে হয়ে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে! উল্লাসে উল্লাসে যেন সে হয়ে যাচ্ছে আতশবাজির বহু বহুরঙা আলোকণিকা!

আমার ভালো লাগছে না! আমারÑ আমারÑ বিষমÑ বিষম ভালো লাগছে!

আহ! এমন হলে কী কেউ স্বস্তিতে থাকতে পারে? পারে? পারে না পারে না! আমি এখন একদম একটুও স্বস্তিতে নেই! একেবারেই নেই! মনটা বড়ই খারাপ আমার! অনেক খারাপ!

পাঁচ দিন আগে, আমি এইখানে এসে পৌঁছুবার পরের দিন দুপুরে, মৃধা মিয়া মারা গেছে! নাহ! কোনো কঠিন অসুখে মারা যায়নি সে! নিতান্ত সামান্য জ্বর নিয়ে, একেবারে ঝুম মৌনতা নিজের শরীরে ধরে রেখে, একেবারে নির্জলা মুখে, সে চোখ বুজেছে! বরাবরের জন্য চোখ বুজেছে! এবং আজব ব্যাপার এই যে, চিরকালের জন্য চোখ বন্ধ করার আগে, সে হাতড়ে হাতড়ে আমার ডানহাতখানা জাবড়ে ধরে নিয়েছে। আমি তার পাশে বসেছিলাম। মৃধা মিয়ার মাথায় জলপট্টি দিতে দিতে একটু কাতর হয়ে ওঠা আমার ডান হাতটা তখন নেতিয়ে ছিল হোগলার পাটির ওপরে!

মুখে সে একটা কোনো আওয়াজ তোলেনি। বা চোখ খুলে আমার দিকে তাকাবার চেষ্টাও করেনি! হয়তো ওই শক্তিটুকু তখন তার শরীরের কোথাও ছড়িয়ে ছিল না! তাও যে কেমন করে সে আমার হাতটাকে খুঁজে নিতে পারে, আমি বসে বসে সেই কথা ভাবতে থাকি! ভাবতে ভাবতে এক সময় বোধ করতে থাকি, মৃধা মিয়ার উষ্ণ হাতটা ক্রমে যেন নিভে আসছে! যেন একটা ধীর শীতলতা এসে মুড়ে নিচ্ছে সেই হাত!

তখন আমি দেখি, মৃধা মিয়া চোখ বুজে ফেলার পরেও তার মুষ্টি আমাকে আঁকড়ে ধরেই আছে! খসে পড়ে যায়নি! আমিই শেষে শক্ত হাতে সেই মুষ্টি খসিয়ে, মৃধা মিয়ার ডান হাতটাকে চাটাইয়ের ওপর নামিয়ে রেখেছি!

কী অদ্ভুত না অবস্থাটা? জীবদ্দশায় যেই মৃধা মিয়া কদাপি কোনো আকুল কথা মুখে আনেনি, সে কী এই শেষবেলায় কোনো এক রকম মৌন কাকুতি ছড়াতে ছড়াতে চলে গেল? একটা কোনো আওয়াজ না করে, একটা বার আমার চোখের দিকে চোখ না দিয়ে, শুধু অশক্ত কাতর একটা মুষ্টির স্পর্শ দিয়ে সে কোন কথা বলে গেল? কোন কথা? আমি কি তা তখন বুঝতে পেরেছি? একটুও বুঝতে পারিনি!

অথচ এখন, এই আজকে তিন দিন ধরে নীরবে নীরবে, ধীরে ধীরে, যেন পরিষ্কার বুঝে উঠছি!

কিন্তু বুঝলে কী? মৃধা মিয়ার সেই বাঞ্ছাকে আমি কস্মিনকালেও সত্য হতে দেব না! একটুও না! কিছুতেই-কিছুতেই না!

নেহাত বিধি আছে যে, মউতাবাড়ি থেকে চারদিন পার না-করে যেতে নেই। তাই আমি এইখানে এখনও আছি! নয়তো মৃধা মিয়াকে মাটি-মঞ্জিল দিয়ে, তার কবরের পায়ের কাছে একটা আমলকী চারা পুঁতে রেখে, আমি অনায়াসেই, সেই দিনই রওনা হতে পারতাম!

তখনও আকাশে ভাদ্র মাসের তেজালো রোদের ধুম ডাকাডাকিটা ছিল। নিচের বনে বনেও আলোর কমতি ছিল না! কাজেই আমি রওনা দিয়ে দিলেই হতো! সহজেই আমি বেলাবেলিই বনের দীর্ঘ তল্লাট পাড়ি দিতে পারতাম। রাত্রি এক প্রহরের মধ্যে হয়তো হাইওয়েতেও পা রাখতে পারতাম! তারপর পরদিন ভোরে, চোখের সামনে এসে ঠিকই দাঁড়ায়ে যেতÑ ঢাকা! আমার নগরী!

কিন্তু তেমনটা করতে কিছুতেই আমার মন সরেনি! পা ওঠেনি। একটা মউতাবাড়িকে এমন একলা ফেলে রাখে যাব? মানলাম আমার বিবেকে বিস্তর সমস্যা আছে, কিন্তু সেই বিবেকও তো এতখানি চোখ উল্টাইন্না জল্লাদ হইয়া যায় নাই এখনও! আমার সেই ট্যামরা-ধরা বিবেক কী আমারে এমন করে চলে যাওয়ার জন্য সম্মতি দেবে? দেয় নাই তো!

তখন একবার মনে হয়েছে, যাই গা বরং এক্ষণই! এই তো এখনও আছরের ওয়াক্তও পার হয় নাই! এই পাহাড়-চূড়া থেকে উতরাই বেয়ে নামতে যতক্ষণ, তারপরই তো বনের সমতল!জোর কদমে হাঁটলে সন্ধ্যার অন্ধকার আমার নাগালই পাবে না! যাইই বরং! তক্ষুনি পলকের মধ্যে কে জানি আমাকে শুনিয়েছে, ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এইটা কোনো মানুষের কর্ম হইব? ছিহ! মউতাবাড়িরে যেয় কিনা এমনে ফালাইয়া যায়, হেয় না হুদা একটা আমাইনষের ছাও! ধিক তারে!

‘কিন্তু এটা তো আদতে কোনো বাড়িই নয় বাবা!’ চলে যাবার জন্য আমার শরীর আবার তড়পে উঠেছে! ‘এটা এই যে পাহাড়চূড়াখান-এটার প্রায় সমস্তটাই তো কবরখানা! শুধু দক্ষিণের শেষমাথাটাতে আছে একটা কোনোরকম চালাঘর! এই চালাটুকুই না আজীবন মৃধা মিয়ার ঘরসংসার ছিল? এই নিঃঝুম কবরখানাই না তার বসতভিটা ছিল চিরদিন? সেই কবরখানায় আবার চারদিনের নিয়ম-ব্রত পালন করা-করির কোনো ব্যাপার থাকে নাকি?’

ভাঙা ঝুরঝুরা মুলিবেড়ার ঘেরঅলা চালাটার দিকে তাকায়ে থাকতে থাকতে আমার মন আমাকে ডেকে উঠেছে, ‘চল! চল! যাইগা!’

আবার কিনা কালোর কালো সেই বেড়ার মুখে যে তেখেচরা বেঁকে থাকা কপাটখানা আছে, সেই কপাটে তখন আমাকে ধুম দোহাই দিয়ে উঠেছে, ‘এমনে যাইয়ো না ধন! এমনে যাইতে নাই! মউতাবাড়িরে সন্ধ্যাবাত্তি দেখানের কিন্তুক তুমি ছাড়া কেউ নাই!’

অই যে কপাট-অই দেখা যায় তার দুই দুইটা পাল্লা! তাতে খিল আছে। কিন্তু সেই খিল মৃধা মিয়া তার জীবদ্দশায় কখনও এঁটে দিত না।

এদিকে খিল না এঁটে আমার তো স্বস্তি হতো না। ঘুমাতে অশান্তি হতে থাকত! অই যে আগে- হঠাৎ হঠাৎ এসে হাজির হওয়া আমি, আমার স্বস্তি-অস্বস্তি বা জগৎ-সংসারের অন্য কোনো কিছুই কি মৃধা মিয়া গোনায় ধরার বিষয় মনে করত? করত না! সেই কথা মনে আসে আমার তখন, আচমকাই! আর কিনা তখন পরানের ভিতরে কেমন টনটন করে উঠতে থাকে!

আমি কী মৃধা মিয়ার কেউ ছিলাম? আমি তার এইখানে এসে, তার নিয়ম মেনেগুনে, দিন কয় পার করে যেতাম শুধু। অল্প কয়দিনের জন্য আসা-এক অল্প পরিচয়ের মেহমান মাত্র ছিলাম আমি!

সেই আমাকেই কিনা শেষ পর্যন্ত মৃধা মিয়ার শেষবেলার তাবৎ দায়-কর্তব্য পালনের ঠেকায় পড়তে হলো! কী অদ্ভুত না ব্যাপারটা? আচ্ছা, ঠিক আছে। শেষকৃত্যের সকল দায় না হয় সারলাম! না  করে উপায়ই বা কী ছিল! আমি ছাড়া মৃধা মিয়ার সামনে তখন আর ছিলই বা কে? কেউ না! এই কবরখানায়ও যেমন কেউই নেই, আশপাশের সমতলের বনভূমিতেও তো কোনো জনমনিষ্যির চিহ্নমাত্র নেই! কোনোদিন নেই!

মৃধা মিয়ার মৃত শরীরকে সামনে নিয়ে বসে থাকতে থাকতে, সেই দুপুরে আমি পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম, আমি ছাড়া এই বিজন তল্লাটে আর একটা কেউ নেই, যে কিনা সৎকারে হাত লাগাতে পারে!

আর এখন, এই যে মৃধা মিয়ার মৃত্যুর পরের তৃতীয় দিনটি আমি পেরোচ্ছি, এখন আমি বুঝতে পারছি, শুধু চারদিনের বিধি পালনেই আমার দায়িত্ব শেষ হবে না! অন্য আরও কী যেন একটা দায় পালনের দায় আছে আমার! আছে আছে! এবং ওটি পালনই আমার নির্বন্ধ! ওটি পালন করতে হবে বলেই, এই ভাদ্র মাসের দিনে, অমন পাগল-ছুট দিয়ে আমাকে চলে আসতে হয়েছে এখানে।

কিন্তু না না! আমি সেটা করব না! এই যে চারদিন একদিকে শেষ হবে, অমনি আমি আমার ব্যাকপ্যাকটা পিঠে নিয়ে সমতলের দিকে নামা শুরু করব! একদম একবারও পিছু ফিরে তাকাব না এই কবরখানার দিকে!

এই যে আজকের পরেই শেষ হবে এই মউতাবাড়ির চারদিন পালনের দায়! আগামীকাল আসতে তো আর দেরি নেই! মোটেও দেরি নেই! উপোস!

আচ্ছা, সেই আগামীকাল চলে যাওয়ার কথাটা না হয় পরে মনে করি? এখন বরং অন্য জরুরি বিষয়টা নিয়ে ভাবি! গত তিনদিন ধরে আমার শরীরের ভেতরে যেই উৎপাতটা পাচ্ছি, সেইটাকে বরং একটু বুঝে ওঠার চেষ্টা চালাই? আমার মধ্যে যেই অদ্ভুত একটা বোধকে পাচ্ছি, থেকে থেকেই পাচ্ছি! সেইটাকেই বরং তন্নতন্ন করে নেড়েচেড়ে দেখি এখন?

তারও আগে না হয় মৃধা মিয়ার সাথে আমার সম্পর্কটাকে একটু চিনে ওঠার চেষ্টাটা করি আজকে?

দুই.

এবার, এই যে এখন, আমি লামায় এসেছি; এখন এটা ভাদ্র মাস। এর আগে আমি আর কখনও ভাদ্র মাসে লামায় আসিনি। এই প্রথম, এইখানে, ভাদ্র মাসে। 

অন্য-অন্যবার বছরের কত কত মাসেই না লামায় যাই! কোনোবার হয়তো বৈশাখ থাকে, বা অঘ্রান বা ফাল্গুন বা আষাঢ়! কোনো কোনো বছর হয়তো দু’বার গেলাম। কোনোবার হয়তো তিনবারও হয়ে যায়! কোনো কোনো বছর হয়তো একবারই গেছি, কিন্তু এক মাস পেরিয়ে দুমাস ফুরিয়ে হয়তো তৃতীয় মাসেরও অর্ধেক চলে গেছে, শহরে ফেরার কথা আমার কিছুতেই আর মনে আসছে না!

তখন হয়তো মৃধা মিয়াই আমাকে আলগোছে, একবারই আমার শহরের কথা কথা মনে করিয়ে দেয়! হয়তো তখন এক ফুঁয়ে কুপি নিভিয়ে, চাটাইয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে, সে আমার ফেলে আসা বিষয়কর্ম নিয়ে একটা দুটা কথা বলে! বা হয়তো আমার টাউনের বাসার গাছ-গরানের বিষয়টা টেনে এনে একটু খানিক কথা চালায়।

যখন আমি দিন দশেক বা সপ্তা দুয়েকের জন্য যাই, তখন কিন্তু সে অইসব কথা কদাপি তোলা দেয় না! আমি যেমন হঠাৎ গিয়ে হাজির হই, তেমনি হঠাৎই হয়তো একভোরে জানাই, আমি রওনা দিতে যাচ্ছি! সে হয়তো তখন তার কর্মব্যাপৃত হাত দুখানা একটু থামিয়ে ফেলে, বা নত চোখ দুটো পলকের জন্য তুলে ধরে। ব্যস অইই!

বিদায়ের কালে কখনও সে আমাকে এগিয়ে দেবার জন্য পাহাড়ের কিনারা বরাবরও আসে না। বা উতরাই বেয়ে নিচের সমতলে নেমে আসার কোনো উদ্যোগও কখনও নেয় না। সে তখনও নিজের হাতের কাজ নিয়ে নিজের মতনই মেতে থাকে, আমি আমার বিমর্ষ পায়ের আওয়াজ পেছনে পাঠাতে পাঠাতে উতরাই পেরোতে থাকি।

কিন্তু যখনই আমার অবস্থানের কাল দু’মাস ছাড়িয়ে আড়াই মাসও পেরিয়ে যেতে থাকে, তখনই মৃধা মিয়াকে রাত্রির প্রথম প্রহরে আমি খানিকটা বিচলিত হতে শুনতে পেতে থাকি! এক ফুঁয়ে কুপি নিভিয়ে সে যেন নিজেকেই আমার বিষয়ে দুই চারটা দরকারি কথা শোনাতে থাকে। খুবই অস্ফুট স্বরেই সে তখন হয়তো নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে থাকে; কিন্তু কবরখানার গাঢ় নৈঃশব্দ্যের সাথে শুয়ে থাকা রাতে, সেই অল্প কয়টা ফিসফিসে কথাও আমার চাটাইয়ে এসে ঠিকই বসে পড়ে!

এই যেমন, সে হয়তো তখন বলে, ‘অখনও টাইম অয় নাই আম্মা, আপনের! এত্তাদিন ধইরা এইনে পইড়া থাকোনের টাইম এইটা না আম্মা! আপনের টাউনের কামগিলিয়ে আপনের লেইগা বার চাইতাছে না? হেটি তো আগে তরাতরি শ্যাষ করোনের কাম আপনের! নাইলে পরে আর হেইগিলি গুছানের ফুরসত পাইবেন? জিন্দিগিতে আর পাইবেন না আম্মা!’ 

প্রথম প্রথম মৃধা মিয়ার ওই ওই অস্ফুট কথার পিঠে আমি ঠিকই কথা বলে উঠেছি। জিজ্ঞেস করেছি, ‘আমারে কিছু কইতাছেন, মৃধা মিয়া? কী কইতাছেন, বাজান?’ কিন্তু সেই জিজ্ঞাসার কোনো উত্তর আসেনি! কখনওই আসেনি!

আমি তখন ক্রমে বুঝতে শিখেছি, ওই অস্ফুট কথাদের কী মানে দাঁড়ায়! কোন মিহি স্বর কোন বক্তব্য জ্ঞাপন করে! আমি বুঝে উঠতে শিখেছি, অইসব ছাড়া ছাড়া কথার মানে কী! ওসবের মানে হচ্ছে, আমাকে এখন বিদায় নিতে হবে। এখন মৃধা মিয়া তার বসতস্থানে একা হয়ে যেতে চাচ্ছে! নিজের সঙ্গে তার নিজেরÑ অহোরাত্রি নিরিবিলি বসত করার অধিকারটা ফেরত চাচ্ছে সে!

বিষয়টা বুঝতে পেরে, অন্ধকার চাটাইয়ের ওপর পড়ে থাকা আমার শরীর, তখন আরও অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু সেই তক্ষন তক্ষনই আমি- দূর বাতাসে কফির গন্ধ ঝমঝমিয়ে উঠতে শুনেছি। একটা দুটা কাক ডেকে ডেকে উঠছে তখনই! কোনো অদেখা গাছে গাছে যেন ডেকে ডেকে উঠেছে! আমাদের বাড়িটার উঠানের কামরাঙা গাছে, দুপুরের কালে, যেভাবে ডেকে ডেকে যায় তারা, ঠিক তেমন রকম তুমুল বিমর্ষ স্বরে ডেকে উঠেছে কাক- কবরখানার গাছে গাছে, রাত্রির প্রহরে প্রহরে। আর তখনই আমার কিনা- ঢাকার কথা মনে পড়ে গেছে! আচমকাই খুব মনে পড়ে গেছে! আরে! সবকিছু ফেলে আমি এইখানে এইভাবে পড়ে আছি কেন! এই কথা মনে এসেছে  আমার! তখন ভোরের জন্য আমার ছটফটানির কোনো বিরাম থাকেনি!

কেন যেতাম আমি তখন লামায়? বারেবারে কেন এসেছি? কেন এসেছি এইবারও?

কেন যে এসেছিÑ তার সঠিক কারণ কী জানা আছে নাকি? জানা নেই তো!

ঢাকার আরামে-আহ্লাদে থাকতে থাকতেই হঠাৎ একদিন দেখতে পেতাম, জীবনকে যেন টেনে টেনে আর কুলাতে পারছি না! যেন হাঁটু বেঁকে যাচ্ছে আমার যখন-তখনই! যেন গুন-টানতে থাকা আমার শরীরটা একেবারে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাবার দশায় এসে পৌঁছেছে! তখন-তখন আচমকাই বোধ করেছি যে, কাঁধে গেঁড়ে বসা গুণটা থেকে আমার দুই হাত কেমনে জানি হড়াৎ করে খসে পড়েছে!

গুণসহ জীবনের নাওখানা আমার পেছনে থেমে গিয়ে, আমার দিকে অশ্রদ্ধামাখানো চোখে তখন চেয়ে থেকেছে শুধু! আর, তাকে পেছনে রেখে আমি নিজেকে দাঁড় করিয়ে নেওয়ার চেষ্টাটা চালাতে চালাতে, বুঝে উঠতে পেরেছি, আমাকে লামায় যেতে হবে!

আরেকবারের জন্য বেঁচে উঠতে হলে, আমাকে ওইখানে যেতে হবেই এখন! আমার তখন গরম-ঠান্ডার হিসেব মনে আসেনি। বৃষ্টির তোড়ে দুর্গম পথ আরও জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে আছে কিনা, সে-কথা মনে পড়েনি। বা, ঘন ওশে দিকভ্রান্ত হয়ে যাবার আশঙ্কা কতটা আছে, তাও আর বিবেচনার বিষয় হয়ে থাকে নাই তখন! তখন আমি শুধু বুঝতে পেরেছি, আমাকে যেতে হবে! আমাকে লামায় যেতে হবে!

কী আছে সেইখানে?

সে অর্থে বলতে গেলে কিছুই নেই! কিচ্ছু নেই। কোনো গোছানো-পরিপাটি রিসোর্ট বা  আধামাধা ঝুঁমতে থাকা হোটেল বা বেড়ার ঘরে কোনোমতে রাত পার করার কোনো একটা অগত্যা বন্দোবস্তÑ  কিচ্ছু নেই!

থাকার মধ্যে আছে গহন গভীর এক সমতল, বাঁশ বনে বনে ঢাকা। জমাট, ঘন বাঁশবন সেইখানে- মাইলের পর মাইল জুড়ে। সেই বাঁশÑ কোনো কোনোটি মোটা ঢাউস, কোনোটি লিকলিকে সরু অথচ দড়! কোনো কোনো বাঁশের শরীর আগাগোড়া ঝমঝমে হলুদ! কোনো কোনো ঝাড় কটকটে কইচ্চা। সেইসব বাঁশঝাড়ের বাঁকানো- নোয়ানো শরীরের তল দিয়ে দিয়ে কোনোরকম একটু পথ। ওই পথ দিনের দুপুরেরকালেও ছপছপা অন্ধকারে ছাওয়া! বরাবর চিরদিনÑ অমনই আঁধারে মোড়ানো থাকে সেই পায়েচলা পথ।

ওই পথে পায়ে পায়ে মাইল চারেক যাবার পরে যেখানে পৌঁছুনো যায়, সেখানে সমতল বাঁশবনের সীমানা শেষ হয়! সেই সীমানার শেষে পাওয়া যায় একটি প্রত্নভূমি! কোনো এক আগেকার দিনে অইখানে একদিন একটি আশ্রম ছিল। বিদ্যার্থীদের আনাগোনা ছিল। বিদ্যা অধিগত করার নানা আয়োজন আর ব্যতিব্যস্ততাও হয়তো ছিল! হয়তো কলহাস্যও ছিল। অসংখ্য প্রদীপ জ্বলে ওঠার রাত্রি বা হয়তো মন্ত্র উচ্চারণ করে করে সূর্যবন্দনার ঊষাকালÑ সেইসবও একদিন হয়তো সেখানে ছিল!

আজ সেসবের কিচ্ছু আর নেই! শুধু পড়ে আছে আশ্রমের শূন্য ভিটি, বা ভিটিতে পোতা খুঁটির ভগ্নাবশেষ। আর, ফেঁপে ওঠা সেগুনের পাতার নিচে নিচে আছে অনেক অনেক কাঁটানটে শাকের ঝাড়! আছে জনমনষ্যিহীন, অথচ জনমনিষ্যির পায়ের স্পর্শ পাওয়ার জন্য ছটফটাতে থাকা আঙিনা! সেই আঙিনা পেরিয়ে পুবদিকে এগিয়ে গেলেÑ সামনে পড়বে চড়াই। একেবারে খাড়া। হাতে একটা কোনো লাঠি ধরে না নিলে, সেই চড়াই পাড়ি দেওয়া অসম্ভব ব্যাপার!

তারপর সেই চড়াই গিয়ে শেষ হয় যেইখানে, সেটি গিরিশৃঙ্গ! গিরিশৃঙ্গটি সরল এক সমতল ভূমিরই মতো! অনেক অনেকখানি ছড়ানো সেটি! একদিন এইস্থান ছিল আশ্রমের প্রধান ধ্যানকেন্দ্র। এখন সেটি হয়ে আছে। সুনসান এক কবরখানা! সেইখানে কত কত আমলকীর গাছ! অগুনতি! তাদের ঝিরিঝিরি পাতাদের ছায়ায় ছায়ায় কত কত কবর! প্রাচীন সেসব কবর অতি প্রাচীন বটে, কিন্তু কোনোটিই ভাঙাচোরা নয়। বা কোনোটাই বেপরোয়া বুনো ঘাসে ঢাকা পড়া নয়!

কেননা তারা কেউই অভিভাবকহীন তো নয়! তাদের দেখভাল করার জন্য একজন আছে! সে-ই তো মৃধা মিয়া! প্রাচীন আশ্রমবাসীদের কোনো একজনের বংশধর হয়তো সে! শেষ বংশধর! কিন্তু কে যে তার সেই দূর পূর্বপুরুষ, সেই কথা মৃধা মিয়ার জানা নেই! একদিন কোন আগে, কোন দূর লোকালয়ে তাদের নিবাস ছিল, তাও তার সম্পূর্ণ অজানা! কীভাবে কখন এসে সে ঠাঁই পেয়েছে এই কবরখানায়, সে কথাও তার স্মরণে নেই!

সে শুধু জানে, এই কবরখানার এই চালাটাই তার সব। তার বসতভিটা বলো তো বসতভিটা, বা গ্রাম বলো তো একা এক গ্রাম এটা! আর সে জানে, এই কবরখানার ভালোমন্দ দেখা ছাড়া দুনিয়াতে তার আর কোনো কাজ নাই! জগতে আর কিচ্ছুই তার করার নাই! সেই কাজে কী মৃধা মিয়া বিরাম-বিশ্রাম নিতে পারে কখনও? এক মুহূর্তের জন্যও পারে না!

প্রতিবারই গিয়ে দেখি, মৃধা মিয়া হয় ঢালের ঘাস নিড়াচ্ছে; নয় ঘড়ায় করে করে পানি বয়ে আনছে। দূর পাহাড়ের ঝরনা থেকে আনা সেই পানি- সে তারপর ছিটাচ্ছে-আমলকী গাছের গোড়ায় গোড়ায়। নয়তো তার কুটিরের পাশে জন্ম নেওয়া হরগজা গাছের নিচু ডালে বাঁধা জালটাকে বুনে চলেছে।

সেটা দুপুর হোক কিম্বা সন্ধ্যা কিম্বা বিকেল-কখনওই কাজ ছাড়া, ফাঁকা হাতে বসে নেই মৃধা মিয়া! প্রতিবারেই পাহাড়চূড়ায় পৌঁছে, আমি পেয়েছি ফাঁকা কুটির! মৃধা মিয়ার চিহ্ন কোনোদিকে নেই। আমি খোলা দাওয়ায় বসে তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে একসময় দেখেছিÑ কোনো না কোনো দিকের চড়াই বেয়ে অই তো উঠে আসছে সে! হয়তো কাঁধে এক আঁটি মরা ডালপালা, নয়তো পানি ভর্তি ঘড়া, নয়তো এক পাঁজা পক্ব ভুট্টা।

আমাকে দেখে তার মুখে কখনওই হাসি ফোটে নাই, সেটা সত্য! কিন্তু আমি দেখেছি, আমাকে দেখার পর তার সমস্তটা মুখের বরণ কেমন ধীরে বদলে গেছে! সেই মুখের পোড়া তামাটে রঙটাÑ আস্তে আস্তেÑ হয়ে উঠেছে আমলকী পাতাদের মতো ফিকে সবুজ! আমি ক্রমে ক্রমে জেনে উঠেছি, অই হচ্ছে তার সম্ভাষণ! অই হচ্ছে তার খুশি হয়ে ওঠা!

তবে এবার কবরখানায় পৌঁছে, আমি বেশ বিমূঢ় হয়ে ওঠি! আমি এইবার পাহাড়চূড়ায় গিয়ে পৌঁছুই একেবারে সন্ধ্যার মুখে! পথে বৃষ্টি ছিল। সেই বিকালের কালেই, বাঁশ বনে-বনে অন্ধকার এমন ঘুরঘুট্টি হয়ে গিয়েছিল যে, আমার টর্চের আলোও আমাকে দিকভ্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারেনি! বার তিনেক ভুল পথে অনেকটা গিয়ে আবার সঠিক রাস্তায় ফিরে আসার চেষ্টা চালাতে চালাতে শেষে সন্ধ্যার মুখে আমি পেয়ে যাই চূড়াটিকে, এক পাশের নড়বড়ে কুঁড়েঘরটিকে, আর অনেক অনেক জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কবরখানাটিকে!

অমন সন্ধ্যার কালে আমি দেখি, কুটিরটি নিষ্প্রদীপ। অথচ বরাবর দেখে এসেছি, সন্ধ্যা ঘনিয়ে ওঠার অনেক আগেই মৃধা মিয়া তার ঘরটিতে বাতি জ্বেলে নিতে ভালোবাসে। ঘরে বাতি দিয়ে সে তারপর যায় কবরখানায় ঢোকার জায়গাটার কাছে। সেইখানে দুইপাশে দুটি বরই গাছ, দীঘল। এলানো নোয়ানো। সেই জায়গাটাকে ফটক বললে ফটক, নয়তো বরইতলা বললে বরইতলা। মৃধা মিয়া ডানপাশের বরইগাছের তলায় তেলভর্তি একটা মাটির পিদিম রাখে! সেই পিদিম এখন যতক্ষণ জ্বলতে পারে, জ্বলুক! অই হচ্ছে সেই কবরখানায় সন্ধ্যাবাতি দেখানোর ধরন তার!

কোনো কোনোবার দেখেছি, হয়তো সেটা ঝড়বাদলার সন্ধ্যা! তেলভরা পিদিম পেলে কী, সলতের শিখাটা ভেজা হাওয়া বা বৃষ্টির ঝটকা সয়ে হয়তো এক নিমেষের বেশি জ্বলে থাকতে পারে না! দাপাতে দাপাতে নিভে যায়! সেই সন্ধ্যায় হয়তো কবরখানা একপলকের বেশি আর তার সন্ধ্যাবাতিটা পায় না! মৃধা মিয়া নিজের চালার নিচে বসে পিদিম শিখার সেই খাবি-খাওয়াকে দেখে, দপর দপর কাঁপতে কাঁপতে তার নিভে যাওয়াকে দেখে। কিন্তু নিভে যাওয়া শিখাটাকে আবার ধরিয়ে দেবার জন্য পা বাড়ায় না সে। প্রথম প্রথম অমনটা দেখে আমার হাত আর পায়েরা পাগল পাগল তাড়া পেয়েছে। অই নিভন্ত প্রদীপটাকে আবার ধরিয়ে দিই তবে?

অই ভরভরন্ত সন্ধ্যায় যদি মৃধা মিয়ার আর বাদলায় ভেজার ইচ্ছা না হয়,তো না হোক! আমি তো এখন এইখানে আছি! আমি বরং যাই, শিখা ধরাতে! তখন আমি কোনো একটা কথা বলে ওঠার আগেই, মৃধা মিয়ার নিরালা গলাটা আমাকে বলেছে, ‘এইনে সন্ধ্যাবাত্তি একবারের বেশি ধরানের বিধি নাই! পইল্লা ধরানের পর যেট্টুক জ্বলতে পারে, জ্বলব!’

তাহলে আর কী! সেই নিভে যাওয়া পিদিম-থাকা বরইতলার দিকে চেয়ে চেয়ে তাহলে রাত্রি ঘন হতে দেখি তবে? তবে সেটুকু করারও বিশেষ কোনো সুযোগ কখনও মৃধা মিয়া আমাকে দেয় নাই! হয়তো সন্ধ্যার ফিঁকে সাদা ভাবটুকু তখনও লেগে আছে আকাশের কালো মেঘে মেঘে, বা হয়তো তখনও দিগন্তের দূর থেকে অস্ফুট একটুখানি মুখ তুলে চেয়ে আছে সূর্যের লালিমা, রাত হয়তো তখনও তাকে অন্ধকার দিয়ে ঘিরে নেবার মতন তেজি হয়ে উঠতে পারেনি! তেমন সময়েই মৃধা মিয়া এক ফুঁয়ে হয়তো নিভিয়ে নিয়েছে ঘরের কুপিটাকে।

তার মানে, এইবার অবশ্য অবশ্যই নিজের নিজের চাটাইয়ে নিজের নিজের রকমে ক্যাঁৎ হয়ে যেতে হবে! কোনোমতেই আর বসে থেকে থেকে রাতের দিকে চেয়ে থাকা যাবে না!

তো, মৃধা মিয়ার বিধিমাফিক চলাচলতি করতে আমার কোনো অসুবিধা নেই তো! চালার নিচে দুই প্রান্তের মেঝেতে পাতা দুইখানা সরু চাটাই। তার একটাতে ক্যাঁৎ হয়ে নির্ঘুম চোখে অন্ধকারের গাঢ় হয়ে ওঠাটাকে বোধ করতে করতে আমি তখন হয়তো মনে করতে থেকেছি, অন্য সন্ধ্যাগুলোর কোনো কোনোটার কথা! যেমন, এইখানের পৌষ মাসে পাওয়া একটা সন্ধ্যাকে আমার ভারী ভালো লেগেছিল!

সেইদিন, দূরের দূরের টিলাগুলোর ঝোপে ও মাটিতে তখন অন্ধকার, গাছের ওপরে ওপরে ছাইবরনের আকাশ- ওই দূরে ওই যে কাছেই! আর এইখানেÑ এই পাহাড়চূড়ায়Ñ কচি বরইয়ের ভারে প্রায় নুয়ে আসা ঝাঁকালো বরই গাছের গোড়ায় জ্বলছে সন্ধ্যাবাতি। কবরখানার জন্য জ্বালানো মাটির পিদিমখানা! সে সন্ধ্যায় সেই প্রদীপটা যেন পণ করেছিল, সে কিছুতেই নিভবে না! যেন তার পণ থাকে যে, মধ্যরাত পাড়ি দিয়ে সে, অবশ্য অবশ্যই ছুঁয়ে ফেলবে শেষ রাতটাকে, তারপর ভোরকে। এমন পণ নিয়ে সেই পিদিম জ্বলে যেতে থাকে, জ্বলে যেতে থাকে, ন্যাতা ন্যাতা বেড়ার ফাঁক দিয়ে আমি সেই নিষ্কম্প প্রদীপ শিখাটাকে দেখার চেষ্টা চালাতে চালাতে কখন যে ঘুমিয়ে যাই!

তো, এইবার এই ভাদ্রমাসে, লামায় যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাই আমার ছিল না! ঢাকায় বিস্তর দৌড়ঝাঁপ করার ছিল। তিনটা বই পড়ে ওঠার চাপ ছিল। ইনকাম ট্যাক্সের কাগজপত্র নিয়ে ল-ইয়ারের সাথে বসতে যাবার তাড়াটা ছিল। আড়ংয়ে হঠাৎ সেল শুরু হয়ে যাবার কারণে আটাশটা পর্দা কেনার জন্য দৌড়ুনোর ব্যাপারটা ছিল। তার বাইরে আরও জরুরি মহা গুরুত্বপূর্ণ কাজটা তো ঘাড়ের ওপর চেপে বসে ছিলই! পারিবারিক সঞ্চয়পত্রগুলো ম্যাচিওর হয়ে পড়েছিল। তাদের নতুন করে সিজিলমিছিল করার চাপ তো কম না!

এসবের মধ্যে সময় কোথায় লামাকে মনে করার! একটুও ফুরসত ছিল না। লামার জন্য একটু কোনো টান,একটু কোনো ছলক দিয়ে ওঠাÑ এমন কিছু আমার ভেতর-বাহিরের কোনোখানে ছিল না! এমনকি রোজকার দিনযাপনকেও তেমন একটা তিক্তকর, অসহ মনে হচ্ছিল না! তাহলে কেন আমার তখন লামার কথা মনে পড়বে? কিছুতেই কোনোভাবেই মনে পড়ার কোনো কারণ তো ছিল না!

তো, সেদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়াতে আমি বেশ একটু তাজ্জব হয়ে যাই। রোজ রাতে চ্যাট-ফ্যাট করেটরে ঘুমাতে ঘুমাতে আমার দুটা আড়াইটা নিত্যই বাজে। এবং আমাকে বিস্তর ঘুমাতে হয় বলে, বেলা সাড়ে নয়টা বা দশটার আগে আমি কখনওই চোখ খুলতে পারি না! কোনোদিনই পারি না!

সেদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় কীভাবে জাগনা পেয়ে যাই? আমি বুঝতে পারি না। ঘুম-লাগা চোখ মেলতে গিয়ে দেখি যেনো আমি দেখতে পাচ্ছি প্রত্যুষবেলার কবরখানাটিকে। না না! যেন কবরখানাটাকে নয়, যেন দেখতে পাচ্ছি আমলকীর ফিকে সবুজ ডাল আর পাতাদের! যেন আমি আমার বিছানায় আর নেই! যেন আমি ডালে ডালে কচি আমলকীর সাথে ভাসছি-বাতাসে বাতাসে!

তারপর কখন কীভাবে যে আমি বুড়িচং হাইওয়েতে পৌঁছে যাই, আমি বুঝতে পারি না! তখন ভর বিকেল, অথচ মেঘে মেঘে আকাশ অন্ধকার। আর, বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে বাঁশবন থমথমে কালো। কতবার সেই কালোর ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে কতবার যে পথ ভুল করা হলো, কতবার যে হাইওয়ের ধারে আবার ফিরে আসা হলো, আমি হিসেব রাখতে পারিনি।

সন্ধ্যার মুখে পাহাড়চূড়ায় পৌঁছে, সেই তো দেখি মৃধা মিয়ার চালায় তখনও সন্ধ্যাবাতি জ্বলে ওঠেনি! কবরখানায় ঢোকার মুখের বরই গাছতলায় কেবলই জোনাক জ্বলে যাচ্ছে। কোনো পিদিম কোনোখানে নেই!

হলো কী আজকে! মৃধা মিয়া? আমি ডাক দিই।

উত্তরে কেমন একটু হাহাকারের আওয়াজ যেন ধুঁকতে ধুঁকতে হেঁটে আসতে থাকে আমার দিকে। মৃধা মিয়া চালার মেঝেতে পড়ে আছে। এই যেন হুঁশ আসে তার, এই যেন হুঁশহারা হয়ে যায় সে! আহা! এটা কী বিপত্তি! কতদিন ধরে এমন! ইইস!

‘আমি এত যে ডাক পাড়তাছি আপনেরে! একটা জবও তো দেন নাই!’ মৃধা মিয়ার গলায় যেন কান্না যেন আফসোস যেন কঠিন একটা ভয়- থরথর করে উঠতে থাকে! ‘এত দেরি করলেন আইতে! কিছুই তো বুঝাইয়া দিয়া যাইতে পারলাম না! কিচ্ছু পারলাম না!’

আমাকে আবার তার কী বোঝাবার আছে! আমাকে আবার কখন সে ডাকল? এইখানে জ্বর গায়ে শুয়ে থেকে থেকে আমাকে ডেকেছে, আর ঢাকায় বসে আমি সেই ডাক শুনতে পাব! মৃধা মিয়া এমন প্রলাপ বকছে! আহা! কতদিন ধরে এমন জ্বর তার! একা একলা জ্বরে পড়ে থেকে থেকে, ক্ষুধার কষ্টটা পেয়ে পেয়েই তার এমন কাহিল দশাটা হয়ে আছে! আচ্ছা! আর ভাবনা নেই!

আমি যথেষ্ট পরিমাণে প্যারাপাইরল সাথে নিয়ে এসেছি। আমার সাথে ইন্সট্যান্ট স্যুপের প্যাকেট আছে অনেক অনেকগুলা। গরম স্যুপ আর প্যারাপাইরলÑ এই জ্বরকে আর একদিনের বেশি আর টিকতে দেবে নাকি?

আমি মধ্যরাত পর্যন্ত মৃধা মিয়ার মাথায় জলপট্টি দিই। জোর করে করে তার মুখে স্যুপ তুলে দেই। আর আশা করতে থাকি, অল্প কিছুক্ষণের ভেতরইÑ এই তোÑ তার জ্বর নেমে যাবে। জ্বর নেমে যাবে। তারপর চোখ খুলে তাকায়ে সে আমাকে এইবার অন্তত বলবে, ‘কুনসুম আইলেন?’

‘আমারে এট্টু কব্বরখানার উত্তর মুড়ায় লইয়া যান গো অক্ষন।’ দুপুরে হঠাৎ চোখ খোলে মৃধা মিয়া; ‘অক্ষন লইয়া চলেন গো আম্মা!’

কী আছে সেইখানে? সেইখানে নতুন একটা কবর খোঁড়া আছে। নিজের মাটি-মঞ্জিলের সকল আয়োজন-আঞ্জাম সেরে রাখতে কোনো আলসেমি করে নাই মৃধা মিয়া!

তিন

তো, আমার তেরা-ল্যাংড়া বিবেকের ধাক্কার চোটেÑ আমি এই মউতাবাড়িতে রয়ে যাই। প্রথম সন্ধ্যায় ঘরের ভেতরে সন্ধ্যাবাতি দেওয়ার আগেইÑ কবরখানার ঢোকার পথেরÑ পিদিমটা জ্বেলে দিই। তারপর কোনোমতে মেঝেতে হোগলার পাটিটা পেতেÑ নিজেকে তাতে ছুটকে ফেলি। এক ঘুমে কেমনে যে রাত কাবার হয়ে যায়, বুঝতে পারি না!

সকালে চোখ খুলতেই মনে পড়ে, আরও তিন তিনটা দিন আমাকে এইখানে এমনে এমনে পাহারা দিয়ে যেতে হবে। আরও তিন দিন! উফ!

এই কথা মনে আসার সাথে সাথেই আমি দেখি, ভোর-সকালের অই ঘোলাটে সাদার মধ্যে আমি দেখি কী, চাটাইয়ের ওপরে পড়ে থাকা আমার শরীরটা আর চাটাইয়ের ওপরে নেই। ওটি আর কোথাওই নেই। তার বদলে আমি যেন অন্য কোন এক জায়গায় শুয়ে আছি!

কোথায়? কোথায় আমাকে আমি বিছিয়ে রেখেছি?

আরে! এই যে এই পাহাড়চূড়ায় ওঠার মুখের শেষ চড়াইটা দেখা যায়! সেটা আর এখন শুধু খানিকটা মাটি মাত্র নয়! ওটা আমি! মাটি হয়ে আছি আমি! চড়াইয়ের সবটা আসলে আমার শরীরটাই! বৃষ্টি আর রোদ চুবানো এঁটেল মাটির চড়াই! আমার সমস্তটা শরীর ভরে ঝোপ! ঘন ফোঁপানো সবুজ পাতাবোঝাই ঝোপ, তোকমার ঝোপ!  ঝোপে ঝোপে কত জোনাক জ্বলছে নিভছে, কতো টুনটুনি উড়ছে বসছে! কত ডাক বেজে বেজে যাচ্ছেঃ টুই টুই টিট ট্টি, টুই টুই টিট ট্টি! বাতাসে বাতাসে তোকমা ঝাড়ের ঘন গন্ধ ফুটে উঠছেÑ একদম ফুলের মতনই ফুটে উঠছে!

আরে, এই নাকি আমি! আমি কেনো অমনটা হবো! দূর দূর! আমি কী স্বপ্ন দেখছি? এটা দুঃস্বপ্ন? আমি চেঁচিয়ে উঠতে চাই! কিন্তু আমার কণ্ঠে কোনো ধ্বনি বেজে ওঠে না! বরং তোকমা ঝোপের গন্ধটাই আরও তেজালো হয়ে উঠতে থাকে! আতঙ্কে পলকে যেন আমি অজ্ঞান হয়ে যাই! এবং ওই অজ্ঞান হওয়াতেই যেন শেষ রক্ষাটা হয় আমার! আমি আবার আমাকে হোগলার পাটির ওপর ক্যাঁৎ হয়ে পড়ে থাকতে দেখি! আরে! এই তো আমি!

তবে, অই ঘটনাটাকে দুঃস্বপ্ন বলেই উড়িয়ে দিতে ইচ্ছা হতে থাকে আমার! তাই দিতাম, কিন্তু সেই ভোরের বেলায় কবরখানার রোদের নিচে দাঁড়ায়ে আমি দেখতে পাই যে, আমার শরীরের বাদামি ত্বকটাকে ভারী অদ্ভুত দেখাচ্ছে! এই যেন দেখাচ্ছে সবজেটে, আবার এই যেন তাকে মনে হচ্ছে বাদামি! আজব তো! আমি ধন্দে পড়ে যাই! এটা কী আমার চোখের ভুল? নাকি মনের সমস্যা?

আমি বিষয়টা নিষ্পত্তি করার জন্য ডান হাতের আঙুল দিয়ে বাম হাতটাকে একটু ঘষটে নিতে যাই, আমার চোখেরা দেখে, অইখানে অস্থিমজ্জামাংস কিচ্ছু নাই! সেখানে লেটকে-পেটকে যাচ্ছে বাদামি এঁটেল মাটি। সেই মাটি একই সঙ্গে ভেজা থকপকে আবার শুকনো কটকটা! আরে!

এবার তো দেখি আমার ভয় লাগছে না! এবার তো দেখি আমার উল্লাস লাগছে! শিথিল অফুরান উল্লাস!

সেই না-ফুরন্ত উল্লাস নিয়ে আমি মৃধা মিয়ার মৃত্যুর দ্বিতীয় দিনটাকে সহজেই পার করে দিই! আর তো মাত্র দুটা দিন! আমার ফিরে যাওয়ার আর তো বেশি দেরি নাই।

এই যে আজকে সেই তৃতীয় দিনের বেলা দ্বিপ্রহর! আজকে আকাশে কী যে মেঘ! সে মেঘের কী যে গর্জন! গুরু গর্জন! আমার আজকে থেকে থেকে কেবল কেমন ঘোর ঘোর লাগছে! একবার কেবল চ্ছল্লাত-চ্ছল চ্ছল্লাত-চ্ছল লাগছে! এই একবার মনে হচ্ছে, আমি আস্ত একটা মানুষ! এই আমার চুল! মেঘের সমান দীঘল! এই আমার চোখ! তারাদের মতন অন্ধকারে মোড়ানো!

তারপরেই আবার দেখতে পাচ্ছি, কোথায় আমি এক আস্ত মানুষ? এই আমি একটা ঝিরি। একটা ঝিরি। নিরালা বিজন একটা ঝিরি। বয়ে আসছি কোন ভেতরের এক পর্বতগুহা থেকে। ঝিরঝির তিরতির বহতা জলের এক মুঠো ঝিরি। কোথাও আমার এখন গোড়ালি-ভেজানো পানি। কোথাও হাঁটুজল। ঘোলাজল ছলাত-ছল ছলাত-ছল! চলিষ্ণু চলিষ্ণু, শীতল! দুই কিনারে জল ঘেঁষে ঘেঁষে  জন্মে আছে কলমির দাম, কচুর ঝোপড়া, কণ্টিকারীর ঝোপ। আর বাঁশ ঝাড়। আমার কিনারে কিনারে কত কত বাঁশবন!

সেইসব পেছনে ফেলে ফেলে- ঘোলাজল আমি- ছুটে যাচ্ছি আরো সামনে, আরেকটু সামনে।ওই সেখানে এক কিনারে একটুখানি তক্তা ফেলা এক ঘাট। সেই ঘাটে নিত্যকার বাসনকোসন মাজতে আসে আদিবাসীদের কন্যারা! মাটির পাতিলে করে রাঙা চাল নিয়ে আসে তারা, ধুয়ে নেবে বলে। এই আমি ঝিরিÑ তাদের সবাকার জন্যÑ আমি বয়ে যাচ্ছি বয়ে যাচ্ছি।

তার মধ্যেই হঠাৎ দেখি কী, আমি ঝিরি ছিলাম বটে, তবে পলকে যেনো আমি অন্য কিছু হয়ে গেলাম! আমি হয়ে গেছি সেই ঝিরির ওপর দিয়ে হেঁটে চলা একটা দঙ্গল! বহু লোকের হুল্লোড় যেন আমি। তাদের আমোদের স্বরÑ আমিই। অই যে আমিই যেন-কয়েকটা শরীর নিয়ে-অই যে একটু কিনার খুঁজে নিচ্ছি। তারপর সোল্লাসে আমার ঝিরি শরীরেই আমি নামিয়ে দিচ্ছি মূত্র! নামিয়ে দিচ্ছি আমার বিকট উল্লাস! জলে জলে ছড়িয়ে দিচ্ছি মূত্র!

আমার জলদেহে  আমারই মনুষ্য কাঠামো থেকে নেমে আসা মূত্রের ধারা ঝাঁপিয়ে পড়ছে-ছর ছর ছর ছর! দেখে দেখে আমার উল্লাস হচ্ছে! অনেক উল্লাস হচ্ছে। কিন্তু অই যে বালিকাগণ, যারা গৃহস্থালির বাসনকোসন ধুয়ে নেবে বলে এসে বসে আছে ঘাটের কিনারে, তারা স্তব্ধ চোখে চেয়ে চেয়ে দেখে নিচ্ছে আমার ওই পাপ! তাদের চোখের কিনারে কিনারে জল, এক রত্তি জল! সেই জল দিয়ে তো লালচাল ধুয়ে ওঠা যাবে না! আহ! ঝিরি! তোমার অশুদ্ধ জলে আসুক আসুক নব স্রোতের ঝাপট। পাপ মুক্ত করুক তোমাকে!

সেই পাপের ঝটকাটা আমাকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে। থ্যাতলা-ভ্যাতলা করে নিতে থাকে। পর্বতকন্যাদের মৌন ক্রন্দন আমাকে চাবকাতে থাকে! চাবকাতে থাকে। আমি আমার মনুষ্য শরীর ফিরে পাবার জন্য তছনছ হয়ে যেতে থাকি!

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares