বেগম সাহেবা : বিশ্বজিৎ চৌধুরী

বেগম সাহেবার সামনে এনে দাঁড় করানো হলো আমাকে। শাহি খাসমহল নয়, শহরেই একটি আলিশান বাড়ি। এই বহুতল জমানায়, চট্টগ্রাম শহরে কয়েক বিঘা জমির ওপর এ রকম দোতলা বাড়ি আজকাল দুর্লভ। গেটের সামনে দারোয়ানের কাছে নিজের নাম পরিচয় জানানোর পর, দারোয়ান উল্লিখিত ব্যক্তিকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া যায় কি না ইন্টারকমের মাধ্যমে জেনে নিয়েছে তার ঊর্ধ্বতনের কাছে। অতঃপর বিরাট ফটকের ছোট একটি প্রবেশ পথ খুলে দিয়েছে, যে পথ দিয়ে মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়।

ঢুকেই একটি কুকুরের মুখে পড়েছিলাম। ভয়ংকর নয়, প্রচুর লোমওয়ালা খেলনা পুতুলের মতো। তবু আমার দিকে ছুটে আসায় ভড়কে গিয়েছিলাম। কিন্তু সভ্য সারমেয় আমার গন্ধ শুঁকে, জিহ্বা দিয়ে হাতটা একটু চেটে সরে পড়েছিল।

কালো প্যান্ট সাদা শার্ট, হাতে ওয়াকিটকি, বেশ সপ্রতিভ এক যুবক হাঁক দিয়ে বললেন, ‘শাহজাহান, এই স্যাররে ভিতরে নিয়া বসতে দে। বেগম সাহেবারে গিয়া কইবি স্যার আসছে।’

শাহজাহান আমাকে বলল, ‘আসেন স্যার।’

শাহজাহানের জন্য একটু দুঃখ হলো। এক কালে শাহজাহান রাজদরবার আলোকিত করে বসতেন। চারপাশে মন্ত্রীরাজন্যদের ভিড়। অন্দর মহলে বেগম সাহেবানরা তো আছেনই, এ ছাড়াও দাসী-বাঁদির চলাবলায় মুখরিত, ঠারে-ঠমকে চমকিত চতুর্দিক। আর আজকের শাহজাহান এখানকার বেগম সাহেবার সামান্য একজন পরিচারক!

দুঃখ করেইবা কী হবে, আমার নিজের অবস্থা এর চেয়ে কী এমন ভালো। আমি শাহজাহানকে অনুসরণ করে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলাম। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল ড্রয়িংরুম। আগাগোড়া কার্পেটে মোড়া মেঝে, মাথার ওপর এই দিনের বেলায়ও ঝাড়বাতির রোশনাই। সারা ঘর ও দেওয়ালজুড়ে দেশি-বিদেশি মূল্যবান বস্তুসামগ্রীর প্রদর্শনী, বিত্তের সঙ্গে রুচির যোগাযোগ খুবই ক্ষীণ। হোক, সেই সম্পর্ক যত ক্ষীণই হোক, বাড়ির মালিকদের চিত্ত যে প্রসারিত এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। বেশ বড়-সড় একটি ট্রলিতে চড়ে নানা পদের সুখাদ্য এলো। পরিচারক বিনীত স্বরে জানতে চাইল, ‘চা না কফি?’

আমার পছন্দের কথা জেনে নিয়ে ফিরে গেল কিচেনে। আমার প্রচণ্ড ক্ষিধে পেয়েছিল, কিন্তু আপ্যায়নের বহর যেখানে যত বেশি, সেখানে রসনা ততটাই সংযত রাখা দস্তুর। আমি সেই নিয়ম মেনে অল্প একটু খেয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম।

অতঃপর ডাক এলো। বোরকা পরা এক মহিলা এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন পাশের ঘরে। ড্রয়িংরুমের তুলনায় ছোট একটি কামরা। একটি খাট, টেবিল-চেয়ার ইত্যাদি সুন্দর করে গোছানো। কিন্তু এসব ছাড়িয়ে আমার প্রথমেই নজর গেল বেগম সাহেবার দিকে। রীতিমতো ঘোর লেগে যায়। পান পাতা ছাঁচের মুখ, টিকালো নাক, কাজলে আঁকা বড় দুটি চোখ আর দুকাঁধ বেয়ে নেমে আসা ঘনচুলের দীর্ঘ দুটি বেণী, সাবেকি আমলের তৈলচিত্র থেকে উঠে আসা নারী বলে ভ্রম হয়। চেহারা শরীরের সর্বত্র উপচে পড়া যৌবন। কত বয়স, আঠারো থেকে বিশের মধ্যে। এই বয়সের কারণেই বোধকরি মর্যাদা অনুযায়ী গাম্ভীর্য আয়ত্ত করতে পারেনি। দামি টিস্যু কাপড়ের কুচি দেওয়া গাউনের ওপর মসলিনের ওড়না জড়িয়ে, সারা গায়ে মূল্যবান অলঙ্কারাদি পরেও চেহারা থেকে কিশোরীসুলভ সারল্য আর দৃষ্টি থেকে কৌতূহলের চঞ্চলতা আড়াল করতে পারেনি বেচারি।

এই মেয়েকে কীভাবে অভিবাদন জানানো দরকার বা আমারই সেটা আগে এটা করতে হবে কিনা বুঝে উঠতে না পেরে আমি একটা হাত কপালের দিকে তোলার ভঙ্গি করলাম।

বেগম সাহেবা বললেন, ‘আসসালামুআলাইকুম স্যার।’

‘ওয়ালেকুম সালাম।’

‘একন থেকে আপনি আমাকে ফড়াবেন যে?’

বেগম সাহেবার মুখনিঃসৃত বচন শুনে আমার যাবতীয় সম্ভ্রম ও মুগ্ধতা কাচের পাত্রের মতো হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেল মুহূর্তে। বুঝলাম, বাঁশি যত সুদৃশ্যই হোক শিল্পীর হাতে পড়লে সেটা বাঁশি, তাতে সুর ওঠে, অদক্ষের হাতে পড়লে সেটা নেহাৎ এক টুকরো বাঁশের লাঠিই।

এই চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার আগে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় ‘টেকনাফ ট্রেডার্স’ নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে আমাকে দুইবার মৌখিক পরীক্ষা দিতে হয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, আমার মনে হয়েছে প্রার্থীর আচার-আচরণ ও চরিত্র সম্পর্কে ধারণা লাভের চেষ্টা করেছেন পরীক্ষকরা। আমিও টেকনাফ ট্রেডার্সের কয়েকজন কর্মকর্তার সামনে একবার এবং খোদ এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রৌঢ় স্বত্বাধিকারীর সামনে একবার পরীক্ষা দিতে রাজি হয়েছিলাম বড় ঠেকায় পড়ে।

পৃথিবীজুড়ে করোনা মহামারির পর অন্যান্য দেশের মতো এদেশেও বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বড় লোকসানের মুখে পড়েছে। তবে যতটা না ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠান, তার চেয়ে বেশি পথে নামিয়ে দিয়েছে তার কর্মীদের। এ রকম ইপিজেডের একটি শতভাগ রপ্তানিমুখি প্রতিষ্ঠানের ছাঁটাইকৃত কর্মীর তালিকায় আমার নামটিও ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সনদটি দেখিয়েও যখন আরেকটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছিল না, তখন স্থানীয় দৈনিকে গৃহশিক্ষক চেয়ে একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়েছিল। এতে শিক্ষার্থী কোন শ্রেণির তা উল্লেখ ছিল না। এমনকি ছাত্র বা ছাত্রী বিজ্ঞান, বাণিজ্য, না কলা বিভাগের এ বিষয়েও কিছু লেখা ছিল না। কিন্তু টানা ছয় মাস বেকার জীবন অতিবাহিত হওয়ার পর এ নিয়ে গবেষণার সুযোগ কোথায় আমার? যে কোনো শ্রেণির, যে কোনো বিভাগের শিক্ষার্থীকে পাঠদানে নিজের যোগ্যতা প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম আমি। রীতিমতো লাইন পড়ে গিয়েছিল। এক টুকরো মাংসের জন্য এক ঝাঁক হাভাতে কুকুরের ভিড়ের মতো বিশ্রী সেই দৃশ্য। এর কারণ, কোন শ্রেণির কোন বিভাগের বা কোন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে হবে তা লেখা না থাকলেও বিজ্ঞাপনে সম্মানীর অঙ্কটার উল্লেখ ছিল, বিশ হাজার টাকা।

সত্যি বলতে কী, আমি তখনও জানি না আমার এই ছাত্রী, মানে বেগম সাহেবার লেখাপড়া সংক্রান্ত পূর্ব অভিজ্ঞতা কী, ঠিক কোন জায়গা থেকে শুরু করতে হবে। ইতিমধ্যে আমি শুধু শুনেছি তিনি ছালেহ আহমদ কোম্পানির দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের নামের শেষে সওদাগর পদবি যুক্ত হতে শুনেছি, কিন্তু ছালেহ আহমদের নামের শেষে কেন কোম্পানি, সেটা জানি না। জানার প্রয়োজনই বা কী? আর যেটুকু না জানলে নয়, তা হচ্ছে ঢাকায় বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসা এবং দুটি পুত্র সন্তানসহ স্ত্রী ও সংসার আছে টেকনাফের এই আদি বাসিন্দার। লবণ, চিংড়িঘের, ফিশিংবোট ইত্যাদি ব্যবসার দেখভালের কাজে তাঁকে ঢাকা-চট্টগ্রাম, কক্সবাজার-টেকনাফ এসব এলাকায় নিয়মিত ছোটাছুটি করতে হয়। এখানকার এই রাজকীয় বাড়িটি তিনি কয়েক বছর আগে কিনে নিয়েছেন হৃতগৌরব এক বনেদী পরিবারের দুই শরিকের কাছ থেকে।

এত বড় বাড়ি, পিয়ন-দারোয়ান-মালি-বাবুর্চিসহ নানা কাজের অন্তত পনের-কুড়িজন লোকে গমগম করছে দিনরাত! বাড়ির মালিক ছালেহ আহমদ কোম্পানি মাঝে মাঝে এসে  দু-একটি দিন কাটিয়ে যান। তো, এতসব প্রাচুর্যের ভিড়ে একটি নারীর প্রয়োজন পড়বে না তা কি হয়? কোম্পানি সমঝদার আদমি। বয়স যতই সত্তর স্পর্শ করুক, পানিতে তো পড়ে যাননি। বাজারমূল্যও যে যথেষ্ট আছে সে কথা প্রমাণ করে হাঁটুর বয়েসী অপূর্ব সুন্দরী তরুণীকে বিয়ে করে এনে এই আলিশান বাড়ির অপূর্ণতা দূর করেছেন।

টেকনাফে নিয়মিত যাতায়াত, আকিয়াবের সঙ্গেও ব্যবসাবাণিজ্য আছে কিছু। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তাড়া খেয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে রোহিঙ্গা মুসলমান যখন এপারে হুমড়ি খেয়ে পড়ল, পাহাড়টিলা জঙ্গল ধানক্ষেত যে যেখানে সম্ভব মাথার ওপর একটা ছাউনি তুলে দিন কাটাতে শুরু করল, তখন শরণার্থী পরিবারের এই মেয়েটিকে বিয়ে করে এই বাড়িতে এনে তুলেছিলেন ছালেহ কোম্পানি। এ নিয়ে ঢাকায় তাঁর সংসারে অশান্তি কম কিছু হয়নি, কিন্তু এসব সামাল দেওয়ার সামর্থ্য প্রৌঢ় কোম্পানির ছিল। শুধু সেই মুরোদ কেন, তরুণী ভার্যাকে যথার্থ মর্যাদা দেওয়ার মতো সংবেদনও কী অস্বীকার করা যাবে? তাকে বেগম সাহেবা বানিয়ে দিল কে?

রিলিফের চাল-ডালের জন্য লাইনে দাঁড়াত ছখিনা খাতুন। মলিন চেহারা, ততোধিক অপরিচ্ছন্ন পোশাকের আড়ালেও এই ছখিনার আসল রূপকথাটি পড়ে ফেলতে পেরেছিল ছালেহ আহমদ কোম্পানির এক কর্মচারী। ঘষা দিলেই যে চকচক করে উঠবে রত্নটি, বিলক্ষণ বুঝেছিল তার জহুরি চোখ। কোম্পানির খায়েশ বা মজুরির কথাটাও তো জানত কর্মচারীটি। তাই সরাসরি মেয়ের বাবার কাছে গিয়ে তার সৌভাগ্যের সম্ভাবনাটি জানিয়েছিল। লোকটিকে সরাসরি ছালেহ আহমদের সামনে এনে হাজির করেছিল কর্মচারী। বয়সে কোম্পানির চেয়ে কম ছখিনার বাবা নিজেই তাঁর হাতে কন্যাকে তুলে দেওয়ার অভিপ্রায় জানিয়েছিল। এসব কথা অবশ্য প্রথম দিনেই জানা হয়নি আমার। এক একদিনে আলাদা করে শোনা তথ্যগুলো জোড়া লাগিয়ে এই ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছিল।

প্রথম দিন সেই কালো প্যান্ট সাদা শার্ট পরিহিত ওয়াকিটকি হাতের দায়িত্ববান কর্মচারীটি ঘরে প্রবেশ করেছিল কিছুক্ষণ পর। তার হাতে ষষ্ঠ শ্রেণির কিছু বই, আর নিয়মিত চাকরির ইন্টারভিউ দিতে অভ্যস্ত আশাবাদী মানুষদের প্রিয় গ্রন্থ ‘স্পোকেন ইংলিশ’। লোকটি কেন জানি না শুরুতেই আমাকে জানিয়ে রাখল, এই ঘরটি সম্পূর্ণ রূপে ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বেগম সাহেবাকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পাঠদান শুরু করা যেতে পারে, কিন্তু সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, তার চেয়ে বড় কথা তাকে শেখাতে হবে সহবৎ। কিছু ইংরেজি শব্দ বা বাক্য তাঁর মুখে তুলে দিতে পারলে খুবই ভালো হয়।

আমার জন্য ভালোই হলো। নির্দিষ্ট সিলেবাস নেই, স্কুলের নিয়মিত পরীক্ষায় পাস করানোর দায় নেই। আমি সপ্তাহে তিন দিন ঘণ্টা দুয়েক এক সরলা সুন্দরীর সঙ্গে সময় কাটিয়ে আনন্দই পেতাম। তার মুখে ইয়েস, নো, ভেরিগুডের পাশাপাশি গুড মর্নিং, গুড নাইট, হাউ আর ইউ, আই অ্যাম ফাইন, থ্যাংকু… ইত্যাদি কিছু মহার্ঘ বচন তুলে দিতে পেরেছিলাম। বেগম সাহেবা শুরুর দিকে হেসে গড়িয়ে পড়লেও ধীরে ধীরে আমার সঙ্গে দুচার লাইন ইংরেজি বলতে শুরু করেছিল।

বাড়ি জুড়ে এই মেয়েটির বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা দেখে বিস্মিত হলেও পরে আবিষ্কার করেছিলাম প্রৌঢ় ছালেহ আহমদ তরুণী স্ত্রীটিকে এতই ভালোবাসতেন এবং প্রকাশ্যে তা নির্দ্বিধায় উল্লেখ করতেন যে, কর্মচারীদের পক্ষে ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় এই বেগম সাহেবাকে তোয়াজ না করে উপায় ছিল না। আর কোম্পানির বিশেষ আগ্রহ বা নির্দেশে কিনা কে জানে সারাদিন মেয়েটি প্রসাধনচর্চিত, সালঙ্কারা ও মূল্যবান পোশাকসজ্জিতা হয়ে মোগল অন্তঃপুরবাসিনীর মতো চলাফেরা করে। এই কারণেও বোধকরি বেগম সাহেবার ওজনদার অভিধাটি ধীরে ধীরে সুপ্রযুক্ত হয়ে উঠেছে তার জন্য।

‘টেকনাফ ট্রেডার্সে’ ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে সেই যে একবার দেখা হয়েছিল, তারপর এই বাড়িতে ছালেহ কোম্পানির সঙ্গে আমার সাকুল্যে সাক্ষাৎ হয়েছে দু-তিনবার। পক্ব কেশ ও শ্মশ্রু মেহেদি রাঙানো, চোখে সুরমা, সর্বদা প্রসন্ন চেহারা। অর্থবিত্ত, না নারীসঙ্গ কী সুখ এই প্রৌঢ়ের চেহারায় এমন উপচে পড়া জেল্লা দিয়েছে কে জানে, কিন্তু কোম্পানির স্নেহসিক্ত সম্বোধন ও আচরণে আমি বরাবর মুগ্ধ হয়েছি।

অফুরন্ত অবসর ছিল বলেই হয়তো নির্ধারিত তিন দিনের পরিবর্তে আমি কখনও চতুর্থ দিনেও উপস্থিত হতাম। আমার এই অতি উৎসাহ বোধহয় কালো প্যান্ট সাদা শার্ট পরিহিত বিশেষ কর্মচারীটির পছন্দ হতো না, তার ভ্রুকুঞ্চন দেখে তা অনুমান করা সহজ। তবে ওইটুকু বিরক্তি আমলে না নিলেও চলে, কারণ আমার এই বাড়তি মনোযোগ বেগম সাহেবাকে আনন্দিত করত বলেই মনে হয়েছে।

শুরুর দিকে ‘আপনি’ সম্বোধন করতাম, কিন্তু ছখিনা বেগম যেদিন, ‘আপনি আমার টিচার না? তাহলে কেন আমাকে আফনি বলতেছেন যে?’ বলে অনুযোগ করেছিল, সেদিন থেকে তুমিতে নেমেছিলাম। এতে সুবিধা হয়েছিল, পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের আলাপ-আলোচনা অনেক দূর চলে যেত। মিয়ানমারের সেনারা কীভাবে হঠাৎ একদিন তাদের পাড়ায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল! চারদিকে বাড়িঘরে আগুনের শিখা যখন আকাশ ছুঁয়েছিল, তখন বিভ্রান্ত মানুষ কেমন পশুপাখির মতো ছুটোছুটি করছিল; কে গিয়ে পড়েছে মিলিটারির বন্দুকের সামনে, আর কে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে সীমানার দেখা পেয়েছে, এসব গল্প বলতে বলতে সালঙ্কারা বেগম সাহেবার চোখের সামনে ভীত-আতঙ্কিত ছখিনার চেহারা ভেসে উঠত বোধহয়, তার দৃষ্টিতে সেই বিহ্বলতা দেখতে পেতাম।

একদিন ছখিনা হঠাৎ জানতে চেয়েছিল, ‘রেপ মানে কী স্যার?’

আমি চমকে উঠেছি, আধ মিনিটেরও বেশি সময় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। তারপর জিজ্ঞেস করেছি, ‘কেন, এই শব্দের অর্থ জানত চাও কেন?’

নাফ নদী পেরিয়ে, তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশির মধ্যে একটি ছোট ইঞ্জিন নৌকায় চড়ে বিশ-পঁচিশজন মানুষের সঙ্গে জীবনমৃত্যুর দোলায় দুলে এপারে এসে পৌঁছেছিল ছখিনার পরিবার। এনজিওর ক্যাম্পে নেওয়ার পরপরই জ্ঞান হারানোর আগে কানে এসেছিল এক মহিলা ডাক্তার তাকে দেখে বলছে, ‘এইটা রেপ কেস, এই মেয়েকে রেপ করছে।’

এসব শুনে মাথা নিচু করে ছিলাম। যেন মানব সম্প্রদায়ের এই লাঞ্চনার দায় এড়াতে পারি না আমিও। বাড়িটা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে, আর দুইটা আর্মি রেপ করে পোড়া ভিটায় ফেলে রেখে গিয়েছিল তাকে।

আমি এই দুর্বহ প্রসঙ্গ থেকে সরতে চাই। ছখিনার শৈশব, তার গ্রাম, মা-বাবা, ভাই-বোনের কথা পেড়ে গল্পটার মোড় অন্যদিকে ঘোরাতে চাই। কিন্তু ছখিনা আমাকে জানায়, ক্যাম্পে ডাক্তার তাকে ইনজেকশন দিয়েছে, তার আর কোনোদিন বাচ্চা হবে না! আমি কেঁপে উঠি, এটা যে তার ভুল ধারণা তা নিশ্চিত করে বলতে চাই। আমি তাকে তার সৌভাগ্যের কথা বলি, বর্তমান রাজকীয় জীবনের কথা বলি। আর কোনো দিন তাকে সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলোতে ফিরে যেতে হবে না এই আশা ও আশ্বাসের কথা শোনাই। কিন্তু ছখিনা আমাকে জানায়, এখানে এই বেগম সাহেবার জীবনটাতেও অনেক গোপন অসম্মান আছে। এখানে তাকে রেপ করেছে বড় মিয়া আর ছোট মিয়া।

বড় মিয়া আর ছোট মিয়া ছালেহ্ আহমদ কোম্পানির দুই ছেলে। তারা পিতার অবর্তমানে মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে আসে, এই বাড়িতেই থাকে।

‘তুমি এসব কথা কোম্পানিকে জানাও নাই?’

না, ছখিনা এসব কথা কোম্পানিকে জানায়নি। তার ভয় এসব শুনলে কোম্পানি তাকে তালাক দেবে। তখন কোথায় যাবে সে?

আমি হাঁ করে বেগম সাহেবার দিকে তাকিয়ে থাকি। তখন রূপচর্চিত, সুবেশী সালঙ্কারা মেয়েটিকে আমার বিপণিবিতানের সামনে সাজিয়ে রাখা ম্যানিকিনের মতো মনে হয়, যাদের শরীর থেকে যখন খুশি তখন বস্ত্র-অলঙ্কার খুলে নিয়ে নতুন পোশাক, নতুন অলঙ্কার পরিয়ে দেয় দোকানিরা।

আমি যেন এই সুখ-দুঃখের কথা শোনার জন্যই এই বাড়িতে আসি। পড়াশোনা কদ্দুর এগোল তার খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। নিয়মিত হাজিরা দিয়েই দিব্যি চলে যাচ্ছে। সপ্তাহে তিন দিনের পরিবর্তে চার দিন এলে বেগম নিজে খুশি হলেও ওয়াকিটকি হাতে থাকা বাড়ির গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারীটি বিরক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ভারসাম্য রেখেই চাকরি রক্ষা করে চলেছি আমি। কেননা বছর ঘুরতেই ভালো অঙ্কের বেতন বেড়েছে। পৃথিবীতে এর চেয়ে নির্ঝঞ্ঝাট কোনো চাকরির খবর জানা নেই আমার।

কিন্তু পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা সুখ ভোগের কপাল বোধহয় নেই আমার। শুধু আমারইবা বলি কেন, বেগম সাহেবারও।

যে পত্রিকাটি আমি নিয়মিত পাঠ করি, যে পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি পড়ে আমি ‘টেকনাফ ট্রেডার্সে’ ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম, একদিন সেই পত্রিকাটির শেষের পৃষ্ঠায় একটি ছোট সংবাদে চোখ আটকে গেল আমার, ‘টেকনাফে বন্দুকযুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত।’ এ রকম গতানুগতিক সংবাদগুলোর প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে একই রকম গল্প পড়ে পড়ে অন্যান্য পাঠকের মতো আমিও বিরক্ত ও প্রতিক্রিয়াহীন। কিন্তু কেন জানি না, এই সংবাদটির প্রথম দু-তিন লাইন পড়ার পরেই ছালেহ আহমদ কোম্পানির নামটি দৃষ্টিগোচর হওয়ায় বলা যায় পুরো সংবাদটি পাঠ করতে বাধ্য হলাম এবং হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম বেশ কিছুটা সময়ের জন্য।

ধীরে ধীরে আমার মাথা কাজ করতে শুরু করলে ছালেহ আহমদ কোম্পানির বিশাল অর্থ সম্পদের উৎস ও রাজকীয় জীবন যাপনের সামর্থ্যরে কারণ অনুমান করতে পারলাম আমি। একবার কথায় কথায় ছখিনা আমাকে বলেছিল বটে কোম্পানি ট্যাবলেটের ব্যবসা করে, কিন্তু আমি ধরে নিয়েছিলাম ওষুধের ব্যবসা। নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য নিজেকে দোষারোপ করলাম আমি। কোম্পানি যেহেতু একজন মাদক কারবারি, সেদিক থেকে তার মৃত্যু স্বস্তিদায়ক সংবাদই। কিন্তু আমার নিয়মিত উপার্জন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল বলে হোক বা বেগম সাহেবার অকাল বৈধব্যের কারণে, আমি এই ইয়াবা ব্যবসায়ীর মৃত্যুতে কিছুটা শোকার্ত হয়ে পড়েছিলাম।

ওই বাড়িতে এখন আমার যাওয়া নিরাপদ কিনা, ছালেহ আহমদ টেকনাফে নিহত হলেও তার এখানকার বাড়িটিতে লোকজনের যাতায়াতের বিষয়ে পুলিশের কৌতূহল আছে কিনা ইত্যাদি নানা দোনমনার পর প্রায় পাঁচ দিন পর আমি গিয়ে হাজির হয়েছিলাম সেখানে। ঘটনাচক্রে সেদিনই কোম্পানির দুই ছেলে বাড়ির মালিকানা ভাগ–বাটোয়ারার জন্য আইনজীবীসমেত উপস্থিত হয়েছিলেন বাড়িতে। বাড়ির প্রাঙ্গণে বেশ কিছু চেয়ার রাখা হয়েছে। সেখানে বসেই আলোচনা চলছিল। আলোচনা না বলে বাদানুবাদ বলা ভালো। উকিল সাহেব মাঝে মাঝে দুই ভাইকে থামিয়ে দিয়ে তাঁর মতামত দিচ্ছেন। তিনি বোধহয় কোম্পানির পরিবারের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত আইন পরামর্শক, তাঁর মতামতের প্রতি দুই ভাইয়ের সমীহ দেখে এই ধারণা হয়। বেগম সাহেবা আলোচনাস্থলে ছিল না।

আমার উপস্থিতি কে কীভাবে নিল জানি না, কিছুটা উপেক্ষিত বোধ করেও আমি একটি চেয়ার টেনে নির্দিষ্ট দূরত্বে বসে পড়েছিলাম। আরও প্রায় ঘণ্টা দুয়েক আলাপ-আলোচনা কিংবা বাদানুবাদের পর দোতলা বাড়ি ও সংলগ্ন জায়গাটি বণ্টনের ব্যাপারে আইনজীবীর মতামত দুই ভাইয়ের মনঃপূত হলো।

এতক্ষণ বাড়ির অন্যান্য কর্মচারীদের মতো নীরব দর্শক হয়েছিলাম আমিও। কিন্তু হঠাৎ বিস্ময় নিবৃত্ত করতে না পেরে উকিল সাহেবের কাছে গিয়ে নিচু গলায় জানতে চাইলাম, ‘কোম্পানির সম্পত্তিতে বেগম সাহেবের অংশ কতটুকু?’

তিনি সরু চোখে আমার দিকে তাকালেন, তাঁর দৃষ্টিতে একটি জিজ্ঞাসা ছিল, সম্ভবত তিনি চেয়েছিলেন আমি আমার পরিচয়টা তাঁর সামনে তুলে ধরব। আমি সেদিকে ভ্রƒক্ষেপ না করে প্রশ্ন করলাম, ‘স্বামীর সম্পদে স্ত্রীর অংশীদারিত্ব থাকবে না?’

এবার তিনি কিছুটা করুণার সঙ্গে ততোধিক বিদ্রুপ মিশিয়ে হাসলেন, ‘স্ত্রী? কে ছালেহ আহমদের স্ত্রী?’

বেগম সাহেবা ঘরের ভেতর দরজার আড়ালেই বোধহয় দাঁড়িয়ে ছিল। বেরিয়ে এলো। এই প্রথম প্রায় বিবর্ণ চেহারায় দেখলাম মেয়েটিকে।

‘আমি কোম্পানির ওয়াইফ এইটা কে জানে না যে?’

দুএকটা ইংরেজি বুলি শিখেছিল মেয়েটা, শিক্ষিত ব্যক্তিদের সামনে ‘ওয়াইফ’ শব্দটা উচ্চারণ করে কিছুটা সমীহ আদায়ের চেষ্টা করল বোধহয়। কিন্তু সেটা বিশেষ আমল পেল না।

ধুরন্ধর আইনজীবী জানতে চাইলেন, ‘কাগজপত্র কিছু আছে?’

কিছুক্ষণ নিরুত্তর থেকে ছখিনা বলল, ‘টেকনাফে ময়-মুরব্বির সামনে শাদী হইছে যে না? আমি একানে এমনে এমনে চলে আসছি যে?’

উকিল সাহেব উঠে দাঁড়ালেন, অর্থহীন কথা শুনে নষ্ট করার মতো যথেষ্ট সময় তাঁর নেই, বললেন, ‘কাগজপত্র ছাড়া কোনো কথার মূল্য আমার কাছেও নাই, কোর্টেও নাই।’ শুধু মেয়েটির প্রতি দয়াপরবশ হয়েই যেন তিনি দুই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাদের মরহুম আব্বাজান মেয়েটাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন…। আপনারা আশ্রয় না দিলে এখন কোথায় যাবে?’

এই একটি কথায় এক মুহূর্তে বাড়ির বেগম সাহেবা আশ্রিতার স্তরে নেমে এলো।

বড় মিয়া বড় গলায় বলল, ‘আমি আশ্রয় দিব কোনো অসুবিধা নাই।’

ছোট মিয়া মানতে নারাজ, ‘আমার লগে থাকলে অসুবিধা কী?’

এই সম্পত্তির ভাগাভাগিতে উপস্থিত থাকতে রাজি নন অভিজ্ঞ আইনজীবী। তিনি যেতে যেতে বললেন, ‘সেটা আপনারা ঠিক করেন।’

দুই ভাইয়ের এই মহত্ত্বের অন্তর্নিহিত কারণ আমি জানি। ফস্ করে বলে বসলাম, ‘আপনারা এই রকম টানাটানি না করে, বেগম সাহেবা কার সাথে থাকতে চায়, তাকেই জিজ্ঞাস করেন।’

বড় মিয়া হঠাৎ প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে তেড়ে এলো আমার দিকে, ‘এই শালা মাগির দালাল, তুই চুপ থাক।’

আমার ওপর এ রকম আকস্মিক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার কোনো কারণই খুঁজে পেলাম না আমি। নাকি ধরে নিয়েছে এ রকম নিরীহ গৃহশিক্ষককে যে কোনো নামেই ডাকা যায়! এতক্ষণ কাঠের পুতুলের মতো আইন ও আইনজীবীর তেলেসমাতি দেখেছি, এবার কে যেন বারুদকাঠি ঠুকে দিল আমার দেশলাই বাক্সে, চিৎকার করে উঠলাম, ‘খবরদার, মুখ সামলে কথা বলো মিয়া, বাপ-বেটা সবাই ইয়াবার কারবার চালাও, আবার মুখে বড় কথা!’

বেলুনের মুখ দিয়ে হাওয়া বেরিয়ে গেলে যা হয়, চুপসে গেল দুই ভাইয়ের মুখ। কর্মচারীরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়; এদিক সেদিক তাকাতে লাগল, যেন তাদের কানে কোনো কথাই ঢোকেনি! বেশ একটা বীরত্বের অনুভূতি হলো, ছখিনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কার সঙ্গে থাকতে চাও বেগম সাহেবা?’

সকলের দৃষ্টি ছখিনার দিকে, সবাই উৎকর্ণ। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বেগম সাহেবা বলল, ‘আপনি আমাকে একান থেকে নিয়ে যেতে ফারবেন স্যার?’

চমকে উঠলাম। আমি তো রাজপরিবারের কেউ না, আমি বেগম সাহেবাকে কোথায় নিয়ে যাব! নিজের পায়ের তলায়ই মাটি নেই। আজ থেকে আমার আবার পত্রিকার পাতায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি খুঁজতে হবে।

‘আমি যাই।’ ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম আমি।

‘আমাকে এই দোজখে রাখি যাবেন যে স্যার?’ ছখিনার তীব্র আর্তি কানে নিয়ে গেট পেরিয়ে এলাম।

জানি, দু-এক বছরের মধ্যেই আবার দেখা হয়ে যাবে বেগম সাহেবার সঙ্গে। কোনো এক সন্ধ্যায় সিআরবি মোড় বা বটতলী রেলস্টেশনের বাইরে আলো-অন্ধকার এলাকার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে চকিতে আড়ালে সরে যেতে পারে; কিংবা ততদিনে নির্লজ্জ অশ্লীলতায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে ভ্রু বাঁকিয়ে, শরীরে মোচড় তুলে চটুল গলায় বলেও উঠতে পারে, ‘হাউ আর ইউ স্যার?’

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares