মাতৃত্ব : মোজাম্মেল হক নিয়োগী

শরতের এক দুপুরে আলস্যে খাটে গা এলিয়ে যখন তন্দ্রার ভাব এসেছে তখনই ল্যান্ড ফোনে রিং হয়। রাহেলার মেজাজ চিড়িক দিয়ে ওঠে । তার মেজাজ সব সময়ই ফরটি নাইন ডিগ্রিতে চড়া থাকার কারণ হলো দুর্বিষহ একাকিত্ব। মিজানের প্রতিও আর কোনো আস্থা রাখতে পারছে না। বিয়ের আগে বলেছিল বিয়ের পরেই তাকে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে যাবে। তা বিশ^াস করেছিল কারণ মিজান শ্রমিক হিসেবে সেখানে যায়নি, গিয়েছে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। কাজও পেয়েছে খুব বড় কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে। কিন্তু আট বছর হলো এখনও সে কোনো কিছু সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেনি যে তাকে কখন নিয়ে যাবে। শ^শুর-শাশুড়ির সঙ্গে ভালো ব্যবহার তো দূরের কথা নিজের মা-বাবার সঙ্গেও একটি কথা পর্যন্ত ভালো করে বলে না। দুই পরিবারের কাউকে সে সহ্য করতে পারে না বলেই দুবছর আগে এক বছরের ছেলে আদনানকে নিয়ে আলাদা বাসা নিয়ে থাকে। গৃহকর্মী হিসেবে থাকে টুনি। ফোন রিসিভ করে রূঢ় কণ্ঠে বলল, হ্যালো।

              হ্যালো শব্দটির ধরন-ধারণ বুঝেই মিজান হকচকিয়ে যায় এবং অনুমান করতে চেষ্টা করে বাসায় বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটেছে কি না। তবে মিজানের সঙ্গে বিয়ের প্রথম দিকে যেমন আবেগে গদগদ হয়ে জলো আলাপে মগ্ন হতো গত কয়েক বছর ধরে তেমন ভাব আর জমে না। কিছুটা অস্বস্তিতেই মিজান জিজ্ঞেস করল, কেমন আছো রাহেলা?

              রাহেলা আগের টেম্পারেই বলল, ভালো আছি। খুব ভালো আছি। আরও কিছু বলতে চাও?

              মিজান দীর্ঘশ^াস ফেলে বলল, তুমি এভাবে কথা বলছ কেন? এত দিন সবুর করতে পারছ আর কয়েকটা দিন সবুর করতে পারবা না?

              রাহেলা শ্লেষের হাসি হেসে বলল, সবুর! সবুর করার কী আছে? আমি তো ভালোই আছি। তুমিও ভালো আছো। আর কী? তুমি কি আজকেও ভিসার গল্প শোনাতে চাও। তোমার সবুরের চালবাজি আমি বুঝি না মনে করেছ? আমি রাখছি। তোমার ঘ্যানঘ্যানানি আমার অসহ্য লাগে।

              মিজান কাতর কণ্ঠে বলল, প্লিজ রাহেলা, শোনো। সত্যি বলছি, তোমার ভিসার কাগজপত্র ঠিক হয়ে যাবে মাস দু-একের মধ্যেই। তুমি বিশ^াস করো। আর ভিসা তো আমার হাতে নয়। 

              রাহেলা আগের মেজাজেই বলল, তোমার এক কথা আমাকে আর কতকাল শুনতে হবে সেটাই বলো? যা পারবে না তা কেন বলো?

              মিজান বলল, এবার সত্যি সত্যি হয়ে যাবে। তুমি বিশ্বাস করো। এবার আর চালবাজি না। তুমি দেখো সত্যি সত্যি হয়ে যাবে। তিন মাসের মধ্যেই তুমি চলে আসতে পারবে। যদি এবার ভিসা না হয় তাহলে আমি নিজেই দেশে চলে আসব, প্রমিজ।

              এই সময় টুনি রান্নাঘরে খুব জোরে শব্দ করে পাটায় মসলা বাটে। ও ইচ্ছে করেই বেশি শব্দ করে যাতে নিচের জামেলা বিরক্ত হয়। পাটায় হলুদ রেখে শিল দিয়ে বেশ জোরে জোরে আঘাত করায় শব্দটা অসহনীয় লাগে। শিল-পাটার শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে নিচতলার জামেলা এসে টুনির সঙ্গে তর্ক শুরু করে। এদিকে মিজানের ফোনের পুরোনো কথার জাবরকাটা ভালো লাগছিল না। জেদ দেখানোর জন্য খটাস করে রিসিভার রেখে দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে দেখে জামেলা টুনির সঙ্গে তর্ক করছে।  

জামেলা চোখ বড় বড় করে টুনির দিকে তাকিয়ে বলল, তরে না কয়দিন নিষেধ করলাম এত জোরে শব্দ করবি না। তবু দুপুরবেলায় এমন শব্দ করে মসলা বাটোস ক্যান? আমি কি মসলা বাটি না? কোনো দিন শব্দ হুনছিলি? তর যন্ত্রণায় কি বাসা ছাইড়্যা দেওন লাগবো?

              টুনি সে মুখ বাঁকিয়ে আহ্লাদ করে বলল, আমি আবার শব্দ করলাম কই? একটু শব্দ তো অইবোই।

              তর্কটা আরও হয়তো এগুতো। কিন্তু মঞ্চে টুনির ভূমিকায় চলে আসে স্বয়ং গৃহকর্তী রাহেলা। রাহেলাকে দেখে টুনি মসলা পেষায় এতটা আত্মমগ্ন হয় যেন সে ভাজা মাছটিও উল্টিয়ে খেতে জানে না। রাহেলা কড়া মেজাজে জামেলাকে বলল, বুয়া। তুমি সব সময়ই টুনির সাথে ঝগড়া করতে আসো। আমি প্রায়ই লক্ষ করেছি। মসল্যা বাটলে তো এমন একটু শব্দ হবেই। সে জন্য তুমি এভাবে চিৎকার করে কথা বলবে? তুমি খুব ঝগড়াটে। এত ঝগড়াটে হলে বাসাবাড়িতে কাজ করা যায় না। 

              একতরফা শুধু জামেলাকে দোষারোপ করাতে তার মেজাজও চড়ে যায় এবং ধারালো কণ্ঠে বলল, কী কইলেন আফা? আমি ঝগড়াটে? আমি ঝগড়াটে? আর টুনি যে এমুন করে হেইডা কোনো সোমায় দেখলেন না। এমুন এক চৌক্ষা বিচার আফনের!

              টুনি লক্ষ্মী মেয়ের মতো শান্ত স্বরে বলল, আমি আবার কী করলাম? আমি মসলা বাটতাম না? তোমার লাইগ্যা কাম বন্ধ রাহন লাগব? কামের মানুষ কাম ছাড়া থাকলে জীবন চলব?

              গৃহকর্তী যেখানে কথা বলছে সেখানে কাজের মেয়ের কথা বেমানান। রাহেলা টুনিকে ধমক দিয়ে বলল, তুই চুপ কর। চুপচাপ কাজ কর। জামেলার দিকে তাকিয়ে বলল, বুয়া শুনো, তুমি আর কোনো দিন ঝগড়া করতে আসবে না। আমি কিন্তু একদম সহ্য করব না।

              জামেলার মেজাজের পারদ কয়েক ডিগ্রি নিচে নেমে আসে এবং ভদ্রভাবে বলল, যদি নিচের তলায় থাকতেন তাইলে বুঝতেন কত যন্ত্রণা। ওপরের তলার মাইনসে নিচের তলার মাইনসের কষ্ট বুঝে না। অহন আফনের ছেলে আবার বল দিয়া শব্দ করতাছে।

              রাহেলা বলল, বড় আশ্চর্য মেয়ে তো তুমি। ছেলে কী তাহলে একটু খেলতেও পারবে না? তাহলে বলো আমরা এ বাসা থেকে চলে যাই। তোমরাই থাকো। 

              ওপরের হট্টগোল শুনে দোতলা থেকে ফ্লোরা অধিকারী এসে রাহেলার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে বললেন, মা গো ওরে আমিই আসতে বলছিলাম। মা মরা আমার নাতনিটা কয়েক দিন ধরে শুধু কাঁদে। ও জোরে শব্দ পাইলে মনে হয় ভয় পায়। চমকে ওঠে আর কাঁদে। এইজন্য বুয়া একটু বারণ করতে এসেছিল। তোমরা বাসা ছেড়ে চলে যাবে কেন? একসঙ্গে থাকলে একজনের কষ্ট অন্যজন না বুঝলে কীভাবে একসঙ্গে থাকব, বলো মা?

              তিন মাসের শিশু সিঁথির কান্নার শব্দ ভেসে আসে দোতলা থেকে। রাহেলা কান পেতে শুনে। ফ্লোরা অধিকারীর কথায় ঝগড়ার ঝড় থামে এবং তখন জামেলা ও ফ্লোরা অধিকারী নিচে চলে যান।

              এতটুকুন শিশুর কান্নায় রাহেলার মন দ্রবীভূত হয় এবং সে নিচে নেমে এসে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনে অনেক দ্বিধা ও সংকোচ। মনে মনে নিজেকে তিরস্কার দেয়, আমি এতটাই খারাপ যেন নিচতলার মানুষগুলোর খবর পর্যন্ত রাখি না। কয়েক বছর যাবৎ মিজানের মিথ্যাচারে রাহেলা বলতে গেলে স্বেচ্ছায় নির্বাসন নিয়ে এই বাসায় এসেছে। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করে না, কারও সঙ্গে কথা বলতেও তার ইচ্ছে করে না। এমন মানসিক টানাপোড়েনে আজ নিজেকে বড় ছোট মনে হয়। একটু আগে যাদের সঙ্গে এত ঝগড়া হলো তাদের বাসায় কীভাবে ঢুকবে? তিন চারদিন আগেও জামেলার সঙ্গে ঝগড়া হয় রাহেলার। সেখানেও টুনির বাড়াবাড়ির জন্য ছাদে রাহেলাকে গিয়ে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। আসলে সে ঝগড়া মিটমাট করলেও পারত। কিন্তু তার মেজাজ থাকে সব সময় উচ্চগ্রামে। কথা বলে মনের ঝাল মিটানোর জন্য ঝগড়া করে। সেদিন ছাদের একটি তারে জামেলাদের কাপড়গুলো নিচে ফেলে দিয়ে টুনি নিজের কাপড় শুকাতে দেয়। তখনই জামেলা এসে দেখে ফেলে এবং বাজখাঁই গলায় বলল, শোন টুনি তুই আমাদের কাফড় নিচে ফেলে দিয়া তোর কাফর লাড়লি? এত বড় সাহস তর? হা।

              টুনিও কি আর কম যায়? সে বলল, হুনো। তোমার নামে আর কামে খুব মিল। তোমার নাম অইলো জামেলা আর তুমি সব সময় ঝামেলা বানধো। আমি তোমরার কাফর নিচে রাহুম কেয়্যা? 

              জামেলা রুষ্ট ভাষায় বলল, মুখ সামালয়া কতা কইবি কিন্তু। কাফরের কি হাতফাও আছে যে নিচে হাইট্যা নামবো? তুই খুব বজ্জাত মাইয়্যা। আর দেহি নাই তুই ফেলায়া দিছোস। বজ্জাত মাইয়্যা।

              রাহেলারা থাকে তেতলায়, টপফ্লোর। দুজনের ঝগড়া শুনে ছাদে এসে কোনো কিছু যাচাই-বাছাই না করেই জামেলাকে বলল, বুয়া তোমার কোনো কাজ নেই? তুমি শুধু টুনির সঙ্গে লাগতে আসো কেন? তুমি এত ঝগড়া লাগো কেন?

              জামেলা বলল, আফনের ফেডেও তো কুনো বিচার নাই। কুনো কিছু না দেইক্যাই আমার দোষ দিলাইন। এই দ্যাহেন টুনি ভাইজানের শাটটা নিচে রাইক্যা হে কাফর লাড়লো। আর আফনে কিছু না দেইক্যাই কাইজ্যার মধ্যি আগুন লাগায়া দিলাইন।

              জামেলার কথা শুনে রাহেলার মেজাজ আরও চড়ে যায় এবং ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, তুমি দেখছ ও কাপড় নিচে রাখছে? না দেখে তুমি মিথ্যা কথা বলছ? কাপড় তো বাতাসেও পড়তে পারে। আর আবার মুখে মুখে বড় বড় কথা বলছ? তোমার সাহস তো কম না? আশ্চর্য! একটা কাজের বুয়ার এত পাওয়ার।

              ঝগড়াটি ছাদ ও তেতলার সীমা ছাড়িয়ে চলে যায় দোতলায়। দোতলার বাসিন্দা টনি অধিকারী এসে একটু দূরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা শুনে পরে বলল, কাপড়ে ক্লিপ মারা থাকলে বাতাসে পড়বে কীভাবে? আপনি কোনো সময়ই টুনিকে কিছু বলেন না। ও সেদিন আমাদের দরজার বাহির থেকে আটকে দিয়ে চলে আসল। ভাগ্যিস আমি দেখেছিলাম। নয়তো সে কথাটাও আপনাকে বোঝানো যেত না।

              রাহেলা বলল, একটার মধ্যে আরেকটা আনেন কেন? এই টুনি, এই টুনি তুই কি কাপড় নিচে রাখছিস?

              টুনি ভিজে বেড়ালের মতো বলল, না, আমি কাপড় নিচে রাকুম ক্যান? কাপড়ে আমারে কি করছে? এইডা কুনো মুনুষ্যির কাম?

              রাহেলা কায়সারের দিকে তাকিয়ে বলল, শুনলেন তো? ওর কথা শুনলেন তো? তাহলে কে মিথ্যা বললো? 

              টনি অধিকারী শান্ত স্বভাবের মানুষ। স্ত্রী বিয়োগের শোক এখনও কাটেনি। বিষাদে মুহ্যমান মানুষটির আর কথা বলতে ইচ্ছে করেনি। সে বলল, জামেলা চলো। বাসায় চলো। তুমি একটু সাবধানে থাকতে পারো না? আর ছাদে কাপড় শুকাতে দিবে না। আমাদের বারান্দায় দিবে।

              জামেলাকে নিয়ে টনি অধিকারীর চলে যাওয়ার পর রাহেলা বিড়বিড় করে বলল, ছাদটা মনে করে ওদের একার। এই  টুনি…

              টুনি বলল, জি খালাম্মা।

              রাহেলা বলল, তুই আলাদা একটা দড়ি টানিয়ে নিবি। এ নিয়ে আর যেন কোনো কথা না শুনি। কথা শেষ করে হনহন করি সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে রাহেলা।

              একা একা দাঁড়িয়ে টুনি বলল, আমার নাম টুনি। শয়তানের মুনি। বাতাসের মধ্যে ধানের চারা বুনি। কাজের মেয়ে দেইক্যা এত সোজা মনে করছ? হি হি হি। হি হি হি। তারপর ছাদ থেকে একটু ময়লা হাতে নিয়ে টনি অধিকারীর কায়সারের একটা জামায় একটু লাগিয়ে দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নিচে নেমে আসে।

              দুটি ঘটনা পর পর ঘটে যাওয়ার পর এখন নিজেকে কীভাবে তাদের সামনে দাঁড় করাবে ভাবতে থাকে রাহেলা। বাসার ভেতর সিঁথির অবিরাম কান্নার শব্দ রাহেলার অন্তরে ঝড় তুলছে এবং সে স্থির থাকতে না পেরে আস্তে আস্তে ডোরবেল বাজায়। জামেলা দরজা খুলে হকচকিয়ে যায়। তার চোখে চরম বিতৃষ্ণা। রাহেলাও কিছুক্ষণ ইতস্তত করে রুমের ভেতরে ঢুকে দেখে সিঁথি কাঁদছে আর ফ্লোরা অধিকারী তাকে কোলে নিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। রাহেলাকে দেখে ফ্লোরা অধিকারী হাসি মুখে বললেন, এসো মা। বসো।

              রাহেলা ফ্লোরা অধিকারীর পাশে বসে বলল, আমার কাছে দেন আন্টি। ফ্লোরা অধিকারী দেওয়ার আগেই রাহেলা সিঁথিকে টেনে কোলে নেয়।

              কিছুক্ষণ আগের বিবাদ-কলহ, রেষারেষি, পারস্পরিক মনের কষ্ট সব ভুলে গিয়ে দীর্ঘশ^াস ফেলে ফ্লোরা অধিকারী বললেন, দ্যাখো মা, খুব কাঁদছে। ক’দিন ধরেই খুব বেশি কান্নাকাটি করছে। ডাক্তার দেখালাম, তিনিও কিছু বলতে পারলেন না।

              রাহেলার কোলে এসে সিঁথি কিছুটা শান্ত হয়। একবার চোখ খুলে তাকিয়েও দেখে। রাহেলা আদর করে, না না কাঁদে না। কিছুক্ষণ কোলঝোলা দিয়ে বলল, আন্টি আমি আমার রুমে নিয়ে যাই। কিছুক্ষণ পর দিয়ে যাব।   

              রাহেলা সিঁথিকে নিয়ে চলে আসে তার নিজের রুমে। ছয় মাস আগে আদনান স্তন্যপান ছেড়েছে। এখন কি স্তনে দুধ আছে? রাহেলা কিছুক্ষণ ভেবে সিঁথিকে স্তন্যপান করায়। সিঁথির কান্না থামে, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে যেন মায়ের কোলে পরম শান্তির পরশ পায়। সিঁথির পাশে বসে আদনান গালে হাত বুলায়। এক সময় উঠে গিয়ে পাশের রুমে বল দিয়ে বাউন্স করে। রাহেলা ক্ষেপে যায় এবং ধমক দিয়ে বলল, এই এখন বল খেলবি না। একটা শব্দও করবি না। মেয়েটা ঘুমাচ্ছে দেখছিস না।

              মায়ের ক্ষেপাটে ধমক খেয়ে আদনান মায়ের দিকে তাকায় বিস্ময়ের দৃষ্টিতে। বল সোফার ওপর রেখে বারান্দায় চলে যায় পাখির খাঁচার কাছে। 

               রান্নাঘরে টুনি মসলা বাটার শব্দ এখন হচ্ছে। যত শব্দ করছে তত ক্ষেপে যাচ্ছে রাহেলা। সে এক সময় রাগে তিরতির করে কাঁপতে কাঁপতে রান্নার ঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, তুই মসলা পিষা বন্ধ কর। এখন অন্য কাজ কর।

              রাহেলার কথা শুনে হতবাক হয়ে যায় টুনি। এই মানুষটার হঠাৎ পরিবর্তন কেন—এমনই মনে মনে ভাবে টুনি। রাহেলার সামনে সে ভিজে বেড়ালের মতো, কথাই বলতে পারে না। বলল, কী কন খালাম্মা? রাইতে না মাংস রানবেন, তয় আদা বাটা, পেঁয়াজ বাটা কোন সোমায় করুম। 

              রাহেলা শান্ত কিন্তু রূঢ়ভাবে বলল, আমি বলছি থাম। রাতে মাংস রান্না করব না। তুই আর একটা শব্দও করবি না। যা অন্য কাজ কর গে। ড্রয়িং রুমের সোফা পরিষ্কার কর। না-হয় ঘুমিয়ে থাক।

              টুনি বিস্মিত ও বিস্ফারিত চোখে রাহেলার দিকে একবার তাকায়। পাটা ঢেকে সে বের হয়ে যায়। মনে মনে বলল, ঠিক আছে অন্য কোনো বুদ্ধি পামু না? এত সহজে ছাইড়া দিমু? 

              বিকেলে টনি অধিকারী অফিস থেকে এসে সিঁথির বিছানা খালি দেখতে পেয়ে মাকে জিজ্ঞেস করল, আম্মা, সিঁথি কোথায়?

              ফ্লোরা অধিকারীর মুখে হাসি। তিনি বললেন, তোর সিঁথির কান্না দেখে ওপর তলার রাহেলা এসে নিয়ে গেছে। ওখানে যাওয়ার পর আর কাঁদেনি। খুব শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে।

              টনি অধিকারী কিছুটা হতবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকায়। তার আস্তে আস্তে বলল, এই ঝগড়াটে মহিলা সিঁথিকে নিয়ে গেছে? খুব আশ্চর্যের ব্যাপার তো। নিয়ে আসেন। তার কাছে নিরাপদ না।

              ফ্লোরা অধিকারী স্বাভাবিকভাবে বললেন, না রে বাবা। মেয়েটা ভালো। স্বামী দেশে থাকে না। ছেলেটাও বিরক্ত করে। মাঝে মাঝে মেজাজ একটু গরম থাকে। সিঁথি ওখানে থাক কিছুক্ষণ। রাতে নিয়ে আসব। 

              টনি অধিকারী স্মিত হেসে বলল, মেজাজ গরম মানে কি? বলেন, আগুনে ঝলসানো মেজাজ। মাথা যেন বাদাম ভাজার কড়াই। এমন আগুনী বেগম জীবনে আর দেখি নাই। গায়ে পড়ে ঝগড়া করে। 

             দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ফ্লোরা অধিকারী। হয়তো এই দীর্ঘশ্বাস নারীর একাকিত্ব অনুভবের, হয়তো প্রবাসী স্বামীর অবহেলার, হয়তো জীবনের অপূর্ণতা সঞ্জাত, হয়তো নারী হয়ে নারীর কষ্ট অনুভবের। তিনি শান্তভাবে বললেন, এভাবে বলিস না বাবা। মেয়েটা ভালো। মাঝে মাঝে এমন তো সবাই করে। দু’একটা ঘটনা দিয়ে মানুষকে এভাবে বলতে হয় না। তুই চা খাবি?

              টনি অধিকারী বলল, খাব। দেন এক কাপ?

              ফ্লোরা অধিকারী জানতে চাইলেন, আর কিছু খাবি?

              টনি অধিকারী বলল, মুড়ি আছে? মুড়ি থাকলে দেন।

              ফ্লোরা অধিকারী একট প্লেটে মুড়ি আর চা নিয়ে এসে টি-টেবিলে রাখেন। মুড়ি আর চা খায় টনি। ফ্লোরা অধিকারী কাছে বসে আস্তে আস্তে বললেন, দেখতে দেখতে কতগুলো দিন চলে গেল। তোকে বলতেও সাহস পাচ্ছি না আর না বলেও উপায় নেই।

              মায়ের দিকে তাকিয়ে টনি অধিকারী বলল, কী (চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে)?

              ফ্লোরা অধিকারী বললেন, এভাবে তো আর জীবন চলবে না। অন্তত সিঁথির জন্য হলেও তোকে আবার সংসার করা উচিত। বউমার জন্য তো কম করলি না। তার হায়াৎ নাই কী করবি বাবা? মানুষের মৃত্যুর ওপর কি কারও হাত আছে? (ফ্লোরা অধিকারী চোখ মোছেন।)

              মায়ের কথার উত্তর না দিয়ে টনি অধিকারী বলল, আম্মা, সিঁথিকে দেখাশোনা করতে পারে এমন কোনো নার্স পাওয়া যায় না?

              ফ্লোরা অধিকারী বললেন, নার্স পাওয়া যায় কি না তা তো জানি না। খোঁজ করলে হয়তো পাওয়াও যেতে পারে। 

              টনি অধিকারী বলল, একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন না। একজন নার্স হলে ওকে সামলাতে পারবে। যদি পারেন তাহলে ২৪ ঘণ্টার জন্য নিয়ে নেন। 

              ফ্লোরা অধিকারীকে খুব চিন্তিত দেখায়। তিনি বললেন, আমি যা বললাম তার কোনো কিছু তো বললি না। বাবারে, জীব হলো মরার জাত। জীবন মানেই অবধারিত মৃত্যু। এক জীবনের মৃত্যুতে অন্য জীবন থেমে থাকতে পারে না। তোকে জোর করব না। সিঁথিকে ভালোভাবে মানুষ করার জন্য দায়িত্ব নার্সের কাছে না দিয়ে একজন মায়ের কাছে দে।  

              টনি অধিকারী বলল, অন্য কোনো মেয়ে এসে সিঁথিকে ভালোভাবে গ্রহণ করবে এটাই তো বিশ্বাস করতে পারছি না। এসব থাক না মা। সৎ মায়ের অবহেলা নির্যাতনের কত ঘটনাই তো জানি। চাকরির মায়ায় নার্স অন্তত অবহেলা নির্যাতন করবে না। অনুচ্চারে বলল, নীলার স্মৃতি তো এখনও বাসি হয়নি। এখনও তার ছায়া সারা বাড়িতে কাব্যময় হয়ে আছে। কী করে অন্য একটি মেয়ে এই ঘরে আসবে? এসেই তো তার ছবিটি সরিয়ে ফেলবে। কী করে মেনে নেব?

              টনি অধিকারী সোফা ছেড়ে গিয়ে বারান্দায় বসে। তার চোখ দুটি ছলছল করতে থাকে। তার দৃষ্টি অনেক দূরে। দূরে আকাশে স্থির তার দৃষ্টিতে ভরাট শূন্যতা।

              সন্ধ্যার পর সিঁথির জন্য টনি অধিকারীর কায়সারের মন অস্থির হয়ে ওঠে। সে তেতলা গিয়ে রাহেলাকে বলল, ভাবি, সিঁথিকে নিতে এসেছি।

              হাসি মুখে রাহেলা বলল, ভেতরে আসুন। আসুন।

              টনি অধিকারী বলল, আপনার কাছে কৃতজ্ঞ ভাবি। আপনি শুধু শুধু কষ্ট করলেন। তবে এই ভেবে শান্তি পাই যে, সিঁথি আপনার কাছে এসে শান্ত হয়েছে।

              রাহেলা বলল, এভাবে বলছেন কেন? মেয়েটা কাঁদছিল। তাই নিয়ে এলাম। আশ্চর্য এখানে এসে সে একেবারে শান্ত। এটকুও কাঁদেনি।

              সিঁথি গভীর ঘুমে। তাকে কোলে নিয়ে টনি অধিকারী বলল, ভাবি আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

              রাহেলা বলল, সিঁথি কয়েক দিন আমার কাছে থাকতে পারে না? ধরুন আমরা বিদেশে যাওয়ার আগ পর্যন্ত।

              টনি অধিকারী বলল, ঋণের বোঝা বাড়াতে চাই না, ভাবি। ওর জন্য আপনার অনেক কষ্ট হবে। এ ঋণ কীভাবে শোধ করব?

              রাহেলা বলল, এভাবে বলছেন কেন? এই অবোধ শিশুর জন্য আমি কিছু করতে পারছি এতে আমি কম আনন্দিত নই। শিশুর জন্য আবার ঋণ কীসের?

              টনি অধিকারী বলল, আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষাও আমি হারিয়ে ফেলেছি। ও যদি আপনার কাছে কিছুটা শান্তি পায় তাহলে আমাদের দুর্গতি কিছুটা কমে। এখন আসি ভাবি।

              সিঁথিকে নিয়ে টনি অধিকারী চলে যায় পাছে ফেলে যায় কিছু দীর্ঘশ^াস। তবে সিঁথির জন্য একটি নিরাপদ কোল, একটি নিরাপদ আশ্রয়, একটি মাতৃত্বের ছায়া পাওয়া গেল এটিই বড় কথা।

              এদিনের এই ঘটনার পর সিঁথি অধিকাংশ সময়ই রাহেলার কাছে থাকে। সিঁথি যেন রাহেলারই মেয়ে হয়ে গেছে। 

তিন মাস পর কোনো বার্তা না দিয়েই একদিন সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর মিজান এসে হাজির। বাসার গেট খুলে মিজানকে দেখে টুনি হতবাক ও বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মিজানও কিছু না বলে টুনির ভাব দেখে। হঠাৎ টুনির ঘোর কাটে এবং ‘ও খালাম্মা’ চিৎকার ও দৌড় দুটি ক্রিয়া একসঙ্গে সম্পন্ন করে রাহেলার রুমে গিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, দ্যাহেন কেডা আইছে। তাড়াতাড়ি যান।

              টুনির অস্বাভাবিক চিৎকার হাঁফানি দেখে রাহেলা গেটের পাশে এসে হতবাক। আর বাইরে দাঁড়িয়ে মিটমিট করে হাসছে মিজান।

              রাহেলা এতটা হতবাক হয়ে গেছে যে, অনেকটা সময় নিল কথা বলতে। তারপর বলল, ফোন না করেই এসেছ। আমি তো রিসিভ করতে পারতাম।

              সব সময়ই তো জানিয়েই আসি। এবার শুধু সারপ্রাইজ আর সারপ্রাইজ। আর আমি কি দেশের কোনো নেতা যে, আমাকে রিসিভ করতে হবে।

              ততক্ষণে আদনানও এসে হাজির। আব্বু তুমি কখন এসেছ। আহা! তুমি এসে গেছো। দেখে যাও আমাদের বাসায় কে?

              তিন বছরের আদনান বাবাকে দেখে অবাক হয়ে এলোমেলো করে অনেক কথাই বলল। কিন্তু মিজান তার সব কথা বুঝতে পারেনি। বড় বড় স্যুটকেস দুটি রুমের ভেতরে ঢুকিয়ে আদনানকে কোলে নিয়ে চুমু খেতে খেতে রাহেলার রুমে ঢুকে দেখে একটি মেয়ে ঘুমিয়ে আছে।

              মিজানের পেছনে রাহেলা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আদনান বলল, ওর নাম সিঁথি। দোতলায় থাকে। আমাদের এখানেও থাকে।

              মিজান হাসতে হাসতে বলল, তাহলে তুমি একটি মেয়ে পেয়ে গেলে।

              রাহেলা বলল, হ্যাঁ। খুব লক্ষ্মী মেয়ে।

              দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হয়। এই দৃষ্টিতে প্রকাশিত হয় শাশ^ত প্রেমের আলো। রাহেলা বলল, তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো। আমি চা দিচ্ছি।

              একটি ছোট ব্যাগ থেকে মিজান কাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢোকে আর রাহেলা কিচেনে। ডিম দিয়ে পাউরুটি টোস্ট করে চায়ের পানি স্টোভে দেওয়ার সময়ই ফ্লোরা অধিকারী আসেন। মিজান আসার খবর পেয়ে তিনিও খুশি হন এবং সিঁথিকে নিয়ে যান নিচে।

              ড্রয়িংরুমে বসেছে মিজান। তার চুল এখনও ভিজা। ফ্যানের বাতাসে এক প্রকার প্রশান্তি অনুভব করে। পাউরুটির টোস্ট মুখে দিয়ে আস্তে আস্তে চিবুতে চিবুতে বলল, সিঁথি কে?

              রাহেলা বলল, দোতলার। মেয়েটার জন্মের তিন মাসের মাথায় ওর মা মারা যায়।

              মিজান কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে জিজ্ঞেস করল, কীভাবে? অসুখ বিসুখ ছিল?

              না। বেবিটা সিজিরিয়ান। আসলে সিজার করতে কী যেন ত্রুটি ছিল। পরে বড় ধরনের ইনফেকশন হয়, অনেক চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারেনি।

             দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিজান বলল, সিজার করাটা এদেশের বড় ব্যবসা। পৃথিবীর অন্য দেশে সিজার করানোর জন্য খুব নিরুৎসাহিত করে। আর আমাদের…

              মিজান কথাটি শেষ করেনি। একটি টোস্ট শেষ করে আরেকটি নিয়ে মুখে দেয়। তারপর বলল, সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ কী জানো?

              রাহেলা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মিজানের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি ফ্যামিলি ভিসা পেয়ে গেছি। ফ্লাইটের টিকিটও কনফার্ম। আগামী পনেরো তারিখ সন্ধ্যায় আমাদের ফ্লাইট।

              রাহেলার চোখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেলেও বুকের ভেতরটায় চিনচিন করে, সিঁথির জন্য মুহূর্তের মধ্যে এক প্রকার হাহাকার অনুভব করে। এতদিনের চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলে প্রাপ্ত ভিসা ও টিকিটের কথা শুনে হঠাৎ করেই হাহাকারের কথা কীভাবে প্রকাশ করে। রাহেলা উচ্ছ্বাস নিয়েই বলল, তাহলে তোমার চেষ্টা সফল হলো। শুকরিয়া আলহামদুলিল্লাহ।

              চায়ের পর্ব শেষ হলে বড় স্যুটকেস দুটি ড্রয়িংরুমে খুলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করে। আনদানের জন্য আনা কিছু জিনিস ওকে ডেকে হাতে তুলে দেয়। মাত্র কয়েক দিন দেশে থাকবে তাই তেমন কিছু আনা হয়নি। বরং দেশ থেকে অনেক কিছু নিয়ে যেতে হবে সে-রকম চিন্তা করে রেখেছে মিজান।

              আত্মীয়-স্বজনদের জন্য আনা কাপড়-চোপড়গুলো ড্রয়িংরুমে রাখছে আর কার জন্য কী তাও মুখে বলছে।

              সবশেষে প্রত্যাশিত ভিসা ও টিকিট বের করল হ্যান্ডব্যাগ থেকে এবং রাহেলার হাতে দিয়ে বলল, তুমি খুব রাগ করেছ বারবার। কিন্তু দেখো বিদেশের ব্যাপার। মধ্যপ্রাচ্যে ফ্যামেলি ভিসা পাওয়া বেশ কঠিন ও জটিল কাজ। তবু আল্লাহর অশেষ রহমত যে পেয়ে গেলাম।

              রাহেলাও জানে ভিসার জন্য মিজানকে কম অপমান করেনি সে। তবু এত প্রত্যাশিত ভিসাটি হাতে পেয়েও কেন তার মন আনন্দে ভাসছে না ভেবে পায় না।

              মিজান বলল, এখান থেকে কী কী নিতে হবে কাল থেকে কিনতে বের হয়ে যাব। বড় আপাকে বলে দেখো বাসায় থাকবে কি না। আপা রাজি হলে রক্ষে। না-হয় এত আসবাবপত্র কোথায় রাখবে? বাসা ছাড়াটা ঠিক হবে না। 

              বড় আপার বাসায় ফোন নেই। আমরা আগামীকাল গিয়ে কথা বলে দেখি রাজি হয় কি না।

              তাই করো। ওদের বাসায় তেমন কিছুই নেই। আর বাসা ভাড়া তো আমিই দেব। প্রয়োজনবোধে অগ্রিম ছয় মাসের ভাড়া দিয়ে যাব।

              আগে কথা বলে দেখি। তারপর না-হয় সিদ্ধান্ত।

              মিজান আসাতে সিঁথির প্রতি মনোযোগ কমে যায় রাহেলার আর সিঁথির কান্না আবার বেড়ে যায়। রাতে যখন সিঁথি কাঁদে তখন রাহেলার বুকের ভেতরটা মোচড় দিতে থাকে। দিনের বেলায় দু-একবার স্তন্যপান করাতে পারে মাত্র। কিন্তু মিজান প্রথম দিন কিছু না বললেও তৃতীয় দিন বলল, আর মাত্র কয়েক দিন দেশে থাকবে। ওকে ওর মতোই থাকতে দাও।

              রাহেলা কোনো কথা বলতে পারে না। শুধু বুকের ভেতরে হাহাকারই অনুভব করে। রাহেলার বড় বোন এখানে থাকতে রাজি হয়েছে। আস্তে আস্তে গোছগাছও কায়সারের করা শুরু হয়েছে।

              টুনিরও মন খারাপ এবং সারাক্ষণই তাকে বিষণ্ন দেখায়। রাহেলা ধমকালেও ভালো-মন্দ খেতে তো পারত। এক বিকেলে ছাদে মন খারাপ করে বসে আছে টুনি আর তখনই জামেলা যায় শুকনো কাপড় বাসায় আনতে। জামেলাকে দেখে সে বলল, জানো, আর কাইজ্যা বাজাইতাম না। এ্যাই বুয়া আইয়ো আমরা মিইল্যা যাই।

              টুনির কথায় জামেলা বিস্মিত হয় এবং বলল, ক্যান? মিলতে চাস ক্যান? কাইজ্যা বাজাইয়া আফেত্তি মিইট্যা গ্যাছে? 

              টুনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, হ বুয়া। আফেত্তি মিইট্যা গ্যাছে। খালুসাব আইছে। খালাম্মারে লইয়্যা যাইবো বিদেশে। তহন যে কোন বাসায় যাই ঠিক আছে? কাইজ্যা কইর‌্যা লাভ নাই। অশান্তি। তুমি মিলাবা না?

              জামেলা বলল, মিল কী হিরেবার? তর সাতে মিল কী? তুই অইলি ইবলিশের হাড্ডি। 

              টুনি জামেলার গলায় জড়িয়ে ধরে বলল, আইয়ো মিইল্যা যাই ঝামেলা বুয়া। টুনি জামেলাকে কাতুকুতু দেয়। কাইজ্যা-কাইজ্যির কাম নাই, বুইড়্যা বেডির দাম নাই। হি হি হি।

              জামেলা হাসতে হাসতে বলল, আরে ছাড় ছাড়। ছাড় পাজি। আর আমারে ঝামেলা ডাকবি না। জামেলা বুয়া কইবি। ঠিক আছে?      

              টুনি বলল, হ। ঠিক আছে। জামেলা বুয়া। জানো জামেলা বুয়া, হুনছি এই বাসায় খালাম্মার বড় বইন আইয়া থাকবো। গরিব মানুষ। আমার এইহানে থাহনের ইচ্ছা নাই। গরিব মাইনসের বাসায় কাম করন কি মন চায়?

              জামেলা বলল, আরে গরিব মাইনসের বাসায় কাম করতেই মজা। এরার কাজ থাহে কম। আর গরিবের মর্ম বুঝে। আদর করে।

              টুনি বলল, তাইলে কি থাহনের কথা কও?

              জামেলা বলল, হ। থাক।

দিনগুলো এত দ্রুত যাচ্ছে যে, রাহেলা কোনো কিছুরই তল পাচ্ছে না। দিনের বেলায় মিজানের সঙ্গে টুকটাক কেনাকাটা আর রাতে ব্যাগ গুছানো, আত্মীয়স্বজনদের অ্যাটেন্ড করা, সিঁথিকে মাঝে মাঝে স্তন্যপান করানো এসব কাজ করেই খুব তাড়াতাড়ি আঙুলের করে দিনগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। এক সন্ধ্যায় সিঁথির কান্না শুনে রাহেলা দোতলায় গিয়ে হাজির হয়। রাহেলার কোলে এসেই শান্ত হয়। আজকে আর নিজের রুমে নিয়ে আসেনি। ফ্লোরার রুমে গিয়ে স্তন্যপান করিয়ে শান্ত হলে বাসায় ফিরে হতভম্ব হয়ে ঝিম ধরে বসে থাকে। সিঁথির প্রতি তার নাড়ির টান সৃষ্টি হয়েছে, মিজানের প্রতি ভালোবাসার টান। কোনটা শক্ত? এ যেন নিয়তির এক অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হলো। রাহেলা যখনই বিদেশে যাওয়ার কথা চিন্তা করে তখনই তার বুকের ভেতরে সিঁথির কান্নার শব্দ হতে থাকে। কোনোভাবেই সিঁথিকে নিজের অস্তিত্বের বাইরে ভাবতে পারছে না। মেয়েটাকে বাঁচানো কি রাহেলার কর্তব্য নয়।

                গতকাল দুপুরে মিজানের সঙ্গে সিঁথিকে কেন্দ্র করে কিছুটা মনোমালিন্যও তৈরি হয়। রাহেলা যখন সিঁথিকে কাছে শুইয়ে আদর করছিল তখন মিজান পাশের একটা চেয়ারে বসে বলল, সিঁথির সঙ্গে তোমার তো বেশ ভাব দেখা যাচ্ছে। একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না? তাছাড়া একটি খ্রিস্টান মেয়ের জন্য এত কিছু আমার ভালো লাগছে না।

              মিজানের কথা শুনে রাহেলার বুকের ভেতরে যেন দাউ দাউ করে আগুন জ¦লে ওঠে। তবু আজ উত্তেজিত হয়নি। শান্ত কণ্ঠে বলল, শিশুর আবার ধর্ম কী? রাহেলার কথা চাপা ও শান্ত হলেও এর ভেতরের তীব্র উত্তাপ অনুভব করতে পেরে কথা আর বাড়ায় না মিজান।

              দুর্বোধ্য নৈঃশব্দ্যের মধ্যে অনেকক্ষণ সময় চলে যায়।

              রাহেলা সিঁথিকে নিচে দিয়ে আসতে গিয়ে টনি অধিকারীর কায়সারের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা হওয়াতে দেরি হয়। নিজের রুমে এসে দেখে মিজান আগের মতোই থোম মেরে বসে আছে। পূর্বের সৃজিত নৈঃশব্দ্যের প্রাচীর মিজানই ভাঙে এবং রাহেলাকে বলল, বাচ্চাকে দিয়ে আসতে এত দেরি? সে বাসায় এত কথা কার সঙ্গে?

              রাহেলা বলল, তুমি কী মিন করতে চাইছ? এত দেরি বলতে কী বুঝাতে চাও?

              মিজান বলল, ভালোভাবে জিগ্যেস করলাম ভালোভাবে উত্তর দাও। এত কথা কীসের?

              রাহেলা বলল, এত মেজাজ দেখাচ্ছ কেন? তুমি কী মিন করতে চাইছ তা আমি বুঝতে পারছি না? সত্য কথা পরিষ্কার করে বলতে ভয় পাও কেন?

              রাহেলার মেজাজের উত্তাপ অনুভব করে মিজান বলল, সরি রাহেলা। এখন থামো।

              রাতেও দুজনের রসায়ন ছিল ভয়ানক খারাপ। সকালে নাশতার টেবিলে বসেছে কেবল মিজান। মিজানের প্রিয় খাবার পাতলা খিচুড়ি, জলপাইয়ের আচার আর ডিম ভাজি। টুনি টেবিলে সাজিয়ে নাশতা দিচ্ছে। গম্ভীর হয়ে মিজান আস্তে ধীরে খায় আর মনে মনে ভাবে রাহেলার এত বাড়াবাড়ি ভালো লাগছে না। সিঁথির কান্না শোনা যায়। রাহেলা কিছুক্ষণের মধ্যেই সিঁথিকে নিয়ে আসে। নিজের রুমে গিয়ে স্তন্যপান করিয়ে আবার দোতলায় দিয়ে এসে বসে নাশতার টেবিলে। হেমন্তের সকালে বাতাসে হিমেল ভাব থাকলেও রাহেলা ঘামছে। দুজনই নাশতা খায় ধীরে সুস্থে। খেতে খেতে রাহেলা বলল, আমার আর আদনানের টিকিট ক্যানসেল করে দাও। আমি বিদেশে যাব না।

              রাহেলার কথা শুনে মিজান পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। মিজান জানে রাহেলা তার কথা থেকে সরে আসবে না। হঠাৎ করেই সম্পূর্ণ বাসাটিতে নেমে আসে প্রগাঢ় স্তব্ধতা। 

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares